শেক্সপীয়র -এর ওথেলো নাটকের চরিত্রগুলো যেন ঈর্ষা, প্রেম ও প্রতারণার চূড়ান্ত রূপ।


ভূমিকা:
শেক্সপীয়র, বিশ্বনাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে ব্যক্তি হয়েও এক প্রতিষ্ঠাণ। তিনি মানবমনের গভীরতম স্তরকে শিল্পের মাধ্যমে অনাবৃত করেছেন। তাঁর ওথেলো নাটকটি মূলত ঈর্ষা, সন্দেহ, ভালোবাসা ও বিশ্বাসঘাতকতার এক করুণ মনস্তাত্ত্বিক ট্র্যাজেডি, যেখানে মানুষের আবেগ ও যুক্তির দ্বন্দ্ব ক্রমে ভয়াবহ পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়। শেক্সপীয়র এ নাটকে বাহ্যিক ঘটনার নাটকীয়তা সৃষ্টির সাথে সাথে চরিত্রগুলোর অন্তর্গত সংকটকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করেছেন। ওথেলো, ইয়াগো, ডেসডিমোনা ও ক্যাসিও—এই চারটি চরিত্রের মধ্য দিয়েই শেক্সপীয়র মানব চরিত্রের বিভিন্ন প্রবণতা যেমন সরলতা, ষড়যন্ত্র, নিষ্পাপতা ও আত্মমর্যাদাবোধকে নাট্যরূপ দিয়েছেন।
সব চরিত্রগুলোই অসাধারণ সক্রিয়, বিশেষত ইয়াগোর চরিত্রের কূটবুদ্ধি ও ওথেলোর মানসিক দুর্বলতার সংঘাতে যে ট্র্যাজিক পরিণতি সৃষ্টি হয়, তা পাঠক ও দর্শককে গভীরভাবে আলোড়িত করে। শেক্সপীয়র ওথেলো নাটকে ইয়াগো চরিত্রের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, মানুষের আবেগ যখন যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়, তখন ব্যক্তিগত সম্পর্কও ধ্বংসের পথে ধাবিত হয়। তাই ওথেলো শুধু একটি প্রেম বা বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি নয়, বরং মানুষের মনস্তত্ত্বের এক গভীর পাঠ, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে শেক্সপীয়র-এর মানবমন অনুধাবনের অসাধারণ দক্ষতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শেক্সপীয়র এর ওথেলো নাটক আসলেই “মানবমনের নাট্যমঞ্চ: ‘ওথেলো’ নাটকের চরিত্রবিশ্ব” । শেক্সপীয়র-এর কৃতিত্ব পুরনো কাহিনির নব বিন্যাস ও পরিবেশনায়, জীবন্ত চরিত্র সৃষ্টিতে। চরিত্রগুলো পাঠককে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে, শেক্সপীয়র-এর-্ভাষা ব্যবহারে প্রবল শক্তিশালী শব্দচয়নে ভাষা যেমন মনোহর ও সুমধুর সৌন্দর্যে ভরা। চরিত্রগলো বহুমাত্রিক, আপাত সহজবোধ্যতার অন্তরালে জটিল। ঘটনার আবর্তের তরঙ্গের দোলায় দোল খেতে খেতে চরিত্রগুলো বিকশিত হয়েছে।
শেক্সপীয়র-এর ওথেলো নাটকের চরিত্র দেখলেই মনে হয় মানবমনের এক বিচিত্র আকাশপট, যেখানে ঈর্ষা, বিশ্বাস, প্রতারণা, প্রেম, নিষ্কলুষতা, কূটবুদ্ধি। সব চরিত্রই যেন আলাদা আলাদা আমাদের মানসিক জগৎ। নাটকের চরিত্রগুলো শুধু চরিত্র-তালিকা নয়, এটা মানুষের অন্তর্গত নাটক।
শেক্সপীয়র-এর ওথেলো নাটকের চরিত্র সম্পর্কে বলা যায় –
- মানবমনের নাট্যমঞ্চ : ‘ওথেলো’ নাটকের চরিত্রসমূহের মনস্তাত্ত্বিক পাঠ।
- ঈর্ষা, প্রেম ও প্রতারণার মানুষগুলো: ‘ওথেলো’ নাটকের চরিত্রবিশ্ব।
- শেক্সপীয়রের ‘ওথেলো’: প্রধান ও পার্শ্বচরিত্রের সাহিত্যিক বিশ্লেষণ
- Villain to Victim: ‘ওথেলো’ নাটকের চরিত্রগুলো কেন আজও প্রাসঙ্গিক?
- চরিত্র নয়, চরিত্রের ভেতর মানুষ: ‘ওথেলো’ নাটকের মনস্তত্ত্ব
ওথেলো চরিত্র:
” শেক্সপীয়র-এর নায়ককুলের মধ্যে ওথেলোই সব চাইতে বেশি রোমান্টিক স্বভাবের।”-
ওথেলো শেক্সপীয়র-এর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। ওথেলো চরিত্র শুধু সাহিত্যিক চরিত্রই নয়, আমাদের চিত্তের দিগন্ত প্রসারিত করে, চেতনাকে তীক্ষ্ণতর করে এবং জীবনের স্বরূপ উপলব্ধিতে সহায়তা করে।
ওথেলো কৃষ্ণকায় অভিজাত মূর, ওথেলো বীর। নিজের শৌর্য, বীর্য ও বাহুবলে সে জীবনে প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছে। সে সাইপ্রাসের যুদ্ধের সেনাপতি। তার বীরত্ব, উদার হৃদয়, সংযত ধীরোদাত্ত পৌরুষের কারণে সে বিদেশি ভেসেনীয় সমাজে উচ্চতর পদ অধিকার করে নিয়েছে, জিতে নিয়েছে ডেসডিমোনা নামে তাদেরই এক সুন্দরী অভিজাত তরুণীকে। সে ডেসডিমোনাকে তার নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।
শিশুসুলভ সরলমনা । মুক্ত স্বভাবের বিশ্বাসপ্রবণ, ওথেলো তার নিজের সম্পর্কে বলেছে- “One not easily jealous. but being wrough/perplexed in the extreme.” তার জীবনের বেশির ভাগ অভিজ্ঞতা যুদ্ধ-বিগ্রহের, রণাঙ্গনের, সৈন্য শিবিরের এবং রাজসভার। সাংসারিক জ্ঞান সীমিত। সরলচিত্ত, ছলচাতুরীতে সহজে বিভ্রান্ত। ওথেলো চরিত্রের ট্র্যাজেডির বীজ তার সরলতা ও সংসারের অনভিজ্ঞতা।
ওথেলো কৃষ্ণাঙ্গ কিন্তু মনে বিন্দুমাত্র হীনমন্যতা নেই। তার সাহস, আত্মমর্যাদাবোধ, উত্তেজিত হবার মত ঘটনায়ও সংযমী ও অপরিসীম ধৈর্যশক্তি রয়েছে, যা পাঠককে আকর্ষণ করে। কঠোর সংযমের সাথে সে নিজের উত্তেজনাপ্রবণ মনকে নিয়ন্ত্রিত রাখে। তার আত্মসংযম দৃষ্টি কেড়ে নেওয়ার মত আকর্ষণীয়। তার উদাত্ত উচ্চারণ- “Keep up your bright swords, for the dew will rust them আমাদের কানে বাজে সর্বক্ষণ।
সবাই মনে করে ওথেলো যাদুবিদ্যায় ডেসডিমোনাকে ভুলিয়েছে, তাদের সম্পর্কের কাহিনি বললে সকলেই তার সরল মর্যাদাবোধ মুগ্ধ হয়ে ওঠে। উদ্দীপ্ত কল্পনাশক্তির অধিকারী, আবার শিশুর মত সরল, বহির্মুখীন এবং বিশ্লেষণ বিমুখ। সরলতার কারণে অনেক কিছুই তার চোখ এড়িয়ে যায়। আবেগের জোয়ারে সে কল্পনাপ্রবণ। ডেসডিমোনার ভালবাসায় মুগ্ধ। ভালবাসা কামগন্ধহীন। ডেসডিমোনার ঠোঁটে চুমো খেতে সে সাইপ্রাস হতে প্যালেস্টাইন পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যেতে পারে। এখানেই তার একান্ত রোমান্টিক প্রকৃতির পরিচয় মেলে। ভয়ংকর কঠিনের মধ্যে কোমল। যুদ্ধের সেনাপতি ঈর্ষণীয় সুন্দরীর প্রেমিক ও আরাধ্য। রোমান্টিকতা তার সত্তার বহুলাংশ অধিকার করে আছে।
No, my heart is turned to stone, I strike it, and it hurts my hand. মূলত শেক্সপীয়রের সৃষ্ট নায়ককূলের মধ্যে ওথেলোই সর্বাপেক্ষা অধিক রোমান্টিক স্বভাবে মূর্ত হয়েছে।
যুদ্ধ বিরোধের ক্রিয়াকর্ম ব্যতীত এই বৃহৎ পৃথিবীর অন্য কোন প্রসঙ্গ সম্পর্কে সে বলতে পারে না। ইস্পাতে গড়া রণাঙ্গনই তার সুখশয্যা। জীবনের এ রূঢ় বাস্তবতার রসে গলে গিয়েই ডেসডিমোনা তাকে দেহতনুমন সঁপে দিয়েছে। সাইপ্রাস রক্ষার্থে সে নববধূ ডেসডিমোনাকে সাথে নিয়ে গেলেও যুদ্ধক্ষেত্রের কর্তব্য এতটুকুও বিস্মৃত হয় না সে।
ওথেলো সরল বিশ্বাসপ্রবণ বলেই শয়তান ইয়াগো বা বন্ধু ক্যাসিও সবাইকে সমান বিশ্বাস করেছে এবং ভালবেসেছে। ডেসডিমোনাকে সে দশ আঙুলে বিশ্বাসে ভালোবাসায় মমত্বে জড়িয়ে ছড়িয়ে রেখেছে। ডেসডিমোনা সম্পর্কে সে বলেছে- ওকে অবিশ্বাস করবার আগে যেন আমার মৃত্যু হয়।
ওথেলো ভালোবাসা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কোন মধ্যপন্থা জানে না, সে যাকে বিশ্বাস করে, তাকে বিশ্বাসই করে, যাকে ভালবাসে তাকে ভালই বাসে। কৃষ্ণাঙ্গ হয়েও তার অন্তর ছিল শুচিশুভ্র। অথচ শিশুর মত সহজ-সরল প্রাণবন্ত কল্পনাপ্রবণ সংযমী ওথেলোই ইয়াগোর চাতুরীতে অশ্লীল অশোভন উক্তি ও আচরণে লিপ্ত হয় এবং শেষে পরিণত হয় প্রিয়া হত্যাকারীতে।
ইয়াগোর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ধীরে ধীরে সূক্ষ্মভাবে উপকারী বন্ধুর ভান করে ওথেলোর সামনে ডেসডিমোনার অসতীত্বের প্রসঙ্গ তোলে। ওথেলো তার বিশাল ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বলিষ্ঠতা দিয়েও ইয়াগোর কূটকৌশল ধরতে পারে নি। ওথেলো সরল বলেই অন্যের ষড়যন্ত্র ধরতে পারে না। ওথেলো যেহেতু জাতিবর্ণ ও রক্তে ছিল স্বতন্ত্র, তাই সে ভেনেসীয় উচ্চবিত্ত সমাজের তরুণীর জীবনরীতি সম্পর্কে ছিল অজ্ঞ।
অনভিজ্ঞতা ছিল বলেই ওথোলো ডেসডিমোনার উদারতা ও কৃতজ্ঞতাকে সে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। তবুও তার দেবীতুল্য প্রিয়ার চরিত্রস্খলন সে বিশ্বাস করে নি। সে প্রমাণ চেয়েছে, চাক্ষুষ প্রমাণ। ধূর্ত ইয়াগো চাক্ষুষ প্রমাণই হাজির করে। ডেসডিমোনার রুমাল হারানো, সেই মুহূর্তে বিয়াস্কার আবির্ভাব সবই ইয়াগোর নারকীয় পরিকল্পনার সমর্থক। ওথেলোর মনে শুরু হয় বিষক্রিয়া। সন্দেহের বিষে সে নীলকণ্ঠ। আত্মায় তার অগ্নিদাহ। দাহ মেটাতে সে তার জীবনের জীবনকে হত্যা করে।
সন্দেহের বিষবাষ্প ওথেলোর যাপিত জীবনকে বিষাক্ত করেছে, বিশাল প্রেমময় বক্ষ হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত। ইয়াগোর কথায় (চক্রান্তে) হৃদয় হয়ে উঠেছে তার অশান্ত এবং বিক্ষুব্ধ। জীবন তার জ্বালাময় হয়ে উঠেছে ।
ওথেলো চরিত্রে সংশয়ী পরিপূর্ণ মানবাত্মার ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত পরিচয় ফুটে উঠেছে। তার অন্তর্লোকে যে সমুদ্র মন্থন চলেছে, তারই গুমরানো বিষ তাকে পান করতে হয়েছে। তার দাম্পত্যকে তন্ন তন্ন করতে গিয়ে তার চরিত্র হয়েছে ছিন্ন ভিন্ন। শিকারি ইয়াগোর ষড়যন্ত্রে ওথেলো শিকার করেছে তার জীবনের সর্বৈব সুখ-শান্তিকে।
ওথেলো চরিত্রের মানসিক জটিলতা সমাজ মানবেরই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিজাত। প্রতিশোধ চরিতার্থতার কারণে সে ডেসডিমোনাকে হত্যা করেনি। ধর্মীয় পবিত্র আনুষ্ঠানিক কর্তব্য পালনের একাগ্রতা নিয়ে সে ডেসডিমোনাকে হত্যা করে। এ হত্যার পেছনে ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও আত্মমর্যাদার দাবিই মুখ্য। দ্বিচারিণী বেঁচে থাকলে আরও পাপ করবে। সে পাপের ভাগী ও ভোগী তাকে হতে হবে। তাই সে হত্যায় উদ্যত হয়। কিন্তু লক্ষণীয় যে তখনও করুণ বিষণ্ণতা তাকে ঘিরে ধরে-Put out the light, and then put out the light. যখন সে বুঝতে পারে যে, সে অমানুষ, শাঠ্য ও শয়তানের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছে, অর্থাৎ যখন সে উপলব্ধি করে যে সে ভুল করেছে, তখন সব শেষ। তখন তার আত্মহনন ছাড়া গত্যন্তর থাকে না।
ওথেলোর মনের ন্যায়বোধ কতটা প্রবল তা ধরা পড়ে স্ত্রীকে হত্যার পর যখন জানতে পারে যে ডেসডিমনা নিষ্পাপ, তখন সে বিচারে নিজেকেই মৃত্যুদণ্ড দেয়।
অর্থাৎ নিরপরাধ ডেসডিমোনাকে হত্যা করে সে যে পাপ করেছে, তার শাস্তি তার ন্যায়বোধেরই সমার্থক। মৃত্যুতে সে বিন্দুমাত্রও দ্বিধান্বিত নয়। অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে পরিপূর্ণ মর্যাদার সাথে ওথেলো আত্মাহুতি দিয়ে তার নির্বুদ্ধিতা ও অপরাধের চরম প্রায়শ্চিত্ত করেছে গভীর তৃপ্তির সাথে। সাথে সাথে আমাদের জন্য রেখে যায় এক সুমহান দৃষ্টান্ত যে, পাহাড় প্রমাণ চারিত্রিক বলিষ্ঠতা সত্ত্বেও সামান্য মানবিক ত্রুটির কারণে কীভাবে বীরের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু এত কিছুতেও তার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাবোধ তিরোহিত হয় না।
ইয়াগো চরিত্র:
নাট্যকার শেক্সপীয়র এর “ইয়াগো হচ্ছে মিথ্যা, ছলনা এবং কুতর্কের নিপুণ শিল্পী।” –
বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ইয়াগো। খলচরিত্র তবুও এই চরিত্রের প্রভাবেই সমগ্র নাটকটি আবর্তিত হয়েছে। এরই চক্রান্তে নাটকে নেমে এসেছে ট্র্যাজেডি, মৃত্যু হয়েছে ডেসডিমোনা ও ওথেলোর।
শেক্সপীয়র তাঁর শিল্পীসত্তার, স্রষ্টাসত্তার বহুলাংশ ইয়াগো চরিত্র নির্মাণে সঞ্চারিত করেছেন। ইয়াগো ঈর্ষার চরম প্রতীক, সাক্ষাৎ শয়তান। সে মিথ্যা, ছলনা এবং কুতর্কের নিপুণ শিল্পী। অন্যের সুখ ও আনন্দ নষ্ট করার মধ্যেই তার মূল জীবনীশক্তি নিহিত। পৈশাচিক ধূর্ততা ও নির্ভেজাল মিথ্যা নির্মাণে দক্ষ ইয়াগো পৈশাচিক প্রতিহিংসাপরায়ণ। ইয়াগোর মত হৃদয়হীন, শান্ত-শীতল আবেগ বর্জিত বুদ্ধিসর্বস্ব অহংকারী আত্মাভিমানী কুটিল ধূর্ত নররূপী শয়তান পৃথিবীতে বিরল।
শৈশব থেকে ইয়াগো মুখোশধারী। নিজে যা নয়, তা সেজেই থেকেছে। সে একজন নির্জলা সৈনিক। সে নিজেকে অতি মাত্রায় চালাক ও জ্ঞানী মনে করে। চোখে চারপাশের মানুষগুলোকে মনে করে নির্বোধ ভেড়া। মিথ্যা আদর্শ ও মূল্যবোধ নিয়ে ব্যস্ত থাকা অর্থহীন মনে । তার কাছে সবাই তুচ্ছ ও অবজ্ঞার পাত্র। বুদ্ধির জোরেই সে তার চারপাশের বিত্তশালী অভিজাত ও ক্ষমতাধর মানুষকে গাধার মত নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরায়। মুহূর্তের সুযোগকে সে অবহেলা করে না, সামান্যতম সুযোগেরও সে সদ্ব্যবহার করে। সে অন্যের ওপর যে চাল চালায়, তা যে আগে থেকেই ঠিক করে রাখে তেমন নয়। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করায় তার জ্ঞান অভ্রান্ত। ভাগ্য তাকে সাহায্য করে, কিন্তু সে নিজে ভাগ্যের মুখাপেক্ষী নয়।
ইয়াগো নির্ভেজাল শয়তানি ও ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারে নিপুণ কৌশলী এবং এ বিষয়ে সে নীতিবর্জিত। তার কূটকৌশল ও ষড়যন্ত্রকে কেউ স্পর্শ করতে পারে না। রোডেরিগোর কাছে ডেসডিমোনার সতীত্বের প্রশ্নকে সে চরম তাচ্ছিল্যের সাথে উড়িয়ে দেয়। সবাই ইয়াগোর সততায় চরম বিশ্বাসী। তার ষড়যন্ত্র নিখুঁত, তাই সর্বৈব সর্বনাশ ঘটালেও সে সবার কাছে সৎ ও বন্ধুপরায়ণ। ফলে ক্যাসিও, ওথেলো, রোডেরিগো, ডেসডিমোনা কোন না কোন সময়ে তার সাহায্য পেতে চেয়েছে। আগাগোড়া অসাধারণ নৈপুণ্যের সাথে অভিনয় করে চলে ধূর্ত ইয়াগো। তার ধূর্ততার কোন সাক্ষী নেই। তার স্ত্রীও তার শঠতা বুঝতে পারে না। সবাই তাকে সত্যবাদী, বন্ধুবৎসল, স্পষ্ট বক্তা ও কাটখোট্টা সৈনিক হিসেবে জানে। আসলে সবাই ইয়াগোকে যেভাবে জানে, সে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখানেই সে মুখোশধারী।
ওথেলোকে ইয়াগো নিপুণ চাতুরী দিয়ে যৌন ঈর্ষাকাতর করে তোলে। ডেসডিমোনা ভিন্ন যে ওথেলো স্বর্গও চায় নি, সেই ওথেলোকে সে ধীরে দীরে বিষাক্ত করে তুলে নিষ্ঠুর হত্যাকারীতে পরিণত করেছে। ধূর্ত ইয়াগো জানে যে- ওথেলো যাকে বিশ্বাস করে তাকে বিশ্বাসই করে, যাকে ভালোবাসে তাকে ভালই বাসে। এ ধরনের চরিত্রে একবার যৌন-ঈর্ষা সৃষ্টি করতে পারলে গভীর বিশ্বাসের বন্ধনও টুটে যাবে। তাই সে অসম্ভব ধূর্ততার সাথে ওথেলোর পরম বন্ধু ও হিতৈষীর ছদ্মবেশে তার মনে ধীরে ধীরে সন্দেহের বিষ ছড়াতে থাকে।
ইয়াগো যে ওথোলোর সাথে বৈরিতা করেছে, তা উদ্দেশ্যহীন বা অকারণে নয়। ইয়াগো নিজেকে সবার চেয়ে যোগ্য জ্ঞান করে, অথচ ওথেলো তরুণ নির্বোধ ক্যাসিওকে সহ-সেনাপতি নিযুক্ত করেছে। ফলে ইয়াগোর আত্মাভিমানে আঘাত লাগে এবং তার মান-মর্যাদা বিধ্বস্ত হয়। ফলে সে যন্ত্রণাকাতর, ঈর্ষাপরায়ণ। ক্যাসিও যতদিন সহ-সেনাপতি নিযুক্ত থাকবে, ততদিন তার পদোন্নতি হবে না। তাছাড়া সে শুনেছে যে, ওথেলো এবং ক্যাসিও উভয়ই তার স্ত্রী এমিলিয়ার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। তাছাড়া ক্যাসিওর দৈনন্দিন জীবনে চলাফেরায় এমন একটা সহজ সৌন্দর্য আছে, যা ইয়াগোকে স্বভাবতই ঈর্ষাপরায়ণ করে তোলে।
তাই সে একই ঢিলে ক্যাসিও এবং ওথেলো-দুই পাখিকেই মারতে উদ্যত হয়। ওথেলো তার উচ্চপদস্থ হলেও তাকে সে ঘৃণা করে। তাই সে রোডেরিগোর সাথে একজোট হয়ে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চায়। রোডেরিগোকে সে বলেছে যে, ডেসডিমোনার সতীত্ব নাশ করতে পারলে ইয়াগো তৃপ্ত হবে।
ইয়াগোর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার:
ইয়াগো ষড়যন্ত্রের জাল পাতে। আতিথেয়তার নাম করে ক্যাসিওকে মদ্যপ করে তোলে এবং বিদেশিদের সাথে অন্যায় আচরণের কারণে ওথেলো ক্যাসিওকে বরখাস্ত করে।
ইয়াগো যুক্তি দেয় ক্যাসিওকে, ক্যাসিও যেন ডেসডিমোনার শরণাপন্ন হয়। কেননা, ওথেলো-ডেসডিমোনার প্রেমে ক্যাসিও সাহায্য করেছে। হারানো, পদমর্যাদা ও বিশ্বাস ফিরে পেতে ক্যাসিও বারবার ডেসডিমোনার কাছে যায়।
এদিকে ইয়াগো সুকৌশলে ওথেলোকে ক্যাসিও এবং ডেসডিমোনার মিলন সম্পর্কে সন্ধিহান করে তোলে। স্ত্রীর অসতীত্বে ওথেলো বিশ্বাস করে না, চায় চাক্ষুষ প্রমাণ। চতুর ইয়াগো প্রমাণ হাজির করে। ইয়াগোর চক্রান্তে নিয়তিও সাহায্য করে। ডেসডিমোনাকে দেওয়া ওথেলোর প্রেমের চিহ্ন স্বরূপ রুমাল অসর্তকতায় মেঝেতে পড়ে যায়, সরল এমিলিয়া তা কুড়িয়ে পেয়ে স্বামী ইয়াগোকে দেয়। ইয়াগো গোপনে তা ক্যাসিওর ঘরে রেখে আসে এবং ওথেলোর কাছে প্রমাণ করে যে, ক্যাসিওই ডেসডিমোনার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ এবং ডেসডিমোনা ক্যাসিওর নিত্য অঙ্কশায়িনী।
ইয়াগো সফল হয়, ডেসডিমোনার চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করে এবং ওথেলোকে হত্যায় উদ্যোগী করে তোলে। ইয়াগোর সমস্ত পদক্ষেপ সুকৌশলে এবং ধীরে ধীরে। সে যে খেলা খেলেছে তা খুবই সাংঘাতিক। সে জানে, সামান্য ভুল হলে সব বিনাশ হবে।
ইয়াগো শয়তান, প্রতিশোধ পরায়ণ, তবুও সে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে চায়, ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায়। নিজের কুটকৌশলের তীক্ষ্ণতা পরীক্ষা করতে চায়। রোডেরিগো তার কাছে শিশু, ক্যাসিওকে সে তুচ্ছ জ্ঞান করে, এমনকি সর্বজন প্রশংসিত মহাবীর ওথেলোকে ছলনা ও মায়ার জালে জড়িয়ে তার দাম্পত্য জীবন বিপর্যন্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এখানেই তার অহংবোধের তৃপ্তি।
ইয়াগো হচ্ছে সাক্ষাৎ শয়তান। ডেসডিমোনাকে পাইয়ে দিতে রোডেরিগোর কাছ থেকে সে প্রচুর অর্থ গ্রহণ করেছে। অতঃপর কৌশলে তাকে হত্যা করিয়েছে। তারই কুমন্ত্রণায় ওথেলো তার প্রাণপ্রতিম স্ত্রীকে হত্যা করেছে। তার কুচক্রান্তের কথা তার স্ত্রী এমিলিয়াও বুঝতে পারে নি, যখন বুঝেছে তখন সেও ইয়াগোর চক্রান্তের শিকার হয়েছে।
ইয়াগোর পরিণতি ঘটে তার স্ত্রী এমিলিয়ার মাধ্যমে। অথচ সে নিজের স্বার্থোদ্ধারের জন্য চরম হৃদয়হীনতার সাথে ব্যবহার করেছে তার স্ত্রীকে। ইয়াগোর যথার্থ স্বরূপ যখন এমিলিয়ার কাছে উন্মোচিত হয়েছে, তখনই ইয়াগোর হাতে তার মৃত্যু হয়েছে। এমিলিয়ার মাধ্যমেই ইয়াগোর নীচ হীন শয়তানি চরিত্র সবার কাছে স্পষ্ট হয়েছে। বিচারে তার ধীরে ধীরে পীড়নের মাধ্যমে মুখ খোলার ব্যাবস্থা করা হয়। অর্থাৎ ওথেলো এবং ডেসডিমোনার সাথে সাথে নিজের কু-জালে জড়িয়ে ইয়াগো নিজেও ধ্বংস হয়ে যায়।
হৃদয়হীন পাষণ্ড ইয়াগোর চরিত্র হতে সকল মানবীয় গুণ অপসৃত হয়েছে। সে দয়া-মায়া-স্নেহ-ভয়-ভীতির ঊর্ধ্বে। ইয়াগো এখানে- “Great stock type of intellectual villainy in all literature.
ওথোলো নাটকে ইয়াগো চরিত্রের প্রভাব:
শেক্সপীয়র-এর ‘ওথেলো’ নাটকের সমস্ত কাহিনি যেভাবে ইয়াগোর সক্রিয়তা দিয়ে পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে, তাতে মনে এ নাটকর সূচিপত্র ইয়াগো চরিত্র। ইয়াগোর কূটকৌশলই ওথেলোর কাহিনিকে গতিশীল করে ট্র্যাজিক পরিণতি দিয়েছে। সকল দুষ্কর্ম ও দুর্ঘটনার চাবিকাঠি ইয়াগো। নাট্যকার এ চরিত্রটিকে মৌলিক চরিত্রানুগ করে নির্মাণ করেছেন। নাট্যকারের প্রতিভার চরম বিকাশ ইয়াগো চরিত্র।
ডেসডিমোনা চরিত্র
শেক্সপীয়র-এর সৃষ্ট এক বিশেষ নারী চরিত্র। শিশুর মত সারল্য, স্বভাবের মাধুর্য, পরোপকারী প্রবৃত্তি ও পতিপরায়ণা ডেসডিমোনা ‘ওথেলো’ নাটকের অন্যতমা নায়িকা। ভেনেসীয় মান্যবর সিনেটর ব্রাবানশিও-এর কন্যা এবং মূর সেনাপতি ওথেলোর স্ত্রী।
সৌন্দর্যের পুতুল:
ডেসডিমোনা অসাধারণ সৌন্দর্যের অধিকারিণী। ক্যাসিওর দৃষ্টিতে ডেসডিমোনার কাছে যে-কোন সৌন্দর্যের বর্ণনা হার মানে। অবিশ্বাস্য রূপের জনশ্রুতিও তার রূপের কাছে তুচ্ছ। কারুকার্যমণ্ডিত কথায় কবি যে স্তব রচনা করেন ডেসডিমোনার রূপ তা সহজেই অতিক্রম করে যায়। সৃষ্টির সে ঐশ্বর্য প্রকাশ করতে গিয়ে কল্পনা নিঃশেষিত হয়। বড় স্নিগ্ধ ও সুকোমল তন্বী। আশ্চর্য মোহনীয় এক জোড়া চোখ। শুধু চাহনির গুঞ্জরণে বাসনা জাগিয়ে তুলতে পারে। বড় মোহময় দৃষ্টি, তাতে নারীসুলভ লজ্জায় ভরপুর। ডেসডিমোনার অন্তর এত শান্ত নিস্পন্দ যে নিজের হৃদয়ের চঞ্চলতায় সে নিজেই লজ্জায় আরক্তিম হয়ে ওঠে। ওথেলোর দৃষ্টিতে ডেসডিমোনা চারুশীলা কলাবতী সুন্দরী তন্বী।
চরিত্রের অনন্য দিক:
ডেসডিমোনা ভেনেসীয় নগরের আর দশটা মেয়ের মতো নয়। সুন্দরী হয়েও অন্য পুরুষকে রূপের আগুনে দগ্ধ করেনি। শান্ত, সুন্দর রূপ ঐশ্বর্যে ঋদ্ধা, লোভনীয় যুবতী ডেসডিমোনা বিয়ে করতে অনিচ্ছুক ছিল। তাই বিত্তশালী মার্জিত রুচিসম্পন্ন সুবেশধারী সুদর্শন তরুণকেও সে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সেই ডেসডিমোনা কৃষ্ণাঙ্গ মূর সেনাপতি ওথেলোর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সংগ্রামমুখর জীবনকাহিনি ডেসডিমোনার সরল শিশু অন্তরকে বেদনার্ত করে এবং তাকে ভালোবেসে বিয়ে করে। সে ওথেলোকে ভালোবেসে তার চিত্ত বিত্ত সমর্পণ করেছে ওথেলোর মহত্ত্বের কাছে।
স্বামী সোহাগিনী ডেসডিমোনা:
স্বামী অনুগতা রমণীর যেসব গুণাবলি থাকা দরকার তার সবটাই ডেসডিমোনার মাঝে পূর্ণমাত্রায় বিরাজমান ছিল। স্বামী তার জীবনের সর্বস্ব এবং স্বামীকে সুখী করাই তার জীবনের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা। তার মমত্বে প্রেমে ওথেলোও মুগ্ধ ও বিকশিত। সে তার রমণীয়তা ও কমনীয়তার কারণে ওথেলোকে যেমন খুশি ভাঙতে বা গড়তে পারে। এমনকি পৈতৃক ধর্মও পরিত্যাগ করাতে সক্ষম। ওথেলোর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসাই তাকে পিতৃগৃহ ত্যাগে বাধ্য করে। সে তার ভালোবাসার শক্তিতেই সেনাপতি ওথেলোকে স্বামী রূপে গ্রহণ করে এবং দীপ্তকণ্ঠে তার পিতার উপস্থিতিতে সিনেট সভায় ঘোষণা করে-
“আমি মুরকে ভালবেসেছি জীবনে তাঁর নিত্য সহচর হবো বলে। এখন আমার সমগ্র সত্তা আমার স্বামীর গুণে গুণান্বিতা। ওথেলোর রূপ আমি তার মনের মুকুরে দেখেছি। আমার বিত্ত আমার চিত্ত সব আমি সঁপে দিয়েছি তাঁর মহত্ত্ব ও বীর্যবত্তার কাছে।”
যাপিত জীবনের অন্ধকার দিকে সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ডেসডিমোনা :
ডেসডিমোনার শিশুসুলভ সারল্য, স্বভাবের মাধুর্য, পরোপকারস্পৃহা, জীবনের নোংরা দিক সম্পর্কে চূড়ান্ত অজ্ঞতা তাকে করুণ পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। সে স্বভাবে এত উদার, এত মধুর, এত সহানুভূতিশীল, এত কর্মতৎপর যে, তাকে যা অনুরোধ করা হয় তার চেয়ে অতিরিক্ত কিছু না করাকে সে অপরাধ জ্ঞান করে। তার ভিতর ও বাহির জুড়ে আছে পরোপকারী মন। সে সকলের কল্যাণ চায়, মঙ্গল চায়। ক্যাসিওর মঙ্গল চায় বলেই সে ক্যাসিওর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে- জেনে রাখুন যে, আমি যাঁকে একবার বন্ধু বলে গ্রহণ করি, তার জন্য সব কিছু করতে তৈরি থাকি।
ডেসডিমোনার সারল্য, স্বভাবের মাধুর্য, পরোপকার স্পৃহা, জীবনের নোংরা দিক সম্পর্কে চূড়ান্ত অজ্ঞতা- সর্বোপরি ওথেলোর প্রতি তার বিমুগ্ধ ভালবাসায় চরিত্রটি অন্যতম আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
কৃতজ্ঞ ডেসডিমোনা:
সে উপকারীর উপকার কখনো ভুলতে পারে না। ওথেলোর সাথে প্রেমে ক্যাসিও তাদের সাহায্য করেছিল। ফলে সে সকৃতজ্ঞ চিত্তে ক্যাসিওর বিপদে আজ সহযোগিতা করাকে নিজের পবিত্র কর্তব্য জ্ঞান করেছে। তাই ক্যাসিওকে সে নিশ্চয়তা দিয়ে বলেছে- “আপনার জন্য প্রাণ দেবে, তবু আপনার স্বার্থ বিসর্জন দেবে না।” যতক্ষণ ওথেলো ক্যাসিওর ব্যাপারে তার সাথে একমত না হবে, সে ওথেলোকে শান্তিতে থাকতে দেবে না।
নিষ্ক্রিয় হয়েও সক্রিয় চরিত্র:
শেক্সপীয়র-এর ওথেলো নাটকের অধিকাংশ সময় সে নিরুপায়ভাবে অসহায় এবং নিষ্ক্রিয়। তবে প্রয়োজনীয় সময়ে সে নিষ্ক্রিয় নয়। সিনেটের সভায় স্বামীর সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করা, তার আচরণ ও উক্তি আমাদের সপ্রশংস বিস্ময় ও শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। সে তার পিতাকে বলেছে-
“কন্যারূপে আমার সকল কর্মের প্রভু আপনি। কিন্তু ইনি আমার স্বামী। আমার মাতা বিবাহের পর তাঁর পিতাকে অতিক্রম করে পতির প্রতি যে আনুগত্য প্রকাশ করেছেন, আমার দাবি আমার মুর স্বামীর প্রতি আমাকেও ততখানি প্রকাশ করার অধিকাংশ দেওয়া হোক।”
সংসার সম্পর্কে অনভিজ্ঞ ডেসডিমোনা:
ভালোবেসে বিয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু স্বামী সেনাপতি, যুদ্ধ ও যুদ্ধক্ষেত্র তাদের বিচরণভূমি তাই, ডেসডিমোনা স্বামীকে গভীরভাবে ভালবেসেছিল সত্য কিন্তু স্বামীর মানসিকতা এবং মানসপট বিশ্লেষণ করে দেখবার সময় সুযোগ তার হয় নি। সে ওথেলোকে বিয়ের পূর্বে প্রেমিক হিসেবে আধো আধো লাজে দূরত্ব বজায় রেখে যতটুকু জেনেছ তা প্রণয়জাত আবেগপ্রবণ অভিজ্ঞতা।
কিন্তু দাম্পত্য জীবনের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে ভিন্ন মাত্রার। কিন্তু সে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তাদের হয় নি। কেননা বিয়ের পর পরই ওথেলোকে চলে যেতে হলো সাইপ্রাসে। সেখানে বসেই তাদের বাসর কেটেছে প্রথম আবেগসঞ্জাত সুখ ও আনন্দ অনুভূতির মধ্য দিয়ে। যৌবন ও তারুণ্যের বাসনা দিয়ে সে তার প্রেমিক প্রবরের জন্য বাসরে নিত্য নবরূপে নবরাগে স্বামীকে বিমোহিত করেছে। কিন্তু স্বামী সম্পর্কে বাস্তব ও জীবনমুখী জ্ঞান সে অর্জন করে নি।
বাসরের প্রেমের আবির মুছতে না মুছতেই দেখা দিল জীবনাকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। নৃশংস শয়তান ইয়াগোর ষড়যন্ত্রে তার জীবনাকাশে শুরু হল মেঘ-বিদ্যুতের খেলা, ছিন্নভিন্ন হল দাম্পত্য জীবন। বিশ্বাসে ভালোবাসায় তারা যে বাঁধনে আবদ্ধ ছিল, সে বাঁধন ক্ষয়ে যেতে লাগল। কেবল অদৃশ্য সুতার মত দাম্পত্য সম্পর্ক ঝুলতে লাগল।
ক্যাসিওর হারানো পদমর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে উপর্যুপরি অনুরোধ এবং প্রেমের বন্ধন ও নিদর্শন রূপ রুমাল হারানোর ঘটনাই তার জীবন অবসানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বামীর ক্রুদ্ধ বিচলিত মুখাবয়ব দেখে রুমাল হারাবার সত্য কথাটি এই ভীতা প্রেমাবেগপ্রবণ তরুণী সংসার অনভিজ্ঞ নববধূ স্বীকার করতে পারে নি। ফলে ওথেলোর চোখে সে আরও অপরাধী হয়ে ওঠে, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে সে তা বুঝতে পারে নি।
ইয়াগোর কুমন্ত্রণায় ওথেলো সন্দেহ অবিশ্বাসের বিষে নীলকণ্ঠ। অথচ সরলা প্রাণবন্তা যৌবনা ডেসডিমোনা তখনও প্রেমে আবেগে উতলা- আধখানা প্রকাশ, আধখানা গোপন। নবন্ধুটা পুষ্পসম। সতৃষ্ণ লীলাময়ী আবার কম্পিত শঙ্কিত বিহ্বল। প্রেমকে সামান্য স্পর্শ করেই পলায়ন করে। লজ্জায়, ভয়ে, আনন্দে, প্রেমে, সংশয়ে আপনাকে গোপন কি প্রকাশ করবে সে ভেবে পায় না।
স্বামীর রূঢ় অশোভন আচরণে নদীর জলের মত স্থির মানসে ঢেউ ওঠে, বেদনার ঢেউ। বাতাসে অশনি সংকেত। ডেসডিমোনার মনে হয় কোথাও কোন সত্য নেই। শঙ্খের মধ্যকার জটিলতা তার দাম্পত্য জীবনকে জটিল ও বিষময় করে তোলে। একটা ধ্রুব বিশ্বাস বনেদি আমলের ঘোড়ার খুরে তছনছ হচ্ছে। ওথেলোর উপরকার সকল বিশ্বাসে ভরা প্রেম প্রণয় তখন মুঠি ভরা বরফের মত গলে গলে পড়ছে। মনে হচ্ছে ক্রমশ ওথেলো তার কাছ থেকে সরে সরে যাচ্ছে। এখন সে বান্ধবহীন বিষাদের মুখোমুখী। দাম্পত্য জীবন এখন সাপের খোলসের মত ঠাণ্ডা। মৃত্যু হয় প্রাণের হরিণ শিশুর। শশ্মশানের বিশীর্ণতার সাথে শুরু হয় তার আত্মীয়তা।
তার চরিত্রে নিচতা ও হীনতা নেই। স্বামী ওথেলো সম্পর্কে তার বিশ্বাস সে ঈর্ষাপরায়ণ নয়। সে এমিলিয়াকে বলেছে- “আমার মনে হয় ওর জনন্মলগ্নে প্রকৃতি তার সর্বসত্তা থেকে ওই বস্তুটি শুষে নিয়েছিল।”
ডেসডিমোনার দুর্ভাগ্য এখানে যে, তার স্বামী যখন তার ওপর অবিশ্বাসে ক্রুদ্ধ তখনও সে কিছুই বুঝতে পারে নি। সে মনে করেছে সাইপ্রাস ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়ায় ওথেলো ডেসডিমোনার বাবার ষড়যন্ত্র জ্ঞান করে তার ওপর ক্রুদ্ধ হয়েছে। ডেসডিমোনা তখনই ক্যাসিওর খোঁজে বের হয় এবং তার হারানো পদমর্যাদা ফেরত পাবার চেষ্টায় তৎপর। সে ক্যাসিওকে বলেছে- ‘আমি স্বামীর কাছে বিরক্তি ভাজন পর্যন্ত হয়েছি তবুও আমি যা করতে পারি করব।” তার ভিতর সততার কোন অভাব নেই। সে বলেছে- “অন্যায়ের প্রতিবাদে অন্যায় নয়, বরং অন্যায়ের দৃষ্টান্ত থেকে নিজেকে শাসন করবার শিক্ষাই যেন বিধাতা আমাকে দেন।” সে যথার্থ সত্যই বলেছে- “সাধারণ স্বভাবসিদ্ধ প্রীতি ছাড়া ক্যাসিওকে কোনদিন আমি ভিন্নভাবে ভালবাসি নি, কোন প্রেমোপহার তাকে দেই নি।”
ডেসডিমোনা যা নয়, সে সেই কুলটা অভিযোগে তার স্বামীর কাছে অভিযুক্তা। দুনিয়ার যাবতীয় তুচ্ছ ধন-দৌলত আর আনন্দের বিনিময়েও ওই কর্ম তার দ্বারা সাধ্যাতীত। যে ডেসডিমোনা বিশ্বাস করে না যে, স্বামীকে জঘন্য প্রবঞ্চনা করে এ রকম মেয়ে সত্যি আছে। এমিলিয়ার শত যুক্তিতেও ডেসডিমোনা বিশ্বাস করে না যে, কোন মেয়ে কুলটা হতে পারে। অথচ সে কারণেই তাকে মরতে হল।
ডেসডিমোনার নতুন যৌবন, সমগ্র জীবনের খুবই সামান্য সে ভোগ করতে পেরেছে। বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছে তার বুকে। খেলা শেষ না হতেই বেলা থাকতেই তার জীবনখেলা শেষ হবে তা সে চায় নি। চোখের সামনে অনিবার্য মৃত্যুর আগ্রাসন দেখে কাতর কণ্ঠে সে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছে।
“আমাকে নির্বাসন দিন, প্রভু, কিন্তু হত্যা করবেন না।” কিন্তু সে যখন বুঝেছে- ওথেলোর প্রতিহিংসা অনিবার্য জিঘাংসায় রূপ নিয়েছে, তার হাত হতে নিস্তার নেই। তখন একদিনের জন্য সে প্রাণ ভিক্ষা চেয়েছে। আর কিছুক্ষণের জন্য হলেও সে বেঁচে থাকতে চায়। জীবনের জন্য তার এ আর্তি বিশ্ব মানবের হৃদয়ে বেদনাময় ও মর্মস্পর্শী অনুভূতি সৃষ্টি করে “কাল মারবেন আমাকে, আজ রাতটুকু বেঁচে থাকতে দিন।”
কিন্তু সে সুযোগ ডেসডিমোনা পায় নি। মুখে বালিশ চেপে শ্বাসরুদ্ধ করে নির্মমভাবে হত্যা করা হল তাকে। নিরপরাধ অসহায় ডেসডিমোনাকে ঢলে পড়তে হল মৃত্যুর কোলে। প্রভাত শিশির শুকাতে না শুকাতেই ঝরে পড়ে ফুটন্ত ফুল। অথচ একদিন সে বলেছিল-“আমাদের সুখ ও ভালবাসা, যতদিন যাবে, তত বাড়বে বৈ কমবে না।”
স্বামীর প্রতি তার অগাধ ভালবাসায় হত্যার জন্য সে তার স্বামীকে দায়ী করে নি। কে এই হত্যাকাণ্ডের নায়ক? এমিলিয়ার প্রশ্নের জবাবে জীবনশিখা নিভে যাবার আগ মুহূর্তে ডেসডিমোনার কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে-
Nobody-I myself. Farewell.
Commend me to my kind lord. O. farewell.
“কেউ না- আমি নিজেই। বিদায়। আমার স্বামীকে আমার প্রিয় সম্ভাষণ দিও। বিদায়।”
ডেসডিমোনা ছিল সম্পূর্ণ নিরপরাধ। তার কণ্ঠেই আমরা শুনতে পাই- “আমি অপরাধহীন মৃত্যুবরণ করেছি।”
অনুবাদক কবীর চৌধুরীর ভাষায়- “ডেসডিমোনা মিরান্ডার মতো নিষ্পাপ, ভায়োলার মতো প্রেমময়ী, কিন্তু দুঃসহ যন্ত্রণাভোগের দিক থেকে কর্ডেলিয়া কিংবা ইমোজনের চাইতেও তার পরিস্থিতি অধিকতর বেদনাদায়ক।” ডেসডিমোনা বঙ্কিমের কপালকুণ্ডলার মত পরোপকারী, রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তীর মত সরল এবং শরৎচন্দ্রের বিলাসীর মত প্রেমময়ী।
উপসংহার
শেক্সপীয়র-এর , ওথেলো নাটকের চরিত্রসমূহের মধ্য দিয়ে শেক্সপীয়র মানব প্রকৃতির আলো-আঁধারিকে এক অনন্য শিল্পরূপ দিয়েছেন। ওথেলোর সরল বিশ্বাসপ্রবণতা, ডেসডিমোনার নিষ্পাপ ভালোবাসা, ক্যাসিওর ভদ্রতা এবং ইয়াগোর নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্র—এই বৈপরীত্যের মধ্যেই নাটকের ট্র্যাজিক শক্তি নিহিত।
শেক্সপীয়র দেখিয়েছেন, মানুষ যতই বীর বা মহৎ হোক না কেন, মানসিক দুর্বলতা ও ভুল সিদ্ধান্ত তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে ইয়াগোর চরিত্রের মাধ্যমে শেক্সপীয়র প্রমাণ করেন, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু অনেক সময় বাইরের কেউ নয়, বরং মানুষের ভেতরের অন্ধ বিশ্বাস ও সন্দেহ।
এই নাটক তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক বা কল্পিত কাহিনি নয়, বরং মানব জীবনের চিরন্তন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আজও পাঠক যখন ওথেলো পড়েন বা মঞ্চে দেখেন, তখন নিজের জীবন ও সম্পর্কের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পান। এখানেই শেক্সপীয়র-এর মহত্ত্ব—তিনি সময়কে অতিক্রম করে মানব জীবনের চিরস্থায়ী সত্যকে নাটকের ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
ফলে ওথেলো নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণ আমাদের শুধু সাহিত্যিক আনন্দ দেয় না, বরং মানুষের মন ও সমাজকে বোঝার এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধিও প্রদান করে, যা শেক্সপীয়র-কে বিশ্বসাহিত্যের চিরকালীন শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

