প্রমথ চৌধুরীর যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধ অবলম্বণ লেখকের যৌবন-বন্দনার স্বরূপ ব্যাখ্যা কর।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
প্রমথ চৌধুরী

যৌবনে দাও রাজটিকা

‘সবুজ পত্র’- এর সম্পাদক প্রমথ চৌধুরী (১৮৬৮-১৯৪৬) রবীন্দ্রযুগে সাহিত্য চর্চা করেও আপন মহিমায় উজ্জ্বল। বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যে তিনি নতুন পথের পথিক। তাঁর লেখায়, চিন্তায়, বাচনে, প্রকাশভঙ্গিতে, বিষয়বস্তুর উপস্থাপনার একটি নতুন মনের পরিচয় মেলে। তিনি প্রবন্ধরীতিতে বৈঠকী মেজাজ প্রবর্তন করে যেকোন গাম্ভীর্যপূর্ণ বিষয়কে হালকাভাবে, আবার অতি সাধারণ বিষয়কে গাম্ভীর্যপূর্ণ করে তুলেছেন। সমাজ সাহিত্য, ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে প্রাবন্ধিক যুক্তিনিষ্ঠ মতামত বিচিত্র বিষয় অবলম্বনে বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে একটি বিশিষ্ট বিষয় নিয়ে নিজস্ব মতামত তুলে ধরেছেন।

প্রবন্ধ সংগ্রহ – প্রমথ চৌধুরী

যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধটি যৌবনের জীবন ও মানসিকতার জটিলতা নিয়ে আলোচনার এক গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এখানে লেখক যুবকদের মানসিক, সামাজিক ও নৈতিক দ্বন্দ্বগুলোকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধে দেখা যায়, কিভাবে যৌবনের উদ্দীপনা, স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা জীবনের নানা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। প্রবন্ধের মাধ্যমে পাঠকরা কেবল যৌবনের ভাবনা ও আবেগের প্রতিফলনই পান না, বরং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুবকের মানসিক দ্বন্দ্বের সংযোগও বোঝার সুযোগ পান। ফলে, যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধটি কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রতিফলন নয়, এটি সমাজবিজ্ঞানের দিক থেকেও যৌবনের মানসিক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে।

যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধটি যৌবন-বন্দনাগান। অবশ্য যৌবনকে বন্দনা করা নিষ্কণ্টক নয়। কারণ যৌবন সম্পর্কে আমাদের মনে যেসব ধারণা তার সবগুলোই নেতিবাচক। প্রমথ চৌধুরী নিজস্ব জ্ঞান-প্রজ্ঞার আলোকে মন্তব্য করেছেন যে, যৌবনের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও মূল্যবান অংশটিকে বাদ দিয়েই যৌবন সম্পর্কে অতীতকাল থেকেই আমাদের মনে বিভ্রান্তি রয়েছে। আলোচ্য প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক যৌবন সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো দূর করে যৌবনকে রাজসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। দৈহিক যৌবনের ওপর মানসিক যৌবনকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধে লেখক মানসিক যৌবনের বন্দনা করেছেন।

যৌবন সম্পর্কে আমাদের মনের অবস্থা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের প্রসঙ্গ এনেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘সবুজপত্রে’ যৌবনকে রাজটিকায় অভিষিক্ত করার কথা লিখেছিলেন। চারপাশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ব্যাপক। কেননা যৌবনের কথা উঠলে একে আমরা শায়েস্তা করার কথাই ভাবি। মনের যৌবন আমাদের কাছে প্রকৃতির বসন্ত ঋতুর মতই অশায়েস্ত। ফলে তা শাস্তিযোগ্য। ফলে যৌবন-বন্দনা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু প্রকৃতির ওপর আমাদের অধিকার নেই। ফলে মানবিক যৌবনকে প্রতিহত করার যাবতীয় উদ্যোগ আমরা গ্রহণ করি। এমনকি আমাদের জ্ঞানী ব্যক্তিরা প্রকৃতির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে মানা করেছেন। তাদের ভাবনাÑ সে ক্ষেত্রে প্রকৃতির বসন্ত আর মানুষের যৌবনের যৌথ সমবায় আমাদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারে।

আমাদের দেশে যৌবনের জন্য উদ্বেগ ও উৎকন্ঠার শেষ নেই। এ উৎকন্ঠার সঙ্গত কারণও রয়েছে। কেননা আমরা যৌবন বলতে দৈহিক যৌবনকেই বুঝি। ফলে এ যৌবনের সঙ্গে একটি সময়ের ব্যাপার জড়িত। যৌবনকে প্রাধান্য দেওয়ার জন্যই সম্ভবত আমরা শৈশবের উপর আক্রমণ করি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও সে রকম। বাল্যবিবাহকে যৌবন দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা ছাড়া আর কি বলা যায়। জীবনকে বৃহৎ বা মহৎ করা নয় ; কোন প্রকারে দীর্ঘ করার এই চেষ্টা সমাজের স্থায়িত্বের কারণ হতে পারে ; কিন্তু তাতে গৌরব করার কিছু আছে বলে মনে হয় না।

সংস্কৃত সাহিত্য বিশ্লেষণ করলেও যৌবন সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত বিবেচনার একটি রূপরেখা পাওয়া যায়। কোনো এক ইংরেজ লেখক বলেছিলেন, সাহিত্য হচ্ছে জীবনের সমালোচনা। কিন্তু সংস্কৃত সাহিত্য পড়লে মনে হয়, সাহিত্য হচ্ছে যৌবন-বন্দনা ও যৌবনের আলোচনা। যৌবন সেখানে কোনো কল্যাণদায়িনী শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় নি।

‘গীতগোবিন্দ’ কাব্যের ভূমিকায় জয়দেব লিখেছেন- এ গ্রন্থ বিলাসকলায় আগ্রহীদের জন্য। এ কথাটি যেন সমগ্র সংস্কৃত সাহিত্যের মূলকথা। সেখানে পাত্র-পাত্রীরা যুবক-যুবতী। প্রকৃতি সেখানে যৌবনের উপমা মাত্র। যুবকরা সে যুবতীর মন হরণের কাজে ব্যস্ত। ত্যাগও যে যৌবনেরই ধর্ম, তার উল্লেখ সংস্কৃত সাহিত্যে নেই। অথচ গৌতম বুদ্ধের মতো ত্যাগী যুবকের জন্ম এ দেশেই। সংস্কৃত সাহিত্য তাকে পরিহার করে কৌশাম্বির যুবরাজ উদয়নকে নিয়ে টানাটানি করেছে। ইতিহাসে জানা যায় যে, বনের হস্তিনী আর অন্তঃপুরের রমণীদের বশ করে ভোগ করাই ছিল কৌশাম্বির যুবরাজের কাজ।

ভোগবাদী মানসিকতার কারণেই সংস্কৃত সাহিত্যে একদিকে বিলাসী, আর অন্যদিকে সন্ন্যাসী। সংস্কৃত কবিদের বন্দিত যৌবন মানবজীবনে প্রভাব ফেতে সমর্থ। কিন্তু সেখানে দৈহিক যৌবনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার কারণে মানসিক যৌবন বাদ পড়ে গেছে। ফলে একদিকে আছে যৌবন বন্দনা, অন্যদিকে যৌবন নিন্দা। এ রকম লোক ভোগবিলাসে মত্ত হতে না পারলে হয়ে ওঠে যৌবন ও নারী বিদ্বেষী। আমাদের সমাজ জীবনেও এ দৃষ্টিকোণ থেকে যৌবনকে দু’রূপে দেখা হয়।

সমাজ জীবনে যৌবনকে এভাবে দেখার কারণ হলো যৌবনের দৈহিক রূপকেই প্রকৃত যৌবন মনে করা। আর সেজন্যই যৌবনকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। যৌবনের অপশক্তি সম্পর্কে নিশ্চিত বলেই যৌবনকে অবরুদ্ধ করার যাবতীয় ব্যবস্থাও সমাজ করে রেখেছে। আমরা শিক্ষানীতিকে সাজিয়েছি ইঁচড়ে পাকা তৈরির উদ্দেশ্যে। উদ্দেশ্য বালক থেকে এক লাফে বৃদ্ধ হওয়া। যৌবনের ফাঁড়া কোনো রকমে কাটিয়ে ওঠাই যেন আমাদের লক্ষ্য। ফল যা হবার তাই হয়েছে। জীবনের আদি ও অন্ত রেখে আমরা মধ্যভাগকে শূন্য করেছি। রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও ধর্ম সবক্ষেত্রেই অতি নিয়মতান্ত্রিক কিংবা অতি বৈরাগী হয়েই মুক্তি খুঁজছি। কিন্তু মানবজীবনের যে একটি স্বাভাবিক প্রবহমানতা আছে, আমাদের সমাজে যৌবনের অনুপস্থিতি হেতু, আমরা তার সাক্ষাৎ পাই না।

প্রমথ চৌধুরী যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধে যে যৌবন-বন্দনা করেছেন, তা মানসিক যৌবন। আর যৌবনে রাজটিকা পরানোর ক্ষেত্রে সামাজিক যৌবন বা সমষ্টির যৌবনের কথা বলেন। ব্যক্তির যৌবনের সঙ্গে দৈহিক যৌবনের সম্পর্ক নিবিড় কিন্তু তা অবশ্যই ক্ষণস্থায়ী। তাছাড়া দেহ সংকীর্ণ অন্যদিকে মন উদার ও ব্যাপক। মানসিক যৌবন অর্থাৎ প্রাণশক্তিই পারে দেহ ও মনের যোগসূত্র স্থাপন করতে। প্রাণশক্তি দেহকেও সজীব, কর্মচঞ্চল ও উদ্দীপ্ত করে। কিন্তু তার স্বাভাবিক গতি মনোজগতের দিকে। প্রাণশক্তির স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ আসলে মনেরই বিকাশ। বিকশিত মন বার্ধক্যরূপ জড়তাকে অতিক্রম করে চিরনতুন কর্মচাঞ্চল্যের মধ্যে আশ্রয় নেয়। বহুজনের প্রাশক্তি মিলেই প্রতিষ্ঠিত করে সামাজিক যৌবন। লেখকের মতে যৌবন-বন্দনার প্রকৃত রূপ এখানেই।

সমাজ জীবনে মানসিক যৌবনকে প্রতিষ্ঠিত করাই প্রাবন্ধিকের উদ্দেশ্য। তাহলেই যৌবনের প্রকৃত ও চিরন্তন রূপ বিকশিত হবে। মানসিক যৌবন দৈহিক শক্তির মতো ক্ষণস্থায়ী নয়, অন্যদিকে এর বিস্তৃতিও ব্যাপক। একজনের যৌবন অন্যের দেগে সঞ্চালিত করার উপায় নেই। কিন্তু একটি প্রাণশক্তিময় মানুষ লক্ষ লোককে উদ্দীপ্ত করতে পারে।

মানসিক যৌবন দেহের যৌবনের সাথে সাথে আসে। একে বিস্তৃত করতে হবে শৈশবে নয়, বার্ধক্যে। বার্ধক্যে উপনীত হয়েও আমরা যৌবনের প্রাণাবেশ ধারণ করতে পারি। কেননা, সমাজে যৌবন চিরকালই উপস্থিত। ব্যক্তিগত জীবনে যৌবন ক্ষণস্থায়ী কিন্তু সমাজ জীবনে যৌবন অ¤øান এবং চিরন্তন। একজনের মনের যৌবন অপরের মনে সঞ্চারিত হয়ে সমাজ জীবনে সামগ্রিকভাবে যৌবন বিকশিত হয়।

সমাজ যেহেতু বহু ব্যক্তির সমষ্টি তাই সামাজিক যৌবনই প্রগতির পূর্বশর্ত। বহু ব্যক্তির মানসিক যৌবনই প্রাণশক্তিতে পরিণত হয়। প্রবন্ধকার এ মানসিক যৌবনের ললাটে রাজটিকা পরাতে চেয়েছেন। অর্থাৎ তিনি মানসিক যৌবনের সংক্রমণ ঘটিয়ে সমাজের জরাজীর্ণতা ঘোচাতে চান। এজন্য তিনি তরুণ সমাজকে মানসিক যৌবনের অধিকারী হয়ে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উদাও আহবান জানিয়েছেন। মানসিক যৌবনকে সামগ্রিকভাবে সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

মানবসভ্যতার প্রতিটি উদ্যম ও কর্মপ্রবাহে লেখক যৌবনের শক্তিকে দেখেছেন। অথচ আমাদের সমাজে তার বিকৃত ব্যাখ্যা হয়েছে এবং সমাজ জীবনে সেই বিকৃতির প্রতিরূপ লেখককে আহত করেছে। সংস্কৃত সাহিত্যের দৈহিক যৌবন বন্দনাও তাকে ক্ষুব্ধ করেছে। যৌবনের এ রকম বিকৃত উপস্থাপনার বিরুদ্ধাচরণ করেছেন তিনি।

সারসংক্ষেপে, যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধটি যৌবনের জটিলতা, আবেগ ও মানসিক দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করে পাঠককে জীবনের বিভিন্ন স্তরে চিন্তা করার সুযোগ দেয়। প্রবন্ধে যৌবনের উদ্দীপনা ও আকাঙ্ক্ষার সাথে সমাজ ও নৈতিকতার সম্পর্ক স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধের পাঠের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, কিভাবে যৌবনের সময় উদ্দীপনা, ভাবনা ও স্বপ্ন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব ফেলে। শেষমেশ, যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধটি কেবল যুবসমাজের মানসিকতাকেই নয়, সামগ্রিক জীবনের দার্শনিক ভাবনাকেও তুলে ধরে।

পরিশেষে যৌবনে দাও রাজটিকা প্রবন্ধে লেখকের অভিপ্রায় দিয়েই কথা শেষ করা যাক। প্রকৃত যৌবন অক্ষয়, অম্লান এবং চিরন্তন। সুতরাং যৌবনের কোনো বিকল্প নেই, তবে সে যৌবন অবশ্যই মানসিক যৌবন। মানসিক যৌবন লাভ করার চেষ্টাই প্রকৃত কাজ। সমাজদেহে মানসিক যৌবন প্রতিষ্ঠিত করতে সকলকে দ্বিধাহীন চিত্তে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধূসূদন কলেজ, যশোর।

খোলা পাতা বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষামূলক ব্লগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *