আখ্যানকাব্য হিসেবে সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যের সফলতা। বা গীতিকবিতা অপেক্ষা আখ্যানকাব্য রচনায় কবির সাফল্য বেশি



সোজন বাদিয়ার ঘাট – শিল্পমূল্য / আখ্যানকাব্য- জসীম উদদীনের কবিকৃতিত্ব।
পল্লীজীবনের যথার্থ রূপকার, বাংলা কাব্য জগতে স্বতন্ত্র ধারার কবি জসীম উদদীনের (১৯০৩-১৯৭৪) সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ ও’ সোজন বাদিয়ার ঘাট’। এ কাব্য দুটিতে কবির সাফল্য এত বেশি যে মনে হয় গীতিকবিতা অপেক্ষা আখ্যানকাব্য রচনায় কবির পারদর্শিতা বেশি। এই কাব্যদুটির বিষয়বস্তু, সামগ্রিক আবহ, চরিত্র দেখে মনে হয় তিনি যথার্থ অর্থেই পল্লীজীবনের রূপকার।
পল্লীজীবনবৃত্তাশ্রয়ী হলেও এ কাব্যদুটি রূপসজ্জায় আধুনিক এবং নাগরিক প্রকর্ষের লক্ষ্মণাক্রান্ত। আধুনিক উপন্যাসের রীতি-প্রকৃতি অনুসারে প্রেমের পূর্বরাগ, মিলন এবং বিরহকে যুক্তিসহকারে গড়ে তুলেছেন। কাব্যদুটিতে ঘটনা বিন্যাসে, প্রকৃতি বর্ণনায়, চরিত্র বিশ্লেষণে মনস্তাত্ত্বিক কৌতূহল প্রকাশে, ভাষার পরিমার্জনায়, বাস্তব সমাজ-চিত্র অঙ্কনে, প্রকরণশৈলীতে কবি যথেষ্ট স্বকীয় ক্ষমতার পরিচয় দিতে পেরেছেন।
সোজন বাদিয়ার ঘাট

অবহেলিত পল্লীজীবনের ক্ষুদ্র তুচ্ছ প্রাণ ও তার উপকরণকে কবি এ কাব্যের বিষয়বস্তু করেছেন। তাঁর লেখনীর যাদু স্পর্শে গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষের প্রেম ভালবাসা, সামাজিকতা, দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মাখামাখি, সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কাব্যটি কবির কবিখ্যাতির বিশিষ্ট দ্যোতক। উপন্যাসোচিত শিলপনৈপুণ্য ও সমাজবাস্তবতার নিখুঁত দলিলে কাব্যখানি অপরূপ সৌন্দর্ঘমন্ডিত ও সার্থক।
সোজন বাদিয়ার ঘাট — সংক্ষিপ্ত ‘কাহিনি:
গ্রামের নাম শিমুলতলী। এখানে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলমানের বসবাস। যথেষ্ট সম্প্রীতি তাদের মধ্যে। সুখে-দুঃখে, আনন্দ-উৎসবে পরস্পর পরস্পরের সমভাগী, সহমর্মী। গ্রামের গদাই নমুর মেয়ে দুলী ও ছমির শেখের ছেলে সোজন আবাল্য খেলার সাথী। পুতুল খেলার ছল করতে করতে তারা একে অপরের হৃদয়ে বাসর তৈরি করে। একবার মহররমের উৎসবকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময় নমুর ভয়ে শিমুলতলী গাঁ জোড়ে মুসলমানেরা কাজীর গাঁয়ে আশ্রয় নেয়। এদিকে দুলীর বিয়ে ঠিক হলে দুলী বিয়ের আসর ছেড়ে সোজনের সাথে পালিয়ে গিয়ে গড়াই নদীর তীরে ঘর বাঁধে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিমুলতলী ও কাজীর গাঁয়ের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। সেই সাথে চলে মহাজন-নায়েবদের স্বার্থ উদ্ধারের গোপন ষড়যন্ত্র ।
নারী অপহরণের দায়ে সোজনের সাত বছরের কারাদন্ড হয়। দুলীকে বিয়ে দেওয়া হয় অবস্থাসম্পন্ন কৃষক কালাচাঁদের সাথে। জেল থেকে বের হয়ে সোজন দুলীর খোঁজে বেদের নৌকায় দেশে দেশে ফেরে। হঠাৎ দুলীর খোঁজ পায় সোজন, দুলী সোজনের সাথে রূঢ় আচরণ করে, সোজন সহ্য করতে না পেরে বিষলক্ষের বড়ি খেয়ে নদীর ঘাটে বাঁশিতে করুণ সুর তোলে। দুলী ভুল বুঝতে পারে। বাঁশির সুরে উন্মনা হয়ে ঘর ছাড়ে। দুলীও সোজলের সাথে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।
এরকম সামান্য কাহিনি কবির প্রতিভার সংস্পর্শে জীবন্ত হয়ে উঠেছে, উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষা, শব্দচয়ন, সমাজ-বাস্তবতা, কাহিনিবিন্যাস, চরিত্র-বিশ্লেষণে মনস্তাত্ত্বিক কৌতূহল প্রকাশ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যে কাব্যটি আশ্চর্য শিল্পসফলতা পেয়েছে। লোকজীবনের একটি প্রেম কাহিনি ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে কবি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। হিন্দু-মুসলিম বিরোধের ছবি অঙ্কনে যেমন সমাজ বাস্তবতার ছাপ পড়েছে, নায়ক-নায়িকার প্রেমকাহিনি অঙ্কনেও সমকালীন বাস্তব ঘটনার ছায়া পড়েছে।
সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যটি ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের মতই বহু প্রশংসাধন্য রচনা। দীনেশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ মনীষী ও রসিক মানুষের চিত্ত জয় করেছিলো কাব্যটি। অসমপ্রদায়িক জীবনদৃষ্টি, পল্লীর জীবন-বাস্তবতার জীবন্ত ছবি, জমিদার ও মহাজন শ্রেণির শোষণের রূপ, নিপীড়িতের প্রতি গভীর দরদ ও সহানুভূতি, হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জীবনধারার বৈশিষ্ট্য, ধর্মবোধ, সামাজিক সংকীর্ণতা ও সংস্কারকে বাস্তবতার সাথে তুলে ধরা ইত্যাদি বিষয়গুলো কবির জীবনাভিজ্ঞতারই পরিচয় বহন করে।
পল্লীগ্রামের আবহস্রষ্টির সুবিধার্থে কবি মাঝে মাঝে পল্লীগীতি ও পল্লীসাহিত্যের রচনারীতি গ্রহণ করেছেন এবং সচেতনভাবেই তিনি গ্রাম্যকবিদের দু’একটি পংক্তি নিজ রচনার মধ্যে জুড়ে দিয়েছেন। গ্রাম্য শব্দ, উপমাও সচেতনভাবে মার্জিত করে ব্যবহার করেছেন। পল্লীগীতির হবহু উদ্ধৃতি, একটু পরিবর্তিত রূপ, কোথাও পল্লীকাব্যের ভাবনার তরজমা রূপে ব্যবহৃত হয়েছে কবির কাছে। ছন্দের ক্ষেত্রেও এ ঋণ যথেষ্ট। ভূমিকা অংশেও কবি তা স্বীকার করেছেন, কবির সহজাত শিল্পবোধের কারণে তা দোষের না হয়ে গুণেরই হয়েছে।
সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যটির স্পষ্টত দুটি অংশ। অবশ্য কবি তা নির্দেশ করেননি। প্রথম অংশে বিষয়ের উপস্থাপনা ও নায়ক-নায়িকার প্রেম বর্ণনাসহ সামগ্রিক সমাজবাস্তবতা উঠে এসেছে। এটি ১৪ পরিচ্ছেদ পর্যন্ত বিস্তৃত। দ্বিতীয় অংশ টি সংক্ষিপ্ত, উপসংহার স্বরূপে। এটি আট পরিচ্ছেদের।
কাব্যটিতে কবির ঔপন্যাসিকসুলভ বাস্তব-বর্ণনা, চরিত্র-চিত্রণ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ক্ষমতার পরিচয় রয়েছে। নাটকীয়তারও পরিচয় আছে। কাব্যের নর-নারীরা জটিল সমাজ-ভাবনার চেয়ে হৃদয়বৃত্তির আকর্ষণেই সাড়া দিয়েছে বেশি। স্বভাবধর্ম অনুযায়ী প্রেমচিত্র অঙ্কনে কবি বৈষ্ণবকাব্য, মঙ্গলকাব্য ও গীতিকাব্যের অনুগামী হয়েছেন।
লোকজীবনের প্রভাব একাব্যে প্রচুর। নায়ক-নায়িকার রূপবর্ণনায়, তাদের সরল জীবনের বর্ণনায়, গ্রামীন আবহসৃষ্টিতে পল্লীর পাখি, পশু, ফুল, ফল, অলংকার, খাবার চালচিত্র, নীতি-প্রথা, সংস্কার, উৎসব-পার্বণ, হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতি ও দাঙ্গা, স্বার্থান্বেষী মহলের তৎপরতা, হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্য, চরিত্র-চিত্রণ সব কিছুতেই লোকজ উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রকরণগত দিক থেকেও সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যটি আধুনিক বৈশিষ্ট্যের। উপমা, রূপক, চিত্রকল্প ব্যবহারে কবির সচেতন শিল্পবোধের পরিচয় রয়েছে।
উপমা: মন সে ত নহে কুমড়ার ফালি,
তাহারে তাহারে কাটিয়া বিলান যায়।
ঐতিহ্যের ব্যবহার: ভেলায় ভাসিয়া বেহুলা চলেছে লখাই লইয়া কোলে
লোকবিশ্বাস ও সংস্কার:
ছোঁয়াছুঁয়ির এতই যে বাড়, পীরের পড়া জল
নমুর পোলার পীড়ার দিনে হয়নি তা বিফল
চিত্রকল্পঃ
রহিয়া রহিয়া মড়ার গুলিতে বাতাস দিতেছে শীস
সুরে সুরে তার শিহরি উঠিছে আধিয়ারা দশদিশ
উৎপ্রেক্ষা :
সেজনের সাথে তার ভারি ভাব, পথে যদি দেখা হয়
যেন রাঙা ঘুড়ি আকাশে উড়াল, হেন তার মনে লয়।
ছড়ার নিপুণ ব্যবহারঃ
তাগ ধুমাধুম বাদ্যি বাজে কাল শেয়ালের বিয়ে
শিয়াল চলে শশুর বাড়ি খালুই মাথায় দিয়ে।
প্রবাদের ব্যবহারঃ
পান হাতে চুন খসাবে এমন বাসের ছেলে
শপত করে বলতে পারি দশ গাঁয়ে না মেলে।
কাব্যটির প্রায় সর্বত্রই কথোপকথনের ভঙ্গি রয়েছে। এই সংলাপধর্মিতার কারণে কাব্যটি গীতিনৃত্যনাট্যের মর্যাদা পেয়েছে।
যেমন
“দুলী কছে, দেখ। তুই ত আসিলি, মা তব মোরে কয়
বয়স বুঝিয়া লোকের সঙ্গে আলাপ করিতে হয়।
ছন্দঃ ভাব অনুযায়ী কখনো স্বরবৃত্তে, কখনো মাত্রাবৃত্তে কাব্যটি রচিত।
স্বরবৃত্তের দৃষ্টান্ত-
পায়ে তাহার/ গয়না নাহি/ হাতে কাচের/ চুড়ি
দুই পায়েতে/ কাসার থাড়ু। বাজছে ঘুরি/ ঘুরি।
মাত্রাবৃত্তঃ-
মনেই করনা/যদি কেউ মোরে/ জোর করে নিয়ে/ যায়
তুমি কিবা কর/ জানিতে আমার/ আজিকে যে মন/ চায়।
রসের বিচারে কাব্যটি করুণ রসেই পরিণতি পেয়েছে। সোজন-দুলীর বিচ্ছেদ, হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত, গ্রাম উজাড় হওয়া, সোজন-দুলীর আত্মবিসর্জন কাব্যের জমিন বেদনার রঙে নীল হয়ে গেছে।
কাব্যটির নাম ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ রাখাটাও যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত হয়েছে। সোজন-দুলী শেষ পর্যন্ত আত্মহননের পথ বেছে নিয়ে নিজেদের মুক্তির সন্ধান খোঁজে। কবির ভাষায় –
“পরদিন ভোরে গায়ের লোকেরা দেখিল বালুর চরে
একটি যুবক একটি যুবতী আছে গলাগলি ধরে।”
স্থানটি নদীর ঘাটে। তাই সেই থেকে এ ঘাটের নাম হয় ‘সোজন বেদের ঘাট। সোজন-দুলীর বেদনার এ কাহিনি লোকমুখে গানে গানে সুরে সুরে উচ্চারিত হতে থাকে। এ ঘাট নিয়ে তৈরি হয় নানা কিংবদন্তি। বিরহীরা এ ঘাটে এসে তাদের জ্বালা-জুড়ায়, গাঁয়ের বধূরা জেল ভরতে এসে সোজন-দুলীর কথা স্মরণ করে দু’ফোটা চোখের জল ফেলে ঘায়। ঘাটটি প্রেমের তীর্থ হিসেবে পরিচিত। ফলে কাব্যের নামকরণ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ শিল্প উৎকর্ষতা পেয়েছে।
ভাষার ক্ষেত্রেও শিল্পীর শিল্প-কশলতার ছাপ রয়েছে। পল্লীজীবনের অবহ সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচলিত, অপ্রচলিত শব্দ, আধুনিক বাংলার তৎসম, তদ্ভব দেশি ও অনেক নতুন শব্দ সম্পদসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ব্যবহৃত শব্দটি কাজে লাগিয়েছেন। ভাষা কখনো নাগরিক মৌখিক ভাষার অনুসারী কোথাও বা বিষয়বস্তু অনুযায়ী গ্রাম্য ভাষাভঙ্গির নিকট আত্মীয়। আরবি, ফারসি শব্দের মিশ্রণ এবং ঐতিহ্য অনুযায়ী শব্দ ব্যবহারেরও দৃষ্টান্ত রয়েছে।
উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় ঘে, কাব্যটি সত্যিই জসীম উদদীনের কবি প্রতিভার অন্যতম স্বাক্ষর। বিষয়বস্ত কাহিনির নিটোলতা, ভাব, ভাষা, শব্দ প্রয়োগ, প্রকরণশৈলী উপন্যাসোচিত বৈশিষ্ট্য, চরিত্র চিত্রণ, সমাজ-বাস্তবতা, লোকজ উপাদানের ব্যবহার, ছন্দ, রস, নামকরণ, নাটকীয় সংস্থাপনে সব দিক থেকেই কাব্যটি আশ্চর্য শিল্পসফল।