সমাসের সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয়তা ও সমাস সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও সমাধান।
সমাস কাকে বলে ?
উত্তরঃ সমাস সম+√অস+ঘঞ্জ। ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে সমাস শব্দের অর্থ সংক্ষেপণ। সমাস মানে সংক্ষেপ, মিলন; একাধিক পদের একপদীকরণ। অর্থের দিক থেকে মিল আছে এমন দুই বা ততোধিক পদ মিলে একপদ হলেই সমাস হয়। তাই বলা যায়-
পরস্পর অর্থসংগতিযুক্ত দুই বা ততোধিক পদের এক পদে মিলিত হওয়াকে সমাস বলে।
যেমন-
সিংহ চিহ্নিত আসন সিংহাসন।
রাজার পুত্র রাজপুত্র।

সমাসের প্রকারভেদ
সমাস সাধারণত ছয় প্রকার। যথা-
দ্বন্দ্ব, দ্বিগু, বহুব্রীহি, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, ও অব্যয়ীভাব সমাস।
দ্বন্দ্ব সমাস কাকে বলে? দ্বন্দ্ব শব্দের অর্থ মিলন বা জোড়া। একই জাতীয় পদের মধ্যে সমাস হলে এবং উভয় পদের অর্থ প্রাধান্য পেলে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
যেমন- ভাই ও বোন ভাই-বোন। ভাল ও মন্দ ভালমন্দ ইত্যাদি। বি
ভিন্ন প্রকারের দ্বন্দ্ব সমাস রয়েছে। যেমন-
সমার্থক দ্বন্দ্ব- হাট ও বাজার হাট-বাজার।
মিলনার্থক দ্বন্দ্ব মা ও বাবা = মা-বাবা।
বিপরীতার্থক দ্বন্দ্ব আকাশ ও পাতাল = আকাশ-পাতাল।
অলুক দ্বন্দ্ব- পথে ও ঘাটে = পাথে-ঘাটে।
বিরোধার্থক দ্বন্দ্ব- দা ও কুমড়া = দা-কুমড়া।
ইত্যাদি দ্বন্দ্ব-কাপড় ও চোপড় = কাপড়-চোপড়।
একশেষ দ্বন্দ্ব- আমি, তুমি ও সে = আমরা।
বহুপদী দ্বন্দ্ব —-টাকা, আনা ও পাই = টাকা-আনা-পাই।
দ্বিগু সমাস কাকে বলে? দ্বিগু শব্দটি একটি সংস্কৃত সমাসবদ্ধ শব্দ-দ্বি (দুই) এবং গো (বিকারে গু-গোরু) এই দুই পদের সমাস। এর অর্থ শুধু দুটি গরু নয়, বরং দুটি গরুর মূল্যের বস্তু বা দুটি গরু দিয়ে কোনো বস্তু। সংস্কৃত ভাষায় এ অর্থেই দ্বিগু শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকেই এ সমাসের নামকরণ করা হয়েছে দ্বিগু সমাস। সুতরাং বলা যায়,
সংখ্যাবাচক শব্দ আগে থেকে বিশেষ্য পদের যে সমাস হয় এবং সমস্তপদটি দ্বারা সমাহার বা সমষ্টি বুঝায়, তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
যেমন- নব রত্নের সমাহার = নবরত্ন,
সপ্ত অহের সমাহার=সপ্তাহ;
সে (তিন) তারের সমাহার= সেতার।
বহুব্রীহি সমাস কাকে বলে? যে সমাসে পূর্বপদ ও পরপদের কোনোটির অর্থ না বুঝিয়ে অন্য কোনো অর্থ প্রকাশ করে, তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।
বহুব্রীহি শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ শব্দ। এর ব্যাসবাক্য এ রকম বহু ব্রীহি (ধান) আছে যার= বহুব্রীহিঃ বহু ও ব্রীহি এ পদ দুটির অর্থ প্রধান ভাবে না বুঝিয়ে এতে অন্য অর্থ (বহু ধান আছে এমন বাক্তি) ধনী ব্যক্তিকে বুঝায়। এ অর্থে বহুব্রীহি শব্দটিতে যে সমাস হয়েছে সে প্রকারের সমাসের নাম বহুব্রীহি।
বিভিন্ন প্রকারের বহুব্রীহি সমাস রয়েছে। যেমন –
সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস- সুন্দর বর্ণ যার = সুবর্ণ;
ব্যধিকরণ বহুব্রীহি সমাস- পাপে মতি যার= পাপমতি।
ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস- কানে কানে যে কথা= কানাকানি
নঞ্ বহুব্রীহি সমাস- নেই অন্ত যার = অনন্ত
মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস- বিড়ালের ন্যায় চোখ যার = বিড়ালচোখী
অন্ত্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস- আট মাসে জন্মেছে যে = আটাশে
প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি সমাস – একদিকে চোখ যার একচোখা (আ প্রত্যয়)
অলুক বহুব্রীহি সমাস- মাথায় পাগড়ি যার = মাথায় পাগড়ি;
হাতে বেড়ি যার= হাতে-বেড়ি
সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস- তিন পায়া যার = তেপায়া
সহার্থক বহুব্রীহি সমাস — আদরের সাথে বর্তমান ;
সমান তীর্থ যার = সতীর্থ
নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি সমাস — অন্তর্গত অপ (জল) যার = অন্তরীপ
উপমাপ্রধান বহুব্রীহি সমাস – চাঁদের মত মুখ যার চাঁদমুখ
কর্মধারয় সমাস কাকে বলে ? বিশেষণ বা বিশেষণ-ভাবাপন্ন পদের সাথে বিশেষ্য বা বিশেষ্য-ভাবাপন্ন পদের যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য থাকে, তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। কর্মধারয় সমাসে প্রথম পদটি দ্বিতীয় পদের বিশেষণ হিসেবে অবস্থান করে। প্রথম পদটি বিশেষ্য হলেও তা পরবর্তী পদের বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হয়।
যেমন-ডাক্তারসাহেব। এখানে ডাক্তার পদটি সাহেব পদটিকে বিশেষায়িত করেছে।
কর্মধারয় সমাসের প্রকারভেদ:
১. সাধারণ কর্মধারয়
বিশেষণ + বিশেষ্য- নীল যে আকাশ = নীলাকাশ
বিশেষ্য+ বিশেষণ সিদ্ধ যে আলু = আলুসিদ্ধ
বিশেষ্য+ বিশেষ্য যিনি মাস্টার তিনিই সাহেব = মাস্টারসাহেব
বিশেষণ বিশেষণ- যা মিঠা তা কড়া = মিঠাকড়া:
২. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস
সিংহ চিহ্নিত যে আসন = সিংহাসন
৩. উপমিত কর্মধারয় সমাস
চাঁদের মত বদন চাঁদবদন
৪. উপমান কর্মধারয় সমাস-
কাজলের মত কালো কাজলকালো
৫. রূপক কর্মধারয় সমাস-
ভব রূপ নদী ভবনদী
তৎপুরুষ সমাস কাকে বলে ? পূর্বপদে দ্বিতীয়াদি বিভক্তি লোপ পেয়ে যে সমাস হয় এবং পরপদের অর্থ প্রাধান্য থাকে, তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে। পূর্ব পদের যে বিভক্তি লোপ পেয়ে সমস্তপদটি গঠিত হয়, সে বিভক্তির নামানুসারে তৎপুরুষ সমাসের নামকরণ করা হয়।
তৎ অর্থ তার। তৎপুরুষ অর্থ-তার সম্পর্কিত পুরুষ। তৎপুরুষ শব্দটিতে যে রকম সমাস হয়েছে, সে প্রকারের সমাসকে তৎপুরুষ সমাস বলে।
তৎপুরুষ সমাসের প্রকারভেদঃ
১. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস — স্বকে গত = স্বগত;
২. তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস — হাত দ্বারা ছানি = হাতছানি।
৩. চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস — ডাকের জন্য মাশুল = ডাকমাশুল:
৪. পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস –বিলাত থেকে ফেরত = বিলাতফেরত।
৫. যষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস—ধানের ক্ষেত = ধানক্ষেত:
৬. সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস—মাথায় ব্যথা =মাথাব্যথা:
৭. অলুক তৎপুরুষ সমাস — চোখের বালি= চোখেরবালি:
৮. নঃ তৎপুরুষ সমাস— নেই ঈমান =বেঈমান।
৯. উপপদ তৎপুরুষ সমাস — ধামা ধরে যে = ধামাধরা।
১০. প্রাদি তৎপুরুষ সমাস প্র (প্রকৃষ্ট) ভাত = প্রভাত।
অব্যয়ীভাব সমাস কাকে বলে ? অব্যয় পদ আগে বসে যে সমাস হয় এবং যে সমাসে পূর্বপদের অর্থ প্রাধান্য পায় তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
অব্যয়ীভাব সমাস বিভিন্ন অর্থে প্রকাশ পায়-
সামীপ্য অর্থে- কন্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ:
পশ্চাৎ অর্থে- তাপের পশ্চাৎ = অনুতাপ।
সাদৃশ্য অর্থে- জেলার সদৃশ = উপজেলা:
বিপরীত অর্থে- বাদের বিপরীত = প্রতিবাদ:
অভাব অর্থে- আমিষের অভাব নিরামিষ:
বীপ্সা অর্থে- দিন দিন = প্রতিদিন।
ঈষৎ বা সামান্য অর্থে ঈষৎ নত= আনত।
পর্যন্ত বা ব্যাপ্তি অর্থে জীবন পর্যন্ত = আজীবন।
প্রতিনিধি অর্থে- বিম্বের প্রতিনিধি = প্রতিবিম্ব।
অনতিক্রম্যতা অর্থে- সময়কে অতিক্রম না করে = যথাসাধ্য:
অতিক্রম্যতা অর্থে- শৃঙ্খলাকে অতিক্রম করে = উচ্ছৃঙ্খল।
সমাসের প্রয়োজনীয়তাঃ
সমাস শব্দ গঠনের অন্যতম মাধ্যম। তাই ভাষার সংক্ষিপ্ততা, শ্রুতিমাধুর্য, সৌন্দর্যবৃদ্ধি, অলঙ্করণ, পরিভাষা তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমাসের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
- সমাস কয়েকটি পদকে একপদে পরিণত করে বলে অল্প পরিসরে অনেক ভাব প্রকাশ করা যায়। স্বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল অক্ষর কথাটিকে সংক্ষেপ করে সমাসবদ্ধ পদ হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে রূপান্তরিত করলে আকৃতিগত সংক্ষিপ্ততা যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি শুনতেও মধুর লাগে।
- সমাস ভাষাকে সহজ ও সরল করে।
- সমাস ভাষাকে সংক্ষিপ্ত করে বলে অল্প কথায় অনেক ভাব প্রকাশ করা যায়।
- বক্তব্য সংক্ষিপ্ত হলে তা অর্থবহ, তাৎপর্যময়, ও ব্যঞ্জনাময় হয়ে থাকে।
- বক্তব্য বিষয় অনাবশ্যকভাবে বড় না করে ছোট আকারের পদে প্রকাশ করলে বক্তব্যের সৌন্দর্য বাড়ে। আর এটা সমাসের দ্বারা করা সম্ভব। যেমন- সিংহ চিহ্নিত আসনে উপবেশন করে আছেন যে রাজা না বলে বলা যায় সিংহাসনে বসা রাজা যে ফুল পঙ্কে জন্মে না বলে বলা যায় পঙ্কজ: তিনটি বাহু দ্বারা রচিত ক্ষেত্র না বলে বলা যায় ত্রিভুজ।
- এতে নতুন পরিভাষাও সৃষ্টি হয়। এভাবে নতুন নতুন শব্দ গঠনের ক্ষেত্রে সমাসের অপরিসীম দক্ষতা রয়েছে।
- নতুন শব্দ তৈরির মাধ্যমে ভাষাকে জীবন্ত করে রাখতে হলে সমাসের চর্চা করতে হবে।
শেষে বলা যায় সমাসের ব্যবহারে বাক্য সরল গাঢ়বদ্ধ সৌষ্ঠবময় ও ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। ফলে বাক্য শ্রুতিমধুর ও শালীনতা সম্পন্ন হয়ে মনোমুগ্ধকর হয়।
প্রশ্নঃ সমাস মূলত চারি প্রকার আলোচনা কর।
উত্তর: পরস্পর অর্থসংগতিযুক্ত দুই বা ততোধিক পদের এক পদে মিলিত হওয়াকে সমাস বলে।
যেমন-
সিংহ চিহ্নিত যে আসন = সিংহাসন।
রাজার পুত্র = রাজপুত্র।
সমাস সাধারণত ছয় প্রকার। যেমন-
দ্বন্দ্ব, দ্বিগু, বহুব্রীহি, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, ও অব্যয়ীভাব সমাস।
তবে বাংলা ভাষার সমাসবদ্ধ পদগুলোকে ব্যাসবাক্যের আলোকে বিচার করলে দেখা যায় পদগুলোতে
কখনো পূর্বপদের অর্থ প্রাধান্য পায়,
কখনো পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়,
কখনো উভয়পদের অর্থ প্রাধান্য পায়,
আবার কখনো উভয়পদের কোনোটিরই অর্থ প্রাধান্য না পেয়ে তৃতীয় কোনো অর্থ প্রকাশ পায়।
এভাবে পূর্বপদ ও পরপদের অর্থ প্রাধান্যের দিক থেকে বিচার করলে বাংলা ভাষার সমাসবদ্ধ পদগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
ক) পূর্বপদের অর্থ-প্রধান সমাস-অব্যয়ীভাব সমাস
আমিষের অভাব = নিরামিষ। কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ।
খ) পরপদের অর্থ-প্রধান সমাস তৎপুরুষ সমাস
ঘি দ্বারা মাখা = ঘি-মাখা: বাক্সে বন্দী = বাক্সবন্দী;
গ) উভয় পদের অর্থ-প্রধান সমাস –দ্বন্দ্ব সমাস
মা ও বাবা = মা-বাবা; পথে ও ঘাটে = পথে-ঘাটে;
ঘ) তৃতীয় কোনো ভিন্ন অর্থ প্রধান সমাস বহুব্রীহি সমাস
বিনয়ের সাথে বর্তমান= সবিনয় পাপে মতি যার= পাপমতি।
ডঃ এনামুল হক এ শ্রেণীবিভাগ করেছেন এবং পরপদের অর্থ-প্রাধান্যের জন্য দ্বিগু ও কর্মধারয় সমাসকে তিনি তৎপুরুষ সমাসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। সমাস গঠনের মূল যেহেতু দুটি মাত্র পদ, সেহেতু বাংলা ভাষায় সমাস মূলত উপর্যুক্ত চার শ্রেণীর বেশি হতে পারে না।
সমাসের অনেক উপশ্রেণী আছে। যেমন নিত্যসমাস, প্রাদি সমাস, নঞ সমাস, উপপদ সমাস, অলুক সমাস ইত্যাদি। কিন্তু এরা পৃথক কোনো সমাস নয়। অর্থ বিচারে এদেরকে উক্ত চার শ্রেণীর যে-কোনো এক শ্রেণীতে ফেলা যায়। অতএব, সমাস মূলত চার প্রকার।
প্রশ্ন: সন্ধি ও সমাসের মধ্যে পার্থক্য লেখ।
উত্তরঃ সন্ধি ও সমাস উভয়েই শব্দ গঠনের অন্যতম উপায়। শব্দ গঠনের অন্যতম মাধ্যম হলেও উভয়ের মধ্যে যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে। নিম্নে এদের পার্থক্যগুলো দেখানো হলো।
১. পরস্পর অর্থসংগতি বিশিষ্ট দুই বা ততোধিক পদের একপদে মিলিত হওয়াকে সমাস বলে।
যেমন- আমিষের অভাব = নিরামিষ: কণ্ঠের সমীপে = উপকণ্ঠ।
অন্যদিকে পাশাপাশি দুটি ধ্বনি বা বর্ণের মিলনকে সন্ধি বলে। সন্ধি অর্থ মিলন।
যেমন বিদ্যা + আলয়= বিদ্যালয় প্রতি +এক= প্রত্যেক।
২. সমাসে পদের মিলন হয়। যেমন রক্তে রক্তে যে যুদ্ধ = রক্তারক্তি। সন্ধিতে ধ্বনি বা বর্ণের মিলন হয়। যেমন নব+ অন্ন = নবান্ন এখানে অ এবং অ মিলে আ হয়েছে।
৩. সন্ধিতে পদগুলো ঠিক থাকে, কিন্তু সমাসে অনেকগুলো পদ মিলে একটিমাত্র পদে পরিণত হয়। যেমন-সন্ধি— শত+ এক= শতেক
সমাস — ঘরে আশ্রিত যে জামাই =ঘরজামাই।
৪. সন্ধির মিলনের ভিত্তি হলো উচ্চারণ; সমাসের মিলনের ভিত্তি হলো অর্থ।
৫. সন্ধি উচ্চারণের কাঠিন্য দূর করে লঘুতা সৃষ্টি করে। সমাসের মূল লক্ষ্য বাক্য সংক্ষেপণ ও শ্রুতিমধুরতা সৃষ্টি করা।
৬. সন্ধি শব্দকে সংক্ষেপ করে। সমাস বাক্যকে সংক্ষেপ করে।
৭. সন্ধিতে পদের বিভক্তি লোপ পায় না। হিম+ আলয়= হিমালয়। সমাসের ক্ষেত্রে বিভক্তি লোপ পায়। যেমন গাছে পাকা = গাছপাকা।
৮. সমাসে দুই পদের মাঝে সাধারণত অব্যয় পদ ব্যবহার করা হয়। সন্ধিতে দুই বর্ণের মাঝে যোগ(+) চিহ্ন ব্যবহার করা হয়।
৯. সন্ধির ভিত্তি উচ্চারণ। উচ্চারণের সময় সন্ধি নিজে নিজেই সৃষ্টি হয়। সমাস পদ সংক্ষেপণের জন্যে তৈরি করে নিতে হয়।
১০. সমাস ছয় প্রকার। যথাঃ দ্বন্দ্ব, দ্বিগু বহুব্রীহি, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, ও অব্যয়ীভাব। অন্যদিকে বাংলা শব্দে সন্ধি তিন প্রকার। যথাঃ স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গসন্ধি।
প্রশ্নঃ উদাহরণসহ উপমান, উপমিত ও রূপক কর্মধারয় সমাসের পার্থক্য লেখ।
উপমান সমাস কাকে বলে, উপমিত সমাস কাকে বলে এবং রূপক সমাস কাকে বলে – তা জানতে পারলে তাদের মধ্যে পার্থক্য সহজে বুঝা যায়।
১. উপমান কর্মধারয় সমাসে উপমান পদের সাথে সাধারণ ধর্মের সমাস হয়। উপমিত কর্মধারয় সমাসে উপমান পদের সাথে উপমেয় পদের সমাস হয়। সাধারণ ধর্মের উল্লেখ থাকে না। রূপক কর্মধারয় সমাসে উপমান ও উপমেয় পদের মধ্যে অভেদ কল্পনা করা হয়।
২. উপমান কর্মধারয় সমাসে উপমেয় পদের উল্লেখ থাকে না। সাধারণ ধর্মের উল্লেখ থাকে। এখানে পূর্বপদটি উপমান এবং পরপদটি সাধারণ ধর্মবোধক বিশেষণ হয়। উপমিত কর্মধারয় সমাসে উপমেয় পদটি সাধারণত পূর্বে বসে এবং উপমান পদটি পরে বসে। তবে এর কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ম নেই। উপমান পদ আগেও থাকতে পারে। রূপক কর্মধারয় সমাসে উপমেয় পদ পূর্বে এবং উপমান পদ পরে বসে।
৩. উপমান কর্মধারয় সমাসে সমস্যমান পদ দুটির একটি বিশেষ্য ও অন্যটি বিশেষণ। সমস্তপদটিও বিশেষণ হয়। উপমিত কর্মধারয় সমাসে সমস্যমান পদ দুটির উভয়েই বিশেষ্য। রূপক কর্মধারয় সমাসেরও সমস্যমান পদ দুটির উভয়েই বিশেষ্য।
৪. সাধারণত ন্যায়, মতো, সদৃশ ইত্যাদি ব্যাসবাক্যে ব্যবহার করে উপমান কর্মধারয় সমাস সাধন করা হয়। সাধারণত এগুলো সমস্যমান পদ দুটির মাঝখানে বসে। যেমন -হরিণের ন্যায় চপল =হরিণচপল।
উপমিত কর্মধারয় সমাসেও সাধারণত ন্যায়, মতো, সদৃশ ইত্যাদি ব্যাসবাক্যে ব্যবহৃত হয়। এগুলো সাধারণত সমস্যমান পদের শেষে বসে। তবে খাঁটি বাংলা বা তদ্ভব শব্দ হলে ন্যায় বা মতো সমস্যমান পদের মাঝে বসে। যেমন- মুখ চন্দ্রের ন্যায় =মুখচন্দ্র। কিন্তু চাঁদের মতো মুখ চাঁদমুখ। রূপক কর্মধারয় সমাসে সমস্যমান পদের মাঝে রূপ যোগ করে ব্যাসবাক্য গঠন করা হয়। যেমন- মন রূপ মাঝি =মনমাঝি।
প্রশ্নঃ বাংলায় কোনো কোনো সময় একই পদের অর্থভেদে বিভিন্ন সমাস হতে পারে। আলোচনা কর।
উত্তর: পরস্পর অর্থসংগতিযুক্ত দুই বা ততোধিক পদের এক পদে মিলিত হওয়াকে সমাস বলে।
যেমন-
সিংহ চিহ্নিত যে আসন = সিংহাসন।
রাজার পুত্র = রাজপুত্র।
সমাস সাধারণত ছয় প্রকার। যথা –
দ্বন্দ্ব, দ্বিও, বহুব্রীহি, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, ও অব্যয়ীভাব সমান।
প্রতিটি সমাসের রয়েছে নিজস্ব গঠন বৈশিষ্ট্য। তবে প্রতিটি সমাসেই ব্যাসবাক্য করা হয় অর্থভিত্তিক। পূর্বপদ ও পরপদের অর্থপ্রাধান্যের ভিত্তিতে সমাসের মান নির্ধারিত হয়। যেমন দ্বন্দ্ব সমাসে উভয় পরের অর্থ প্রাধান্য পায়, কর্মধারয়, তৎপুরুষ ও দ্বিগু সমাসে পরপদের অর্থ প্রাধান্য পায়, বহুব্রীহি সমাসে পূর্বপদ ও পরপর কোনোটিরই অর্থ না বুঝিয়ে তৃতীয় কোনো অর্থ প্রকাশ পায়, অব্যয়ীভাব সমাসে পূর্বপদের অর্থ প্রাধান্য পায়। প্রতিটি সমাস আলাদা আলাদা হলেও বাংলায় কখনো কখনো একই পদ অর্থভেদে বিভিন্ন সমাস দ্বারা সাধিত হয়। যেমন-
পীত অম্বর যার = পীতাম্বর (শ্রীকৃষ্ণ)। তৃতীয় অর্থ প্রকাশের জন্য এটি বহুব্রীহি সমাস। আবার, পীত যে অম্বর = পীতাম্বর (পীত বর্ণ বস্ত্র): পূর্বপদ বিশেষণ ধরে এবং পরপদের অর্থ বিচারে এটি কর্মধারয় সমাস।
এভাবে আরো উদাহরণ-
১. নীল যে অম্বর = নীলাম্বর (নীল বর্ণ বস্ত্র) কর্মধারয় সমাস।
নীল অম্বর যার = নীলাম্বর (বলরাম) বহুব্রীহি সমাস।
২. মিল নেই যাতে= গরমিল — নঞ বহুব্রীহি সমাস।
মিলের অভাব = গরমিল —অব্যয়ীভাব সমাস।
নেই মিল = গরমিল — নঞ তৎপুরুষ সমাস।
৩. হাতের জন্য ঘড়ি = হাতঘড়ি — চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস।
হাতে পরা হয় যে ঘড়ি = হাতঘড়ি– মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস।
৪. হায়া নেই যার= বেহায়া –নঞ বহুব্রীহি সমাস
হায়ার অভাব= বেহায়া— অব্যয়ীভাব সমাস
নেই হায়া = বেহায়া –নঞ্ তৎপুরুষ সমাস।।
এভাবে বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। এতে বোঝা যায়, বাংলায় একই পদের অর্থভেদে বিভিন্ন সমাস হতে পারে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।