রুদ্রমঙ্গল গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধের আলোকে দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকচেতনা সম্পর্কে নজরুলের মতামত।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িকচেতনা।

‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধগ্রন্থের ‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধ দুটোর আলোকে প্রাবন্ধিক
নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ।

সম্পাদক নজরুল সম্পাদকীয় কলামে সরাসরি ভারত মাতার পূর্ণ স্বাধীনতা চেয়েছেন। স্বাধীনতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন জাগ্রত ঐক্যবদ্ধ ভারতবাসীকে জাগাতে জাগরণী গান গেয়েছেন। নজরুলের জাগরণী গানের মূলমন্ত্র হলো দেশপ্রেম ও দেশমাতৃকার মুক্তি। জনসাধারণ দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষা না নিলে ভারতমাতার মুক্তি অসম্ভব।

হিন্দু মুসলমানকে প্রাবন্ধিক নজরুল সমান দৃষ্টি দেখেছেন। চেয়েছেন তাদের ঐক্য। কেননা, তাদের ঐক্য ছাড়া কখনো ভারতমাতার শৃঙ্খলমুক্তি সম্ভব নয়। তাদের জাগাতে হিন্দু মুসলমান উভয় স¤প্রদায়ের দোষক্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে বারবার দেখিয়েছেন। হিন্দু মুসলমানের বিরোধের জন্য ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন বারবার পশ্চাদমুখী হয়েছে। দেশপ্রেম ছাড়া তাদের মিলন যে সম্ভব নয় তা নজরুল বুঝতে পেরেছিলেন।

হিন্দু মুসলমানের পারস্পরিক সম্পর্ক বহু তিক্ততার মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। মন্দির ও মসজিদ এবং হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধের মধ্যে নজরুল ওজস্বী ভাষায় এই বিরোধকে সমালোচনা করেছেন।

মন্দির ও মসজিদ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক ধর্মমাতাল শয়তানদের কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গার পেক্ষাপটে প্রবন্ধটি লেখা। পৃথিবীর প্রতিটি ধর্মই দেশ-জাতি ও মানবের কল্যাণের বাণী বয়ে এনেছে। কিন্তু মানুষের অহংকার, স্বার্থ, ক্ষমতা ও লোভের কারণে মানুষই ধর্মকে বিকৃত করে। নিজ স্বার্থ রক্ষায় মানুষ ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এতে ধর্মের কোনো দোষ নেই, দোষ হলো ধর্মব্যবহারকারী স্বার্থন্বেষী মহল।

এরাই নিজ স্বার্থে হিন্দু মুসলমানে বিরোধ বাঁধায়। প্রাবন্ধিক এর নিরসন চেয়েছেন। উদার মানবিকতাপূর্ণ মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে হিন্দু মুসলমানে বিরোধ বাঁধায়। প্রাবন্ধিক এর নিরসন চেয়েছেন। উদার মানবিকতারপূর্ণ মনুষ্যত্বের জাগরণ ঘটিয়ে হিন্দু মুসলমানের ভেদরেখাহীন স্বদেশপ্রেম ও স্বদেশভূমিই প্রাবন্ধিকের কাম্য।

১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল কলকাতার মর্মান্তিক সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা কবিকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এ ঘটনার প্রেক্ষিতেই সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লিখিত হয় মন্দির ও মসজিদ। ধর্মের নামে মন্দির মসজিদকে কেন্দ্র করে মানুষ কীভাবে পশুতে পরিণত হয় তারই জীবন্ত বিবরণ এখানে রয়েছে আর সেই সাথে ধর্মের সাথে রাজনৈতিকে জড়িয়ে যারা স্বার্থসিদ্ধি করে প্রাবন্ধিক তাদের করেছেন।

ধর্মান্ধ মুসলমান ও হিন্দু আল্লা ও মা কালী বলে একে অপরের মাথা ফাটিয়ে মাটিতে পড়ে আর্তনাদ করছে। তখন তাদের ভাষা এক “ বাবা গো মা গো’ কেউ আল্লা বা কালী বলছে না। তাদের আর্তনাদে মসজিদও টলে না পাষাণ দেবতাও সাড়া দেয় না, বরং মানুষের রক্তে মন্দির মসজিদ কলংকিত হয়। ধর্মমাতালই পারে এরকম জঘন্য কাজ করতে। এরা কখনো সত্যের আলো দেখেনি। মহানবী-রাসূলদের যেসব ধর্মমাতাল প্রহার করেছিল তাদেরই বংশধরেরা আজ ঈসা মুসা হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর মত মানুষকে হত্যা করছে।

এরকম দাঙ্গায় অসহায় দুর্বল মানুষই মারা যায়। যারা মারে তারা শয়তানের চেয়েও বীভৎস, হিংসায় বর্বরতায় এরা নরকের কীটকেও হার মানায়। মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গকারী মানুষের শিষ্যরা আজ মাতাল হয়ে অকল্যাণের কারণ হয়ে উঠেছে। মানবকল্যাণে জীবন উৎসর্গকারী দেব তুল্য মানবেরা মন্দির মসজিদ গীর্জায় মোল্লা পুরুত পাদ্রী-ভিক্ষুর হাতে বন্দী। স্রষ্টার সিংহাসনে আজ শয়তান বসে অট্্রহাসি হাসছে।

এই মানুষরূপী শয়তানই কখনো টুপি পরে দাড়ি লাগিয়ে মুসলমান খেপাচ্ছে, আবার কখনো টিকি রেখে হিন্দু খেপাচ্ছে। এতে মন্দিরের চূড়া ভাঙছে, মসজিদের গম্বুজ ভাঙছে-অথচ “আল্লার মসজিদ আল্লা রক্ষা করিলেন না, মা কালীর মন্দির কালী আসিয়া আগলাইণের না।”

এমন কি এই শয়তানের উপর আল্লা বা দেবতার কোনো পক্ষ থেকেই গজব নাজিল হল না।

দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক নিয়ে ভিডিও:

প্রাবন্ধিক এসবের অবসান কল্পে রুদ্রকে আহবান করেছেন এবং কামনা করেছেন রুদ্র এসে যেন শয়তানের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করে এবং সকল ভজনালয়ের তালা ভেঙে মানুষকে আকাশের গম্বুজতলে নিয়ে আসে।

ভারতবর্ষে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর না খেয়ে মরে, ধর্মান্ধ হিন্দু-মুসলমানের সেদিকে খেয়াল নেই। এরা ইট পাথরের তৈরি মন্দির মসজিদের জন্য মানুষকে অবহেলা করে। মানুষের চেয়ে এ শয়তানরা ইট-পাথরকেই বেশি ভক্তি করে।

নরকের কীটতূল্য ধর্মান্ধ শয়তানরা এটা ভাবে না যে, হিন্দু হোক, মুসলমান হোক এরা সকলেই এক স্রষ্টার সৃষ্টি-মানুষ। এই মানুষের কল্যাণের জন্যই মন্দির মসজিদের সৃষ্টি,

ভজনালয়ের মঙ্গলের জন্য মানুষ সৃষ্ট হয় নাই। আজ যদি আমাদের মাতলামির দরুণ ঐ ভজনালয়ই মানুষের অকল্যাণের হেতু হইয়া উঠে-যাহার হওয়া উচিত ছিল স্বর্গমর্ত্যরে হেতু- তবে ভাঙ্গিয়া ফেল ঐ মন্দির মসজিদ। সকল মানুষ আসিয়া দাঁড়াইয়া বাঁচুক এক আকাশের ছত্রতলে, এক চন্দ্র সূর্য-তারা-জ্বালা মহামন্দিরের আঙ্গিনা তলে।

মানুষ তার পা দিয়ে মাটি দলে ইট তৈরি করে সইে ইট দিয়ে মন্দির মসজিদ তৈরি করে। সেই মন্দির মসজিদের দুটো ইট খসে পড়লো বলে দুগ মানুষের মাথা যারা খসিয়া ফেলে, তাদেরই বিচার হওয়া উচিৎ।

দুটো ইট খসে পড়ার কারণে যদি দুইশ মানুষের মাথা দিতে হয়, তাহলে বাঙালি জাতির দেহ মন্দির থেকে দশ লক্ষ মাথা শোষণের যাতাকলে পড়ে খসে পড়ছে সে মহাঋণের পরিশোধ হবে কত লক্ষ মানুষের মাথা দিয়ে?

এই মানুষই পবিত্রশ্রম দিয়ে মন্দির-মসজিদের চূড়া আবার গড়ে তুলবে, কিন্তু আলো- বাতাস ওষুধ জল বার্লি থেকে বঞ্চিত মানুষগুলো আর ফিরে আসবে না। প্রাবান্ধিক ভাবেন-

যখন রোগ-শীর্ণ-জরা-জীর্ণ অনাহার ক্লিষ্ট বিবস্ত্র বুভুক্ষু সর্বহারা ভূখারিদের দশ লক্ষ করিয়া লাশ দিনের পর দিন ধরিয়া ঐ মন্দির মসজিদের পাশ দিয়া চলিয়া যায়, তখন ধসিয়া পড়ে না কেন মানুষের ঐ নিরর্থক ভজনালয়গুলো?

প্রাবন্ধিক এই সব নিরর্থক ভজনালয় গুড়িতে দিতে রুদ্রকে আহবান করেছেন।

ধর্মান্ধদের নাচিয়ে যেনব কাপুরুষ মহাপুরুষে পরিণত হয়েছে, যারা দেশে ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে, তাদের দমন করতে প্রাবন্ধিক বলদীপ্ত তরুণ সমাজকে আহবান জানিয়েছেন। তারাই পারে অকালমৃতদের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে।

দেশের ধর্মান্ধ মাতালদের উন্মত্ত করে বৃটিশ শোষক শ্রেণী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে। হিন্দু মুসলমানদের বিরোধকে তারাই জিইয়ে রেখেছে। এবং বিভেদকে পুঁজি করে এদেশ শোষণ করে দেশকে শ্মশানে পরিণত করেছে। ভারতবাসী অত্যাচারী বৃটিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সাহস পায় না, অথচ বীরত্বের নামে তারা এক ভাই আরেক ভাইকে হত্যা করছে।

এ ধরনের মানসিকতাকে প্রাবন্ধিক তীব্য ভাষায় সমালোচনা করেছেন। সেই সাথে এ প্রবন্ধে প্রত্যাশা করেছেন যে, নির্ভীক তরুণ সমাজ জেগে উঠে ধর্ম বিভেদ ভুলে হিন্দু মুসলমান মিলে এদেশ থেকে শয়তানরূপী বিদেশী শকুনি শাসকদের দেশছাড়া করবে।

হিন্দু মুসলমান প্রবন্ধ

প্রাবন্ধিক এ প্রবন্ধে হিন্দু-মুসলমানের সংঘর্ষের মূল কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন। ১৯২৬ সালের ২ এপ্রিল কলকাতার ভয়াবহ সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা দেখে মানবতাবাদী নজরুল বেদনার্ত ও বিস্মিত হয়েছেন। তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছে মানুষ কীভাবে, কেন পশু হয়ে যায়?

দেশপ্রেমের তাড়নায় নজরুল দেশের হিন্দুমুসলমানের মিলনে চেয়েছেন। ধর্মান্ধ ও গোঁড়ামি থাকলে হিন্দু-মুসলমানকে কখনোই এক ছায়াতলে আনা সম্ভব নয়। তাই নজরুল মসজিদ মন্দির হিন্দু-মুসলমান প্রবন্ধে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মাধ্যমে তাদের মনে দেশপ্রেম জাগাতে চেয়েছেন।

প্রাবন্ধিক এ সা¤প্রদায়িক দাঙ্গাকে পশুবৃত্তির সাথে তুলনা করেছেন। যেসব পশুর লেজ ও শিং দুটোই আছে, তারা কম হিংস্র হয়। যেমন- গরু-মহিষ। আর যাদের শুধু লেজ আছে সেসব পশু বেশি হিংস্র হয়। যেমন ঃ বাঘ-সিংহ। ভারত বর্ষের হিন্দু মুসলমান মূলত ওই রকম লেজওয়ালা পশু হয়ে গেছে। পশুর শিং বা লেজ বাইরে আছে বলে তাদের সম্পর্কে আগে থেকে সতর্ক হওয়া যায়। কিন্তু মানুষ নামক পশুর শিং ও লেজ দুটোই ভেতরে। তাই ভয়-

“কেননা,ন্যাজ আর শিং দুই-ই ভেতরে থাকলে কী রকম হিংস্র হয়ে উঠতে হয়, তা হিন্দু-মুসলমানের ছোরা-মারা না দেখলে কেউ বুঝতে পারবে না।”

মানুষের চিন্তা ভাবনা ও কর্ম পশুর মতো বলেই তারা টিকি ও দাড়ি রেখে পশুত্ব অর্জন করে।

মানুষে মানুষে আত্মীয়তা চিরকালের। অথচ মানুষ সেই ভ্রাতৃত্বকে ভুলে টিকি ও দাড়িয়ে অবলম্বন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। প্রাবন্ধিক মনে করেন যে হিন্দু মুসলমানে মূলত বিরোধ নেই। বিরোধ যত টিকি ও দাড়ির মধ্যে। তাই এ দুটো অসহ্য। টিকিত্ব হিন্দুত্ব নয়, ওটা পণ্ডিতত্ব, দাড়িও ইসলামত্ব নয়, ওটা মোল্লাত্ব। এই দুই ‘ত্ব’ মার্কা চুলের গোছা নিয়েই আজ এত মারামারি।

হিন্দু মুসলমানের দাঙ্গা মূলত পন্ডিত মোল্লার দাঙ্গা। নারায়নের গদা আর আল্লার তলোয়ারে কোনো দিনই ঠোকাঠুকি বাঁধবে না, কেননা তাঁতা দুজনেই এ। তিনি সর্বনাম, সকল নাম গিয়ে মিশেছে ওঁর মধ্যে। আল্লা বা নারায়ণ মূলত হিন্দুও নয়, মুসলমানও নয়। তার টিকিও নেই, দাড়িও নেই। টিকি দাড়িই মনে করিয়ে দেয় যে তুমি আলাদা (হিন্দু) আমি আলাদা (মুসলমান) বাইরের চিহৃ দাড়িই মানুষকে তার চিরন্তন রক্ষের সম্পর্ক ভুলিয়ে দেয়।

যুগে যুগে যেসব মহামানুষেরা পৃথিবীতে এসেছেন তাঁরা কেউই বলেন নি যে তাঁরা কেবল হিন্দু বা মুসলমানের জন্য এসেছেন। তাঁরা সকল মানুষের জন্য এসেছেন। টিকিওয়ালারা ও দাড়িওয়ালারাই অবতার পয়গম্বরদের সীমাবদ্ধ করেছে।

কৃষ্ণের ভক্তরা কৃষ্ণকে নিজেদের, মুহম্মদ (সঃ) কে তার ভক্তরা, খ্রিস্টের ভক্তরা খ্রিস্টরা নিজ নিজ গোত্রের সম্পত্তি বিবেচনা করে মহামানবদের সর্বমানবের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে জাতীয় সম্পত্তি করে নিয়েছে। তার এই সম্পত্তি জ্ঞান থেকেই যত বিপত্তি। মহামানবেরা আলোর মত সর্বজনীন। এই আলো নিয়ে ঝগড়া করা বোকামি। স্রষ্টাও কারো ব্যক্তিগত বা বস্তুগত সম্পত্তি নয়। স্রষ্টা সংক্রান্ত ভেদ বিচারের ভাব যখন আব্দুর রহিম বা মদনমোহনের উপর পড়ে। তখন স্রষ্টার মালিকানা নিয়ে দ্ব›দ্ব শুরু হয়। আর এর পরিনাম দেহ থেকে শত শর্ত মাথা বিচ্ছিন্ন।

মানুষ যদি মানবিকতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়, তখন ডুবন্ত কাউকে জল থেকে বাঁচানোর সময় হিন্দু-মুসলমান বিচার করে না। মানুষ ডুবছে এবং তাকে বাঁচাতে হবেÑ এটায় তার কাছে সত্যি হয়ে ওঠে। উদ্ধারের পরে হিন্দু যদি দেখে ওটা মুসলমান, মুসলমান যদি দেখে উদ্ধারকৃত মানুষটি হিন্দু, তবে তাকে আবার কেউই জলে ফেলে দেয় না। বরং উদ্ধারকারী এই ভেবে আত্মপ্রসাদ লাভ করে যে, সে একজন মানুষকে বাঁচিয়েছে।

মানুষের পশুত্ব প্রাবন্ধিককে বেদনাদগ্ধ করেছে। মানুষ পশুতে পরিণত হয়েছে বলেই চিরন্তর মানবতা-ভ্রাতৃত্ব বিস্মৃত হয়েছে। বাইরের চিহ্ন নিয়েই মূর্খরা মারামারি করছে। প্রাবন্ধিক আরও বলেছেন যে, সভ্যতার কারণে আজ কিছুটা হলেও পশুর লেজ খাটো হচ্ছে, পক্ষান্তরে মানুষের লেজ গজাচ্ছে অর্থাৎ পশুত্ব বাড়ছে। মানুষের পশুত্ব দূর করে মনুষ্যত্ব বৃদ্ধি করতে পারলেই ভারতবর্ষের সা¤প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ হবে। নইলে রক্তপাত চলবেই।

মোঃ আখতার হোসেন
সহযোগী অধ্যাপক
বাংলা বিভাগ
সরকারী কে.এম.এইচ কলেজ

‘রুদ্রমঙ্গল’ গ্রন্থের আলোকে নজরুলের দেশপ্রেমের স্বরূপ।

কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহের মূল প্রেরণা দেশপ্রেম। নজরুল বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। পরাধীন ভারত মাতাকে ম্ক্তু করতে। নজরুলের এ মনোভাব তার অনেক রচনার মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। ‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ গ্রন্থের অনেক প্রবন্ধের মধ্যে নজরুলের স্বদেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে। তা কখনো সরাসরি, আবার কখনো পরোক্ষভাবে।

‘রুদ্রমঙ্গল’ নজরুলের অন্যতম প্রবন্ধ গ্রন্থ। এখানে রুদ্রকে কামনা করা হয়েছে মনুষত্ব বিকাশের অন্তরায় দূর করার জন্য। দেশের মানুষকে জাগাতে, বিদ্রোহী হয়ে উঠতে, যাতে তারা দেশ মাতার মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিতে পারে। মোট আটটি প্রবন্ধের প্রতিটি প্রবন্ধের বক্তব্যের মূল চেতনা স্বদেশপ্রেম। বিশেষ করে ‘রুদ্রমঙ্গল’, ‘আমার পথ’, ‘বিষবাণী ’, ‘ক্ষুদিরামের মা’, ‘ধূমকেতুর পথ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে প্রত্যক্ষভাবে দেশপ্রেমের কথা উচ্চারিত হয়েছে।

‘রুদ্রমঙ্গল’ প্রবন্ধ অত্যাচারী হায়না রূপী শাসকের অত্যাচারে ভারতমাতা ক্ষত-বিক্ষত, দেশবাসীর জীবন অন্ধকারময়, চারপাশে কান্ন আর দীর্ঘশ্বাস, আর এর জন্য দায়ী মাত্র কয়জন হিংস্র হায়না। কবি তাই রুদ্রকে আহবান করেছেন, যে যেন ভীরু, কাপুরুষ, চিরমার খাওয়া ভারতবাসীকে প্রচন্ড আঘাত করে জাগিয়ে তোলে। জেগে উঠে তারা যেন দেশকে মুক্ত করে। কবি মনে করেন একমাত্র শিবই পারে সমস্ত অপকর্ম দূর করে দেশকে মুক্ত করতে। দেশপ্রেম না থাকলে দেশের জন্য জীবনের মায়া ত্যাগ করা যায় না।

‘আমার পথ’ প্রবন্ধে লেখক কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথের নির্দেশনা দিয়েছেন। ভারতমাতা দীর্ঘদিন ধরে বন্দী। তিনি মনে করেন সামনে এমন কোনো আদর্শ বা নেতা নেই, কোন পথ নেই, যে পথে গেলে মুক্তি আসবে। তাই তাঁর অভিমত, ধূমকেতুর রথে চড়ে নজরুলের বিপ্লবের আহবানে সাড়া দিয়ে দেশবাসী যেন জেগে ওঠে। কবি রাজভয়কে গ্রাহ্য করেন না, সত্যকে চিনতে পেরেছেন বলে কবি নির্ভয়। কবি পথে চলে সত্যে জেনে দেশমাতার মুক্তির জন্য বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য কবি সবাইকে ডাক দিয়েছেন। আমার পথ প্রবন্ধে নজরুল দেশের জনগণের মনে দেশপ্রেম জাগাতে চেয়েছেন। কেননা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে দেশমাতার মুক্তি হবে না।

‘বষবাণী’ প্রবন্ধে লেখক নিজেকে নাগশিশু হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছেন। দেশের স্বাধীনতা নিয়ে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেই সে বিভীষণের প্রতি দেশের তরুণ সামজকে উদ্বেলিত করার চেষ্টা করা হয়েছে এ প্রবন্ধে। কবি মনে করেন তরুণেরা যথার্থ বিষমুখ অগ্নি নাগ-নাগিনী। তারা বিষের ভান্ডার। এদের ধরতে এলে বিষের তেজে তাদের হাড়-মাংস গলে যাবে। জগতের কোনো কারাগার তরুণদের ধরে রাখতে পারে না, কারণ এদের নিৎশ্বাসে কথায় আগুন, লৌহদন্ডসহ কারাগারে জ্বলে ছাই হয়ে যায়। জল্লাদের খড়গ ছাই হয়ে যায়। এমনকি ফাঁসির রশিও। নজরুল তরুণদের নাগশিশুর হিসেবে বিষ সঞ্চয় করতে বলেছেন, যাতে ব্রিটিশের সব মহলে ঘুরে ঘুরে তাদের নিঃশেষ করে দেশকে মুক্ত করতে পারে। দীপ্ত তরুণেরা দেশপ্রেমের দীপ্ত শিখা বুকে জ্বেলে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করুক প্রাবন্ধিকের প্রত্যাশা।

‘ক্ষুদিরামের মা’ দেশপ্রেমোদ্দীপক প্রবন্ধ। ক্ষুদিমরামের দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের সূত্র ধরে ভারতবর্ষের সব যুব সমাজকে ও দেশের জন্য আত্মোৎসর্গী হয়ে দেশকে মুক্ত করার আহবান জানিয়েছেন লেখক।

রুদ্রমঙ্গল – কাজী নজরুল ইসলাম

দেশের জন্য জীবন দানের পথ প্রদর্শক হলো ক্ষুদিরাম। দেশপ্রেমের তাড়নায় নজরুল মনে করেন ক্ষুদিরামের পথ ধরে ভারত সন্তানই পারবে পরাধীনতার শেকল থেকে ভারতকে মুক্ত করতে।

নির্মোহ-নির্লোভ আত্মত্যাগী ক্ষুদিরাম দেশের মুক্তির জন্য জীবন বলি দিয়ে ভারতীয় মায়েদের সুখ কেড়ে নিয়ে তাদের মাতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাই তারা আপন ছেলেকে বুকে করেও শান্তি পায় না। ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম বলেছিল ১৮ মাস পরে ফাঁসির চিহ্ন গলায় নিয়ে মাসীর ঘরে জন্ম নেবে। ভারতের প্রতিটি মা তার ছেলের গলায় সে চি‎ দেখে, কিন্তু তারা সে চিহ্ন আড়াল করে রাখে এই ভয়ে যে, তাদের ছেলেও হয়ত ক্ষুদিরারেম মত তাদেরকে ফাঁকি দেবে।

ক্ষুদিরামের চৈতন্যে স্নাত ও অনুপ্রেনিত দেশের মুক্তিকামী নজরুল ইসলাম দেশের মায়েদের জানাচ্ছেন যে, ক্ষদিরামের প্রতিশ্র“তি মিথ্যা হতে পারে না। ভারতীয় মায়েদের কোল জুড়ে যেসব সন্তান রয়েছে তারা সব ফাঁসির চি‎হ্নধারী ক্ষুদিরাম। দেশমাতা পরাধীন, ফলে তারা তাদের সর্বনাশ খেলা করছে, পরাধীন ভারতমাতা তাদেরকে চাবুক হানছে। মূলত তাদের জন্ম হয়েছে আÍবলিদানের মাধ্যমে পরাধীন ভারমাতাকে মুক্ত করতে। তাদের মাতৃস্নেহে বেঁচে রাখা যাবে না, অপত্য স্নেহে তাদের চিত্তদাহ নিভবে না

ক্ষুদিরাম নেই,কিন্তু ভারতবর্ষের প্রতি ঘরে ঘরে জন্ম নিয়েছে কোটি কোটি ক্ষুদিরাম। মায়েরা অপত্য স্নেহে ান্ধ বলে বুঝতে পারে না যে তাদের কোল জুড়ে ক্ষুদিরামরাই এসেছে। দেশ প্রেমিক নজরুল ভারতের ম দেকে আহবান করেছেন, তারা যেন মায়ার কাজল মুছে, ক্ষুদিরামকে কোল থেকে নামিয়ে দেশের জন্য উৎসর্গ করে। কেননা এসব সন্তান তাদের নয়, ভারতমাতার। ওদের জন্মই হয়েছে ফাঁসির মঞ্চের জন্য ওরা মায়ের সম্পদ নয়, দেশের সম্পদ। কবি মনে করেন যে উদ্দেশ্য এসব সন্তানদের জন্ম, তারা যেন সে উদ্দেশ্য পালন করে দেশকে মুক্ত করবে।

কবি আহবান করেছেন দেশের মুক্তির জন্য তারা যেন সবাই ফাঁসির মঞ্চে দাঁরায়। দেশমাতাকে মুক্ত করে। তাদের ভুলে গেলে চলবে না যে তারা কোনো বিশেষ মায়ের সন্তান নয়,তারা দেশমাতৃকার সন্তন। শৃঙ্খলিত দেশ মাতা তাদের মুখের দিকে চেয়ে আছে, তাদের আত্মদানই দেশমাতৃকার মুক্তির একমাত্র উপায়। সুতরাং দেশের জন্য জীবন বলি দিয়ে দেশকে স্বাধীন করে তাদের জন্ম সফল ও সার্থক করে তুলুক এটাই প্রাবন্ধিকের প্রত্যাশা।

‘ধূমকেতুর পথ’ প্রবন্ধটিও দেশপ্রেমমূলক। প্রাবন্ধিক তাঁর নিজের সম্পাদিত ধূমকেতুর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন যে, ধূমকেতু ভারতবর্ষের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। প্রাবন্ধিক মনে করেন যে, ভারতের একতিল জায়গাও বিদেশিদের দখলে থাকবে না। ভারতের শাসনভার ভারতীয়দের হাতেই থাকবে, স্বাধীনতা রক্ষা, দায়-দায়িত্ব সবই থাকবে ভারতীয়দের হাতে। ভারত শোষণকারীদের পোটলা গুছিয়ে সাগর পাড়ি দিতে হবে। দেশ সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের ভাবনা অত্যন্ত স্পষ্ট।

প্রাবন্ধিকের ধারণা, এদেশবাসী এতদিন নিজেকে চিনতে পারে নি বলেই তারা নিজেকে চিনবে, সেদিন তারা তাদের দূর্বলতা কাটিয়ে সবল হয়ে উঠবে। সত্যকে জানবে, গোলামি না করে নিজেকে শক্তিধর করে তুলবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবে। দেশ মুক্ত হবে।

‘মন্দির ও মসজিদ’ এবং ‘হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে পরোক্ষভাবে প্রাবন্ধিকের দেশপ্রেম প্রকাশ পেয়েছে, হিন্দু-মুসলিম দুই শক্তি যদি বিভক্ত থাকে, তাহলে শোষক শ্রেণি পেয়ে বসবে, আর তারা যদি অসা¤প্রদায়িক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ থাকে তবে তাদের মিলিত শক্তির কাছে বিদেশি শোষকরা টিকতে পারবে না। দেশ মুক্ত হবে এটা প্রাবন্ধিক মনে করেন।

‘রুদ্রমঙ্গল’ গ্রন্থের প্রতিটি প্রবন্ধের মূল বক্তব্য আলোচনা করলে দেখা যাবে প্রতিটি প্রবন্ধের মূল ভাবনা দেশপ্রেমকে ঘিরে। পরাধীন ভারতমাতার বন্দীত্ব, দেশবাসীর আর্তনাদ কবিকে ব্যথাতুর, ক্ষিপ্ত ও ক্ষিপ্র করে তোলে। তাই নানাভাবে এদেশের মানুষকে পরাধীনতার বিরুদ্ধে জাগ্রত করেছেন এবং দেশকে মুক্তির জন্য জাতিকে আহবান জানিয়েছেন।

খোলা পাতা বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষামূলক ব্লগ

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ,. যশোর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *