বাউল গানের তত্ত্ব ও ভাব-সম্পদের মৌল প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য


বাউল গানের – তত্ত্ব ও দর্শন
বাউল গানে বাউল তত্ত্ব ও দর্শন প্রকাশিত। তাই, বাউল ধর্মমতের বাহন হলো বাউল গান। মধ্যযুগের শেষ দিকে একদল রহস্যবাদী সাধক সম্প্রদায়, যারা উৎকৃষ্ট অভিনব অধ্যাত্মাসংগীত রচনা করেছিলেন, তারাই বাউল সম্প্রদায় নামে পরিচিত।
উদাসী হাওয়ায় যে একতারার সুর পথে টানে তা বাউলের গানের সুর। আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার বেড়াজালে আবদ্ধ মানুষের বিপন্ন চিত্তে মরমী পরশ বুলিয়ে দেয় বাউলের হৃদয়হরণ করা সুর। নশ্বর সংসারের বেড়াজাল থেকে অপার্থিব শান্তির সন্ধানে বাউলেরা মনের মাঝে খুঁজেছেন মনের মানুষ । জীবাত্মা ওপরমাত্মার মাঝে কোনো ভেদাভেদ না রেখে দেহের মাঝেই তারা পরম সুন্দরের অস্তিত্ব সন্ধান করেছেন এবং তার সন্ধান অন্যকেও দিয়েছেন।


মধ্যযুগে বাংলায় বসবাসকারী নাথপন্থী ও সহজিয়ারা ব্রাহ্মণদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ইসলাম ও বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করে। আবার অনেকে কোনো ধর্মের দিকে না গিয়ে খোলা আকাশের তলে মুক্তির পথ খুঁজেছিল। আর যারা নবধর্মে দীক্ষা নিয়েছিল তারাও পুরাতন সংস্কৃতি পুরোপুরি ত্যাগ করতে পারে নি।
ফলে হিন্দু-মুসলমানের সমবায়ে বাউল মতের উদ্ভব ঘটে। অধ্যাপক উপেন্দনাথ ভট্টাচার্যের মতে মুসলমান মাধববিবি ও আউল চাঁদই বাউল মতের প্রবর্তক এবং মাধববিবির শিষ্য নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্রই বাউল মত জনপ্রিয় করে তোলেন।
বাউল শব্দের উৎপত্তি নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। মধ্যযুগে ঈশ্বরপ্রেমে মাতোয়ারা বা বাহ্যিক ব্যাপারে উদাসীন ব্যক্তিকে বাউল বলা হতো। চৈতন্যদেবও নিজেকে বাউল বলেছেন। অনেকের ধারণা বাতুল বা ব্যাকুল থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি। কেউ কেউ বলেন বাউর, থেকেই বাউল শব্দটি এসেছে।
মধ্যযুগে একদল দীন দুঃখী উলুঝুল লোক ছিল, যারা একতারা বাজিয়ে ভিক্ষা করে খেত, তাদের জনসাধারণ বাতুল বলে উপহাস করতো। অনেকের ধারণা এ বাতুল থেকে বাউল এসেছে। এখনও বাউলরা আমাদের সমাজে বাতুল (অপদার্থ) বলে উপহাসের পাত্র। আর বাউলরা সব সময় ব্যাকুল (ভাবোন্মত্ত) থাকে।
বাউলেরা অশিক্ষিত। তাদের কোনো লিখিত শাস্ত্র নেই। তাই, বাউল মতাবাদের কালিক বা দার্শনিক পরিচয় পাওয়া যায় না। তবে, অনুমান সতের শতকের মাঝামাঝি থেকে বাউল মতবাদের উদ্ভব। এরপর উনিশ শতকে বাউল সম্রাট লালন ফকিরের সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমে এর পরিপূর্ণ তাত্ত্বিক ও সাহিত্যিক বিকাশ ঘটে।
বাউলেরা তাদের মতবাদ ও সাধনকে বাউল গানের মাধ্যমে প্রকাশ করে। তাই, বাউল গান শুধু গান নয়, একাধারে ধর্মশাস্ত্র, দর্শন, ভজন, সংগীত ও সাহিত্য। তাও লোকসাহিত্য মাত্র নয়, এগুলো এদেশের সাধারণ মানুষের প্রাণের কথা, মনীষার ফসল ও সংস্কৃতির স্বাক্ষর।
বাউলেরা মনে করে পরমাত্মা থেকে জীবাত্মার সৃষ্টি। জীবাত্মার স্থিতি পরমাত্মায়। আত্মার পরিত্রতার মধ্যে দিয়ে খোদাকে পাওয়া যায়। তাই আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির সাধনাই হলো বাউলদের সাধনা। সক্রেটিসের – know thyself (নিজেকে জানো), বেদের আত্মানং বিদ্ধি নিজেকে জান। হাদিসের কথায় – যে নিজেকে চিনেছে, সে আল্লাহকে জেনেছে। জীবনের পরম ও চরম সাধনা হচ্ছে খোদাকে চেনা। এ সবের সাথে বাউল সাধনার গভীর মিল রয়েছে।
বাউল গানের মধ্যে মনের মানুষ, অটল মানুষ, অধর মানুষ, মানুষ রতন, মনমনুরা, অচিন পাখি, অলখ সাঁই ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো আসলে পরমাত্মার প্রতীক। বাউলরা মনে করে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই অধর চাঁদ আছে, তাকে খুঁজে বের করতে হবে। দেহের মধ্যে তাকে অনুভব করতে হবে।
তবেই আলেখ মুরের (পরম জ্যোতি) সন্ধান পাওয়া যাবে। তখন বাইরের সীমাবদ্ধ বস্তুজগৎ থেকে মুক্তি নিয়ে দেহ ও মনে ঈশ্বর সত্ত্বা লাভ করা সম্ভব হবে। বাউলেরা মনের মানুষের সন্ধান করে। তারা নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের নিয়ম-কানুনের ধার ধারে না।
পুজো-অর্চনা, রোজা-নামাজ, মন্দির-মসজিদ, কাশী, কাবা এসব সম্পর্কে তারা উদাসীন। এমন কি হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে যে স্বাভাবিক ধর্মীয় ভেদাভেদ, তাও তারা মানে না। ধর্মভেদ সম্পর্কে বাউলেরা বলেছে-
তোমার পথ ঢাইক্যাছে মন্দিরে-মসজিদে ও তোর ডাক শুনে সাঁই চলতে না পাই আমায় রুখে দাঁড়ায় শুরুতে মুর্শীদে।
বাউল গানের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ সব ধর্মের শব্দ ও রূপক তত্ত্ব ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়েছে। মানুষের মধ্যে উঁচু-নিচু, জাত-পাত কোনো কিছুই তারা মানে না। সব সৃষ্টি একই সৃষ্টার। একই চাঁদ-সূর্যের আলোয় প্রতিপালিত।
বাউল গানে বলা হয়েছে – স্রষ্টার কাছে ভক্তিই সব। ভক্তির জোরে স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। লালন বলেন-
ভক্তির দ্বারে বাঁধা আছেন সাঁই হিন্দু কি যবন বলে তার কাছে জাতের বিচার নাই। ভক্ত কবির জেতে জোলা প্রেম ভক্তিতে মাতোয়ালা রামদাস মুচি এই ভবের পরে পেলো রতন ভক্তির জোরে তার স্বর্গে সদাই ঘন্টা পড়ে।
বাউল গানের তত্ত্ব অনুসারে বাউলেরা রাগপন্থী। ইন্দ্রিয় নিরোধ, বিষয়ত্যাগ কিংবা বৈরাগ্য এদের লক্ষ্য নয়। এ জন্য তারা সহজিয়া। আকার-নিরাকার তত্ত্বে বাউলেরাও উৎসুক। বাউলেরা আত্মার স্বরূপ বুঝতে চায়। তাই তারা দেহযন্ত্রকে বিশ্লেষণ করতে চায়। কেননা দেহ ছাড়া আত্মার অনুভূতি সম্ভব নয়। তাই বাউলদের সাধন পদ্ধতি কামাচার মিথুনাত্মক যোগ সাধনা। অবশ্য এ সাধনা গোপনীয়। বাউল ছাড়া অন্যদের কাছে প্রকাশ করা নিষেধ। আর বাউল ছাড়া অন্যরা বোঝেও না।
জগৎ ও জীবনের এবং সৃষ্টি ও সৃষ্টার সম্পর্ক অত্যন্ত সহজভাবে বাউল গানে প্রকাশ পেয়েছে। বাউলদের মতে মানুষের দেহের মধ্যেই লীলাময় বাস করেন। তাকে বাইরে খুঁজলে পাওয়া যাবে না। কেননা-
আমার এ ঘরখানায় কে বিরাজ করে তারে জনমভর একবার দেখলাম নারে।
বাউল গানে প্রকাশিত – আত্মা আর পরমাত্মা ভিন্ন ভেদ নয়। আসল কথা একবার আপনারে চিনলে পরে যায় অচেনারে চেনা। নিজেকে চিনতে না পারলে ভবের বাজারে কানার মতো হাতড়ে বেড়াতে হবে। ঢাকা-দিল্লী হাতড়ে বা বেদ-বেদান্ত পড়ে ঈশ্বরকে চেনা যায় না। কেননা মানুষের দেহের মধ্যেই আত্মারূপ হরি বাস করে। বাউলেরা মনে করে যা আছে ব্রহ্মাণ্ডে তা আছে, দেহভাণ্ডে।
বাউলেরা গুরুবাদে বিশ্বাস করে। তারা মনে করে যোগসাধনা গুরুর কাছ থেকে জেনে নিয়ে সাধনা করতে হয়। যেমন-
তিন মানুষের তিন রূপ কর সদগুরু মন আগে ধর।
অথবা,
আমার দেহ জমি আবাদ হইল না গুরুর বীজ বুনতে পারলাম না।
বাউলেরা তাদের ধর্মতত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে চর্যার পদকর্তাদের মতো বাস্তব জীবন থেকে নানা রকম উপমা-রূপক গ্রহণ করেছে। যেমন-
দেহ বর্ণনায় আট কুঠুরী নয় দরজা, অথবা, খাঁচা রে তোর কাঁচা বাঁশের, ধর্ম সাধনার পথের বাধা বিপত্তির কথা বলতে গিয়ে গেরাম বেড়ে অগাধ পানি বা আমার ঘরের চাবি পরের হাতে-এভাবে অনেক দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়।
বৈষ্ণবরা একান্তভাবে প্রেমিক ও প্রেম সাধক ছিলেন, আর বাউলেরা ছিল তাত্ত্বিক। বৈষ্ণবেরা সমাজ সংসার সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু বাউলেরা সমাজ, জীবন ও পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন। বাউল গানের মধ্যে উদার মানবতার কথা প্রকাশ পেয়েছে। এ মানবতা সাম্য ও প্রীতির উপর প্রতিষ্ঠিত।
আজকে যারা সম্প্রীতির কথা বলে, তাদের অনেক আগে থেকেই পথে প্রান্তরে পরম নিষ্ঠার সঙ্গে সে সম্প্রীতির কথা বাউলেরা বলে গেছেন।
বাউলেরা আড়ালে থাকতে পছন্দ করতো। অ-বাউলদের কাছে তাদের তত্ত্বভেদের কথা প্রকাশ করতো না। সমাজে নীচুতলার লোকের ধর্ম বলে বাউল ধর্ম উঁচু তলার মানুষের কাছে অবহেলার বিষয় ছিল। রবীন্দ্রনাথই এদেরকে শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করে তোলেন।
পরিশেষে বলা যায় যে, বাউলগান বাউল ধর্মতত্ত্বের রসভাষ্য। বাউল পদাবলিকে অনেকে চর্যাপদের উত্তরসূরী বলে মনে করেন। বাউল মতের সাথে ইসলামের সূফীতত্ত্ব ও বৈষ্ণব তত্ত্বের মিশ্রণ ঘটেছে বলেও অনেকে মনে করেন।
বাউল গান বাউলতত্ত্বে ভরা। তবে এর মধ্যে সুরের মূর্ছনা, মানবতা ও সাম্যের কথা যেভাবে অপূর্ব মমতার সাথে প্রকাশিত হয়েছে, তাতে মানুষের হৃদয়ের বীণার তারে আঘাত না করে পারে নি