সুভাষণ ভাষাকে শ্রুতিমধুর করে সভ্যসমাজের উপযোগী করে তোলে।
শব্দের অর্থকে মনে করা হয়ে থাকে নাম ও তাৎপর্যের মধ্যে বিরাজমান পাবম্পরিক সম্পর্ক বলে। শব্দের এই অর্থকে ভাষাবিজ্ঞানের যে অধ্যায়ে বিশ্লেষণ ও আলোচনা করা হয় তাকে অর্থবিজ্ঞান, বা বাগর্থবিজ্ঞান বলে। ভাষার বিজ্ঞান যেমন ভাষা বিজ্ঞান, তেমন অর্থের বিজ্ঞান হলো অর্থবিজ্ঞান।
শব্দ বস্তু বা ভাবের বোধক। শব্দকে বিশ্লেষণ করলে তার মূল অর্থকে পাওয়া যায়। মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির সাথে সাথে বস্তুজগৎ এবং ভাবজগতের পরিসীমাও বেড়েছে। ফলে একই শব্দ একাধিক বস্তু বা ভাবের বোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ শব্দের অর্থ পরিবর্তন ঘটেছে। বাগর্থবিজ্ঞান শব্দার্থের পরিবর্তন বিচার বিশ্লেষণ করে।
শব্দের অর্থ পরিবতনের প্রক্রিয়া বহু ও বিচিত্র। এর মাঝে গুরুত্বপূর্ণগুলো হচ্ছে, প্রসারণ, সংকোচন, আলংকারিক প্রয়োগ, দ্যোতিতবদল, উন্নতি, অবনতি ইত্যাদি। সুভাষণ অর্থ অবনতির অন্তর্ভূক্ত। অর্থ পরিবর্তনের রয়েছে নানাবিধ কারণ। যেমন ভিন্ন পারিবেশিক কারণ, মনোবিষয়ক কারণ, আলঙ্কারিক কারণ, সামাজিক-ভৌগোলিক কারণ, ঐতিহাসিক কারণ। আলোচ্য বিষয়টি মনোবিষয়ক কারণের অন্তর্গত।
সংজ্ঞা: ‘কদর্থক (অশোভন, অশুভ, অমার্জিত প্রভৃতি) শব্দের বদলে সদর্থক শব্দ ব্যবহারকে বলা হয় সুভাষণ।’ (হুমায়ুন আজাদ)
মানুষ প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন শব্দ ব্যবহার করে মনের ভাব অপরের কাছে প্রকাশ করে। মানুষ তার পরিবেশকে যেমন সভ্যতা দান করেছে, তেমনি মনের ভাবকেও সভ্যতা দিতে চায়। মানুষ তার আচার-আচরণ, চলা-বলাকে সব সময় শোভনতার আবরণে মোড়াতে চায়। তাই দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত অসভ্য-কুসভ্য শব্দকে সভ্য-ভব্য ও সুন্দর করে প্রকাশ করতে চায়। তখন আশ্রয় নেয়ে এর ।
এটি মানেই ভাষার কুশ্রীকে সুশ্রী দান। তাই এটি সামগ্রিকভাবে ভাষাকে সুন্দর করে তোলে। অনেক শব্দ রয়েছে, যা শোভন পরিবেশে ব্যবহার করতে দ্বিধা হয় বা ব্যবহার করা যায় না। অনেক শব্দ রয়েছে যা এমন অশুভ অকল্যাণ জ্ঞান করে যে মানুষ সে-শব্দ উচ্চারণ করতে চায় না। মানুষ সুভাষণের আশ্রয় নিয়ে সদর্থক করে তোলে। দেখা যায় ভয়ংকর বা ক্ষতিকর কারো নামের বিকল্পে ব্যবহার করা হয় নির্দোষ বা প্রশংসাসূচক নাম।
গ্রিক প্রতিশোধের দেবীর নাম ‘এরিনিয়েস’ যার অর্থ ক্রদ্ধজন’ এ নামের ব্যবহারে অকল্যাণ ঘটতে পারে বলে তাকে দেওয়া হয় সুভাষিত অভিধা ‘অয়মেনিদেস’ অর্থাৎ ‘উদার’, ‘দয়ালু’। বাংলায় বসন্তের দেবীকে বলা হয় ‘শীতলা’।
কটুতা বা ভয়ঙ্করতা এড়িয়ে যাবার উদ্দেশ্যে অপেক্ষাকৃত মৃদু বা নিরীহ শব্দ ব্যবহার করে শব্দের অর্থ পরিবর্তন ঘটানো হয়। সুন্দরবনে বাঘকে বলা হয় ‘বড় শেয়াল’, রাত্রিবেলা অনেকে সাপকে বলে ‘লতা’। বসন্ত রোগকে বলা হয় ‘মায়ের দয়া’ বা ‘শীতলার দয়া’।

রুশ ভাষায় ‘ভালুক’কে বলা হয় ‘মেদভেদি’ (Medvedi) অর্থাৎ ‘মধুভোজী’। এভাবে ক্ষতিকর পশুকে সুভাষিত নাম দেওয়া হয়।
মৃত্যু সবসময়ই ভয়ঙ্কর। তাই পৃথিবীর সব ভাষাতেই মৃত্যু আর কবরস্থান নিয়ে অনেক সুভাষণ রয়েছে। ইংরেজিতে মৃত্যুসূচক সুভাষণ পাওয়া যায়-
To pass away, to fall asleep, to join the great majority, to expire, breathe one’s last, succumb, go to a better world ইত্যাদি।
বাংলায় পাওয়া যায়-
‘পরলোকগমন’, ‘লোকান্তরগমন’, ‘ইন্তেকাল’, ‘জান্নাতবাসী হওয়া’, ‘শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা’, ‘ধরাধাম ত্যাগ করা’, ‘অনন্ত নিদ্রায় শায়িত হওয়া,’ প্রভৃতি।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় মৃত্যুকে ইউরোপে বলা হতো To go west.
‘কবরস্থান’ বোঝানোর জন্য ইংরেজিতে ব্যবহৃত হয়- Cemetery অর্থাৎ ‘নিদ্রাস্থল’,Charchyard, God’s acre, Long home প্রভৃতি শব্দ।
বাংলায় বলা হয়- সমাধিস্থল, গোরস্থান, কবরস্থান ইত্যাদি।
সব সমাজেই লোকেরা বিব্রত বোধ করে থাকে ‘শৌচাগার’ নিয়ে। যদিও শৌচাগার শব্দটিই আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্গত ।
ইংরেজিতে Latrine শব্দের জন্যে একের পর এক সুন্দর সুন্দর শব্দ সৃষ্টি করা হয়েছে ; এবং এটি এক এক করে নষ্ট করেছে প্রতিটি শব্দ। তাই সৃষ্টি হয়েছে এমন সুন্দর সুন্দর শব্দমালা।
Toilet, Privy, Water Closet, Powder Room ইত্যাদি।
বাংলায় ‘পায়খানা’ শব্দের সুভাষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয় ইংরেজি Bathroom|
Gentleman ও Ladies শব্দ দুটিকেও সুভাষণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমানে এ শব্দ দুটির পতনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। (হুমায়ুন আজাদ)
বাংলায় ভদ্র সমাজে বহু কাল থেকে ব্যবহৃত ‘স্বামী’ ও ‘স্ত্রী’ শব্দ দুটোও অশুভ, অশোভন, অশ্লীল হয়ে উঠেছে। তাই সুভাষণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে- Husband ও wafe।
রাজনীতির ভাষায় এখন অনেক সুভাষণ দেখা যায়, রাজনীতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করার সুভাষণ হয়ে উঠেছে Liquidate অর্থাৎ ‘তরলিত করা’। জর্জ অরওয়েল ভবিষ্যতে রাজনীতিক প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার সুভাষণ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন Vapourize অর্থাৎ ‘বাষ্পীভূত করা’।
‘অনুন্নতকে প্রশংসা করে আজকাল বলা হয় ‘উন্নয়নশীল’। তবে ‘উন্নয়নশীল’ শব্দটিও আর প্রশংসাসূচক থাকছে না বলে অনুন্নত দেশগুলোকে বলা যেতে পারে ‘মানবসম্পদশীল দেশ’, কারণ অধিকাংশ উন্নয়ণশীল দেশের একমাত্র সম্পদ হচ্ছে ‘মানব’।
বাংলায় কারো মেয়েকে বলা হয় ‘শ্যামলা’। বোবা মেয়েকে বলা হয় সুভাষিণী, কানা ছেলেকে পদ্মলোচন।
সংস্কারের বশেও অনেক সুভাষণ তৈরি হয়েছে। যেমনÑ অমঙ্গলের আশঙ্কায় আমরা বলি ‘চাউল বাড়ন্ত’ ‘শাঁখা শীতলানো’। যে যায় তাকে বলি ‘এসো’। আসার সময় বলি ‘যাই’।
কুরুচিকে বা গ্রাম্য শব্দ-ব্যবহারের পরিবর্তে ব্যবহৃত হয় সুভাষণ। বিশেষ একটা বেগ বোঝানোর জন্য বলা হয় ‘বাথরুম পাওয়া’, গ্রামের লোকেরা বলে ‘মাঠে যাওয়া/ঘাটে যাওয়া’, হিন্দিতে বলেÑ‘বিলেত যাওয়া’।
অন্ধবিশ্বাসের কারণেও সুভাষণ ব্যবহৃত হয়। স্বামী বা ভাশুরের নাম অনেকে মুখে আনে না। তাই কারো স্বামী বা ভাশুরের নাম যদি ‘কালীচরণ’ বা ‘তুলসী’ হয়, তবে সে ‘কালীচরণকে ‘ময়লাচরণ’, ‘তুলসী পাতার রস বলে।
হীন কাজকে শোভনতা দানের উদ্দেশ্যেও সুভাষণের ব্যবহার করা হয়। যেমন রান্নার কাজে নিয়োজিত পুরুষকে ‘মহারাজ বা ঠাকুর’ বলা, বাড়ির কাজের দাসীকে কন্যার মর্যাদা দানে ‘ঝি’ বলা। বহু ব্যবহারে ‘ঝি’ শব্দের অর্থকৌলিন্য নষ্ট হয়ে গিয়ে ‘দাসী’ অর্থই চালু হয়ে গেছে, দাসীরাও এখন ‘ঝি’ বলল্লে অসন্তুষ্ট হয়, তাদের বলতে হয় ‘মাসি’, ‘কাজের লোক’।
কাউকে একটু সম্মান দেখাতে গিয়ে অনেক সময় একটু বাড়াবাড়িই করা হয়। যেমন বাস-ট্রাক-ট্রামের কন্টাকটরদের মুখে ‘বড়দা’ আর ‘দাদু’ শব্দগুলোর অতিব্যবহার। অনেক অঞ্চলে বাস রেলের কর্মচারীদের ‘মামা’ বলে ডাকে। বর্তমানে প্রভাব শালীদের অতিরিক্ত সম্মান দেখাতে ‘বস’ বলে সম্মোধনও করা হয়।
গণতান্ত্রিক শক্তির প্রাধান্যের ফলে এখন নানা সুভাষণের উদ্ভব হচ্ছে বাংলায়। দরিদ্র জনগণের বলা হয় ‘শক্তির উৎস’। এতে গরিব জনগণের অহমিকা পরিতৃপ্ত হয়। জেলে’কে বলা হয় ‘মৎস্যজীবী’, চাষীকে বলা হয় ‘কৃষিজীবী’। এতে সমাজে তাদের সম্মান বাড়ে।
অনেক সময় নিষেধাজ্ঞা বা ট্যাবুর কারণে সুভাষণের আশ্রয় নেওয়া হয়। অনেক সমাজে অতি পবিত্র ও ভয়াবহ কোনো কিছুর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ। তাই তারা কথা অনেকটা ঘুরিয়ে বলে। ‘বাম’ শব্দ উল্লেখ করা অনেক সমাজেই নিষিদ্ধ। গ্রিকে ‘বাঁ’ বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হতো Aristeros (আরিস্তরস), যার অর্থ ‘উৎকৃষ্টতর’।
অনেক সমাজে যখন-তখন দেবদেবীর নাম নেওয়া নিষিদ্ধ। ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। এতে ঈশ্বরের নাম লিখিত Jhwh রূপে। এতে কোনো স্বরধ্বনি নেই, তাই এর উচ্চারণ অজ্ঞাত, অর্থও অজানা।
যৌন সম্পর্কিত শব্দগুলোও সাধারণত প্রকাশ্যে উচ্চারণে নিষেধাজ্ঞা থাকে। অথচ এগুলো ভাষা থেকে হারিয়েও যায় না। তাই প্রয়োজনে অনেক সময় সুভাষণের আশ্রয় নেওয়া হয়। যেমন- শরীরের মুখ, গোপনাঙ্গ, ইত্যাদি। (এছাড়াও প্রস্রাবের রাস্তা, সন্তানের নাড়ি ইত্যাদি শব্দগুলো কিছুটা সভ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়।)
নিষেধের প্রভাব অনেক সময় এতো শক্তিশালী হয় যে, নির্দোষ শব্দও অনুষঙ্গবশত, নিষিদ্ধ হয়ে ওঠে। যেমন ‘সোনা’, ‘দুধ’ প্রভৃতি শব্দ অনেক এলাকার মানুষ ব্যবহার করতে বিব্রত বোধ করে।
কদর্থকে সদর্থক করাই হলো সুভাষণ। তাই সুভাষণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা কদর্থকে সভ্য-ভব্য করে তোলে। তবে সুভাষিত শব্দগুলোর পরিণাম অবশ্য খুব ভাল নয়। ‘সুন্দর সুন্দর শব্দ কুৎসিত ব্যাপারের সাথে জড়িয়ে পড়ে অচিরেই কদর্থক হয়ে ওঠে। তখন ওই সব ব্যাপারের জন্য আবার দরকার পড়ে সুভাষণের। আজকাল প্রতিনিয়ত সৃষ্ট ও নষ্ট হচ্ছে সুভাষণের পর সুভাষণ।
লেখক:
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।