“বাংলা ভাষায় অর্ধ-স্বরধ্বনির ধ্বনিগত গঠন ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ”


অর্ধ-স্বরধ্বনির সংজ্ঞা, গঠন-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
প্রসঙ্গকথা: বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনি দুই প্রকার- স্বর ও ব্যজ্ঞন। উচ্চারণ-প্রকৃতি ও গঠন-বৈচিত্র্যের জন্য স্বর ও ব্যঞ্জনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ধ্বনির পার্থক্য বা স্বাতন্ত্র্য-বিচারে রয়েছে নানা প্রক্রিয়া বা মাপকাঠি। সে সব প্রক্রিয়ার সাহায্যে স্বর ও ব্যঞ্জনের বিচার করে ধ্বনিমূল নির্ণয় করা হয়। বাংলায় স্বরবর্ণ ১১টি হলেও মূলস্বর ০৭টি, কারো কারো মতে ৮টি। তবে বাংলায় মূলস্বর ছাড়াও অতিরিক্ত কিছু ধ্বনি পাওয়া যায়। একে Semi-Vowel বা অর্থ-স্বরধ্বনি বলে। অবশ্য যে অর্থে এদেরকে Semi-Vowel বলা হয়ে থাকে, সে অর্থে এদেরকে Semi-Consonant-ও বলা যেতে পারে। গঠন-প্রকৃতির দিক থেকে এগুলো স্বর ও ব্যঞ্জন উভয় ধ্বনির প্রকৃতি গ্রহণ করে থাকে।

অর্ধ-স্বরধ্বনির সংজ্ঞা:
অর্ধ-স্বরধ্বনির সংজ্ঞা নির্ণয় বেশ দুরূহ। ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই এর মতে-
বাংলা শব্দের মধ্যে দুই স্বরধ্বনির মাঝখানে কিংবা এক শব্দের শেষে এবং পরবর্তী শব্দের আদিতে পাশাপাশি একই স্বরধ্বনি থাকলে এক সঙ্গে উচ্চারণ করতে গিয়ে বাগযন্ত্রগুলোর অসুবিধা হয়। সেই অসুবিধা দূর করবার জন্যে যে-সব অস্পষ্ট ধ্বনি উত্থিত হয়, সেই gliding (পিচ্ছিল) ধ্বনিগুলোই তার পরবর্তী স্বরধ্বনি সহযোগে জাত যথার্থ অর্ধ-স্বরধ্বনি।
মুহম্মদ আবদুল হাই অর্ধ-স্বরধ্বনির তিনটি বৈশিষ্ট্যের কথাও বলেছেন-
১. জিভের অবস্থানের দিক থেকে অর্ধ-স্বরধ্বনির নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই।
২. উচ্চারণের সময়ের দিক থেকে তার (অর্ধ-স্বরধ্বনির) স্থিতিকাল অত্যস্ত স্বল্প অর্থাৎ মুখের মধ্যে ধ্বনিটি তৈরি হতে না হতেই উচ্চারিত হয়ে যায়।
৩. স্বরধ্বনির তুলনায় উচ্চারণে জিভ উচ্চতর ও বায়ুপথ সংকীর্ণতর হয় বলে অর্ধ-স্বরধ্বনি সবচেয়ে কম অনুরণিত হয়।
আধুনিককালে অর্ধ-স্বরধ্বনির আলোচনায় অক্ষর-গঠনের বৈশিষ্ট্যকে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সে আলোকেই পাশ্চাত্য ও আমাদের দেশে অর্ধ-স্বরধ্বনির সংজ্ঞার্থ নিরূপণ করা হয়েছে।
রিচার্ডস-এর মতে-
অর্ধ-স্বরধ্বনি হচ্ছে সেই বাগধ্বনি যার উৎপাদনে ফুসফুস-আগত বাতাস মুখ বা নাক দিয়ে বের হওয়ার সময় খুব কম ঘর্ষণের সৃষ্টি হয়।
আর এল ট্র্যাঙ্ক-এর মতে
অর্ধ-স্বরধ্বনি হচ্ছে এক ধরনের অনাক্ষরিক ধ্বনিখণ্ড যার ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য স্বরের মতো, কিন্তু ধ্বনিতাত্ত্বিক আচরণে তা ব্যঞ্জনের ন্যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পিচ্ছিল স্বর।
পবিত্র সরকার বলেছেন-
যে স্বরধ্বনিগুলোর সিলেবল-গঠনের ক্ষমতা নেই, বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিলেবলের প্রান্তে বসে, সেগুলি অর্ধ-স্বরধ্বনি।
বৃটিশ ধ্বনিবিজ্ঞানীদের মতে-
অর্ধ-স্বরধ্বনি এমন একটি শ্রুতি বা পিচ্ছিল ধ্বনি যার উচ্চারণে জিহ্বার গতি উচ্চ ও সংকীর্ণ একটি স্বরধ্বনির দিক থেকে প্রশস্ততর একটি স্বরধ্বনির দিকে অগ্রসর হয়।
তাদের মতে-
জিহ্বার গতিশীলতা ও তৎসংশ্লিষ্ট একটি অসম্পূর্ণ স্বরধ্বনির সমষ্টি হচ্ছে অর্ধ-স্বরধ্বনি।
মহম্মদ দানীউল হক বলেছেন যে, অর্ধ-স্বরধ্বনি স্বরধ্বনির আশ্রয়ে থাকে। উচ্চারণ-কালে জিভ পার্শ্ববর্তী স্বরধ্বনিটির দিকে পিছলে চলে যায় অথবা ঐ স্বরধ্বনিটি থেকে পিছলে বেরিয়ে আসে, পিছলে বেরিয়ে আসে বলেই বাংলায় এর নাম পিচ্ছিল ধ্বনি।
জীনাত ইমতিয়াজ আলী’র কথায়-
বস্তুত, অর্ধ-স্বরধ্বনি হচ্ছে সেই অপূর্ণ বা অগঠিত স্বর যা কখনোই অক্ষরের চূড়ায় অবস্থান করতে পারে না; তার আসন সব সময় চূড়ার পাদদেশে নির্দিষ্ট এবং স্বর হিসেবে চিহ্নিত বা উল্লিখিত হলেও গভীরতর বিবেচনায় তার আত্মীয়তা বা নৈকট্য ব্যঞ্জনের দিকেই নিবন্ধ। সে-হিসেবে ব্যঞ্জনসদৃশ স্বর-ই হলো অর্ধ-স্বরধ্বনি।
অর্ধ-স্বরধ্বনির গঠন-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য:
ফুসফুস থেকে বাতাস বেরিয়ে আসার সময় বাকপ্রত্যঙ্গগুলো ততখানি সক্রিয় থাকে না বলে অনেক সময় স্বরধ্বনিগুলো ততখানি অনুরণিত হয় না এবং কম দ্যোতনার জন্যে তার প্রকৃতি পাল্টে যায়। ধ্বনিগত প্রক্রিয়ার দিক থেকে অর্ধ-স্বরধ্বনিকে তাই পিচ্ছিল ধ্বনি বলা হয়।
পিচ্ছিল উচ্চারণ-প্রক্রিয়ার জন্য কাছাকাছি অবস্থিত দুটো স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় একটা স্বরধ্বনি গঠনের আগেই বাকপ্রত্যঙ্গ অন্য একটি স্বরধ্বনি গঠনের দিকে এগিয়ে যায়। স্বরধ্বনি গঠনে যতটুকু সময় লাগে তার চেয়ে সময় কম নেওয়ার ফলে পিচ্ছিল ধ্বনি গঠিত হয়।
দ্বি-স্বরধ্বনির গঠন প্রসঙ্গে মুহম্মদ আবদুল হাই অর্ধ-স্বরধ্বনি প্রসঙ্গে যা বলেছেন, তার সূত্র ধরে বলা যায় যে, একটি পূর্ণাঙ্গ স্বরধ্বনির উচ্চারণ-কালে জিহ্বা একটা নির্দিষ্ট স্থান গ্রহণ করে, কিন্তু পাশাপাশি অবস্থিত দুটো স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে জিহ্বা প্রথম ধ্বনিটি উচ্চারণ করেই পরবর্তী স্বরধ্বনির দিকে দ্রুত এগিয়ে (পিছলে) যায়। জিহ্বার প্রথম স্বরধ্বনির গঠন এবং দ্বিতীয় স্বরধ্বনির দিকে দ্রুত পেশী সঞ্চালনের মাঝখানে শোনা না গেলেও পিচ্ছিল স্বতন্ত্র শ্রুতিধ্বনি স্বতঃউৎসারিত না হয়ে পারে না।
অর্ধ-স্বরধ্বনি ঘোষ ও অঘোষ উভয়ভাবেই উচ্চারিত হতে পারে।
স্বরধ্বনির উচ্চারণে জিভের একটা নির্দিষ্ট স্থান থাকে বলে তার একটি নির্দিষ্ট ধ্বনি-ব্যঞ্জনা থাকে, কিন্তু অর্ধ-স্বরধ্বনির বেলায় এ কথা খাটে না।
ইংরেজ ধ্বনিবিজ্ঞানীদের সংজ্ঞা অনুসরণে অর্ধ-স্বরধ্বনির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য-
- এ ধ্বনি গঠনের সময় জিভ ক্রমাগত উঁচুতে ও পেছনে যেতে পারে এবং সেই সাথে ঠোঁটের আকারও গোলাকার ধারণ করে।
- অনেক সময় জিভের উচ্চতা অন্যান্য স্বরধ্বনির মতো থাকতে পারে, কিন্তু সে-ক্ষেত্রে অর্ধ-স্বরধ্বনিগুলো স্বরধ্বনির মতো স্বরিত নয়।
- দ্বি-স্বরধ্বনি ও অর্ধ-স্বরধ্বনির মধ্যে উচ্চারণগত প্রক্রিয়ার জন্য স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি হয়। নিঃশ্বাসের এক প্রয়াসে উচ্চারিত হলে তা হয়ে যায় দ্বি-স্বরধ্বনি, আর নিঃশ্বাসের স্বতন্ত্র প্রয়াসে উচ্চারিত হয়ে তা হয়ে যায় অর্ধ-স্বরধ্বনি। উদাহরণ দেয়া হলো-
ক) ই- ১. জা-ই- আমার ছোট জা-ই এ কাজ করেছে।
২. যাই- আমি বাড়ি যাই।
খ) এ- ১. জা-এ এটা আমার জা-এ করেছে।
২. যায় – সে রোজ স্কুলে যায়।
গ) ও ১. জা-ও – আমার জা-ও সিনেমায় যাবে।
২. যাও – তুমি এখন বাজারে যাও।
বাংলা অর্ধ-স্বরধ্বনি:
বাংলায় অর্ধ-স্বরধ্বনির সংখ্যা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও সুকুমার সেনের মতে বাংলা অর্ধ-স্বরধ্বনি দুইটি- অস্তস্থ- ব এবং অন্তস্থ- য় । কিন্তু, মুহম্মদ আবদুল হাই ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি বিভিন্ন আলোচনার প্রেক্ষিতে বাংলায় তিন ধরনের অর্ধ-স্বরধ্বনির কথা বলেছেন। যেমন-
১. শ্রুতিবাচক: ক) য়-শ্রুতি; খ) অন্তস্থ ব –শ্রুতি এবং গ) ই-শ্রুতি।
২. নিয়মিত দ্বি-স্বরধ্বনির শেষ উপাদান হিসেবে- ই, এ(য়), ও এবং উ।
৩. অনিয়মিত দ্বি-স্বরধ্বনির দ্বিতীয় কিংবা (সীমিতভাবে) প্রথম উপাদান হিসেবে।
তবে তিনি মোটামুটিভাবে য়-শ্রুতি , অন্তঃস্থ ব-শ্রুতি এবং ই-শ্রুতি এই তিনটি অর্ধ-স্বরধ্বনিই ব্যাপকভাবে বাংলায় ব্যবহৃত হয় বলে মত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ মনে করেন যে, অন্তস্থ-ব এবং অন্তস্থ- য় ইংরেজিতে অর্ধ-স্বরধ্বনির মর্যাদা পেলেও বাংলায় এগুলি অর্ধ-স্বরধ্বনি নয়।
বাংলায় অর্ধ-স্বরধ্বনি নির্ণয়ে নবতর দৃষ্টিকোণ গৃহীত হয়েছে। ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী সে দিক থেকে বাংলায় ৪টি অর্ধ-স্বরধ্বনির কথা বলেছেন। যেমন- ই, এ, ও এবং উ। এদের মতোই পবিত্র সরকার ও গণেশ বসুও চারটি অর্ধ-স্বরধ্বনির কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে তারা বলেছেন-
—ভাই, বউ, ঢেউ, দাও, ঝাউ ইত্যাদির ই, উ, ও। এর সঙ্গে আর একটি আছে এ। সেটি সাধারণত বাংলা শব্দের শেষে য় দিয়ে লেখা হয়। যেমন- হয়, যায়। বাংলা অর্ধ-স্বর এই চারটি ( ই, উ, এ ও)।
পবিত্র সরকার ও গণেশ বসু নির্দেশিত অর্ধ-স্বরগুলো মূলত নিয়মিত দ্বি-স্বরধ্বনির শেষ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত । (ই, এ(য়), ও এবং উ)
ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী চারটি অর্ধ-স্বরধ্বনির কথা বললেও উদাহরণ হিসেবে উ এর জন্য কোনো ন্যূনতম জোড় দেখাতে পারেননি। তাই, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ ই, এ, এবং ও এই তিনটিকে অর্ধ-স্বরধ্বনি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ধ্বনি নির্ণয়ের একটি স্বীকৃত পদ্ধতি হলো ধ্বনির পাঠ-প্রতিকল্পন তৈরি। পাঠ-প্রতিকল্পন তৈরি করে আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ বাংলা অর্ধ-স্বরধ্বনির নিম্নোক্ত পরিচয় দিয়েছেন।
ক) ই- ১. জা-ই- আমার ছোট জা-ই এ কাজ করেছে।
২. যাই- আমি বাড়ি যাই।
খ) এ- ১. জা-এ এটা আমার জা-এ করেছে।
২. যায় – সে রোজ স্কুলে যায়।
গ) ও ১. জা-ও – আমার জা-ও সিনেমায় যাবে।
২. যাও – তুমি এখন বাজারে যাও।
অর্ধ-স্বরধ্বনির ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিচয়
১. শ্রুতিবাচক:
ক) য়-শ্রুতি: খেয়ে, মেয়ে , মায়া ইত্যাদি শব্দের প্রথম ও শেষ স্বরধ্বনির মাঝখানে মুখগহ্বর ও জিভের অস্বস্তিজনিত একটা শ্রুতি বা gliding (পিচ্ছিল) ধ্বনি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য উত্থিত হচ্ছে। এটিই য়-শ্রুতি। যেমন- খে-এর এ-কার এবং য়ে-এর এ-কার, এই দুটো স্বরধ্বনির বেলায় শেষের য়-টি অর্ধ-স্বরধ্বনি।
ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিচয়: য়-শ্রুতি উচ্চারণে জিভের পাতা শক্ত তালুর দিকে সামান্য উঠে যায়। কাজেই একে তালব্য শ্রুতিধ্বনি বলা চলে। মা আমার (মায়ামার) জাতীয় পাশাপাশি দুই শব্দে এ ধরনের শ্রুতিবাচক য় অর্ধ-স্বরধ্বনি বেশ লক্ষ করা যায়।
খ) অন্তস্থ ব-শ্রুতি: খাওয়া, পোয়া, কুয়া ইত্যাদি শব্দের অন্তস্থ-য় শ্রুতি অন্তস্থ-ব শ্রুতির জায়গা দখল করে নিয়েছে। খাওয়া শব্দের খা-র আ-কার এবং ওয়া’র মাঝখানে উচ্চারণ-কালে ঠোঁট গোল হয় এবং পরমুহূর্তে প্রসৃত হয়ে যায়। ঠোঁটের এই রূপান্তরের মাঝখানেই গতিশীলতার ফলে উত্থিত ধ্বনিটিই অর্ধ-স্বরধ্বনি ব-শ্রুতি।
ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিচয়: ব-শ্রুতি উচ্চারণ-কালে জিভের পেছনভাগ আলজিভের দিকে উঠে যায় এবং একই সঙ্গে দুই ঠোঁট গোলাকার ধারণ করে। কাজেই এটাকে বলা চলে জিহ্বামূলীয় ওষ্ঠ্য শ্রুতিধ্বনি।
গ) ই-শ্রুতি: দ্রুত কথাবার্তায় বাংলায় পিউ, পিউলি, দিয়া, প্রিয়া ইত্যাদি শব্দের প্রথম ও দ্বিতীয় স্বরের মাঝখানে উচ্চারকদ্বয়ের অজ্ঞাতে এ ধরনের ই জাতীয় একটা অর্ধ-স্বরধ্বনি উত্থিত হয়।
ধ্বনিতাত্ত্বিক পরিচয়: ই-শ্রুতি উচ্চারণে জিভের পাতা শক্ত তালুর দিকে একটু বেশি উঠে যায়। তাই, একে তালব্য শ্রুতিধ্বনি বলা যায়।
২. নিয়মিত দ্বি-স্বরধ্বনির শেষ উপাদান হিসেবে:( ই, এ(য়), ও এবং উ)
একটি অক্ষর উচ্চারণে একটি চূড়া এবং একটি খাদ-এর দরকার হয়। চূড়াটি অক্ষর গঠনে সহায়তা করে বলে তার নাম আক্ষরিক। আর অক্ষরটি খাদে পড়ে যায় বলে তার নাম অনাক্ষরিক। এর ভূমিকা মোটামুটি ব্যঞ্জনাত্মক। অক্ষর গঠনে চূড়াটি প্রথমে এবং খাদটি সাধারণত পরে আসে। যেমন-
আই, আয়, আও, উউ – এসব ক্ষেত্রে অক্ষরটি হয় সংবৃত। এ ধরনের পাশাপাশি অবস্থানরত দ্বি-স্বরধ্বনিকেন্দ্রিক অক্ষরের শেষের দিকের খাদটিকে অর্ধ-স্বরধ্বনি ধরে অধ্যাপক ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী বাংলায় উচ্চাবস্থিত তথা সংকীর্ণ ই, উ এবং মধ্যে অবস্থিত তথা অর্ধ-সংকীর্ণ এ এবং ও –কে অর্ধ-স্বরধ্বনি বলেছেন।
অধ্যাপক ফার্গুসন ও মুনীর চৌধুরী উদাহরণ হিসেবে উ এর জন্য কোনো ন্যূনতম জোড় দেখাতে পারেননি। তাই, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ ই, এ, এবং ও এই তিনটিকে অর্ধ-স্বরধ্বনি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
৩. অনিয়মিত দ্বি-স্বরধ্বনির দ্বিতীয় কিংবা (সীমিতভাবে) প্রথম উপাদান হিসেবে:
বাংলায় ইয়ার, এয়ার, ইউরোপ, ওয়াড় প্রভৃতি শব্দের দ্রুত ও অস্বাভাবিক পিষ্ট উচ্চারণের উপর নির্ভর করে এ ধরনের অর্ধ-স্বরধ্বনি। আবার ইয়া, এয়া, ওয়া, উয়া, এ্যায়া, অয়া, ইয়ে, ওয়ে, উয়ে, ইও, এয়ো, উয়ো – এই ১২টি অনিয়মিত দ্বি-স্বরধ্বনির শেষের স্বরধ্বনি য়া, য়ে, এবং ও অক্ষর গঠনে খাদ সৃষ্টি না করলেও এরা স্বল্পশ্রুতিব্যঞ্জক অসম্পূর্ণ স্বরধ্বনি হিসেবে উচ্চারিত হয় বলে এরাও এ পর্যায়ে অর্ধ-স্বরধ্বনি হতে পারে।