জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতা – বিষয়বস্তুর গরিমায় অনন্য।


যুগযন্ত্রণায় কাতর কবি দুদণ্ড শান্তির আশায়, কামনা-বাসনা ও আবেগে তাড়িত হয়ে কবি দীর্ঘদিন ধরে জীবনের পথ হাঁটছেন। তিনি পথ হাঁটছেন সূর্য-পাখির প্রতিরূপ ভ্রাম্যমাণ নায়কের মত, যার হাজার হাজার বছরের পথ-পরিক্রমা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন মিথের মধ্যে প্রকাশিত। বনলতা সেন কবিতা কবির কবি খ্যাতির দ্যোতক।


বনলতা সেন কবিতার শুরুতেই কবির ভ্রমণপিপাসু মনের পথ পরিক্রমার দৃশ্য অঙ্কিত। ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’- এই উক্তির মধ্যে কবি ব্যক্তিগত কামনা-বাসনাকে মানব ইতিহাসের কামনা-বাসনার সঙ্গে জড়িত করলেন। এ সমস্যা তাঁর একার নয়, এ সমস্যা সমষ্টির। এ সমস্যা একালের নয়, এ সমস্যা সর্বকালীন। কেন তাঁর এই পথ পরিক্রমা তাঁর উদ্বেল কামনা-বাসনাকে সহজে ধারণ করতে পারবে, তার জন্য চাই একটি যোগ্য আধার: ‘মানুষের তরে এক মানুষীর গভীর হৃদয়।’ চাই মনের মৃত একজন বাস্তব নারী, যার সাহচর্যে কামনা-বাসনার পরিতৃপ্তি ঘটবে, আবেগ হবে প্রশমিত। এমন সময় নাটোরের বনলতা সেনের সঙ্গে তাঁর দেখা।
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। ( বনলতা সেন কবিতা )
কবি-নায়ক হাজার বছর ধরে পথ হাঁটছেন। তাঁর সেই পথপরিক্রমার ছবি তিনি ফুটিয়ে তুললেন ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসের সাহায্যে। আমরা কবিকে দেখতে পাচ্ছি প্রাচীন ভারতীয় নাবিক হয়ে সিংহল সমুদ্র থেকে রাত্রির অন্ধকারে মালয় সাগরে- বৃহত্তর ভারতে ঘুরে বেড়াতে। আজ বিম্বিসার অশোকের জগৎ যতই ‘ধূসর’ হোক, বিদর্ভনগরের সভ্যতা যতই হোক ‘দূর অন্ধকার’ একদিন তিনি সেখানে ছিলেন এবং পরিপূর্ণ জীবনের আস্বাদ পেয়েছিলেন।
আজ তিনি ‘কান্ত প্রাণ’ চারদিকে জীবনের সফেন সমুদ্র তাঁকে ঘিরে রেখেছে, নেই কোন স্থির বিশ্বাসের আশ্রয়ভূমি। এরই মাঝখানে নাটোরের বনলতা সেনের সাহচর্যে তিনি দু’দণ্ডের শান্তি পেয়েছিলেন। প্রেমের বিশেষ এক মুহূর্তে তাঁর আত্মা পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
কিন্তু কবি জানেন যে, এ অবস্থায় কিন্তু বেশিক্ষণ থাকা যায় না, তাই অনুভবের শীর্ষবিন্দু থেকে তিনি স্খলিত হয়ে পড়েন। বনলতা সেন আজ কবির জীবনে নেই। কিন্তু বনলতা সেনের সাহচর্যে যে দু’দণ্ডের পরিপূর্ণতা তিনি পেয়েছিলেন তার আস্বাদ তিনি ভুলে যাননি, ভুলতে চান না। স্মৃতিচারণার মাধ্যমে সেই হারানো সুখের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়ে কবি বর্তমান জীবনের ক্লান্তি, অশান্তি ও অর্থহীনতা অতিক্রম করতে চান।
কবির বয়স প্রায় চল্লিশ এবং কোনো মানুষের পক্ষেই হাজার বছর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। অতএব প্রাচীন ভারতের দৃশ্যটি স্বপ্নচিত্র ছাড়া কিছু নয়। স্বপ্নের ব্যক্ত উপাদান হলো প্রাচীন ভারতের হাজার বছরের পথপরিক্রমা, অব্যক্ত উপাদান হলো কবির শৈশব-কৈশোর-প্রথম যৌবন, যা চল্লিশ বছরের কবির কাছে কখনো ‘ধূসর’ কখনো বা ‘দূর অন্ধকার’।
বিম্বিসার অশোক অথবা বিদর্ভনগরের সভ্যতার যুগ ভারতীয় ইতিহাসে পরিপূর্ণতা ও আত্মসম্প্রসারণের যুগ, তেমনই কবির ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর শৈশব-কৈশোর-প্রথম যৌবনের দিনগুলো ছিল উচ্ছল, সপ্রাণ ও পরিপূর্ণ। নাটোরের বনলতা সেন কবির জীবনে পরিপূর্ণতা ও প্রশান্তি প্রতীক।
বনলতা সেনের চোখ কবির মনে এনেছিল পাখির নীড়ের অনুভব। স্পষ্টতই কবি তখন নীড়হারা, প্রয়োজন ছিল ভালোবাসার, আশ্রয়ের। বনলতা সেনের চোখের ভাষায় তিনি পেয়েছিলেন সেই কাঙ্ক্ষিত নির্ভরতা।
কবি বনলতা সেনের কণ্ঠস্বরের কোনো উপমা দেননি, তারচেয়েও বেশি কিছু দিয়েছেন-
‘বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’
পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।’ ( বনলতা সেন কবিতা)
পড়ক্তি দুটির ধ্বনি-মাধুর্যের মাধ্যমে কবি বনলতা সেনের মধুর কণ্ঠস্বরটি আমাদের শুনিয়ে দিয়েছেন, যা কোনো উপমার সাহায্যে শোনানো সম্ভব ছিল না।
“মুখ তার শ্রাবন্তীর কারুকার্য’। ক্লান্ত কবি পথ হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ যেন শ্রাবস্তীর কারুকার্যের মহৎ সৌন্দর্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন এবং দু’দণ্ডের জন্য ভুলে গিয়েছিলেন তাঁর মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি।
‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।’ বৌদ্ধ যুগে শ্রাবস্তী ছিল শিল্পকলার জন্য বিখ্যাত নগরী কিন্তু বিদিশার নিশার কোনো খ্যাতি আমাদের জানা নেই। আসলে বিদিশা হল ছন্দবেশী চিত্রকল্প। বনলতা সেন কবিতার মধ্যে ইতিহাস চেতনা ও সময়চেতনা প্রকাশিত।
কবি বিদিশার আড়ালে আমাদের মনে ‘মেঘদূতে’ বর্ণিত কালিদাশের উজ্জয়িনীর রাত্রির রহস্যঘন সৌন্দর্য ও সৌরভের স্মৃতি জাগিয়ে তুলতে চান। প্রশ্ন উঠতে পারে, কবি উজ্জয়িনীর বদলে বিদিশা ব্যবহার করলেন কেন? সেই সৌন্দর্যই আমাদের অন্তরাত্মাকে আলোড়িত করে তোলে, যা দূরবর্তী ও অস্ফুট যা হাতের মুঠোর মধ্যে ধরা দেয় না। রবীন্দ্রযুগের বাঙালি পাঠকের কাছে কালিদাশের উজ্জয়িনী এত বেশি পরিচিত যে মনে হয় সে তার দূরত্ব ও অস্পষ্টতা হারিয়ে ফেলেছে, তাকে যদি আবার সৌন্দর্যের ব্যঞ্জনা দিতে হয়, তাহলে একটু কুয়াশার আড়াল চাই, তাই ‘উজ্জয়িনী’র বদলে কবি ব্যবহার করলেন ‘বিদিশা’। উজ্জয়িনীর মত বিদিশাও একটি প্রাচীন নগরী। শুধু তাই নয়, বিদিশা বৌদ্ধযুগের নগরী। সুতরাং বৌদ্ধযুগের ‘শ্রাবন্তী’র সঙ্গে ‘বিম্বিসার অশোকের যুগে’র সঙ্গে সেতুবন্ধ রচিত হলো।
‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’ পঙক্তিটির মধ্যে একদিকে ‘তার’, ‘কবেকার’, ‘অন্ধকার’, ‘বিদিশার’, অন্যদিকে বিদিশার ‘দিশা’ ও ‘নিশা’ অনুপ্রাসের মাধুর্য সৃষ্টি করেছে, যা মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। তাছাড়া শব্দগুলির মধ্যে আকারের দীর্ঘায়িত উচ্চারণ কবিকে ইন্দিত দূরত্ব সৃষ্টি করতে সাহায্য করেছে। কবি বনলতা সেনের অন্ধকার চুলের অরণ্যে ‘দিশাহারা’ হয়েছিলেন, আত্মহারা হয়ে দিশা খুঁজে পেয়েছিলেন, সেই বিপরীত অর্থবোধক অভিজ্ঞতার আভাস ‘বিদিশা’ শব্দটির মধ্যে বিধৃত হয়ে আছে। এ ব্যঞ্জনা উজ্জয়িনী অথবা অন্য কোনো নগরীর নামের মধ্যে আভাসিত হত না।
অতিদূর সুমদ্রে হালভাঙা নাবিকের মতো কবির জীবন যখন বিপর্যস্ত, তখনই তিনি বনলতা সেনের দেখা পেয়েছিলেন। তাই বনলতা সেন তাঁর চোখে ‘সবুজ ঘাসের দেশ’ ও ‘দারুচিনি দ্বীপ’ এমন একটি আশ্রয়, যা সৌন্দর্য, সৌরভ ও আশ্বাসে ভরা।
অতিদূর সমুদ্রে হালভাঙা নাবিকের হঠাৎ সবুজ ঘাসের দেশ ও দারুচিনি দ্বীপ আবিষ্কার করার উপমা পাঠকের মনে হোমার রচিত ইলিয়াডের অডিসিয়াসের ঘরে ফেরার পথে জাহাজডুবির অভিজ্ঞতা ও প্রায় নগ্ন অবস্থায় নৌসিকা’র পবিত্র সৌন্দর্যের সম্মুখীন হবার দৃশ্য ফুটিয়ে তুলবে। পেনিলোপির কাছে পৌঁছতে হলে নৌসিকার দু’দিনের সাহচর্য অডিসিয়াসের যেমন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল, যেমন প্রয়োজনীয় ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’র অমিতের লাবণ্যকে, জীবনানন্দের জীবনে ঘরে ফেরার পথে তেমনই অনিবার্য ছিল বনলতা সেনের সাহচর্য।
কবি যেমন বনলতা সেনের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেছেন, বনলতা সেনও তেমনই কবির জন্য দীর্ঘদিন ধরে প্রতীক্ষা করে আছে। সুতরাং এ মিলন সফল ও সার্থক। আমরা ইতিপূর্বে ‘ক্যাম্পে’ অসফল মিলন-এর ছবি দেখেছি, কবি ‘বনলতা সেন’ কবিতায় আঁকলেন সফল মিলন-এর চরিত্র।
জোনাকির আলো জোনাকির যৌন-আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। নর-নারীর যৌন-কামনা উদগতির ফল প্রেমের আলোয় রূপান্তরিত হয়- কবি পাঠককে এ কথা মনে করিয়ে দিলেন। এই জোনাকিরা যেন পাড়াগাঁর বাসর ঘরে গোধূলি মদির মেয়ে, অবচেতনার বাসর ঘরে নায়ক-নায়িকার মিলনের আয়োজন করার জন্য যাদের প্রয়োজনীয়তা কবি অনুভব করেছেন।
অন্ধকারে নায়ক-নায়িকার মুখোমুখি বসে থাকার অর্থ পাঠকের পক্ষে বুঝে ওঠা কষ্টকর নয়। এক অর্থে এই চিত্রকল্প আনুষ্ঠানিক অথবা আত্মিক বিবাহের প্রতীক। ইচ্ছাপূরণের অভিব্যক্তি হিসাবে এই স্বপ্নচিত্রের অবতারণা।
আদিম কামনাকে স্বীকৃতি দিয়ে কবি তাকে অতিক্রম করে যেতে চান। চেতন জগতের অভিজ্ঞতাগুলি নিশ্চেতনায় নিমজ্জিত হয়ে পরিশ্রত ও রূপান্তরিত হবার ফলেই মহৎ কবিতার জনয়িত্রী হতে পারে। হৃদয়ের সন্তানের জন্য দেবার জন্য প্রয়োজন নর-নারীর দৈহিক মিলনের মধ্যে আত্মিক মিলন; তেমনই উৎকৃষ্ট ও মহৎ কবিতার জন্য প্রয়োজন চেতনা ও নিশ্চেতনার পরিপূর্ণ সমন্বয়। চেতনা ও নিশ্চেতনার মিলনবেদীতে যে অগ্নির জন্ম হয়, সেই অগ্নিই রূপান্তরিত অভিজ্ঞতাকে করে তোলে অবিনশ্বর শিল্পকর্ম।
বনলতা সেন নেই, আছে তার স্মৃতি। এই স্মৃতি কবির কাছে অমূল্য সম্পদ; প্রবহমান সময়স্রোতে দু’দণ্ডের বুদ্বুদ, যার মধ্যে প্রতিফলিত হয় সূর্যের সাতটি রঙ। এই স্মৃতির সাহায্যে কবি নিজের মনে এবং কবিতায় এমন একটি পরিপূর্ণ প্রশান্তির নীড় রচনা করতে চান যা হেমন্তের ঝড়ে ভেঙে পড়বে না, কুয়াশায় মলিন হবে না। বনলতা সেন সেই শাশ্বত সৌন্দর্যের প্রতীক। আজও কবির জীবনে ক্লান্তির অভাব নেই। তবু জীবনেও আসে সান্ধ্য অবসর। সেই অবসর মুহূর্তের নিস্তব্ধতায় কবি সন্ধ্যার
চিলের মত প্রতিদিনের গ্লানি মুছে ফেলে বনলতা সেনের স্মৃতির নীড়ে ডানা গুটিয়ে বসার আয়োজন করেন। অন্তরের পটে রচিত হতে থাকে ধূসর পাণ্ডুলিপি। জোনাকির আলোয় ঝিলমিল অবচেতনার জগতে যখন কবির মন আশ্রয় পায়, তখন বাইরের জীবনের সব দায়-দায়িত্ব চুকিয়ে ফেলে পাখির ঘরে ফিরে আসার মতো নদীর সমুদ্রে মিলনের মত কবি অন্তর্জগতে চেতনা ও নিশ্চেতনার মধ্যবর্তী সৃষ্টিশীল সেই স্থিরবিন্দুটি আবিভার করেন, তখনই তিনি পান অবচেতনার অন্ধকারে বনলতা সেনের মুখোমুখি বসার অধিকার, পরিপূর্ণ প্রশান্তির আস্বাদ। কবির কাছে বনলতা সেনের বৃহত্তর ও মহত্ত্বর চেতনায় উত্তরণের ছাড়পত্র।
ইন্দ্রিয় ঘনত্ব জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে অবয়বত্ব দান করেছে। ফলে, বনলতা সেন কবিতায় বর্ণিত সব ঘটনা কাহিনি মনে হয় অবয়বত্ব পেয়েছে। চিত্রের মতো ভাসে।