‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যের বিষয়বস্তু, প্রেমভাবনা আলোচনা


সিন্ধু হিন্দোল কাজী নজরুল ইসলামের কাব্যগ্রন্থ, ১৯২৭ সালে প্রকাশিত এবং এতে মোট ১৯টি কবিতা রয়েছে। কাব্যগ্রন্থটি হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ও শামসুন নাহারকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
- কবি: কাজী নজরুল ইসলাম
- প্রকাশকাল: ১৯২৭ সাল বা ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ
- কবিতার সংখ্যা: মোট ১৯টি
- উৎসর্গ: হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী এবং শামসুন নাহারকে
প্রকাশক শ্রীগোপালদাস মজুমদার, ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রীট, কলিকাতা। মুদ্রাকর শ্রীনিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য, সারস্বত প্রিণ্টিং ওয়ার্কস, ৬ নিবেদিতা লেন, বাগবাজার, কলিকাতা। রয়্যাল অক্টোভো আকার; ৫৮ পৃষ্ঠা; মূল্য এক টাকা ছয় আনা।
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যগ্রন্থে মোট ১৯টি কবিতা রয়েছে।
কবিতাগুলো লেখা ১৯২৬ খৃষ্টাব্দে, জুলাই মাসে হেমন্তকুমার সরকারকে সঙ্গে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম চট্টগ্রামে আসেন। কয়েকদিন পর হেমন্তকুমার সরকার কলকাতায় ফিরে গেলেও মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহারের আমন্ত্রণে তাঁর মাতামহ শিক্ষাব্রতী মরহুম খান বাহাদুর আবদুল আজিজ বিএ-র বাড়িতে নজরুল কিছুকাল অবস্থান করেন।
এখানেই তিনি ২৭ জুলাই থেকে ২ আগষ্টের মধ্যে ‘অ-নামিকা’, ‘গোপন-প্রিয়া’, ‘সিন্ধু—প্রথম তরঙ্গ’, উৎসর্গ-পৃষ্ঠার পূর্বে যোজিত দুটি চরণ, ‘সিন্ধু—দ্বিতীয় তরঙ্গ’, মুহম্মদ হবীবুল্লাহ্ বাহার ও তাঁর ভগ্নী শামসুন্নাহারকে উৎসর্গ-কবিতা এবং ‘সিন্ধু—তৃতীয় তরঙ্গ’, রচনা করেন।
‘সিন্ধু’ প্রথম তরঙ্গ ১৩৩৩ অগ্রহায়ণের, দ্বিতীয় তরঙ্গ ১৩৩৩ পৌষের এবং তৃতীয় তরঙ্গ ১৩৩৩ মাঘের ‘কালিকলমে’ প্রকাশিত হয়।
‘পথের স্মৃতি’ গানটি ১৩২৭ মাঘের ‘নারায়ণ’ পত্রিকায় ‘ছায়ানট’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।
নজরুল ইসলাম ১৯২৬ সালে কেন্দ্রীয় আইন-সভায় নির্বাচন-কালে একদিন আবদুল কাদিরকে সঙ্গে নিয়ে জয়দেবপুর যাওয়ার সময় গাড়িতে বসে সুবিখ্যাত কবিতা ‘চাঁদনী রাতে’ রচনা করেন।
রাত্রে আকাশে যখন চাঁদ উঠেছে, চাঁদের আলোয় সারা আকাশ যখন তোলপাড়, আর প্রকৃতি যখন উতলা, তখন কবির মনের ত্রিসীমানায়ও ঘেঁষতে পারেনি নির্বাচন কি গজনভী সাহেব।’—
[সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবন, ৪২০-৪২১ পৃষ্ঠা]
‘মাধবী-প্রলাপ’ ১৩৩৩ জ্যৈষ্ঠের ‘কালিকলমে’ প্রকাশিত। প্রথম বর্ষে ‘কালিকলমের’ সম্পাদক ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও মুরলীধর বসু; কৃষ্ণনগর হতে কবি ১০-৪-২৬ তারিখের একপত্রে শৈলজানন্দকে লেখেন—
‘মাধবী-প্রলাপ পাঠালুম। বৈশাখেই দিও। দরকার হলে অদল-বদল করে নিও কথা—অবশ্য ছন্দ রক্ষা করে।’
[নজরুল-রচনা-সম্ভার, কলিকাতা সংস্করণ, ২৫৬+১৫ পৃষ্ঠা]
‘দ্বারে বাজে জঞ্ঝার জিঞ্জির’ ১৩৩৪ বৈশাখের ‘কল্লোল’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
উৎসর্গ পাতার পূর্বে যে দুটি চরণ ছিল, তা হল—
আলোর মতো জ্বলে ওঠো, ঊষার মতো ফোটো
তিমির চিরে জ্যোতির মতো প্রকাশ হয়ে ওঠো!
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের কবিতাসমূহ:
সিন্ধু, গোপন প্রিয়া, অনামিকা, বিদায়-স্মরণে, পথের স্মৃতি, উন্মনা, অতল পথের যাত্রী, দারিদ্র্য, বাসন্তী, ফাল্গুনী, মঙ্গলাচরণ, বধূবরণ, অভিযান, রাখীবন্ধন, চাঁদনীরাতে, মাধবী-প্রলাপ, দ্বারে বাজে ঝঞ্ঝার জিঞ্জির।
কাজী নজরুল ইসলাম (২৪ মে ১৮৯৯ – ২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ)
বিংশ শতাব্দীর প্রধান বাঙালি বিদ্রোহী ও প্রেমের সুন্দরের কবি ও সঙ্গীতকার। ২৩ বৎসরের সাহিত্যিক জীবনে কবির সৃষ্টির যে প্রাচুর্য তার সাথে আর কিছুরই তুলনা হয় না।
কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি কবি।
কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু হলো –
- মানবতা,
- প্রেম,
- বিদ্রোহ ও
- সাম্যবাদ।
- সিন্ধু হিন্দোল কাব্যে কবি সমুদ্রের তিন তরঙ্গের মাধ্যমে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, জীবন ও সমাজের উত্থান-পতনকে তুলে ধরেছেন এবং মানবতার জয়গান গেয়েছেন।
‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যে প্রেম ও মানবতার কথা বলা হয়েছে। কবি হৃদয়ের পবিত্রতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সাম্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সেইসাথে এই কাব্যগ্রন্থে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার প্রকাশ ঘটেছে। তিনি সমাজে বিদ্যমান বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক নতুন জাগরণের ডাক দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক যুগের অন্যায় অবিচার দূর করার জন্য তিনি নানাভাবে দ্রোহের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
সমুদের উপমা দিয়ে কবি সমাজ ও মানুষের নানা পর্যায় তুলে ধরেছেন। সমুদ্রের তিনটি তরঙ্গের উপমা ব্যবহার করেছেন। এই তরঙ্গগুলো যেন মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বেদনা, এবং উচ্ছ্বাসের প্রতীক।
নজরুলের অনেকগুলো রোমান্টিক কাব্য প্রেমের কাব্য রয়েছে। তার মধ্যে এই কাব্যগ্রন্থটি রোমান্টিক সাহিত্য-নন্দনতত্ত্বের বিচিত্র প্রকাশ ঘটেছে। এটি নজরুলের রোমান্টিক কাব্যগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের মধ্যে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব রয়েছে। কবি তার কবিতার মাধ্যমে সমাজের মানুষকে সচেতন করতে চেয়েছেন এবং একটি নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন।
বেগম আকতার কামাল নজরুল –সিন্ধুর তিন তরঙ্গ নিবন্ধে সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের সমুদ্র নিয়ে লেখা কবিতার অসাধারণ ব্যাখ্যা করেছেন। কবিতায় ব্যবহৃত উপমাগুলো সমাজ ও মানুষের যাপিত জীবন ও মননের নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার নানা রকম ব্যঞ্জনার জন্ম দেয়। ফলে কবিতায় ব্যবহৃত গাছপালা, ফুল-ফল, নদী-সমুদ্র, আকাশ বাতাসের সাথে একটা মানবিক সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে ওঠে।
শৈল্পিক দৃষ্টি দিয়ে শিল্পিত করে কবিগণ যে কাব্যসৌন্দর্য গড়ে তোলেন তাতেই পাঠক বোজে যে প্রকৃতি কত সুন্দর, নদী সমুদ্রের ঢেউ আমাদের চিত্তের বিচিত্র তরঙ্গলীলা। রবীন্দ্রনাথও সোনার তরী কাব্যে সমুদ্রের প্রতি বা বসুন্ধরা কবিতায় সমুদ্রের সাথে মানুষের একটা আত্মিক বন্ধন খুঁজে পেয়েছেন, নজরুলও তেমনি সমুদ্রের তিন তরঙ্গ দিয়ে মানুষের হৃদয়বৃত্তির নানা বিচিত্রতা প্রকাশ করেছেন।
রোমান্টিক কবিরা জগতের বিষাদ-বিষণ্নতার মধ্যে আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন করতে গিয়ে দুঃখকেই আশা-তরঙ্গের ভেলা করে তোলেন।
‘নজরুলের ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কবিতায় তিনটি তরঙ্গে ঢেউয়ের অবিরাম গর্জন-আলোড়ন-অস্থিরতার সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে কবির বিক্ষোভ-বেদনা-উত্তাল দুঃখ-দ্রোহের ছন্দ।’
যদিও ইউরোপীয় রোমান্টিসিমের সাথে রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিসিজমের যেমন পার্থক্য রয়েছে, নজরুলের রোমান্টিসিজমের সাথেও পার্থক্য বিদ্যমান। নজরুলে রোমান্টিসিজমকে ধারণ করেছেন ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে, ধর্ম ও সমাজকে আঘাত করেছেন মানুষকে জাগিয়ে তুলতে, ঔপনিবেশিক শক্তিকে ধ্বংসকরণে তিনি হয়ে ওঠেন বিদ্রোহী।
বেগম আকতার কামাল বলেন –
আরেক মাত্রায় তাঁর প্রেমসত্তা, যা রোমান্টিসিজমের মৌল, তাতে তীব্র জ্বালাময়ী ক্রন্দন, ব্যথাহত বেদনার ধারক। এই দ্রোহশক্তি ও বিধুর বেদনা – দুইয়ের সম্মিলন ঘটেছে তাঁর কবিতায়, গল্পে-উপন্যাসে। প্রভুত্ববাদের বিরুদ্ধে তাঁর দ্রোহশক্তি যেমন কোনো রূপক-প্রতীকের ছদ্মবেশ নেয়নি, তা প্রত্যক্ষ ও সরাসরি, তেমনি তাঁর বিষাদ-বেদনাও দেহকে ছাড়িয়ে অতীন্দ্রিয়লোকে উত্তরণ করেনি। তাই বলা চলে নজরুলের রোমান্টিসজম একান্তই পার্থিব।
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের সিন্ধু কবিতার তিন তরঙ্গ তিন রূপে চিত্রিত। সমুদ্রকে পুরুষরূপে চিত্রিত করে সমুদ্রকে সমাসোক্তি ( অচেতন বস্তুর উপর চেতন বস্তুর আচরণ আরোপ করা) অলঙ্কারে পরিণত করেছেন।
নজরুল কবিচিত্তের বিক্ষুব্ধতা সমুদ্র ছাড়া আর কী দিয়ে প্রকাশ করা যায়? কবিচিত্তের যে অতলতা, বিরহ-বিচ্ছেদের যে গভীরতা, দ্রোহের যে ব্যাপকতা তার যথার্থ প্রতীক তো সমুদ্রের অগাধ জলরাশি। সেজন্যই কবি সিন্ধুকে বন্ধু , সখা বলে সম্বোধন করেছেন। তুমি কাঁদ, আমি কাঁদি কাঁদে মোর প্রিয়া।
নজরুল কবিমানসের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রচণ্ড অভিমান, একটা অতৃপ্তি এবং সে কারণে প্রচণ্ড ক্ষোভ। কবির যন্ত্রণা, বেদনা, রক্তক্ষরণ সবই ব্যাপক, সেই সাথে আবার অশ্রুভেজা। চিরবিদ্রোহীও বটে। অনেকটা সমুদ্রের মতো। সমুদ্র যেমন বিরামহীন উদ্বেলিত, সক্রিয়, সদা চঞ্চল, তেমনি তার বেদনাও সদা বিরামহীনভাবে আলোড়িত। অব্যক্ত ভাষায় সে যেন তার ব্যথাসিক্ত মনের কথা, চিত্তের কথা অনবরত বলে চলে। নজরুলের চিত্তভূমিও সে রকম, তাই সিন্ধু তার বন্ধু বা সখা। ফলে সমুদ্রের তরঙ্গ ছাড়া কবি মনের উপমা আর কী হতে পারে।
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের সিন্ধু কবিতার প্রথম তরঙ্গ:
এখানে কবি বন্ধু হিসেবে মধুর সম্পর্ক নিয়ে সমুদ্রের হৃদয়ের অব্যক্ত ব্যথা বুঝতে চেয়েছেন।
সমুদ্রের তরঙ্গ নিয়ে নজরুলের উপলব্দির বিচিত্রতা এখানেই যে তিনি অতীত নয়, ভবিষ্যতের কবিও নয়, তিনি বর্তমানের কবি। তাই তার উপলব্ধি সমকালীন সমাজবাস্তবতার নিরিখে।
বেগম আকতার কামালের মতে-
এই বর্তমানতা অথচ নিত্যতা ইঙ্গিত করে তাঁর সময়চেতনার স্বরূপকে। চলমান চঞ্চল বর্তমানই তাঁর আধেয়, বর্তমানেই তাঁর ক্ষুব্ধতা ও প্রেমিকতার বসতি। অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ – এই ত্রিকালস্পর্শের আকাঙক্ষা থাকে আধুনিক কবিতায়, এই কবি ঘটমান বর্তমানেই নিজের অসিন্তত্ব ও নান্দনিকতাকে তরঙ্গায়িত করেছেন, নিত্যতার প্রশ্নে দেখি ‘দিবা নাই রাত্রি নাই, অনন্ত ক্রন্দন। থামিল না, বন্ধু-, তব’ – এই কাব্যাংশে লক্ষ করি সেই নিত্যতাকে যা দৃশ্যমান বাস্তবতার ছবিই তুলে ধরে। এই দৃশ্যমান বাস্তবতা তাঁর কবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য।
সমুদ্র তরঙ্গের আন্দোলিত হওয়ার সাথে চাঁদের একটা সম্পর্কতো আছেই। তাই কবি চাঁদকে সমুদ্রের প্রেমিকারূপেও কল্পনা করেছেন।
‘চাঁদের চাঁদিনী বুঝি তাই এত টানে
তোমার সাগর-প্রাণ, জাগায় জোয়ার?
কী রহস্য আছে চাঁদে লুকানো তোমার?
…ঐ চাঁদ সে কি প্রেয়সী তোমার?
টানিয়া সে মেঘের আড়াল
সুদূরিকা সুদূরেই থাকে চিরকাল?’
চাঁদের কলঙ্ককে কবি সমুদ্রের ‘ক্ষুধাতুর চুম্বনের দাগ’ মনে করেন – যা বেশ অভিনব কল্পনা। চাঁদের বিচ্ছেদজনিত কারণে সমুদ্রের বিক্ষুব্ধুতা ‘তাই
তরঙ্গে আছড়ি মরে আক্রোশে বৃথাই?’
রোমান্টিকতার ধারায় রবীন্দ্রনাথ যেখানে না-পাওয়ার মধ্যেই , চিরবিরহের মধ্যেই প্রেমিকাকে পেতে চেয়েছেন, নজরুলের চাওয়ার মধ্যে রয়েছে ক্রিয়াশীলতা।
তাতে স্তব্ধতা নেই –
‘জাগিল আনন্দ-ব্যথা, জাগিল জোয়ার,
লাগিল তরঙ্গে দোলা, ভাঙিল দুয়ার,
মাতিয়া উঠিলে তুমি।
এই মাতামাতিতে ‘নিদ্রাতুরা ভূমি’ কেঁপে ওঠে, বাতাস হতাশ্বাসে ভরে যায়, আকাশের শূন্যতায়
‘নীলিমা-উচ্ছ্বাস জাগে।’
‘বিস্ময়ে বাহিরি’ এল নব নব নক্ষত্রের দল,
রোমাঞ্চিত হল ধারা,
বুক চিরে এল তার তৃণ ফুল-ফল।’
এই যে বিরহব্যথা, সেই সাথে পাওয়ার বাসনা এ থেকেই জাগে সৃষ্টির প্রেরণা।
‘জলে জলে ঢলাঢলি চলমান বেগে,
ফুলে হুলে চুমোচুমি – চরাচরে বেলা ওঠে জেগে।’
সৃষ্টির নেশায় সবকিছুর মধ্যে কামবাসনার উদ্রেক হয়-
‘দেবতা ইহার শিব নয়’ – কামরতিই সৃষ্টির বীজতলা। অনন্ত ক্ষুধায় সমুদ্র ও সমস্ত সৃষ্টিতে কম্পন জাগে। তবে না-পাওয়ার ব্যথাও আছে, আর সে ব্যথা – ‘ক্ষুধার পীড়া গলে যায় সারা হিয়া, ছিঁড়ে যায় যত স্নায়ু শিরা।’
সমুদ্র ও চাঁদের যে সম্পর্ক তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার তা হলো সমুদ্র চাঁদকে চাচ্ছে ঠিকই কিন্তু এ কামনার কখনও পরিতৃপ্তি হবে না। চাঁদের প্রতিচ্ছায়াই শুধু পেয়ে থাকে। এ ক্রন্দন চিরকালীন।
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের সিন্ধু কবিতার দ্বিতীয় তরঙ্গ:
এখানে সিন্ধুর সাথে কবির একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। কবি হৃদয়ের সাথে সিন্ধুর একাত্মতা ঘটে। এখানে সিন্ধু ভূমিগ্রাসী! যে-রূপটি ফুটেছে তা-ও ‘নিষ্ফল আক্রোশের আস্ফালন’ – ‘সর্বগ্রাসী!
গ্রাসিতেছ মৃত্যু-ক্ষুধা নিয়া/
ধরণীরে তিলে তিলে!/
হে অস্থির! স্থির নাহি হ’তে দিলে/
পৃথিবীরে
ও গো নৃত্য-ভোলা,/
ধরারে দোলায় শূন্যে তোমার হিন্দোলা।’
দ্বিতীয় তরঙ্গের সম্পূর্ণটাই ক্রিয়া ও নৃত্যছন্দে উচ্ছ্বসিত। এখানে কবি আর সমুদ্র একীভূত, নিজেকেই সম্বোধন করেন ‘বন্ধু’ বলে – নিজেকে অর্থাৎ নিজের সমুদ্রতরঙ্গাকুল প্রেমসত্তাকে
– ‘হে-‘মজনুন’ কোন্ সে ‘লায়লী’র/
প্রলয়ে উন্মাদ তুমি? বিরহ অথির/
করিয়াছ বিদ্রোহ ঘোষণা।’
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের সিন্ধু কবিতার তৃতীয় তরঙ্গ:
তৃতীয় তরঙ্গে নজরুল সমুদ্রের সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্কের জালটি পেতে দেন। সমুদ্র এখানে বুভুক্ষু –
‘তিন ভাগ গ্রাসিয়াছ – এক ভাগ বাকি!
সুরা নাই – পাত্র-হাতে কাঁপিতেছে সাকি।’
সমুদ্র আপন তরঙ্গমালা নিয়েই বিভোর, কবির বাসনা
‘শস্য-শ্যামা বসুমতী ফুলে-ফলে ভরিয়া অঞ্জলি
কবিছে বন্দনা তব, বলী!
তুমি আছ নিয়া নিজ দুরন্ত কলেস্নাল
আপনাতে আপনি বিভোল,।’
এখানে কবির সঙ্গে সমুদ্রের আর বন্ধুতা নেই, কারণ সমুদ্র আন্তভোলা, পৃথিবীর প্রতি একান্ত উদাসীন। জনমানুষের সঙ্গে নজরুলের যে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক সেখানে আন্ততা সত্ত্বেও তিনি বহু হয়ে ওঠেন, বহুজন সংস্পর্শে যেতে চান।
তরঙ্গ চিরবিরহী ও বিদ্রোহী। নজরুল দ্রোহকে তথা শক্তিকে সর্বদাই গেঁথে দেন ব্যথাব্যাকুলতার সঙ্গেও, আর তাতেই ঝলকে ওঠে সৌন্দর্য –
‘সুন্দর আমার।
নমস্কার!/
নমস্কার লহ।
তুমি কাঁদো, – আমি কাঁদি – কাঁদে মোর প্রিয় অহরহ।’
বিরহই শেষ কথা, যদিও সমুদ্রের পার আছে কূল আছে কিন্তু কবির অনন্ত বিরহের ‘নাহি পার, – নাহি কূল, – শুধু স্বপ্ন, ভুল।’
কী বিচিত্র উপলব্ধি –
‘মাগিব বিদায় যবে, – নাহি র’ব আর,
তব কল্লোলের মাঝে বাজে যেন ক্রন্দন আমার!
বৃথাই খুঁজিবে যবে প্রিয়া,
উত্তরিও বন্ধু ওগো সিন্ধু মোর, তুমি গরজিয়া।
তুমি শূন্য, আমি শূন্য; শূন্য চারিধার,
মধ্যে কাঁদে বারিধারা, সীমাহীন রিক্ত হাহাকার।’
তিনটি তরঙ্গেই মূল স্বর বিরহীর ও ক্রন্দনের, শেষে এসে যে-শূন্যতার কথা বলা হল তা কবির চির-একাকিত্বের দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এই যে শূন্যতা তা প্রিয়ার অভাবজনিত। আর যে বেদনা তা উদাসীন প্রত্যাখানের তীব্র ব্যথা। ব্যথা-বেদনার যে তীব্র সুর প্রকাশিত তা বাংলা সাহিত্যে আর পাওয়া যায় না। চিরবিরহের বেদনার এই যে তীব্রতা এখানেই নজরুলের স্বাতন্ত্র্যতা।
সিন্ধু হিন্দোলের কবি নজরুল:
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) তাঁর কাব্যের বিচিত্র অনুষঙ্গ, আঙ্গিকের প্রায়োগিক বৈচিত্র্য, নন্দনতত্ত্বের বহুসূত্রের প্রয়োগে নজরুলকে আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বাংলা কাব্যাঙ্গনে করেছে।
তবে বিদ্রোহী কবি হিসেবে বেশি পরিচিতি পেলেও বাংলা কাব্যাঙ্গনে নজরুলকে রোমান্টিক কবি হিসেবেও পাঠক দেখে। তবে নজরুলের সমগ্র কবিতা রোমান্টিক নন্দনতত্ত্বে পাঠ সম্ভব নয়; কারণ এর রয়েছে নানা নন্দনতাত্ত্বিক সমস্যা। রোমান্টিক ভাবালুতা, আবেগ, প্রকৃতিপ্রেম, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা- এই সবই রোমান্টিক কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য হয়। নজরুল কাব্যে এ সবের প্রভাব রয়েছে।
বিশেষ করে নজরুলের দোলনচাঁপা, ছায়ানট, চিত্তনামা, পূবের হাওয়া, সিন্ধু-হিন্দোল, চক্রবাক, সন্ধ্যা কাব্যের কবিতাসমূহে রোমান্টিক সাহিত্য-বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। রোমান্টিক সাহিত্য-নন্দনতত্ত্বের মৌলিক সূত্রসমূহের সাথে এইসকল কাব্যের অন্তর্গত কবিতার সাযুজ্য বজায় রয়েছে।
নজরুলের অগ্নি-বীণা, সাম্যবাদী, সর্বহারা, বিষের বাঁশী কাব্যের প্রায় সকল কবিতায় ঔপনিবেশিক ভারতের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার স্বতঃহ্নূর্ত প্রকাশ ঘটেছে। রোমান্টিক নন্দনতত্ত্ব সবসময় স্নিগ্ধতার ব্যাপারে সচেতন থেকেছে; একটা বিদ্রোহী ভাবের কথা বলতে চেয়েছে বার বার। কিšদ কবিতার প্রকাশগত দিক থেকে রোমান্টিক সাহিত্য বরাবরই স্নিগ্ধতা আর কোমলতাকে প্রশ্রয় দেয়। বিদ্রোহী কবিতার মধ্যেও কবি ঘোষণা করেছেন — আমি কুমারীর প্রেমের প্রথম পরশ।
রোমান্টিক যুগের কবি হয়েও ঔপনিবেশিক প্রভাবের কারণে কবি সব সময় একটা বিদ্রোহের ভাব প্রকাশ করেছেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার, মানবিকতা, অসাম্প্রদায়ক মনোভাব নজরুলের প্রতিটি কাব্যেও মধ্যে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে রয়ে গেছে। এমনকি নিখুঁত রোমান্টিক কবিতার মধ্যে একটা দ্রোহচেতনা কাজ করেছে। এ সব কবিতা দেখে মনে হয় দ্রোহের কবি রোমান্টিক কবিতায় ভিন্নভাবে দ্রোহ নিয়েই প্রকাশিত।
ঔপনিবেশিক ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে শেলি, কিটস প্রমুখ রোমান্টিক কবিরা যে ভাবতন্ময়ে বিভোর হয়ে কবিতা লিখেছেন, একটা স্বর্গরাজ্য সৃষ্টি করেছেন, সেই স্বর্গরাজ্যে সুন্দর-মঙ্গল-শুভবোধের ছড়াছড়ি। কিন্তু নজরুলের পক্ষে তা সম্ভব নয়।
নজরুলের পক্ষে রোমান্টিক কবি হিসেবে কাব্যজগতের সেই বাস্তব-ভূমি পাওয়া অসম্ভব। ‘তাই উপনিবেশের ক্ষমতা-কেন্দ্রে বসে যে ধরনের কবিতা ‘কিটসরা’ লিখেছেন সেধরনের কবিতা নজরুলের লেখা সম্ভব নয়।’
নজরুল চক্রবাক, দোলনচাঁপা ও সিন্ধু হিন্দোল কাব্যে শেলি কিটস প্রমুখের লেখা রোমান্টিক ধরনের কবিতা লেখেননি এমন নয়, তবে নজরুলকে যে সকল কবিতা লেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে মাপাজোখা করা হয় সেই সকল কবিতা ‘কীটসদের’ কবিতা থেকে ভিন্নতর।
নজরুলের কাব্যের একটা অংশ সম্পৃক্ত দ্রোহ, বিপ্লব ও উন্মাদনার সাথে। যদিও এ দ্রোহচেতনা রোমান্টিসিজমেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ শাখা; তবুও রোমান্টিসিজমের সাথে রয়েছে এর বিস্তর ফারাক। স্নিগ্ধতা, আবেগ, কোমলতা, ভাষার ভাবালুতা, আধ্যাত্মিকতার অনেক কিছুই নজরুল কাব্যে থাকলেও প্রকৃত রোমান্টিসিজমের মতো নয়।
তবে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ রচনার পরিপ্রেক্ষিত সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নজরুল এই কবিতা রচনা করছেন। আঙ্গিক ব্যবহারের বেলায়ও একটা বিশেষ হিসেব-নিকেশের হেরফের চোখে পড়ে।
সিন্ধু হিন্দোল কাব্যে নজরুল জীবনের প্রবাহ, প্রকৃতির সুর ও প্রেমের আবেগকে একাকার করেছেন এক অনুপম কাব্যভাষায়। এখানে সিন্ধুর ঢেউয়ের দোলায় যেমন প্রকৃতির অনন্ত গতি ও ছন্দ ধ্বনিত হয়েছে, তেমনি কবির হৃদয়ের বিরহবেদনার বিক্ষুব্ধতাকে সর্বজনীন করে তুলেছেন। যেন মানুষের অন্তর্জগতের তরঙ্গও প্রকাশ পেয়েছে গভীর অনুভূতির স্বরে। সিন্ধু হিন্দোল কাব্যে কবি প্রেম, বিরহ, আশা ও জীবনের নিত্য নবীন সৃষ্টিস্রোতকে মিলিয়ে এক মহাকাব্যিক ভাবমূর্তি নির্মাণ করেছেন। ফলে ‘সিন্ধু হিন্দোল’ শুধু একটি প্রেমকাব্য নয়, এটি মানবজীবনের উত্থান-পতন, সুখ-দুঃখ ও সৌন্দর্যবোধের এক সার্থক প্রতীকী রূপায়ণ। এখানেই সিন্ধু হিন্দোল কাব্যের সার্থকতা।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ যশোর