প্রশ্নঃ কাজী আবদুল ওদুদের বাংলার জাগরণ প্রবন্ধ অবলম্বনে রাজা রামমোহন রায় ও ডিরোজিও এর ভাব-আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা কর।

রামমোহন ও ডিরোজিও এর ভাব-আন্দোলন
মননশীল ভাবনায় সমর্পিত এক উজ্জ্বল নক্ষত্ররূপে বাংলা সাহিত্যে আবির্ভূত হন কাজী আবদুল ওদুদ। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করেছেন। মুসলিম সমাজে নবজাগরণ এনে তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়। চিন্তা-চেতনায় তিনি একজন প্রতিভাবান লেখক। প্রতিভার আলোয় তিনি বাঙ্গালী জাতির মুক্তির পথ খুঁজেছেন। এরই প্রয়োজনে অনিবার্যভাবে এসেছে রাজা রামমোহন রায় এবং এক ইউরোপীয় স্বতন্ত্র ভাবধারার প্রতীক ডিরোজিও।

রাজা রামমোহন রায়ের ভাব-আন্দোলন ঃ (১৭৭৪-১৮৩৩)
রাজা রামমোহন রায়ের মধ্যদিয়েই আমাদের নবচিন্তা ও ভাবধারার সূচনা হয়েছে। তাই তাঁর সমাজ সংস্কার, জ্ঞান সাধনা মুক্তি তপস্যা, জীবনচর্যা ইত্যাদি বিষয় ‘বাংলার জাগরণ’ প্রবন্ধে লেখক আলোচনা করেছেন।
রাজা রামমোহন রায় বাঙ্গালির জীবন সংস্কারের জন্য নানাবিধ অবদান রেখেছেন। পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনে রামমোহন রায়ের অবদান চিরস্মরণীয়। ইংরেজরা তাদের ঔপনিবেশিক শাসন বজায় রাখার জন্য ভারতবর্ষে কিছু ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শাস্ত্রীয় শিক্ষাদান কেন্দ্র ছাড়া আর কোনো উচ্চশিক্ষার সুযোগ দিচ্ছিল না। রামমোহন রায় উপলব্ধি করেছিলেন ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ব্যতীত জাতির উন্নতি সম্ভব নয়। রামমোহন রায় শাসকদের এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং এর গুরুত্ব বোঝান।
রামমোহন ভারতবর্ষে আধুনিকতারও পথিকৃৎ। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-
“যে দিন রামমোহন রায় কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন, সেদিন থেকে ভারতবর্ষে ‘আধুনিকতার শুরু।”
প্রাবন্ধিক রামমোহন রায়কে বাংলার নবজাগরণের প্রভাত নক্ষত্রই বলে ক্ষান্ত হন নি। নক্ষত্রের চেয়েও বড় সূর্য বলেছেন। সেসময়ে তিনি জাতীয় জীবনে এমন আদর্শ রেখে গেছেন যে, শত বছরেও এদেশে এমন ব্যক্তিত্ব দ্বিতীয়টি জন্ম গ্রহণ করে নি, যার সাথে তার তুলনা করা যায়।
রামমোহন রায় পাশ্চাত্য জীবনাদর্শে আসেন পূর্ণ যৌবনে। তার আগেই তিনি পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে বাদানুবাদ শুরু করেন। হিন্দু চিন্তার উত্তরাধিকার হয়েও যারা পৌত্তলিকতা অবতারবাদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সে দলের নানক, কবীর প্রভৃতি ভক্তদের ভাবধারার সাথে পরিচিতি লাভ করেন। মোতাজেনা, সুফী প্রভৃতির প্রভাব তার চিত্তের উপর পড়ে।
মধ্য যুগে জন্ম নেওয়া নানক, কবীর, দাদু, আকবর, আবুল ফজল, দারাশেকো প্রভৃতি ভক্ত, ভাবুক ও কর্মীর দলের অন্যতম উত্তরসুরী হলেন রামমোহন। রামমোহন ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাবেই শুধু আধুনিক হয়ে ওঠেন নি। তিনি এ দেশীয় সংস্কার ও ঐতিহ্যের মধ্যদিয়েই আধুনিকতায় এসে পৌঁছেছেন। তিনি বুঝেছিলেন ভারতবর্ষের শাস্ত্রশাসিত জীবনের সংস্কার ছাড়া এ অঞ্চলের উন্নতির সম্ভাবনা নেই।
তিনি সকল স¤প্রদায়ের উন্নয়ন কামনা করেছেন। হিন্দুর সাথে বেদ-ওপনিষদ-রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ-তন্ত্র সংহিতা নিয়ে যৌক্তিক তর্ক করেছেন। মুসলমানদের সাথেও কোরআন, হাদীস, ফিকাহ প্রভৃতি বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করেছেন। তাঁর প্রভাবেই অভিজাত মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে। সকল ধর্মের সার নিয়ে দ্বৈতবাদের উপর ভিত্তি করে তিনি ব্রহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজা রামমোহন রায় সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে অনন্য আইকন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। অমানবিক নিষ্ঠুর সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সংগ্রামে অবতীর্ণ হন এবং সতীদাহ প্রথা বন্ধ করতে সক্ষম হন।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় রাজা রামমোহন রায় ছিলেন চির ঘনিষ্ঠ। আধুনিক জ্ঞান চর্চার অন্যতম মাধ্যম হল মুদ্রণ শিল্প। অথচ ইংরেজরা এ ব্যাপারে ছিল নীরব। রামমোহন মুদ্রাযন্ত্রের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেন। সংবাদপত্র প্রকাশের ব্যবস্থা করে জনগনকে সচেতন করে স্বাধীনতা আন্দোলনকে বেগবান করেন। জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে তিনি মাতৃভাষাকে প্রধান্য দেন।
ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার নানা বিরূপতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেছেন। প্রয়োজনে তিনি সবকারকে দিক নির্দেশনাও দিয়েছেন। চীনের সাথে বাণিজ্য স¤প্রসারণের আন্দোলনও করেছেন।
রামমোহন আলোর দিশারী। নব নব সম্ভাবনার অগ্র পথিক। তাঁর ভাবধারার আলোয় জাতি আলোকিত হয়েছে। ধর্মের ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেনÑ এক নিরাকার পরম ব্রহ্মের উপাসনা আর লোকশ্রেয়ঃ ও চিচার বৃদ্ধির দ্বারা পরিশোধিত শাস্ত্র। নানা উপশাস্ত্রসমূহ প্রত্যাখ্যান করে মূল শাস্ত্রসমূহে প্রত্যাবর্তন করেছেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে রেখেছেনÑ ইউরোপীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিশেষ অনুশীলন। সমাজের ক্ষেত্রে রেখে গেছেন- লোকহিতকর আচার-অনুষ্ঠানের প্রবর্তন এবং যা অকল্যাণকর তার প্রাচীন হলেও বর্জনীয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি উড়সরহরড়হ ঝঃধঃঁং- এর মত একটা কিছুর স্বপ্ন তিনি দেখতেন। এমনিভাবে নানা ভাব-আন্দোলনে আলোড়নে সারা দেশকে আন্দোলিত করে নবচেতনায় উদ্ভাসিত করেছেন।
ডিরোজিওর ভাব-আন্দোলন
ডিরোজিও একটি প্রতিষ্ঠান, স্বতন্ত্র ভাবধারায় চিহ্নিত। বলা যায় একটা বিস্ফোরণ। ডিরোজিওর প্রভাবে ভারতবর্ষে নতুন এক সভ্যতার শুরু হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের আকর এ ক্ষণজন্মা পুরুষ মাত্র বিশ বছর বয়সে হিন্দু কলেজের চতুর্থ শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। অল্প বয়সেই তিনি কবি ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরূপে যে খ্যাতি অর্জন করেন, তা সত্যিই বিরল। নিজস্ব চিন্তাধারাকে তিনি তাঁর ছাত্রদের দ্বারা বাস্তবে রূপ দেবার চেষ্টা করেন। ফলে তিন বছরের মধ্যেই কলেজ থেকে তিনি বিতাড়িত হন।
ডিরোজিও কলেজ থেকে বিতাড়িত হলেও কলেজের সাথে তাঁর যে নিবিড় বন্ধন তৈরি হয়েছিল তা ছিন্ন হয় নি। তাঁর সর্বগ্রাসী প্রভাবে সারা ভারতবর্ষ বিশেষ করে বাংলা আলোড়িত হয়।
ডিরোজিও ইউরোপীয় বিপ্লবজাত ভাবধারায় স্নাত। বলা চলে তিনি ফরাসি বিল্পবের ভাব সন্তান। ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল চিন্তার স্বাধীনতা। সে ভাবধারার আলোয় ডিরোজিও আলোকিত ছিলেন। ইউরোপের শিল্প বিল্পবের ফলে উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থার সমাজ কাঠামো সম্পর্কে তাঁর ধারণা ছিল। সমাজের মানুষের চিন্তাধারার উন্নতি ঘটাতে যে রেনেসাঁসের প্রভাব প্রতিফলিত করা দরকার তা তিনি অনুভব করেছিলেন। ডিরোজিও ছিলেন ইউরোপীয় রিফর্মেশন আন্দোলনের মূলসূত্রের ধারক। সব মিলিয়ে ডিরোজিও হয়ে ওঠেন একটা স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। ডিরোজিও নতুন ভাবধারার পথিক হলেও তাঁর যে ভাব-ধারা গ্রহণ করার মতো উপযুক্ত সমাজ বা রাষ্ট্র তখন গড়ে ওঠে নি। ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে তাঁর ও তাঁর ভাব-ধারায় পুষ্ঠ শিষ্যদের মধ্যে দ্ব›দ্ব দেখা দেয়।
রাজা রামমোহন রায় তার নব-ধারার দ্বারা সমাজে যে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলেন ; ডিরোজিও তাতে নতুন পুষ্টি দান করেন। ডিরোজিওর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে ছাত্রদের উপর। ক্লাশের বাইরে তিনি ছাত্রদের কাছে ছিলেন একাধারে বন্ধু ও আধ্যাত্মিক নেতা। ছাত্ররা বুঝতে পেরেছিল যে নব জাগ্রত জ্ঞান পিপাসা মেটাতে হলে মুক্তপ্রাণ ডিরোজিওর ভাবধারার সংস্পর্শ বড় প্রয়োজন। ছাত্রদের উপর ডিরোজিওর প্রভাব হিন্দু কলেজের দুর্বল কর্তৃপক্ষ ভালোভাবে নিতে পারে না। ফলে তিনি কলেজ থেকে বিতাড়িত হন।
প্রকৃত জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চা শুধু প্রতিষ্ঠানে নয়, বাইরেও চলে। তাই ডিরোজিও কলেজ থেকে বিতাড়িত হলেও ডিরোজিওর জ্বালানো মশাল বহুদিন ধরে তাঁর ভক্তদেরকে প্রজ্জ্বলিত করে রাখে।
ডিরোজিওর শিষ্যরা অনেকেই চরিত্র, বিদ্যা, বিদ্রোহ ইত্যাদির জন্য জাতীয় জীবনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। সেই সাথে হিন্দু সমাজের আুচার-প্রথা লঙ্ঘন করে সুনাম বা দুর্ণাম অর্জন করে। মোটকথা তারা সমগ্র সমাজ জীবনে একটা নব ভাবধারার সৃষ্টি করে। যার ফলে ভারতীয় সমাজ মধ্যযুগীয় বৈশিষ্ট্য ত্যাগ করে আধুনিক হয়ে ওঠে।
রামমোহন ইউরোপীয় জ্ঞানের আভাস দিয়েছিলেন মাত্র, আর ডিরোজিওর হাত ধরেই প্রকৃত ইউরোপীয় জ্ঞানের স্বাদ পায়। মাইকেল মধুসূদন ডিরোজিওর ভাবশিষ্য ছিলেন। মধুসূদনের মাইকেল নাম গ্রহণ তাও ডিরোজিওর পরোক্ষ প্রভাব। ডিরোজিও ইউরোপীয় হয়েও বাংলার কল্যাণে কাজ করেছেন। ডিরোজিওর এই বৈশ্বিকবোধ মধুসূদনের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। মধুসূদন উদাত্তচিত্তে সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে ইউরোপ ও ভারতে প্রাচীন কাব্যকলার শ্রেষ্ঠ সম্পদসমূহ অবলীলায় গ্রহণ করে দেশবাসীদের উপহার দিয়েছেন। এসব ডিরোজিওর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাবেই ঘটেছে।
রামমোহন সমাজে আধুনিকতার বীজ বপন করলেও ধর্মকে কখনো বিচ্ছিন্ন করেন নি, অন্যদিকে ডিরোজও ও তাঁর দল ধর্মকে বাদ দিয়েছিলেন। তাই অনেকে ডিরোজিও ও তাঁর দলকে রামমোহনের বিরুদ্ধ দল বলে মনে করেন। তবে প্রকৃত প্রস্তাবে তার মেনে নেওয়া যায় না। কেননা ডিরোজিও দলের অনেকেই পরবর্তীকালে ব্রাহ্ম সমাজের নেতা ও কর্মী হয়েছিলেন।
ডিরোজিওর প্রভাব সর্বগ্রাসী হলেও বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। এক পুরুষের পরেই তারা নির্মুল হয়ে যায়। আসলে পরিবর্তন কোনো আকস্মিক বিষয় নয়, বরং দেশীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভিত্তিক দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও সুষ্ঠু পরিকল্পনার বিষয়। ডিরোজিও এ বিষয়টি বিস্মৃত হয়েছিলেন। তাঁরা দেশের ইতিহাসকে ভিত্তি ভূমিকারূপে মূল্যায়ন করতে চান নি। তাছাড়া উন্নত সমাজ থেকে আগত ডিরোজিওর পক্ষে ভারতবর্ষের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা গ্রহণ দুরূহ কাজ ছিল।
পরিশেষে একথা স্বীকার্য যে, ডিরোজিওর সংগ্রামী জীবনের প্রভাবে প্রভাবিত অনেক উন্নত শিষ্যই নব নব ভাবধারায় উজ্জীবিত হন। তারা সবাই উন্নত চিত্তের অধিকারী ছিলেন। তাদের প্রভাবে আধুনিক হিন্দু সমাজ উন্নত মানব হয়েছে। তবুও ডিরোজিও ও তার দল এদেশ থেকে চিরবিদায় নিয়েছে। তাবে প্রাবন্ধিক প্রত্যাশা করেছেন যে, হয়ত কোন একদিন, এত জাতি-স¤প্রদায়-বিখন্ডিত, এত শাস্ত্র-উপশাস্ত্র ভাবক্লিষ্ট, এত পূর্ণাবতার-খন্ডবতার নিপীড়িত বাঙালি জাতি আবারো কোনো দিন বলে উঠবেÑ উবৎুরড় ইবহমধষ যধঃয ড়ভ ঃযবব.
