শাশ্বত বঙ্গ প্রবন্ধ গ্রন্থের মনোজ্ঞ আলোচনা কর।



বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে কাজী আবদুল ওদুদ এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। চিন্তার উদারতায়, যুক্তিবাদের প্রতিষ্ঠায়, অকৃত্রিম মননশীলতায় তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ। এসব বৈশিষ্ট্য তাঁকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ধারক ও বাহক হতে সাহায্য করেছে। দেশীয় ঐতিহ্য স্বদেশের সমাজ ও রাষ্ট্র তাঁর লেখার অন্যতম বিষয়বস্তু। উদার ও যুক্তিবাদী চৈতন্যের আলোয় আলোকিত হয়ে দেশ জাতির বিবিধ সমস্যা, ধর্মের কূপমন্ডুকতাকে নিজ জ্ঞান বলে তার লেখনী দিয়ে আমাদের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করতে চেয়েছেন। ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থটি লেখকের চিন্তা Ñচেতনার সকল বৈশিষ্ট্য শিরে ধারণ করে আছে।
যুক্তিহীন বিচার বিশ্লেষণহীন অন্ধ-বিশ্বাসের স্থলে বিবেক-বুদ্বির প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা ‘শিখা’ গোষ্ঠী তথা “মুসলিম সাহিত্য সমাজের (১৯২৬) আদর্শ ছিল কাজী আব্দুল ওদুদের সকল কর্মের মূল প্রেরণা। তিনি পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজের মোহ ভঙ্গ করে উন্নতি সাধন করে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত চেষ্টার দ্বারা দেশ গড়ার কথা বলেছেন।” ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের মধ্যে তার প্রতিফলন রয়েছে।
‘শাশ্বত বঙ্গ’ (১৩৫৮) (১৯৫১) গ্রন্থটি প্রবন্ধ গ্রন্থ বস্তুনিষ্ঠ প্রবন্ধই প্রাধান্য পেয়েছে এ গ্রন্থে। গ্রন্থটি লেখকের মননশীলতার ধারক। মুক্তবুদ্ধির চর্চা রয়েছে প্রবন্ধগুলোতে। শুভবুদ্ধির সাথে য্ুিক্ত নির্ভরতাই কাজী আবদুল ওদুদের রচনার বৈশিষ্ট্য। যুক্তিহীন কুসংস্কার ও বুদ্ধিহীনতার বিরুদ্ধে তিনি চির আপোষহীন। তাঁর এরকম চিন্তা ও মানস চেতনার পরিচয় ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে পাওয়া যায়।
‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের আগে প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ তথা নবপর্যায় (১ম ও ২য় খন্ড); ‘রবীন্দ্রপাঠ’, ‘সমাজ ও সাহিত্য’, ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ’, ‘আজকার কথা’, ‘নজরুল প্রতিভা’ ও ‘স্বাধীনতা দিনের উপহার’ প্রভৃতি গ্রন্থের প্রবন্ধাবলি, ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। এছাড়াও আরো কটি প্রবন্ধ এতে যুক্ত হয়েছে। সেগুলো হলো- কালিদাস ও রবীন্দ্রনাথ, রস ও ব্যক্তিত্ব, সাহিত্য জগৎ, ব্যক্তির স্বাধীনতা, ইসলামে রাষ্ট্রের ভিত্তি, কোরআনের আলাহ, সৈয়দ জামালুদ্দিন আল আফগানী, ইকবাল, গৃহযুদ্ধের প্রাককালে, কবিগুরু স্মরণে, রবীন্দ্রনাথ ও মুসলমান সমাজ, সংস্কৃতির কথা, আধুনিক বাংলা সাহিত্য।
এই গ্রন্থে সমাজ, দেশ, সাহিত্য শিল্প ও ধর্ম সম্পর্কে বহু জ্ঞানগর্ভ আলোচনা স্থান পেয়েছে এসব আলোচনার মধ্যে লেখকের জ্ঞানবত্তা ও পরিমিতিবোধ, সাহিত্য ও শিল্প সম্বন্ধে তাঁর ধ্যান-ধারণা, মুক্ত বিচারবুদ্ধির উদারতা ইত্যাদি অসাধারণ ভঙ্গিমায় প্রকাশ পেয়েছে। প্রতিটি বক্তব্য জোরালো যক্তির আলোয় ও বুদ্ধির দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
“জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব” ‘শিখা’ গোষ্ঠীর এ মূলমন্ত্র আবদুল ওদুদের বুদ্ধির মুক্তি চর্চার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তাই বুদ্ধির মুক্তি-মন্ত্রের সাধক যেখানে যত তিনি পেয়েছেন, তাদের প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারেন নি। গ্যেটে, রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ এ কারণেই তাঁর শ্রদ্ধার পাত্র ও অধ্যয়নের বিষয়। হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর ‘নবুওতের’ চেয়ে তার মনুষ্যত্ববোধ, শুভবুদ্ধি ও সবল কান্ডজ্ঞানের তিনি বেশ ভক্ত।
‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থটি হিন্দু-মুসলমানের মিলন মেলা, লেখকের অপক্ষপাত মনোভাব, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ, চিন্তার সার্বজনীনতা ও বিশ্বায়ন, ধর্মীয় গোড়ামী ও কূপমন্ডুক্তামুক্ত ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র্য মর্যাদা লাভ করে আছে। সাময়িক প্রয়োজনের চেয়ে শাশ্বতের সাধনার কথা বলা হয়েছে। হিন্দু-মুসলমানের মিলিত চেষ্টার ফলে বলিষ্ঠ বাঙালি জাতি গঠিত হবে এবং সেই জাতি শাশ্বতের সাধানায় আত্মনিয়োগ করবেÑ এরকম একটা বাণী প্রতিটি প্রবন্ধের মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে। আর এ কারণেই গ্রন্থটির নাম ‘শাশ্বত বঙ্গ’। এ গ্রন্থের ভূমিকায় লেখক বলেছেনও যে, পূর্ণরূপে সত্যাশ্রয়ী আর সভার জন্য কল্যাণবাহী পথ ও চিরন্তন ধর্ম সকলের বুকে জেগে থাকুক। মানুষ অপ্রেমও বিপথ থেকে রক্ষা পাক। এটি হোক প্রত্যেক দায়িত্ববোধসম্পন্ন নর ও নারীর অন্তরম প্রার্থনা।
‘শাশ্বত বঙ্গে’র বিভিন্ন প্রবন্ধের মধ্যে লেখকের পরিশ্রম ও দায়িত্বজ্ঞানের পরিচয় রয়েছে। পরিশ্রম ও দায়িত্ববোধের সাথে লেখা আবদুল ওদুদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সচেতন সাহিত্যিকের উপজীব্য হিসেবে গভীর জীবন জিজ্ঞাসা ও মানবতাবোধ, প্রচার বিমূখতার পরিচয় এ গ্রন্থে রয়েছে।
শুধু চিন্তা ও মননশীলতার দিক থেকে নয়, রচনা শৈলী ও ভাষার দিক থেকেও ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থে লেখকের বিশিষ্টতা চোখে পড়ে। ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের ভাষা ও রচনাশৈলীর জন্য বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় বিশিষ্ট গদ্য লেখক হিসেবে তিনি পরিচিত, তিনি যতখানি লেখেন, ভাবেন তার চেয়ে বেশী। ভাবনার সাথে সাথে ভাষাও গড়ে ওঠে। বিশিষ্ট রচনাশৈলীর জন্যই তিনি স্বতন্ত্র স্টাইলের অধিকারী। ওদুদের রচনার বিষয় বস্তু কখনো হালকা নয় তাই রচনাও ভারী। কেননা তাঁর ভাষা তাঁর ভাবের উপযুক্ত বাহন। এজন্য অনেকে বলে থাকেন তাঁর স্টাইল বড় গুরু-গম্ভীর ঝঃুষব.।
কাজী আবদুল ওদুদের রচনার প্রাচুর্য, বৈচিত্র্য ও তার মননশীলতার মূল্য বিচার করতে হলে তার সামগ্রিক রচনার পরিচয় জানা আবশ্যক। তবে অনেকে বলে থাকেন, ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থটি লেখকের সার্বিক বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক। ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের মধ্যে সমাজ, দেশ, সাহিত্য ও শিল্প সম্বন্ধে লেখকের বহু মূল্যবান আলোচনা স্থান পেয়েছে। একটি গ্রন্থ পড়েও লেখকের জ্ঞানবত্তা ও পরিমিতিবোধ, সাহিত্য ও শিল্প সম্বন্ধে লেখকের ধ্যান ধারণার অনন্য সাধারণ সুমার্জিত রূপ চোখে পড়ে।
‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের মধ্যে সাহিত্য ও সাহিত্যিক সম্পর্কে সমালোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। লেখকের সমালোনা মূলক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে পাঠকের কাছে সাহিত্য ও সাহিত্যিক পুনর্মূল্যায়িত হয়েছে। সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র, কৃষি মানুষ নিয়ে লেখকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হয়, সমকালীন জীবনধারার পটভূমিতে ‘শাশ্বত বঙ্গে’র প্রবন্ধগুলোর সামাজিক মূল্য অপরিসীম, প্রবন্ধগুলোর মধ্যে লেখকের আকর্ষনীয় ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং বৈচিত্রপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভাবজীবন কর্মজীবনের ছাপ রয়েছে। তিনি লেখনি ধারণ করেছিলেনÑ প্রথমত, সমাজ সংস্কার ও জাতি গঠনের লক্ষ্যে। দ্বিতীয়ত, প্রজ্ঞা ও সৌন্দর্যের সন্ধানে।
পরিশেষে বলতে হয়, ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের গদ্যের প্রধান ভিত্তি যুক্তি, পরিমিতিবোধ ও আত্মপ্রত্যয়, একই সাথে এ তিন বৈশিষ্ট্য খুব কম লেখকের মধ্যেই দেখা যায়। স্বতন্ত্র স্টাইল, যুক্তিবাদ, বুদ্ধির মুক্তি, উদারতা, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, হিন্দু-মুসলিমের মিলনের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার, ভাব ও ভাষার সামঞ্জস্য রক্ষা, উপমা-দৃষ্টান্ত দ্বারা বক্তব্য উপস্থাপন ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের গদ্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শুধু ‘শাশ্বত বঙ্গ’ গ্রন্থের রচনাই তাকে বহুযুগব্যাপী স্মরণীয় করে রাখবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন
বাংলা বিভাগ
সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।