‘শাশ্বত বঙ্গ’ প্রবন্ধগ্রন্থ অবলম্বনে কাজী আবদুল ওদুদের প্রগতিশীল মানসিকতা, ও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় দাও।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

প্রগতিশীল মানসিকতা ও মুক্তবুদ্ধির পরিচয়।

“কাজী আবদুল ওদুদের সাহিত্য সাধনার মূলে ছিল উদার ও মুক্তবুদ্ধির চেতনা।” তিনি ছিলেন গ্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিনিষ্ঠ মননশীল প্রবন্ধকার। তিনি ছিলেন মুক্তবুদ্ধির ধারক। তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’- এর সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’– এর মুখপাত্র ‘শিখা’ পত্রিকা একটি আন্দোলন গড়ে তোলে। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল সংস্কার থেকে অন্ধ অনুকরণ থেকে মানবচিত্তকে মুক্তি দিয়ে বুদ্ধির আলোকে সত্যকে গ্রহণ করা। মুসলিম সমাজে যুগসঞ্চিত যে ধর্মীয় কুসংস্কার বা কূপমন্ডুকতা, যে অন্ধত্ব তাদের প্রগতির পথকে রুদ্ধ করে রেখেছিল, সেই রুদ্ধপথ খুলে দেওয়ার প্রথম উদ্যোগ ‘শিখা’ গোষ্ঠী গ্রহণ করেছিল কাজী আবদুল ওদুদ এই গোষ্ঠীর অন্যতম সারথি ছিলেন।

কাজী আবদুল ওদুদ

কাজী আবদুল ওদুদ একজন বিশিষ্ট গদ্য লেখক। তাঁর বিশিষ্টতা শুধু রচনাশৈলী ও ভাষার দিক থেকেই নয়, চিন্তা ও মননশীলতার দিক থেকে, মতবাদ ও জীবনদর্শনের দিক থেকেও। সব ক্ষেত্রেই তিনি মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন। মুসলিম সাহিত্য সমাজের মূলমন্ত্র ছিল বুদ্ধির মুক্তি। ‘শিখা’ পত্রিকার প্রথম পাতায় লেখা থাকত; “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” এই বুদ্ধির মুক্তি কথাটির মধ্যেই কাজী আবদুল ওদুদের সমস্ত চিন্তাধারার বীজ নিহিত রয়েছে। শিখা গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান সারথী আবদুল ওদুদ মুক্তবুদ্ধির ধারকহয়ে ওঠেন।

ওদুদ ছিলেন মুক্তবুদ্ধির লেখক, তাই যেখানে যত বুদ্ধির মুক্তি-মন্ত্রের সাধাকের পরিচয় তিনি পেয়েছেন তাঁদের প্রতি আকৃষ্টি না হয়ে পারেন নি। গ্যেটে, রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ এ কারণেই তার শ্রদ্ধার পাত্র ও অধ্যয়নের বিষয়। এই একই কারণে হযরত মোহাম্মদের ‘নবুওতের’ চাইতে তার মনুষ্যত্ববোধ, শুভবুদ্ধি ও সবল কান্ডজ্ঞানের তিনি বেশ ভক্ত। তাই নবী হযরত মোহাম্মদের চেয়ে মানুষ হযরত মোহাম্মদ-ই তাঁর অধ্যয়নের বিষয়।

শুভবুদ্ধির সাথে মুক্তি নির্ভরতাই কাজী আবদুল ওদুদের রচনার বৈশিষ্ট্য। যুক্তিহীন কুসংস্কার ও বুদ্ধিহীনতার বিরুদ্ধে তিনি চির আপোষহীন। মুক্তবুদ্ধি ধারক ওদুদের এরকম চিন্তা ও মানস চেতনার পরিচয় পাওয়া যায় ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে। এই গ্রন্থে সমাজ, দেশ, সাহিত্য, শিল্প ও ধর্ম সম্পর্কে বহু মূল্যবান আলোচনা স্থান পেয়েছে।

শাশ্বতবঙ্গ কজী আবদুল ওদুদ

এসব আলোচনার মধ্যে তাঁর জ্ঞানবত্তা ও পরিমিতিবোধ, সাহিত্য ও শিল্প সম্বন্ধে তাঁর ধ্যান-ধারণা, মুক্ত-বিচার বুদ্ধির উদারতা ইত্যাদি অসাধারণ ভঙ্গিমায় প্রকাশ পেয়েছে। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ভাবুক ও কর্মীরা প্রাণপণে চেষ্টা করেছিলেন ইসলামকে বুঝতে, কোরআন-হাদিস ও মহামানব মোহাম্মদ (সঃ) এর সাধনা ও সংগ্রামকে বুঝতে, ইসলামের ইতিহাসকে বুঝতে।

তাঁরা চেষ্টা করেছিলেন পশ্চাদবর্তী মুসলমান বাঙালিকে, অগ্রসর হিন্দু-বাঙালির সমপর্যায়ে এনে দুই স¤প্রদায়ের সমন্বিত সাধনার মধ্যে দিয়ে শক্তিশালী আধুনিক ‘বাঙালি জাতি’ সন্মোহিত মুসলমান ও ইসলামে রাষ্ট্রের ভিত্তি ইত্যাদি প্রবন্ধের মর্ম সন্ধান করলেই ‘বুদ্ধির মুুক্তি’ আন্দোলনের মর্মবাণীর সন্ধান পাওয়া যায়।

ইসলামে রাষ্ট্রের ভিত্তি’ প্রবন্ধে তিনি ইসলামী আইন, সমাজ ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে মতামত প্রকাশ করেছেন। এতে তিনি ইসলামী আইনের চিরন্তনতা বা শাশ্বততত্ত¡ অস্বীকার করেন এবং বোঝাতে চেষ্টা করেন যে ইসলামী বিধান ও মানব সৃষ্ট এবং দেশ কালের অধীন। আজ থেকে পনের শ বছর আগে আরব সমাজের জন্য যা মহত্তম ছিল, আজকের বাংলাদেশে জীবনের সমস্যা সমাধানে সেগুলো উপযোগী নাও হতে পারে।

অপরাধীর শাস্তি বিধানের প্রশ্নে ইসলাম যে কঠোরতার পরিচয় দিয়েছে আধুনিক পৃথিবীতে তার প্রয়োজন নেই বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি আধুনিক ইউরোপের উন্নততর আইন-কানুনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নতুন ইসলামী আইন-কানুন প্রণয়নের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন। মুক্তমন ও মুক্তবুদ্ধির ধারক না হলে এ প্রবন্ধের মর্মার্থ অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

কোরআনের আল্লাহ’ প্রবন্ধের মধ্যেও কাজী আবদুল ওদুদের মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীল উদার মনের পরিচয় পাওয়া যায়। এ প্রবন্ধে তিনি তাঁর বিবেচনা অনুযায়ী কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, সমগ্র কোরআনে আল্লাহর মহিমায় বিরাটভাবে কীর্তিতে হয়েছে, কিন্তু কোরআনে শুধু আল্লাহকে মান্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহকে জানার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন যে, মহামানব হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর উক্তিতে আছে যে, ‘আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হও’।

লেখক উল্লেখ করেছেন, আল্লাহর ৯৯টি নামই গুণবাচক এবং এই সব গুণ কমবেশি পরিমাণে মানুষের মধ্যে বিদ্যামান, লেখকের মতে, কোরআনের আল্লাহকে এভাবে উপলদ্ধি কল্যাণকর যে, আল্লাহ সকল প্রকার মানবিক গুণের সমষ্টি। মুসলমানের কর্তব্য নিজ নিজ জীবনে এইসব গুণের অনুশীলন করে মহত্তে¡র সাধানায় নিবিষ্ট হওয়া। আল্লাহর ধারণাকে এভাবে তিনি লৌকিক কল্যাণের ভিত্তিতে একটি সুস্পষ্ট রূপ দিয়েছেন।

সন্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধে লেখক সন্মোহিত মুসলমানদের অন্ধত্ব দূর করে আলো ও প্রগতির পথে চলতে বলেছেন এবং এ প্রসঙ্গে মুসলমানদের সীমাবদ্ধতার স্বারূপ ব্যাখ্যা করেছেন। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) যে একজন মহামনাব তা অনস্বীকার্য। তিনি সমগ্র জীবন দিয়ে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু তাঁর কিছু ভক্ত যেভাবে হযরত মুহম্মদ (সঃ) এর অলৌকিকতা নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছেন এবং অন্যকে সে দৃষ্টিতে দেখতে প্রভাবিত করেছেন, এতে হযরত মুহম্মদ (সঃ) যে একজন মানুষ, এ সত্য আচ্ছন্ন হয়ে গেছে।

মহামানবেরা বিশেষ শক্তিমাহাত্ম্যে সমৃদ্ধ হয়ে সাধারণ মানুষের সাথে সমন্বয় করে থাকেন। সে দিক বিচারে হযরত মুহম্মদ (সঃ) সর্বজ্ঞ নন, মানুষের সর্বময় প্রভূ নন। মানুষের জীবন সংগ্রামে তিনি একজন বন্ধু মাত্র। কিন্তু তাঁর ভক্তরা হযরত নামক। প্রকান্ড প্রতিমার সামনে নতদৃষ্টি হয়ে জীবনপাত করছে। এজন্য লেখক মুসলমানকে সন্মোহিত বলেছেন।

তারা শুধু পৌত্তলিক নয়, পৌত্তলিকাতারও চরম। লেখক মনে করেন বুদ্ধি-বিচার প্রভৃতি মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্বল বিসর্জন দিয়ে নতজানু হয়ে মাহপুরুষের পায়ে গড় তওয়া যে তাঁর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা নিবেদন নয়, তাঁর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা নিবেদন হচ্ছে প্রকান্ড এই জগতের উপর দাঁড়িয়ে তার সাধনাকে সমস্ত প্রাণ ও মস্তিষ্ক দিয়ে গ্রহণ করায় এবং সেই অধিকারে প্রয়োজন হলে তাকে অতিক্রম করায়।

সব শাস্ত্রে আছে, সব ইসলামে আছে, এর মত ভূয়া কথা আর হতে পারে না। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও যদি এমন কথা বলে তা হলে তাও ভুয়া উক্তি ছাড়া কিছুই নয়। ধর্ম ও ধর্মশাস্ত্রে উক্তির নানা বিধি-নিষেধকে জ্ঞান-বুদ্ধি ও যুক্তি-বিচার দিয়েই গ্রহণ করা উচিত। আবদুল ওদুদের বিভিন্ন রচনার এইটিই মূল বক্তব্য।

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ কাজী আবদুল ওদুদের একটি প্রিয় সাহিত্যভাবনা। তিনি লেখক জীবনের প্রথম থেকেই এ সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে লেখক চিরায়ত বাঙলার নবজাগরণ সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণী আলোকপাত করেছেন। লেখক মনে করেন বাংলার নবজাগরণের সুচনা করেন রাজা রামমোহন রায়। রামমোহন চেয়েছিলেন-

“বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের সভ্য ও ভব্য মানুষদের এক ধর্ম-মিলন-কেন্দ্র, এক স্রষ্ট ও পাতার ছায়াতলে; এই উদ্দেশ্য নিয়ে যে মানুষ পরস্পরের প্রতি প্রেম সম্পন্ন হবেও পরস্পরের হিত সাধনে তৎপর হবে।

ওদুদের ‘শাশ্বত বঙ্গ’ হচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের মিলন মেলা। ওদুদ ছিলেন রামমোহনের পরম ভক্ত। বাংলার নবজাগরণের ঐতিহাসিক ধারা ও কার্যকারণ অধ্যয়ন ও আলোচনা করেছেন তিনি তাঁর ‘বাংলার জাগরণ’ প্রবন্ধে। বলা বাহুল্য এই জাগরণের পনের আনাই ছিল হিন্দু। তবুও পরম শ্রদ্ধা ও আগ্রহের সাথে এইসবের অধ্যয়নÑ আলোচনায় আত্মনিয়োগ করেছেন কাজী আবদুল ওদুদ।

শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থে কৃষ্টি-সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধের মধ্যেও লেখকের অপক্ষপাত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মনে করেন সংস্কৃতির চর্চা একটি বিশেষ স¤প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ঐ সংস্কৃতির কোনো মূল্য থাকে না। বরং সংস্কৃতি সাধনার অঙ্গ এমন হওয়া উচিত, যাতে দেশ, জাতি বা স¤প্রদায়ের মনে রেনেসাঁস বা নবজাগরণের পরিপূর্ণ চেতনা আসতে পারে। মানব-মনীষার পরিপূর্ণ ধারণা বা মূল্যবোধ জন্মাতে পারে। ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধের মধ্যে লেখক বলেছেনÑ “আজ বড় কথা সেসবের প্রাণশক্তির সন্ধান, যা থেকে সম্ভবপর হবে জাতিতে জাতিতে অথবা সমাজে সমাজে গাঢ়তর সহযোগিতা ও মঙ্গলতর ভবিষ্যৎ।”

গ্যেটে’ প্রবন্ধের মধ্যে ইউরোপীয় মানবতাবোধের শ্রেষ্ঠ প্রতীক মহাকবি গ্যেটের সাহিত্য ও জীবন কাহিনী থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে উপযুক্ত মূল্যায়ণের সাথে বাঙালি পাঠককে উপহার দিয়েছেন। বস্তুত, গ্যেটের মতো তিনি ও “মানবাত্মার অপরিসীম বিকাশ সম্ভাবনায় বিশ্বাস করতেন।”

পরিশেষে বলা যায় যে, এভাবে ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের অন্তর্গত বিভিন্ন প্রবন্ধ আলোচনা করলে লেখকের মুক্তবুদ্ধি ও উদারচিন্তা চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ ও মহা-পুরুষদের সম্পর্কে যেমন তার প্রগতিশীল মনের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রবন্ধের মধ্যেও তার উন্নত প্রগতিশীল বা নবজাগরণমূলক মনোবৃত্তির পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। এ প্রসঙ্গে ‘কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ’, ‘রস ও ব্যক্তিত্ব’, ‘সংস্কৃতি কথা’, ‘গ্যেটে, ‘নজরুল ইসলাম’ প্রভূতি প্রবন্ধের কথা উল্লেখযোগ্য।

খোলা পাতা বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষামূলক ব্লগ

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *