Table of Contents

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়: স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, মাপকাঠি, বর্গ, মাত্রাভেদে শ্রেণিকরণ, কার ও ফলা।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়: ধ্বনি ও বর্ণ

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথমেই মনে রাখা দরকার একটা শ্রুতিগ্রাহ্য অন্যটি দৃষ্টিগ্রাহ্য। ধ্বনি ও বর্ণের সংখ্যার দিক থেকেও এক নয়। ধ্বনি ও বর্ণের হিসেবে স্বরধ্বনি ও স্বরবর্ণ যদি ধরি, দেখা যাবে যে, স্বরবর্ণ ১১টি কিন্তু স্বরধ্বনি ৭টি। তেমনি ধ্বনি ও বর্ণ হিসেবে ব্যঞ্জনধ্বনি ও ব্যঞ্জনবর্ণ বিচার করলে ব্যঞ্জনবর্ণ ৩৯টি কিন্তু ব্যঞ্জনধ্বনি ৩০টি। ধ্বনির সাংকেতিক চিহ্নকে বর্ণ বলে। ফলে ধ্বনি ও বর্ণ এক নয়। ধ্বনি ও বর্নের পরিচয় প্রসঙ্গে এ নিবন্ধে ধ্বনি ও বর্ণের উভয়ের পরিচয় দেওয়া হলো।

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একে অন্যের সাথে মনের ভাব বিনিময় করতে গিয়ে কথা বলে। কথার মূলে রয়েছে কতকগুলো আওয়াজ। এই আওয়াজই হলো ধ্বনি। তাই বলা যায়-

মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে যে অর্থবোধক আওয়াজ করে, তাকে ধ্বনি বলে।

অথবা ,

“কোন ভাষায় উচ্চারিত শব্দকে বিশ্লেষণ করলে তার যে পরমাণু বা অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম অংশ পাওয়া যায় তা-ই ধ্বনি।”

 যেমন – অ, র, ম, আ, ই ইত্যাদি।

ধ্বনি ও বর্ণের প্রকারভেদ:

ধ্বনি দুই প্রকার । যথা: স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি ।

স্বরধ্বনি: যে ধ্বনি অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে উচ্চারিত হতে পারে, তাকে স্বরধ্বনি বলে। ধ্বনিবিজ্ঞানীদের ভাষায় – যে সব ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে  ফুসফুস তাড়িত বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় না, তাদেরকে স্বরধ্বনি বলে।  যেমন – অ, আ, উ, এ ইত্যাদি।

 ব্যঞ্জনধ্বনি: যে ধ্বনি স্বরধ্বনির সাহায্য ছাড়া উচ্চারিত হতে পারে না, তাকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে। ধ্বনিবিজ্ঞানীদের ভাষায় –  যে সব ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে ফুসফুস তাড়িত বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় কোথাও না কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় কিংবা ঘর্ষণ লাগে, তাদেরকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে।

যেমন – ক, চ, জ , প ইত্যাদি।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় : ধ্বনি, বর্ণ  ও  অক্ষরের মধ্যে পার্থক্য:

মানুষ সামাজিক জীব। মানুষ একে অন্যের সাথে মনের ভাব বিনিময় করতে গিয়ে কথা বলে। কথার মূলে রয়েছে কতকগুলো আওয়াজ। এই আওয়াজই হলো ধ্বনি। তাই বলা যায়-

মানুষ মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাক-যন্ত্রের সাহায্যে যে অর্থবোধক আওয়াজ করে, তাকে ধ্বনি বলে।

    অথবা ,

 “কোন ভাষায় উচ্চারিত শব্দকে বিশ্লেষণ করলে তার যে পরমাণু বা অবিভাজ্য ক্ষুদ্রতম অংশ পাওয়া যায় তাÑই ধ্বনি।”    যেমন – অ ,র, ম, আ , ই ইত্যাদি। 

অন্যদিকে, ধ্বনির লিখিত রূপকে বলা হয় বর্ণ। অর্থাৎ, ধ্বনিকে যে প্রতীক বা চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়, তাকে বর্ণ বলে।

ধ্বনিগুলো মুখে উচ্চারিত হয়। তারই লিখিতরূপ হলো বর্ণ। তাই ধ্বনি শ্র“তিগ্রাহ্য , আর বর্ণ দৃষ্টিগ্রাহ্য। যেমন – ‘অ’-ধ্বনির প্রতীক হলো – অ-বর্ণ, ‘আ ’ ধ্বনির প্রতীক হলো – আ  বর্ণ ।

ধ্বনিরই লিখিতরূপ বর্ণ বলে, ধ্বনির মতো বর্ণও দুই প্রকার। স্বরধ্বনির প্রতীক স্বরবর্ণ, আর, ব্যঞ্জনধ্বনির প্রতীক হলো ব্যঞ্জনবর্ণ।

ধ্বনির লিখিতরূপ বর্ণ , তাই ধ্বনি ও বর্ণের সংখ্যা এক হবার কথা । কিন্তু বাংলা ধ্বনি ও বর্ণের সংখ্যা এক নয়। যেমন – স্বরবর্ণ ১১টি হলেও স্বরধ্বনি ৭টি। আবার ‘এ্যা’- স্বরধ্বনি থাকলেও তার কোনো বর্ণ নেই।

ধ্বনি কালের গতিতে পরিবর্তিত হয়, কিন্তু ধ্বনির রূপ বর্ণকে পাল্টানো যায় না।

সাধারণ অর্থে অক্ষর বলতে বর্ণ বা হরফকে বোঝালেও প্রকৃত প্রস্তাবে অক্ষর ও বর্ণ প্রতিশব্দ বা সমার্থক শব্দ নয়।

অক্ষর হচ্ছে – “নিশ্বাসের স্বল্পতম প্রয়াসে একই বক্ষ স্পন্দনের ফলে একবারে একত্রে উচ্চারিত ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ।” আর বর্ণ বা হরফ হচ্ছে ধ্বনির লিখিত রূপ।

ইংরেজিতে আমরা যাকে Sllyble  বলে থাকি , তাÑই অক্ষর । যেমন – Umbrella  শব্দটিতে  um +bre+lla তিনটি সিলেবল আছে। এই তিনটি সিলেবলই হলো অক্ষর । কিন্তু U+M +B + R +E + L+ L+ A আলাদাভাবে প্রতিটিই বর্ণ। তদ্রূপ, বাংলায় ‘মাতা ’ শব্দটিতে মা+তা দুটো সিলেবল, তাই দুটো অক্ষর। কিন্তু ম+আ +তা+আ প্রতিটি বর্ণ।

এক কথায়- এক প্রয়াসে উচ্চারিত ধ্বনিসমষ্টির নাম অক্ষর।

এ ক্ষেত্রে যদি একটি বর্ণ এক প্রয়াসে উচ্চারিত হয় , তাহলে সে ক্ষেত্রে একটি বর্ণ অক্ষর হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন – ‘অনবরত ’ শব্দে অ +ন +ব +র +ত  – প্রতিটি বর্ণই অক্ষর। 

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় : উচ্চারণ-স্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস:

যে ধ্বনি স্বরধ্বনির সাহায্য ছাড়া উচ্চারিত হতে পারে না, তাকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে।   ধ্বনিবিজ্ঞানীদের  ভাষায় Ñ  যে সব ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে ফুসফুস তাড়িত বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় কোথাও না কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় কিংবা ঘর্ষণ লাগে, তাদেরকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে। যেমন – ক, চ, জ, প ইত্যাদি।

ব্যঞ্জনধ্বনিকে বিভিন্নভাবে ভাগ করা যায়।

উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস

ক) কণ্ঠ্য বা জিহ্বামূলীয় ধ্বনি – জিহবার গোড়ালী ও কোমলতালুর সংস্পর্শে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে কণ্ঠ্য বা জিহŸামূলীয় ধ্বনি বলে। এক কথায় – কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত ব্যঞ্জনধ্বনিকে কণ্ঠ্যধ্বনি বলে। যেমন Ñ ক, খ, গ, ঘ, ঙ, হ।

খ) তালব্যধ্বনি :  জিহ্বার পাতা ও তালুর সম্মুখভাগের ঘর্ষণের ফলে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে তালব্যধ্বনি বলে। অর্থাৎ তালু থেকে উচ্চারিত ব্যঞ্জনধ্বনিকে তালব্যধ্বনি বলে। যেমন – চ, ছ, জ, ঝ, ঞ, শ, য।

গ)  মূর্ধন্যধ্বনি বা দন্তমূলীয় ধ্বনি: উপর-পাটি দাঁতের গোড়ার সাথে জিহবার ডগা  উল্টো করে লাগিয়ে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তাকে মূর্ধন্যধ্বনি বলে। মূর্ধা (উপরের মাড়ির গোড়ার শক্ত অংশ) থেকে উচ্চারিত ধ্বনিই মূর্ধন্যধ্বনি। যেমন – ট, ঠ, ড, ঢ, ণ, র, ষ ।

 ঘ) দন্ত্যধ্বনি :  জিহবার ডগা ও উপরের পাটির দাঁতের সংযোগে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে দন্ত্যধ্বনি বলে। অর্থাৎ উপরের পাটি দাঁত থেকে উচ্চারিত ধ্বনিই দন্ত্য ধ্বনি। যেমন – ত, থ, দ, ধ, ন, ল, স।

 ঙ) ওষ্ঠ্যধ্বনি:  দুই ঠোঁট দিয়ে বাতাস আটকিয়ে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে ওষ্ঠ্যধ্বনি বলে। সহজ কথায়, ঠোঁট থেকে উচ্চারিত ধ্বনিই ওষ্ঠ্যধ্বনি। যেমন – প, ফ, ব, ভ, ম ।

 চ) দন্তৌষ্ঠ্য ধ্বনিঃ নিচের ঠোঁট  উপর পাটি দাঁতের দিকে উঁচু করে যে ধ্বনি পাওয়া যায়, তাকে দন্তৌষ্ঠ্য ধ্বনি বলে।  যেমন- অন্তঃস্থ ধ্বনি । এরা খাঁটি স্বরধ্বনিও নয়, আবার খাঁটি ব্যঞ্জনধ্বনিও নয়। বাংলায় এ ধ্বনি পাওয়া যায় না।

ধ্বনিবিজ্ঞানে সূক্ষ্মভাবে উচ্চারণস্থান বিচারে  বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনিগুলির উচ্চারণস্থান নিম্নোক্তভাবে দেখানো হয়েছে-

ক) কণ্ঠনালীয়:   হ্                     
খ) কণ্ঠ্য বা  জিহ্বামূলীয় ধ্বনি:  ক্ খ্ গ্ ঘ্ ঙ্  ।
গ) প্রশস্ত দন্তমূলীয় ধ্বনি বা তালব্য ধ্বনি:   চ্ ছ্ জ্ ঝ্ ।        
ঘ) পশ্চাৎ দন্তমূলীয় ধ্বনি :   শ।
ঙ) তালবা-দন্তমূলীয় বা দন্তমূলীয় মূর্ধন্য বা দন্তমূলীয় প্রতিবেষ্টিত ধ্বনি:   ট , ঠ, ড, ঢ ড়, ঢ় ।
চ) দন্তমূলীয় ধ্বনি:   র , ল, ন ।                   
ছ) দন্ত্য ধ্বনি:    ত , থ , দ, ধ ।
জ) ওষ্ঠ্য-ধ্বনি:  প , ফ , ব, ভ,  ম ।

বাংলা স্বরধ্বনি: সংজ্ঞা, ধরন ও শ্রেণিবিন্যাস
বাংলা স্বরধ্বনি: সংজ্ঞা, ধরন ও শ্রেণিবিন্যাস

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় —- উচ্চারণ-রীতি অনুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস:

ক) স্পর্শ বা ¯পৃষ্টধ্বনি: যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময়  বাগযন্ত্রের যে-কোনো দুটো অঙ্গের স্পর্শ  লাগে, তাদেরকে স্পর্শ ধ্বনি বলে। এ স্পর্শ লাগে জিহ্বার সাথে বাগযন্ত্রের  বা বাগযন্ত্রের সাথে বাগযন্ত্রের কোনো না কোনো অংশের। স্পর্শধ্বনি ১৬টি বা কারো কারো মতে ২০ টি। কারো মতে ক থেকে ম পর্যন্ত ।

খ) ঘৃষ্ট বা ঘর্ষণজাতধ্বনি: যে ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের পাতা ও শক্ত তালুর ঘষা লাগে,  তাকে ঘৃষ্ট বাঘর্ষণধ্বনি বলে। যেমন – চ, ছ, জ, ঝ ।

গ) উষ্ম বা শিসধ্বনি: যে ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস মুখবিবরের সংকীর্ণ পথে ঘষা লেগে বা চাপা খেয়ে এক প্রকার শিসধ্বনির সৃষ্টি হয়, তাকে শিসধ্বনি বা উষ্মধ্বনি বলে। এক কথায় Ñ যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় শিস দেওয়ার মতো আওয়াজ হয়, তাকে শিসধ্বনি বলে। যেমন- স, শ, ষ ।

ঘ) পার্শ্বিকধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস জিভেয় বাধা পেয়ে জিভের দু’পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়. তাকে পাশ্বিক ধ্বনি বলে। যেমন- ল।

ঙ) কম্পনজাতধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের ডগায় কম্পনের সৃষ্টি হয় , তাকে কম্পনজাত বা কম্পনধ্বনি বলে। যেমন -র।

চ) তাড়নজাতধ্বনি ঃ যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিভের অগ্রভাগের উল্টো পিঠের দ্বারা উপরের দাঁতের গোড়ায় দ্রুত আঘাত বা তাড়না করা হয়, তাকে তাড়নজাতধ্বনি বলে। জিভের আগা তাড়না করা হয় বলে এ রকম নাম। যেমন – ড়, ঢ় ।

ছ) নাসিক্যধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস তাড়িত বাতাস মুখের কোনো জায়গায় বাধা পেয়ে নাক দিয়ে বের হয় এবং বাতাস নাকের দেয়ালে ঘষা লাগে, তাকে নাসিক্যধ্বনি বলে। যেমন – ঙ , ন, ম । (তবে বাংলায় বর্ণ আছে ঙ, ং, ঞ, ণ , ন, ম ।)

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়স্বরযন্ত্রের বা স্বরতন্ত্রীর অবস্থানুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস:

স্বরযন্ত্রের বা স্বরতন্ত্রীর অবস্থানুযায়ী ব্যঞ্জনধ্বনিকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়।

 যেমন – ঘোষধ্বনি ও অঘোষধ্বনি।

ঘোষধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরতন্ত্রী রীতিমত কেঁপে ওঠে , তাকে ঘোষধ্বনি বলে। যেমন – প্রতি বর্গের ৩য় ,৪র্থ, ও  ৫ম বর্ণ এবং  র, ল, ড়, ঢ়, হ।

অঘোষধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় স্বরযন্ত্রের ভেতরকার স্বরতন্ত্রী যথারীতি কাঁপে না, তাকে অঘোষধ্বনি বলে। যেমন-প্রতি বর্গের ১ম ও ২য় বর্ণ এবং শ ,স, ষ।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়——বাতাসের চাপের স্বল্পতা ও আধিক্যের দিক থেকে  ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস:

বাতাসের চাপের স্বল্পতা ও আধিক্যের দিক থেকে  ব্যঞ্জনধ্বনিকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

  যেমন – ১) অল্পপ্রাণ ও ২। মহাপ্রাণ ।

১। অল্পপ্রাণধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে বের হয় বা বাতাসের চাপের স্বল্পতা থাকে, তাকে অল্পপ্রাণ ধ্বনি বলে। যেমনÑ প্রতি বর্গের ১ম ও ৩য় বর্ণ এবং র, ল, ড়, ন, ম, ঙ, শ, স।

বাংলা বর্গীয় প্রথম (ক, চ, ট, ত, প), তৃতীয় ধ্বনি (গ,জ,ড, দ,ব), নাসিক্য ধ্বনি (ঙ, ন ,ম) তরল ধ্বনি (র, ল), তাড়ন (ড়) ও শিস ধ্বনি (শ, স) হলো অল্পপ্রাণ ধ্বনি ।

২। মহাপ্রাণধ্বনি: যে ধ্বনি উচ্চারণের সময় বাতাস বেশি পরিমাণে এবং জোরে বের হয় বা বাতাসের চাপের আধিক্য থাকে , তাকে মহাপ্রাণ ধ্বনি বলে। যেমন – প্রতি বর্গের ২য় ও ৪র্থ বর্ণ এবং ঢ় ,হ,ষ।

শ্বাসবায়ুকেই প্রাণ বলা । সে জন্যই অল্পপ্রাণ ও মহাপ্রাণ নামকরণ।

বাংলা বর্গীয় দ্বিতীয় ধ্বনি (খ ছ ঠ থ ফ ) চতুর্থ ধ্বনি (ঘ ঝ ঢ ধ ভ ) তাড়ন (ঢ়) , শিস (হ) মহাপ্রাণ ধ্বনি।

কোমল তালুর অবস্থান বিচারে ব্যঞ্জনধ্বনির বিভাজন:

কোমলতালুর অবস্থা অনুসারে ব্যঞ্জন ধ্বনিকে মৌখিক ও নাসিক্য  এই দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়।

ক) মৌখিক ধ্বনি: যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময়  কোমল তালু উপরে উঠে গিয়ে নাসিক্যপথ বন্ধ করে দেয় এবং বাতাস কেবল মুখ দিয়ে বের হয় , সে-সব ধ্বনিকে মৌখিক ধ্বনি বলে। বাংলা স্বরধ্বনিমাত্রই হচ্ছে মৌখিক। ঙ, ন, ম এই তিনটি নাসিক্য ধ্বনি ছাড়া বাকী সব মুল ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো মৌখিক ধ্বনি।

 খ) নাসিক্য ধ্বনি: যে-সব ধ্বনি উচ্চারণের সময় কোমল তালু নিচে নেমে আসে এবং ফুসফুস আগত বাতাস মুখের ভেতর বা দুই ঠোঁটের সাহায্যে সম্পূর্ণ রুদ্ধ হয়ে নাসারন্ধ্র দিয়ে বের হয়, সে-সব ধ্বনিকে নাসিক্য ধ্বনি বলে। কিছু নাসিক্য ধ্বনি উচ্চারণে অবশ্য বাতাস নাক ও মুখ দিয়ে একই সাথে বেরিয়ে যেতে পারে। বাংলা ঙ, ন, ম নাসিক্য ধ্বনি।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়মাত্রাভেদে

মাত্রা কী? মাত্রার দিক থেকে বাংলা বর্ণমালা।

স্বরবর্ণ বা ব্যঞ্জনবর্ণের মাথায় সোজা দাগ থাকলেই সেটাকে মাত্রা বলে।

মাত্রার দিক থেকে বাংলা স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ তিন ভাগে বিভক্ত । যথা:

ক) মাত্রাহীন বর্ণ– যে সব স্বর বা ব্যঞ্জন বর্ণের মাথায় মাত্রা হবে না, তাকে মাত্রাহীন বর্ণ বলে।

      যেমন-  স্বর – এ,  ঐ,  ও,  ঔ ।    ব্যঞ্জনঃ  ঙ, ঞ, ৎ , ং,  ঃ , ঁ ।  মাত্রাহীন বর্ণ মোট ১০ টি।

খ) অর্ধমাত্রার বর্ণ– যে সব স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের মাথায় আংশিক বা অর্ধেক মাত্রা হয় , তাকে অর্ধমাত্রার বর্ণ বলে।

যেমন- স্বর-ঋ    ব্যঞ্জন- খ, গ, ণ, থ, ধ, প, শ।    অর্ধমাত্রার বর্ণ মোট ৮ টি।

গ) পূর্ণমাত্রার বর্ণ: যে সব স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণের মাথায় পূর্ণ দাগ দেয়া হয় বা পূর্ণমাত্রা হয়, তাদেরকে পূর্ণমাত্রার বর্ণ বলে। যেমন- স্বর- অ, আ, ই, ঈ, উ, ঊ । ব্যঞ্জন: ক, ঘ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, দ, ন, ফ, ব, ভ, ম, য, র, ল, ষ, স, হ, ড়, ঢ়,  য়।

লেখার ক্ষেত্রে বর্ণের মাত্রার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ‘এ’  কিংবা ‘ও’ বর্ণের ওপরে মাত্রা থাকে না । মাত্রা দেয়া হলে ‘এ’ এবং ‘ও’ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধ্বনি বা অক্ষর হয়ে যাবে। ‘এ’-এর মাথায় মাত্রা দিলে ‘এ’ হয়ে যাবে ত-য়ে র-ফলা (ত্র)। আর ‘ও’ হয়ে যাবে ত-য়ে ত (ত্ত)। এ দুটো এর স্বরবর্ণ থাকে না, হয়ে যায় যুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণ।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়—– বর্গীয় বর্ণ

বর্গ কী ? বর্গীয় বর্ণের পরিচয়:

বাংলা বর্ণমালায় ক থেকে ম পর্যন্ত এই পঁচিশটি বর্ণকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রতিটি ভাগকে বলা হয় বর্গ। প্রতিটি বর্গের প্রথম বর্ণ অনুযায়ী বর্গের নামকরণ করা হয়ে থাকে। যেমন –

ক-বর্গ  : ক, খ, গ, ঘ,  ঙ
চ-বর্গ   : চ, ছ, জ, ঝ, ঞ
ট -বর্গ  : ট, ঠ, ড, ঢ, ণ
ত -বর্গ : ত, থ, দ, ধ, ন
প- বর্গ : প, ফ, ব, ভ, ম

বর্গের অন্তর্গত প্রতিটি বর্ণকে বলা হয় বর্গীয় বর্ণ। (বর্গীয় বর্ণের সংখ্যা ২৫ । সংখ্যাটি একটি বর্গ সংখ্যা । আবার বর্গীয় বর্ণগুলোকে সাজালে সবদিকে ৫টি করে বর্ণ হয়। সবদিকে ৫ সংখ্যা । এটি বর্গক্ষেত্র সম্পর্কিত ধারণা।)

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়—–মৌলিক স্বর:

ফুসফুস তাড়িত বাতাস মুখবিবর দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় শ্রুতিগ্রাহ্য চাপা না খেয়ে ঘোষবৎ যে ধ্বনি উদগত হয়, তা-ই স্বরধ্বনি। এভাবে সৃষ্ট স্বরকেই মূলস্বর বলে।

মৌলিক স্বরধ্বনি পৃথিবীর কোন ভাষার স্বরধ্বনি নয়। বিভিন্ন ভাষার স্বরধ্বনি বিচারের জন্য এই মৌলিক স্বরধ্বনির উদ্ভব। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কোন একটি ভাষার স্বরধ্বনি উচ্চারণের অবস্থান নির্ণয়ের এটি একটি মানদণ্ড।

বাংলা ভাষার উচ্চারণে মোট সাতটি মৌলিক স্বরধ্বনি পাওয়া যায়। যথাঃ অ, আ, ই, এ, এ্যা এবং ও । ঈ এবং ঊ- এ দুটি ধ্বনির লিখিত রূপ থাকলেও উচ্চারণে পাওয়া যায় না । যেমন – বাড়ি ও বাড়ী। এখানে ই ও ঈ এর হ্রস্বতা ও দীর্ঘতার পার্থক্য নেই। তেমনি উ এবং ঊ এর উচ্চারণে কোনো পার্থক্য নেই। ঐ এবং ঔ- এ দুটি যৌগিক স্বর। ঐ =অ+ই (উচ্চারণে ও+ই) , ঔ = অ+উ (উচ্চারণে ও+উ) , ঋ স্বরধ্বনিই নয় – ঋ-কে ‘রি’ হিসেবে লেখা যায়।  লিখিত রূপ না থাকলেও বাংলায় ‘এ্যা ’ একটি স্বরধ্বনি। যেমন- দেখা -দ্যাখা ।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়—– দ্বি-স্বরধ্বনিঃ

পাশাপাশি দুটি স্বরধ্বনি থাকলে দ্রুত উচ্চারণের সময় তা একটি সংযুক্ত স্বরধ্বনিরূপে উচ্চারিত হয়, এ ভাবে এক সঙ্গে উচ্চারিত দুটো স্বরধ্বনিকে যৌগিক বা দ্বি-স্বরধ্বনি বলে । একে সন্ধিস্বর বা সান্ধ্যক্ষরও বলে।

 যেমন- ঐ এবং ঔ । বাংলায় মোট দ্বি-স্বরধ্বনি ৩১টি। চিহ্ন আছে মাত্র দুটি।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়—–অর্ধ-স্বরধ্বনিঃ

পাশাপাশি দুটো স্বরধ্বনি দ্রুত উচ্চারণের সময় দুটো স্বরধ্বনির মাঝে একটা অস্পষ্ট পিচ্ছিল ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকেই অর্ধ-স্বরধ্বনি বলে। বাংলায় য়’শ্রুতি, ব’ শ্রুতি এবং ই ’ শ্রুতিকেই এক প্রকার  অর্ধ-স্বরধ্বনি ধরা হয় ।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়——অন্তঃস্থ ধ্বনিঃ

যে-সব ধ্বনির উচ্চারণস্থান স্পর্শ ও উষ্মধ্বনির মাঝামাঝি তাকে অন্তঃস্থ ধ্বনি এবং এদের প্রতীককে অন্তঃস্থ বর্ণ বলে। যেমন – য, র, ল, ব।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়—-ব্যঞ্জনধ্বনি:

ব্যঞ্জনধ্বনি: যে ধ্বনি স্বরধ্বনির সাহায্য ছাড়া উচ্চারিত হতে পারে না , তাকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে। ধ্বনিবিজ্ঞানীদের ভাষায় –  যে সব ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে ফুসফুস তাড়িত বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় কোথাও না কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় কিংবা ঘর্ষণ লাগে, তাদেরকে ব্যঞ্জনধ্বনি বলে। যেমন – ক, চ, জ, প ইত্যাদি।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়: মাপকাঠি বিষয়

ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপকাঠি কয়টি ও কী কী ?

প্রতিটি ব্যঞ্জনধ্বনিই একে অন্য থেকে পৃথক। এই স্বাতন্ত্র্য বিচারের জন্য রয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া । প্রচলিত অর্থে একে ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপাকাঠি বলে। ব্যঞ্জনধ্বনি বিচারের মাপিকাঠি পাঁচটিÑ

১, উচ্চারণ স্থান বিচার
২.  উচ্চারণরীতি বিচার (উচ্চারণ প্রক্রিয়া)
৩. কোমল তালুর অবস্থা বিচার
৪. স্বরতন্ত্রের অবস্থা বিচার
৫. বাতাসের চাপের আধিক্য বিচার

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়: স্পৃষ্ট ধ্বনি

স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনির সংজ্ঞা:

স্পর্শ বা ¯পৃষ্টধ্বনি ঃ যে সব ধ্বনি উচ্চারণের সময়  বাগযন্ত্রের যে-কোনো দুটো অঙ্গের স্পর্শ  লাগে, তাদেরকে স্পর্শ ধ্বনি বলে। এ স্পর্শ লাগে জিহŸার সাথে বাগযন্ত্রের  বা বাগযন্ত্রের সাথে বাগযন্ত্রের কোনো না কোনো অংশের। স্পর্শধ্বনি ১৬টি বা কারো কারো মতে ২০ টি। প্রচলিত ব্যাকরণে  ক থেকে ম পর্যন্ত ।

উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী বাংলা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস:

উচ্চারণ স্থান অনুযায়ী বাংলা স্পৃষ্ট ব্যঞ্জনধ্বনির শ্রেণীবিন্যাস নিম্নে আলোচনা করা হলো ।

ক) কণ্ঠ্য বা জিহ্বামূলীয় ধ্বনি: জিহবার গোড়ালী ও কোমলতালুর সংস্পর্শে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় তাকে কণ্ঠ্য বা জিহŸামূলীয় ধ্বনি বলে। এক কথায় – কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত ব্যঞ্জনধ্বনিকে কণ্ঠ্যধ্বনি বলে। যেমন – ক, খ, গ, ঘ।

         খ) তালব্যধ্বনি: জিভের পাতা ও তালুর সম্মুখ ভাগের ঘর্ষণের ফলে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে তালব্যধ্বনি বলে। অর্থাৎ, তালু থেকে উচ্চারিত ব্যঞ্জনধ্বনিকে তালব্যধ্বনি বলে। যেমন – চ, ছ, জ, ঝ।

        গ)  মূর্ধন্যধ্বনি বা দন্তমূলীয় ধ্বনি ঃ উপর-পাটি দাঁতের গোড়ার সাথে জিহবার ডগা  উল্টো করে লাগিয়ে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে মূর্ধন্যধ্বনি বলে। মূর্ধা (উপরের মাড়ির গোড়ার শক্ত অংশ) থেকে উচ্চারিত ধ্বনিই মূর্ধন্যধ্বনি। যেমন – ট, ঠ ,ড ,ঢ ।

      ঘ) দন্ত্যধ্বনি ঃ জিহবার ডগা ও উপরের পাটির দাঁতের সংযোগে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তাকে দন্ত্যধ্বনি বলে। অর্থাৎ, উপরের পাটি দাঁত থেকে উচ্চারিত ধ্বনিই দন্ত্য ধ্বনি। যেমন – ত, থ, দ, ধ।

       ঙ) ওষ্ঠ্যধ্বনি ঃ দুই ঠোঁট দিয়ে বাতাস আটকিয়ে যে ধ্বনি উচ্চারিত হয় , তাকে ওষ্ঠ্যধ্বনি বলে। সহজ কথায় , ঠোঁট থেকে উচ্চারিত ধ্বনিই ওষ্ঠ্যধ্বনি। যেমন – প, ফ, ব, ভ।

       যারা চ ছ জ ঝ এই চারটিকে ঘৃষ্ট ধ্বনি হিসেবে বিবেচনা করেন তাদের মতে স্পৃষ্ট ধ্বনি ১৬ টি।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় : ফলা ও কার

কার ও ফলা :

স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে কার বলে। যেমন আ – া -কার, ই- -িকার ইত্যাদি।

ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে ফলা বলে। যেমন – ম-ফলা, য-ফলা, র-ফলা, ব-ফলা ল-ফলা।

অনুনাসিক/ আনুনাসিক/সানুনাসিক ধ্বনি ও বর্ণ: চন্দ্রবিন্দু চিহ্ন বা  প্রতীকটি স্বরধ্বনির অনুনাসিকতার দ্যোতনা করে। এজন্য এটিকে অনুনাসিক ধ্বনি এবং প্রতীকটিকে অনুনাসিক প্রতীক বা চিহ্ন বলে। যেমন – আঁক, চাঁদ।

বিসর্গ : বিসর্গ হলো হ ধ্বনির অঘোষ উচ্চারণ। অর্থাৎ হ ঘোষ আর বিসর্গ হলো অঘোষ। বিষ্ময়বোধক শব্দেই বিসর্গের উচ্চারণ পাওয়া যায়। 

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় : স্বরধ্বনি

স্বরধ্বনির সংজ্ঞা  ও  স্বরধ্বনি বিচারের মাপকাঠি :

স্বরধ্বনি: যে ধ্বনি অন্য ধ্বনির সাহায্য ছাড়া নিজে নিজে উচ্চারিত হতে পারে, তাকে স্বরধ্বনি বলে। ধ্বনিবিজ্ঞানীদের ভাষায় – যে সব ধ্বনি উচ্চারণের ক্ষেত্রে  ফুসফুস তাড়িত বাতাস বেরিয়ে যাবার সময় কোথাও কোনো প্রকার বাধা পায় না , তাদেরকে স্বরধ্বনি বলে।  যেমন Ñ অ, আ, উ , এ ইত্যাদি।

প্রতিটি স্বরধ্বনিই একে অন্য থেকে পৃথক। এই স্বাতন্ত্র্য বিচারের জন্য রয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক  প্রক্রিয়া । প্রচলিত অর্থে একে স্বরধ্বনি বিচারের মাপাকাঠি বলে। স্বরধ্বনি বিচারের মাপিকাঠি নিম্নরূপ :

১. জিভের অবস্থা ;
২. জিভের উচ্চতা ;
৩. ঠোঁটের অবস্থা ;
৪. কোমল তালুর অবস্থা এবং
৫. চোয়ালের অবস্থা ।

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়: বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনি

বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা :

মৌলিক স্বর: ফুসফুস তাড়িত বাতাস মুখবিবর দিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় শ্রুতিগ্রাহ্য চাপা না খেয়ে ঘোষবৎ যে ধ্বনি উদগত হয়, তা-ই স্বরধ্বনি। এভাবে সৃষ্ট স্বরকেই মূলস্বর বলে।

         মৌলিক স্বরধ্বনি পৃথিবীর কোন ভাষার স্বরধ্বনি নয়। বিভিন্ন ভাষার স্বরধ্বনি বিচারের জন্য এই মৌলিক স্বরধ্বনির উদ্ভব। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কোন একটি ভাষার স্বরধ্বনি উচ্চারণের অবস্থান নির্ণয়ের এটি একটি মানদÐ।

     বাংলা ভাষার উচ্চারণে মোট সাতটি মৌলিক স্বরধ্বনি পাওয়া যায়। যথাঃ অ, আ, ই, এ, এ্যা এবং ও । ঈ এবং ঊ- এ দুটি ধ্বনির লিখিত রূপ থাকলেও উচ্চারণে পাওয়া যায় না । যেমন – বাড়ি ও বাড়ী। এখানে ই ও ঈ এর হ্রস্বতা ও দীর্ঘতার পার্থক্য নেই। তেমনি উ এবং ঊ এর উচ্চারণে কোনো পার্থক্য নেই। ঐ এবং ঔ- এ দুটি যৌগিক স্বর। ঐ =অ+ই (উচ্চারণে ও+ই), ঔ = অ+উ (উচ্চারণে ও+উ), ঋ স্বরধ্বনিই নয় – ঋ-কে ‘রি’ হিসেবে লেখা যায়।  লিখিত রূপ না থাকলেও বাংলায় ‘এ্যা ’ একটি স্বরধ্বনি। যেমন- দেখা Ñদ্যাখা ।

বাংলায় মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ড্যানিয়েল জোনসের মতানুসারে মুহম্মদ আবদুল হাই বাংলায় মোট আটটি স্বরধ্বনির কথা বলেছেন।

যেমন – ই , এ, অ্যা  , আ, অ , ও , ও’(অভিশ্রুতি ও) এবং উ ।

আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ এর মতে –

বাংলায় সাতটি মৌলিক স্বরধ্বনির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। এগুলি যথাক্রমে ই , এ , এ্যা , আ, অ, ও , উ।

পবিত্র সরকারের মতে –

আমাদের মান্য চলিত বাংলায় মুখে আমরা সাতটি স্বরধ্বনি উচ্চারণ করি – অ , আ, অ্যা, এ, ও, ই, উ।
আমাদের মতেও বাংলা ভাষার মৌলিক স্বরধ্বনির সংখ্যা সাতটি। যথা- ই, এ, এ্যা, আ, অ, ও, উ। 

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়—–স্বরধ্বনির সংবৃত ও বিবৃত উচ্চারণ:

অ স্বরধ্বনির দুটো উচ্চারণ – একটা বিবৃত বা স্বাভাবিক উচ্চারণ  অর্থাৎ অ-এর মতো।
যেমন – অনেক – অনেক। আরেকটি সংবৃত বা বিকৃত উচ্চারণ অর্থাৎ ও -এর মতো উচচারণ – মতি >মোতি।

এ- ধ্বনির উচ্চারণ দুটো – এ এবং এ্যা। সংবৃত ও বিবৃত।

সংবৃত উচ্চারণ – পথে, ঘাটে।
বিবৃত উচ্চারণ – দেখ – দ্যাখ, যেন – য্যানো ।

১. জিভের অবস্থানুসারে বাংলা স্বরধ্বনি বিচার🙁ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়)

     জিভের কোন্ অংশের সাহায্যে স্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়, তার বিচারে বাংলা স্বরধ্বনি তিন রকমের। যথা:

ক) সম্মুখ স্বরধ্বনি , খ) মধ্য স্বরধ্বনি ও  গ) পশ্চাৎ স্বরধ্বনি।

ক) সম্মুখ স্বরধ্বনি : জিভের সামনের অংশ থেকে উচ্চারিত —- ই, এ, অ্যা – এ জাতীয় স্বরধ্বনি।
খ) মধ্য স্বরধ্বনি: জিভের স্বাভাবিক অবস্থায় – জিভ সামনে ও পেছনে না সরে উচ্চরিত যেমন – আ।
গ) পশ্চাৎ স্বরধ্বনি: জিভের পেছনের অংশের সাহায্যে উচ্চারিত-         যেমন – অ, ও, উ।

২. জিভের উচ্চতা অনুসারে: (অর্থাৎ জিভে কতটুকু উঁচু করা হয়। )

     জিভের উচ্চতা অনুসারে স্বরধ্বনিগুলোকে এভাবে ভাগ করা যায়। যেমন –

ক) উচ্চ স্বরধ্বনি : যে স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারণে জিভ সবচেয়ে উপরে ওঠে ,  যেমন – ই, উ।
খ) উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি : যে স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময় জিভ নিম্ন-স্বরধ্বনির তুলনায় উপরে এবং উচ্চ-স্বরধ্বনির তুলনায় নিচে থাকে,  বাংলা এ, ও  উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনি।
গ) নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি : এ-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ কালে জিভ উচ্চ-মধ্য স্বরধ্বনির তুলনায় নিচে এবং নিম্ন-স্বরধ্বনির চেয়ে উপরে ওঠে। বাংলা  অ্যা,  অ  নিম্ন-মধ্য স্বরধ্বনি।
ঘ) নিম্ন-স্বরধ্বনি: এ জাতীয় স্বরধ্বনিগুলো উচ্চারণের সময় জিভ সবচেয়ে নিম্নে অবস্থান করে। বাংলা আ, এ জাতীয় স্বরধ্বনি।

জিভের উচ্চতাজিভের অবস্থা
সম্মুখ মধ্যপশ্চাৎ
উচ্চ
উচ্চ-মধ্য
নিম্ন-মধ্যএ্যা
নিম্ন

জিভের উচ্চতা ও অবস্থা অনুসারে বাংলা স্বরধ্বনি।

৩. ঠোঁটের অবস্থা অনুসারে:(ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়)

ক) গোলাকৃত স্বরধ্বনি: যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণ-কালে ঠোঁট গোলাকার ধারণ করে,  যেমন – অ, ও, উ স্বর।
খ) অগোলাকৃত স্বরধ্বনি:  ঠোঁট গোল না হয়ে প্রসৃত অবস্থায় থাকে,  যেমন – ই , এ,  অ্যা  স্বর।

ঠোঁটের উন্মুক্তি বিচারে বাংলা স্বরধ্বনিগুলোকে চারটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন –

ক) বিবৃত স্বরধ্বনি,  খ) অর্ধ-বিবৃত স্বরধ্বনি,  গ) অর্ধ-সংবৃত স্বরধ্বনি  এবং ঘ) সংবৃত স্বরধ্বনি।
ক) বিবৃত স্বরধ্বনি – যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণে ঠোঁট সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে;
খ) অর্ধ-বিবৃত স্বরধ্বনি : বিবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় ঠোঁট কম খোলা;
গ) অর্ধ-সংবৃত স্বরধ্বনিঃ যে-সব স্বর সংবৃত স্বরধ্বনির তুলনায় ঠোঁট বেশি খোলা থাকে;
ঘ) সংবৃত স্বরধ্বনিঃ যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় ঠোঁট সবচেয়ে কম খোলা থাকে;

ঠোঁটের অবস্থাজিভের অবস্থা
সম্মুখমধ্যপশ্চাৎ
সংবৃত
অর্ধ-সংবৃত
অর্ধ-বিবৃতএ্যা
বিবৃত
আধুনিক ভাষাতত্ত্ব

                                                ঠোঁটের উন্মুক্তি অনুযায়ী বাংলা স্বরধ্বনি। 

৪. কোমল তালুর অবস্থা বিচারে: (ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়)

  ক. মৌখিক    ও        খ. অনুনাসিক ।

ক. মৌখিকঃ যে স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস তাড়িত বাতাস কেবল মুখ দিয়ে নির্গত হয়, তা-ই মৌখিক স্বরধ্বনি।

খ. অনুনাসিকঃ যে-সব স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় কোমল তালু নিচে নেমে যায় এবং বাতাস মুখ ও নাক দিয়ে যুগপৎভাবে বেরিয়ে যায়, সে-সব স্বরধ্বনিই এ জাতীয় স্বরধ্বনি।

বাংলা মৌলিক স্বরধ্বনিগুলো মৌখিক ও অনুনাসিক দু’রকমই হতে পারে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় মৌলিক স্বরধ্বনিগুলো মৌখিক স্বরধ্বনি। অনুনাসিক স্বরধ্বনির দৃষ্টান্ত-

ইঁ – বিঁধি (বিদ্ধ করা ), এঁ – এঁরা,  অ্যাঁ – ট্যাঁক (থলে ), আঁ- বাঁকা (বক্র), অঁ – গঁদ (আঠা ), ওঁ – তাঁরা,     উঁ -কুঁড়ি (ফুলের কলি ) ।

৫. চোয়ালের অবস্থা – (ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয়)

চোয়ালের অবস্থা অনুসারে স্বরধ্বনিগুলোকে দৃঢ় ও শিথিল এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়।

ফলার নামকরণ : ব্যঞ্জনের সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ফলা। যে ব্যঞ্জন সংক্ষিপ্ত হয়, তার নাম অনুসরণে ফলার নামকরণ হয়। যেমনÑ র সংক্ষিপ্ত হয়ে র-ফলা (  ্র)। র ফলা ব্যঞ্জনের পরে বসলে র-ফলা হয়, আর ব্যঞ্জনের আগে হলে রেফ-ফলা হয়। যেমনÑর্  +ক =র্ক, আর ক+র্  = ক্র।

নাসিক্য ধ্বনি- ঙ, ঞ, ণ, ন, ম,  এ পাঁচটি ঘোষ অল্পপ্রাণ।

প্রকৃত নাসিক্য ধ্বনি হলো Ñ ঙ, ন, ও ম। ঞ , ণ -এর  উচ্চারণ ন এর মতো।

উপসংহার:

ধ্বনি ও বর্ণের পরিচয় ব্যাপক। প্রচলিত অর্থে অনেকেই মনে করেন ধ্বনি ও বর্ণের কোনো পার্থক্য নেই। নিবন্ধটি ধ্বনি, বর্ণ, অক্ষক, স্বরবর্ণ, স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনবর্ণ, ব্যঞ্জনধ্বনি, মাত্রা, কার, ফলা, মাপকাঠি, মৌলিক স্বর ইত্যাদি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *