কালিদাসের মেঘদূত কাব্য চির বিরহী হৃদয়ের বেদনার্ত চিত্রের রূপায়ণ।
মেঘদূত কাব্য – বিরহের প্রতিচ্ছবি।
কালিদাসের অমর কাব্য মেঘদূত কাব্য বহুকাল ধরে রসিক সমাজে বিশেষভাবে সমাদৃত হয়ে আছে। মেঘদূত কাব্যটি পাঠক হৃদয়ে এমন প্রভাব বিস্তার করেছে যে, অনেকে বলেছেন, তিনি যদি আর কিছু না লিখেও শুধু মেঘদূত কাব্য লিখতেন, তবু তাঁর কবি খ্যাতি অক্ষুন্ন থাকত। শব্দ চয়ন, উপমা প্রয়োগ, বিষয়বস্তুর গৌরবে, প্রকৃতির ব্যবহারে, পার্থিব প্রেম ও সৌন্দর্যের রূপায়ণে বিশেষ করে বিরহের কাব্যরূপে এটি একটি সার্থক রচনা। আলোচ্য নিবন্ধে বিচ্ছেদ বেদনার কাব্যরূপে মেঘদূত কতটুকু সার্থক, তা বিচার করবো।
মেঘদূত কাব্যের বিষয়বস্তুই কাব্যটিকে বিচ্ছেদ বেদনার কাব্যরূপে অমর করেছে। প্রভূশাপে যক্ষ নির্বাসিত অলকা থেকে সুদূর রামগিরিতে। অর্থাৎ স্বর্গ থেকে মর্তে নির্বাসিত। নির্বাসিত যক্ষ পত্নী বিরহে নিতান্ত কাতর এবং আষাঢ়ের প্রথম দিবসে আকাশে জমাট মেঘ দেখে তার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে নিজেকে কিছুতেই সংযত রাখতে পারে না। সে মেঘকে দূত করে পাঠায় পত্নীর কাছে অলকাপুরীতে। ‘মেঘদূত’ কাব্যে বিরহ-হৃদয়ের বার্তাই আশ্চর্য কাব্যরূপ লাভ করেছে। তাই এই কাব্যের আবেদন শাশ্বত।
মেঘদূত কাব্য বিরহের কাব্য। বর্ষার সাথে বিরহের এক নিবিড় ও আন্তরিক সম্পর্ক বিরাজমান এবং বিশ্বসাহিত্যে কবি কালিদাস তা সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন। কাব্যের শুরুতেই কবি বলেছেন, মেঘ দেখলে সুখী লোকের চিত্তও বিমনা হয়ে যায়, আর যে বিরহী, তার তো কথাই নেই। তাই আষাঢ়ের প্রথম দিবসে আকাশে মেঘ জমতে দেখে যক্ষের হৃদয় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে দূর অলকাপুরীতে বিরহিণী প্রিয়ার কথা স্মরণ করে। প্রিয়া বিরহে দক্ষ এতটা উদভ্রান্ত যে সে মেঘকে দূত হবার জন্য অনুরোধ করে। মেঘ আদৌ দূত হবার যোগ্য কিনা এ জ্ঞানও তার লোপ পেয়েছে। আসলে নিতান্ত বিরহী হৃদয় চেতন ও অবচেতনের পার্থক্য হারিয়ে ফেলে, প্রেমাতুর যক্ষের মধ্যে সকল ভেদবুুদ্ধি লোপ পেয়েছে।
নিদারুণ বিরহ-বেদনায় দক্ষ প্রচন্ড কাতর। আর ভাবনায় বিচলিত একাকিনী প্রিয়ার কথা ভেবে। নিজের বিরহ যন্ত্রণা যত বেড়েছে ততই মনে হয়েছে, প্রিয়াকে একটা সংবাদ দিতে না পারলে সে বেঁচে থাকবে কি করে? যক্ষ মেঘকে বলেছে-
তার পত্নী দিবস গণণায় এখানো বেঁচে আছে। রমনী হৃদয় কুসুম-সদৃশ কোমল এবং প্রিয় বিচ্ছেদে সদ্য ভগ্ন হয়, কেবল আশার বন্ধন তাকে বাঁচিয়ে রাখে। (পূর্বমেঘ-১০)
যক্ষ নিজের বিরহ-যন্ত্রণার দ্বারা পত্নীর বিরহ-যন্ত্রণা পরিমাপ করে। তাই নিজের জন্য নয়, প্রেয়সীর জন্য ভাবনা হয়। সে নিজের বেদনার চেয়ে পত্নীর বেদনাকে অনেক বড় করে দেখেছে এবং নিজের বেদনার চেয়ে পত্নীর বেদনা তার কাছে বেশি তীব্র হয়ে উঠেছে। এ কারণেই মেঘকে দূত করে পত্নীর কাছে একটা সংবাদ পৌঁছে দেবার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে।
প্রেম ও বিরহ মানুষকে আশংকাতুর করে তোলে। যক্ষ দেবযোনি হলেও স্বর্গ থেকে মর্তে নির্বাসিত- তাই সে দেবতার মহিমা থেকে বিচ্যুত। কবি তাকে মানুষের মর্যাদায় মন্ডিত করেছেন। যক্ষ তাই মর্তের মানুষের মতো প্রেম-বিরহে জর্জরিত হয়েছে এবং মানুষের মতো সদা আশংকাতুর।
অলকাপুরী ভোগ-বিলাসপূর্ণ ও ঐশ্বর্যময়। এখানে যক্ষগণ পুষ্পময় কাননে, জোছনামাখা মনোরম সন্ধ্যায়, অনন্ত যৌবন নিয়ে রূপসীবণিতার সঙ্গে মদপান করে আর আনন্দে মেতে থাকে। এ রকম ঐশ্বর্যের-বৈপরীত্যে সক্ষমপতœীর বিরহদশা আরও প্রকটিত হয়ে উঠেছে।
চির আনন্দ-নিকেতন এই অলকাপুরীতে যক্ষ বিরহে যক্ষপত্নী যেন একাকিনী চক্রবাকী, গভীর উৎকণ্ঠায় দিন যাপন করছে। সে শিশির মথিত পদ্মের ন্যায় ম্লান। যে অলকাপুরীতে কোনো বিচ্ছেদ কাতরতা নেই সেখানে যক্ষপত্নীর বেদনা বিশিষ্ট হয়ে ওঠে।
যক্ষের বিরহে বিরহিনী প্রিয়া সকল ভূষণ ত্যাগ করেছে। বিরহিনী প্রিয়ার জন্য যক্ষের উৎকণ্ঠার শেষ নেই। সে মেঘকে অনুরোধ করেছে যে, প্রিয়া যদি ঘুমিয়ে থাকে, তবে মেঘ যেন গর্জন না করে অপেক্ষা করে। প্রথমেই যেন ‘অবিধবা’ বলে সম্বোধন করে। মেঘ যেন বিরহ-শোকে তাপিত্তা বধূর কাছে আশ্বাস ও সান্ত¡নার বাণী বহন করে নিয়ে যায়। যক্ষ আজও বেঁচে আছে এবং পত্নীর কুশল জানতে চাইছে। বিধি প্রতিকূল, তাই সে দূরে রয়েছে, তবে মনে মনে পত্নীর সাথে মিলিত হচ্ছে। মেঘ প্রিয়াকে সাত্ত্বনা দিয়ে যেন তাড়াতাড়ি ফিরে এসে প্রিয়ার কুশলবার্তা দিয়ে প্রভাত-কুন্দের মতো স্খলিত-প্রায় যক্ষের জীবন রক্ষা করে।
যক্ষ প্রাকৃতির মধ্যে প্রিয়ার প্রতিরূপ দর্শন করেছে। শ্যামা-লতায় তার দেহ, চকিত হরিণী প্রেক্ষণে দৃষ্টি, চন্দ্রে আনন-প্রতিবিম্ব, শিখির পুচ্ছভাবে কেশদাম, মৃদু নদী-তরঙ্গে ভ্রুবিলাস অবলোকন করেছে। কিন্তু প্রেয়সীর সাদৃশ্য একত্রে কোথাও দেখতে পায় নি।
কবি যক্ষের বেদনাকে বিশ্বপ্রসারী করে তুলেছেন। রামগিরি থেকে অলকা পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ব-প্রকৃতি ও বিশ্ব জগৎ বিরহাতুর যক্ষের সমব্যথী। যক্ষের বিরহ আমাদেরই বিরহ। নববর্ষায় বিরহের যে অব্যক্ত বেদনা যুগ যুগ ধরে প্রেমিক হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে,তা-ই এ কাব্যে চিরন্তন রূপলাভ করেছে। এ কাব্যে বিরহ বিশ্বব্যাপী সার্বভৌম রূপ পরিগ্রহ করেছে।
যক্ষের বিরহ-বেদনা ব্যক্তিকে অতিক্রম করে সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে। তাই রবীন্দ্রনাথ মেঘদূত কাব্য – কে শুধু যক্ষের ব্যক্তিগত বিরহের প্রকাশরূপে না দেখে বিশ্বের সকল প্রেমিক হৃদয়ের বিরহ-বেদনার শাশ্বত প্রকাশ বলে উপলব্ধি করেছেন। মানসী কাব্যের ‘মেঘদূত’ কবিতায় কবি বলেছেন-
“ মেঘদূত কাব্য যেখানে আমাদের সবচেয়ে নিরাশ করে, সেটি তার বিরহ প্রসঙ্গ-‘মেঘদূত’ কাব্যে কোনো ব্যর্থতাবোধ নেই যক্ষের অবস্থায় তা থাকতেও পারে নাÑ সেই জন্য তার বিরহ বেদনা এত দুর্বল।”
বুদ্ধদেবের যুক্তি এই যে-
“উত্তরমেঘের শেষাংশে (১০২-১১৫ শ্লোক) যক্ষ যে কথাগুলি বলেছে, তার মধ্য দিয়ে তাকে একটি ভোগবঞ্চিত বিলাসী নাগর রূপে দেখতে পাই, পুরো উক্তিটি একটি সযতœলালিত ও সুগন্ধী প্রেমপত্রের মতো দেখায়।”
কিন্তু বুদ্ধদেবের এই অভিমত এবং অভিমতের সপক্ষে যে যুক্তি তা আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা যক্ষকে একজন বিলাসী নাগররূপে নয়, সত্যিকারের বিরহীরূপেই কবি রূপায়িত করেছেন।
যক্ষ চারমাস পরে নিশ্চিত মিলন হবে জেনেও যক্ষের উচ্ছ্বাসকে যারা অবাস্তব মনে করেন, তাদের কথা গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা বিচ্ছেদ ক্ষণকালীন হলেও বেদনা নিছক উচ্ছ্বাসে পর্যবসিত হয় না। এ প্রসঙ্গে ইংরেজ কবি ডাইড্রেনের একটি উক্তি উল্লেখ্যÑ ঊাবৎু ষরঃঃষব ধনংবহংব রং ধহ ধমব.Ñ “বিরহের প্রতিটি মুহূর্তই অনন্ত বলে প্রতিভাত হওয়াই স্বাভাবিক।
যক্ষের বিরহ যথার্থ ও আন্তরিক বলেই শাশ্বত মর্যাদা লাভ করেছে। যথার্থ ও আন্তরিক বলেই তা বহুকাল ধরে পাঠকের মনকে রাঙিয়ে তুলতে পেরেছে। পার্বতীচরণ ভট্টাচার্য ‘মেঘদূত পরিচয়’ গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে বলেছেনÑ
যথার্থ ও শাশ্বত না হলেÑএতদিনে মেঘদূতের ভাববস্তু ‘অন্তুংগমিতমহিমা’ হত। পক্কবিম্বাধরোষ্ঠীর রক্তিম আভা ফিকে হয়ে আসত, যক্ষপতœীর চিকুরের ছায়াখানি বর্তমানের খরতাপে ম্লানচ্ছবি হয়ে যেত।
যক্ষের বিরহ-বেদনা সত্যি বলেই কবি কালিদাস যক্ষের বেদনার মাধ্যমে বিশ্বের সকল বিরহীর বেদনাকে রূপদান করতে সমর্থ হয়েছেন। তাই মেঘদূত যুগ যুগ ধরে বিশ্বের সকল বিরহীর চিত্তে আবেদন জানায়। মেঘদূত কাব্য যে বিচ্ছেদ বেদনার কাব্য এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বাংলা বিভাগ,
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর