‘শাশ্বতবঙ্গ’ প্রবন্ধ গ্রন্থের ‘বাংলার জাগরণ’ প্রবন্ধের মূল বক্তব্য তোমার নিজের ভাষায় লেখ।

খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ব্লগ

বাংলার জাগরণ

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রাণপুরুষ কাজী আবদুল ওদুদ আজীবন সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে মুক্তচিন্তা, উদারতা, মানবতার বাণী প্রকাশ করেছেন। বাংলার জাগরণ প্রবন্ধটি একজন সচেতন বুদ্ধিজীবীর অসা¤প্রায়িক মুক্তিচিন্তাশ্রয়ী দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-ধারার উজ্জল দৃষ্টান্ত। জাতির উন্নতির নিয়ামক হিসেবে যে জীবন-দর্শন ও জীবনঘনিষ্ট মুক্তচিন্তা লেখক লালন করতেন বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে তা প্রকাশ পেয়েছে।

কাজী আবদুল ওদুদ

বাংলার জাগরণ প্রবন্ধটি প্রথম পঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ এর দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে এবং প্রথম প্রকাশিত হয় ‘শিখা’র দ্বিতীয় বার্ষিক সংখ্যায় (১৩৩৫)। পরে ‘নবপর্যায়’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খন্ডে সংকলিত হয়।

রেনেসাঁ বা নবজাগরণ কাজী আবদুল ওদুদের একটি প্রিয় সাহিত্যিক ভাবনা। তিনি লেখক জীবনের প্রথম থেকেই এ সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক চিরায়ত বাংলার নবজাগরণ সম্পর্কে তথ্যনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণী আলোকপাত করেছেন।

তাঁর মতে বাংলাদেশের নবজাগরণ পুরোপুরি পাশ্চাত্য প্রভাবের ফল নয়, বরং যারা এই জাগরণের পুরোধা, তাঁরা যে উদ্দেশ্যে- আদর্শের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে কর্মক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং এ জাগরণের ফলে দেশের যা লাভ হয়েছে, তার স্বরূপের মধ্যেই এর কার্যকারণ সূত্র নিহিত।

‘বাংলার জাগরণ’ প্রবন্ধে বাংলার নবজাগরণের ক্ষেত্রে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। এ প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায়, ডিরোজিও, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, কেশবচন্দ্র সেন, রামকৃষ্ণ পরমহংসদের, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, স্বামী বিবেকান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের অবদান আলোচনা করেছেন। তবে রামমোহন রায়ের জীবনকৃতি বেশি আলোচিত হয়েছে। ডিরোজিও ভাব আন্দোলন, ধর্মচিন্তা ও লেখকের উদার মুক্ত মনের পরিচয় এ প্রবন্ধে পাওয়া যায়।

বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের মতে নবজাগরণের সূত্রপাত হয় রাজা রামমোহনের হাত ধরে। তিনিই জাতীয় জীবনে নব চৈতন্যের সাড়া জাগিয়েছিলেন এবং একটা নব আদর্শ তিনি জাতির সামনে উপস্থাপিত করে গেছেন। রাজা রামমোহন পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, পাশ্চাত্য জীবনাদর্শ ইত্যাদির সংস্পর্শে এসেছিলেন পূর্ণ যৌবনে।

তবে তার আগে পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে যেভাবে লড়াই করেছেন, তাঁর মনের উপর মোতাজেলা সুফি প্রভূতির প্রভাবের কথা মনে করলে তাঁকে নানক, কবীর, দাদু, আকবর, আবুল ফজল, দারাশেকো প্রভূতি ভক্ত ভাবুক ও কর্মী দলের অন্যতম উত্তর-সাধক বলে মনে হয়। অবশ্য তাঁর মধ্যে আধুনিক কালের শক্তিমান মানুষের চিত্তের পরিচয় পাওয়া যায়।

বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মনে করেন রামমোহন ভাব কর্মের প্রেরণা পেয়েছেন দেশ ও সমাজের কল্যাণ ব্রতের মধ্যে। তিনি সতীদাহ নিবারণের জন্য লড়াই করেছেন। বেদ উপনিষৎ নিয়ে হিন্দুর সাথে তর্ক করেছেন, কোরআন হাদিস কেকা মান্তেক নিয়ে মুসলমানের সাথে তর্ক করেছেন, বাইকেল ও বড় বড় খ্রিষ্টানদের মতবাদ নিয়ে খ্রিষ্টানদের সাথে তর্ক করেছেন, নারীর অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেছেন, ইংরেজ শাসনের সমালোচনা করেছেন, এসব কর্ম ও আন্দোলন তাকে তরুণ সমাজের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

প্রাবন্ধিকের দৃষ্টিতে রামমোহনের অবদান হলো-“ধর্মের ক্ষেত্রে তাঁর নির্দেশ এক নিরাকার পরমব্রহ্মের উপাসনা, লোকশ্রেয়ঃ ও বিচারবুদ্ধির দ্বারা পরিশোধিত শাস্ত্র, ইউরোপীয় জ্ঞান বিজ্ঞানের বিশেষ অনুশীলন, সমাজের ক্ষেত্রে লোকহিতকর অনুষ্ঠানসমূহের প্রবর্তনা, যা অনিষ্টকর তা প্রাচীন হলেও বর্জনীয়” ইত্যাদি।

বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিকের দৃষ্টিতে বাংলার নবজাগরণে রামমোহনের পরেই ডিরোজিও এর নাম স্মরণীয়। ডিরোজিও হিন্দু কলেজের শিক্ষক ছিলেন মাত্র পাঁচ বছর (১৮২৬-১৮৩১)। অথচ এ স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর দুর্লভ ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে বাংলা দেশে সুপ্ত তারুণ্যের দীপ্ত প্রকাশ ঘটেছিল। তিনি তাঁর ছাত্রদের মনে তীব্র জ্ঞানানুসন্ধিৎসা সৃষ্টি করে তাদেরকে যুক্তিবাদী ও সত্যসন্ধানী করে তুলেছিলেন ফলে তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করে সব রকম শঠতা, ভন্ডামী, মিথ্যাচরণ ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে। ফলে রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের সঙ্গে তাদের দ্ব›দ্ব তীব্র হয় এবং ডিরোজিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

ডিরোজিও এবং তাঁর অনুসারী ‘ইয়ংবেঙ্গল’ এর ক্ষণপ্রভা সম্পর্কে প্রাবন্ধিকের ব্যাখ্যা হল-“তারা দেশের ইতিহাসকে একটুও খাতির করতে চাননি, পবননন্দণের মতো আস্ত ইউরোপ-গন্ধমাদন এদেশে বসিয়ে দিতে তাঁরা প্রয়াস পেয়েছিলেন।”

রামমোনহন প্রতিষ্ঠিত ‘ব্রাহ্ম সমাজ’ বাংলার নবজাগরণের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। বস্তুধর্ম বিশারদ মানবের মুক্তির লক্ষ্যে রামমোহন প্রতিষ্ঠিত করেন ব্রাহ্মধর্ম। প্রাবন্ধিক রামমোহনের ধর্ম সংস্কারক ও সমাজ সংস্কারক ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন যথার্থভাবে।

ব্রাহ্ম সমাজের নেতৃত্ব যাঁরা হাতে নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত ও কেশবচন্দ্র সেন উলে­খযোগ্য। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিষ্ঠা ছিল ভগবৎ ভক্তিতে। তিনি ঈশ্বর প্রেমিক ছিলেন। হাফিজের যেসব লাইন তাঁর অতিপ্রিয় ছিল তার একটি হলো-“হরগিজম মোহরে তু আজ লওহে দিলও জাঁন রত্তদ।” (তোমার ছাপ আমার চিত্র-ফলক থেকে কিছুতেই মুছবে না)। পরম সত্তার প্রতি মহাআ দেবেন্দ্রের এই যে গভীর অনুরাগ তা প্রাবন্ধিক মূল্যায়ণ করেছেন।

অক্ষয়কুমার ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। সে পিপসা এতই প্রবল যে, এতদিনেও বাংলাদেশে সে রকম লোক অতি অল্পই জন্মগ্রহণ করেছেন। অক্ষয়কুমার মত প্রকাশ করেছেন যে, রাজা রামমোহনের বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রচার। জ্ঞানানুশীলন অক্ষয়কুমারের কাছে এত বড় জিনিস ছিল যে এ ভিন্ন অন্য রকমের প্রার্থনার প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করতেন না। তাঁর সুবিখ্যাত সমীকরণ বাংলার চিন্তা জগতে অক্ষয় হয়ে আছে আজো।

প্রার্থনা+পরিশ্রম শস্য
পরিশ্রম শস্য
প্রার্থনা ০

অন্যদিকে কেশবচন্দ্র সেন ধর্মের দিক থেকে বাঙ্গালির জাতীয় জীবনকে প্রভাবিত করলেও প্রাবন্ধিক মনে করেন “বিজ্ঞান-প্রভাবান্বিত ঊনবিংশ শতাব্দিতেও কেশবচন্দ্র বেশি গুংঃরপ (মরমিয়া)। তাই তাঁর প্রভাবে বাংলার জাতীয় জীবনে তত ও ধর্মীয় হতে পারেনি, যত হয়েছে ধর্মোন্দও, অন্য কথায় কর্মহীন ও গতিহীন।” এ ধারা অন্য দুজন নেতা হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদের ও স্বামী বিবেকানন্দ। এঁরা বাংলার জাতীয় জীবনে কেশবচন্দের তুলনায় অনেকে বেশি আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হয়েছিলেন। তবে প্রাবন্ধিক রামকৃষ্ণকে নিয়ে আলোচনায় অগ্রসর হননি। কারণ তাঁর মর্যাদা তাঁর দেবত্বেরই জন্য, নবত্বের জন্য নয়।

আর বিবেকানন্দের গুরুত্ব সম্পর্কে লেখকের মন্তব্যÑ “বিবেকানন্দ সুপন্ডিত ও সুলেখক, কিন্তু তাঁর প্রধান কীর্তি দেশের বুকে সেবা-শ্রমের বিস্তার। এর পেছনে যে আত্মসম্মানবোধ ও স্বদেশ বাৎসল্য রয়েছে সেটি আমদের পরম আনন্দ ও শ্রদ্ধার সামগ্রী। তবু এ কথা আমাদের ভাবতেই হবে যে সন্ন্যাস ও ভিক্ষার সাহায্যে দেশের দুঃখ দূর করতে চেষ্টা করা ছেঁড়া কাপড় তালি দেওয়ার চাইতে বড় কাজ নয়।”

নগজাগরণের প্রথম শক্তিমান শিল্পী মাইকেল মধুসূদন দত্ত উদারচিত্ত নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। জাতি-ধর্ম ইত্যাদির সংকীর্ণতা তাঁকে বিন্দুমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি। প্রাবন্ধিক মনে করেন যে কবি ইউরোপ ও ভারতের প্রাচীন কাব্যকলার শ্রেষ্ঠ সম্পদকে অবলীলাক্রমে তাঁর স্বদেশবাসীদের উপহার দিয়েছেন শক্তিধর শিল্পস্রষ্টা হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রের অনন্যতাকে প্রাবন্ধিক মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করেলও তাঁর মনে হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাধারা বাঙালি জাতিকে সঠিক পথ দেখাতে সক্ষম হয়নি। জাতীয়তার প্রশ্নে তাঁর হিন্দুত্বের ধারণা সমগ্র বাঙালি সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।

রামমোহন, ডিরোজিও, অক্ষয়কুমার প্রমুখের আদর্শকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মনে করেন কেবল রামমোহন ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তাধারার মধ্যেই ব্যাপক ও আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দির নবজাগারণে বাঙালি মুসলমান সমাজের অংশগ্রহণ পূর্ণাঙ্গ ছিল না। এর মূলে আছে এ সমাজের অর্থনৈতিক বিপর্যয়। প্রাবন্ধিক মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণ হিসেবে শুধু অর্থনৈতিক অবস্থাকে দায়ী না করে মনস্তাত্বিক কারণের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। “নানা ঘটনায় মুসলমান ও ইংরেজদের মধ্যে যে দীর্ঘকালব্যাপী মনোমালিন্য এমনকি শত্র“তা মুসলমানদের সচেতন অংশে দেখা দেয় সেইটিই হচ্ছে তাদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি বিতৃষ্ণার মূল কারণ।”

যাহোক, বাংলার জাগরণ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক দেখিয়েছেন, শেষপর্যন্ত বাংলার নবজাগরণের দুটো ধারায় সমান্তারাল হয়ে গিয়েছে। একটি হিন্দু জাগরণ, অপরটি মুসলিম জাগরণ। তবু লেখক ‘স্বাপ্নিক হিন্দু’ ও ‘বস্তুতান্ত্রিক মুসলমান’ এ দুয়ের মিলনে বাংলার ‘অভিনব জাতীয় জীবন’ এর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *