বিসর্জন নাটকের রাজা গোবিন্দমাণিক্য ও রঘুপতির চরিত্র বিচার ।
চরিত্র বিচার : গোবিন্দমাণিক্য
বিরল নাট্য প্রতিভার সংস্পর্শে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বিসর্জন’ নাটকটি এক বিশিষ্ট আসনের দাবীদার। নাটকটিতে প্রেম ও প্রথার দ্বন্দ্বকে রূপায়িত করা, হয়েছে এবং প্রেম ধর্মের জয় ঘোষিত হয়েছে। শিল্প সফল সৃষ্টি বিসর্জন নাটকটিতে প্রেম ও প্রথার সংঘাতকে কেন্দ্র করেই পরিণতি পেয়েছে। আর এই সংঘাতকে তরান্বিত করে কাহিনির মাঝে যে চরিত্রটি মানবতা ও প্রেমের জয়গান গেয়ে উঠেছেন, তিনি হচ্ছেন রাজা গোবিন্দমাণিক্য।
‘রাজর্ষি’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘বিসর্জন’। উপন্যাসের রাজা একাধারে রাজা এবং ঋষি। ‘বিসর্জন’ নাটকেও গোবিন্দমাণিক্যের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনেকটা উপন্যাসের রাজার অনুরূপ। গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্র বিচার করে দেখা যেতে পারে।

গোবিন্দমাণিক্য ত্রিপুরার রাজা। তিনি নিঃসন্তান। রাজ্যের সকল প্রজাকে সন্তান স্নেহে দেখাশুনা করেন। রানী গুণবতী সন্তান কামনায় দেবীর পায়ে অপর্ণার সন্তানতূল্য দুটি ছাগশিশু বলি দেয়। অপর্ণা রাজার কাছে নালিশ জানালে অপর্ণার হৃদয় নিঃসৃত আবেদন রাজার কাছে দেবীর আদেশ হয়ে ফিরে আসে। রাজা রাজ্যে বলি বন্ধ ঘোষণা করেন।

রাজা তার উদার আদর্শবোধে অটল থেকেছে। রাজ্যের রাণী থেকে শুরু করে অনেকেই তার বিপক্ষে চলে গেছে, কিন্তু রাজা দৃঢ়চিত্তে অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে দন্ডায়মান থেকেছেন।
গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্র বিচার প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে রাজা গোবিন্দমাণিক্য চিরন্তন হৃদয়ধর্মকে, মানবধর্মকে বড় করে দেখেছেন। মাটির দেবীর মাতৃমূর্তির চেয়ে জীবন্ত অপর্ণার মাতৃমূর্তিকে বড় করে দেখেছেন। যে মা সন্তানের রক্তে স্নাত হতে পছন্দ করে, তার চেয়ে যে মা সন্তানের রক্ত দেখে বিচলিত ও ক্ষতাক্ত হয়, সেই মাকেই রাজা প্রকৃত মা বলে জ্ঞান করেছেন।
“এতদিন স্বপ্নে ছিনু
আজ জাগরণ। বালিকার মূর্তি ধরে
স্বয়ং জননী মোরে বলে গিয়েছেন,
জীবরক্ত সহে না তাহার। (১ম অঙ্ক, ২য় দৃশ্য)
রাজা গোবিন্দমাণিক্য এ নাটকে প্রেম তথা হৃদয়ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে সমস্ত বাঁধাকে অতিক্রম করেছেন। তাঁর প্রতিপক্ষকে ভালবাসার বন্ধনে জড়িয়ে, আদর্শ দ্বারা মোকাবেলা করতে চেয়েছেন। রাজপুরোহিত ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে দম্ভ ও অহংকারের বশে রাজাকে হত্যার চেষ্টা করে। যুবরাজ নক্ষত্র রায়কে রাজাকে হত্যায় প্ররোচিত করে রানী গুণবতীকে ক্ষেপিয়ে তুলে পালিত সন্তান ধ্রুব হত্যায় প্ররোচিত করে। মন্দিরে দেবীর মুখ ঘুরিয়ে রেখে প্রজাদের মনে ভীতির সৃষ্টি করে, দেবীর আড়ালে দাঁড়িয়ে কন্ঠ নকল করে জয়সিংহকে বিভ্রান্ত করে। রাজা স্থির থেকে সব বাঁধা অতিক্রম করে। রক্তপাত এড়াতে ছোট ভাই নক্ষত্ররায়কে সিংহাসন ছেড়ে দিতে সম্মত হয়, জয়সিংহকে প্রকৃত ঘটনা বোঝাতে সক্ষম হয়।
রাজরক্ত প্রসঙ্গে কথা উঠতেই চাঁদপাল রাজাকে সতর্ক করে দিলে রাজা বলে ওঠেÑ
তবে আর নক্ষত্রের
নাই দোষ। জানিয়াছি, দেবতার নামে
মনুষ্যত্ব হারায় মানুষ। ভয় নাই,
যাও তুমি কাজে। সবধানে রব আমি। (২য় অঙ্ক ৪র্থ দৃশ্য)
প্রেম ও প্রথার দ্বন্দ্ব এ নাটকের প্রাণ। রঘুপতির প্রতিপক্ষ রাজা গোবিন্দমাণিক্যকে নাট্যকার দ্বন্দ্বহীন এবং একমূখী স্বভাব বিশিষ্ট করে গড়ে তুলেছেন। রাজার মনে কোনো সন্দেহ সংশয় নেই, বিচার বিতর্ক নেই, একটা উচ্চ আদর্শ ও মহৎ নীতিকেই অবলম্বন করে চলেছেন পুরো জীবনপথ। অনেকে মনে করেন চরিত্রটি ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার বিকাশে বিকশিত সর্বাঙ্গ সুন্দর চরিত্র হিসেবে চিত্রিত হয়নি। ক্রিয়াশীল আদর্শের বীজ চরিত্রটির বিকাশের পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্র বিচার প্রসঙ্গে এটি বিবেচ্য।
রাজা চরিত্রটি নির্ভেজাল প্রেম পূজারি। সমস্ত চিত্ত জুড়ে শুধু মানবতার জয়গান ধ্বনিত হয়েছে। রাজা কঠোরতার বদলে কোমলতা আর হিংসার বদলে মহত্ত্বকে জাগ্রতরূপে তুলে ধরেছেন। জীবনের নানাবিধ ঘাত প্রতিঘাত ও পারিপার্শ্বিক জটিলতা, এমনকি দাম্পত্য কলহের শুভ সমাধানকে বিবেচ্য না করে প্রেমের ও মানবতার আদর্শকেই বড় করে দেখেছেন। ফলে রাজাকে দোষে-গুণে জীবন্ত মানুষ হিসেবে নয়, মহৎ ধারণার প্রতীক বলে মনে হয়।
রাজা সব সময় প্রেমধর্মের বলে বলীয়ান হয়ে সামনে এগিয়ে গেছেন। প্রেমের পথেই মুক্তি খুঁজেছেন, হিংস্রতার পথে হাঁটেন নি, প্রথাকে নিষিদ্ধ করতে কোনো রক্তপান ঘটাননিÑ এদিক থেকে রাজা সবাইকে অতিক্রম করে গেছেন। রাজাকে প্রেমধর্মের পথে চলতে গিয়ে অনেক দুঃখ কষ্ট ভোগ করতে হয়েছে। অনুজ তাকে হত্যা করতে চেয়েছে, প্রজারা বিমুখ হয়েছে, রক্তপাত এড়াতে রাজ্য ছেড়ে বলে যাবার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। রানীর সাথে বিচ্ছেদ ঘটেছে।
নাটকের ধ্রুব চরিত্র রাজা গোবিন্দমাণিক্য। তার মনে কোনো দ্বন্দ্ব কোনে সংশয় নেই। শাস্ত্র জ্ঞানের মধ্যে দিয়ে নয়, অভিজ্ঞতা ও বুদ্ধির সাহায্যেও নয়, আপন নির্মল অন্তরের মধ্যে গোবিন্দমাণিক্য সত্যকে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তার হৃদয়ে সংশয়ের লেশ নেই। তার কর্তব্যের পথ কঠিন হলেও পরিষ্কার। ক্ষোভ শুধু এইÑ
হায় মহারাণী, কর্তব্য কঠিন হয়ে
ওঠেÑ তোমরা ফিরালে মুখ।
ক্ষুব্ধ প্রেম যদি পথ রোধ করে দাঁড়ায় সে বড় মর্মান্তিক। গোবিন্দমাণিক্যের জীবনে এটাই ট্রাজেডি।
উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর ‘রবীন্দ্র নাট্য পরিক্রমা’ গ্রন্থে গোবিন্দমাণিক্য সম্পর্কে বলেছেন যে, চরিত্রটি একেবারে দ্বন্দ্বহীন ও একমূখী। একটা উচ্চ আদর্শ ও মহা নীতিকেই জীবনের ধ্রুবতারা করে জীবন পথে এগিয়ে গেছেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও, চারপাশের প্রতিকূল পরিবেশেও অচঞ্চল ও নির্বিকার থেকে মানবতার পথেই হেঁটেছেন। চরিত্র সৃষ্টির দিক থেকে চরিত্রটিকে নিষ্প্রভ মনে হলেও একটা ভাব বা তত্ত্বের বাহন হিসেবে এর সার্থকতা আছে। সমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উর্ধ্বে যে আদর্শ চরিত্র, কবি তাই রূপায়িত করেছেন গোবিন্দমাণিক্য চরিত্রে তিনি কেবল রাজা নান, তিনি রাজর্ষি।
প্রেমের পথই তাঁর কাছে মুক্তির পথ, হিংসার মধ্যে কোন শান্তি নেই, এ বিশ্বাসে বিশ্বাসী তিনি। তাই সমস্ত জটিলতার মধ্যে থেকেও অপর্ণার আহবানে সাড়া দিয়েছেন। প্রথার পক্ষে না গিয়ে হৃদয়ধর্মের পথে গিয়ে নিজের আদর্শকে বজায় রাখতে মানুষ বলির পথে যান নি। জয়ীও হয়েছেন। রাজার উক্তিÑ
গেছে পাপ। দেবী আজ এসেছে ফিরিয়া
আমার দেবীর মাঝে। (৫ম অঙ্ক, ৪র্থ দৃশ্য)
তবে একথা ঠিক যে রাজা জয়ী হলেও তার চরিত্রে যে শক্তিমত্তা ও প্রতিপক্ষ হিসেবে যে দামামা থাকা উচিত ছিল, তা নেই। তাই প্রতিপক্ষ হিসেবে তার ঔজ্জ্বল্যতা কম, তবে তিনি আদর্শ ও সত্যের বাহক। নাট্যকারের প্রকৃত উদ্দেশ্যের বীজ এ চরিত্রের মধ্যে নিহিত। রাজার আদর্শে মুগ্ধ হয়ে জয়সিংহ মুক্তির পথ পেয়েছে, গুরু রঘুপতিকে ধিক্কার জানাতে পেরেছে। রঘুপতিও পেয়েছে প্রকৃত সত্যের সন্ধান। প্রেম ধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য রাজা গোবিন্দমাণিক্য অবশ্যই শ্রদ্ধার যোগ্য।
রঘুপতির চরিত্র বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ‘বিসর্জন’ নাটকটি বাংলা গদ্য সাহিত্যের ধারায় এক বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। নাটকটিতে প্রেম ও প্রথার দ্বন্দ্বকে রূপায়িত করা হয়েছে এবং প্রেম ধর্মের জয় ঘোষিত হয়েছে। প্রেম ও প্রথার দ্বন্দ্ব যে চরিত্রকে অবলম্বন করে ঘণীভূত হয়ে উঠেছে। তিনি হচ্ছেন পুরোহিত রঘুপতি।
নাটকে রঘুপতি ধর্মের অর্থহীন অন্ধ সংস্কার ও চিরাচরিত প্রথা ধর্মের প্রতিনিধি। প্রচন্ড শক্তি নিয়ে সে প্রবল পক্ষ। তার সহায়তাকারী হিসেবে রয়েছে রাণীর স্বার্থ বিজড়িত সংস্কার ও প্রথামূলক ধর্মবোধ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নক্ষত্ররায়ের রাজ্যলোভ। প্রথার পক্ষের সমস্ত চিন্তা ও কর্ম পরিচালিত হয়েছে রঘুপতির মস্তিষ্ক থেকে।
চরিত্র বিচার – রঘুপতি
রঘুপতি ব্রাহ্মণ, তার বিশ্বাস, সে ধর্মের প্রতিনিধি, ধর্ম রক্ষার দায়িত্ব তার। তাই মন্দির হতে পুজোর বলি ফিরে গেলে সে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে, নিজের আত্মসম্মানে লাগে, সে আঘাত করার জন্য প্রস্তুত হয়। কেননা ধর্মের আঘাত তার নিজের আঘাত। ধর্মের সাথে তার মর্যাদা ও সম্মান জড়িত।
রঘুপতি রাজা গোবিন্দমাণিক্যের সাথে যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে, তার কারণ যতটা না ধর্মরক্ষার্থে তার চেয়ে বেশি নিজের গর্ব অহংকার ও দম্ভ রক্ষার্থে। চরিত্র বিচার করতে গিয়ে মনে রাখতে হবে রঘুপতি একটা প্রথার প্রতিনিধি, যা আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। সহজে সেখান থেকে ফিরে আসা তার পক্ষে সম্ভব নয়।
রঘুপতি নিজের সম্মান রক্ষার্থে বদ্ধপরিকর। বুদ্ধি ও সাহসে সে অসাধারণ, উদ্দেশ্য সাধনে দৃঢ়চিত্ত ও অদ্ভূত কৌশলী। ধর্মরক্ষার নামে নিজ সম্মান বজায় রাখতে সে সত্য-মিথ্যা, পাপ-পূণ্য বর্জিত বিবেকহীন পাষন্ড।
রাজা গোবিন্দমাণিক্য মন্দিরে জীব বলি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে রঘুপতি রাগে জ্বলে ওঠে। শুরু হয় তার চারিত্রিক সক্রিয়তা। রঘুপতি তার ক্রোধকে চারপাশে ছড়িয়ে দেয়। সবাইকে রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। ক্রমেই তার উন্মত্ততা বেড়ে চলে।
নিজের জয় ত্বরান্বিত করতে রঘুপতি রাজ্যলোভী যুবরাজ নক্ষত্র রায়কে গোবিন্দমাণিক্যকে হত্যায় প্ররোচিত করে এবং জয়সিংহকে বোঝায়-
রাজরক্ত চাই দেবীর আদেশ।
জয়সিংহ রাজাকে হত্যায় ব্যর্থ হলে রঘুপতি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। জয়সিংহকে দিয়ে সে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেয় রাজরক্ত আনার, জয়সিংহ গুরুর কাছে প্রতিশ্র“তি দেয়Ñ
আমি এনে দেব রাজরক্ত শ্রাবণের
শেষ রাতে দেবীর চরণেÑ
রঘুপতি নিজের দম্ভ ও অহংকার রক্ষার্থে অবিরাম চক্রান্ত করে চলে। চক্রান্ত হিসেবে মন্দিরে প্রতিমার মুখ ঘুরিয়ে রেখে প্রজাদের মনে ভীতি ও শঙ্কা সৃষ্টি করে। তার লক্ষ্য মন্দিরের সমস্ত ক্ষমতা নিজের হস্তগত করা।
রঘুপতি মনে করে রাজ্য শাসনের ক্ষমতা রাজার হলেও মন্দিরের শাসনদন্ড তার হাতেই থাকা উচিত। সে তার অভিপ্রায় বাস্তবায়নে অবিচল থেকেছে। কিন্তু ধরা পড়ে আট বছরের নির্বাসন দন্ড হলে রঘুপতি বিচলিত হয়ে ওঠে।
রঘুপতির অন্তর পরাজয়ের জ্বালায় দগ্ধ হয়। রাজার কাছ থেকে দু’দিনের সময় চেয়ে নেয়। হাল ছাড়ার পাত্র সে নয়। জয়সিংহের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। জয়সিংহ কথা দিয়েছে শ্রাবণের শেষ রাতে রাজরক্ত এনে দেবে। তাই সে শ্রাবণের শেষ রাত পর্যন্ত সময় চেয়ে নেয়।
রঘুপতি চরিত্রের প্রচন্ডতা ও নিজ স্বার্থ রক্ষায় কত কুটিল হতে পারে তার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন রাণী গুণবতীকে রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে তখন। রাণীকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, পালিত পুত্র ধ্রুবর জন্য রাজা সন্তান চায় না, তাই সন্তান কামনায় কাতর রাণীর পূজোও রাজা করতে দিতে চায় না। রানীকে ধ্রুব হত্যায় প্ররোচিত করে রঘুপতি। শেষ পর্যন্ত চক্রান্ত ধরা পড়ে।
পরাজয়ের মুখে এসে রঘুপতি হিংসার আগুনে অন্তরে পুড়ে ছাই হতে থাকে। জয়সিংহকে বার বার প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। প্রচন্ড ঝড়ের রাত্রে মন্দিরের সামনে জয়সিংহের জন্য অপেক্ষা করে। এ সময় অপর্ণা জয়সিংহের সন্ধানে রঘুপতি চাকেও দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। জয়সিংহ মন্দিরে প্রবেশ করতে না করতেই রঘুপতি বলে ওঠেÑ ‘রাজরক্ত কই’। জয়সিংহ নিজের বুকে ছুরি বসিয়ে বলে-
রাজরক্ত আছে দেহে।
এই রক্ত দিব। এই যেন শেষ রক্ত হয় মাতা।
জয়সিংহকে হারিয়ে রঘুপতির চৈতন্য ফেরে। পাথরের দেবীকে গোমতী নদীর জলে ফেলে দিয়ে মানবী দেবী অপর্ণার হাত ধরে মন্দির ত্যাগ করে।
রঘুপতি চরিত্র ক্ষমতার লোভে উন্মত্ত হয়েছিল বলেই সন্তানতূল্য জয়সিংহ তার লালসার আগুনে পুড়ে গেছে। রঘুপতির লোভের ঝড় থামাতে জয়সিংহকে আত্মাহুতি দিতে হয়েছে।
রঘুপতির ক্রোধ নিষ্ঠুর হলেও কুটিল নয়। সে নিজেকে কখনো বঞ্চনা করেনি। সে সত্যিই বিশ্বাস করে দেবী বলি চায়। এটা রঘুপতির আজন্ম সংস্কার। এই ব্রাহ্মণত্ব অপমানিত হলে সে সহ্য করতে পারে না। সে কিছুতেই চিরায়ত সংস্কার ও প্রথাকে ক্ষুণœ হতে দিতে চায় না। তাই সে ষড়যন্ত্র করে। এ জন্যই পুত্রতুল্য জয়সিংহকে বার বার বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
রঘুপতির গর্বই তাকে অন্ধ করে তোলে। সত্য-মিথ্যা-পাপ-পূণ্য সবই একাকার হয়ে যায় তার কাছে। এই আত্মাভিমানের নিষ্ঠুরতার মাঝেও জয়সিংহের প্রতি রয়েছে তার স্নেহ ও দুর্বলতা। তাই অপর্ণা জয়সিংহকে কেড়ে নিতে এলে সহ্য করতে পারে নি। জয়সিংহের প্রতি রঘুপতির যে ভালোবাসা, তা ছলনা নয়।
সনাতন ধর্মের প্রতি নিষ্ঠার কারণে রঘুপতির মধ্যে দম্ভ ও অহংকার কাজ করেছে। এ দম্ভ ও অহংকার রঘুপতির সব কর্ম ও চিন্তারকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তার যুক্তি কারও কাছে হার মানে নি। কিন্তু জয়সিংহের আত্মবলিদান রঘুপতির সব দম্ভ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তার জীবনের সঞ্চয়স্থল ধ্বংস হয়ে যায়। রঘুপতি চরিত্রের বিশেষ দিক বের হয়ে আসে।
“বৎস মোর গুরু বৎসল।
ফিরে আয়, ফিরে আয়, তোরে ছাড়া আর
কিছু নাহি চাহি।”
রঘুপতি চরম আঘাতের মধ্য দিয়ে জীবনের পরম সত্যকে খুুঁজে পায়। বাহ্যিকভাবে তার পরাজয় হলেও মানবধর্মের জয় ঘোষিত হয়। রঘুপতি যেমন সক্রিয়, ট্রাজেডিও তার জীবনে সবচেয়ে বেশি। নাটকে তার প্রভাব এত বেশি যে, সেই নায়ক পর্যায়ে চলে এসেছে। তার হৃদয়-বেদনাকে বড় করতেই হয়তো জয়সিংহের মৃত্যুর পরও নাটক শেষ হয় নি, প্রথার বিসর্জন হয়েছে রঘুপতির হৃদয় থেকে সংস্কার বিদায়ের মধ্যে দিয়ে।
জয়সিংহের মৃত্যুতে রঘুপতির চৈতন্য ফেরে। রঘুপতি বুঝতে পারে অপর্ণা সঠিক। বুঝতে পারে মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের বাস। তাই সে প্রতিমা বিসর্জন দেয়, চৈতন্য থেকে বিসর্জন দেয় হিংসা। রঘুপতি সবদিক দিয়ে ক্ষয়িত হলেও সে বিজয়ী, কেননা তারই শিষ্য জয়সিংহের মাধ্যমে তার অনাবি®কৃত নবজীবন তার কাছে ধরা দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে সব মিলিয়ে চরিত্রটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
চরিত্র বিচার প্রসঙ্গে রঘুপতির উপর জয়সিংহের প্রভাব বিবেচ্য।
চরিত্র বিচার – গোবিন্দমাণিক্য ও রঘুপতি :
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিসর্জন নাটকে গোবিন্দমাণিক্য ও রঘুপতি দুই বিপরীত চরিত্র—
একজন মানবতার,
অন্যজন ধর্মান্ধতার প্রতীক।
গোবিন্দমাণিক্য যুক্তিবাদী, সহানুভূতিশীল ও ন্যায়পরায়ণ রাজা; তিনি মনে করেন, ধর্মের মূল উদ্দেশ্য মানুষের মঙ্গল। বিপরীতে রঘুপতি কট্টর পুরোহিত, যিনি দেবীর নামে রক্তবলি প্রথাকে ধর্ম হিসেবে মানেন।
গোবিন্দমাণিক্য মানবতাকে ধর্মের উপরে স্থান দেন, রঘুপতি ধর্মকে মানুষ থেকে বড় করে দেখেন।
একজন মুক্তির আলো ছড়ান, অন্যজন অন্ধকারের প্রতীক। এই দুই চরিত্রের দ্বন্দ্বেই প্রকাশ পায় বিসর্জন নাটকের চিরন্তন বার্তা—“মানুষের উপরে ধর্ম নয়, ধর্মের উপরে মানুষ।”
বিসর্জন নাটকের প্রধান দ্বন্দ্ব প্রেম ও প্রতাপের দ্বন্দ্ব। এক পক্ষে গোবিন্দমাণিক্য অপর পক্ষে রঘুপতি। চরিত্র বিচার করতে হিয়ে মনে রাখতে হবে তারা দুই ভাবনার প্রতিনিধি। চরিত্র বিচার প্রসঙ্গে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের অপেক্ষা রাখে, নইলে দুটি চরিত্র সম্পর্কে ভুল বুঝার অবকাশ রয়ে যাবে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিসর্জন নাটকে গোবিন্দমাণিক্য ও রঘুপতি—এই দুই চরিত্র বিচার করলে নাটকের মূল দর্শন ও সংঘাত প্রকটভাবে উদ্ভাসিত হয়। চরিত্র বিচার করলে দেখা যায়, গোবিন্দমাণিক্য মানবতাবাদী, উদার ও নীতিনিষ্ঠ রাজা, যিনি ধর্মের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্ধ আনুষ্ঠানিকতার বিরোধিতা করেন। অপরদিকে চরিত্র বিচার অনুযায়ী রঘুপতি কট্টর ধর্মান্ধ, যিনি দেবতার নামে মানুষের জীবন বলিদানকে ন্যায্য মনে করেন।
এই দুই চরিত্র বিচার করতে গেলে বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ এখানে ধর্ম ও মানবতার দ্বন্দ্বকে দুই বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়েছেন। গোবিন্দমাণিক্য যুক্তি ও মানবতার প্রতিনিধি, রঘুপতি অন্ধ বিশ্বাস ও গোঁড়ামির প্রতীক। চরিত্র বিচার করলে স্পষ্ট হয়—এই দ্বন্দ্বই নাটকের মূল চালিকাশক্তি।
অতএব, চরিত্র বিচার বিশ্লেষণে বলা যায়, গোবিন্দমাণিক্য ও রঘুপতি—দুজনেই রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চিন্তার দুই বিপরীত প্রতিফলন। একজনের মাধ্যমে লেখক মুক্তির পথ দেখিয়েছেন, অন্যজনের মাধ্যমে ধর্মের নামে অমানবিকতার বিপদ চিহ্নিত করেছেন। ফলে বিসর্জন নাটকের চরিত্র বিচার কেবল দুটি ব্যক্তিত্বের নয়, বরং মানবসভ্যতার চিরন্তন দ্বন্দ্বের এক দার্শনিক মূল্যায়ন।
চরিত্র বিচার সংক্রান্ত প্রশ্ন ও উত্তর
চরিত্র বিচার: FAQ (Frequently Asked Questions)
১. প্রশ্ন: বিসর্জন নাটকের মূল বিষয়বস্তু কী?
উত্তর: ধর্মান্ধতা বনাম মানবতার দ্বন্দ্বই বিসর্জন নাটকের মূল বিষয়বস্তু। প্রেম ও প্রতাপের দ্বন্দ্ব। প্রেম ও ক্ষমতার লড়াই।
২. প্রশ্ন: গোবিন্দমাণিক্য কে ছিলেন ?
উত্তর: গোবিন্দমাণিক্য দেবতাত্মক রাজ্যের প্রজাবৎসল মানবতাবাদী রাজা, যিনি দেবীর রক্তবলি প্রথার বিরোধিতা করেন।
৩. প্রশ্ন: রঘুপতি কীভাবে নাটকের সংঘাত সৃষ্টি করে ?
উত্তর: রঘুপতি ধর্মের নামে বলি প্রথা বজায় রাখতে চায়, আর রাজার মানবিক চিন্তার বিরোধিতা করেই নাটকের মূল সংঘাত ঘটায়। নিজের ক্ষমতা বজায় রাখতে সে সবাইকে রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে।
৪. প্রশ্ন: ধ্রুব চরিত্রের ভূমিকা কী ?
উত্তর: ধ্রুব নিষ্পাপ ও আত্মোৎসর্গকারী শিশু, যার বলিদান নাটকের আবেগঘন ও ট্র্যাজিক পরিণতির প্রতীক। সন্তান কামনায় রানী পশু বলি দেয়, অথচ সে ধ্রুবকে বলি দিতে চায়।
৫. প্রশ্ন: জয়সিংহের চরিত্রের গুরুত্ব কী ?
উত্তর: জয়সিংহ আজন্ম মন্দিরে লালিত, সে রঘুপতির আদেশের বাইরে কাজ করে না। সে জানে রঘুপতি যা করে মঙ্গলের জন্য করে। সেজন্য প্রথমে গোবিন্দমাণিকের উপর ক্ষুব্ধ হয়, যদিও গোবিন্দমাণিক্য তার প্রিয় মানুষ। শেষ পর্যন্ত জয়সিংহ নিজের জীবন দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠা করে ।
৬. প্রশ্ন: অপর্ণা চরিত্রে কী প্রতিফলিত হয়েছে?
উত্তর: অপর্ণা মাতৃত্ব, মমতা ও করুণার প্রতীক; সে ধ্রুবকে নিজের সন্তান বলে মনে করে। সে মনে করে প্রকৃত দেবী কখনো রক্ত চায়তে পারে না।
৭. প্রশ্ন: গুণবতী চরিত্র বিচার এ সে কীসের প্রতিনিধিত্ব করে?
উত্তর: গুণবতী হলো সংসারী নারী, যিনি রাজাকে মানবিক পথে দৃঢ় থাকতে অনুপ্রাণিত করেন। সংসারের আর দশটা নারীর মতো স্বামী-সন্তান চায়।
৮. প্রশ্ন: গোবিন্দমাণিক্যের চরিত্র বিচার করলে কী ধরা পড়ে?
উত্তর: গোবিন্দমাণিক্য যুক্তিবাদী, দয়ালু ও মানবতাবাদী এক শাসক—যিনি ধর্ম নয়, মানুষকে প্রাধান্য দেন। মানুষই তার কাছে বড়।
৯. প্রশ্ন: রঘুপতির চরিত্র বিচার করলে তার বৈশিষ্ট্য কী?
উত্তর: রঘুপতি কট্টর, গোঁড়া, ধর্মান্ধ ও আত্মমুগ্ধ পুরোহিত; তার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ ধর্মীয় ভণ্ডামি ও অন্ধবিশ্বাসের সমালোচনা করেছেন।
১০. প্রশ্ন: নাটকের শিরোনাম “বিসর্জন” অর্থ কী?
উত্তর: ‘বিসর্জন’ মানে ত্যাগ। নাটকে দেবীর মূর্তি ও ধর্মীয় গোঁড়ামি ত্যাগের মধ্য দিয়ে মানবতার প্রতিষ্ঠা বোঝানো হয়েছে।
১১. প্রশ্ন: নাটকের বার্তা কী?
উত্তর: মানুষই সর্বোচ্চ মূল্যবোধ—এই মানবতাবাদী বার্তাই বিসর্জন নাটকের সারকথা।
১২. প্রশ্ন: নাটকের শেষে কী ঘটে?
উত্তর: ধ্রুব দেবীর বলি হিসেবে আত্মবলি দেয়, এবং রঘুপতির চোখে সত্য উন্মোচিত হয়—এটাই নাটকের ট্র্যাজিক পরিণতি।
১৩. প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ কেন এই নাটকটি লিখেছিলেন?
উত্তর: সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় ভণ্ডামি ও রক্তবলি প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর জন্য রবীন্দ্রনাথ বিসর্জন রচনা করেন।
১৪. প্রশ্ন: বিসর্জন নাটকে মানবতাবাদের প্রকাশ কোথায়?
উত্তর: গোবিন্দমাণিক্যের সিদ্ধান্তে—যেখানে তিনি দেবীর পরিবর্তে মানুষের জীবনকে বেশি মূল্য দেন।
১৫. প্রশ্ন: নাটকের প্রতীকী অর্থ কী?
উত্তর: দেবী, বলি, বিসর্জন—সবই ধর্ম, ক্ষমতা ও মানবতার প্রতীক; এগুলোর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ মানুষকেই সর্বোচ্চ সত্য হিসেবে দেখিয়েছেন।
প্রশ্ন: বিসর্জন নাটকের প্রেমের পক্ষে কোন কোন চরিত্র রয়েছে ?
উত্তর: গোবিন্দমাণিক্য ও অপর্ণা
প্রশ্ন: জয়সিংহ প্রেমের পক্ষে না প্রতাপের পক্ষে ?
উত্তর : প্রথমে রঘুপতির দিকে ছিল অর্থাৎ প্রতাপের দিকে ছিল। পরে প্রেমের পথে আসে।
প্রশ্ন: রঘুপতি কাকে রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে?
উত্তর : রাণী গুণবতীকে।
প্রশ্ন: মন্দিরে দেবীর মুখ ঘুরিয়ে রাখে কে ?
উত্তর: রঘুপতি।
প্রশ্ন: রঘুপতি জয়সিংহকে কার রক্ত এনে দিতে বলে ?
উত্তর: রাজরক্ত এনে দিতে বলে।
প্রশ্ন: রানী গুণবতী কার ছাগল বলি দেয়?
উত্তর: অপর্ণার।
প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন
অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন, কলেজ।
রেফারেন্স তালিকা: চরিত্র বিচার ক্ষেত্রে
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর — বিসর্জন, বিশ্বভারতী প্রকাশন।
- ড. সুকুমার সেন — রবীন্দ্রনাথের নাট্যচিন্তা, আনন্দ পাবলিশার্স।
- হরপ্রসাদ শাস্ত্রী — রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর নাট্যকলা, সাহিত্য সংসদ।
- বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য — রবীন্দ্রনাট্যের সমাজদর্শন, দে’জ পাবলিশিং।
- অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় — রবীন্দ্রনাথের নাটকে ধর্ম ও মানবতা, মিত্র অ্যান্ড ঘোষ পাবলিশার্স।