ভাষাবিচারের পদ্ধতিসমূহ বিশ্লেষণ। শ্রেষ্ঠ বা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি কোনটি?


ভাষাতত্তের সংজ্ঞা :
ভাষাবিষয়ক যাবতীয় তথ্যানুসন্ধান ও তত্ত্ব উদ্ধার অর্থাৎ ভাষার বৈজ্ঞানিক পঠন-পাঠনই হলো ভাষাতত্ত্ব বা ভাষাবিজ্ঞান। ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ ভাষার আদি উৎস নির্ণয়, ক্রমবিকাশের সংগত কারণ উদঘাটন, ভাষার সব রকম বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার ও গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করা।


ভাষার পরিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়ম ও ব্যতিক্রম নিয়মের আলোচনা, ভাষার অন্তর প্রকৃতি ও আঙ্গিকগত বৈশিষ্ট্য নিরূপণসহ বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নির্ণয় করা।
বিভিন্ন ভাষার শ্রেণীবিন্যাস ও সম্পর্ক নির্ণয় ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করে বিশ্লেষণ করাই হলো ভাষাতত্তে¡র উদ্দেশ্য ও বিষয়।
অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর মতে “ভাষাতত্তে¡র কাজÑ ভাষার অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ, ভাষার অবয়ব সংস্থানের শৃঙ্খলা আবিষ্কার এবং ব্যবহার প্রণালী বর্ণনা।”
ভাষার বিজ্ঞানই ভাষা বিজ্ঞান। “ভাষাবিষয়ক বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ, ওই উপাত্তের আভ্যন্তর শৃঙ্খলা উদঘাটন এবং ওই শৃঙ্খলা সুস্পষ্ট সূত্রের সাহায্যে প্রকাশ করা ভাষাবিজ্ঞানের কাজ।”
ভাষাবিচারের পদ্ধতি কয়টি ও কী কী :
ভাষাতত্ত্বে ভাষাকে বিশ্লেষণ বা বিচার করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। ভাষাবিচারের পদ্ধতিগুলো হলো-
ঐতিহাসিক পদ্ধতি,
তুলনামূলক পদ্ধতি,
বর্ণনামূলক পদ্ধতি ও
রূপান্তরমূলক পদ্ধতি।
ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক ভাষাবিচার পদ্ধতি প্রাচীনকালের। বিশ শতকের প্রথম দিক থেকে প্রাধান্য বিস্তার করে বর্ণনামূলক বা গঠনমূলক পদ্ধতি। এটি বিজ্ঞান সম্মত বলে পন্ডিত মহলে গৃহীত হয়েছিল। এরপর আসে রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ।
এবারে বিভিন্ন ভাষাবিচারের পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করার প্রয়াস পাবো।
তুলনামূলক পদ্ধতি: ভাষা বিচারের যে পদ্ধতিতে সম্পর্কিত বা অসম্পর্কিত ভাষাগুলোর ধ্বনি ও রূপমূল গঠনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়, তাকে তুলনামূলক পদ্ধতি বলে।
দূর কিংবা নিকট সম্পর্কিত দুই বা ততোধিক ভাষার সম্পর্ক নিরূপণ করা তুলনামূলক পদ্ধতির প্রতিপাদ্য বিষয়। এই পদ্ধতিতে ভাষাসমূহের তত্ত্ব ও প্রয়োগ কৌশল বা ব্যবস্থাবিধি আলোচনা করে। বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণের ব্যবহার বিধি আলোচনা করে।
বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণের গঠন ও রূপমূলের মধ্যে সাদৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে এই পদ্ধতি সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে সেই সব ভাষা একই মূল ভাষা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যেমন ‘মা’ শব্দের রূপ সংস্কৃতে ইংরেজিতে, জার্মানে, ল্যাটিনে, গ্রীকে একই রকম।
সুতরাং উক্ত ভাষাগুলো যে একটি মূলভাষা অর্থাৎ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে আগত, তুলনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। বীমস, রামকৃষ্ণ গোপাল ভান্ডাকার, জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন প্রমুখ তুলনামূলক পদ্ধতিতে ভাষা তত্ত্বচর্চায় অবিস্মরণীয় অবদান রখেছেন।
ঐতিহাসিক পদ্ধতি: কোনো ভাষার অতীতরূপের বিশ্লেষণ করা ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের কাজ। ভাষাবংশ, ভাষার কালানুক্রমিক প্রবাহ ও পরিবর্তনের ইতিহাস, শব্দের শ্রেণীকরণ, পদ ও বিভক্তির ব্যুৎপত্তিগত বর্ণনা এবং বিশ্লেষণ রীতিকে ঐতিহাসিক পদ্ধতি বলা হয়।
ঐতিহাসিক পদ্ধতির লক্ষ্য:
“মূলত বিবর্তিত ভাষার পূর্বরূপের বিবর্তনগত দিক বিশ্লেষণই হচ্ছে ঐতিহাসিক পদ্ধতির অন্যতম লক্ষ্য।”
একটি ভাষা বা সম্পর্কিত ভাষা গোষ্ঠীতে যেভাবে ধ্বনি ও রূপমূলের পরিবর্তন ঘটে, এই পদ্ধতির সাহায্যে তার অনুসন্ধান করা হয়। প্রাচীন ভাষা বিচারের ক্ষেত্রে গ্রাম, বপ, গ্রাসম্যান, ভার্ণার প্রমুখ ভাষাতত্ত্ববিদরা ঐতিহাসিক পদ্ধতির বিশ্লেষণ করেছেন।
তাঁদের নির্দেশিত সূত্রের সাহায্যেই প্রাচীন ভাষার বিভিন্ন পরিবর্তনগত দিক সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া একটি ভাষার ক্রমবিবর্তনের ধারাও এই পদ্ধতির সাহায্যে নির্দেশ করা হয়। ভাষার ইতিহাস নির্মাণ ছাড়াও প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, লিপিতত্ত্ব, ইত্যাদির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির অবদান অনস্বীকার্য। উল্লেখিত ভাষাবিদ ছাড়াও হেনরি সুইট, এ মেইলেট, এ মর্টিনেট, আর.জি. কেন্ট, লেহম্যান, বিজয়চন্দ্র মজুমদার ও সুনীতিকুমার, ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অতীন্দ্রমজুমদার প্রমূখ ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব চর্চা করেছেন।
বর্ণনামূলক পদ্ধতি: ভাষার সাংগঠনিক বর্ণনা করাই হলো এ পদ্ধতির কাজ। এ পদ্ধতির সাহায্যে বিশেষ ভাষার বিভিন্ন স্তরের উপাত্তসংগ্রহ করে বিভিন্ন ভাষাবস্তুর বিন্যাসের বর্ণনা করা হয়। কোনো ভাষার ধ্বনি রাশির শৃঙ্খলা, রূপমূলের বর্ণনা, বাক্য গঠনের পদ্ধতি অর্থাৎ ভাষার সকল স্তরের বর্ণনা করা হলো বর্ণনামূলক পদ্ধতি।
রূপান্তরমূলক পদ্ধতি: নোআম চমস্কি গঠণমূলক বা বর্ণনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে ভাষা বিচারের পরিবর্তে রূপান্তরমূলক উৎপাদক পদ্ধতির প্রয়োগে ভাষা বিচার শুরু করেন। রূপান্তরমূলক পদ্ধতি হচ্ছে নিয়মানুগ ভাষাতাত্তি¡ক প্রয়োগগত প্রক্রিয়া, যার সাহায্যে দ্বিস্তরীয় গঠণগত প্রতীকরূপের ব্যবহার অন্তর্ভূক্ত।
রূপান্তরমূলক সূত্রে একটি প্রতীকের অনুক্রম অন্তর্ভূক্ত, যা অপর একটি অনুক্রমরূপে কয়েকটি প্রয়োগ দ্বারা পুনর্লিখিত হয়। যে ব্যাকরণে রূপান্তরমূলক সূত্র প্রয়োগ করে ভাষা বিশ্লেষণ করা হয়, তা রূপান্তরমূলক ব্যাকরণরূপে পরিচিত।
ভাষাবিচারের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে কোন পদ্ধতি শ্রেষ্ঠ:
ভাষাতত্তে¡ ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে তত্ত্ব ও উপাত্ত ব্যবহারের প্রক্রিয়ার দিক থেকে একে অন্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রয়োজনের তাগিদেই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এসব ভাষাবিচারের পদ্ধতির উদ্ভব ঘটেছে।
তবে এদের উদ্দেশ্য হলো সর্বোপরি ভাষার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। ভাষা নিয়ত পরিবর্তনশীল। এ পরিবর্তন ভাষার সামগ্রিক উপাদানের মধ্যে। ভাষার ধ্বনি, রূপমূল ও বাক্য হলো ভাষার মূল কাঠামো।
বর্ণনামূলক পদ্ধতি ধ্বনির উচ্চারণ প্রকৃতি, সাদৃশ্য ও শব্দার্থ সহযোগে যে কোনো ভাষার বর্তমান রূপের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে সহায়তা করে। তাই আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনামূলক পদ্ধতির উপযোগিতা অপরিহার্য।
ভাষা বিচারে প্রাচীনকাল থেকেই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যবহৃত হয়ে এলেও উনিশ শতকের শেষের দিকে এসে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে গেছে। কারণ ভাষা বিজ্ঞানীদের কাছে মনে হয়েছে ভাষার ক্রমবিকাশের ইতিহাসের চেয়ে ভাষার সংগঠন, পরিবর্তন এবং ভাষার বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন বেশি তাৎপর্যের।
ভাষা আলোচনায় সমকালিক ও পুরাকালিক দুটি পদ্ধতির কথা উঠে আসে। এর মধ্যে সমকালিক পদ্ধতির বর্ণনামূলক আলোচনা খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে বর্ণনামূলক পদ্ধতি বিবেচিত হতে থাকে।
বর্ণনামূলক পদ্ধতির সঙ্গে জীবন্ত মানুষের বাস্তব সংযোগ রয়েছে এবং বিশ্লেষণের প্রক্রিযায় Grammar, Semanties, Phoneties ইত্যাদি সব রীতিই গ্রহণ করা হয়। তাই এ পদ্ধতি অন্যান্য ভাষাবিচারের পদ্ধতির তুলনায় বৈজ্ঞানিক ও শ্রেষ্ঠ।
প্রফেসর মো: আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর