প্রসঙ্গ-কথা: যে স্বরধ্বনি উচ্চারণ কালে জিভ প্রথমে এক রকম অবস্থানে এবং একটু পরেই অন্য অবস্থানে সরে যায়, অথচ সমস্ত উচ্চারণ প্রক্রিয়াটা একটা স্বরধ্বনির উচ্চারণকালের মধ্যে সংঘটিত হয়, সেই স্বরধ্বনিকে যৌগিক বা দ্বিস্বরধ্বনি বলে। যেমন- (ঐ=অ+ই)=(ও+ই উচ্চারণে) বাংলায় ঐ=ওই। এর উচ্চারণের সময় জিভ প্রথমে ‘ও’ ধ্বনি উচ্চারণের জন্যে পেছন দিকে উচ্চমধ্য অবস্থানে থাকে। তার একটু পরেই ‘ই’ ধ্বনি উচ্চারণের জন্যে সামনের দিকে উচ্চ অবস্থানে চলে যায়। -এই দুটো অবস্থান থেকে বাংলা ঐ ধ্বনিটি উচ্চারিত হয়।
মহাম্মদ দানীউল হকের মতে-
দ্বি-স্বরধ্বনি হলো এমন সব স্বরধ্বনি সেগুলোর উচ্চারিত হবার সময় জিহŸার অবস্থান দ্রুত একটি থেকে অন্যটিতে চলে যায়।
আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ বলেছেন- যদি পাশাপাশি অবস্থিত দুটো সমশ্রেণীর অথবা অসমশ্রেণীর স্বরধ্বনি নিশ্বাসের একই প্রয়াসে উচ্চারিত হয়ে আক্ষরিক ধ্বনি গঠন করে এবং দ্বিতীয় স্বরধ্বনির তুলনায় প্রথমটা দীর্ঘ ও স্পষ্ট হয়, তাহলে ঐ শ্রেণীর আক্ষরিক স্বরধ্বনিকে দ্বি-স্বরধ্বনি বলা হয়।
দ্বি-স্বরধ্বনি
গঠনের প্রক্রিয়া:
বাংলা বর্ণমালায় ঐ এবং ঔ(অ+উ) (উচ্চারণে ও+উ) এই দুটো বর্ণ সাধারণত দ্বৈতস্বর, দ্বি-স্বরধ্বনি বা যৌগিক স্বরধ্বনি হিসেবে পরিচিত। দুটি স্বরধ্বনি মিলে এক অক্ষর (Syllable) তৈরি করলেই স্বাভাবিকভাবে ধরে নেয়া হয় দ্বি-স্বরধ্বনি সৃষ্টি হয়েছে।
আপাতদৃষ্টিতে পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি এক অক্ষর হিসেবে উচ্চারিত হওয়াই অবশ্য দ্বি-স্বরধ্বনির প্রথম শর্ত। এক নিশ্বাসের দুই বারের স্বতন্ত্র চেষ্টায় এ রকম দুই স্বর পাশাপাশি উচ্চারিত হলে তা আর দ্বি-স্বরধ্বনি থাকে না । যেমন- যা-ই দ্বিস্বরধ্বনি নয়, অথচ এক নিশ্বাসে উচ্চারিত ‘যাই’ দ্বিস্বরধ্বনি।
এ ছাড়া দ্বিস্বরধ্বনি গঠনের আরও কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। প্রথম স্বরধ্বনি উচ্চারণ কালে জিহ্বা একটা নির্দিষ্ট স্থান গ্রহণ করে এবং সাধারণ স্বরধ্বনি উচ্চারণকালে এরকম ক্ষেত্রে জিহ্বা যতটুকু সময় অপেক্ষা করত ততটুকু অপেক্ষা না করেই পরবর্তী স্বরধ্বনির দিকে দ্রুত এগিয়ে (পিছলে) যায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পরবর্তী স্বরধ্বনি মৃখ বিবরে পরিষ্কার রূপ পরিগ্রহ করে না । জিভের প্রথম স্বরধ্বনি গঠন এবং দ্বিতীয় স্বধ্বনির দিকে দ্রুত পেশী সঞ্চালনের মাঝখানে শোনা না গেলেও একটা পিচ্ছিলধ্বনি স্বতঃউৎসারিত হয়। যৌগিক স্বরধ্বনির মাঝখানে একটি স্বয়ম্ভু পিচ্ছিল ধ্বনি জিভের পেশী সঞ্চালনের ফলে উদ্ভূত না হয়ে পারে না ।
এ প্রসঙ্গে আবুল কালাম মুনজুর মোরশেদ বলেছেন যে দ্বি-স্বরধ্বনি একটা পূর্ণ এবং অন্য একটা পিচ্ছিল ধ্বনি সহকারে গঠিত। এবং শেষোক্ত স্বরধ্বনি পূর্ণ স্বরধ্বনির পর রূপমূলে অন্তর্গত হয়ে থাকে। তিনি দ্বি-স্বরধ্বনি গঠনের সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ নির্দেশ করেছেন এভাবে-
(ক) দুটো স্বরধ্বনি একসঙ্গে একই প্রয়াসে উচ্চারিত। (খ) রূপমূলে দুটো স্বরধ্বনি পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়। (গ) প্রথম স্বরধ্বনি পূর্ণদৈর্ঘ্য স্বরধ্বনির বৈশিষ্ট্যপ্রাপ্ত এবং দ্বিতীয় স্বরধ্বনি পিচ্ছিল জাতীয় স্বরধ্বনি। (ঘ) প্রথম স্বরধ্বনি দ্বিতীয় স্বরধ্বনির তুলনায় দীর্ঘ ও স্পষ্ট। (ঙ) দ্বি-স্বরধ্বনি গঠনে সমশ্রেণীর অথবা অসমশ্রেণীর দুটো স্বরধ্বনি সহযোগে গঠিত হয়ে থাকে। যেমন- ইই, আআ এবং ইএ, ইআ,এউ ইত্যাদি।
অনেক সময় সাধুভাষার শব্দের মধ্য অবস্থিত দ্বিতীয় ব্যঞ্জনধ্বনি লোপ পেয়ে দ্বি-স্বরধ্বনি গঠণে সহায়তা করে। যেমন- সখি(সওখই) সই(সওই) দধি (দওধই) দই(দওই)
তাহলে বলা যেতে পারে- একটি স্বরধ্বনি, জিভের গতিশীলতা এবং তৎপরবর্তী সামগ্রিক প্রক্রিয়া-সৃষ্ট অর্ধ-স্বরধ্বনি সমন্বয়ে জাত একটি অক্ষরকেই দ্বি-স্বরধ্বনি বলা যেতে পারে। এ বিবেচনায় অবশ্য একটি পূর্ণ স্বর ও অর্ধস্বর মিলেই দ্বি-স্বরধ্বনি।
প্রকারভেদঃ
বাংলা বর্ণমালায় যৌগিক বা দ্বি-স্বরধ্বনিজ্ঞাপক হরফ আছে মাত্র দুটি। যথা-ঐ, ঔ। কিন্তু বাংলা ভাষায় ধ্বনিগত দিক থেকে একত্রিশটি পর্যন্ত যৌগিক স্বরধ্বনি হতে পারে। এদের মধ্যে নিয়মিত ১৯ টি এবং অনিয়মিত ১২টি।
(১) নিয়মিত যৌগিক স্বরধ্বনি
১৯ টি দ্বি-স্বর নিয়মিত। কারণ, সতর্ক কিংবা অসতর্ক উচ্চারণেও তাদের দ্বি-স্বরধ্বনি হিসেবে উচ্চারিত হওয়াটা স্বাভাবিক। নিচে উদাহরণ দেয়া হলো :
অনিয়মিত যৌগিক স্বরধ্বনি মোট ১২টি। তারা অনিয়মিত, কারণ তাদের উচ্চারণে দ্বৈত স্বরের প্রথম এবং প্রধান শর্ত এক আক্ষরিকতা যদি বজায় থাকে তবে তারা যৌগিক স্বরধ্বনিই। কিন্তু কোন ভাবে যদি ক্ষুণœ হয়, তাহলে আর তারা দ্বি-স্বরধ্বনি রূপে উচ্চারিত হতে পারে না। কিন্তুু সতর্ক ও স্বাভাবিক উচ্চারণে তাদের দ্বি-স্বর না হওয়ারই কথা। নিচে উদাহরণ দেওয়া হলোঃ
তবে এদেরকে ঠিক দ্বি-স্বর বলা যায় না। কারণ এগুলোর কোনোটি ঠিক শ্বাসবায়ুর এক ধাক্কায় উচ্চারিত হয় না ।
দ্বি-স্বরধ্বনি বাংলা স্বরধ্বনির এক নান্দনিক রূপ। বর্ণমালায় ঐ এবং ঔ এই দুইট যৌগিক বা দ্বি-স্বরধ্বনি থাকলেও ব্যাবহারিক দিক থেকে প্রায়োগিক দিক থেকে এই যৌগিক স্বরধ্বনির বৈচিত্য ও শব্দগঠনের বহুমাত্রিক রূপ পরিলক্ষিত হয়।