সংস্কৃতি ও ইতিহাসের স্বরূপ, বৈশিষ্ট্য ও ধারণার বিবর্তন।
ভূমিকা:
সংস্কৃতি-ইতিহাস মানুষের সভ্যতার দুই অবিচ্ছেদ্য দিক। এগুলো ছাড়া সভ্যতা পরিচয়হীন। সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, রীতি, শিল্প, সাহিত্য ও জীবনযাপনের ধারায়; আর ইতিহাস সেই সংস্কৃতির বিকাশ, পরিবর্তন ও সময়ের ধারাকে ধারণ করে। একদিকে সংস্কৃতি আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে, অন্যদিকে ইতিহাস সেই পরিচয়ের বিবর্তন ও উত্তরাধিকার রক্ষা করে। সংস্কৃতি-ইতিহাস একে অপরের পরিপূরক।
এ সবের জ্ঞান ছাড়া কোনো জাতিই টিকতে পারে ন। ইতিহাস ছাড়া সংস্কৃতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, আর সংস্কৃতি ছাড়া ইতিহাস থাকে প্রাণহীন। তাই এগুলো পরস্পর নির্ভরশীল — একে অপরকে ব্যাখ্যা করে, পরিপূর্ণ করে এবং মানবজীবনের সামাজিক ও বৌদ্ধিক অগ্রযাত্রাকে অর্থবহ করে তোলে। যে জাতি সংস্কৃতি -ইতিহাস যত চর্চা করে, সংরক্ষণ করে সেই জাতির অস্তিত্ব তত শক্ত, তাদের সংস্কৃতি-ইতিহাসের প্রভাব অন্য জাতির উপর তত বেশি।
প্রশ্ন সংস্কৃতি কী ? বাঙালি সংস্কৃতি কী ?
ইংরেজি Culture শব্দের বাংলা পরিভাষা সংস্কৃতি। মানুষের বিশ্বাস, আচার-আচরণ এবং জ্ঞানের একটি সমন্বিত প্যাটার্ণকে বলা যায় সংস্কৃতি।
https://youtu.be/uKVXXFkUqcg?si=cq63rqsX9CcTriON
সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের জীবনযাত্রা প্রণালি। জীবনের মৌল চাহিদা পুরণার্থে এবং সর্বোপরি মানুষ তার সব ধরনের দৈহিক ও মানসিক চাহিদা পূরণে যেসব বিষয়বস্তু অবলম্বন করেছে তার সবটাই সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত।
রবার্টসন বলেন- “সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজ সৃষ্ট বা সমাজ কর্তৃক উৎপাদিত বিষয়বস্তু বা দ্রব্য সামগ্রী যা সমাজবাসীর সবাই একত্রে ধারণ করে এবং যা একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনযাত্রা প্রণালির সূচনা করে।”
পল জোনস্ বলেন- “মানুষ যা কিছু সৃষ্টি করে তার সামগ্রিক রূপই হচ্ছে সংস্কৃতি।”

নৃবিজ্ঞানী ই.বি. টেইলর বলেন- “সমাজের সদস্য হিসেবে অর্জিত আচার-আচরণ, ব্যবহার, জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নীতি-প্রথা ইত্যাদির জটিল সমাবেশই হলো সংস্কৃতি।”
সুতরাং সংস্কৃতি হচ্ছে মানুষের সেসব আচরণের সামগ্রিক রূপ যা তারা সমাজ থেকে অর্জন করে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রয়োগ করে এবং সামাজিকভাবে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যায়।
সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য:
:
সংস্কৃতির স্বরূপ পরিপূর্ণভাবে জানতে হলে এর সংজ্ঞার পাশাপাশি, বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা দরকার। সংস্কৃতি কেবল শিল্প-সাহিত্য-সংগীত নয়, মৃৎপাত্র, পোশাক, ঘরবাড়ি তৈরির কৌশলও সংস্কৃতির অংশ। মানুষের মনের অবস্থা, ভৌগোলিক অবস্থা উন্নত-অনুন্নত অবস্থা ইত্যাদির জন্য প্রত্যেক জাতি বা গোষ্ঠীর সংস্কৃতির নিজস্বতা বা স্বতন্ত্রতা গড়ে ওঠে। এসব বিষয় মাথায় রেখেই সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরতে হয়।
(ক) সংস্কৃতি শিক্ষণের বিষয়: সংস্কৃতি শিক্ষনের বিষয়। মানুষের শিক্ষালব্ধ ব্যবহারই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি জন্মগত নয়, পূর্বপুরুষ থেকে অর্জিত। তাই মানুষের পরিবেশ বা পরিবার ভিন্ন বলেই সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন।
(খ) সংস্কৃতি ধারনালব্ধ বিষয়: সংস্কৃতি ধারণালব্ধ বিষয় শিশু সংস্কৃতি নিয়ে জন্মায় না। জন্মের পর থেকে সে যা শেখে তার তার সংস্কৃতি।
(গ) সংস্কৃতি সামাজিক বিষয়: সংস্কৃতি হলো সার্বিক সমাজের রূপ। সমাজের বাইরে সংস্কৃতির অস্তিত্ব নেই। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সমাজ। সমাজের মানুষের আলাদা ব্যবহার সংস্কৃতি নয়। সব ব্যবহারের সামগ্রিক রূপই হলো সংস্কৃতি।
(ঘ) সংস্কৃতি পরিশীলিত: আমরা যা করি তাই সংস্কৃতি, কিন্তু তা আদর্শ সংস্কৃতি নয়। বস্তুত মানুষের আচরণে যে সচেতন মান প্রকাশ পায়, তাই আদর্শ সংস্কৃতি। তাই বলা হয় সংস্কৃতি একটি পরিশীলিত বিষয়।
(ঙ) সংস্কৃতি বাসনা চরিতার্থকারী বিষয়: সংস্কৃতির সাথে সমাজের মঙ্গল বা কল্যাণের বিষয়টি জড়িত। প্রত্যেক সংস্কৃতিরই রয়েছে শারীরবৃত্তীয় ও মনোবিদ্যাগত চাহিদা পূরণের ক্ষমতা। তাই বলা হয় সংস্কৃতি বাসনা চরিতার্থকারী বিষয়। সংস্কৃতির সামাজিক অভ্যাসগুলো অবশ্যই সমষ্টিগত চাহিদা পূরণ করে।
(চ) সংস্কৃতি উপযোগীকরণ যোগ্য: সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য- উপযোগীকরণ যোগ্যতা থাকতে হবে। সমাজের পরিবেশের উপযোগী না হলে সংস্কৃতি গ্রহণযোগ্য হারায়। সমাজ পরিবর্তনশীল, তাই সংস্কৃতিকে উপযোগীকরণ যোগ্য হতে হয়।
(ছ) সংস্কৃতি অখন্ড সত্তা: সংস্কৃতির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর রয়েছে অখন্ড সত্তা। সংস্কৃতির সকল উপাদান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিশুদ্ধ এবং অখন্ড। সংগীত, সাহিত্য, শিল্পকলা, পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি, ভাষা প্রভৃতি আন্তঃসম্পর্ক যুক্ত।
সংস্কৃতির উপাদান:
প্রতি সমাজের মানুষের সমস্ত সত্তার উপর ভিত্তি করে সংস্কৃতির উপাদান গড়ে ওঠে। সংস্কৃতির উপাদানসমূহের মধ্যে সামাজিক মানুষের স্বরূপ ফুটে ওঠে। সংস্কৃতির উপাদানের মধ্যে বাসগৃহের নমুনা, পোশাক-পরিচ্ছেদের নমুনা খাদ্য দ্রব্যের নমুনা ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। মানুষের জীবনযাত্রা, আচার, ধর্ম, বাসস্থান নির্মাণ কৌশল, পোশাকের রূপ, শিল্প-সাহিত্য-সংগীত, কৃষি-জলবায়ু ইত্যাদি যদি ভিন্ন হয় তাহলে সংস্কৃতির উপাদানও ভিন্ন হবে। কেননা, সংস্কৃতির উপাদান হলো কোনো অঞ্চলের বিশেষ জীবন প্রণালী, যার মাধ্যমে তাদের নিজস্বতা ঐ জীবন প্রণালী দ্বারা প্রভাবিত হয়।
সংস্কৃতির উপাদান দুই প্রকার:
(১) বস্তুগত সংস্কৃতি এবং
(২) অবস্তুগত সংস্কৃতি।
(১) বস্তুগত সংস্কৃতি: মানুষের উদ্ভাবিত বস্তুগত উপকরণগুলো বস্তুগত সংস্কৃতি নামে পরিচিত। যেমন-ঘরবাড়ি, কাপড়-চোপড়, আসবাবপত্র ইত্যাদি।
মানবজীবন পরিচালনায় মানুষ যেসব বস্তু তৈরি এবং ব্যবহার করে থাকে, তাকে সামগ্রিকভাবে বস্তুগত সংস্কৃতি বলে।
ক) জীবন ও জীবিকাকেন্দ্রিক সব ধরনের বস্তুধর্মী উপকরণ।খ) গৃহ ও গৃহস্থলি কেন্দ্রিক বস্তুধর্মী উপকরণ।
গ) পোশাক, অলংকার, যানবাহন কেন্দ্রিক বস্তুগত।
ঘ) শখ, সংগীত, নৃত্য কেন্দ্রিক বস্তুগত উপকরণ সহ সব ধরনের বস্তুগত উপকরণ (যা ছোঁয়া যায়, দেখা যায়, ধরা যায়) বস্তুগত সংস্কৃতি।
(২) অবস্তুগত সংস্কৃতি: মানুষের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, চিত্রকলা, গান, নৃত্য, সাহিত্য ইত্যাদির মধ্যে সংস্কৃতির যে অপর্থিব বা অবস্তুগত দিক রয়েছে, তাকে অবস্তুগত সংস্কৃতি বলে। বস্তুর বাইরে লিখনগত ও ভঙ্গিগত সৃষ্টি, যা সাহিত্য ও শিল্পকে গুনান্বিত করে, সেসবই অবস্তুগত সংস্কৃতি।
ক) কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস, সংগীত, লোককথা, ছড়া, ধাঁধাঁ, লোকবিশ্বাস ইত্যাদি অবস্তুগত সংস্কৃতির উপাদান।
খ) প্রত্যেক সাহিত্যকর্মই অবস্তুগত সংস্কৃতির ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে।
গ) অবস্তুগত সংস্কৃতি জীবিকার তাগিদে, অথবা নিছক সুকুমার বৃত্তি চর্চার উপায় হিসেবে সৃষ্টি হতে পারে।
ঘ) দর্শন, বিজ্ঞান ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি সম্পর্কিত চিন্তা, তত্ত্ব ও মতবাদও অবস্তুগত সংস্কৃতি।
ঙ) যুগ ও জীবনের পরিবর্তনশীলতার সাথে তাল মিলিয়ে মানব মনীষার ভাব ও মননের জগৎ থেকে অবস্তুগত সংস্কৃতির নানা উপাদান বের হয়েছে।
সংস্কৃতির সংজ্ঞা, বৈশিষ্ট্য, উপাদান বিশ্লেষণ করলে সহজেই সংস্কৃতির স্বরূপ উপলব্ধি করা যায়। সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদান দ্বারা যেমন সমাজজীবন অগ্রসর হয়েছে, তেমনি অবস্তুগত উপাদান মানস জগতে নতুন চেতনা ও নব নব উপকরণ উদ্ভাবনে মানুষকে উৎসাহিত করেছে। সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদান সক্রিয়ভাবে একে অন্যকে পরিপুষ্ট করে। মূলত বস্তুগত ও অবস্তুগত সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক।
বাঙালি সংস্কৃতি কী ?
সমাজস্থ মানুষ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত যা কিছু উদ্ভাবন করেছে বা করছে সবই তার সংস্কৃতি। তাই সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনধারণের পদ্ধতি। বাঙালি জাতি তার জীবনধারণের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত যা কিছু উদ্ভাবন করেছে বা করছে তার সবই বাঙালি সংস্কৃতি। বলা যায় বাঙালির জীবিকা সম্পৃক্ত জীবনের সার্বক্ষণিক ও বহুধা অভিব্যক্তিই হলো বাঙালি সংস্কৃতি। বাঙালির জীবনের সাথে সম্পৃক্ত সকল কিছুই বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গীভূত।
ইতিহাসের সংজ্ঞা ও স্বরূপ:
অতীতকালে কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো মানব বা মানবগোষ্ঠী কর্তৃক সম্পাদিত কাজের প্রামাণ্য উৎস এবং তথ্যভিত্তিক লিখিত ও বস্তুনিষ্ঠ ধারাবাহিক বিবরণই হলো ইতিহাস।
ইতিহাস হলো সেই ঘটনা বা কর্ম যা মানুষের দ্বারা সম্পাদিত হয়। ইতিহাসের ঘটনা অতীতকালের। এর একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান থাকে। ঘটনাটি প্রামাণ্য তথ্য ও উৎসভিত্তিক হয়। ঘটনাটির লিখিত বিবরণ থাকে এবং সময়ের ক্রমিক বিবরণ থাকে। এসব বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে ইতিহাস বলা যাবে।

ইতিহাস শব্দটির ব্যুৎপত্তি:
ইংরেজি History শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হলো ইতিহাস। History শব্দটি এসেছে গ্রিক ও ল্যাটিন শব্দ Historia থেকে। Historia শব্দটির অর্থ সত্যানুসন্ধান বা গবেষণা।
বাংলায় ইতিহাস শব্দটি এসেছে ‘ইতিহ’ থেকে, যার অর্থ হলো ‘ঐতিহ্য’+ইতিহাস শব্দটি ব্যুৎপত্তি হলো-‘ইতিহ+আস’ এর অর্থ হলো এমনটি ছিল বা এমনটিই ঘটেছিল। তাই বলা হয়-
প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছিল তার অনুসন্ধান ও বিবরণই ইতিহাস।
তাই বলা হয়-
“চলতি অর্থে ইতিহাস হচ্ছে মানব কর্মকান্ড, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা সম্পর্কিত বিশ্লেষণাত্মক লিখিত বিবরণ।”
ইতিহাসের ক্ষেত্র বা পরিধি:
ইতিহাসের কারবার মানুষ ও তার পারিপার্শ্বিকতা অর্থাৎ প্রকৃতি কিংবা পরিবেশ নিয়ে। এছাড়া সমাজ, সংস্কৃতি, ও সভ্যতার বিকাশ, পরিবর্তন এবং পতনও ইতিহাসের আওতাধীন।
ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য::
মানব জাতির অতীত কর্মের খতিয়ান বা সার-সংক্ষেপ হলো ইতিহাস। এর বৈশিষ্ট্য:
১) ইতিহাস মূলত উৎস ও তথ্যাভিত্তিক।
২) ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তা অনুসন্ধানমূলক।
৩) ইতিহাস সর্বজনীন।
৪) ধারাবাহিকতা এবং সময়ানুক্রমিকতা ইতিহাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৫) ইতিহাস হলো সঠিক তথ্যনির্ভর ও অবিবিছন্ন।
এছাড়াও আরও যে বৈশিষ্ট্য লক্ষ্ করা যায়-
আত্মোপলব্ধি, নিরপেক্ষতা, মানবীয়তা, প্রাচীনত্ব, পরিবর্তনশীলতা, স্বকীয়তা, ক্রমবর্ধনশীলতা, সঠিক পথের নির্দেশনা, মহানুভবতা, আন্তর্জাতিকতা ইত্যাদি।
সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণার বিবর্তন:
সংস্কৃতি ও ইতিহাস পরিবর্তনশীল। তাই এ সম্পর্কিত ধারণাও যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। ইতিহাস হলো “ঘটনার নিরন্তর সত্যানুসন্ধান’। আর সংস্কৃতি হলো মানুষের জীবন যাত্রা প্রণালী। উভয় বিষযই স্থির নেই। পরিবর্তনের হাওয়া লেগে সংস্কৃতি ও ইতিহাস পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে সংস্কৃতি ও ইতিহাস সর্ম্পকে নিত্যনতুন চিন্তাভাবনা গড়ে উঠেছে। সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা বিবর্তিত হয় বলেই প্রতিনিয়ত আধুনিক জ্ঞানকে ধারণ করে সমৃদ্ধ হয়।
ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা: হিরোডোটাস ইতিহাসের জনক। তবে তার অনেক আগে থেকেই ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণার জন্ম হয়। তারপর যুগে যুগে ইতিহাস সম্পর্কিত মানুষের ধারণা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেছে। তবে হিরোডোটাস কর্তৃক ব্যবহৃত ঐরংঃড়ৎু শব্দটি এখনও ইতিহাস বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। যুগে যুগে বিভিন্ন পন্ডিত ও ঐতিহাসিকদের মতামত থেকে ইতিহাস সম্পর্কিত যে ধারণা পাওয়া যায়, তা হলো পৃথিবীতে মানুষের আগমন, বিবর্তন, সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও সমাজরাষ্ট্রের সবকিছুর বিবরণ-সমীক্ষণই হলো ইতিহাস।
ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণার বিবর্তন: ইতিহাসের মূল উপাদান মানুষের কর্ম, ভাবনা যত প্রসারিত ও বিকশিত হয়েছে ইতিহাসের বিবর্তন ততটাই সম্ভব হয়েছে। মানুষ আদিম যুগে শুধু খাদ্য সংগ্রহ করতো, তাই যে যুগের ইতিহাসও তার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এরপর মানুষ খাদ্য সংগ্রহ থেকে খাদ্য উৎপাদন করেছে, পাথরের ব্যবহার ও আগুন জ্বালাতে শিখেছে, পশুপালন ও মৃৎপাত্র তৈরি করেছে। এভাবে নিত্য নতুন উদ্ভাবনী কর্মের প্রসারের সাথে সাথে ইতিহাসেরও বিবর্তন ঘটেছে। এটা হলো প্রাগৈতিহাসিক যুগ।
এরপর ঐতিহাসিক যুগে মানুষ লিখিত ও প্রমান্য তথ্যের আলোকে তার কর্মকান্ডকে ধরে রাখতে প্রয়াসী হয়েছে।
মানুষ গড়ে তুলেছে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকাঠামো। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের সেসব কর্মকে তুলে ধরার প্রবণতা।
প্রথম দিকে ইতিসাসে গুরুত্ব পেয়েছে প্রধানত যুদ্ধ ও রাজনীতি। পরবর্তীতে গুরুত্ব পেয়েছে সমাজ, অর্থনীত, সংস্কৃতি, ধর্ম, স্থাপত্যসহ সবকিছু। মধ্যযুগের ইউরোপে খ্রিষ্টধর্ম ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। বারো শতকে ভারতীয় ইতিহাসে সমাজও গুরুত্ব পায়।
মধ্যযুগের শেষের দিকে ইউরোপে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের সূত্রপাত হলে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হয় ধর্ম-সংক্রান্ত কর্মকান্ড দ্বারা। আঠারো শতকের বিজ্ঞানের জ্ঞানের আলো, কুটনৈতিক বিপ্লব, শিল্পবিপ্লব ইতিহাসের ধারণায় নতুনত্ব আনে। যুক্তবাদের কাছে ধর্ম হেরে যায়। আঠারো শতকের ফরাসী বিপ্লব সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটে।
নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদী নীতি, ইতালির একত্রীকরণ জার্মানির ঐক্য, রোমাণ্টিজম, ডারউইনের বিবর্তনবাদ, কার্ল মার্কসের সমাজতন্ত্র বিষয়ক মতবাদ ইত্যাদি বিষয় ইতিহাসের ধারণায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
ঊনিশ শতকের জার্মান ঐতিহাসিক Leopold Ban Ranke ইতিহাসকে বিজ্ঞানরূপে ব্যাখ্যা করেন। Jakob Burkhard এর Civilization of the Renaissance এবং History of Greek Civilization ইত্যাদি গ্রন্থ ইতিহাসের ধারণায় অভিনবত্ব আনে।
বিশ শতকের ইতিহাস সম্পর্কিত আরও অভিনব। রাজনৈতিক মৈত্রী জোট গঠন, আন্তর্জাতিক বলয় সৃষ্টি, অভিনব সব আবিষ্কার, স্নায়ুযুদ্ধ, উপনিবেশবাদ, অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ, পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা থেকে মানব সভ্যতা রক্ষায় জাতিপুঞ্জ (১৯২০), পরবর্তীতে জাতিসংঘ (১৯৪৫) প্রতিষ্ঠা, বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কিত শতশত ঐতিহাসিক গ্রন্থ সৃষ্টি- ইতিহাস ও ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে ও বিস্তার ঘটায়।
সুতরাং বলা যায়, ইতিহাস-বিবর্তন ও ইতিহাস-সম্পর্কিত ধারণার বিবর্তন সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে গেছে। মানুষের চিন্তা-চেতনা, কর্মধারা ও জীবন প্রণালীর পরিবর্তন ও প্রবহমানতার সাথে তাল মিলিয়ে ইতিহাস সম্পর্কিত ধারণা পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে এবং হচ্ছে।
উপসংহার:
অতএব বলা যায়, সংস্কৃতি-ইতিহাস মানবসমাজের মানসিক, নৈতিক ও ঐতিহ্যিক পরিচয়ের মূল উৎস। এর ধারাবাহিকতা সংস্কৃতিকে নতুন নতুন রূপে বিকশিত করে, আর সংস্কৃতি ইতিহাসকে অর্থ ও প্রাণ দেয়। সংস্কৃতি-ইতিহাসের সমন্বিত অধ্যয়ন আমাদের জাতিগত চেতনা, সমাজগঠন ও মানবিক মূল্যবোধ বুঝতে সহায়তা করে। তাই সংস্কৃতি-ইতিহাস কেবল অতীতের দলিল নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশক শক্তি, যা মানুষের আত্মপরিচয় ও সভ্যতার ধারাবাহিক বিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করে।
প্রফেসর মো: আথতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।