শাশ্বতবঙ্গ গ্রন্থের আলোকে লেখকের সাহিত্য-ভাবনা।


কাজী আবদুল ওদুদের সাহিত্য-ভাবনা।
মুক্তবুদ্ধির ধারক, মননশীল প্রবন্ধকার, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এ সক্রিয় সদস্য, ‘শিখা গোষ্ঠী’র অন্যতম সারথি কাজী আবদুল ওদুদের সাহিত্য সাধনার মূলে ছিল উদার ও মুক্তবুদ্ধির চেতনা। ‘শিখা’ পত্রিকা কেন্দ্রিক আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সংস্কার থেকে অন্ধ অনুকরণ থেকে মানব চিত্তকে মুক্তি দিয়ে বুদ্ধির আলোকে সত্যকে গ্রহণ করা। মুসলিম সমাজের যুগ সঞ্চিত যে ধর্মীয় কুসংস্কার বা কূপমন্ডুকতা, যে অন্ধত্ব তাদের প্রগতির পথকে রুদ্ধ করে রেখেছিল, সেই রুদ্ধ পথকে খুলে দেওয়ার উদ্যোগ প্রথম গ্রহণ করেছিল ‘শিখা’। ‘শিখা গোষ্ঠী’র অন্যতম সারথি আবদুল ওদুদের সাহিত্য-ভাবনার মধ্যেও এসবের প্রতিফলন ঘটেছে।

আবদুল ওদুদ বিশিষ্ট গদ্য লেখক। এই বিশিষ্টতা শুধু রচনাশৈলী ও ভাষার দিক থেকে নয় ; চিন্তাা ও মননশীলতার দিক থেকেও এবং তা জীবন দর্শনের দিক থেকেও। চিন্তা ও মননশীলতার চর্চা তাঁর বৈশিষ্ট্য হলেও আসলে তিনি একজন সচেতন সাহিত্যিক। তাই সাহিত্য ধর্মকে ডিঙিয়ে তাঁর রচনা কখনো প্রচারধর্শী হয়ে ওঠেনি। তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য গভীর জীবন জিজ্ঞাসা ও মানবতাবোধ।
আবদুল ওদুদ সাহিত্য-ভাবনা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁর চিন্তার বড় আকর্ষণ অনন্য মৌলিকতায়। গতানুগতিক চিন্তাধারার অনুসরণ তিনি করেন নি ; নতুন করে ভেবেছেন সব বিষয়ে। তাই তাঁর রচনা অন্যের চিন্তাকে নাড়া দেয় ; অনেক পূর্ব ধারণা ভেঙে দেয়, পাঠকের মনে জাগিয়ে তোলে নতুন জিজ্ঞাসা।
https://youtu.be/BiOYP38O1RI?si=Yrv3nYWwNDq5aviD
সাহিত্যের ক্ষেত্রে সা¤প্রদায়িক চেতনাকে তিনি সমস্যা হিসেবে চিহিৃত করেছেন। স¤প্রদায়িক শ্রেণীচেতনা মিশ্রিত সাহিত্যেকে আবদুল ওদুদ ‘সাহিত্যের দারিদ্র্য’ বলে মনে করেন। প্রথমে মানবতা পরে সা¤প্রদায়িকতা এটাই সাহিত্যের নৈতিকতা হওয়া উচিত। ঐতিহ্যবোধ ওদুদের সাহিত্য-ভাবনার মধ্যে অন্যতম। সেক্ষেত্রে হাজার বছরের বাংলা সাহিত্য সাধনায় বিভিন্ন মনীষীদেরকে আবদুল ওদুদ ঐতিহ্য হিসেবে দেখেছেন এবং বলেছেন তাতে হিন্দু-মুসলমানের সমান উত্তরাধিকার। সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে তিনি বাঙালি মুসলমান সমাকে এই বোধ লালন করতে বলেছেন।
আবদুল ওদুদ সাহিত্য-ভাবনা প্রসঙ্গে বলেছেন যে, সাহিত্যের সঙ্গে বৃহত্তর গণমানসের কল্যাণপ্রসূ যোগসূত্রকে সমর্থন করেছেন। কেননা, মানুষের কল্যাণ কামনা সব সাহিত্যিকের লক্ষ্য থাকে। সাহিত্যের সাথে সমাজ জীবন নিবিড় ভাবে যুক্ত না হলে সমাজ জীবনের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি রুশ সাহিত্য ও ইউরোপীয় সাহিত্যের কথা বলেছেন। আর বাংলা সাহিত্য বৃহত্তর জনসমাজের সাথে সম্পৃক্ত না হওয়ার কারণে সমাজ জীবনের সঙ্গে সাহিত্যের একটি দূরাত্মীয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
তিরিশোত্তর কল্লোলীয় সাহিত্যের ইউরোপ মনস্কতা ও গতানুগতিক মূল্যবোধকে ভেঙে দিয়ে ফ্রয়েডীয় যৌনতার চর্চাকে অনেকে অনাচার মনে করলেও আবদুল ওদুদ এই নবাগত চেতনাকে ধিক্কার জানাননি। তাঁর বিবোচনায় তরুণদের নব ইউরোপ প্রাতি ও অতরুণদের প্রাচীন ভারতপ্রীতি একই মনোভাবের এপিঠ-ওপিঠ। সাহিত্যাদর্শে তিনি অতীতমুখী বা প্রাচীনপন্থী বা রক্ষণশীল ছিলেন না। তাঁর সাহিত্য-ভাবনা প্রসঙ্গে এ দিকটি বিশেষভাবে বিবেচ্য।
সাহিত্যের সৃজনশীলতার পাশাপাশি সাহিত্য সমালোচনার ক্রুটি-বিচ্যুতি নিয়েও আবদুল ওদুদ ভেবেছেন। তিনি মনে করেন সাহিত্য সমালোচনার উৎকর্ষের জন্য প্রয়োজন পরিমার্জিত, শিক্ষিত, রুচিপূর্ণ উপস্থাপন ভঙ্গী এবং আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে পরিচ্ছন্ন চিন্তা।
সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র নির্ণয় করতে গিয়ে কাজী আবদুল ওদুদ রস ও ব্যক্তিত্বকে সমান গুরুত্ব প্রদান করেছেন। সাহিত্য বলতে তিনি রসের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের প্রসঙ্গটিকেও অবিচ্ছেদ্য মনে করেছেন। রসের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের অন্তরঙ্গতা মহৎ সাহিত্যকের অন্যতম লক্ষণ বলে তিনি মনে করেন। তিনি মনে করেন সাহিত্যের উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান ও আনন্দ বিতরণ। তবে এ জ্ঞান তথ্য সর্বস্ব না হয়ে রসাত্মক ভাবে উপস্থাপিত হতে হবে। সাহিত্যিককে অবশ্যই তাঁর নিজের প্রতিভার প্রতিবিশ্বস্ত থাকতে হবে।
আবদুল ওদুদের মতে, সাহিত্য কখনো সমাজ জীবন বিচ্ছিন্ন নয়। কেননা, দেশ ও সমাজ মৃত্তিকায় প্রোথিত থেকে সাহিত্য তার বর্ণময় বিকাশ ঘটায়। তিনি বলেছেনÑ “সাহিত্য জীবন বৃক্ষের ফুল ; জাতি বা সমাজ বিশেষের মগ্ন চৈতন্যের রসের যোগানে তার বিকাশ ঘটে।” তাই তিনি মনে করেন সাহিত্যিককে অবশ্যই সমাজ ধর্ম রক্ষার দিকে খেয়াল রাখতে হবে এবং তাকে সমাজে শোধনমূলক বক্তব্য পেশ করতে হবে।
আবদুল ওদুদ সাহিত্যে যুগধর্মের উপস্থিতি মেনে নিয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য যুগধর্মকে আত্মসাৎ করে চিরন্তনতার পথে যাত্রা করে। সাহিত্য যুগপৎ কালজ ও কালোত্তর। তিনি বলেছেন ‘সাহিত্য ফুল আর যুগধর্ম তার বৃন্ত।
সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে লেখকের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন ও বাণিজ্যিক অভিসন্ধিকে তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি মনে করেন সমাজের কাছে দায়বদ্ধ থেকেই শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি একমাত্র সাহিত্য সাধনা হওয়া উচিৎ। তিনি বলেন, সাহিত্য রচনায় আর্টের বা শিল্প নৈপুন্যের বিশেষ প্রয়োজন।
অনেক সময় দেখা যায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে হিন্দু লেখক তাঁর রচনায় হিন্দু চরিত্রকে হীন ও নীচ হিসেবে চিত্রিত করেছেন। এতে শিল্প সৃষ্টির চেয়ে সা¤প্রদায়িক দ্ব›দ্ব সংঘাত বৃদ্ধি পায়। আবদুল ওদুদ সাহিত্যকে এই হীনস্বার্থে ব্যবহার না করে বিশ্বভ্রাতৃত্বের কল্যাণ সাধনের মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহারের কথা বলেছেন।
লেখক মনে করতেন সাহিত্য সৃষ্টির পশ্চাতে একটি উদ্দেশ্য, সাধনা ও জীবন দর্শন থাকা উচিত। প্রকৃত সাহিত্যিক যা কিছু বলবেন তা ব্রত হিসেবেই নেবেনা। জগৎ ও জীবনকে তিনি যে দৃষ্টিকোন থেকে দেখতে চান বা দেখাতে চান, তার মধ্যে তাঁর স্বকীয় কিছু বিশেষত্ব থাকতে হবে। সাহিত্য শুধু চর্চার বিষয় নয় ; সাহিত্য ওদুদের কাছে ছিল প্রকৃত সাধনার বিষয়।
তিনি বলেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের সাধনা প্রকৃত পক্ষে একটি আধ্যাত্মিক সাধনা’। আবদুল এই দৃষ্টিভঙ্গী তাঁর নিজের জীবনেও প্রতিফলিত হয়েছে। আধ্যাত্মিক সাধনাকে তিনি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেননি। সাধনার অন্তর্নিহিত অর্থকে বোঝাতে ‘আধ্যাত্মিক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তবে তিনি সাহিত্যিকের সাধনার পাশাপাশি সাহিত্য উপলব্ধির জন্য পাঠকের সাধনার কথাও বলেছেন। উভয়ের সম্মিলিত সাধনার ফলেই সম্ভব সাহিত্য রসকে আবিষ্কার করা।
তিনি নীতি-রুচির বোঝা পাঠকের উপর চাপানোকে পছন্দ করতেন না। সাহিত্যিকের স্বেচ্ছাচারিতাকে তিনি কখনো অনুমোদন করেন নি। তিনি নিজে যেমন মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন, তেমনি কারো উপর তাঁর চিন্তা চাপিয়ে দেননি। মুক্ত চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির বিকাশকে তিনি সাহিত্যেও স্বাগত জানিেেয়ছেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, আবদুল ওদুদ তাঁর নিজগুণে বাংলা সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। ব্যক্তিজীবনের মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি তাঁর সাহিত্য-ভাবনার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে তিনি যে সাহিত্যাদর্শ ও সাহিত্য-ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। তা একদিকে যেমন যথেষ্ট ও বাস্তবধর্মী, অন্যদিকে তেমনি যুগোপযোগী। তাই তিনি বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের ইতিহাসে শ্রদ্ধার আসনে সমাসীন থাকবেন চিরকাল।
মোঃ আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।