বৈষ্ণব পদাবলিতে রসের পরিচয়

রসের পরিচয়:
রস’ সাহিত্যতত্ত্বের একটি মূল ধারণা, প্রাচীনকাল থেকেই প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে এর ব্যাপক চর্চা, যার অর্থ হলো অনুভূতির পরিশুদ্ধ ও পরিণত আনন্দানুভূতি। সাধারণ সাহিত্যে রস যেভাবে প্রকাশ পায়, বৈষ্ণব পদাবলিতে অবশ্য সেভাবে প্রকাশিত নয়। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলিতে এই রসের পরিচয় সবচেয়ে গভীরভাবে প্রকাশ পেয়েছে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলার মাধ্যমে। এখানে প্রেম কেবল শারীরিক নয়, তা ভক্তি ও আত্মার মিলনের প্রতীক। মিলন ও বিরহ — এই দুই অবস্থার মধ্যে কবিরা সৃষ্টি করেছেন এক অনন্ত মধুর রসের জগৎ। রসের পরিচয় দিতে গিয়ে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে, সাহিত্যের রসের পরিচয় দিতে অন্যান্য ধারার ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় পদাবলির ক্ষেত্রে পুরোপুরি খাটে না।

বৈষ্ণব পদাবলির রসের পরিচয়
রাধা-কৃষ্ণ জীবাত্মা-পরমাত্মার প্রতীক ধরেই পদকর্তারা পদাবলি সাহিত্যের রচনা করেছেন। রসের পরিচয় প্রসঙ্গে এ দিকটি মাথায় রাখতে হবে। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলীর মধ্যে রাধার বিরহের জ্বালা, কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে হৃদয়ের বেদনা, আবার মিলনের আনন্দ — সব মিলিয়ে বৈষ্ণব পদাবলি হয়ে উঠেছে রসসৃষ্টি ও ভক্তির এক সঙ্গীতধারা। এই রস মানব-প্রেমকে ঈশ্বরপ্রেমে উত্তীর্ণ করেছে, ফলে বৈষ্ণব পদাবলিতে রসের পরিচয় পাওয়া যায় এক আধ্যাত্মিক ও চিরন্তন অনুভূতির রূপে। বৈষ্ণব পদাবলি বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে বৈষ্ণব পদাবলি এক অনন্য সৃষ্টি, যেখানে ভক্তি ও প্রেম একাকার হয়ে এক অতুলনীয় রসসৃষ্টি ঘটিয়েছে। চৈতন্য ভাবধারার প্রভাবে রাধাকৃষ্ণ প্রেমের মাধ্যমে যে মানবিক ও আধ্যাত্মিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে, তাকে বলা হয় বৈষ্ণব পদাবলির রসসৌন্দর্য। এই পদাবলিতে ভক্তির রস, প্রেমের রস, বিরহের রস ও মিলনের রস পরস্পরে মিলেমিশে এমন এক আবেগময় সুর সৃষ্টি করেছে যা বাংলা কবিতার ইতিহাসে চিরন্তন। তবে কথা থাকে। বৈষ্ণব পদাবলি বৈষ্ণবদের ধর্মের, দর্শনের। পাঠক সাহিত্যিক মন নিয়ে ভাবলেও প্রকৃতভাবে বৈষ্ণব পদাবলিতে পদকর্তারা তাদের ধর্মের নানা অধ্যায় ব্যক্ত করেছেন।

বৈষ্ণব পদাবলি বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের রসভাষ্য। পদাবলির সাহায্যে পদকর্তারা তাদের ধর্মকে প্রচার ও প্রসার ঘটালেও পদাবলি রচনার সময় তারা সাহিত্য-তত্ত্বের দিকেও খেয়াল রেখেছিলেন। তাই পদাবলির মধ্যে সাহিত্য-রস ফুটে উঠেছে। তবে, ধর্মের আশ্রয়ে গড়ে ওঠা সাহিত্যের রস নির্ণয় করা ঐ পথের পথিকের জন্য সহজ, কিন্তু অন্যদের পক্ষে এটা বড় কঠিন কাজ। রূপ গোস্বামী তার ‘উজ্জ্বল নীলমনি’ ও ‘ভক্তিরসামৃতসিন্ধু’ এবং জীব গোস্বামী ‘ষটসন্দর্ভ’-এ বৈষ্ণব দর্শন ও রসতত্ত্ব সম্পর্কে মূল আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন সহায়ক গ্রন্থের সহায়তায় বৈষ্ণব পদাবলিতে বিধৃত রসের পরিচয় দেবার চেষ্টা করব। তবে তার আগে অলংকার শাস্ত্র অনুযায়ী রসের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে।
অলংকার শাস্ত্র অনুসারে রসের পরিচয়:
অলংকার শাস্ত্র অনুযায়ী স্থায়ী ভাব নয়টি। কাব্যে এ স্থায়ীভাব বিভাব, অনুভাব, ও সঞ্চারী ভাবের সংযোগে রসে পরিণত হয়। রতি নামক স্থায়ীভাব থেকে শৃঙ্গার রসের সৃষ্টি হয়। নায়ক-নায়িকা এখানে আলম্বন বিভাব। বৈষ্ণব শাস্ত্রকারেরা রতিভাব ও শৃঙ্গার রসের অর্থকে সম্প্রসারণ করেছেন। তাদের মতে রতি বলতে কৃষ্ণরতি এবং তার রস বলতে ভক্তিরসাত্মক কৃষ্ণশৃঙ্গার। এখানে রাধা-কৃষ্ণলীলা হলো বিভাব, রাধাকৃষ্ণের পারস্পরিক অনুরাগ বোঝাতে যে-সব বাচিক বা আঙ্গিক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে সেগুলো অনুভাব। মূল রসকে পরিপুষ্টি দানের জন্য যে-সব রসের সাহায্য নেয়া হয়েছে সেগুলো সঞ্চারীভাব।
বৈষ্ণবদের মতে রসের পরিচয় : বৈষ্ণবদের মতে রস পাঁচ প্রকার। সেগুলো হলো শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর। এখানে পাঁচটি রসের কথা বলা হলেও মূলত রস একটি, তাহলো ভক্তিরস। কৃষ্ণের নাম শুনলে, জপ করলে ও স্মরণ করলে ভক্তের মনে কৃষ্ণরতি জেগে ওঠে। এই কৃষ্ণরতি বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংযোগে ভক্ত হৃদয়ে ভক্তিরসে রূপান্তরিত হয়।
ভক্তের মনে কৃষ্ণরতি পাঁচভাবে আসতে পারে। তাই, বৈষ্ণব সাহিত্যে রস পাঁচ প্রকার। পাঁচ প্রকার রসের পরিচয় নিম্নে দেয়া হলো।
১। শান্তরস : শান্ত রসের স্থায়ীভাব হলো শম রতি। কৃষ্ণকে পরম ঐশ্বর্যশালী মনে করে ভক্ত কৃষ্ণের পায়ে নিজেকে সপেঁ দেয়। কৃষ্ণকে পরম সত্য জেনে মন থেকে সমস্ত জাগতিক বিষয় দূর করে দেয়। এখানে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনো আত্মীয় সম্পর্ক থাকে না।
২। দাস্যরসঃ সেবা রতি থেকে দাস্য রসের সৃষ্টি। এখানে ভগবান প্রভু, আর ভক্ত দাস। কৃষ্ণের ঐশ্বর্য দেখে ভক্ত আকৃষ্ট হয়। ভক্ত তাকে সেবা করে কৃতার্থ হয়। এখানে শান্ত রসের সাথে সেবা মিশেছে।
৩। সখ্যরস : বিশ্রম্ভ রতি থেকে সখ্য রসের সৃষ্টি। এখানে ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস থাকে। তাদের প্রাণের সাথে প্রাণের সংযোগ সৃষ্টি হয়। শান্তের কৃষ্ণনিষ্ঠা, দাস্যের সেবার সাথে এখানে বন্ধুত্বের সমপ্রাণতা যুক্ত হয়েছে। এখানে তারা দু’জন দু’জনার বন্ধু।
৪। বাৎসল্যরস : বৎসলতা থেকে বাৎসল্য রসের সৃষ্টি। ভগবান এখানে সন্তান, ভক্ত মাতা বা পিতা। এখানে শান্তের নিষ্ঠা, দাস্যের সেবা, সখ্যের সমপ্রাণতার সাথে মায়ের মমতা যুক্ত হয়।
৫। মধুররস: মধুরা রতি থেকে মধুর রসের সৃষ্টি। শ্রীকৃষ্ণ এখানে কান্ত, রাধা কান্তা। আগের চারটি ভাবের সাথে এখানে মধুরের কান্তাকান্তভাব মিলেছে। সর্ব রসের সার মধুর রস। বেশির ভাগ বৈষ্ণব পদাবলি মধুর রসের। শান্তে ভালোবাসা নেই, ভয় ও বিশ্বয় মিশ্রিত ভক্তি রস আছে। ভালোবাসার সূচনা দাস্যে এবং সখ্য ও বাৎসল্য রসের মধ্যে দিয়ে সেই ভালোবাসা পরিণত হয় মধুর রসে। শৃঙ্গার রসই বৈষ্ণবীয় শাস্ত্রে মধুর রস।
মধুরা রতি আবার তিন রকমের। যথা:
ক। সাধারণীঃ কৃষ্ণের রূপে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্রিয় ভোগের ইচ্ছাই সাধারণী রতি। কুজ্জার রতি সাধারণী।
খ। সমঞ্জসা: কৃষ্ণের রূপে মৃগ্ধ হয়ে শাস্ত্রসম্মতভাবে পরিণয়ে আবদ্ধ হয়ে কৃষ্ণের সঙ্গ লাভের ইচ্ছার নাম সমঞ্জসা। দ্বারকায় রুক্মিনী সত্যভামা সমঞ্জসা রতির নায়িকা ছিলেন।
সমর্থা : এ রতির একমাত্র লক্ষ্য ভগবানকে তৃপ্তি দেওয়া এবং এতে ভগবান ভক্তের বশ হয়। গোপীরা সমর্থা রতির নায়িকা। এরা কৃষ্ণের তৃপ্তি সাধনের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে কৃষ্ণের নিত্যপ্রিয়া হয়েছে। নিত্যপ্রিয়াদের মধ্যে রাধা শ্রেষ্ঠা।
কৃষ্ণ রতির দুটি ভাগ –স্বকীয়া আর পরকীয়া। সমঞ্জসা রতির নায়িকারা স্বকীয়া। সমর্থা রতির নায়িকারা পরকীয়া। কেননা গোপীরা গোপগণের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও কৃষ্ণের সম্ভোগ চেয়েছিল। তত্ত্বের দিক থেকে রাধা কৃষ্ণের নিজেরই অংশ, তাই স্বকীয়া। কিন্তু লৌকিক দৃষ্টিতে রাধা আয়ান ঘোষের বউ, অথচ কৃষ্ণের সম্ভোগ চেয়েছে, তাই রাধা পরকীয়া।
সমর্থা রতিই ক্রমে ক্রমে প্রেম, স্নেহ, মান, প্রণয়, রাগ, অনুরাগ, ভাব এবং মহাভাবে পরিণতি লাভকরে। শ্রীরাধাকে মহাভাবম্বরুপিণী বলা হয়।
মধুর রস লীলাভেদে দু’রকম।
যথাঃ ১. বিপ্রলম্ভ
২. সম্ভোগ
বিপ্রলম্ভ: নায়ক নায়িকা একে অন্যের প্রতি আসক্ত, রতি মিলনের জন্য উগ্রীব, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মিলন হয়নি, এই পর্যায়ের নাম বিপ্রলম্ভ। বৈষ্ণব পদাবলীতে বিরহমূলক বিপ্রলম্ভের পরিচয় বেশি।
বিলম্ভের চারটি ভাগ-
পূর্বরাগ : মিলনের আগে পরস্পরের দেখাদেখির দ্বারা নায়ক নায়িকার চিত্তে জন্ম নেওয়া রতি বিভাবাদির দ্বারা রসে পরিণতি হলে তাকে পূর্বরাগ বলে।
সই, কেবা শুনাইল ঐ শ্যাম নাম
কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গিয়া
আকুল করিল মোর প্রাণ।
মান: নায়িকাকে ছেড়ে নায়ক প্রতিনায়িকাকে গুরুত্ব দিলে নায়িকার মনে ঈর্যাজনিত রোষ দেখা দেয়। তার আম্বাধযোগ্য অবস্থার নাম মান।
তোমার কঠিন হিয়া ভজ নানা নারী লৈয়া
কোথা গেলা বসি রৈনু আমি
পালঙ্ক সাজই নারী জাগিয়া কান্দিয়া পুড়ি
নিশি গেল না আসিলা তুমি।
প্রেমবৈচিত্ত্য: প্রেমের গভীরতার কারণে প্রিয়াকে কাছে পেয়েও হারাবার ভয় জনিত যে বেদনা, তারই আস্বাদযোগ্য অবস্থার নাম প্রেমবৈচিত্ত্য। আক্ষেপানুরাণ প্রেমবৈচিত্ত্যেরই অংশবিশেষ।
সুখের লাগিয়া এ ঘর বাধিনু
অনলে পুড়িয়া গেল
অমিয়া সাগরে সিনান করিতে
সকলি গরল ভেল।
প্রবাস: ভিন্ন দেশে চলে যাওয়ার কারণে নায়ক নায়িকার মনে যে বিরহ বেদনার সৃষ্টি হয়, সেই বেদনার আস্বাদ্য অবস্থার নাম প্রবাস। শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরা গমনকে প্রবাস বলা হয়। এ অংশের নাম মাথুর। বৈষ্ণব পদাবলিতে মাথুর পর্যায়ের উৎকৃষ্ট পদ রয়েছে।
শুন ভেল শুন ভেল নগরী
শূন ভেল দশদিশ শুন ভেল সগরি।
২। সম্ভোগ: অনুরক্ত নায়ক নায়িকার প্রগাঢ় রতি উৎকর্ষ লাভের পর মিলিত হতে পারলে তাদের মনে যে আনন্দ বোধ হয়, তাকে সম্ভোগ বলে। বৈষ্ণব পদাবলিতে সম্ভোগের পদ বেশি নেই।
সম্ভোগ দু’প্রকারের মুখ্য সম্ভোগ ও গৌণ সম্ভোগ।
জাগ্রত অবস্থায় যে সম্ভোগ, তা মুখ্য সম্ভোগ, আর স্বপ্নাবস্থায় যে সম্ভোগ, তাই গৌণ সম্ভোগ।
সম্ভোগে নায়িকা স্বাধীন থাকে, কিন্তু রাধা পরকীয়া। তাই পদাবলিতে সম্ভোগের পূর্ণ ভাবোল্লাস সম্ভব নয়। আসলে বিপ্রলম্ভই সম্ভোগকে পুষ্ট করে তোলে। পদকর্তারা অভিসারের পর মিলন, দানলীলা, নৌকা বিলাস মানান্তে মিলন প্রভৃতি উপলক্ষ্যে সম্ভোগের অনেক পদ রচনা করেছেন।
বৈষ্ণব ধর্মের রসভাষ্য ঠিকই, তবে রূপকের আড়ালে যা-ই বলুক না কেন, মানবিক রসের প্রকাশ যেভাবে প্রকাশ পেয়েছে তাতে বলা যায় বৈষ্ণব পদাবলির রস শুধু ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক অনুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবমনের গভীর প্রেম, ব্যাকুলতা ও ভক্তির সঙ্গীত। রাধাকৃষ্ণের প্রেমকথা আসলে মানুষের অন্তরের প্রেমরসেরই প্রতিচ্ছবি। তাই বৈষ্ণব পদাবলি হয়ে উঠেছে বাংলার কাব্যধারায় রস ও ভাবের চিরসবুজ উৎস — যেখানে ভক্তি ও প্রেম মিলিত হয়ে সৃষ্টি করেছে এক অমর রসানুভূতির ঐতিহ্য।
রসের পরিচয় প্রসঙ্গে পরিশেষে বলা যায় , আলোচিত মধুর রস আসলে শৃঙ্গার রস। লৌকিক রসের সাথে এ শৃঙ্গার রসের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পদাবলির রস মূলত শৃঙ্গার রসেরই বিভিন্ন অবস্থা। তাত্ত্বিক দিক থেকে বৈষ্ণব পদগুলো বৈষ্ণব দর্শনের রসভাষ্য। এ রসের পরিচয় আধ্যাত্মিক রস। তবে, শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাবে এর মধ্যে মানবীয় রসের সঞ্চার ঘটে।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর