মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা, পরিচয়, উদ্ভবের প্রেক্ষাপট ও বৈশিষ্ট্য
মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য:
মঙ্গলকাব্যের সময়কাল: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের যতগুলো শাখা আছে তার মধ্যে মঙ্গলকাব্য শাখা বিশেষ তাৎপর্যের দাবি রাখে। আনুমানিক খ্রীষ্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দী মঙ্গলকাব্যের প্রারম্ভিক কাল। অনেকের মতে মঙ্গলকাব্যের উদ্ভবকাল পাল রাজার আমলে। সাধারণভাবে যে দেবীর কথা বা কাহিনি শ্রবণ বা পাঠ করলে মঙ্গল হয় এবং শ্রোতা ও পাঠক পূণ্য পায়, তাকে মঙ্গলকাব্য বলে।
মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা ও পরিচয়:
আনুমানিক খ্রীস্টীয় ত্রয়োদশী শতাব্দী হতে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীর কবি ভারতচন্দ্রের কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যে যে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্ম বিষয়ক আখ্যান কাব্য প্রচলিত ছিল, তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়ে বাংলাদেশের লৌকিক ও বহিরাগত বিভিন্ন ধর্ম মতের যে অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়েছে, মঙ্গলকাব্যগুলা তারই পরিচয় বহন করে। বিভিন্ন যুগের ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আচার-আচারণ, সংস্কার-সংস্কৃতি ও ধর্মবিশ্বাসের বিস্তৃত ভিত্তির উপরই মঙ্গলকাব্যের প্রতিষ্ঠা। সংস্কৃত সাহিত্য বিবিধ মহাপুরাণ ও উপপুরাণগুলো যে উদ্দেশ্যে রচিত হয়, বাংলা মঙ্গলকাব্যগুলোও সেই উদ্দেশ্যেই সর্ব প্রথম রচিত হতে শুরু করে। পৌরাণিক, লৌকিক সংমিশ্রণে দেব-দেবীর লীলা-মাহাত্ম্য ভক্তি-কাহিনী অবলম্বনে মঙ্গলকাব্যগুলো রচিত হত।
অতএব বলা যেতে পারে, দেব-দেবীর মাহাত্ম্যবাচক কাহিনির আলোকে যে-সব কাব্য রচিত হয়েছে, তাকেই মঙ্গলকাব্য বলে।
মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য
মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য: প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যের কিছু না কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যামান, যার ফলে মঙ্গলকাব্যগুলো হয়েছে প্রাণবন্ত। এ সব বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে মঙ্গলকাব্যগুলো সম্পর্কে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায়।
বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ:
আশীর্বাদধর্মী সূচনা – প্রতিটি কাব্যের শুরুতে দেব-দেবীর বন্দনা, তাঁদের মঙ্গলকামনা ও আশীর্বাদের আহ্বান করা হয়।
ধর্মীয় উদ্দেশ্য – ধর্ম প্রচার, নিজ দেব-দেবীর মাহাত্ম্য প্রচার ও ভক্তদের আস্থা সৃষ্টিই মূল লক্ষ্য।
নির্দিষ্ট দেবতার মাহাত্ম্যকীর্তন – যেমন মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল ইত্যাদিতে দেবী মনসা, দেবী চণ্ডী বা ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য গাওয়া হয়েছে।
মঙ্গলকামনা – কাব্যের নামানুসারে সমাজ ও ভক্তদের কল্যাণ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
লোকায়ত প্রভাব – আর্য-অনার্য, ব্রাহ্মণ্য ও লোকজ বিশ্বাসের মিশ্রণে রচিত হয়েছে। তবে লোকায়ত প্রভাব বেশি থাকে।
বর্ণনাধর্মী কাহিনি – দেবতার মাহাত্ম্যের সাথে কাহিনি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যেমন—চাঁদ সওদাগর, কালকেতু-ফুল্লরা, লাউ সেন ইত্যাদির কাহিনি।
পৌরাণিক ও লোককাহিনির মিশ্রণ – পুরাণের উপাদান ও বাংলার স্থানীয় লোককথা একত্রিত হয়েছে।
আখ্যানমূলক ধারা – পদ্যে বর্ণিত দীর্ঘ কাহিনি, যেখানে চরিত্র, ঘটনা ও সংঘাত বিদ্যমান। দেবদেবীর জন্মকাহিনি, মর্তে আগমন, স্বর্গে প্রত্যাবর্তন।
সামাজিক প্রতিফলন – তৎকালীন সমাজব্যবস্থা, বিশ্বাস, পেশা ও জীবনধারা স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ভক্তি ও নৈতিক শিক্ষা – দেবতার প্রতি ভক্তি, ভক্তের পরীক্ষার কাহিনি এবং শেষপর্যন্ত ভক্তির জয়ের বার্তা থাকে।
ভাষা ও রীতি – সহজবোধ্য, লোকপ্রিয়, আঞ্চলিক টানে ভরা পদ্যরীতি।
আঞ্চলিক বৈচিত্র্য – বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে, ফলে আঞ্চলিক প্রভাব স্পষ্ট।
গীতিধর্মীতা – অনেক কাব্য গানের মতো ছন্দে লেখা, যা পালাগান বা যাত্রার মতো আসরে গাওয়া যেত।
চিত্ররূপময়তা – প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, নদী-নৌকা, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রভৃতি জীবন্ত চিত্র উঠে আসে। লোকায়ত জীবনের সংসার, যাপিতজীবন চিত্ররূপময় হয়ে
লোকভাষার ব্যবহার – সাধারণ মানুষের কথ্যরীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।:
পঞ্চতদেবতার বর্ণনা: মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য হিসেবে পরিচিত পঞ্চদেবতার বর্ণনা। বিভিন্ন সৃষ্টির রহস্য, পূজা-প্রচার ইত্যাদি মঙ্গলকাব্যের মধ্যে দেখা যায়। মঙ্গলকাব্যের সমস্ত কিছু এসেছে হিন্দু-সভ্যতা থেকে, যারা মঙ্গলকাব্য রচনা করেছেন তারাও জাতিতে ও ধর্মে হিন্দু। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে পাঁচজন দেবতার কথা উল্লেখ আছে। দেবতা পাঁচজন যথাক্রমে ব্রক্ষা, বিষ্ণু, মহেশ্বর, গনেশ, কার্তিক।
গ্রন্থ উৎপত্তির বর্ণনা: মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য হল গ্রন্থউৎপত্তির বর্ণনা। প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যে কবি গ্রন্থোৎপত্তির একটি বর্ণনা দিয়ে থাকেন। গ্রন্থোৎপত্তির বিবরণ অংশে দেবতার স্বপ্নাদেশই যে কাব্য রচনার মুখ্য কারণ, তা উল্লেখ করা থাকে। তবে কোনো কোনো অংশে গ্রন্থ রচনার সময় উল্লেখ থাকে না। এটি ভূমিকা রূপে কাব্যের প্রথম দিকে যুক্ত থাকে।
কবির আত্মপরিচয়: মঙ্গলকাব্যের অনেক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি হল কবির আত্মপরিচয়। মঙ্গলকাব্যের কবিগণ তাদের গ্রন্থের মধ্যে আত্মপরিচয়মূলক পদ রচনা করে থাকেন। আত্মপরিচয় অংশে পিতা-পিতামহ মাতা-মাতামহ প্রকৃতির নাম ও বাসস্থানের উল্লেখ থাকে।
হেঁয়ালীতে গ্রন্থ-রচনার কাল: মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য হল হেঁয়ালীকে গ্রন্থ-রচনার কাল বর্ণনা করা। মধ্যযুগের প্রচলিত রীতির অংশ হিসেবেই মঙ্গলকাব্যের কবিগণ তাঁদের কাব্য রচনারকাল হেঁয়ালীর মত করে উল্লেখ করতেন। সমসাময়িক কালেই বিজয়গুপ্ত তাঁর মনসা-মঙ্গল কাব্য রচনার কাল এভাবে নির্দেশ করেছেনÑ
“ঋতু শশী বেদ শশী পরিমিত শক (১৪০৬+৭৮=১৪৮৪ সাল)
সুলতান হুসেন শাহ্ নৃপতি তিলক”
অতএব, হেঁয়ালী সমস্ত মঙ্গলকাব্যের রচনাকালজ্ঞাপন পদনির্দেশের একমাত্র রীতি ছিল।
নায়িকার বারমাসীর বর্ণনা: নায়িকার বারমাসির বর্ণনা বাংলার প্রাচীন কাব্যগুলির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই বারমাসীর বর্ণনায় প্রাচীন কবিগণ পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলির পটভূমিকায় নায়ক-নায়িকার সুখ দুঃখের বিস্তৃত বর্ণনা দিয়েছেন। মঙ্গলকাব্যের মধ্যে বারমাসীর বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো কোনো অনুবাদে সীতার বারমাসী, বৈষ্ণব কবিতায় রাধিকার বারমাসী চৈতন্য-জীবনচরিতে বিষ্ণু প্রিয়ার বারমাসী মৈমনসিংহ গীতিকায় মলুয়ার বারমাসী ইত্যাদির সাথে পরিচয় লাভ করা যায়। অতএব অনুমান করা যেতে পারে সংস্কৃত সাহিত্য হতে মঙ্গলকাব্যে বারমাসীর বর্ণনাগুলো এসেছে। তাছাড়া বাংলা মঙ্গলকাব্য বারমাসের পরিবর্তে নায়িকার ছয়মাসের সুখ দুঃখের বর্ণনামূলক রচনাও দেখতে পাওয়া যায়। তাকে ছয়মাসী বা ছয়মা
পতিনিন্দার বর্ণনা: মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য হল নারীদের পতিনিন্দার বর্ণনা। এতে বিবাহ-সভা কিংবা অন্যত্র কাব্যের নায়ককে দর্শন করে বিবাহিত নারীরা তার সঙ্গে নিজেদের পতিদের তুলনা করে নিজেদের স্বামীর দুর্ভাগ্যের কথা পরস্পর আলোচনা করে থাকেন। পাতিব্রজের এক অতি কঠোর আদর্শ সম্মুখে রেখে মনসামঙ্গলকাব্য রচিত হলেও এদের মধ্যেও পতিনিন্দার গতানুগতিক বর্ণনা স্থান লাভ করেছে। এতে একদিকে মৃত পতির অস্থিকয়খানা সম্বল করে সুপরিস্ফুট যৌবনা এক নারী পাতিব্রত্যের শ্বেত-পতাকা উড়িয়ে দুস্তুর সংসার-গাঙুরে দুঃখের ভেলা নিয়ে ভেসেছে আর অন্যদিকে তারই প্রতিবেশিনী নারীরা নিজেদের পতিদের ঐহিক ছোট ছোট দোষত্রুটির কথা স্মরণ করে তাদের প্রতি নির্লজ্জ ধিক্কারে পাতিব্রত্যকে পদদলিত করছে।
নারীর সতীত্ব পরীক্ষা: প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যের মধ্যেই নারীর সতীত্বের পরীক্ষার বিষয়টি থাকে। কুলীন সমাজে নারীর বিড়ম্বনার বর্ণনা করা আছে। নারীর সতীত্বের পরীক্ষার কথাশুনে রামায়ণের সীতার অগ্নিপরীক্ষার কথা মনে হতে পারে। কিন্তু তা সত্য নয়। কারণ মঙ্গলকাব্যগুলোর মধ্যে সীতার অগ্নি-পরীক্ষার অনুরূপ কোনো পরীক্ষার পরিবর্তে একাধিক পরীকার উল্লেখ আছে। মনসামঙ্গলে বেহুলার অষ্ট-পরীক্ষার কথা উল্লেখিত হয়েছে।
দাম্পত্য কলহ:: দাম্পত্য কলহের বর্ণনা দেওয়া মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। বৃদ্ধ স্বামীর সাথে যুবতী স্ত্রীর মনোমালিন্য কুলীন স্বামীদের হাতে কুল কন্যাদের নির্যাতন ও বিড়ম্বনার কথা কবিগণ বর্ণনা করতেন। দাম্পত্য কলহ দেখা দিত চারটি কারণে। যথা- অসম বিবাহের কারণে, আর্থিক সমস্যার কারণে, একাধিক স্ত্রী থাকবার কারণে ও যৌন সমস্যার কারণে।
বিবাহাচারের বর্ণনা: বিবাহাচারের বিস্তৃত বর্ণনা মঙ্গলকাব্যগুলোর বৈশিষ্ট্য। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল হতে সংগৃহীত বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যের মধ্যে এই বিষয়ক রচনায় বাংলা-সমাজের আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলো সার্থকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। বিবাহের আচারগুলো অত্যন্ত রক্ষনশীল। কারণ বিবাহের উদ্দেশ্য সন্তানলাভ। বিবাহ সমাজের সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে পারিবারিক জীবনধারা রক্ষা পায় এবং পরিবারকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর সমাজজীবন গড়ে ওঠে। বিবাহাচারগুলো মঙ্গলকাব্যের মধ্যে এত বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে যে তা হতে বাংলার সমাজ সম্পর্কে এ বিষয়ের বহু খুঁটিনাটি তথ্য সংগৃহীত হতে পারে। প্রত্যেক মঙ্গলকাব্যেই একাধিকবার এ সকল বিবাহাচারের সুবিস্তৃত বর্ণনা শুনতে পাওয়া যায়। মনসামঙ্গল কাব্যে তিনটি বিবাহের অনুষ্ঠান হয়েছে। যথা- মনসার বিবাহ, চাঁদ সদাগরের বিবাহ, এবং লখীন্দরের বিবাহ। মঙ্গলকাব্যেগুলোর মধ্যে বিবাহাচারের মত আর কোনো সামাজিক আচারের এত বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায় না।
নায়ক-নায়িকার রূপ বর্ণনা: মঙ্গলকাব্যের আরও একটি বৈশিষ্ট্যের নায়ক-নায়িকার রুপ বর্ণনা। মঙ্গলকাব্যগুলোর রূপ-বর্ণনাচ্ছলে যে উপমা-উৎপেক্ষার ব্যবহার করা হয়েছে, যদিও সেগুলো রূপ বর্ণনায় আদৌ সহায়তা করেনি। মঙ্গলকাব্যের ঐশ্বর্যযুগের কবিগণ রূপ বর্ণনাতে স্বর্গমর্ত্য নিয়ে ক্রীড়া করেছেন ও কাব্যপল্লবের বিস্তার ঘটিয়েছেন।
সাজসজ্জার বর্ণনা: সাজ-সজ্জার বর্ণনা দেওয়া মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। এই সাজ-সজ্জার বর্ণনার মধ্যে দিয়ে আমরা সেকালের নর নারীদের পরিচ্ছেদ ও আভরণ সম্বন্ধে জ্ঞান লাভ করতে পারি। মঙ্গলকাব্যের রমণীরা পদে পাশুলি, কটিতে কিঙ্কিনী, কন্ঠে শতেশ্বরী হার, বাহুতে তাড়ু, হাতে শঙ্খ, কঙ্কন, কনক মাদুলি ও অঙ্গুলিতে অঙ্গুরীয়ক ব্যবহার করত। কর্ণাভরণ হিসাবে ব্যবহৃত হত তাটঙ্ক, কনক বৌলি রামকড়ি মদনকরি ও মকরকুন্তল। মঙ্গলকাব্যের পুরুষগণও অঙ্গে আভরণ ব্যবহার করত। মঙ্গলকাব্যে পরিচ্ছেদের অংশ হিসেবে নারীগণ গঙ্গাজল, মেঘডম্বুর, অগ্নিপাট, কমলা-বিলাস প্রভূতি শাড়ি ব্যবহার করত। তারা খোঁপার মধ্যে দিত মানিক ও মালতী ফুল। কেশ সংস্কারের জন্য আমলকী ব্যবহৃত হত।
পাক-প্রণালির বর্ণনা: মধ্যযুগের বাংলা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য হল পাক-প্রণালির বর্ণনা। উপযুক্ত কোন অবকাশ পেলেই এসকল কাব্যের মধ্যে প্রায় সর্ব এই রন্ধনকার্যের বিস্তৃত বর্ণনার অবতারণা করা হয়েছে। এই সকল বর্ণনায় কবিগণ বাস্তবতার উপর যথেষ্ট নিষ্ঠা দেখিয়েছেন। মধ্যযুগের আখ্যান কাব্যের বাইরেই এদের উদ্ভব হয়েছিল, কালক্রমে মঙ্গলকাব্যের কাহিনী অবলম্বন করে তা আত্মপ্রকাশ করেছে। ডাকের নামে প্রচলিত কতকগুলো বিচ্ছিন্ন লোক-প্রবচনের মধ্যেও এই প্রকার পাক কার্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। সমাজের জনসাধারনের রুচির অনুগামা বলে চারিদিক হতে এসকল বিচ্ছিন্ন লৌকিক রচনাসমূল কালক্রমে মঙ্গলকাব্যে কাহিনীতে এসে স্থান লাভ করেছে। ‘কৃত্তিবাসী রামায়ণ’, ‘চৈতন্য ভাগবত’ এসব রচনায় বর্ণনা পাওয়া গেলেও মঙ্গলকাব্যের মধ্যে ইহার বিস্তৃততম বর্ণনা পাওয়া যায়।
সমুদ্রযাত্রার বর্ণনা: সমুদ্রযাত্রার বর্ণনা মঙ্গলকাব্য মাত্রেরই অপরিহার্য অঙ্গ। মঙ্গলকাব্যে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার কথা উল্লেখ থাকত। সমুদ্রপথের বর্ণনার মধ্যে কালীদহের বর্ণনা এক অপরিহার্য বিষয়। কালীদহেই চন্ডীমঙ্গলের কমলে কামিনী বা সামুদ্রিক মরীচিকার আবির্ভাব হয়েছিল, এরই উত্তাল তরঙ্গে চাঁদ সদাগরের ভরাডুবি হয়েছিল। প্রত্যেক সমুদ্রযাত্রার বর্ণনাই এক একটি উন্মত্ত ঝড়ের বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
নগর-বর্ণনা: নগর-বর্ণনা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। মঙ্গলকাব্যের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের বাংলার এক একটি নগর যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলকাব্যের কবিগণ সেকালের একটি নগর বর্ণনা করতে গিয়ে তাদের চোখ চারদিকে খুলে রেখেছিলেন। নাগরিক জীবন যে মিশ্র সমাজজীবন, এর বহু বৈচিত্র্যের মধ্যেও যে ঐক্য আছে, এর বিভিন্ন সমাজ পরস্পর আপেক্ষিক হয়েও যে স্বতন্ত্র, মঙ্গলকাব্যের কবিদের নগর বর্ণনার ভিতর দিয়ে তা প্রকাশ পেয়েছে। মুকুন্দরামের ‘চন্ডীমঙ্গল’র মত এত বিস্তৃত নাগরিক জীবনের বর্ণনা আর কোন মঙ্গলকাব্যে নেই।
নগর-পরিকল্পনা: নগর-পরিকল্পনা ছিল মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। প্রথমযুগের মঙ্গলকাব্যে বর্ণিত নগরগুলি ছিল অবাস্তব। এখানে নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী নগরগুলো ব্যাপক হারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তাদের মৃত্তিকা ছিল রতœমন্ডিত, গৃহে প্রতিচালে ‘সোনার কোমড়া’ ঝুলত। কিন্তু ঐশ্বর্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলোতে অঙ্কিত নগর চিত্রগুলো অধিকতর বাস্তব। নগরের সাথে সরোবরও বর্ণিত হত। ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর কাব্যের পুরবর্ণনায় সেকালের নগর পরিকল্পনার একটি সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
রপ্তানী-দ্রব্য ও আমদানী-দ্রব্যের বিস্তারিত বর্ণনা: অধিকাংশ মঙ্গলকাব্যে রপ্তানী-দ্রব্য ও আমদানী-দ্রব্যের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। রপ্তানী ও আমদানী দ্রব্যের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যাবে বিশ্বকর্মার আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে। বিশ্বকর্মার পুরীনির্মাণের মধ্যে এ দেশের স্থাপত্য-শিল্প, নগর-পত্তনের মধ্য দিয়ে নগর-সংস্থাপনা, ডিঙ্গা-নির্মাণের মধ্য দিয়ে সমুদ্রগামী নৌকা-নর্মাণ কৌশল, কাঁচুলী, টোপর প্রভৃতি নির্মাণের ভিতর দিয়ে চারুশিল্প সাধনার প্রকাশ পেয়েছে।
যুদ্ধের বর্ণনা: এক মনসামঙ্গল ব্যতীত সকল মঙ্গলকাব্যেই বিস্তৃত যুদ্ধ বর্ণনার উল্লেখ রয়েছে। বীররসের সাথে সাথে বীভৎস রসেরও এতে পরিবেশন করা হয়েছে। কোনো কোনো মঙ্গলকাব্যে যুদ্ধের বর্ণনা অত্যন্ত বিস্তৃত এবং নিতান্ত বৈচিত্র্যহীন।
শ্মশান বর্ণনা : শ্মশান বর্ণনা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। মঙ্গলকাব্যের মধ্য দিয়ে সংস্কৃত মহাকাব্যের মত বিবিধ রস পরিবেশন করা হয়ে থাকে- শ্মশান বর্ণনার ভিতর দিয়েই বীভৎস রস মূখ্য হয়ে উঠে। অবশ্য যুদ্ধ বর্ণনার মধ্যে প্রেতের হাট প্রভৃতি প্রসঙ্গ অবতারণার ভিতর দিয়েও বীভৎস রসের অবতারণা করা হয়। কিন্তু শ্মশান বর্ণনার ভিতর দিয়ে ইহা আরও প্রত্যক্ষ হয়ে উঠবার সুযোগ পায়। এসকল বর্ণনা গতানুগতিক এবং অত্যন্ত কৃত্রিম।
জরতীর ছদ্মবেশ ধারণ: দেবীর জরতী বা বৃদ্ধার বেশ ধারণ করে নায়ক বা নায়িকাকে ছলনা বা রক্ষা করা মঙ্গলকাব্যের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয়। মঙ্গলকাব্যের জরতী চরিত্রের মধ্যেও সেজন্যই দৈবশক্তি আরোপিত হয়ে থাকে। জরতী বেশ ব্যতীত ও দেবতাদের কাক ও মাছির কোনোও কোনোও স্থলে শ্বেতকাক ও শ্বেতমাছির রূপধারণও মঙ্গলকাব্যের একটি অতিসাধারণ বৈশিষ্ট্য
চৌতিশার বর্ণনা: বিপন্ন নায়ক কর্তৃক দেবীর চৌতিশা স্তব বর্ণনা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। ক-হতে শুরু করে হ-পর্যন্ত প্রত্যেকটি ব্যঞ্জনবর্ণ ক্রমান্বয়ে প্রত্যেক পর্বের আদিবর্ণরূপে ব্যবহার করে রচিত স্তবই চৌতিশা স্তব নামে পরিচিতি। এতে ক্রমান্বয়ে ৩৪টি অক্ষর ব্যবহার করতে পারা যায় বলে একে চৌত্রিশা বা চৌতিশা বলে।
পৃষ্ঠপোষক বা আশ্রয়দাতার পরিচয়: মঙ্গলকাব্যের কবিগণ তার আশ্রয়দাতা এবং পৃষ্ঠপোষকদের নাম নিজের নামের সঙ্গে অনেক সময় ভণিতায় উল্লেখ করেছেন। কবিদের আশ্রয়দাতৃদের নাম ভণিতায় উল্লেখ থাকবার ফলে অনেক সময় কবিদের কালনির্ণয়ে সহায়ক হয়েছে।
দেবীর নায়ক-নায়িকার প্রত্যাবর্তন: দেবীর নায়ক-নায়িকার প্রত্যাবর্তন মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। মঙ্গলকাব্যে দেখা যায়, নায়ক বা নায়িকার বিপদ আসন্ন হলে দেবীর মাহাত্ম্যে নায়ক বা নায়িকাকে প্রত্যাবর্তন করা হয়। এ জন্য হনুমানের অবতারণা মঙ্গলকাব্যে দেখা যায়। দেবীর আদেশে হনুমান কখনো মনসামঙ্গল কাব্যে মনসাকে সহায়তা করে আবার ধর্মমঙ্গলে লাউসেনকে সহায়তা করে।
মঙ্গলকাব্যের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য–অন্যান্য বৈশিষ্ট্য: উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্য ছাড়াও মঙ্গলকাব্যের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। যেমন-
- দেবতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীকে দেবতার পদতলে নতশীর্ষ করানো মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য
- গর্ভবর্ণনা তথা মাসের পর মাস ধরে গর্ভলক্ষণগুলো কীরূপে সন্তান-সম্ভবা রমনীর শরীরে প্রকাশ পাচ্ছে তার বিস্তৃত বর্ণনা করা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে।
- জ্যোতিষ শাস্ত্রের কথা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য
- নানা কুসংস্কারের কথা মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য
- সামাজিক উৎসব অনুষ্ঠানের কথা পরিবেশন করাও মঙ্গলকাব্যের বৈশিষ্ট্য। এ সকল বর্ণনা থেকে সেকালের রীতিনীতি সংস্কার বিশ্বাসের কথা জানতে পারি। তাছাড়া-
- সৃষ্টিতত্ত্বের বর্ণনা দেওয়াও মঙ্গলকাব্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সৃষ্টিতত্ত্বের মধ্য দিয়ে ক্রমবিবর্তনবাদের ধারার ইঙ্গিত দওয়া হয়েছে।
- বিভিন্ন প্রকারের নির্ঘন্ট রচনাও মঙ্গলকাব্যেরই বৈশিষ্ট্য। এই নির্ঘন্ট রচনা উপলক্ষ্যে কবিরা মানুষ, পশু-পাখি, ফুল-ফল ও নানা দ্রব্যের তালিকা দিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, উপরে উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যসমূহের মাধ্যমে মঙ্গলকাব্যের প্রকৃতি সম্বন্ধে ধারণা লাভ করা যায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই মঙ্গলকাব্যের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। এক কথায় মধ্যযুগের বাংলার সমাজ নতুন ও পুরাতনের মধ্যে সুন্দর সামঞ্জস্য বিধান করে পরস্পর বিপরীতমুখী সংস্কারকে একসূত্রে গেঁথে দেবার চেষ্টা করেছে। বাংলার সংস্কার যে কীভাবে একদেহে লীন হয়ে আছে, মঙ্গলকাব্যগুলো তারই পরিচয় বহন করে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।
রেফারেন্স বই
- দাস, সুকুমার। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (আদি থেকে মধ্যযুগ)। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
- সেন, সুকুমার। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (মধ্যযুগ)। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
- চক্রবর্তী, অশোককুমার। বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত (খণ্ড-১)। কলকাতা: পুস্তক বিপণি।
- মজুমদার, অমলেন্দু। মঙ্গলকাব্যের সামাজিক প্রেক্ষিত। কলকাতা: প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স।
- দত্ত, অজিতকুমার। বাংলা মঙ্গলকাব্য। কলকাতা: মিতালী প্রকাশনী।
- মুখোপাধ্যায়, অশোক। মঙ্গলকাব্যের রূপ ও রীতি। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ।
- রায়, সত্যেন্দ্রনাথ। মঙ্গলকাব্যের ধারা। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
- দাসগুপ্ত, নীহাররঞ্জন। বাঙলা মঙ্গলকাব্য: সমাজ ও সংস্কৃতি। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
- পাল, বিনয়কুমার। মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য। কলকাতা: মডার্ন বুক এজেন্সি।
- সরকার, সুশীলকুমার। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস (মধ্যযুগ)। ঢাকা: মুদ্রণালয়।
- ভট্টাচার্য , আশুতোষ। বাংলা মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস