সাম্যবাদী কাব্য অবলম্বনে কবি নজরুলের কবি-মানস অথবা
সাম্যবাদী কাব্যের বিষয় বৈচিত্র্য উল্লেখ করে এর শিল্পমূল্যে ও নামকরণ বিচার কর।

সাম্যবাদী কাব্য-এর কবি-মানস

সাম্যবাদী কাব্য- কাজী নজরুল ইসলাম ( কবি-মানস, বিষয়ভাবনা ও নামকরণ)

বাংলা সাহিত্য নজরুল (১৮৯৯-১৯৭৬) বিদ্রোহী কবি, মানুষের কবি, সাম্যের কবি হিসেবে পরিচিত। সাম্যবাদী কাব্য-এ (১৯২৫) কবি নজরুলের সাম্যবাদ, মানবতাবাদ ও পরোক্ষভাবে বিদ্রোহী মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। নজরুলের সাম্যবাদের উৎস মানবাতাবাদ। বিচিত্র বিষয় অবলম্বনে নজরুলের সাম্যবাদ শিল্পময় হয়ে ফুটে উঠেছে সাম্যবাদী কাব্য-এ ।

সাম্যবাদী কাব্য-এর কবি নজরুল (কবি-মানস, বিষয়ভাবনা ও নামকরণ)

নজরুলের সাম্যবাদ কোনো উগ্র রাজনৈতিক মতবাদের সাথে সম্পর্কিত নয়। এটি কবির নিজস্ব ভাবনা এবং এটি এসেছে সমাজ চেতনার অন্তস্থল থেকে ইসলামী সাম্যের প্রভারও রয়েছে। কবি আস্তিক্য সাম্যবাদে বিশ্বাসী।

কবির কাছে মানুষই বড়। মানবাত্মার মুক্তির জন্যই তিনি বিদ্রোহী। মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি সোচ্চার। তাই মানুষের জন্য যা অকল্যাণ, তার অবসান ঘটিয়ে সবক্ষেত্রে কবি সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে চান।

সাম্যবাদী কাব্য-এর ১১টি কবিতার মধ্যেই কবির সাম্যবাদ প্রকাশ পেয়েছে। কবি জাতি, ধর্মের বা অন্যকোনোরকম প্রভেদের প্রাচীর তুলতে রাজী নন। সাম্যবাদী কবিতায় এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে।

“সেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।”

কবির সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব অনুভব করেছেন। তাই নিজ অন্তরতলে ঈশ্বরকে খুঁজতে বলেছেন। বাইরে থেকে পাওয়া যাবে না। কবি মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব বিশ্বাসী। ‘মানুষ’ কবিতায় তাই মানুষকে অবহেলিত হতে দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। কবি মনে করেন,

“হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নেই।”

এই হৃদয়ই ‘নীলাচল’, কাশী, মথুরা-বৃন্দাবন, মদিনা, কাবা- এখানেই বসে ঈসা, মুসা পেয়েছে সত্যের পরিচয়। এই মানুষকে ভালোবেসেই শাক্যমুনি মানুষের মুক্তির জন্য রাজ্য ত্যাগ করে সাধনার পথে পা বাড়িয়েছেন। মহানবী গেয়েছেন ‘কোরানের সাম-গান’। এই লাঞ্ছিত, অবহেলিত, মানুষের মাঝে জন্ম নিতে পারে কোনো মহামানব। তাই কবির ঘোষণা-


মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।


পাপী-তাপী, চোর-ডাকাত, বারাঙ্গনা সকলের প্রতি কবির সহানুভূতি সমান। সমাজ ও সভ্যতার পুরুষের ন্যায় নারীর অবদানকেও কবি স্বীকৃতি দিয়েছেন।

উপেক্ষিত ও নির্যাতিত মানুষের প্রতি সহানুভূতি এবং মানুষের লাঞ্ছনা ও অবমাননা কবিকে যেভাবে বিচলিত করেছে, নজরুলের আগে বা সমকালে বাংলা সাহিত্যে অন্য কোন কবিকে সেভাবে বিচলিত করে নি। বিভিন্ন কবিতার মধ্যে কবি মানুষের বঞ্চনা ও বেদনার যথাযথ চিত্রকল্প চিত্রিত করেছেন। কবির এ সহানুভূতির সাথে ইংরেজি সাহিত্যের শেলী, বায়রন ও হুইটম্যানের সাদৃশ্য রয়েছে।

নজরুলের অন্যান্য কাব্যে মতো সাম্যবাদী কাব্যতেও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্যকে অনায়াসে ব্যবহার করেছেন। কবি। জগতের সকল ধর্মের, সকল জাতের কথাও এসেছে। পরাধীনতার বন্ধন মোচনের জন্য কবির কামনাও ছিল হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য। কবির অসাম্প্রদায়িক ও ঐতিহ্যবোধের প্রকাশÑ

দেখো চাষারূপে লুকিয়ে বলরাম এলো কি না,
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণীÑ যা আছে, রবে চিরকাল।

নজরুল কাব্যে ‘প্রকৃতি’, ‘পাঠক’, শত্রু-মিত্র সকলকেই প্রায় ক্ষেত্রে ‘বন্ধু’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। সাম্যবাদী কাব্যেও তার প্রকাশ পেয়েছে। পাঠককে ‘বন্ধু’ সম্বোধনÑ

বন্ধু, যা খুশী হও,
পেটে-পিঠে, কাঁধে-মগজে যা খুশী পুথি ও কেতাব বও।
(সাম্যবাদী)

‘কুলি-মজুর’ কবিতায় বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ ও মৈত্রী প্রকাশ পেয়েছে। কবি বিশ্বের সকল মানুষকে ভেদাভেদ ভুলে সাম্যের পতাকাতলে আসতে বলেছেন।

নজরুল বিদ্রোহের কবি, বিপ্লবের কবি, সাম্যের কবি। তাই তাঁর ভাষা স্বাভাবিকভাবেই বেগবান, শানিত, সংগ্রাম মুখর ও বলিষ্ঠ। সাম্যের প্রতিষ্ঠা, অন্যায়-অত্যাচারের অবসান, নিপীড়িত ও বঞ্চিতদের জয় কামনা কবির সাম্যবাদের মূল বৈশিষ্ট্য। এ ভাববস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই কবি শব্দ, ছন্দ, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, অনুপ্রাস ইত্যাদি ব্যবহার করে সাম্যবাদী কাব্যকে শিল্পমন্ডিত করে তুলেছেন।

কবি দেশি-বিদেশি, তৎসম, তদ্ভব, আরবি-ফারসি প্রভৃতি শব্দ স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করেছেন।
মুসলিম ঐতিহ্যমূলক শব্দ –
কোরান, মদিনা, কাবা, মসজিদ, মুসাফির, মোল্লা, আজারির ইত্যাদি।

হিন্দু ঐতিহ্যমূলক শব্দ:
গীতা, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন, বেদ-বেদান্ত, বলরাম, সীতা, জনক ইত্যাদি।
বৌদ্ধ ঐতিহ্য: কনফুসিয়াস, চার্বাক, নানক কবীর, গ্রন্থসাহেব, বাইবেল, প্লুটো ইত্যাদি।

রসসৃষ্টির প্রয়োজনে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার-

প্রাইভেট সেক্রেটারী, ট্রেডমার্কার ইত্যাদি।

বাস্তব জীবন থেকে সংগৃহীত আটপৌরে খাঁটি গ্রাম্য ও কথ্য ভাষার সঙ্গে তৎসম ও তদ্ভব শব্দের দুঃসাহসিক প্রয়োগ;

তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লাÑ “ভ্যালা হল দেখি লেঠা।”
(মানুষ)


কাব্যদেহকে শ্রুতিমধুর, রসাপ্লুত ও হৃদয়গ্রাহী করে তুলতে শব্দালংকার ও অর্থালিংকারের সার্থক প্রয়োগ করেছেন কবি।
অনুপ্রাস: যত হাতাহাতি হাতে হাতে রেখে মিলিয়াছে ভাই ভাই।
উপমা: তবু জগতের যত পবিত্রগ্রন্থ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়।
উৎপ্রেক্ষা: সুন্দর বসুমতী
চিরযৌবনা, দেবতা ইহার শিব নয়-কাম রতি। (পাপ)

সমাসোক্তি: মাঠে মাঠে কাঁদে বাঁশি। (পাপ) ]
রূপক: কোথা ভেসে গেল সংযম-বাঁধ রাবণের বেড়া টুটে প্রাণ ভয়ে গিয়ে মাটির মদিরা ওষ্ঠ-পুষ্প-পুটে। (পাপ)

সাম্যবাদী কাব্যের সবকটি কবিতাই মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লেখা। তবে মাঝে মাঝে ৪ পর্বের পংক্তির পরে ২ পর্বের পংক্তি দিয়েছেন। কবিতার মধ্যে কবি উক্তি প্রত্যুক্তির মধ্যে দিয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। তবে কোথাও ছন্দ-পতন নেই।

পরিশেষে, সাম্যবাদী কাব্যে কবির মানবতাবাদের ফসল। তাঁর সাম্য আসলে মানুষের সাম্য। দেশের স্বাধীনতা মানে মানুষের সার্বিক স্বাধীনতা। মানুষের অবমাননা তাঁকে পীড়িত করেছে বলেই তিনি বিদ্রোহী। কবির সাম্য কোনো ‘ইজমে’র দ্বারা প্রভাবিত নয়। তবে তা সার্বজনীন, আন্তর্জাতিকতায় ঋদ্ধ। মানুষকে বড় করে দেখা, মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তির জয় ঘোষণা, ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে স্বীকৃতি প্রদান, মানব হৃদয়কে সকল তীর্থক্ষেত্রের উপরে স্থান দেওয়া, পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা করা, নারীর অবদানের স্বীকৃতি, রাজা-প্রজার ব্যবধান দূর করা, কুলি-মজুরদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের প্রতি লাঞ্ছনার প্রতিবাদ করা, বারাঙ্গনাদের মানবসত্তাকে স্বীকৃতি দেওয়া ইত্যাদি নজরুলের সাম্যবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য আর কবি উপযুক্ত শব্দ, ভাষা ও প্রকরণশৈলীতে তার বক্তব্যকে শিল্পময় করে তুলেছেন।

প্রশ্নঃ সাম্যবাদী কাব্যের নামকরণের সার্থকতা বিচার কর।

নামে কিবা আসে যায়’- এ কথা শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে চলে না। নাম দিয়েই তো যায় চেনা। বিশ্বের সকল সৃষ্টির মধ্যে কিশেষত্ব, স্বাতন্ত্র্য রক্ষার্থে বা একজাতীয় বহুর মধ্যে বিশেষভাবে চিহিৃত করার জন্য নামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। অবশ্য মানুষের নামের সাথে তার ব্যবহার কার্যের মিল অনেক ক্ষেত্রে মেলে না। কানা ছেলের নাম ‘পদ্মলোচন’ বোবা মেয়ের নাম সুভাষিনী, কালো মেয়ের নাম জোছনা, চঞ্চল প্রকৃতির ছেলের নাম শান্ত এ রকম পারে। কিন্তু শিল্পকর্মের নাম তাৎপর্যমন্ডিত ও গুরুত্ববহ। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের নামকরণ কতটা তাৎপর্যমন্ডিত তা বিচারের প্রয়াস নেব।

শিল্পকর্মের নাম দর্পনের মতো। শিশির বিন্দুতে যেমন সূর্য প্রতিবিম্বিত হয়, তেমনি শিল্পের মৌল উপজীব্য ধরা পড়ে নামের আধারে। তাই নামকরণ একটি আর্ট। শিল্পকর্মের নামকরণ করা হয়ে থাকে কাহিনীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যঅনুসারে, নায়ক বা নায়িকা বা কেন্দ্রীয় চরিত্রের নামানুসারে, স্থান-কাল বিষয় অনুসারে, আবার কখনো মূল উপজীব্য বিষয়ের প্রতীকী অনুসারে।

কবি নজরুলের কাব্য প্রেরণার মৌল প্রত্যয় হলো মানবতাবাদ। আর এ মানবতাবোধই কবির সাম্যবাদের ভিত্তি। ‘সাম্যবাদী’ কাব্যের প্রতিটি কবিতার মধ্যেই কবির সাম্যবাদী দৃষ্টি ভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। সে হিসেবে বলা যায় যে, কবি তার কবিতা তথা কাব্যের বিষয়বস্তুর তাৎপর্যের উপর ভিত্তি করেই সাম্যবাদী কাব্যের নামকরণ করেছেন ‘সাম্যবাদী’। এবার এ নামকরণ কতটুকু তাৎপর্যবহ তা বিচার করে দেখা যেতে পারে।

কবি নজরুল মূলত মানবতাবাদী কবি। এ মানবতাবাদের কারণে তিনি যেমন বিদ্রোহী, তেমনি সাম্যবাদী। গভীর ও ঘনিষ্ঠ মানবতাবোধই এ সাম্যবাদের ভিত্তি। নজরুলের সাম্যবাদ তাঁর অন্তরেরই প্রেরণালব্ধ জিনিস এবং নিজস্ব

পরিকল্পনার রঙ্গে রঙ্গিণ। তিনি মানুষের বেদাভেদ স্বীকার করেন নি। নর-নারীর মধ্যে কোনো অধিকার বৈষম্য মানেন না, মানবধর্মই তাঁর কাছে বড়। তাঁর সাম্যবাদে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে এবং তা মানুষের মধ্যেই বিদ্যামান। মানুষের প্রতি অত্যাচার শোষণ তিনি সইতে পারেন না। এমন কি ধর্মের নামেও মানুষকে ছোট করা সহ্য করেন নি। তিনি মানুষে মানুষে ভেদ ব্যবধান ও বৈষম্যের অবসান কামনা করেছেন। তিনি সাম্যের গানই গেয়েছেন ‘সাম্যবাদী’ কাব্যে।

‘সাম্যবাদী’ কাব্যের নামভূমিকা স্বরূপ কবিতা ‘সাম্যবাদী’ কবিতার মধ্যেই কবির কাব্যরচনার মৌল প্রত্যয় ধরা পড়েছে। প্রতিটি কবিতার মধ্যেই এ প্রতয় প্রকাশ পেয়েছে।

গাহি সাম্যের গান
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,
যেখানে মিশিছে হিন্দু বৌদ্ধ মুসলিম ক্রীশ্চান।

কবি মনে করেন মানুষের হৃদয়ই বড় কাবা। মানুষের দেহ-মনই স্রষ্টার ভজনালয়। সাম্যের প্রশ্নে জাতি-ধর্মের ব্যবধান নেই। মানবতার জয়গানে মুখরিত প্রতিটি কবিতা। মানুষকে ঘৃনা করা অন্যায়। পাপী-তাপী সবাই তাঁর কাছে সমান। যত পাপী তাপী সব মোর বোন, সব হয় মোর ভাই।

পুরুষশাসিত সমাজে নারীর লাঞ্ছনা, অপমান, অবহেলা মেনে নিতে পারেন নি। কেননা-
বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর।
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
‘নারী’ কবিতায় কবি নারী পুরুষের সাম্যের কথা ব্যক্ত করেছেন।

‘ঈশ্বর’ কবিতায় কবি বলেছেন যে, বনে জঙ্গলে বা কিতাব পুঁথিতে ঈশ্বরকে পাওয়া যাবে না। ঈশ্বর মানুষেই বিরাজিত। তাই কবি বলেন-
শাস্ত্র না ঘেঁটে ডুব দাও সখা, সত্য সিন্ধু জলে।

নজরুলের সাম্যবাদের চরম পরমরূপ ধরা পড়েছে ‘মানুষ’ কবিতায়। কবি ঘোষনা করেছেন।
“মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান”।

ধর্মের নামে ক্ষুধাতুর মানুষের উপর মসজিদের ঈমামের অবমাননাকর ও অবহেলায় তিনি ক্ষেপে উঠেছেন। মানুষকে উপেক্ষা করা তাঁর পক্ষে অসহ্য। কেননা এই উপেক্ষিত মানবের মধ্যে থেকেই এমন একজন আসবে, যার বানী শুনে পৃথিবী স্তম্ভিত হবে।

সাম্যবাদী কবি চন্ডাল বা রাখাল, কুলি-মজুর, সবাইকে সমান চোখে দেখেছেন। কেননা-
রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও হেলা কাহারে কাজে
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে।

এই অবহেলিত মানুষের শ্রমের বিনিময়ে এই সভ্যতার জন্ম হয়েছে।

‘সাম্য’ কবিতায় কবি স্বপ্নের দেশ, আদর্শ দেশের কল্পনা করেছেন। এমন দেশ যেখানে রাজা প্রজা, ধনী দরিদ্রের ভেদাভেদ নেই। নেই বর্ণ বৈষম্য, সাদা ও কালোদের জন্য আলাদা গোরস্থান বা গির্জা নেই। ধর্ম ও শাস্ত্রের ভেদ নেই।

সাম্যবাদী কাব্যের বিভিন্ন কবিতায় কবির যে সাম্যবাদী দর্শন প্রকাশ পেয়েছে, তার সব সংক্ষেপ করলে যে কয়েকটি দিক ভেসে ওঠে তাহলে সাম্যের সঙ্গে জাতি ধর্মের কোনো ভেদাভেদ নেই, ঈশ্বর মানুষের মধ্যেই বিরাজিত। তাই মানুষের হৃদয়ই বড় কাবা-মন্দির, সেখানেই ঈশ্বরের ভজনালয় অবস্থিত। মানুষ সেখানে শ্রেষ্ঠ। সাধারণ মানুষের মধ্যে অসাধারণ শক্তির সম্ভাবনায় কবি বিশ্বাসী। পাপী, তাপী ও বারাঙ্গনার মধ্যেও মনুষ্যত্বের বিকাশ চান। পুরুষের পাশাপাশি নারীর অবদানকে স্বীকার করেন। তাই নারী পুরুষের সাম্য চান তিনি। রাজা প্রজায় কোনো প্রভেদ দেখেন না। কবি শুধু সাম্যের প্রত্যাশাই নন। তিনি সাম্যের প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার। তাই ঘোষনা করেছেন-

খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা ?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা।

কবি আরও বলেছেন-
আসিতেছে শুভদিন-
দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।
(কুলি-মজুর)
কবি প্রত্যাশাও করেন তা-ই+কেননা-
এ আশা মোদের দুরাশাও নয়,
সেদিন সুদূরও নয়
সমবেত রাজকন্ঠে যেদিন শুনিব প্রজার জয়।
(রাজা-পুজা)

আলোচনা শেষে একথা নিঃসন্দেহ যে কবি একাব্যের বিভিন্ন কবিতার মধ্যে সাম্যের কথা বলেছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হোক সে কামনাও করেছেন। সাম্যের জন্য জাগরনী গানও গেয়েছেন। সাম্য ছাড়া মানবতার নয় সম্ভবও নয়। সাম্যবাদী কাব্যের মূল সুর সাম্যবাদ। তাই বলা যায় এ কাব্যের ‘সাম্যবাদী’ নামকরণ যথেষ্ট অর্থবহ এবং তাৎপর্যমন্ডিত।

প্রফসের মো: আখতার হোসনে
বাংলা বভিাগ
সরকারি মাইকলে মধুসূদন কলজে, যশোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *