লালন দর্শনের মূল অভিপ্রায় : মানুষ চেনার সাধনা

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

লালন দর্শন : ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’

বাউল তত্ত্বদর্শন ও সাহিত্যধারার চূড়ান্ত পরিণতি পেয়েছে লালনের গানে। বাউল দর্শন লালন দর্শন মিলেমিশে একাকার। লালনগীতির রসমাধুর্য ও শিল্পময়তা বিশ্বজনীন।  বাউল গান আর লালনগীতি সমার্থক হয়ে গেছে, বাংলার মানুষের কাছে। কেননা, বাউল গানকে লালন শাহের জীবন-দর্শন ও গানের মাধ্যমেই বিশ্বদরবারে পরিচিতি পায়। লালন ফকিরের সকল গানই মানবতার দর্শনকে ধারণ করে আছে।

লালন ফকির
লালন ফরিরের সমাধি

ড. আহমদ শরীফ বলেছেন-

বাউল গুরুরা একাধারে কবি, দার্শনিক, ধর্মবেত্তা ও মরমী। — বাউল গান একাধারে ধর্মশাস্ত্র ও দর্শন, সাধন সঙ্গীত ও ভজন, গান ও গীতিকবিতা। সে গান বাঙালীর প্রাণের কথা, মনীষার ফসল ও সংস্কৃতির স্বাক্ষর।  

বাউল গান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধি –

বাউলের গান শুনেছি, ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলে না, তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব, তেমনি কাব্য রচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে।

প্রসঙ্গত, ড. আহমদ শরীফ ও রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য লালনগীতি সম্পর্কেই।

নশ্বর সংসারের বেড়াজাল থেকে অপার্থিব শান্তির সন্ধানে বাউলেরা মনের মাঝে খুঁজেছেন মনের মানুষ । জীবাত্মা ও পরমাত্মার মাঝে কোনো ভেদাভেদ না রেখে দেহের মাঝেই তারা পরম সুন্দরের অস্তিত্ব সন্ধান করেছেন এবং তার সন্ধান অন্যকেও দিয়েছেন। এ দিক বিচারে বাউলদের মতো লালন ফকিরও কায়াবাদী। মহৎ সাধক লালন শাহ আত্মতত্ত্ব বিষয়ক গানের মাঝে স্রষ্টার মহিমা প্রকাশিত। ‘

বাউল ধর্মমতের বাহন হলো বাউল পদাবলি। তেমনি লালনের গানই লালন ধর্ম-দর্শন ও তত্ত্বের বাহন। মধ্যযুগের শেষ দিকে একদল রহস্যবাদী সাধক সম্প্রদায়, যারা উৎকৃষ্ট অভিনব অধ্যাত্মাসংগীত রচনা করেছিলেন, তারাই বাউল সম্প্রদায় নামে পরিচিত।

মধ্যযুগে বাংলায় বসবাসকারী নাথপন্থী ও সহজিয়ারা ব্রাহ্মণদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ইসলাম ও বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে। আবার অনেকে কোনো ধর্মের দিকে না গিয়ে খোলা আকাশের তলে মুক্তির পথ খুঁজেছিল। আর যারা নবধর্মে দীক্ষা নিয়েছিল তারাও পুরাতন সংস্কৃতি পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারে নি।

ফলে হিন্দু-মুসলমানের সমবায়ে বাউল মতের উদ্ভব ঘটে। অধ্যাপক উপেন্দনাথ ভট্টাচার্যের মতে মুসলমান মাধববিবি ও আউল চাঁদই বাউল মতের প্রবর্তক এবং মাধববিবির শিষ্য নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্রই বাউল মত জনপ্রিয় করে তোলেন। লালন শাহের হাত ধরে বাউল মত বিশ্বজনীন হয়েছে।

বাউল শব্দের উৎপত্তি নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। মধ্যযুগে ঈশ্বরপ্রেমে মাতোয়ারা বা বাহ্যিক ব্যাপারে উদাসীন ব্যক্তিকে বাউল বলা হতো। চৈতন্যদেবও নিজেকে বাউল বলেছেন। অনেকের ধারণা বাতুল বা ব্যাকুল থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন বাউর, থেকেই বাউল শব্দটি এসেছে।

মধ্যযুগে একদল দীন দুঃখী উলুঝুল লোক ছিল, যারা একতারা বাজিয়ে ভিক্ষা করে খেত, তাদের জনসাধারণ বাতুল বলে উপহাস করতো। অনেকের ধারণা এ বাতুল থেকে বাউল এসেছে। এখনও বাউলরা আমাদের সমাজে বাতুল (অপদার্থ) বলে উপহাসের পাত্র। আর বাউলরা সব সময় ব্যাকুল (ভাবোন্মত্ত) থাকে।

বাউলেরা অশিক্ষিত। তাদের কোনো লিখিত শাস্ত্র নেই। তাই, বাউল মতাবাদের কালিক বা দার্শনিক পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে, অনুমান সতের শতকের মাঝামাঝি থেকে বাউল মতবাদের উদ্ভব। এরপর উনিশ শতকে বাউল সম্রাট লালন ফকিরের সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমে এর পরিপূর্ণ তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিকাশ ঘটে।

বাউলেরা তাদের মতবাদ ও সাধনকে গানের মাধ্যমে প্রকাশ করে। তাই, বাউল গান শুধু গান নয়, একাধারে ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, ভজন, সংগীত ও সাহিত্য। তাও লোকসাহিত্য মাত্র নয়, এগুলো এদেশের সাধারণ মানুষের প্রাণের কথা, মনীষার ফসল ও সংস্কৃতির স্বাক্ষর।

আত্মার পরিচয়ে মানুষ : লালন দর্শন – আধ্যাত্মিক মানবতাবাদ

লালন মনে করে পরমাত্মা থেকে জীবাত্মার সৃষ্টি। জীবাত্মার স্থিতি পরমাত্মায়। আত্মার পরিত্রতার মধ্যে দিয়ে খোদাকে পাওয়া যায়। তাই আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির সাধনাই হলো বাউলদের সাধনা। সক্রেটিসের know thyself (নিজেকে জানো), বেদের আত্মানং বিদ্ধি নিজেকে জান। হাদিসের কথায় – যে নিজেকে চিনেছে, সে আল্লাহকে জেনেছে। জীবনের পরম ও চরম সাধনা হচ্ছে খোদাকে চেনা। এ সবের সাথে বাউল সাধনার গভীর মিল রয়েছে।

মানুষ ও দেহতত্ত্ব : লালন দর্শন বিশ্লেষণ

লালনের  গানের মধ্যে মনের মানুষ, অটল মানুষ, অধর মানুষ, মানুষ রতন, মনমনুরা, অচিন পাখি, অলখ সাঁই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো আসলে পরমাত্মার প্রতীক। লালন মনে করে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই অধর চাঁদ আছে, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। দেহের মধ্যে তাকে অনুভব করতে হবে।

তবেই আলেখ মুরের (পরম জ্যোতি) সন্ধান পাওয়া যাবে। তখন বাইরের সীমাবদ্ধ বস্তুজগৎ থেকে মুক্তি নিয়ে দেহ ও মনে ঈশ্বর সত্ত্বা লাভ করা সম্ভব হবে। লালন তাঁর গানের মধ্যে  মনের মানুষের সন্ধান করেছে। বাউল মতের অনুসারী লালন  নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের নিয়ম-কানুনের ধার ধারে নি।

লালন দর্শন – ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে সার্বজনীন মানুষ ভাবনা

পুজো-অর্চনা, রোজা-নামাজ, মন্দির-মসজিদ, কাশী, কাবা এসব সম্পর্কে লালন ফকির উদাসীন। এমন কি হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে যে স্বাভাবিক ধর্মীয় ভেদাভেদ, তাও তারা মানে না। ধর্মভেদ সম্পর্কে লালনের বক্তব্য –

তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে-মসজিদে                                                                                                                       ও তোর ডাক শুনে সাঁই চলতে না পাই                                                                                                                    আমায় রুখে দাঁড়ায় শুরুতে মুর্শীদে।

লালন গানের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সব ধর্মের শব্দ ও রূপক তত্ত্ব ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু, জাত-পাত কোনো কিছুই লালনের গানে একাকার হয়ে গেছে। সব সৃষ্টি একই সৃষ্টার। একই চাঁদ-সূর্যের আলোয় প্রতিপালিত।

স্রষ্টার কাছে ভক্তিই সব। ভক্তির জোরে স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। লালন বলেন-

ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই হিন্দু কি যবন বলে তার কাছে                                                                                                                      জাতের বিচার নাই।                                                                                                                                                                           ভক্ত কবির জেতে জোলা                                                                                                                                             প্রেম ভক্তিতে মাতোয়ালা                                                                                                                                                   রামদাস মুচি এই ভবের পরে                                                                                                                                      পেলো রতন ভক্তির জোরে                                                                                                                                                তার স্বর্গে সদাই ঘন্টা পড়ে।

বাউলেরা রাগপন্থী, লালনও তেমনি। ইন্দ্রিয় নিরোধ, বিষয়ত্যাগ কিংবা বৈরাগ্য এদের লক্ষ্য নয়। এ জন্য তারা  সহজিয়া।

আকার-নিরাকার তত্ত্বে বাউলদের মতো লালন ফকিরও  উৎসুক। বাউলেরা আত্মার স্বরূপ বুঝতে চায়। তাই তারা দেহযন্ত্রকে বিশ্লেষণ করতে চায়। কেননা দেহ ছাড়া আত্মার অনুভূতি সম্ভব নয়। তাই বাউলদের সাধন পদ্ধতি কামাচার মিথুনাত্মক যোগ সাধনা। অবশ্য এ সাধনা গোপনীয়। বাউল ছাড়া অন্যদের কাছে প্রকাশ করা নিষেধ। আর বাউল ছাড়া অন্যরা বোঝেও না।

জগৎ ও জীবনের এবং সৃষ্টি ও সৃষ্টার সম্পর্ক অত্যন্ত সহজভাবে লালন গানে প্রকাশ পেয়েছে। লালনের  মতে মানুষের দেহের মধ্যেই লীলাময় বাস করেন। তাকে বাইরে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। কেননা-

আমার এ ঘরখানায় কে বিরাজ করে                                                                                                                         তারে জনমভর একবার দেখলাম নারে।

আত্মা আর পরমাত্মা ভিন্ন ভেদ নয়। আসল কথা একবার আপনারে চিনলে পরে যায় অচেনারে চেনা। নিজেকে চিনতে না পারলে ভবের বাজারে কানার মতো হাতড়ে বেড়াতে হবে। ঢাকা-দিল্লী হাতড়ে বা বেদ-বেদান্ত পড়ে ঈশ্বরকে চেনা যায় না। কেননা মানুষের দেহের মধ্যেই আত্মারূপ হরি বাস করে। বাউলেরা মনে করে যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা আছে, দেহভাণ্ডে।

লালন মনে করে, গুরু ছাড়া মুক্তি সম্ভব নয়।  যোগসাধনা গুরুর কাছ থেকে জেনে নিয়ে সাধনা করতে হয়। যেমন-

তিন মানুষের তিন রূপ কর সদগুরু মন আগে ধর।
অথবা,
আমার দেহ জমি আবাদ হইল না                                                                                                                         গুরুর বীজ বুনতে পারলাম না।

বাউলেরা তাদের ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চর্যার পদকর্তাদের মতো বাস্তব জীবন থেকে নানা রকম উপমা-রূপক গ্রহণ করেছে। লালন ফকির তার সমস্ত গানেও তেমনি বাস্তব জীবনের নানা উপকরণ থেকে উপমা-রূপক ব্যবহার করেছেন।  যেমন-

দেহ বর্ণনায় আট কুঠুরী নয় দরজা, অথবা, খাঁচা রে তোর কাঁচা বাঁশের, ধর্ম সাধনার পথের বাধা বিপত্তির কথা বলতে গিয়ে গেরাম বেড়ে অগাধ পানি বা আমার ঘরের চাবি পরের হাতে-এভাবে অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়।

লালন দর্শন – জাত–ধর্ম–বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে লালনের প্রতিবাদী সুর

জীবন ও সমাজ সচেতন লালনের জাতিভেদ সম্পর্কে বক্তব্য-

জেতের কিরূপ দেখলাম না এ নজরে।                                                                                                   সুন্নত দিলে হয় মুসলমান,                                                                                             নারীলোকের কি হয় বিধান?                                                                                                 বামন চিনি পৈতার প্রমাণ                                                                                                               বামনী চিনি কি ধরে।

ভণ্ড সার্থবাদীরাই মানুষে মানুষে এই ভেদাভেদ সৃষ্টি করেছে। মানুষকে ভালবাসা ও মানুষের মূল্যায়নের মধ্যেই অসাম্প্রদায়িকতার বীজ লুকানো থাকে। লালন মনে করতেন মানুষে মানুষে ভেদাভেদ নিরর্থক। কেননা-

কেউ মালা, কেউ তসবি গলায়                                                                                               তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়                                                                                                            যাওয়া কিবা আসার বেলায়                                                                                                           জেতের চিহ্ন রয় কার রে।

মানব-জীবন ছিল লালন শাহের কাছে পরম আরাধনার বিষয়। বাউলরা মনে করে বহু ভাগ্যের ফলেই মানব জীবন পাওয়া যায়। ফেরেসতা দেবতা সবাই আরাধনা করে মানবরূপে জন্ম নিতে। মানব মহিমাকে বড় ঐশ্বর্যময় করে বাউলরা তাদের গানে প্রকাশ করেছে-

অনন্তরূপ সৃষ্টি করলেন সাঁই                                                                                                  শুনি মানবের উত্তম কিছুই নাই                                                                                                                            দেব-দেবতাগণ করে আরাধন                                                                                                                 জন্ম নিতে মানবে।

লালন ফকির তাঁর সংগীতে হিন্দু-মুসলমানের ঐতিহ্য একত্রে ব্যবহার করেছেন। এতে তাঁর অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন-

বেদ-বেদান্ত পড়বে যত                                                                                                     বাড়বে তত লক্ষণা।                                                                                                      লালন কয় নাম ধরেছে                                                                                                      কৃষ্ণ করিম কালা।                                                                                                                                  নামটি লা শরিকাকালা                                                                                                                    সবার শরীক সেই একেলা।                                                                                                   প্রেম দুয়ারে নানা তালা                                                                                                         পুরাণ কোরান, তসবি মালা।

লালন দর্শনের মূল কথা মানুষ। লালনের মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসার দৃষ্টান্ত-

এই মানুষে আছে রে মন                                                                                                                              যারে বলে মানুষ রতন                                                                                                                                   লালন কলে, পেয়ে সে ধন                                                                                               পারলাম না রে চিনিতে।

লালন  উঁচু সমাজে ছিল অবহেলার পাত্র। কিন্তু তাঁর চিন্তা-ভাবনা শিক্ষিত বিত্তবান মানুষের তুলনায় অনেক উপরে। লালন ফকির যে সাম্য ও মানবতার বাণী শিখিয়ে গেছেন, তা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার ভিত হতে পারে।

লালন দর্শন — লালনের মানবতাবাদ : সকলের মাঝে এক মানুষ

লালনের  এ মানবতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানবতার সমগোত্রীয়। লালনের লেখা গান তা মানবতার গান, প্রেমের গান। লালনগীতি বা  গান শুধু ধর্মসংগীত নয়, এ গান মানে লালন দর্শন, ভজন, সংগীত ও সাহিত্য। তাও শুধু লোক-সাহিত্যমাত্র নয় এগুলো সাধারণ মানুষের প্রাণের কথা, মনীষার ফসল। জগৎ ও জীবন সম্পর্কিত উপমা- রূপক তারা গ্রহণ করে আটপৌরে ভাষায় যেভাবে বর্ণনা করেছেন, তাতে কাব্যশ্রীও ফুটে উঠেছে। তারা ভাব অনুযায়ী যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা স্নিগ্ধ গীতিমূর্ছনায় পূর্ণ। তাই, এসব গানের আবেদন বাংলার সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌছে গেছে।

বৈষ্ণবরা একান্তভাবে প্রেমিক ও প্রেম সাধক ছিলেন, আর বাউলেরা ছিল তাত্ত্বিক। বৈষ্ণবেরা সমাজ সংসার সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু বাউলেরা সমাজ, জীবন ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন। তাদের গানের মধ্যে উদার মানবতার কথা প্রকাশ পেয়েছে। এ মানবতা সাম্য ও প্রীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। লালনের সমস্ত গানই প্রায় উদার মানবতার স্পর্শে উজ্জ্বল।

আজকে যারা সম্প্রীতির কথা বলে, তাদের অনেক আগে থেকেই পথে প্রান্তরে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে সে সম্প্রীতির কথা বাউলেরা বলে গেছেন। লালনের অনেক গানেই হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির কথা প্রকাশ পেয়েছে।

বাউল মতের মূল ভাবধারা লালন দর্শনে বা লালন গানে প্রকাশিত, তাই লালনগীতি দেহকেন্দ্রিক।  ভালবাসার আনন্দ বাউলরা সঞ্চার করেছেন বলেই মানবজন্মের মহিমা ও সার্থকতা বাউল গানে পরিস্ফুট হয়েছে। লালনগীতিতে এই সুগভীর মর্ত্যপ্রীতি ও জীবন নিষ্ঠার বার্তা প্রতিফলিত হয়েছে-

এমন মানব জনম আর কি হবে।                                                                                                              মন যা করো ত্বরায় করো এই ভবে ॥

আগেই বলা হয়েছে বাউল দর্শন আর লালন দর্শন সমার্থক। লালন গীতিতে বাউলদের দার্শনিক মনোভঙ্গি ও মানবিক আবেদন বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছে। লালনের গান তাই দেহভিত্তিক রসচেতনা ও তত্ত্বচেতনার সমন্বিত রূপ বলেই তা সুরে ও ভাবে ধূসর ও বৈরাগ্যময়, জগৎ, জীবন ও দেহ সম্পর্কে তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈরাগ্যপূর্ণ মনোভাবের প্রকাশ সুস্পষ্ট।

লালন গীতিতে দেহতত্ত্ব প্রকাশ পেয়েছে ভক্তিকে অবলম্বন করে। কারণ কাম ও প্রেমই ভক্তির উৎস। লালনগীতি তাই ভক্তিগীতি ও প্রেমসঙ্গীত। লালনের গানে যে প্রেমভাবনার প্রকাশ, তা সাধারণ প্রেমবিলাস নয়, একান্তই আধ্যাত্মিক, লোকাতীত ও অতীন্দ্রিয়। লালনগীতিতে প্রেমের গভীরতা, আকুলতা ও আত্মবিস্মরণের ভাবনা অপূর্বব্যঞ্জনায় রসঘন হয়ে উঠেছে।

হৃদয় লালিত করুণাত্বক  বৈরাগ্য সাধকের মনে যে আধ্যাত্মিকভাবনার জাগরণ ঘটায়, লালনের গানে সেই আধ্যাত্মিকতা ও লোকোত্তর জীবনের বার্তা ঘোষিত হয়েছে।

 উদারমানবিকতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও শ্রেণিসচেতনতা লালনগীতিতে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সমাজসচেতন, শ্রেণিবৈষ্ণম্যহীন জীবনের দ্রষ্টা লালনশাহের উপলব্ধি যেন নতুনের আহ্ববান।  লালনের উপলব্ধি তাই চিরন্তন মানবের জয় ঘোষণা বার্তা-

যবন কাফের ঘরে ঘরে                                                                                                                                   শুনে আসার নয়ন ঝরে                                                                                                                                 লালন বলে মরিস কারে                                                                                                                                       চিনলিনে মনের ঘোলায়।

লালনগীতির এ ঐশ্বর্য, এমন ব্যঞ্জনা, ধর্ম ও দর্শনের চরম প্রকাশ তো বটেই,  লালনগীতি সাহিত্যরূপেও  উত্তীর্ণ।

লালন দর্শনে – মনের মানুষ, আলেক নুর , অধর মানুষ

লালন শাহ কবি, বাউল এবং সাধক। স্রষ্টাকে কেন্দ্র করে লালনশাহের গান ভূমি থেকে ‘ভূমা’র দিকে ধাবমান। স্রষ্টার সত্য সুন্দর রূপ তিনি মুগ্ধ ভাবুক ও সাধকের দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন, অনুভব করেছেন।  তত্ত্বের নিরেট শুষ্কতায় নয়; বরং আপন অন্তর্দৃষ্টিতে স্রষ্টার যে রূপ তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তা তার একান্ত নিজের। চিত্তলোকে এই চিরসুন্দর আলেক নুর বা মনের মানুষকে ধরতে চাওয়ার আকুতিই লালনগীতিতে ব্যক্ত হয়েছে।

সাধকমনের চিরন্তন আকুতি ও  মর্মবিদারী ক্রন্দন লালনের গানের ভাবের ঐশ্বর্যকে ফুটিয়ে তুলেছে।

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।                                                                                                                 তারে ধরতে পারলে মনবেড়ি দিতাম পাখির পায়।

লালনগীতিতে আছে আত্মতত্ত্ব ও আধ্যাত্মভাবনার কথা, সেখানে চিরায়ত মানুষের হৃদয়বিদারী পরমাত্মাকে আপন অন্তরে লাভের বাসনা প্রাধান্য পেয়েছে। এই পরমাত্মা চিরকাল বাউল সন্ন্যাসীদের কাছে ‘মনের মানুষ’ ‘অধর মানুষ’ বা আলেফের মানুষ বলে বিবেচিত হয়েছে। পরমাত্মা বা অন্তরতম সত্যই লালনের দৃষ্টিতে স্রষ্টারূপে কল্পিত। তাকে পাওয়ার দুর্ণিবার আকাঙ্ক্ষা জাগতিক মায়া, মোহ ও বস্থজগতের উর্ধ্বে উজ্জ্বল সত্য হিসেবে ফুটে উঠেছে।

আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে
বা

বাড়ির কাছে আরশি নগর/ যেথায় একঘর পড়শী বসত করে।
বা আত্মারূপে কর্তা হরি

বা

ওরে আলেফের মানুষ আলোকে রয়                                                                                                         শুদ্ধ প্রেমরসিক বিনে তারে কে পায়।

লালনগীতির এ সব বক্তব্য গভীর আত্মদর্শন বা তত্ত্বকে প্রকাশ করে। যা লালন দর্শনের মর্মকথা।

লালনগীতির মৌলভাবসম্পদ গভীর ও সুতীব্র মানবতাবোধ। জীবনই সাহিত্যধারার প্রধান উৎসক্ষেত্র। আটপৌরে লোকায়ত জীবনের হৃদস্পন্দন বহন করে লালনশাহের বাণী ও গীতিমূর্ছনা মানবের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহিমাকে প্রমাণ করেছে। লালনের গানে মানুষের বন্দনা ও মহিমা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

মানুষ যে সৃষ্টির উত্তম অংশ এবং স্বপ্নে, আবেগে, ত্যাগে ও ঐশ্বর্যে এই মানবই যে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে, সেই জ্যোতির্ময় রূপ লালনগীতিতে প্রাণ পেয়েছে।

লালন দর্শন — ভালোবাসা, সহনশীলতা ও মানবিক সহাবস্থার শিক্ষা | লালন দর্শনে নারী-পুরুষ সমতা ও মানবতার দৃষ্টিভঙ্গি

লালন শাহ সমকালীন জীবনের শ্রেণীবিচার, জাত-পাতের বৈষম্য, সমাজের বিশ্বাস ও আচারগত বৈষম্য লালন ফকিরকে ব্যথিত করে। সেই ভেদাভেদ, দ্বন্দ্ব ও রূঢ়তা লালনগীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আছে। 

বাউলদর্শনে কেবল প্রচলিত ধর্মসাধনা, আচার সর্বস্ব হৃদয়হীন ধর্মাচরণকে গ্রহণ করা হয়নি। লালনশাহও সেই বাহ্য মত ও পথ, অমানবিক রূঢ়তাকে পরিহার করে সত্য, মহিমাধন্য পূর্ণমানবের জয়গান রচনা করেছেন। লালনগীতি চিরন্তন মানবমহিমার কথা-মালা। হিন্দু-মুসলমান, ব্রাহ্মণ শুভ্র, বিত্তবান বিত্তহীন এই শ্রেণিবৈষম্য বর্জন করে অখণ্ড ও পূর্ণ মানবসত্ত্বাকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে লালনগীতিতে।

লালন কয়, জেতের কিরূপ, দেখলাম না এ নজরে।                                                                           কেউ মালা, কেউ তসবি গলায়,                                                                                                                     তাইতে কি জাত ভিন্ন বলায়                                                                                                                     যাওয়া কিংবা আসার বেলায়                                                                                                                                   জেতের চিহ্ন রয় কার রে।

বাউলরা তাত্ত্বিক, সমাজত্যাগী, গৃহত্যাগী, সংসার বিমুখ হলেও তারা জীবন, সমাজ ও পরিবেশ সচেতন। সমাজের বৈরিতা ও শ্রেণিবৈষম্য  অতিক্রম করেছেন লালন শাহ। লালনগীতি সাম্য ও মানবতার জয় ঘোষণা করেছে। লালন দর্শন তথা লালন সংগীত কেবল লোকসাহিত্য নয়। এগুলো এ দেশের মানুষের মনের কথা ও প্রাণের উচ্ছ্বাসে উজ্জল। অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালন এবং জগতবিশ্বের কেন্দ্রে মানুষকে স্থাপন করে লালন শাহ্ মানবকে মর্যাদাবান করেছেন।

‘রাম রহিম সে কোন জন,                                                                                                                        মাটি কি পবন জল কি হুতাশন,                                                                                                                            শুধাইলে তার অন্বেষণ                                                                                                                                  মূর্খ দেখে কেউ বলে না।

উপসংহার : আজকের সমাজে লালনের মানবতাবাদের প্রাসঙ্গিকতা

পরিশেষে বলা যায় যে, লালনগীতি লালন ধর্মতত্ত্ব ও লালন দর্শনের রসভাষ্য। বাউল পদাবলিকে অনেকে চর্যাপদের উত্তরসূরী বলে মনে করেন। বাউল মতের সাথে ইসলামের সূফীতত্ত্ব ও বৈষ্ণব তত্ত্বের মিশ্রণ ঘটেছে বলেও অনেকে মনে করেন। লালনগীতির অনেক গানই লালন দর্শনের স্বাক্ষর বহন করে। লালন দর্শন আমাদের শেখায় মানুষকে চেনার মাধ্যমে ঈশ্বরচেতনা অর্জনের পথ। এই দর্শনে ধর্ম, বর্ণ, জাত কিংবা লিঙ্গের কোনো বিভেদ নেই—আছে কেবল ‘মানুষ’ নামের এক অনন্ত সত্যের অনুসন্ধান।

লালন দর্শন কেবল আধ্যাত্মিক কোনো তত্ত্ব নয়; এটি সামাজিক ন্যায়, মানবপ্রেম ও সহনশীলতার জীবনদর্শন। তাঁর গীতিতে বা লালন দর্শনে যে মানবতাবাদী চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে, তা আজও সমকালীন সমাজের বিভাজন-দুষ্ট মানসিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক আলোকশিখা। লালন দর্শন তাই যুগে যুগে মানুষকে নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পেতে উদ্বুদ্ধ করে—যেখানে ধর্ম নয়, মানবতাই সর্বোচ্চ সত্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *