প্রমথ চৌধুরীর সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের মূল বক্তব্য বিশ্লেষণ।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধ

প্রমথ চৌধুরী

‘সবুজপত্রে’র সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান। বাংলা প্রবন্ধ- সাহিত্যে তিনি নতুন পথের পথিক। তাঁর লেখায়, চিন্তায়, বাচনে, প্রকাশভঙ্গিতে, বিষয়বস্তুর উপস্থাপনায় একটি নতুন মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

তিনি চিন্তাশীল ও মননধর্মী লেখক। তাঁর প্রবর্তিত রচনারীতি ‘বীরবলী ঢং’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। প্রবন্ধরীতিতে তিনি বৈঠকী মেজাজ, ব্যঙ্গ বিদ্রƒপের দ্যোতনা ও কথ্য ভাষার প্রয়োগে অতি সাধারণ বিষয়কে গাম্ভীর্যপূর্ণ আর গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়কে হালকা করে প্রকাশ করে প্রাণের সঞ্চার করেছেন। আমাদের সমাজে ও সাহিত্যে যে জড়তা, স্থবিরতা, অকালবৃদ্ধতা পাকাপোক্তভাবে আসন লাভ করেছিল প্রমথ চৌধুরী তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রবন্ধকারের যুক্তিনিষ্ঠ মতামত বিচিত্র বিষয় অবলম্বনে বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধের মধ্যে লেখকের সাহিত্য চর্চার আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট মতামত প্রকাশ পেয়েছে।

সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে সাহিত্যের উদ্দেশ্য ও সাহিত্য চর্চার আদর্শ সম্পর্কে লেখকের যে অভিমত তা যেমন যুক্তিনির্ভর, তেমনি হৃদয়গ্রাহ্য। তিনি মনে করেন সাহিত্য লেখকের অন্তরের অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। কোন সাহিত্যিকই উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে কিংবা নগদ প্রাপ্তির প্রত্যাশায় সাহিত্য সষ্টি করেন না।

তাঁর মতে যে লেখক সাহিত্য ক্ষেত্রে ফলের চাষ করতে ব্রতী হন বা যিনি কোনরূপ কার্য উদ্ধারের অভিপ্রায়ে লেখনি ধারণ করেন, তিনি গীতের মর্মও বোঝেন না, গীতার ধর্ম ও বোঝেন না। স্বয়ং ভগবানই বলেছেন যে তাঁর কোন কিছুর অভাব নেই, তবু তিনি সৃষ্টি করে চলেন। সৃষ্টি তাঁর কাছে আনন্দের লীলামাত্র।

খোলা পাতা বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষামূলক ব্লগ

সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে আরও বলেছেন – লেখকের সৃজনের মূলে কোনোরকম অভিপ্রায় থাকে না। সে সৃষ্টির মূল হলো অন্তরাত্মার স্ফূর্তি এবং তার ফল আনন্দ। অর্থাৎ শুধু আনন্দ লাভের জন্যই লেখক সাহিত্য সৃষ্টি করেন, অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয়। সহজ কথা সাহিত্য সৃষ্টি জীবাত্মার লীলামাত্র এবং সে লীলা বিশ্বলীলার অন্তর্ভূক্ত। কেননা, জীবাত্মা পরমাত্মার অঙ্গ এবং অংশ।

প্রমথ চৌধুরী মনে করেন যে, সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেয়া, কারো মনোরঞ্জন করা নয়। এখানে মনে রাখতে হবে সবাইকে আনন্দ দেয়অ আর কারো মনোরঞ্জন করা এক কথা নয়। সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে এটা মনে রাখা দরকার। যারা এ প্রভেদের কথা মনে রাখেন না, তারা নিজেরা খেলা না করে অন্যের জন্য খেলনা তৈরি করতে বসেন। আর পাঠক সস্তা খেলনা পেয়ে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।


পরের মনোরঞ্জন করতে গেলেও সাহিত্য স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে তার প্রমাণ বাংলাদেশে দুর্লভ নয়। লেখকের এ সম্পর্কিত মন্তব্যটি পাঠককে অভিভূত করে।

সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে তিনি বলেছেন “কাব্যের ঝুমঝুমি বিজ্ঞানের চুষিকাঠি, দর্শনের বেলুন, রাজনীতির রাঙালাঠি, ইতিহাসের ন্যাকড়ার পুতুল, নীতির টিনের ভেঁপু এবং ধর্মের জয়ঢাক এইসব জিনিসে সাহিত্যের বাজার ছেয়ে গেছে।” সাহিত্য রাজ্যে খেলনা পেয়ে পাঠকের মনস্তুষ্টি হতে পারে, কিন্তু তা গড়ে লেখকের মনস্তুষ্টি হতে পারে না। কারণ খেলন যত দামিই হোক ফেলনা হতে হতে সময় লাগে না।

দেশিই হোক আর বিদেশিই হোক বেশি দিন তা কারো মনোরঞ্জন করতে পারে না। এ কারণে পাঠককে যাঁরা আনন্দ দিতে চেষ্টা করেন, তাঁরা প্রায়শই বেদনাবোধ করেন। প্রমথ চৌধুরী মনে করেন এ বেদনা আনন্দের একটা অপরিহার্য আঙ্গ। কারণ “কাব্য জগতে যার নাম আনন্দ, তারই নাম বেদনা।”

সাহিত্যের পাঠক জনসাধারণ। মনোরঞ্জনের প্রশ্ন আসলে আমাদেরকে অতি সস্তা খেলনা তৈরি করতে হবে, নইলে বাজারে কাটবে না এবং সস্তা করার অর্থ খেলো করা। তিনি মনে করেন “বৈশ্য লেখকের পক্ষেই শুদ্র পাঠকের মনোরঞ্জন করা সংগত”। অতএব আর যাই করা হোক না কেন সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে পাঠকের মনোরঞ্জন করতে যাওয়া উচিত নয়।

সাহিত্যের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পন্ডিতদের মধ্যে অনেক বাকবিতন্ডা হয়েছে। সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে প্রমথ চৌধুরীর মতামত অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তিনি মনে করেন সাহ্যিতের উদ্দেশ্য মানুষকে শিক্ষা দেয়া নয়। শিক্ষা দেন শিক্ষক সাহিত্য সৃষ্টি করেন সাহিত্যিক।

কবির মতিগতি শিক্ষকের মতিগতির সম্পূর্ণ বিপরীত। তাছাড়া শিক্ষা ও সাহিত্যের ধর্ম-কর্ম ও এক নয়। শিক্ষা হচ্ছে সেই বস্তু যা লোকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও গলাধঃকরণ করতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে কাব্য রস লোকে শুধু স্বেচ্ছায় নয়, সানন্দে পান করে।

শিক্ষার উদ্দেশ্য মানুষের মানকে বিশ্বের খবর জানানো, আর সাহিত্যের উদ্দেশ্য মানুষের মনকে জাগানো। অপরের মনের অভাব পূর্ণ করার উদ্দেশ্যেই শিক্ষকের হাতে শিক্ষার জন্ম। আর কবির নিজের মনের পাঠপূর্ণতা হতেই সাহিত্যের উৎপত্তি। লেখক মনে করেনÑসাহিত্যের উদ্দেশ্য আনন্দ দান করা, শিক্ষাদান করা নয়।

সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে এ প্রসঙ্গে লেখক সুন্দর উদাহরণ দিয়েছেন বালামীকি আদিতে মুনি-ঋষিদের জন্য রামায়ণ রচনা করেছিলেন জনগণের জন্য নয় মুনি-ঋষিদের শিক্ষা দেয়া কবির ঋষিরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে তাদের যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আনন্দ সাধারণ পাঠক ও পেয়েছিল বলে তা আজ অমর হয়ে আছে। অপরপক্ষে লাখে একজনও যে যোগবিশিষ্ট রামায়ণের ছায়া মাড়ান না, তার কারণ সে বস্তু লোককে শিক্ষা দেবার উদ্দেশ্যে রচিত হয়েছিল, আনন্দ দেবার জন্য নয়।

বর্তমানকালে সাহিত্যর্চ্চা যে করেছে তার কারণ হিসেবে লেখক বলেছেন যে লেখক এবং পাঠকদের মধ্যে স্কুল মাষ্টার দাঁড়িয়ে। স্কুল মাষ্টারেরা একালে সাহিত্যের ভার নিয়েছেন কাব্য পড়বার এবং বোঝাবার জিনিস, কিন্তু স্কুল মাষ্টারের কাজ হচ্ছে বই পড়ানো এবং বোঝানো।

ফলে স্কুল-ঘরে বসে এ যুগের পাঠকেরা কাব্যের রূপ দেখতে পায় না, শুধু কাব্যের গুণ শুনতে পায়। টীকা-ভাষ্যের প্রসাদে কাব্য সম্বন্ধে সকল নিগূঢ় তত্ত্ব মুখস্থ হয়, কিন্তু কাব্য কী বস্তু তা আর চেনা হয় না। স্কুল মাষ্টারের দৌরাত্ম্যে পাঠকের সাথে কবির মনের মিলন আর হয়ে ওঠে না।

সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে লেখক বলেছেন যে, সাহিত্য শিক্ষার ভার নেয় না, কেননা মনোজগতে শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কবির কাজের ঠিক উল্টো। কারণ কবির কাজ হচ্ছে কাব্য সৃষ্টি করা, আর শিক্ষকের কাজ হচ্ছে প্রথমে তা বধ করা, তারপরে তার শবচ্ছেদ করা এবং ঐ উপায়ে তার তত্ত্ব আবিষ্কার করা ও প্রচার করা।

এসব বিবেচনা করে প্রমথ চৌধুরী নির্ভয়ে ঘোষণা করেছেনÑ“কারোও মনোরঞ্জন করা ও সাহিত্যের কাজ নয়, কাউকে শিক্ষা দেওয়াও নয়। সাহিত্য ছেলের হাতের খেলনাও নয়, গুরুর হাতের বেতও নয়।”

পরিশেষে বলা যেতে পারেÑলেখকের সুস্পষ্ট মতামত, আনন্দই হচ্ছে সাহিত্যের মৌল উপাদান। Arts forarts sake নীতিকে সাহিত্যের আদর্শ বলে মনে করেন। সাহিত্যের আদর্শ ও উদ্দেশ্য জিনিসচি অনুভূতিসাপেক্ষ, তর্কসাপেক্ষ নয়। সাহিত্যে মানবাত্মা খেলা করে এবং সেই খেলার আনন্দ উপভোগ করেন।

তিনি মনে করেন খেলাধুলার মাঠে দেশ-কাল-পাত্র ভেদাভেদ নেই। রাজা-প্রজা সবাই একত্রে অংশগ্রহণ করতে পারে। খেলাধুলা যেমন সবাইকে আনন্দ দেয় তেমনি সাহিত্যের উদ্দেশ্য সবাইকে আনন্দ দেয়া। লেখকের মন্তব্য হলো যে, সাহিত্যিককে খেলা মনে করে সাহ্যিজগতে প্রবেশ করতে হবে এবং খেলা করার আকাঙ্খা নিয়ে সাহিত্য জগতে প্রবেশ করলে সফলতা অর্জন অবশ্যম্ভাবী। সাহিত্যে খেলা প্রবন্ধে লেখক স্পষ্ট ভাষায় সাহিত্যের উদ্দেশ্য ও সাহিত্য চর্চার স্বরূপ তুলে ধরেছেন।

প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

4 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *