আখ্যান বিশ্লেষণে মোটিফ ও টাইপের ভূমিকা


মোটিফ ও টাইপ : ধারণা ও সাহিত্যিক তাৎপর্য
মোটিফ ও টাইপ : প্রতিটি জাতির প্রাণের মূল সুরটি নিহিত থাকে তার মাটির রস মিশ্রিত লোক সাহিত্যের মধ্যে। তাই লোক সাহিত্য মানুষের প্রাণের সাহিত্য। পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর মানুষ তার ভাষার লোক-সাহিত্যের মধ্যে নিজস্ব ঐতিহ্যকে খুঁজে ফেরে। বর্তমানে সব দেশেই তাদের লোক সাহিত্যের পঠন-পাঠন শুরু হয়েছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও রীতিতে লোক-সাহিত্যের সংগ্রহ ও সম্পাদনার মাধ্যম গবেষণা করা হচ্ছে।
লোক সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বজন আকর্ষণীয় শাখা হলো রূপকথা বা লোক কাহিনি। তাই লোকসাহিত্য গবেষণার ক্ষেত্রে লোক কাহিনিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। সারা পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর রূপকথা বা লোক কাহিনির গবেষকরা দেখেছেন যে, যে দেশেরই হোক না কেন একই জাতীয় লোককাহিনির মধ্যে দেশ-জাতি-নির্বিশেষে কিছু সাধারণ উদ্দিষ্ট থাকে। যেসব উদ্দিষ্ট লোককাহিনিকে পরিণতি দেয়, লোক সাহিত্যের আঙিনায় তাকে মোটিফ বা উদ্দিষ্ট নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।মোটিফ ও টাইপ লোক কাহিনির বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।


মোটিফ ও টাইপ : আলোচনা (Motif) ও (Type)
আখ্যান, চরিত্র ও বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্ত উপাদান বিশ্লেষণে সাহিত্যে বা লোকসাহিত্যে মোটিফ ও টাইপ শব্দদুটি ব্যবহৃত হয়।
মোটিফ: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অসংখ্য লোক কাহিনি রয়েছে। প্রতিটি লোক-কাহিনির এক বা একাধিক মূল বিষয় আছে। ইংরেজিতে মূল বিষয়গুলোকে Motives বলা হয়। কিন্তু ফরাসি ভাষায় Motif শব্দটিই লোক কাহিনির মূল বিষয়গুলোকে বোঝানোর জন্য সর্বত্র স্বীকৃতি লাভ করেছে। ডঃ মযহারুল ইসলাম তাঁর ‘ফোকলোর ; পরিচিত ও পঠন-পাঠন’ গ্রন্থে মোটিফ সম্পর্কে বলেছেন
“একটি লোক কাহিনির গল্পাংশকে ভেঙে শব-ব্যবচ্ছেদের ন্যায় কাহিনি ব্যবচ্ছেদ করে যখন তার মূল একটি বা একাধিক গল্পাংশ পাওয়া যায়, তখন সেই মূল গল্পাংশ বা গল্পাংশ পাওয়া যায়, তখন সেই মূল গল্পাংশ বা গল্পাংশ পাওয়া যায়, তখন সেই মূল গল্পাংশ বা গল্পাংশ সমূহকে আমরা মোটিফ বলবো।”
সাহিত্যের এমন পুনরাবৃত্ত বা চিহ্নিত উপাদান, যা কোনো নির্দিষ্ট ভাব, অনুভূতি বা ঘটনার ইঙ্গিত বহন করে তাকে মোটিফ বলে। এটি গল্পের ভেতর দিয়ে বারবার ফিরে আসে, ফলে পাঠকের মনে একটি বিশেষ ভাবধারা জাগিয়ে তোলে।
যেমন বলা যেতে পারে-
, “আলো–অন্ধকার” বা “যাত্রা–ফেরা” অনেক গল্পে ঘুরে ফিরে আসে এবং একটা আবহ সৃষ্টি করে, যা জীবনের দ্বন্দ্ব বা অনুসন্ধানের প্রতীক হয়ে ওঠে। এই যে, আলো-আঁধার বা যাত্রা-ফেরা গল্পের মধ্যে পুনরাবৃত্ত হয়, তা হলো মোটিফ। রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ গল্পে ‘ছুটি’ শব্দটিই স্বাধীনতার এক প্রতীকী মোটিফ।
মোটিফ একটি লোক কাহিনির খন্ড খন্ড মৌলিক গল্পাংশ যা সমগ্র কাহিনিটিকে অখন্ড সূত্রে গড়ে তোলো। এই খন্ড খন্ড মৌলিক গল্পাংশগুলো যেমন একটি পূর্ণাঙ্গ কাহিনি গড়ে তোলে তেমনি এই প্রত্যেকটি গল্পাংশের এক একটি স্বাধীন বৈশিষ্ট্য আছে। এই স্বাধীন বৈশিষ্ট্য কালের প্রবাহকে অস্বীকার করেও জীবিত থাকে। আমেরিকার বিখ্যাত পন্ডিত স্টিথ থম্পসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লোক কাহিনি পর্যালোচনা করে প্রায় বারো হাজার মূল মোটিফ ছয় খন্ডে “Motif Index of Folk Literature” প্রকাশ করেছেন। তিনি মোটিফের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন-
“A motif is the smallest element in a tale having a power to persist in tradition, In order to have this power it must have something unusual and striking about it.”
টাইপ: ডক্টর মযহারুল ইসলাম ‘ফোকলোর; পরিচিতি ও পঠন-পাঠন’ গ্রন্থে টাইপ সম্পর্কে বলেছেন-
“লোককাহিনির মেজাজ ও চারিত্র্যে বিচারে দেখা যায় যে, এর এক একটি এক এক টাইপ বা বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত। টাইপ বলতে আমরা বুঝবো এক একটি কাহিনির বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে যে বৈশিষ্ট্য তাকে অন্য একটি কাহিনি থেকে স্বতন্ত্র অবয়ব কাহিনি ও মেজাজে দান করে।”
“পৃথিবীতে যত লোক-কাহিনি প্রচলিত আছে তার প্রত্যেকটি আপন আপন নিজস্বতায় এককÑ এই এককতাই তার টাইপ।”
টাইপের উক্ত সংজ্ঞার আলোকে বলা যায় যে লোক-কাহিনির মধ্যে যে এক বা একাধিক মোটিফ থাকে, তাকেও একটি বিশেষ টাইপ বলা যেতে পারে। সাধারণত যে লোককাহিনির মধ্যে একটি মোটিফ থাকে, সেগুলো সহজ ও সরল হয়, আর একাধিক, বিশেষ করে বহু মোটিফ বিশিষ্ট কাহিনিগুলো জটিল রূপ ধারণ করে। প্রাণীবাচক লোক কাহিনিগুলোর মধ্যে একটি মোটিফ থাকে। রূপকথা, পরীকাহিনিতে বহু মোটিফ থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লোককাহিনির টাইপ বা বৈশিষ্ট্য অনুসারেই তাদের একটা তালিকা প্রণয়ন করে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়।
কোনো বিশেষ ধরনের চরিত্র বা ঘটনার রূপ যা বারবার সাহিত্যে দেখা যায় এবং এক ধরনের আদর্শ বা শ্রেণিকে প্রতিনিধিত্ব করে, আমরা সাধারণত তাকেই টাইপ বলি। যেমন— “নায়ক”, “নির্যাতিতা নারী”, “বঞ্চিত দরিদ্র”, “ভণ্ড ধর্মগুরু” প্রভৃতি চরিত্রের ধরন টাইপের উদাহরণ।
টাইপ সাহিত্যকে সামাজিক বাস্তবতার এক সামষ্টিক রূপ দেয়; যেমন শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ চরিত্রটি একধরনের “অক্ষম রোমান্টিক নায়ক” টাইপ হয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যে।
যে-কোন একটি মোটিফ সংখ্যায় অনেক হতে পারে তবে মোটিফগুলো এক জাতের রূপকথায় সর্বদেশে সর্বকালে এক রূপ লাভ করে। যেমন-
এক ধরনের লোক কাহিনিতে দেখা যায় রাজা-রানির কোনো সন্তান থাকে না, বৈদবলে ঔষধ খেয়ে শর্তের বিনিময়ে সন্তান লাভ করে, পরে শর্ত লঙ্ঘন, রাজপুত্রের বিদেশ ভ্রমণ, পথে অনেক বাঁধা অতিক্রম, জেন-পরী, রক্ষস-খোক্ষসের সাথে যুদ্ধ, জয়লাভ, পুরষ্কার, রাজ্য, রাজকন্যা লাভ, দেশে ফেরা, সুখে জীবন যাপন ইত্যাদি। কাহিনির মধ্যে একটা ভিন্নতা থাকলেও উদ্দিষ্ট ও বৈশিষ্ট্য প্রায় একই থাকে।
লোকসাহিত্যে মোটিফ ও টাইপের প্রকাশ
মোটিফ গুলোর একটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত রয়েছে। রয়েছে আন্তর্জাতিক সংকেত। বহুল প্রচলিত মোটিফগুলোর আন্তর্জাতিক সংকেত সহ নাম ও ধরণ প্রদান করা হলো-
A- মৃত, B- জীবজন্তু, C- বিধি নিষেধ, D- ম্যাজিক, E- মৃত, F – অসাধ্য সাধন, G- রাক্ষস-খোক্কস, দৈত্য দানব, H- পরীক্ষা-প্রতিযোগিতা, I- চালাক-বোকা, J- মিথ্যা, ভাওতা, K- নিয়তি, L- ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা, M- সমাজ, N- পুরস্কার, শাস্তি, O- বন্দী P মক্তি, Q- জন্ম ইত্যাদি।
প্রত্যেক মোটিফ আবার হাজার হাজার ধরনের। একটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যাকÑ ধরা যাক নিঃসন্তান রাজা-রানি সন্তান লাভ- এ মূল বিষয় নিয়ে কোনো লোক কাহিনি পড়ে উঠেছে। এ মোটিফটি মনে করি P-এর অন্তর্ভূক্ত। এ মোটিফটি বা মূল বিষয়টি যত রকমের হতে পারে তাÑ
১) সন্ন্যাসীর পানি পড়া খেয়ে সন্তান লাভ করা।
২) কোনো ফল খেয়ে সন্তান লাভ করা।
৩) আপেল খেয়ে সন্তান লাভ করা।
৪) পাখির মাংস খেয়ে সন্তান লাভ করা।
৫) সূর্যের আলো থেকে সন্তান লাভ করা।
৬) পূজো করে সন্তান লাভ করা।
৭) ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে সন্তান লাভ করা।
৮) গাছের শিকড়, লতা, পাত খেয়ে সন্তান লাভ করা।
৯) মন্ত্র উচ্চারণ করে সন্তান লাভ করা ইত্যাদি।
বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশের লোক সাহিত্য বিশ্লেষণ করলে অলৌকিক জন্ম মোটিফের আরও হাজার হাজার কাহিনি পাওয়া যেতে পারে।
লোকসাহিত্যে মোটিফ ও টাইপ লোককথা ও লোকগীতে পুনরাবৃত্ত ধারা ও প্রতীকী উপাদান
লোকসাহিত্য এমন এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যেখানে মানুষের যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস, আশা–আকাঙ্ক্ষা ও জীবনদর্শন প্রজন্মের পর প্রজন্মে কথার, গানের ও রীতির মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়। লোকসাহিত্যের আবহমান ধারা বুঝতে বা পঠন-পাঠনের জন্য বা গবেষণার জন্য বা শ্রেণিবিন্যাস করার জন্য টাইপ (Type) ও মোটিফ (Motif)— দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণধর্মী ধারণা।
লোকসাহিত্যে টাইপ (Type):
টাইপ হলো কোনো নির্দিষ্ট চরিত্র, ঘটনা বা আখ্যান-ধারার আদর্শরূপ, যা বহু লোকগাথা বা লোককথায় পুনরাবৃত্ত হয়। লোকসাহিত্যের টাইপ সাধারণত সমাজমানস ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে প্রতিনিধিত্ব করে।
উদাহরণস্বরূপ —
দুঃখিনী বধূ, বঞ্চিত রাজকন্যা, বীর নায়ক, চতুর বুদ্ধিমান দরিদ্র, বা অলৌকিক সহায়তাকারী দেবতা — এগুলো লোকসাহিত্যের বহুল প্রচলিত চরিত্র-টাইপ। এ ধরনের চরিত্র অনেক গল্পেই ঘুরে ফিরে এসেছে।
‘লক্ষ্মীর প্রতিমা’ বা ‘কানা বউ’ গল্পে বঞ্চিত ও অবহেলিত নারীর যে চরিত্র পাওয়া যায়, তা এক অনন্য নারী-টাইপ, যা করুণা ও ন্যায়বোধের প্রতীক। সমাজে তাদের ধৈর্য ও সহিঞ্চুতা অন্যদের কাছে অনুস্মরণীয় হয়ে ওঠে। তাদের প্রতি সকলেরই হৃদয়ে করুণা সঞ্চারিত হয়।
লোকসাহিত্যে মোটিফ (Motif):
মোটিফ হলো এমন কোনো পুনরাবৃত্ত বিষয় বা প্রতীকী উপাদান যা একাধিক গল্প, গান বা কিংবদন্তিতে দেখা যায়। এটি কোনো সমাজের ভাবপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে গভীরভাবে প্রতিফলিত করে।
উদাহরণস্বরূপ —
অলৌকিক রূপান্তর, নদী পার হওয়া, জাদুকরী ফুল বা ফল, সাপ–মানুষের সম্পর্ক, মা ও সন্তানের বিচ্ছেদ, বিপন্ন রাজ্য পুনরুদ্ধার — এইসব মোটিফ বাংলাদেশের ও বাঙালি লোকসাহিত্যের নানান গল্পে বারবার ফিরে আসে।
‘মনে পড়ে রাধার কথা’ বা ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’— এর মতো লোকগীতে বিরহ ও প্রত্যাবর্তনের মোটিফ বাঙালির আবেগকে সর্বজনীন করে তোলে।
, লোক কাহিনির মধ্যে এমন কিছু উদ্দিষ্ট ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে যার সর্বজনিনতা লক্ষ্য করা যায়। দেখা যায় রূপকথা বা লোককাহিনি দেশকালের ভৌগোলিক সীমা দ্বারা বিভক্ত নয়। তাই তো ডঃ মুহম্মদ শহীদুলাহ লোক সাহিত্যের মধ্যে মিল দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে হয়তো কোনো কালে কালোচামড়া ও সাদাচামড়ার পূর্বপুরুষেরা একই তাবুর নিচে একত্রে বাস করতো।
উপসংহার:
আলোচনা শেষে বলা যায়, মোটিফ ও টাইপ সাহিত্য বিশ্লেষণের দুটি অপরিহার্য ধারণা। মোটিফ পাঠককে ভাবের পুনরাবৃত্তিতে পৌঁছে দেয়, আর টাইপ চরিত্রকে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দেয়। মোটিফ ও টাইপ সমন্বয়েই সাহিত্য হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক ও প্রতীকসমৃদ্ধ। লোকসাহিত্যে মোটিফ ও টাইপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ মর্মার্থ অনুধাবন করার জন্য। লোকসাহিত্যের মোটিফ ও টাইপ কেবল গল্প বলার উপায় নয়; মোটিফ ও টাইপের মাধ্যমে সমাজের চিন্তা, নৈতিক মূল্যবোধ, ইতিহাস ও কল্পনার জগৎ একত্রে গড়ে ওঠে। এই পুনরাবৃত্ত উপাদানগুলিই লোকসাহিত্যকে সর্বজনীন ও চিরকালীন করেছে। লোক সাহিত্যে মোটিফ ও টাইপ সর্বজনীন শব্দ।
প্রফেসর মোঃ আখতার হোসেন বাংলা বিভাগ সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর।