সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির ভূমিকা: বাংলা ভাষায় ধ্বনিগত গঠন, উচ্চারণভঙ্গি ও শব্দগঠনে

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি

প্রসঙ্গ-কথা: অর্থবোধক ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির নাম শব্দ বা রূপমূল। শব্দের মধ্যে স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি বিভিন্ন আঙ্গিকে অবস্থান করে। বাংলার লেখন পদ্ধতি অনুযায়ী পাশাপাশি অবস্থিত দুটো ধ্বনি সাধারণভাবে যুক্তাক্ষর নামে পরিচিত। কিন্তু, ধ্বনিতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে  বাংলায় প্রচলিত যুক্ত হরফ দিয়ে লেখা সব যুক্তাক্ষরই সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি নয়।

সংযুক্ত ব্যঞ্জন
সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির উদাহরণ

প্রচলিত অর্থে যুক্তাক্ষর কী?

দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি একত্রে একটি বর্ণের রূপ নিলে, তাকে বলা হয় যুক্তব্যঞ্জনবর্ণ বা যুক্তাক্ষর।

অথবা, দুটো বা তার চেয়ে বেশি ব্যঞ্জনধ্বনির মধ্যে কোনো স্বরধ্বনি না থাকলে সে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো একত্রে উচ্চারিত হয়। এভাবে একত্রে উচ্চারিত ব্যঞ্জনধ্বনিকে যুক্তাক্ষর বলে। যেমন-

  যুক্ত হয়ে গঠিত ক্ত। এখানে ক্ত একটি যুক্তাক্ষর।

লেখার রীতি অনুযায়ী যুক্তাক্ষর দুই রকমের। যথা-

১. স্বচ্ছ যুক্তাক্ষর         ও          ২. অস্বচ্ছ যুক্তাক্ষর

স্বচ্ছ যুক্তাক্ষর: যে যুক্তাক্ষরের গঠনকারী সংযুক্ত বর্ণগুলোকে সহজে চেনো যায় তাকে স্বচ্ছ যুক্তাক্ষর বলে।     

       যেমন- ক্ক, ল্ল ইত্যাদি।

অস্বচ্ছ যুক্তাক্ষর: যে যুক্তাক্ষরের গঠনকারী সংযুক্ত বর্ণগুলোর কোনো একটিকে অথবা কোনোটিকেই  চেনা যায় না, তাকে অস্বচ্ছ যুক্তাক্ষর বলে। যেমন- জ্ঞ (জ+ঞ), ঙ্গ (ঙ+গ) , হ্ম (হ+ম) ইত্যাদি।

গঠনের দিক থেকে যুক্তাক্ষর দুই রকমের। যথা-

ক) দ্বিত্ব যুক্ত ব্যঞ্জন       ও      খ) সাধারণ যুক্তব্যঞ্জন।

ক)  দ্বিত্ব যুক্তাক্ষর: একই বর্ণ মিলে যুক্তাক্ষর গঠিত হলে তাকে দ্বিত্ব যুক্ত ব্যঞ্জন বা দ্বিত্ব যুক্তাক্ষর বলে।

     যেমন- ক্ক (ক+ক), চ্চ (চ+চ) , জ্জ (জ+জ) , ত্ত (ত+ত) ইত্যদি।

 এগুলো আবার দুই রকমের হতে পারে-

১. স্বচ্ছ দ্বিত্ব যুক্তাক্ষর:   যেমন- চ্চ, জ্জ  ইত্যাদি । গঠনকারী ব্যঞ্জনধ্বনি চেনা যায়।

২. অস্বচ্ছ দ্বিত্ব যুক্তাক্ষর ; যেমন- ট্ট =ট+ট,   ত্ত = ত+ত ইত্যাদি। গঠনকারী ব্যঞ্জনধ্বনি চেনা যায় না।

খ) সাধারণ যুক্ত ব্যঞ্জন: ভিন্ন ব্যঞ্জন দ্বারা গঠিত যুক্তব্যঞ্জনকে সাধারণ যুক্তব্যঞ্জন বলে।

এগুলোও দুই রকমের হতে পারে। যেমন-

ক) স্বচ্ছ সাধারণ যুক্ত ব্যঞ্জন; যেমন- ল্প, চ্ছ, ঙ্খ ইত্যাদি। গঠনকারী ব্যঞ্জন চেনা যায়।

খ) অস্বচ্ছ সাধারণ যুক্তব্যঞ্জন;  যেমন- ক্ত (ক+ত), হ্ম (হ+ম), ক্ষ (ক+ষ), ষ্ণ (ষ+ণ) ইত্যাদি।

যুক্তাক্ষরের গঠন-বৈচিত্র্য লক্ষ করলে একথা বলা যায় যে, কিছু কিছু যুক্তাক্ষরের সংযোজিত বর্ণগুলো চেনা যায়, আর কিছু কিছু যুক্তাক্ষরের সংযোজিত বর্ণগুলো চেনা যায় না।

ধ্বনিতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে সংযুক্ত ব্যঞ্জন:

মুহম্মদ আবদুল হাই এর মতে-

বিভিন্ন স্থানজাত একাধিক ধ্বনি নিঃশ্বাসের এক প্রয়াসে উচ্চারিত হয়ে যদি একাত্মতা লাভ করে তাহলেই তা যথার্থ সংযুক্ত ধ্বনি বা Consonant cluster  নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শব্দের মধ্যে পাশাপাশি দুটো ব্যঞ্জনধ্বনি ব্যবহৃত হলেই সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি গঠিত হয় না।

এ প্রসঙ্গে আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ মন্তব্য করেছেন-

সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি গঠনের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে, পাশাপাশি অবস্থিত দুটো ব্যঞ্জনধ্বনি যদি নিঃশ্বাসের একই প্রয়াসে উচ্চারিত হয়, তাহলেই সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনিতে উন্নীত হবে; অন্যথায় নয়।

সংযুক্ত ব্যঞ্জনের সংখ্যা:

বাংলায় বিভিন্ন ব্যঞ্জনধ্বনি সহযোগে সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি গঠিত হতে পারে। সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি গঠনে সর্বদা অসম প্রকৃতির ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি অবস্থান করে এবং কোনো ক্ষেত্রেই সমশ্রেণির দুটো ব্যঞ্জনধ্বনির সাহায্যে এই শ্রেণির ধ্বনি গঠিত হয় না। বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত যুক্তাক্ষরের সংখ্যা ২৫০ টির মতো, কিন্তু যথার্থ যুক্তব্যঞ্জনধ্বনি আছে ৩৬টি এবং শব্দের শুরুতেই এ ৩৬টি ধ্বনিরই সংযুক্ততা বজায় থাকে।

শব্দের মাঝখানে স্ক, স্খ,ষ্ট, স্ত, স্থ, স্ন, স্প, স্ফ –এই আটটিকে বাদ দিয়ে মোট ২৮টি সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির কথা ধ্বনিবিজ্ঞানী মুহম্মদ আবদুল হাই উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে যথার্থ সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি হলো-

শ্ল, স্পৃ, (স্প্র), স্ত্র, ক্র (কৃ), খ্র ( খৃ), গ্র (গৃ), ঘ্র (ঘৃ), ছ্র (ছৃ), জ্র (জৃ), ট্র, ড্র, ত্র (তৃ), থ্র, দ্র (দৃ), ধ্র (ধৃ), নৃ, প্র (পৃ), ফ্র,  ব্র (বৃ), ভ্র (ভৃ), ম্র (মৃ), শ্র (শৃ), স্র (সৃ), হ্র, হ্ল, ক্ল, গ্ল, প্ল, ফ্ল, ব্ল, স্ল।

ড. রামেশ্বর শ মুহম্মদ আবদুল হাই-এর সংযুক্ত ব্যঞ্জনের সংজ্ঞা ও ৩৬টি সংখ্যা সমর্থন করে তিনি তাঁর মত প্র্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে খাঁটি বাংলায় সংযুক্ত ব্যঞ্জন হলো ২৮টি-

স্প, স্ফ, স্পৃ(স্প্র), স্ত, স্ত্র, স্থ, স্ক, স্খ, স্ন, শ্র, শ্ল, প্র, ব্র, ভ্র, ত্র, দ্র, ধ্র, ছ্র,(কৃচ্ছ্র), জ্র, ক্র(কৃ), গ্র(গৃ), ঘ্র ( ঘৃ), ম্র(মৃ), নৃ, প্ল, ক্ল, গ্ল, ম্ল।

এ ছাড়াও ভিন্ন ভাষা থেকে আগত ৮টি – স্ট, ফ্র, থ্র, ট্র, ড্র, খ্র,  ফ্ল, ব্ল ইত্যাদি।

তৎসম শব্দের বিশুদ্ধ উচ্চারণে বাংলায় ব্যবহৃত দুটি সংযুক্ত ব্যঞ্জন- হ্র, হ্ল/ হল্(হ্লাদিনী)।

সংযুক্ত ব্যঞ্জনের গঠন-প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য:

সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে এর গঠন সম্পর্কে যে কথা জানা যায়, তা হলো-

যুক্ত হরফের সাহায্যে লিখিত হওয়া সত্ত্বেও যে-সব ধ্বনি নিঃশ্বাসের এক প্রয়াসে উচ্চারিত না হবে এবং উচ্চারকদ্বয়ের সজোর পেশী সঞ্চালনের ফলে উচ্চারিত না হবে, সে-সব ধ্বনিকে সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি বলা যাবে না। অর্থাৎ সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি হতে গেলে দুটো ব্যঞ্জনধ্বনি নিঃশ্বাসের একই প্রয়াসে এবং উচ্চারকদ্বয়ের সজোর পেশী সঞ্চালনের ফলে উচ্চারিত হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ ক্ত এবং প্ল এ দুটো সংযুক্ত  অক্ষরের বিশ্লেষণ করলেই উক্ত কথার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

ক্ত এর মধ্যে ক এবং ত ধ্বনি রয়েছে। এ হরফদুটো যু্ক্ত বা বিযুক্ত যেভাবেই লেখা হোক না কেন, তাদের উচ্চারকদ্বয়ের সজোর পেশী সঞ্চালনের ফলে তারা উচ্চারিত হয় না। এক্ষেত্রে ক এবং ত স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারিত হয়।

তবে শব্দের মাঝখানে ক্ ধ্বনিটি তার অন্তর্নিহিত স্বরধ্বনি বিবর্জিত অবস্থায় অসম্পূর্ণভাবে উচ্চারিত হয় বলে এখানে তার উচ্চারণের বেলায় তার উচ্চারকেরা পৃথক হয় না। ফলে বায়ুপথও উন্মুক্ত হয় না।

কিন্তু প্লাবন কিংবা আপ্লুত শব্দ দুটির প্ল ধ্বনিটি দুটো হরফ দিয়ে লেখা হলেও এবং তাদের পরস্পরের দুটো পৃথক উচ্চারণ স্থান থাকলেও তাদের উচ্চারকদ্বয়ের একটি সম্মিলিত সজোর প্রয়াসেই তারা উচ্চারিত হয়।

ফলে, ধ্বনি দুটোর একটি মিলিত দ্যোতনা শোনা যায়। প্ল ধ্বনি সংগঠনে এবং উচ্চারণে প এর জন্যে  দুই ঠোঁট এবং ল এর জন্যে জিভের ডগা একই সঙ্গে সক্রিয় হয়ে ওঠে। প এর জন্যে ঠোঁটদুটো আবদ্ধ হতে না হতেই ল এর জন্যে জিভের ডগা দন্তমূলের কাছাকাছি হয়। আর সেই মুহূর্তেই ঠোঁট দুটো আলগা হয়ে যাওয়ার ফলে এ রকম একটা মিলিত ধ্বনির উৎপত্তি হয়।

এ ধ্বনি দুটির উচ্চারণে সমস্ত প্রক্রিয়াটি এত দ্রুত নিষ্পন্ন হয় যে, এদের ভেতরের পারম্পর্য অনুভব করাও শক্ত হয়ে ওঠে। এজন্য বক্তা ও শ্রোতা উভয়ের মনে এরা এক প্রয়াসজাত ধ্বনিরূপে ধরা দেয়।

চলিতভাষায় শব্দের আদি, মধ্য ও অন্তে সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি গঠিত হতে পারে। শব্দের মধ্যে সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি বেশির ভাগই হচ্ছে সংস্কৃতমূলক সাধুরীতির শব্দ। আর শব্দের শেষে ব্যবহৃত বেশির ভাগ শব্দ বিদেশি। শব্দের প্রথমে ব্যবহৃত- দৃষ্টি   ( দ+র), শব্দের মধ্যে ব্যবহৃত- সংশ্লিষ্ট (শ+ল), শব্দের শেষে ব্যবহৃত- মিস্ত্রি (ত+র)।

ডঃ রামেশ্বর শ বাংলায় সংযুক্ত ব্যঞ্জন সৃষ্টির কতকগুলো বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। যেমন-

বাংলায় শ্+ ঘোষধ্বনি প্রায় বিরল। অনেক ইউরোপীয় আর্য ভাষায় শব্দের আদিতে নাসিক্য ব্যঞ্জন + মৌখিক ব্যঞ্জন প্রায়ই পাওয়া যায় না, কিন্তু বাংলায় পাওয়া যায়। যেমন- নৃত্য। ( ন্ + র)। অবশ্য ঙ আদিতে বসে না। বাংলায় উষ্ম ব্যঞ্জন + ন পাওয়া যায়; যেমন- স্নান। শব্দের আদিতে যুক্ত ব্যঞ্জনের প্রথম ধ্বনিরূপে ল বা র বাংলায় পাওয়া যায় না।

বাংলা সংযুক্ত ব্যঞ্জনের একটি বৈশিষ্ট্য হলো

এখানে সমস্থানজাত একাধিক স্পর্শ ব্যঞ্জনের সংযোগ চোখে পড়ে না। সংযুক্ত উপাদানগুলোর মধ্যে একটি স্পর্শ ব্যঞ্জন থাকলেও থাকতে পারে, অন্যটি হয় উষ্ম ব্যঞ্জন, নয় নাসিক্য ব্যঞ্জন, নয় কম্পিত বা তরল ব্যঞ্জন। অধিকাংশ ভাষারই সংযুক্ত ব্যঞ্জনে এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।

র-ফলা ও ঋ-কারের মধ্যে উচ্চারণ কিংবা শ্রুতির দিক থেকে কোনো পার্থক্য নেই। যেমন- ক্রেতা এবং কৃত। এজন্য সংযুক্ত ধ্বনিমূল হিসেবে বিচার করলে তারা এক ছাড়া দুই নয়। এই শ্রেণির ধ্বনির ক্ষেত্রে আরেকটা কতা মনে রাখা দরকার যে, তিন বা চার হরফ বিশিষ্ট যুক্তাক্ষরের ক্ষেত্রে সবগুলো ধ্বনি সংযুক্ততা রক্ষা করে না। এ রকম ক্ষেত্রে হরফ যতই থাক না কেন ধ্বনির দিক থেকে মাত্র দুটো ধ্বনি রক্ষিত থাকে। যেমন-

নিষ্ক্রান্তষ্ক্র + ক্র (ক্ +র) এখানে ষ+ ক+ র তিনটি হরফ থাকলেও ষ + ক্র এ দুটো ধ্বনি রক্ষিত হয়েছে।

বক্তৃতাক্তৃ– ক্+তৃ (ত+ঋ); একানে ক+ত+ ঋ তিনটি হরফ থাকলেও ক + তৃ এ দুটো ধ্বনি রক্ষিত।

স্থানভেদে সংযুক্ততা হারানো ধ্বনি:

শব্দের মাঝখানে যে আটটি ধ্বনি তার সংযুক্ততা হারিয়ে ফেলে এবার সেগুলোর কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক।

স্কন্দ – বিস্কুট;  স্তুপ – বস্তি  

স্ক সংযুক্ত ব্যঞ্জনটি শব্দের প্রথমে ব্যবহৃত হলে- স্কন্দ ( স্কন্ +দো) স্ক ধ্বনিটি তার সংযুক্ততা ধরে রেখেছে। কিন্তু বিস্কুট শব্দে  স্ক ধ্বনিটি– (বিস্+কুট) সংযুক্ততা হারিয়ে ফেলেছে।

স্তুপ শব্দে স্ত ধ্বনিটি (স্তুপ্) প্রথমে থাকায় সংযুক্ততা ধরে রেখেছে, কিন্তু বস্তি (বস্ +তি)  শব্দে স্ত ধ্বনিটি মাঝে ব্যবহৃত হওয়াই সংযুক্ততা হারিয়ে ফেলেছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, শব্দের প্রথমে থাকলে সংযুক্ততা বজায় থাকলেও শব্দের মাঝে বা শেষে ব্যবহৃত হলে সংযুক্ততা হারিয়ে ফেলছে, অর্থাৎ তারা স্বতন্ত্র প্রয়াসে উচ্চারিত হচ্ছে।

বাংলায় যথার্থ সংযুক্ত ব্যঞ্জন ধ্বনিগুলোর গঠন-প্রকৃতিতে দেখা যায়, দন্তমূলীয় ঘর্ষণজাত মূলধ্বনি শ এবং তার সহধ্বনি স এবং ষ কিংবা তরলধ্বনি  দুটো তথা পার্শ্বজাত ল এবং কম্পনজাত র-ই বাংলা সংযুক্ত ধ্বনি গঠনের মূল উপাদান। স্বতন্ত্র পরিবেশে এদের উচ্চারণে কিছু পার্থক্য লক্ষিত হলেও এ তিনটি মূলধ্বনি ছাড়া বাংলায় যথার্থ সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি গঠনে অন্য কোনো উপাদান নেই।

ল এবং র – এ দুটো ধ্বনি সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনির উপাদান রূপে ব্যবহৃত হলে তারা স্পৃষ্টধ্বনি, ঘর্ষণজাত ধ্বনি কিংবা নাসিক্যধ্বনির পরে আসে। যেমন- ক্ল, শ্ল, ক্র(কৃ) ইত্যাদি। কিন্তু ঘর্ষণজাত ধ্বনিটি যদি এর উপাদান হয়, তাহলে তা স্পৃষ্ট ধ্বনি , তরলধ্বনি এবং নাসিক্যধ্বনির আগে বসে। যেমন- স্ক, স্প, শ্র, স্ন ইত্যাদি।

ঘর্ষণজাত ধ্বনি সংশ্লিষ্ট যুক্তধ্বনিগুলো শব্দের মাঝখানে সংযুক্ততা হারিয়ে স্বতন্ত্র উচ্চারণ পায়। তবে, তরলধ্বনি ঘটিত সংযুক্ত ধ্বনিগুলো শব্দের শুরুতে ও মধ্যে সমভাবে তাদের ধ্বনিগত সংযুক্ততা রক্ষা করে। যেমন- ক্রান্তি-প্রকৃত, ধ্রুব –বিধৃত, ঘ্রাণ-ঘৃত ইত্যাদি।

সংযু্ক্ত ধ্বনি সৃষ্টিতে যখন র এবং ল শব্দের মাঝখানে বসে তখন প্রথম উপাদানটি ধ্বনিগত দিক থেকে দ্বিত্ব লাভ করে দীর্ঘাকৃত হয় এবং প্রবল ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে যেমন-

আক্রান্ত –আক্ ক্রান্ তো   অম্লজান – অমম্লোজান্

সংযুক্ত ব্যঞ্জনধ্বনি মানে অসম শ্রেণির দুটো ব্যঞ্জনধ্বনি পাশাপাশি অবস্থান করবে। দুটো ধ্বনিই নিঃশ্বাসের এক প্রয়াসে বা একাক্ষরিকভাবে উচ্চারিত হবে। এ ধ্বনি শব্দের আদি, মধ্যে ও শেষে ব্যবহৃত হতে পারে। দ্বিতীয় ধ্বনিটির তুলনায় প্রথম ধ্বনিটি দীর্ঘ ও স্পষ্ট হবে। ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারকদের সম্মিলিত প্রয়াসে একই সাথে উচ্চারিত হবে। সব সংযুক্ত ব্যঞ্জন যুক্তাক্ষর, কিন্তু সব যুক্তাক্ষর সংযুক্ত ব্যঞ্জন নয়।

দ্বিত্বধ্বনি:

শব্দের প্রথমে বাংলা ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব উচ্চারণ নেই বা বসে না। শব্দের মাঝখানে বাংলায় যে সমস্ত ব্যঞ্জনধ্বনি দ্বিত্ব লাভ করে তাদের প্রথমটির উচ্চারণ রীতিমতো জোরালো এবং উচ্চারকদের দৃঢ়পেশী সঞ্চালতজাত।

দ্বিত্বপ্রাপ্ত ধ্বনির উচ্চারণ দৃঢ়তাব্যঞ্জক হলেও সংযুক্ত ব্যঞ্জনের মতো একাত্মতা লাভ করে না। তাদের প্রথম অংশটি সংস্কৃত হলন্ত ধ্বনির মতো অসম্পূর্ণ উচ্চারণ লাভ করে। ফলে তাদের পারম্পর্যগত উচ্চারণই রক্ষিত হয়।

যেমন-

পক্ক- পক্+ কো, (pokko);     সত্য –শোত্+ তো (∫otto);   বিশ্বাস- বিশ্ + শাশ্ (bi∫∫a∫

এ সব শব্দের সিলেবল বা অক্ষর ভাগের দিলে লক্ষ করলেই উক্ত কথার প্রমাণ মেলে। বাংলায় বিভিন্ন প্রকার দ্বিত্ব ধ্বনির ব্যবহার রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *