ভিখু চরিত্র : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাগৈতিহাসিক গল্পের আলোকে বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ


ভিখু চরিত্র : ‘প্রাগৈতিহাসিক‘ গল্পের ভিখুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও অন্তর্গত চরিত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ
মানিক সাহিত্য সর্বাধিক আলোচিত গল্প প্রাগৈতিহাসিক। মানিকের জীবনভাবনা শিল্পবোধ ও নির্মাণ দক্ষতার অপূর্ব সমন্বয়ে সৃষ্টি এ গল্পের নায়ক ভিখু। ফলে চরিত্রটি সমগ্র বাংলা সাহিত্য এক তাৎপর্যপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। জীবন চলার পথে দুর্নিবার গতি, প্রতিকুল পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করার শক্তি, মনোভাব প্রকাশে অকপট সারল্য ভিখু চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ভিখু প্রবলভাবে সংগ্রামশীল ও অস্তিত্ববাঙ্গী। ভিখুর জীবনে প্রকাশ পেয়েছে দূর্বিণতা ও প্রচন্ডতা। ‘আদিমতম কামনার রুপ ও অস্তিত্বের সংকটে ভিখু প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারের মানুষ।”
সভ্যতার পর্বে আসার আগে মানুষ কাম ও ভোগস্পৃহায় মেতে থাকতো। এ গল্পের মধ্যে দিয়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের সেই আদিম রুপটি তুলে ধরতে চেয়েছেন। ভিখু হলো প্রাগৈতিহাসিক মানুষের সার্থক প্রতিনিধি।
ভিখু পেশায় ডাকাত। পেশা আর নাম ছাড়া তার কিছুই আমরা জানি না। ঠিকানাহীন বিশ্বপ্রকৃতির এই অবাঞ্চিত সন্তান নরহত্যা, ডাকাতি, চুরি, রাহাজানি, নারীহরণ নিষ্ঠুরতা প্রভূতি কাজকর্ম করে সে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করতো। সে মায়ের সামনে সন্তানকে হত্যা করে আনন্দ পেতো, স্ত্রীর সামনে স্বামীকে কষ্ট দিত। ভিখু সভ্যতার আলোয় কখনো গোসল করেনি।
ভিখু প্রবলভাবে সংগ্রামশীল ও অস্তিত্ববাদী, জীবন যুদ্ধে সে কখনো পরাজয় মেনে নেয়নি। জঙ্গলের মধ্যে জোঁক ও পোকার কামড় খেয়ে, শরীরে প্রচন্ড ব্যথ্যা ও যন্ত্রণা নিয়েও সংগ্রাম করেছে নিজের অস্তিত্বরক্ষার জন্য। অস্তিত্বের জন্যই ডাকাতি করেছে। মানুষ খুন করেছে, মার খেয়ে হাত নষ্ট হলে অস্তিত্বের খাতিরে ভিক্ষা করেছে। নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সে কারো সাথে আপোষ করেনি।
ভিখুর মধ্যে ছিল জীবনকে উপভোগ করার প্রবলতর বাসনা। তাই বঞ্চনাকাতর জীবন কিংবা ভাগ্যবিড়ম্বিত বিকলাঙ্গ জীবন কোনোটাকেই সে মেনে নেয়নি। অসুস্থ থেকে সুস্থ হয়েই জীবনকে ভোগের নেশায় মাতিয়ে তুলেছে নিজেকে। পঙ্গু হাত নিয়ে আপসোস করেছে। আর বলেছে যে সুযোগ পেলে পৃথিবীর সমস্ত খাদ্য ও নারী সে নিজের দখলে নিয় আসতো।
ভিখু আদিম বর্বর। জৈবিক তাড়না তার মধ্যে প্রবল। সে ছিল নারী লোলুপ এবং কামুক। নারীদেহ ভোগ করে ভিখু চরম আনন্দ পেত। সুস্থ হয়ে উঠেই সে পেহলাদের স্ত্রীর দিকে হাত বাড়িয়েছে। পাচীকে নিজের দখলে নিয়েছে। এরকম বৈশিষ্ট্য তার আগের জীবনেও ছিল। পাবনার শ্রীপতি বিশ্বাসের বোনকে রাঘুবাগদির সহায়তায় চুরি করতে গিয়ে সাত বছর জেল খেটেছে। জেল থেকে বেরিয়ে রাঘুর বউকে ভাগিয়ে নিয়ে হাতিয়ায় চলে গেছে। পঙ্গু অবস্থায় ভিক্ষার ভান করে নদীর ধারে স্নানরত রমনীদের সিক্ত বিবস্ত্র দেহ দেখে উম্মুক্ত কামতৃজ্ঞা নিবারণ করেছে।
রক্তের তেজ ছিল, তাই মেজাজ সব সময় খিটখিটে থাকতো। পঙ্গ ুহয়ে ভিক্ষা করলেও বদ মেজাজ পরিবর্তন হয়নি। ভিক্ষা না দিলে তার উদ্দেশ্যে বিশ্রী রকমম মন্তব্য করতো। এক পয়সায় জিনিস কিনে ফাও না দিলে দোকানদারকে মারতে যেত।
ডাকাতি করতে গিয়ে তার ক্রিয়াকলাপ ভিখু চরিত্রের হিংস্রতাকে প্রমাণ করে। পাচী উদ্ধারে বশীরের হত্যা বৈকুন্ঠ সাহার ডাকাতি করতে গিয়ে মেজ ভাইয়ের দায়ের কোপে গলা ও দেহ আলাদা করা। মায়ের সামনে সন্তান হত্যা ইত্যাদি বিষয় বলে দেয় তার স্বভাব ছিল হিংস্র জানোয়ারের মত।
ভিখু ছিল চরম অকৃতজ্ঞ। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পেহলাদ তাকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছে, বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে, অথচ সেরে না উঠতেই পেহলাদের স্ত্রীর প্রতি কামনার হাত বাড়িয়েছে। এ কারণে পেহলাদ ভিখুকে মারধোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সে রাতেই অকৃতজ্ঞ ভিখু প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে পেহলাদের ঘরে আগুন দিয়ে তাকে সর্বস্বাস্ত করেছে।
প্রতিহিংসা পরায়ণতা ভিখু চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট। পেহলাদের ঘরে আগুন দেয়া, বশিরকে হত্যা করা ইত্যাদি কার্যতার প্রতিহিংসা পরায়নতার বহিঃপ্রকাশ।
মাণিকের গল্পে ফ্রয়েড়ীয় চেতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। ভিখুর জীবন পরিণতির মধ্যে ফ্রয়েডীয় চেতনার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। সেই সাথে ইন্দ্রিয় আবেগ ও উদর তাড়না ভিখুর জীবনে অনিবার্য উপাদান হিসেবে এসেছে। ক্রুরতা, নির্মমতা, নিষ্ঠুর নির্দয়তা, অকৃতজ্ঞতা, যৌনাবেগ, প্রবৃত্তি-তাড়না ও তজ্জাত মমত্ববোধ, বেঁচে থাকার দুর্নিবার চেষ্টা ইত্যাদির সমন্বয়ে ডাকাত ও ভিখারি ভিখুকে মানিক অতি নিপুণভাবে সৃষ্টি করেছেন।
ভিখু চরিত্রের অপরিমেয় জীবনী শক্তির কথাটিও বিবেচনায় আনতে হয়। বর্ষাকালে যে বন বাঘেরও বসবাসের অযোগ্য, সেই বনে বর্শাবিদ্ধ জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় ভিখু ক্ষুধাতৃষ্ণা পোকামাকড়, মশামছি, পিপঁড়া-জোঁক-সাপ-শেয়ালের অত্যাচার উপেক্ষা করেই বেঁচে থাকে। লেখক তার সম্পর্কে বলেন-
“মরিবে না। সে কিছুতেই মরিবে না। বনের পমু যে, অবস্থায় বাঁচে না, সেই অবস্থায় মানুষ সে, বাঁচিবেই।”
এরকম জীবনী শক্তির জোরেই পেহলাদের বাড়িতে সামান্য আশ্রয়ের জোরে বিনা চিকিৎসায় বিনা যতেœ এক মাসের মধ্যে সে সুস্থ হয়ে উঠেছে। অরুণকুমার মুখোপাধ্যয় বলেছেন-
“ভিখুর বলিষ্ঠ বীভৎস আদিম মানব রূপটি লেখক অসামান্য দক্ষতায় চিহিৃত করেছেন ও ভিখুর পরিমাপ নির্ভূলভাবে দেখিয়েছেন ভিখুর জীবনে সভ্যতার আলো পড়িনি প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে তার উথান ও বিলয়। তবু তার বেঁচে থাকার তীব্র অভিলাষ ও প্রচন্ড প্রাণশক্তিকে লেখক অভিনন্দন জানিয়েছেন।” ( কালের কুন্ডুলিকা)
ভিখু চরিত্রকে দিয়ে লেখকের জীবন-ভাবনা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা ঠিক না। ভিখু সমগ্র মানবসত্তার প্রতিনিধি না। ভিকু যে পরিবেশের সে পরিবেশের আলোকে ভিখুর এটাই স্বাভাবিক । কেননা সভ্যতার আলোহীন যে জীবন পরিবেশে ভিখুর বসবাস, তার জীবনাচরণ ও মনোভঙ্গি সেই পরিবেশের জন্যই সত্য। এ বাস্তববোধে ভিখু চরিত্র অনন্য। তার জিঘাংসা, বিরংসা, ভোগবাদিতা দস্যুবৃত্তি ও ভিখাবৃত্তি, অন্যদিকে অসাধারণ প্রাণশক্তি, জিগীষাবৃত্তি ও জীবনবাদিতা এসব কিছুর সমন্বয়ে ভিখু চরিত্র যেমন মানানসই তেমনি মানবিক।
ভিখু যে প্রাগৈতিহাসিক যুগের প্রতিনিধি, সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগের বর্বরতা বা অন্ধকার যে অতি আধুনিক সভ্যতার মানুষের মধ্যেও বিরাজ করে এবং অনুকুল পরিবেশ ও বিশেষ পরিস্থিতিতে বিকশিত হতে পাওে, এ গল্পের মধ্যে দিয়ে লেখক তার লেখনিতে তা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায় ভিখু পাশবিক চরিত্র হলেও লেখকের সহানুভূতি থেকে বঞ্চিত হয়নি। লেখক অজ্ঞজ শ্রেনীর পেশি বহুল চরিত্রের মধ্যে যে অদম্য প্রানশক্তি দেখেছেন মধ্যবৃত্ত সমাজে তা কামনা করেছেন। ফলে ভিখু চরিত্র লেখকের অন্তর রসে সিক্ত হয়েছে। এক প্রকার বিদ্রোহ চেতনা, আত্মপ্রতিষ্ঠার সবল প্রকাশ এবং আত্মশক্তির বিকাশের মাধ্যমে জয়ের নেশা। সংগ্রামশীলতা, অস্তিত্বকাম্য, অদম্য জীবনস্পৃহা, প্রকৃতি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ভিখু-চরিত্র সজীব প্রানময় ও উজ্জল।
- আদিম ও হিংস্র:
- প্রবৃত্তিতাড়িত:
- প্রতিশোধপরায়ণ:
- অবিচল ও আপোষহীন:
- জীবন–সংগ্রামে অদম্য:
- বাস্তববাদী ও সত্য:
প্রফেসর
বাংলা বিভাগ
সহায়ক গ্রন্থের তালিকা:
- ভৌমিক, নীরেন্দ্রনাথ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: জীবন ও সাহিত্য। কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ১৯৮৪।
- সাহা, অজিতকুমার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমগ্র সাহিত্য আলোচনা। কলকাতা: দে’জ পাবলিশিং, ১৯৯২।
- ভট্টাচার্য, অচিন্ত্যকুমার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সাহিত্য দর্শন। কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, ১৯৮০।
- বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিতকুমার। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্র (সম্পাদনা)। কলকাতা: সাহিত্যমন্দির, ১৯৭০।
- চক্রবর্তী, দেবীপ্রসাদ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: জীবন, সাহিত্য, সমাজ। কলকাতা: মডার্ন বুক এজেন্সি, ১৯৯১।
- দত্ত, শঙ্করীপ্রসাদ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: ব্যক্তি ও সাহিত্য। কলকাতা: পাপিরাস, ১৯৯৯।
- ভট্টাচার্য, সুধীরচন্দ্র। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: কথাসাহিত্যের সংকট ও সার্থকতা। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ, ১৯৮৭।
- মজুমদার, আশুতোষ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সমালোচনা গ্রন্থ। ঢাকা: মুক্তধারা, ২০০৫।
- রায়, শক্তিপ্রসাদ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর উপন্যাস জগৎ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স, ১৯৯০।
- সেন, শশাঙ্ক। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়: সাহিত্য ও জীবনবোধ। কলকাতা: গ্রন্থনিকেতন, ১৯৮২।


👌👌
কল্যাণ হোক
ধন্যবাদ
ধন্যবাদ