রুদ্রমঙ্গল প্রবন্ধ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধের আলোকে প্রাবন্ধিক নজরুলের বিষয়ভাবনা ও রচনা শৈলীর পরিচয় দাও।

রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থের বিষয়ভাবনা
কবি হিসেবে যুগস্রষ্টা হলেও প্রাবন্ধিক হিসেবেও নজরুলের একটা গভীর পরিচয় রয়েছে। কাব্যে কবিতায় নজরুল যেমন নবজাগরণের ধারক-বাহক তেমনি প্রবন্ধের ক্ষেত্রেও নজরুল নবজাগরণের চেতনায় ভাস্বর। কবি নজরুল যুগযন্ত্রণায় রুষ্ট, দগ্ধ হয়ে বিদ্রোহী হয়েছেন এবং সমস্ত অন্যায়, শোষণ ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তিনি চেয়েছেন দেশমাতার মুক্তি। তাই হিন্দু মুসলমান তথা দেশবাসীকে জাগাতে ও ঐক্যবদ্ধ করতে জাগরণী গান গেয়েছেন। রুদ্রমঙ্গল প্রবন্ধ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধ তাই দেশকালের নানান সমস্যা-আন্দোলনের ভাষ্যরূপ।
‘রুদ্রমঙ্গল’ নজরুলের তৃতীয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। ‘ধূমকেতু’র কয়েকটি সম্পদকীয় প্রবন্ধ আর গণবাণী’র ‘মন্দির ও মসজিদ’ প্রবন্ধসহ মোট আটটি প্রবন্ধ এতে সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রকাশকাল উল্লেখ না থাকলেও প্রবন্ধগুলোর রচনাকাল জানা যায়। তাতে দেখা যায়-১৩২৯ বঙ্গব্দের ১ ভাদ্র থেকে ১৩৩০ বঙ্গব্দের ১৬ ভাদ্র পর্যন্ত নজরুলের লেখা সম্পাদকীয়গুলোই এখানে স্থান পেয়েছে।

সাংবাদিক পেশা গ্রহণের ফলে প্রাবন্ধিক নজরুলকে পাওয়া যায়। সম্পাদক হিসেবে লেখা নজরুলের সম্পাদকীয়গুলো অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। কেননা, তিনি সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লিখতেন এবং ভাষা ছিলো জোরালো ও একই সঙ্গে উচ্ছ্বাসপূর্ণ।
রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থে তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থার পর্যালোচনা, পরাধীনতা থেকে ভারতবর্ষের মুক্তি কামনা ও এ জাতীয় সাময়িক ঘটনা, হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা, তাদের পারস্পারিক সম্পর্ক, হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে পুনর্জাগরণের ভাবের সঞ্চার ইত্যাদি বিষয় এ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।

সমকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অস্থিরতা, মুক্তির সংগ্রাম, প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর বৃটিশ সরকারের বিশ্বাসভঙ্গতা, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদীদের হিংসাত্মক কার্য, অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ইত্যাদি নিয়ে একটা অস্থিরতার যুগে নজরুলের আবির্ভাব। যুগোপযোগী কবিতা রচনার মতো সাংবাদিক হিসেবে সম্পদকীয় লিখেও জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং প্রবন্ধগুলোতে স্বাধীনতার বাণী উচ্চারণ করেছেন বজ্রকন্ঠে।
‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ গ্রন্থে প্রবন্ধের সংখ্যা আটটি। প্রবন্ধগুলো হলো- ‘ রুদ্রমঙ্গল ’, আমার পথ, মোহররম বিষবাণী, ক্ষুদিরামের মা, ধূমকেতুর পথ, মন্দির ও মসজিদ এবং হিন্দু-মুসলমান। প্রতিটি প্রবন্ধের মধ্যেই সমকালীন ঘটনার প্রেক্ষিতে কবি নজরুলের বলিষ্ট বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে।
রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থে প্রাবন্ধিক নজরুলের বক্তব্য ছিল স্বরাজ নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীনে থাকবে না। পূর্ণ স্বাধীনতার জন্যই জন্যই দরকার বিদ্রোহ। ‘বিষবাণী’ প্রবন্ধের মধ্যে কাব্যিক ভাষায় বিদ্রোহের বাণী উচ্চারণ করেছেনÑ
ওগো আমার বিমুখ অগ্নি নাগ-নাগিনীপুঞ্জ। দোলা দাও, দোলা দাও তোমাদের কুটিল ফণায় ফণায়। তোমাদের যুগযুন সঞ্চিত কাল-বিষ আপন আপন সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে ফেল। তোমাদের বিভূতিবরণ অঙ্গ কাঁচা বিষের গাঢ় সবুজ রঙে রেঙে উঠুক। বিষ সঞ্চয় কর; বিষ সঞ্চয় করÑ হে আমার তিক্ত-চিত ভূজগ তরুণ দল। (বিষবাণী)
অসহযোগ আন্দোলন ও তার ব্যর্থতা, দেশের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পরিবেশ, অসাম্য ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো, দেশের যুবশক্তিকে জাগ্রত করা ও সংগ্রামে শরীক হতে আহবান, দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারে সংগ্রামী হতে, হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রবন্ধের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
প্রাবন্ধিক নজরুল হিন্দু-মুসলমানকে সমান দৃষ্টিতে দেখেছেন। তাই হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের দোষ-ত্র“টি চোখে আঙুল দিয়ে বারবার দেখিয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বারংবার পশ্চাদমুখী হয়েছে হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ। হিন্দু-মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক বহু তিক্ততার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। মন্দির ও মসজিদ প্রবন্ধে নজরুল ওজস্বী ভাষায় এই বিরোধকে সমালোচনা করেছেন।
“দেখিলাম আল্লার মসজিদ আল্লা রক্ষা করিলে না, মা কালীর মন্দির কালী আসিয়া আগলাইলেন না। মন্দিরের চূড়া ভাঙ্গিল, মসজিদের গুম্বজ টুটিল।” (মসজিদ ও মন্দির — )
হিন্দু ও মুসলমান প্রবন্ধেও ঐ একই বক্তব্য। পৃথিবীর কোনো দেশেই মনুষ্যত্বের এমন অবমানানা কখনো হয় নি। কিন্তু যে যথার্থ মানুষ তার কাছে কে হিন্দু, কে মুসলমান এটি আদৌ কোনো প্রশ্ন নয়। ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায়ও নজরুল এমন কথা বলেছেন। প্রবন্ধে নজরুল লিখেছেন-
“যখন দেখি একটা লোক ডুবে মরছে, মনের চিরন্তন মানুষটি তখন এ প্রশ্ন করার অবসর দেয় না যে, লোকটা হিন্দু না মুসলমান, একজন মানুষ ডুবছে, এইটেই হয়ে ওঠে তার কাছে সবচেয়ে বড়; সে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীতে। হিন্দু যদি উদ্ধার করে দেখে লোকটা মুসলমান বা মুসলমান যদি দেখে লোকটা হিন্দু তার জন্য তো আর আত্মপ্রসাদ এতটুকু ক্ষুণœ হয় না। তার মন বলেÑ আমি একজন মানুষকে বাঁচিয়েছিÑ আমারই মত একজন মানুষকে।”
মুসলিম জাগরণমূলক কবিতার মতো প্রাবন্ধিক নজরুল কয়েকটি প্রবন্ধেও মুসলমানদের জাগারণের বাণী শুনিয়েছেন। জড়তা থেকে জাগ্রত হতে উদাত্ত কণ্ঠে আহবান জানিয়েছেন। ‘মহররম’ প্রবন্ধটি এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য।
মুসলমানদের গৌরবগাঁথা বিশ্বনন্দিত। মোহররমের মত ত্যাগের দৃষ্টান্ত থাকতেও মুসলমান সমাজ আজ হতদরিদ্র, পদানত ও পরাধীন, অন্যে গোলামী করে। তারা তাদের ঐতিহ্য ভুলে এজিদের মত শাসকের দাসত্ব করে চলেছে। তাই প্রাবন্ধিক বলেছেন যে, মোহররমে মেকি কান্না আর নয়, লোক দেখানো কান্নার অভিনয়ের উৎসব হিসেবে মোহররমকে না দেখে বরং মোহররমের ত্যাগ থেকে শিক্ষা নিয়ে ত্যাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুসলিম জাতিকে শির উঁচু করে দাঁড়ানোর আহবান জানিয়েছেন। ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন নয়, সে আলোকেই বিশ্বের মুসলমান জেগে উঠুক প্রাবন্ধিকের এটাই প্রত্যাশা। (মোহররম)
‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধটির মধ্যে প্রাবন্ধিক বিদ্রোহী হয়েছেন, প্রত্যাশা করেছেন দেশবাসীর ঐক্য, লক্ষ্য ভারতের স্বাধীনতা, তাই ঘুমন্ত ভারতবাসীকে জাগাতে চেয়েছেন। ভারতীয় পুরাণে শিবের আরেক নাম রুদ্র। শিবের এই রূপ সর্বসংহারক ও নবসৃষ্টির প্রতীক। এ শিব ধ্বংস ও প্রলয়ের নেশায় মেতে উঠলেও সে ধ্বংসস্তুপ থেকে নবসৃষ্টির উদ্বোধন ঘটায়।
প্রাবন্ধিক রুদ্রমঙ্গল প্রবন্ধে সেই রুদ্রকে ভারবাসীর বুকে আঘাত করতে বলেছেন। কেননা ভারতবাসী শত লাঞ্ছনা ও ভারতমাতার ধর্ষিত রূপ দেখেও বিদ্রোহে ফেটে পড়ে না, শুধু চোখের জল ফেলে, পড়ে পড়ে মার খায়। ভয়ংকরী শিব যদি তাদের আঘাত করে, তাহলে তারা জেগে উঠবে। ফলে আত্মসম্মান জাগবে, অগ্নিবর্ষী হয়ে উঠবে এবং বিদ্রোহী হয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল ও নির্যাতনের নাগপাশ ছিন্ন করে নিজেকে নিজ দেশকে মুক্ত করবে। প্রাবন্ধিকের ধারণা শিবই পারে অত্যাচারীর অপকর্মকে, অপশক্তিকে ধ্বংস করে সুন্দরকে সৃষ্টি করতে। আর শিবের সংস্পর্শে এসে ঘুমন্ত ভারতবাসীর শিরায় শিরায় প্রতিশোধের আগুন জ্বলে উঠবে।
রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থের ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে ধূমকেতু পত্রিকার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রাবন্ধিক পাঠকের কাছে ব্যক্ত করেছেন। দেশের সার্বিক কল্যাণের এক অতি মহৎ মানবিক উদ্দেশ্য এবং আদর্শে প্রবুদ্ধ যুগচালকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন নজরুল তার ‘আমার পথ’ প্রবন্ধে।
রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থের ‘ক্ষুদিরামের মা’ প্রবন্ধটি দেশপ্রেমোদ্দীপক রচনা। ক্ষুদিরামের অনন্য দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের সূত্র ধরে প্রাবন্ধিক ভারতের যুবস¤প্রদায়কে দেশের জন্য আত্মোৎসর্গী হয়ে পরাধীন ভারতমাতাকে স্বাধীন করার আহবান জানিয়েছেন এ প্রবন্ধে। পরাধীন ভারতমাতা তাদের মুখের দিকে চেয়ে আছে, তাদের আত্মদানই ভারতমাতার মুক্তির একমাত্র উপায়। সুতরাং যুবস¤প্রদায় জীবন বলি দিয়ে দেশকে মুক্ত করুকÑ এটাই প্রাবন্ধিকের প্রত্যাশা।
প্রবন্ধগুলোর বিষয়গত বৈচিত্র্য যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রাবন্ধিকের বিষয়চেতনার গভীরতা। প্রবন্ধগুলোর বক্তব্য, বিষয়, উপস্থাপনভঙ্গী, ভাষা ইত্যাদি থেকে নজরুলের গদ্য রচনারীতি সম্পর্কে বলা যায় যে, কাব্যে যেমন নজরুল উচ্ছ¡াস ও অতিকথনের ভারে জর্জরিতÑ প্রবন্ধগুলো কিন্তু তেমন উচ্ছ¡াসপূর্ণ নয়। তবে উচ্ছ¡াস একেবারে নেই তা নয়। প্রত্যেক লেখকেরই একটা নিজস্ব ঝঃুষব বা ভঙ্গী থাকে, যা দিয়ে তাঁকে চেনা যায়। নজরুলের প্রবন্ধ থেকেও তাঁকে চেনা যায়।
ভাষার কারুকার্য সৃষ্টিতে যথেষ্ট আলংকারিক ভাষা প্রয়োগ করেছেন প্রাবন্ধিক। অনুপ্রাস, উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষার ছড়াছড়ি, রয়ে ব্যঙ্গ, বিদ্রƒপাত্মক ঝধঃরৎব ও ঢ়ধৎধফড়ী এর খোঁচা। সূ² হাস্যরসেরও পরিচয় তাঁর প্রবন্ধে (কুটাভাস) রয়েছে।
উপসংহারে এসে বলা যায় যে, নজরুল ইসলামের প্রবন্ধে সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের পট উন্মোচিত হয়েছে। জীবন্ত হয়ে উঠেছে সেই অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, আর স্বরাজ আন্দোলনের ছোড় বড় নানা ঘটনা তার প্রবন্ধগুলোতে। “জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ড, ক্ষুদিরামের ফাঁসিÑ এ জাতীয় কোনো ঘটনাই বাদ পড়ে নি তাঁর সম্পাদকীয় প্রবন্ধের আলোচনায়। শুধু তৎকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসের কয়েকটি ঘটনামাত্র নয়, তাঁর প্রবন্ধগুলো তাঁর সাহিত্য পাঠে অনেক সহায়তা করে। তাঁর প্রবন্ধগুলো তাঁর সাহিত্য পাঠে অনেক সহায়তা করে। তাঁর কাব্য ও প্রবন্ধ মিলিয়ে পড়লে নজরুলের মন ও মানসের পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায় এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে গদ্যশিল্পী হিসাবে নজরুলের এক নতুন পরিচয় উদ্ভাসিত হয় আমাদের কাছে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর