রবীন্দ্র ছোটগল্পে প্রতিফলিত প্রকৃতির প্রভাব ও মানব মনের সাথে প্রকৃতির সংযোগ।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

প্রকৃতির প্রভাব – রবীন্দ্র ছোটগল্পে – মনের সাথে প্রকৃতির সংযোগ।

প্রকৃতি রবীন্দ্র-কাব্যভাবনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কবির সমগ্র সাহিত্যে মানুষ ও প্রকৃতির নিবিড় সংযোগ লক্ষ্য করা যায়। সার্থক ছোটগল্পের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পগুচ্ছের মধ্যেও প্রকৃতিকে নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। মানব-চরিত্রের ওপর বিশ্ব-প্রকৃতির অমোঘ প্রভাব তাঁর গল্পে খুব সহজ দৃষ্টিতেই চোখে পড়ে।

সেখানে প্রকৃতি মানব-জীবনকে বেষ্টন করে আছে, কোথাও চরিত্রসমূহ বিশেষ কোনো অঞ্চলের ফসল, কোথাও বা মানব মনের চিন্তা-ভাবনা, রাগ-অনুরাগ, বিশেষ বিশেষ সময়ে মানসিক গভীরতা, সংশয়-সংকট ও ইতি-কর্তব্যের সঙ্গে প্রকৃতি অচ্ছেদ্য সম্পর্কে জড়ানো। রবীন্দ্রনাথ মানব-জীবনের নিত্য প্রবহমানতাকে প্রকৃতির পটভূমিকায় উপলব্ধি করেছেন এবং মানব-জীবনের অখÐ রূপকে বাণীরূপ দিয়েছেন। ছোটগল্পে প্রকৃতি ও মানব-মন অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প

বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিকায় প্রসারিত করে প্রবহমান মানব-জীবনকে লেখক তাঁর গল্পের পটভূমি করেছেন। বিশ্বপ্রকৃতির মাঝে যে চিরন্তনতা, বৈচিত্র্য , নিত্য পরিবর্তনশীলতা ও নিত্য নবীনতা বর্তমান – তা গল্পগুচ্ছতেও বর্তমান। প্রকৃতির প্রভাবের এই চিরপুরাতন ও চিরনবীন রূপকে রবীন্দ্রনাথ মানব জীবনেও খুঁজে পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে প্রকৃতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে লেখক তারে গল্পের চরিত্রগুলোকে প্রকৃতির কাচাকাছি নিয়ে এসেছেন।

রবীন্দ্রনাথ জানতেন যে, এমন কতকগুলো কথা আছে, যা বাক্যে প্রকাশ করা যায় না। সে অনুভূতি ও বিশেষ ভাবগুলো প্রকৃতির বর্ণনা বা অবস্থানের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ স্ফূর্ত হয়ে উঠে। ভাষা যেখানে পৌঁছায় না , প্রকৃতি তার অভাব সম্পূর্ণ করে দেয়। রবীন্দ্র-ছোটগল্পে বঙ্গ-প্রকৃতির বিভিন্ন অঞ্চলের ছবি পরিস্ফুট, বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের প্রকৃতির বিস্তার, নদী ও বনানী এমনভাবে কবিকে আবিষ্ট করেছে , যা অন্যত্র দুর্লভ।

সুভা, কুড়ানী, তারাপদ যে প্রকৃতিতে বেড়ে উঠেছে, সেই প্রকৃতির বাইরের আনলে তাদের চরিত্রায়ণ অসম্পূর্ণ হয়ে যেতে বাধ্য। লেখক নিজেও সে-প্রকৃতিতে বিভোর ছিলেন। এ রকম উদার, বিস্তৃত, অবাধ প্রকৃতি ইতঃপূর্বে কবির চোখের সামনে উদ্ভাসিত হয়নি।

পদ্মা তীরবর্তী মানব-জীবন পরিলক্ষিত করেই প্রকৃতি ও মানবের মধ্যে অচ্ছেদ্য সম্পর্ককে আবিষ্কার করেছেন এবং তিনি তা ছোটগল্পে প্রকাশ করেছেন। যেখানে পদ্মার প্রভাব নেই, সেখানে মানব-প্রকৃতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে প্রকৃতির অনুষঙ্গে, বিশেষ করে আত্মার আত্মীয় পল­ী-প্রকৃতির সহায়তায়।

গল্পগুচ্ছের একেবারে প্রথম পর্ব থেকে শুরু করে প্রকৃতি ও মানব-হৃদয়ের অচ্ছেদ্য সম্পর্ক ভিড় করেছে। প্রকৃতিকে ঘটনার পূর্বাভাস সৃজনে এবং চরিত্র ও কাহিনীর আবহ সৃষ্টিতে লেখক কাজে লাগিয়েছেন। লেখক এমন কিছু গল্প লিখেছেন এবং চরিত্রাঙ্কণ করেছেন যেগুলো থেকে প্রকৃতিকে আলাদা করলে ঘটনা ও চরিত্র অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে।

চরিত্রগুলো যেন প্রকৃতির-ই শস্য-রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শে মানব প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আছে। চরিত্রের উপর প্রকৃতির প্রভাব, ঘটনার প্রাসঙ্গিকতার প্রসঙ্গে প্রকৃতির বর্ণনা, পটভূমি থেকে গল্পের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ, বিচিত্র ক্ষেত্রে প্রকৃতিকে প্রয়োজনানুযায়ী ব্যবহার করেছেন। গল্পগুচ্ছের বিভিন্ন গল্প থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তা সহজেই প্রমাণ করা যায়।

খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন গল্পে প্রকৃতি অত্যন্ত জীবন্ত ভূমিকায় অবতীর্ণ। এই গল্পে প্রকৃতি নিষ্ঠুবভাবে উদাসীন। জগতের তুচ্ছ সংবাদ তার জন্য নয়। রবীন্দ্রনাথ এখানে পদ্মাকে শিশু অপহরণকারীরূপে উপস্থিত করেছেন। গল্পের প্রথমে দেখা যায়, দুরন্ত জলরাশি অস্ফুট কলভাষায় শিশুকে বারবার আপনাদের খেলাঘরে আহŸান জানাচ্ছে। শিশু পদ্মার ডাকে সাড়া দেয়। পরে শিশুর সন্ধানে এসে রাইচরণ যখন কোথাও তাকে খুঁজে পাচ্ছে না তখনও কিন্তু Ñ

পদ্মা পূর্ববৎ ছল্ছল্ খল্খল্ করিয়া ছুটিয়া চলিতে লাগিল, যেন সে কিছুই জানে না, এবং পৃথিবীর এই সকল সামান্য ঘটনায় মনোযোগ দিতে তাহার যেন এক মুহূর্ত সময় নেই।

এই বর্ণনা কেবল আলঙ্কারিক নয় – ভয়াবহ ঘটনার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির জন্যই গল্পকার ব্যবহার করেন নি। এ যেন প্রকৃতির নির্মম রুদ্ররূপের দিকে নিসর্গ প্রেমিক কবির অন্য দৃষ্টিতে তাকানো। এই বর্ণনার ভাষায় লেখকের ভীতির চেয়ে নির্বিকার সত্যাদর্শই বড়।

সমাপ্তি গল্পের মৃণ্মযী চরিত্রে প্রকৃতির প্রভাব স্পষ্ট। সমাপ্তি গল্পের কিশোরী নায়িকা মৃণ¥য়ীর যৌবনবতী রমণীতে পরিবর্তন হওয়াকে রবীন্দ্রনাথ অপূর্ব কৌশলে প্রকৃতি-বর্ণনার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। মৃণ¥য়ী কোলকাতায় তার স্বামীর সাথে মিলিত হতে এসেছে। সংসারের সাথে মৃণ¥য়ীর মিলনের বিষয়টিকে রবীন্দ্রনাথ সুন্দর উপমার দ্বারা উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন –

তরুর সহিত শাখা-প্রশাখার যেরূপ মিল, মৃণ¥য়ীকে সেরূপ মিলনের মাধ্যমে সংসার আপন করে নিল। মৃণ্ময়ীর বাল্য অংশ যৌবন থেকে খসে গেছে, অপূর্ব বেদনা ও বিষ্ময়ে এই যৌবনবতী স্বামী সঙ্গের জন্য ব্যাকুল হয়েছে। লেখক মৃণ¥য়ীর গুরুতর পরিবর্তনের বর্ণনা প্রকৃতি বর্ণনার মধ্যে দিয়ে মোহনীয় করে তুলেছেন।

বিশ্বপ্রকৃতির উদাসীন বৃহৎ পটভূমিতে মানব-জীবনের রুদ্র রুদ্র শোক দুঃখের কোনো মূল্য নেই, সত্য হল জীবনের চিরন্তন প্রবাহ। বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিতে মানব-জীবনের তুচ্ছ ঘটনা বিক্ষোভ যে একেবারেই অকিঞ্চিতকর, তা রবীন্দ্রনাথ বারে বারেই স্পষ্ট করে তুলেছেন। পোস্টমাস্টার গল্পে এ উদাসীন প্রকৃতির প্রভাবের রূপ লক্ষ্য কবা যায়। মানব-হৃদয়ের একটি সাধারণ, অথচ গভীর বেদনা এখানে শিল্পরূপ পেয়েছে।

রতনের স্নেহভালোবাসা পদদলিত হতে দেখে আমাদের সকলের মন করুণ রসে ভিজে গেছে। পোস্টমাস্টার চাকরি ছেড়ে এবং নিজের অজ্ঞাতে একটি বিবশ প্রেমব্যাকুলা হৃদয়ের আবেদনকে পায়ে মেড়ে ফিরে যাচ্ছে। রতনকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার বাসনা একবার মনে হলেও তা আর বাস্তবায়িত হয় নি। বর্ষার ফুলে ওঠা নদীর পানি দেখে পোস্টমাস্টারের অন্তর ছল ছল করে উঠেছে। হৃদয়ের মধ্যে বেদনা অনুভব করেছে। গ্রাম্য বালিকার করুণ মুখচ্ছবি বৃহৎ অব্যক্ত মর্মব্যথা রূপে ধরা পড়েছে। একবার মনেও হয়েছে যে –

জগতের ক্রোড়বিচ্যুত সেই অনাথিনীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া আসে। কিন্তু পালে বাতাস লেগেছে, বর্ষার স্রোত প্রচÐ বেগে বয়ে চলেছে, শ্মশান দেখা দিয়েছে; নদী প্রবাহে ভাসমান পথিকের উদাস হৃদয়ে এই তত্তে¡র উদয় হয়েছে, জীবনে এমন কত বিচ্ছেদ , কত মৃত্যু আছে Ñ ফিরিয়া ফল কী, পৃথিবীতে কে কাহার ?

প্রকৃতির আবহে জীবনের চরম সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৃতির প্রভাবই এ গল্পের রসপরিণতি।

মানবের মৃত্যু, অন্তরের নাড়ী ছেঁড়া বিচ্ছেদÑ উদাসীন বিশ্বপ্রকৃতির কাছে কিছুই নয়। এ রকম অনুভূতির প্রকাশ দেখা যায় মেঘ ও রৌদ্র গল্পে। গিরিবালা আর তার শশিদাদার কাহিনী তো বিশ্বপ্রকৃতির নির্বিকার উদাসীনতার কাছে মানব-জীবনের বড় বড় ঘটনার ক্ষুদ্রতার ও অকিঞ্চিতকরতারই কাহিনী। গিরিবালা ও শশিভূষণের বন্ধুত্বের কবর রচিত হয়ে গিরিবালার বিয়ে হল। বিদায় বেলায় নদীতীরে শশিভূষণ দাঁড়িয়ে অথচ নববধূ চোখের জলে বুক ভাসিয়ে নদী বেয়ে চলে গেল। সে জানতেও পারল না তার একান্ত আপন জন দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি হৃদয়ের মর্মান্তিক বিচ্ছেদ বেদনায় পৃথিবীর কিছুই যায় আসে না। লেখক বিচ্ছেদের পরেই উদাসীন প্রকৃতির বর্ণনায় বলেছেন যে,

জলের সকালের রোদ ঝিকমিক করছে, কাছে গাছের ডালে পাখি গান গাচেছ , খেয়া নৌকা লোক পারাপার করছে, মেয়েরা ঘাটে জল নিতে গিয়ে গিরিবালার শ্বশুর বাড়ি যাবার গল্পে মেতে উঠল।

শাস্তি গল্পে গ্রাম্যবধূ চন্দরার কঠিন শাস্তি হলেও সংসারে চাষ-বাস হাসি-কান্না হাট-বাজার পৃথিবীর সব কাজ আগের নিয়ম মত চলছে। উদাসীন পৃথিবী একটি মানবীর দুঃখে কিছুমাত্র বিচলিত হয় নি। এভাবে রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখকে বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিকায় উন্নীত করে নতুন রূপে উপস্থাপন করেছেন। এখানে প্রকৃতি ও মানব-জীবন একসুরে বাঁধা। অর্থাৎ প্রকৃতির প্রভাব স্পষ্ট।

একরাত্রি গল্পেও প্রকৃতি আর জীবন একপ্রান্তে এসে মিশে গেছে। জীবনের তাগিদে সুরবালার প্রেমিক বড় কিছুর সাধনায় সুরবালাকে উপেক্ষা করে চলে গেছে। নায়ক শেষ পর্যন্ত একটা ভাঙা ¯কুলের সেকেন্ড মাস্টার ছাড়া আর কিছুই হতে পারে নি। নিঃসঙ্গ ভাঙা স্কুল ঘরের নিরানন্দ জীবনের পাশে উঁকি দিয়েছে সুরবালার মুখ। প্রকৃতি দুিই হৃদয়কে অলক্ষ্যে এক কিনারে নিয়ে ফেলেছে। প্রকৃতির প্রভাবের কারণেই একরাত্রি গল্পের পরিণতি রস এত উপভোগ্য।

সুরবালা পাশেই এক উকিলের বউ হয়ে আছে। প্রেমিকের বিক্ষুব্ধ বেদনায়ময় উপলব্ধির মাত্রা নির্ণয় করেছে প্রকৃতি । প্রকৃতির নিষ্ঠুর বা নেতিবাচক ঝড়-জল ভাঙা স্কুলের সেকেন্ড মাস্টারকে সুরবালার কাছে ঠেলে দিয়েছে। তাদের সমস্ত ইহজীবনে ক্ষণকালের জন্য একটি ঝড় জলের রাত্রির উদয় হয়েছিল। তাদের পরমায়ুর সমস্ত দিন রাত্রির মধ্যে মাত্র একটি রাতই তুচ্ছ জীবনের একমাত্র চরম সার্থকতা হিসেবে ধরা দিয়েছে।

প্রকৃতিকে মানব মনের আবহ প্রকাশেই শুধু ব্যবহার করেন নি, রবীন্দ্রনাথ গল্পগুচ্ছের চরিত্রগুলোকেও প্রকৃতির সাথে নিবিড় বন্ধনে বেঁধে ফেলেছেন। মৃণ¥য়ীকে প্রকৃতি থেকে আদালা করা যায় না। পোস্টমাস্টার, হৈমন্তী, ফটিক নিজ নিজ প্রকৃতি ছেড়ে অন্য পরিবেশে এসে হাঁপিয়ে উঠেছে। হৈমন্তী আর ফটিক শেষ পর্যন্তমৃত্যুর দিকে এগিয়ে গেছে।

প্রকৃতির প্রভাব রবীন্দ্র-ছোটগল্পে সক্রিয় চরিত্রের মতো। প্রকৃতি এখানে মূক নয়। চরিত্রের সাথে ঘটনার সাথে যেন কথা বলে উঠেছে। প্রকৃতির সাথে চরিত্রের একাত্মতা হতে দেখা যায় অতিথি গল্পে। প্রকৃতির চির চঞ্চল- নির্লিপ্ততা শিল্পরূপ পেয়েছে তারাপদ চরিত্রে। তারাপদ বহু জায়গায় বহু আবেষ্টনের মধ্য দিয়ে গিয়েছে, সকলের প্রেম সে আকর্ষণ করেছে, সংসারের কাদামাটির জলের উপর দিয়ে সে শুভ্রপক্ষ বিশিষ্ট রাজহংসের ন্যায় সাঁতার কেটে বেড়িয়েছে। কোনো কিছুই তাকে জড়াতে পারে নি। সে যেন উদাসীন প্রকৃতির প্রতিরূপ। তারাপদ চরিত্রে প্রকৃতির প্রভাব অত্যন্ত প্রবল।

নিত্য সচলা প্রকৃতির মত সে সব সময় নিশ্চিন্ত , উদাসীন। অথচ সব সময়ই সে ক্রিয়াসক্ত। প্রকৃতির সম্মোহনী শক্তি তার ছিল, তাকে ভালবাসতো না এমন লোক ছিল না, অথচ প্রকৃতির মত সে ছিল নির্লিপ্ত ও রহস্যময়। সে কারো কাছে ধরা দেয় নি। তাই প্রকৃতির প্রতিরূপ তারাপদ মানব-সংসারের স্নেহমমতার খাঁচায় ধরা না দিয়ে মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে হারিয়ে যায়।

স্ত্রীর পত্র গল্পে মৃণাল স্বামীকে লিখেছে Ñ আমি তোমাদের মেজো বউ। আজ পনের বছর পরে এ সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে জানতে পেরেছি আমার জগৎ এবং জগদীশ্বরের সাথে অন্য সম্বন্ধও আছে। প্রকৃতির কাছে এসেই মৃণাল চূড়ান্ত সত্য আবিষ্কারে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্বপ্রকৃতির সাথে মানুষের জীবনের অন্তরতম সংযোগ দেখা যায় নিশীথে, ক্ষুধিত পাষাণ ও কঙ্কাল গল্পে। ক্ষুধিত পাষাণে মেহের আলীর তফাৎ যাও চিৎকার আকাশে বাতাসে পরিব্যাপ্ত হয়ে মানুষের মনে গেঁথে যায়। কঙ্কাল গল্পেও অন্ধকার রাত্রে অতৃপ্ত আত্মার কথোপকথন প্রকৃতির আবহে অপরূপ হয়ে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথ বাস্তবকে প্রকৃতির সাথে, জীবনের সাথে মিশিয়ে নিবিড়ভাবে দেখেছেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি প্রকৃতিকে জানার চেষ্টা করেছেন। জমিদারি দেখা-শোনার ভার নিয়ে বাংলায় এসে প্রকৃতিকে বা প্রকৃতির প্রভাবকে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। এ সময়ের কাব্য-কবিতাও প্রকৃতির অনুষঙ্গে অপূর্ব বাণীরূপ পেয়েছে। গল্পগুচ্ছে এই প্রকৃতিকে তিনি মানব সত্যের উপলব্ধিতে ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তাঁর গল্প সম্পর্কে বলেছেন Ñ

একটু একটু করে লিখছি এবং বাইরের পরিবেশের সমস্ত ছায়া আলোক বর্ণ ধ্বনি আমার লেখার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। আমি যে সব দৃশ্যলোক ও ঘটনা কল্পনা করছি, তারই চারিদিকে এই রৌদ্র-বৃষ্টি, নদী-স্রোত এবং নদী-তীরের শরবন, এই বর্ষার আকাশ , এই ছায়াবেষ্টিত গ্রাম, এই জনধারা প্রফুল­ শস্যের ক্ষেত ঘিরে দাঁড়িয়ে তাদের সত্যে ও সৌন্দর্যে সজীব করে তুলেছে।

রবীন্দ্র গল্পে প্রকৃতিই শুধু নয়, নানা ঋতুতে তার আবর্তন ও পরিবর্তন নানা অনুষঙ্গে ঘুরে ফিরে এসেছে। নদী, বর্ষা, বসন্ত প্রভৃতি ঋতু , ঝড় এবং জোছনা গল্পগুচ্ছের প্রায় প্রতিটি গল্পে একটি মেজাজ নিয়ে বিশেষ কোনো সংকেত বহন করে উপস্থিত হয়েছে। চরিত্র বর্ণনায়, চরিত্রের মনোভাবনা, অন্তরের উপলব্ধি ইত্যাদি বিষয়গুলো লেখক প্রকৃতির প্রভাবকে বিভিন্ন উপাদানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন।

সুভা গল্পে প্রকৃতি সুভার সমস্ত অভাব পূর্ণ করে দেয় একান্ত সঙ্গীর মতো। প্রকৃতির সঙ্গে ব্যক্তি হৃদয়ের নানা অনুভূতি মিলে এই গল্পের জগৎ। এই গল্পের প্রকৃতি উদার, কিন্তু মানুষ নিষ্ঠুর। সুভার স্বামী পরে এক ভাষা বিশিষ্ট কন্যা বিয়ে করে আনে। প্রকৃতি প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ পদ্মা প্রকৃতির উদারতায় জীবনের বৈচিত্র্য যেমন প্রত্যক্ষ করেছেন, তেমনি সামাজিক সমস্যার আঘাতে আঘাতে জীবনের মর্মন্তুদ বেদনাকেও অনুভব করেছিলেন।

সংবেদনশীল রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক মন নিবিড়ভাবে সন্ধান করেছে প্রকৃতি ও মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আসলে বস্তু-জগতের অতৃপ্তি থেকে মুক্তি পেতেই প্রকৃতির আকর্ষণ দুর্বার হয়ে উঠেছে। এই গল্পে প্রকৃতির সুকুমার স্বভাব, অবারিত দাক্ষিণ্য সহজ সারল্য এবং প্রকৃতির মর্ম সত্য উচ্চারিত হয়েছে।

বাণীকণ্ঠের বাণীহারা বোবা মেয়েটির হৃদয়তন্ত্রীতে বারবার বেজে উঠেছে প্রকৃতির সুরঝংকার। মৌণমূক মেয়েটির অব্যক্ত ভাষা যেন ধ্বনিত হয়েছে প্রকৃতির বিচিত্র ধ্বনি তরঙ্গে –

প্রকৃতি যেমন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। যেন তাহার হইয়া কথা কয়। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর Ñ সমস্ত মিশিয়া চারিদিকের চলাফেরা আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়-উপকূলের নিকট আসিয়া ভাঙিয়া পড়ে।

মানব ও প্রকৃতির অচ্ছেদ্য আত্মীয়তা গড়ে উঠার যেমন বর্ণনা পাই এই গল্পে, তেমনি কেন মানব সংসারের সঙ্গে সুভা নিজেকে মেলাতে পারে নি , তারও কারণ খুঁজে পেতে আমাদের কষ্ট হয় না। সুভার বাপ-মায়ের মনে একদিকে সমাজ-ভীতি, অন্যদিকে বাৎসল্য-প্রীতি Ñ এই দুয়ের টানাপোড়েনে একটি সংঘাতকে ফুটিয়ে তোলার অবকাশ এই গল্পে ছিল , কিন্তু সে-দিকটি গল্পে মুখ্য নয়। তার পরিবর্তে এখানে প্রকৃতির প্রভাব প্রাধান্য চোখে পড়ে।

মহামায়া গল্পের রাজীব নিভৃত-মন্দিরে যখন মহামায়াকে বিয়ের প্রস্তাব জানালো, তখন রাজীবের জীবনের সেই কঠিন ভাগ্য পরীক্ষার মুহূর্তে প্রকৃতির উদাসীন মূর্তি প্রত্যক্ষ করা যায়। তখন

বাতাসে মন্দিরের অর্ধসংলগ্ন ভাঙা কবাট এক একবার অত্যন্ত মৃদুমন্দ আর্তস্বর -সহকারে ধীরে ধীরে খুলিতে এবং বন্ধ হইতে লাগিল।

প্রকৃতি এখানে রাজীবের প্রতি বিন্দুমাত্রও মনোযোগী নয়। আবার চিতার আগুন থেকে মহামায়াকে রক্ষা করেছে ঝড়। এরপর নায়ক-নায়িকার সমাজ-গণ্ডি অতিক্রম করে বেরিয়ে পড়ার পথে ঝড় সক্রিয় হয়ে উঠেছে। –

মাথার উপরে গাছ ভাঙ্গিয়া পড়িবার ভয়ে পথ ছাড়িয়া উভয়ে খোলা মাঠ দিয়া চলিতে লাগিল। বায়ুর বেগ পশ্চাৎ হইতে আঘাত করিল। যেন ঝড় লোকালয় হইতে দুইটা মানুষকে ছিন্ন করিয়া প্রলয়ের দিকে উড়াইয়া লইয়া চলিয়াছে।

ঝড়ের মতোই জোছনা তাদের জীবনে এসে সব লÐ ভÐ করে দেয়। এই গল্পের সমস্ত ট্র্যাজেডির মূলে রাজীবের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের অপরাধ মুখ্য, আর সেই অপরাধ ভঙ্গের জন্য জোছনার ভূমিকা সর্বাধিক-

আজ বর্ষারাত্রি তাহার মেঘাবরণ খুলিয়া ফেলিয়াছে এবং আজিকার এই নিশীথিকে সেকালের সেই মহামায়ার মতো নিস্তব্ধ সুন্দর এবং সুগম্ভীর দেখাইতেছে। তাহার সমস্ত অস্তিত্ব সেই মহামায়ার দিকে একযোগে ধাবিত হইল।

এখানে রাজীবের মনের উপর জোছনা প্রকৃতির প্রভাবের প্রতিক্রিয়া এতোই স্পষ্ট যে, তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। জোছনা প্রকৃতির প্রভাবের ফলেই রাজীবের মনে হয়েছে আজ যেন সমস্ত পূর্ব নিয়ম ভাঙিয়া গিয়াছে। আর সে জন্যই, যে-মুখ কখনো দেখবে না বলে রাজীব প্রতিজ্ঞা করেছিল সেই-মুখ দেখার অপরাধে তাকে চিরতরে তার প্রিয়তমাকে হারাতে হয়েছে।

এমনিভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, মানভঞ্জন, মাল্যদান, নিশীথে গল্পেও মানব-জীবনে প্রকৃতির প্রভাব এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে জড়িয়ে আছে। মানুষের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতির যে গভীর সংযোগ, তার আবিষ্কারই ছিল রবীন্দ্রনাথের ধ্যান-জ্ঞান। যৌবনে যে-সব মানব-চরিত্র তাঁর কল্পলোকে আবির্ভূত হয়েছে Ñ সেগুলির অধিকাংশই প্রকৃতির কোলে লালিত। শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলি কবির যৌবনেই রচিত। সেজন্য এগুলি প্রকৃতির মাধুর্যে মতি।

অধিকাংশ গল্পেই অত্যন্ত সংযত মিতভাষণের মধ্য দিয়ে কিছু রেখায় প্রকৃতিকে মানব-চরিত্রের সঙ্গে যুক্ত করেছেন তিনি। পল্লী বাংলার চিত্র, নদ-নদী, বিশেষত পদ্মা তাঁর মনে একটা চলমান শক্তিরূপে জাগরুক থাকলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ছোটগল্পে কোনো প্রকৃতি-তত্ত¡ উপস্থিত করেন নি। প্রকৃতি এসেছে মানবের হাত ধরেই মানব মনে। তাই, আঙিনায় খেলা করা শিশুর মতোই সহজ, স্বাভাবিক পথে প্রকৃতি ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ছোটগল্পে। প্রকৃতির প্রভাবের কারণেই গল্পগুলো সতেজ ও সহজ।

পরিশেষে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ তাঁর গল্পগুচ্ছের বেশিরভাগ গল্পের মধ্যেই প্রকৃতির প্রভাব অনস্বীকার্য। প্রকৃতির সংস্পর্শে মানবের সীমাবব্ধ জীবনে বিপুলের আস্বাদ পাইয়ে দিয়েছেন। এই মানব জীবন বিশ্বপ্রকৃতির পটভূমিকায় প্রসারিত। প্রকৃতির প্রভাব তার ছোটগল্পে বিভিন্ন মেজাজে আলম্বন বিভাবের মত কাজ করে ছোটগল্পের অবয়বে সামান্য ইঙ্গিতে কথাকে, চরিত্রকে স্পষ্ট করেছেন এভং শুন্যতাকে প্রকৃতি দিয়ে পূর্ণ করে তুলেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *