বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রাধা চরিত্রের ক্রমবিকাশ আলোচনা।


: বড়ুচণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মধ্যযুগের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যিক নিদর্শন। বাস্তব সমাজচিত্র অংকন, ভাষা ব্যবহার, নাটকীয় গুণের সমাবেশ, জীবন্ত চরিত্র সৃষ্ট, উপমা অলংকারের ব্যবহার ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যের গুণে কাব্যটি অনন্য। এ কাব্যের সবচেয়ে বড় গুণ রাধা চরিত্রের ক্রমবিকাশ। কবি অপূর্ব কৌশলে এগার বছরের সংসার অনভিজ্ঞ অশিক্ষিত গোপ বালিকার মনে কাম ও প্রেমের জন্মা দিয়ে শাশ্বত চিররসিক শ্রীরাধায় রূপান্তরিত করেছেন। মধ্যযুগের দেবনির্ভর সাহিত্যের আঙিনায় মানুষের দেহ-মনের কামনা-বাসনার প্রতিফলন দেখা যায় না। সে ক্ষেত্রে জীবন্ত রাধা-চরিত্র-সর্বস্ব শ্রীকৃষ্ণকীর্তন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে রাধার এগার বছর থেকে তের বছর পর্যন্ত দেহ ও মনে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। বিষয় পৌরাণিক হলেও রাধা এখানে মানবী। রাধা যে লক্ষ্মী, এ কাব্যে রাধা তা ভুলে গেছে। এ কাব্যে রাধা সাগর গোয়ালার কন্যা। আইহনের স্ত্রী এবং সর্বকুলাচারে বন্দিনী। সে সাধারণ গ্রাম্য বালিকা বধূ। সতী ধর্মই তার কাছে বড়। স্বামীই তার গতি। তাই, স্বামী আইহন তার কাছে বীর পুরুষ।
রাধা নিজেও অপূর্ব লাবণ্যময়ী, কোমল ও একান্ত অনুভূতিপ্রবণ। তবে, দেহ মিলনের সাথে তার পরিচয় নেই। যৌবন দেহে আসলেও মনে আসে নি। তাই, কৃষ্ণের তাম্বুল ফিরিয়ে দিয়েছে। দানখণ্ডে কৃষ্ণ জোর করে রাধার দেহ সম্ভোগ করলে রাধার মনে ঘৃণার ভাব জন্ম নিয়েছে। নৌকা খণ্ডেও একই অবস্থা। তবে, দেহমিলন সম্পর্কে ভয় কিছুটা দূর হয়েছে। ভারখণ্ডে এসে রাধার বিবর্তন চোখে পড়ে। এখানে রাধা কিছুটা সক্রিয়।
ভারখণ্ডে রাধা চরিত্র:
ভারখণ্ডে রাধা দেহমিলনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৃষ্ণের দ্বারা ভার বহন করিয়েছে, ছত্রখণ্ডে ছত্র ধারণ করিয়েছে, কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে নি। একটা কৌতুক মিশ্রিত কপটতা রাধার মধ্যে দেখা যায়। বৃন্দাবন খণ্ডে এসে কৃষ্ণের প্রতি রাধার অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায়। রাধা কৃষ্ণের ডাকে পুষ্পবনে গেছে, সক্রিয়ভাবে দেহমিলনে অংশ গ্রহণ করেছে। ধীরে ধীরে রাধার মনে প্রেমের কলি ফুটেছে। মনের দিক থেকে সব বাধা দূর হয়ে গেছে। বাইরের ঘটনাবলিই এখন বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
যত দেখ মোর সখি গণে
কাহারে ভাল নহে মনে। ল কাহ্নাঞি॥
বাইরের বাধা দূর করার জন্য রাধা নানা কৌশল অবলম্বন করে। কৃষ্ণকে খ্যাপানোর জন্য রাধা যশোদার কাছে কৃষ্ণের বিরুদ্ধে হার চুরির অভিযোগ আনে। কৃষ্ণ রেগে গিয়ে সম্মোহনী বাণ মেরে রাধাকে অজ্ঞান করে দেয়। রাধা পুরোপুরি কৃষ্ণপ্রেমে ডুবে যায়। রাধা বড়ায়িকে কৃষ্ণকে এনে দিতে বলে-
এথাঞি তা লয়ি মৌ করিবো শৃঙ্গার
সফল করিবো নব যৌবন ভার
কত সহিবো এ বড়ায়ি ল।
কুসুম শরবাণ কত সহিব ॥
বংশী ও বিরহখণ্ডে রাধা কৃষ্ণ কৃষ্ণ করে পাগল হয়েছে। রূপ যৌবন পতি পরিজন লাজ লজ্জা কুল গোকুল সব ভাসিয়ে অন্ধ আবেগে কৃষ্ণের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছে। এখানে এসে বিরহী হৃদয়ের ভাবোচ্ছ্বাস রাধার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়।
কেনা বাঁশী বাএ বড়ায়ি কালিনী নই কূলে।
কেনা বাঁশী বাএ বড়ায়ি এ গোঠ গোকুলে।
আকুল শরীর মোর বেআকুল মন।
বাঁশীর শবদে মো আউলাইলোঁ রান্ধন।
রাধার দুচোখে জল, বাঁশির মালিকের কাছে দাসী হয়ে পায়ে না পড়লে আর সুখ নেই।
বংশী ও বিরহখণ্ডে এসে রাধা দেহ ও মনে সম্পূর্ণ মানবীরূপে দেখা দিয়েছে। রাধার মনে অভিমান আকারে পূর্বরাগের খবর আগে থেকেই পাওয়া যায়। কালীয়দমন খণ্ডে প্রকাশ্যে রাধার পূর্বরাগের ঘোষণা পাওয়া যায়। কালীয় দমন করতে গিয়ে কৃষষ্ণ বিষে জর্জরিত হলে রাধা বিলাপ করেছে, কৃষ্ণকে পরান পতী বলে উল্লেখ করেছে। বলেছে-
কি করিব ধনজন জীবন ধরে
কাহ্ন তোহ্মা বিনি সব নিষ্ফল মোরে।
রাধা মানবী বহুযুগের সংস্কার ও নিষ্ঠাবোধ তার মধ্যে জাগ্রত, তাই অবৈধ প্রেমের প্রতি প্রথমে সাড়া দেয় নি। কিন্তু আসক্তির পরিচয় দিয়ে ধীরে ধীরে কৃষ্ণের দিকে ফিরে না এসে পারে নি। আর ফিরে আসাটাই স্বাভাবিক। প্রথম থেকে কামনা জাগ্রত করা ও কামনা নিগ্রহের মধ্যে দিয়ে রাধার হৃদয়ের আবেগ বংশী ও বিরহেখণ্ডে চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। রাধা বাঁশির শব্দে উন্মত্ত হয়েছে। তার মর্মভেদী বেদনাবোধ কবির প্রতিভার স্পর্শে এমন অপূর্ব হয়েছে যে সমগ্র বাংলা সাহিত্যে উজ্জ্বল চরিত্র হিসেবে রাধা চরিত্রকে প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাধা প্রেমের জোয়ারে ভেসে গেছে। প্রেমের ডাকে সাড়া দিয়ে বলেছে-
বড়ার বৌহারী আক্ষে বড়ার কী।
কাহ্ন বিনি মোর রূপ যৌবনে কী।
রাধার এ ব্যাকুলতা আর থামে নি এবং বলেছে-
আজি হতে চন্দ্রাবলী হৈল তোর দাসী।
রাধা যন্ত্রণা সহ্য করেছে। কৃষ্ণের জন্য সব ত্যাগ করেছে। তবু কৃষ্ণ ধরা দেয় নি। কৃষ্ণকে না পেয়ে রাধার চঞ্চলতা দূর হয়ে গেছে, হাসি নেই, রাধা স্বপ্নে ও জেগে শুধু কৃষ্ণের ছবি দেখে। এ প্রসঙ্গে অমৃত সূদন ভট্টাচার্য বলেছেন-
রাধা বিরহ অংশে রাধার বিরহ ব্যাকুলতা পদাবলীর বিরহিনী রাধিকাকে স্মরণ করাইয়া দেয়। এই পর্যায়ে রাধার বিলাপ বেদনা অনেকাংশে বৈষ্ণব পদাবলীর মাথুর বা ভাব সম্মেলনের সমগোত্রীয়।
কৃষ্ণকে না পেয়ে রাধার জীবন অসার, যৌবন জঞ্জাল। কুম্ভারের পণী’র মত মন পোড়ে, যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে বলে-
মেদিনী বিদার দেউ পসি লুকাও।
বংশী ও বিরহখণ্ডের রাধার স্বরূপ দেখে অনেকে বলেছেন যে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের শেষ, আর পদাবলির শুরু। রাধা বিরহ অংশে রাধার বিরহ অনেক স্থানে ব্যক্তিকে ছেড়ে সর্বকালের সর্বদেশের বিরহবেদনার সুরের সাথে মিলিত হয়েছে। এ কথা ঠিক তবে পদাবলির রাধা কেবল ভক্তিরসটুকু জাগিয়ে দেয়, আর এ কাব্যের রাধা আমাদের মনে সমগ্র মানবরসের সঞ্চার করে। মধ্যযুগের কবি ও কাব্য গ্রন্থে শ্রী শঙ্করী প্রসাদ বসু এ কাব্যের মানবতা ও বাস্তবতা খুঁজতে গিয়ে রাধা চরিত্রের মধ্যেই দৃষ্টি দিয়েছেন।
রাধা চরিত্রের বিশেষত্ব এই যে, প্রথম দিকে রাধা দেহভোগে বিমুখ ছিল, বংশী ও বিরহখণ্ডে সেই রাধা কৃষ্ণের সাথে দেহভোগ কামনায় পাগল হয়েছে। কৃষ্ণ নানা কারণে রাধার প্রতি বিরক্ত, তাই কৃষ্ণ রাধাকে ত্যাগ করেছে। রাধার অনুরোধে বড়ায়ি কৃষ্ণকে বুঝিয়ে ডেকে এনে রাধার সাথে মিলনের ব্যবস্থা করে। দেহমিলন শেষে ক্লান্ত রাধা ঘুমিয়ে পড়লে কৃষ্ণ সেই ফাঁকে মথুরায় পালিয়ে যায়। শুরু হয় রাধার বিলাপ। এখানে-
নবযৌবনের চেতনায় দেহ ভোগাকাঙ্ক্ষী স্থলরুচিসম্পন্না এক রমণীর আর্তনাদ শোনা যায়। পাওয়া যায় এক অশিক্ষিত গ্রাম্য বালিকার আত্মসমর্পিতা রূপ।
গোপাল হালদার এ কাব্যের লৌকিকতা বিচার করতে গিয়ে বলেছেন যে, দেহসম্ভোগ প্রেম ছেড়ে বিরহ অংশে বিরহ ব্যাকুলা নারীরই বুকফাটা ক্রন্দন সেখানে ধ্বনিত হয়েছে। এখানে রাধা দেবী নয়, রক্ত-মাংসে গড়া মানবীর প্রতিনিধি। আরা রাধা এখানে ধীরে ধীরে বিকশিত। তিনি রাধা চরিত্রের আড়ালে প্রাকৃত জীবনের শত শত গ্রাম্য বধূর প্রণয় বঞ্চিত জীবনের দুর্দশা ও বেদনার ছবি দেখেছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, রাধা পুরাতন বাংলা কাব্য সাহিত্যের নিখুঁতভাবে চিত্রিত পরিপূর্ণ চরিত্র। সে যুগে এর দ্বিতীয় নেই। রক্ত-মাংসে গড়া জীবন্ত মানবী। এ কাব্যের অন্যান্য চরিত্রগুলোও রাধা চরিত্রকে পরিপূর্ণতা দানের জন্য চিত্রিত হয়েছে। রাধা একেবারেই লৌকিক। সে রোমান্টিক নয়, সে বাস্তবিক। তার মুখের ভাষাটুকু পর্যন্ত তার নিজের। সে এক দুঃখী ব্যর্থ প্রেমিকা। রাধা চরিত্রকে ঘিরেই কবির দক্ষতা ও চাতুর্যের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। বৈষ্ণব-ধর্ম-দর্শন ভিত্তিক এ কাব্যের মধ্যে যে বাস্তব নর-নারীর আশা-আকাঙ্ক্ষা, দৈহিক কামনা-বাসনাই প্রধান হয়ে উঠেছে, তা রাধা চরিত্রের নির্মাণ কৌশলের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।