অনুকরণ তত্ত্ব : “শিল্প মাত্রই অনুকরণ নয়” এরিস্টটল কীভাবে প্রমাণ করেন ?

অনুকরণ তত্ত্ব

প্লেটোর অনুকরণ তত্ত্বকে অসার প্রমাণ করতে শিষ্য এরিস্টটল লেখেন শিল্প মাত্রই অনুকরণ নয়। এরিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্ব পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বের ভিত্তিস্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য হলো জীবনের অনুকরণ—মানুষের কর্ম, চিন্তা, অনুভূতি ও সমাজজীবনের প্রতিফলন। সাহিত্য সমাজ ও জীবনের কথা বলে। এই অনুকরণ তত্ত্ব অনুযায়ী কবি বাস্তব জীবনের ঘটনাকে হুবহু নকল করেন না, বরং কল্পনার আলোয় রূপান্তর ঘটিয়ে তাকে করে তোলেন শিল্পরূপে মহিমান্বিত, সৌন্দর্যের অপার লীলাক্ষেত্র রূপে। তাই এরিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্বে সাহিত্য কেবল অনুকৃতি নয়, সৃষ্টিশীল পুনর্গঠন।

এরিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্ব আলোচনা কর।

গ্রিক তথা বিশ্ব বিশ্রুত দার্শনিক ও সাহিত্য তত্ত্ববিদ এরিস্টটল (খ্রিঃ পূঃ ৩৮৪-খ্রিঃ পূঃ ৩২২ অব্দে) তার গুরু প্লেটোর অনুকরণতত্ত্বকে নতুন করে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। প্লেটো কবিকুলকে উন্মাদ, নকলবাজ, আহাম্মক ইত্যাদি বলে রাজ্য থেকে নির্বাসন দেবার যে হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, তারই শিষ্য এরিস্টটল সেই হুঙ্কার থেকে বাঁচালেন কবিকুলকে। এরিস্টটল সত্যকে যথাযথভাবে সংস্থাপনে উদ্যোগী হলেন, প্রতিষ্ঠা করলেন কাব্যকে তথা কবিকে। সাহিত্য রসিকরা তা অনুকরণ তত্ত্ব হিসেবে জানে।

প্লেটোর মতে শিল্প মাত্রই অনুকরণ; তাই শিল্পকলার মধ্যে সত্য বা সত্যের ছায়ামাত্র নেই। এ যেনো ছায়ার ছায়া। তার ভাষায় ; কাব্যের অনুকরণ শ্রোতাদের পক্ষে অতিশয় হানিকর ; কেননা ঐ অনুকরণ সত্যকে চিনতে শেখায় না, বরং সত্য সম্বন্ধে বিভ্রামের সৃষ্টি করে। প্লেটো তার কল্পনার রাজ্যের মানুষকে কবিমুক্ত করতে প্রয়াস পেয়েছেন।


এরিস্টটল তাঁর গুরুকে উপেক্ষা করে কবির পক্ষাবলম্বন করেন নি, বরং গুরুর মতকে আকর হিসেবে গ্রহণ করে তার বিশ্লেষণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে পরিমার্জন করে স্বীয় মত প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনুকরণতত্ত্বকে এরিস্টটল নতুন ও অভিনব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে সকল শিল্পই বিশ্বব্রাহ্মান্ডের কোনো না কোনো ঘটনা বা বিষয় অনুকরণেই সৃষ্টি হয়।

তাঁর মতে, “এরা তিনভাবে একে অন্যের থেকে পৃথক ; হয় অনুকরণের মাধ্যমে অথবা অনুকরণের বিষয়ে অথবা অনুকরণের সম্পূর্ণ ভিন্ন রীতিতে।” এ থেকে আমরা এরিস্টটলের অনুকরণতত্ত্বের তিনটি বিভিন্ন ধারা বা বিধির সন্ধান পাই। এগুলো হলোÑ

(ক) অনুকরণের মাধ্যম
(খ) অনুকরণের বিষয় এবং
(গ) অনুকরণের রীতি বা প্রকৃতি।

(ক) অনুকরণের মাধ্যম: শিল্প বা সাহিত্যের ভিত্তি অনুকরণ। তাই বলে সব অনুকরণ এক নয়। একই বিষয় নিয়ে গঠিত শিল্প মাধ্যমের ভিন্নতার কারণে শিল্পের মধ্যে পার্থক্য অনিবার্য। বিভিন্ন স্রষ্টার সৃষ্টির মাধ্যম বিভিন্ন। তাই একই বিষয়কে অনুকরণ করে রচিত কবির কবিতা, চিত্রকরের ছবি, সঙ্গীতজ্ঞের সুর, নৃত্যশিল্পীর নাচের মুদ্রা বা ভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন হয়।

সমুদ্র তীরে সূর্যোদয়ের দৃশ্যের কথা ধরা যাক। কবি যখন এ বিষয় নিয়ে শিল্প রচনা করবেন তখন তিনি এ দৃশ্যের মনোরম পরিবেশের সাথে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নির্বাচিত শব্দমালায় ছন্দোবদ্ধ করে তা প্রকাশ করবেন। চিত্রশিল্পী রং তুলির সাহায্যে সাদা ক্যানভাসে রংয়ের প্রলেপ দিয়ে সূর্যোদয়ের দৃশ্য আঁকার উপযুক্ত করে নেবেন। এরপর মনের আবেগ মিশিয়ে এমন একটা দৃশ্যপট কল্পনা করে নেবেন যাতে সহজে সূর্যোদয়ের দৃশ্য বোঝা যায়।

ভাস্কর একখন্ড পাথরকে ছেনি-বাঁটালি দিয়ে কুঁদে কুঁদে সূর্যোদয়ের দৃশ্য প্রস্তুত করবেন। সঙ্গীত শিল্পী প্রভাতের ভৈরবী রাগের উপর ভিত্তি করে রাগ রাগিনীর বিভিন্ন স্বরের নানা মাত্রা উপস্থাপন করে এমন সুরের জগৎ সৃষ্টি করবেন শ্রোতা হৃদয়ের গভীরে সূর্যোদয়ের দৃশ্য দেখবেন।

নৃত্য শিল্পী তার দেহ ভঙ্গিমায় এমন আবেশ সৃষ্টি করবেন যে, তার মূর্ছনায় আবিষ্ট হয়ে দর্শক যেন তার সামনেই সূর্যোদয় দেখবেন। ক্যামেরা শিল্পী সরাসরি সমুদ্রতীরে সূর্যোদয়ের দৃশ্য অবলম্বণে বিভিন্ন মাধ্যমে সৃষ্টি হলো বিভিন্ন শিল্প ; কবিতা, পেইন্টিং, ভাস্কর্য, সঙ্গীত, নৃত্য এবং ছবি তা ফটো।

কবিতা, মহাকাব্য, নাটক, উপন্যাস ইত্যাদির মাধ্যমে ভাষা হলেও ব্যবহার ও প্রয়োগের ভিন্নতা এবং বিষয়বস্তুর আঙ্গিকগত পার্থক্যের জন্য এদের মধ্যে মূলগত পার্থক্য রয়েছে। কবি যেভাবে ভাষা ব্যবহার করেন, গদ্য-শিল্পী সেভাবে ভাষা ব্যবহার করেন না। কবি ও মহাকবি উভয়েই ভাষা, ছন্দ ও মাত্রা নির্ভর।

কিন্তু উভয়ে এক রকম ছন্দ ব্যবহার করেন না। অনভূতির ভিন্নতার কারণে তারা একে অপর থেকে আলাদা। নাট্যকার ও উপন্যাসিকের ভাষারীতি গদ্য হলেও নাটকের সংলাপের মধ্যে নাট্যকার নিজের কথা কিছুই বলেন না, ঔপন্যাসিক প্রায় সবটাই নিজের কথা বলেন।


অনুকরণেররীতি বা পদ্ধতির হেরফেরের কারণে সবকিছু অনুকরণযোগ্য হরেও সবকিছু একই ভাবে বা ভঙ্গিতে অনুকৃত হয় না। এরিস্টটলের মতে বিভিন্ন শিল্পের মধ্যে পার্থক্যের কারণই হলো অনুকরণ পদ্ধতি।

এরিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্ব আলোচনা কর।




(খ) অনুকরণের বিষয়: অনুকরণের বিষয় বলতে বোঝায় যা অনুকৃত হয় বা যাকে অনুকরণ করা হয়, সেই বিষয় বা বস্তু। এরিস্টটল মানুষ এবং তার ক্রিয়াকলাপকেই অনুকরণের বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। পৃথিবীর ঘটে যাওয়া ঘটনার মধ্যে কোনো মিল নেই।

মানুষে মানুষে অনেক পার্থক্য। এ পার্থক্যের কারণ মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, চালচলন ও আচার ব্যবহার। সুখী মানুষের জীবনের সাথে দুঃখী মানুষের জীবনের পার্থক্য অনেক। পরিবেশের ভিন্নতার জন্যেও মানুষের জীবনে পার্থক্য ঘটে। মানুষের জীবন নিয়ে রচিত শিল্প-সাহিত্যও তাই বিচিত্র ধরনের।

নির্মাতার বা অনুকরণকারীর স্বভাবের কারণেও সাহিত্যে-শিল্পে ভিন্নতা আসে। কেউ উচ্চতর মানুষের চরিত্র আঁকেন, কেউ নিম্ন পর্যায়ের মানুষের চিত্র আঁকেন। একই নারীমূর্তি শিল্পীর তুলিতে আঁকা হলেও একর সাথে অন্যের ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। লিওনার্দ দ্যা ভিঞ্চির মোনালিসা’র মত চিত্র আর সৃষ্টি হতে না পারার কারণ মনে হয় অনুকারকের দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে অনুকরণে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বিভিন্ন চিত্রগুলো বিষয় এক হলেও ভিন্নতা পায়।


একই মানুষ এবং তাদের জীবন প্রবাহকে নিয়ে রচিত শিল্প সাহিত্য ভিন্নতার কারণ চরিত্র নির্মাণের ভিন্নতা আর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলে বলা যায় শিল্প সাহিত্যের ভিন্নতার মূলে রয়েছে অনুকরণের বিষয় নির্বাচন।


(গ) অনুকরণের রীতি বা পদ্ধতি: অনুকরণের রীতি বা পদ্ধতির জন্য একই বিষয় নিয়ে অনুকৃত শিল্প সাহিত্য ভিন্নতর হয়। পৃথিবীর সবকিছু একই নিয়মে বা রীতিতে বা ভঙ্গিতে অনুকৃত হয় না। একই বিষয় নিয়ে রচিত হলেও অনুকরণ পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে ইতিহাস, মহাকাব্য আর নাটক কখনো এক হতে পারে না। যেমন পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে রচিত হয়েছে ইতিহাস, কায়কোবাদ রচনা করেন ‘মহাশ্মশান মহাকাব্য, আর মুনীর চৌধুরী লিখেছেন ‘রক্তাক্ত প্রান্তর’ নাটক।

রচনার রীতি বা পদ্ধতির ভিন্নতার করণে এগুলি কখনই মিলে একাকার হয়ে যায় নি। এরিস্টটল এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে সফোক্লিসের নাটকের ভাব ও ভাষা গম্ভীর, আর এরিস্টোফেনিসের নাটকের ভাব ও ভাষা এর বিপরীত, হাল্কা বা তরল। এজন্য সফোক্লিস ট্র্যাজেডি রচয়িতা আর এরিস্টোফেনিসের রচনা কমেডি।

এরিস্টটলের ব্যাখ্যা অনুযায়ী অনুকরণবাদ সম্পর্কে আর একটি বিষয় পরিষ্কার হয় যে, সব ধরনের শিল্প তথা কাব্য-নাটক-সাহিত্য-সংগীত প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকৃত বিষয়কে তিনভাবে রূপ দেয়া যায়।
যেমনÑ
(ক) যথাযথভাব
(খ) অনুকৃত বিষয়কে উচ্চতর রূপে এবং
(গ) অনুকৃত বিষয়কে নিম্নতর রূপে প্রকাশ।

যথাযথ অনুকরণকে সাধারণত নকল থেকে পারে। কেননা কোনো ঘটনার হুবহু নকল করলে শিল্প বৈশিষ্ট্য তেমন থাকে না। তবে কোনো শিল্পী অবিকল অনুকরণ করে উন্নত শিল্প সৃষ্টি করতে পারেন। বাস্তব জীবন ভিত্তিক রচিত মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ওল্ডম্যান এ্যান্ড দ্যা সি’ এর উদাহরণ। এসব শিল্পের মধ্যে স্রষ্টার শৈল্পিক চেতনা, ব্যাখ্যা এবং পরিবেশনার বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বল ছাপ অনিবার্য। এখানে শিল্প স্রষ্টার মন মনন এবং কল্পনার ছাপও সুস্পষ্ট।


এরিস্টটলের মতে প্রাণি জগতের মধ্যে মানুষই বেশি অনুকরণশীল। মানুষ সৃষ্টিশীল বলেই তার অনুকরণের মধ্যে সবসময় একটা সৃজন প্রয়াস উপস্থিত থাকে। বাবুই পাখির বাসা নির্মাণ কিংবা মৌমাছির মৌচাক নির্মাণের মধ্যে উঁচু শিল্প নৈপূণ্য থাকলেও এর মধ্যে বৈচিত্র্য নেই। অনুকরণ এবং নিছক অনুকরণই এর কারণ। মানুষ কখনো এমন বৈচিত্র্যহীন বা সৃষ্টিহীন অনুকরণ করে না।


এরিস্টটলের অনুকরণের তিনটি নিয়মের মধ্যে দিয়ে এটাই বুঝাতে চেয়েছেন যেকোনো শিল্পের মধ্যে শিল্পীর নিজস্বতা প্রকাশ পায়। এরিস্টটল, প্লেটোর অনুকরণ তত্ত্বের নতুন ব্যাখ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন, যে শিল্প মাত্রই অনুকরণ নয়, তার মধ্যে সত্য প্রকাশ পায়। কাব্যের আবেদন শুধু দুর্বলের কাছে নয়। তিনি মনে করেন কাব্য মানব মনের গভীর স্তরের কাছে আবেদন জাগিয়ে তাকে সজাগ করে তোলে, সচেতন করে তার বুদ্ধি-যুক্তির অনুভূতিতে।

তিনি প্রমাণ করলেন কাব্যের সত্য বিশ্বজনীন। প্লেটো বলেছেন যে কাব্য সত্য থেকে তিন ধাপ দূরে। নিছক অনুকরণ মাত্র। প্লেটোর অনুকরণ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করতে এরিস্টটল দার্শনিক ব্যাখ্যার অবতারণা করে অনুকরণ তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন। এরিস্টটল বলেছেন জগৎ সত্য, মায়া নয়। তিনি বাস্তব থেকে ভাবে এবং বিশেষ থেকে নির্বিশেষের সন্ধান করতে চান। তাই তাঁর মতে কাব্য মূল থেকে তিন ধাপ দূরেতো নয়ই বরং মূলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

উপসংহার:

এরিস্টটলের অনুকরণ তত্ত্ব সাহিত্যে বাস্তব ও কল্পনার সমন্বয়ের দার্শনিক ব্যাখ্যা দেয়। শিল্পের সৌন্দর্য ও গঠনরূপ আলোচনা প্রসঙ্গে জীবনের সাথে শিল্পের সম্পর্কেকে তিনি অপরিহার্য বলে মনে করেন। কেননা জীবনেরই আরেক নাম সাহিত্য বা শিল্প। তাঁর মতে, অনুকরণ তত্ত্বের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষামূলক আনন্দ প্রদান—অর্থাৎ পাঠকের চিত্তকে পরিশুদ্ধ করা ও নৈতিক জাগরণ ঘটানো। এই অনুকরণ তত্ত্ব আজও সাহিত্যসমালোচনার মৌলিক নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, কারণ এটি মানবজীবনের শিল্পিত পুনর্গঠনের ধারণাকে সর্বপ্রথম তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

2 Responses

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *