সোজন বাদিয়ার ঘাট — বিষয়বৈচিত্র্য- ২২ অধ্যায়ের আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ কাহিনি।


সোজন বাদিয়ার ঘাট – ২২ অধ্যায়ের আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ কাহিনি।


পল্লী কবি জসীম উদ্দীনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যকীর্তি ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। এর আগের ‘বালুচর’ ‘ধানক্ষেত’ ও ‘রঙিলা নায়ের মাঝি’র বিচিত্র অভিজ্ঞতার পর কবি ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যে ফিরে এসেছেন আগের কাহিনিকাব্য ‘নকসী কাঁথার’ জগতে। কাহিনির জালবিস্তার করে কেমন অবলীলাক্রমে তুচ্ছ পল্লীদৃশ্যকে তিনি পারেন আকর্ষণীয় করে তুলতে। ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ কাব্যের প্রাণ-প্রাচুর্য ও হৃদয়-ঐশ্বর্যের আকর্ষণকে তিনি কখনই কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নক্সী কাঁথার মাঠ ও সোজন বাদিয়ার ঘাট জসীম উদদীনের সার্থক কাহিনিকাব্য।
‘রঙিলা নায়ের মাঝি’ কাব্যের বৈচিত্যের যাত্রা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটে’ এসে শেষ হল। বস্তুত ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট‘ কাব্যে ‘নকসী কাঁথার মাঠে’র জীবনচেতনারই সার্থক উত্তরণ ঘটেছে। দুই কাব্যের কাহিনি-পরিকল্পনা ও রচনারীতি আশ্চর্য রকমের সৌসাদৃশ্য এবং লেখকের জীবনদৃষ্টির সঙ্গতি আমাদের ঐ ধারণাকেই সমর্থন করে। দুটো কাব্যই গ্রাম-বাংলার বাস্তবজীবনালেখ্য।
নিখুঁত সমাজবাস্তবতা ছিল কবির লেখার প্রেরণা। ‘নকসী কাঁথার মাঠে‘র মত ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে জসীম উদদীনের সুতীক্ষ্ম বাস্তব-দৃষ্টির ও সমৃদ্ধ জীবনাভিজ্ঞতা, চিত্রশিল্পীর অপূর্ব রেখাংকন নৈপুণ্য এবং কবির প্রেমসুন্দর হৃদয় ও বলিষ্ঠ কল্পনাশক্তি সব শক্তি ও প্রজ্ঞা যেন এক হয়ে ধরা পড়েছে। তবে একথা স্মরণ রাখা ভালো যে, ‘নকসী কাঁথার মাঠ‘ ও ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট‘ শেষ পর্যন্ত আপন আপন বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র সৃষ্টির মহিমা লাভ করেছে।
তবে নক্সী কাঁথার মাঠ কাব্যের চেয়ে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটে’র কাব্যে বর্ণিত সাম্প্রদায়িক চেতনার বিশেষ রূপায়ণ এবং সামাজিক জটিলতা থেকে মুক্ত ‘নকসী কাঁথার মাঠ’ কাব্য থেকে পৃথক করে তুলছে।
তবে একটা কথা পরিষ্কার যে পরস্পরবিরোধী সমাজশক্তির জটিল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট‘ কাব্যের প্রেমচিত্রকে অনেকটা আচ্ছন্ন করে ফেলছে। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে কবির দৃষ্টি প্রেমকে আশ্রয় করেও শেষ পর্যন্ত সমাজের প্রতিই যেন নিবদ্ধ হয়েছে। সমাজের কুটিলতা ও বাস্তবতাকে কবি এড়িয়ে যেতে পারেননি। অপেক্ষাকৃত পরিণতবুদ্ধি কবির জীবনাভিজ্ঞতার স্বাভাবিক উত্তরণই আমরা লক্ষ্ করি সোজন বাদিয়ার ঘাট কাব্যে। এখানে সাম্প্রদায়িক চেতনা দ্বারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন সমাজের নিষ্ঠুরতাকে এড়িয়ে দুটো নর-নারী নিজেদের মনের চাওয়া-পাওয়ার বৃত্তে আবদ্ধ থাকতে চেয়েছে। কবি সেই নর-নারীর প্রচলিত সমাজের গণ্ডী অতিক্রম-প্রয়াসী প্রেমের জটিল রূপের ছবি আঁকার চেষ্টা কবির জীবনদৃষ্টির প্রসারকেই স্পষ্ট করে তুলছে।
চিরচঞ্চল দুটো গ্রাম্য বালক-বালিকার স্বাভাবিক প্রণয় এ কাব্যের রূপ পেয়েছে। তবে নর-নারী দুটো ভিন্ন সমাজের হওয়ায় তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যে পরস্পরবিরোধী জনগোষ্ঠীর দুটি নর-নারীর প্রেম চিত্রিত। তবে সে প্রেম সমাজের ক্ষমাহীন আক্রোশ ও বিরোধিতায় সদা ভীত। সমাজ এখানে পাষাণ প্রাচীরের মত মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে দুটি নর-নারীর মাঝখানে।
প্রেমাকুল ও মিলনের বাসর রচনায় বিভোর নর-নারীর মানসিক সংকটের যে চিত্র কবি এ কাব্যে তুলে ধরেছেন তা দুর্লভ মনস্তত্ত্ব জ্ঞানসম্মত। ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট‘ তাই অনেক বেশি জীবনাভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ উপন্যাসধর্মী রচনা। এ কাব্য বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চলের নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনের বাস্তবনিষ্ঠ চিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিমহিমার অধিকারী এবং এ কাব্য কবির ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন শিল্পসৃষ্টি।
শোষণকারীদের কোনো জাত থাকে না। শোষণকারীরা পৃথিবীতে সকলে একই জাতের। যেমন চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। এদের প্ররোচনায় হতভাগ্য নমঃশূদ্র ও মুসলমানের যে অবস্থা হয়, তা চোখে দেখলে অশ্রু সংবরণ করা যায় না। এমন একটি ঘটনা নিয়ে এই পুস্তকের সূত্রপাত। এ কাব্যের হিন্দু-মুসলমান বিরোধের ছবি অংকনে যেমন কবির বাস্তব অভিজ্ঞতা কাজ করেছে, তেমনি এর নায়ক ও নায়িকার অসামাজিক প্রেমের কাহিনির পেছনেও সমকালীন একটি ঘটনা ছায়া ফেলছে।
সোজন ও দুলীর প্রেমের কাহিনির কল্পনায় বাস্তব ঘটনার ছায়াপাত হয়েছিল। কাব্যটি তাই গ্রাম-বাংলার হিন্দু-মুসলমান সমাজের একটি বাস্তব ও জীবন্ত আলেখ্য রূপে মেনে নিতে কোনো আপত্তি থাকতে পারে না।
ছোট-বড় বাইশটি পরিচ্ছেদে বিভক্ত কাবাটিতে কবি পূর্ব বাংলার পল্লীর ক্ষুদ্র জীবনবৃত্তের মধ্যেই আমাদের এক মহানাটক প্রত্যক্ষ করিয়েছেন। ভিন্ন দুই সমাজের দুটি কিশোর-কিশোরীর প্রণয়কে কেন্দ্র করে পল্লীর জীবনাকাশে যে ঝড়ের কালো মেঘ দেখা দেয়, তাই কেমন করে নানা পারিপার্শ্বিক কারণে প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের মত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গারূপে দেখা দিয়ে পল্লীজীবনকে বিধ্বস্ত করেছে, তারই আশ্চর্য নিখুঁত চিত্র ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’।
কাব্যটির স্পষ্টত দুটি অংশ। প্রথম অংশটিতে বিষয়ের উপস্থাপনা, দ্বিতীয় অংশে রয়েছে উপসংহার।
কাব্যের প্রথম পরিচ্ছেদে কাব্যের নায়ক সোজন ও নায়িকা দুলীর বাল্যলীলার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে তাদের মনে পরস্পরের প্রতি প্রণয়ের উন্মেষের কথা কবি বেশ কবিত্ব করেই বলেছেন। যেমন- সতেজ উপমা ব্যবহার করে নায়িকার রূপের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে-
“ধানের আগায় ধানের ছড়া, তাহার পরে টিয়া, নমুর মেয়ের গায়ের ঝলক, সেই না রঙ নিয়া। দুর্বাবনে রাখলে তারে দুর্বাতে যায় মিশে, মেঘের খাটে শুইয়ে দিলে খুঁজে না পাই দিশে। যে পথ দিয়ে যায় চলে সে, যে পথ দিয়ে আসে, সে পথ দিয়ে মেঘ চলে যায়, বিজলী বরণ হাসে।”
বাল্যকাল থেকে এ মেয়ের পুতুল খেলা, ফুল কুড়ানো, ফল কুড়ানো এসব কাজে তার সাথী হচ্ছে ‘ছমির শেখের ভাজন বেটা, বাবরী মাথায় ঘেরা’ সোজন। এই সোজন-
“বাঁশের পাতায় নথ গড়ায়ে গাবের গাঁথি হার, অনেক কালই জয় করেছে শিশু মনটি তার।”
গ্রাম্য উদার জমিনে স্বাভাবিকভাবে বড় হওয়া দুটো বালক-বালিকার হৃদয় কাছে এসেছে। সমাজের কুটিলতা, ভেদাভেদ তারা তার কি অত খোঁজ রাখে? স্বভাবের নিয়মেই যেন দুটি হৃদয় বাঁধা পড়ে যায় প্রেমছন্দে। নিজের অজ্ঞাতেই মনের আনন্দে তারা ছড়া কাটে- সে ছাড়া কিসের? না, শিয়ালের বিয়ের ছড়া, চম্পাবতী-কংকাবতী কন্যার ছড়া। তাদের ক্রীড়াচঞ্চল রূপের কথা ইঙ্গিত করেই কবি বলেছেন, ‘গেরাম ভরি নাচে তারা গাঙ শালিকের প্রায়।’
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে শিমুলতলী গাঁয়ের এবং তৃতীয় পরিচ্ছেদে কিশোর সোজন ও কিশোরী দুলীর অনুরাগ রঙিন মনে লুকোচুরির সুন্দর ছবি আঁকা হয়েছে। কবির ভাষায়,
‘সোজন যেন বা তটিনীর কূল, দুলালী নদীর পানি; দুলালী সে যেন বনের হরিণী, সোজন তাহার বন।’
সোজনের ভাবনা, সে বড় হয়ে পাটের নায়ের ভাগী হয়ে টাকা উপার্জন করে দুলীর জন্য আনবে মধুমালা শাড়ি, সিঁদুর কৌটা, শঙ্খের চুড়ি আরো কত কি। আবার ভাবে, সে যখন কৃষাণ হবে তখন সব ক্ষেত ভরে কুসুম ফুলের চাষ করবে। কেননা,
‘কুসুমে কুসুমে চরণ ঘষিয়া কাটিবে দুলীর দিন।’
চতুর্থ পরিচ্ছেদে কৈশোর প্রান্তে উপনীত সোজন ও দুলীর প্রেম মাটির স্পর্শে এসে প্রথমবার হোঁচট খেয়ে কিছুটা যেন সচকিত হল। কবি সোজনকে সতর্ক করে তাই বলেছিল-
“ওরে ঘুমন্ত-ওরে নিদ্রিত ঘুমের বসন খোল, ডাকাত আসিয়া ঘিরিয়াছে তোর বসত-বাড়ির টোল।
শয়ন ঘরেতে বাসা বাঁধিয়াছে যত না সিঁধেল চোরে, কণ্ঠ হইতে গজমতি হার নিয়ে যাবে চুরি করে।”
সে বাণীর অর্থ অনুধাবনের ক্ষমতা সোজনের হয়নি; তবে শীঘ্রই যে অভিজ্ঞতা সে লাভ করতে যাচ্ছে, তাতে প্রেম পথের জটিলতা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে তার কাছে।
পঞ্চম পরিচ্ছেদে নিখুঁত সমাজবাস্তবতার চিত্র। কবির দৃষ্টি প্রেমচিত্র থেকে সরে গিয়ে আপাতত সমাজ-বাস্তবে নিবদ্ধ হয়েছে। এ পরিচ্ছেদের বাস্তব আকর্ষণ হচ্ছে মহররমের মাসে জারি গান আর লাঠি খেলার মহোৎসবে মত্ত শিমুলতলীর মানুষগুলোর তাজা প্রাণের আলেখ্যগুলো। কারবালার মর্মবিদারী ঘটনার আবেদন পল্লীর ধর্মপ্রাণ, আবেগপ্রবণ মানুষের জীবনে কিরূপ প্রবল, তা কেমন করে মুসলমানদের মনে অন্যায়ের প্রতিশোধ নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প সৃষ্টি করে তা কবি অত্যন্ত নিপুণভাবে বর্ণনা করেছেন।
ঘষ্ঠ পরিচ্ছেদে গ্রাম-বাংলার আবহমান কালের বাস্তবচিত্র। হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির চিত্রের পাশাপাশি দাঙ্গার চিত। কবি পঞ্চম পরিচ্ছেদের শেষে উল্লিখিত নমু-মুসলমানদের দাঙ্গার সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ার আভাস দিয়েছেন। আর এই দাঙ্গার ফাটল সৃষ্টিকারী জমিদার নায়েব মশাইয়ের চরিত্র মাহাত্ম্যর কথা ব্যক্ত করেছেন এভাবে-
“রামনগরের নায়েব মশায় যম যেন না স্বয়ং বসে,
ভিটে নিলেম ডিগ্রীজারী করেন বাকী খাজনা কসে
সেলামী আর নজর-আনা কিস্তি খেলাফ সুদের বোঝায়,
ভুঁড়ির ওপর বাড়ছে ভুঁড়ি, দিনে যতই দিন চলে যায়।
ইহার ওপর ‘মাথট’ আছে ‘বাড়তি’ আছে ‘কমতি’ আছে,
যে দিক চাও হাত বাড়ালে হাত যে ঠেকে টাকার গাছে।
ঘড়ি ঘড়ি বাজছে টাকা, সামনে পিছন দিয়ে
কানে কানে কান-কথাতে চোখ টেপাতে ঝনঝনিয়ে।”
মোড়লের কাছে নায়েব যখন শুনতে পেল মহররমের মেলার শেষে মুসলমানেরা তাদের বেদম মার মেরেছে, তখন সহানুভূতি ও দরদের মুখোশ এঁটে নায়েব মশায় যে অভিনয়টা করলেন তার মূর্তিটি-
“কি বললি গদাই মোড়ল গর্জি উঠেন নায়েব মশায়,
ঝড়ের রাতে বিজলী যেমন, চোখ দুটিতে আগ উগরায়।
নমুর মাথায় লাগায় বাড়ি, এতই সাহস নেড়ের বুকে,
গোখরো সাপের লেচুর ছিঁড়ে আজো তারা ঘুমায় সুখে?”
সপ্তম ও অষ্টম পরিচ্ছেদে লেখক পূর্বপরিচ্ছেদের জের টেনেছেন এবং নবম পরিচ্ছেদে পট পরিবর্তন হল। দুর্যোগের মেঘ মিলিয়ে গেলে প্রকৃতির হাস্যোজ্জ্বল রূপ যেমন প্রকাশ পায়, তেমন প্রশান্ত হাস্যে শিতুলতলী জেগে উঠল প্রভাতে। তবে শিমুলতলীর বুকে দুর্যোগের দুরপনেয় বা অমোচনীয় রেখা আঁকা রয়ে গেল তার বুকে।
আর নমু-মুসলমানের বিচ্ছেদ, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যের নায়িকা নমুর মেয়ে দুলী আর নায়ক মুসলমানের ছেলে সোজনের সদ্য অঙ্কুরিত প্রেম ডালপালা মেলে আকাশের দিকে চাইবার আগেই অবাঞ্ছিত এক উৎপাত তাদের পরস্পর থেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে দিল।
দশম পরিচ্ছেদে প্রেমের দুর্জয় প্রাণবেগের যে ছবিটি কবি তুলে ধরেছেন, তা তাঁর শিল্পসৃষ্টির ক্ষমতার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধাকেই বাড়িয়ে তোলে। বিয়ে বাড়ি থেকে অকস্মাৎ দুলীর অন্তর্ধানে যে তড়িৎ প্রতিক্রিয়া জেগেছে, শিমুলতলীর নমঃশূদ্রদের মধ্যে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে একাদশ পরিচ্ছেদে।
দ্বাদশ পরিচ্ছেদে শিমুলতলীর নমঃশূদ্রদের আক্রমণাত্মক অভিসন্ধির খবর জানতে পেরে কাজীর গাঁয়ের মুসলমানদের যে তড়িৎ প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার হয়েছে তাই কবি বলতে চেয়েছেন। চারদিকে সাজ সাজ রব পড়ে গেল, একটা উন্মাদনা দেখা দিল মুসলমানদের মধ্যে-
“দলে দলে লোক সাজিল, হাতে হাতে জ্বলল মশাল
কাল বোশেখীর ঝড় ছুটিল, চৌদিকেতে সামাল সামাল;
মদন কালু ক্ষিপ্ত আজি, দল বেড়িয়া নৃত্য করে,
অট্টহাসি ঠিকরে পড়ে কিড়ি মিড়ি মন্ত্র ভরে।”
যুদ্ধসজ্জার যে বিস্তৃত বর্ণনা কবি দিয়েছেন তা আমাদের ‘জঙ্গনামা’ পুঁথির যুদ্ধবর্ণনার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে জসীম উদ্দীনের হাতে তা অনেকটা মার্জিত রূপ পেয়েছে, এটা অবশ্য স্বীকার্য।
ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদে কবি আমাদের শিমুলতলী ও কাজীর গাঁর দ্বন্দ্বমুখর পরিবেশ থেকে নিয়ে এসেছেন গড়াই নদীর তীরের প্রশান্ত প্রাকৃতিক আবেষ্টনীর মধ্যে। বিরোধী সমাজের হিংস্র ও ক্রুর ছোবল থেকে বাঁচার ভরসায় সোজন ও দুলী এসে বাসা বেঁধেছে গড়াই নদীর তীরে, আপন পল্লী থেকে অনেক দূরে।
দিনের পর দিন যায়। সোজনের প্রতীক্ষায় অতন্দ্র রজনী কাটে দুলীর। অবশেষে প্রতীক্ষা শেষ- সোজনের প্রতীক্ষায় তপস্যারত দুলী হঠাৎ একদিন দেখতে পায়-
“… দুয়ারে দাঁড়াল পুলিসের লোকজন
সোজনেরে তারা আনিয়াছে, সাথে হাত করি বন্ধন।’
ঘটনার এ আকস্মিক মোড় পরিবর্তনের নাটকীয়তা রীতিমত উপভোগ্য। এখানেই ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট‘ কাব্যের প্রথম অংশ শেষ হল।
পঞ্চদশ অধ্যায়ে আমরা পাচ্ছি নমু-মুসলমানের দাঙ্গার বিবরণ। এ বিবরণ দিতে গিয়ে কবি গ্রাম্য কবিদের বাচনভঙ্গির আশ্রয় করেছেন। চূড়ান্ত অমানুষিকতার পরিচয় দিল দুই পক্ষ। কবি আহত-বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছেন সে উন্মত্ততা-
‘গ্রাম জ্বলিল, ঘর পুড়িল, দেশ হল ছারখার,
কিবা নমু-মুসলমানের হুঁশ নাহি ক আর।
সকল মানুষ হদ্দ বেহুঁশ পতঙ্গেরি মত,
আপন হাতে জ্বালাল আগুন আপনি হ’তে হত।
মায়ের বুকের খোকন দুধের, আছড়িয়ে তায় মারি
করছে সবে পথে ঘাটে লাইঠেলি নাম জারি।’
ষোড়শ অধ্যায়ে কবি আমাদের কিছু সংবাদ শুনিয়েছেন- তাদের মধ্যে সোজন-দুলীর সম্পর্কের খবরটাও দিয়েছেন।
কিন্তু সপ্তদশ পরিচ্ছেদে শিমুলতলীর অপমানিত-আত্মা নায়েব মশাইয়ের ওপর চরম প্রতিশোধের একটি জবর খবরই শুনিয়েছেন। যেখানে নায়েবের দেহাবসানই ঘটেছে শেষ পর্যন্ত।
অষ্টাদশ পরিচ্ছেদে কবি আমাদের নিয়ে এসেছেন মধুমতীর তীরে, যার বুকের ওপর দিয়ে ভেসে চলেছে বেদে নৌকার বহর।
আর উনবিংশ পরিচ্ছেদে শুনিয়েছেন দুঃখিনী দুলীর অন্তরের কথা। একদিকে সোজন দুলীকে হারিয়ে বেদে সেজে পল্লীর ঘাটে ঘাটে দুঃসহ ব্যথা নিয়ে খুঁজে ফিরছে দুলীকে, অন্যদিকে সমাজবিধানে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্য পুরুষের অন্তঃপুরে বন্দিনী দুলী দিন-রাত চোখের জল ফেলছে সোজনকে স্মরণ করে।
বিংশ পরিচ্ছেদে কবি উজানখালীর দুলীর স্বামীগৃহে শাঁখা-সিঁদুর বিক্রেতাবেশী সোজন ও দুলীর নাটকীয় সাক্ষাৎ ও উভয়ের মানসিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার বিস্তৃত বর্ণনা।
একবিংশ পরিচ্ছেদে সোজন ও দুলীর প্রেমকাহিনির দুঃখজনক পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। মানে-অভিমানে সোজন ও দুলীর মৃত্যুর করুণ রাগিনীর সুর পাঠককে শোকের সাগরে ভাসিয়ে নেয়।
দ্বাবিংশ অধ্যায়ে সোজন-দুলীর প্রেমকাহিনির উপসংহার ঘটেছে।
‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ বহু প্রশংসাধন্য রচনা। দীনেশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথসহ বিভিন্ন রসিক মানুষের চিত্ত জয় করেছে এ কাব্যটি। কবি জসীম উদদীন প্রেমকে এখানে মানবিক পটভূমিকায় ফেলে বিচার করেছেন- হিন্দুর মেয়ে ও মুসলমানের ছেলের প্রেম সমাজের পক্ষে অসঙ্গত হলেও কবির দৃষ্টিতে স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছে। এ প্রেমকে শেষ পর্যন্ত তিনি শ্রদ্ধার চোখেই দেখেছেন। ধর্মোন্মাদনা ও সংস্কার কণ্টকিত মানুষের হৃদয়ে এ ঔদার্য কোনো ক্ষেত্র থেকেই আশা করা যায় না।
পরিশেষে বলা যায় যে, ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট‘ কাব্যে জসীম উদ্দীন হিন্দু-মুসলমান অধ্যুষিত বাংলার পল্লী জীবনের যে বিরোধ আবিষ্কার করেছেন, তার নাটকীয় সম্ভাবনাকে পূর্ণমাত্রায় কাজে লাগিয়েছেন। এ বিরোধই সোজন ও দুলীর প্রেমকাহিনিকে এত উত্তাল তরঙ্গমুখর হতে সাহায্য করেছে। আর সেই কারণেই সামান্য পল্লীর নর-নারীর জীবন নিয়ে লেখা ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটে’র প্রেমকাহিনির ঊর্মিমুখর রূপ আধুনিক পাঠককেও আকর্ষণ করেছে।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর