রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প : প্রেম, বেদনা ও মানবিকতার চিরন্তন ব্যঞ্জনা

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

বাংলা ছোটগল্পের প্রারম্ভ ও রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব

আখ্যানের ঐতিহ্য ভেঙে নতুন পথের সূচনা

গদ্য আবিষ্কারের ফলে গদ্যকে আশ্রয় করে নানা বিচিত্র আঙ্গিকের সাহিত্য গড়ে ওঠে। এরই পথ বেয়ে বাংলা ছোটগল্পের পথ সূচিত হতে থাকে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘যুগলাঙ্গুরীয় ‘১৮৭৪) ও ‘রাধারাণী’ গ্রন্থে মধ্যে ছোটগল্পের লক্ষণ প্রথম দেখা যায়। আকৃতিতে ছোট হলেও এটি উপন্যাসধর্মী। কেননা ছোটগল্পের নিপুণ শিল্প প্রয়াস এর মধ্যে নেই। পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সঞ্জীবচন্দ্র, স্বর্ণকুমারী দেবী এরা ছোটগল্পের আদলে লিখতে চেষ্টা করেছেন, তবে গল্প রচনায় তেমন সার্থকতা দেখাতে পারেন নি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প

প্রেম ও রোমান্স নিয়ে নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (১৮৬১-১৯৪০) ছোটগল্প লেখায় বৈচিত্র্য দেখালেও প্রকৃত ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্য তার গল্পের মধ্যে পাওয়া যায় না। অসম্ভব কল্পনার জগৎ ও কৌতুককর কাহিনী পরিবেশনের দিক থেকে ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় কিছু স্বতন্ত্র প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তার ছোটগল্প আসলে চিরাগত কালের গল্পকথকের কথা মনে করিয়ে দেয়। আধুনিক কালের ছোটগল্পের বাস্তবতা তার ছোটগল্পের মধ্যে নেই।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বাংলা ছোটগল্পের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। এই সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের সূত্রপাত অন্যদের হাতে সূচিত হলেও রবীন্দ্রনাথই বাংলা সাহিত্যে প্রথম সার্থক ছোটগল্পকার। তাঁর বিপুল প্রতিভার যাদুস্পর্শে বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা যেমন ফুলে-ফলে সমৃদ্ধহয়ে ওঠে ছোটগল্পও তেমনি তার হাতে পড়ে উৎকর্ষের চরম নিদর্শন হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের যে কোনো ছোটগল্পের সমকক্ষ হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের মোপাসা’, আমেরিকার এলেন পো এবং রাশিয়ার গোগোল-এ তিনজন যেমন তিন দেশের ছোটগল্পের জনক হিসেবে বিবেচ্য, বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথও তেমনি।

রবীন্দ্রনাথ: পথিকৃৎ থেকে প্রেরণার উৎসে

আমরা আগেই উল্লেখ করেছি যে, রবীন্দ্রনাথের আগে দু এক জনের রচনায় ছোটগল্পের কিছু কিছু লক্ষণ ছিল। কিন্তু তারা ছোটগল্পের স্বতন্দ্র শিল্পকলা সম্পর্কে তেমন জানতেন না। তারা মনে করতেন। উপন্যাসের ডালপালা ছেঁটে দিয়ে ছোটগল্প করে নিলেই ছোটগল্প হয়। শেষ কথা হলো-রবীন্দ্রনাথই প্রথম সচেতনভাবে ছোটগল্প লিখতে প্রবৃত্ত হন। তিনিই এর পথ নির্মাতা। আবার তিনিই এর শ্রেষ্ঠ শিল্পী।

রবীন্দ্রনাথ মূলত গীতিকবি। গীতিকবিতার সাথে ছোটগল্পের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। তাই রবীন্দ্রনাথ যেন ছোটগল্পের মধ্যে মনের মুক্তি খোঁজার চেষ্টা করেছেন, যা উপন্যাসে সম্ভব নয়। পদ্মাতীরে কাজকর্ম দেখার অবকাশে গ্রামবাংলার দ্বন্দ -কলহ, মামলা মোকদ্দমা, ভোগ-ত্যাগ, স্নেহ- ভালোবাসা ইত্যাদির মিশ্রনে যে জীবন তিনি দেখেছেন, তা তার ছোটগল্পের জমিনে ফুটিয়ে তুলেছেন। ছোটগল্প লেখার প্রয়াস ও ছোটগল্প-এর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি তার কবিতার মধ্যেও সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন-

“ছোটপ্রাণ ছোটকথা        ছোট ছোট দুঃখকথা
নিতান্তই সহজ সরল,
সহস্র বিস্মৃতি রাশি       প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দুচারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা ঘটনার ঘনঘটা
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ,
অন্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।”

কবির এ মনোভাব তাঁর ছোটগল্পে প্রকাশ পেয়েছে। আর কবির দেওয়া এ সংজ্ঞায়ই ছোটগল্পের শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পসমূহ তাঁর গল্পগুচেছর তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর ছোটগল্পগুলো শিল্পের বিচারে উৎকৃষ্ট এবং বাঙালির গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের চিত্র অপূর্ব মহিমায় তাতে ফুটে উঠেছে। বাঙালি পরিবেশ ও জীবন তার গল্পে থাকলেও স্থান কালের গণ্ডী পেরিয়ে তার আবেদন সর্বকালের সর্বমানবের হৃদয়ে আনন্দ প্রদান করে।

রবীন্দ্রনাথের তার বাংলা ছোটগল্পে সমাজ সংসারের সহজ সরল গ্রাম-জীবনের পটভূমিকায় অপূর্ব রূপ ও রসের পরিচয় পাওয়া যায়। মানব জীবনের প্রাত্যহিক সুখ-দুঃখ সবই আছে। মনগড়া কল্পনার মানুষ নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া মানুষের চিত্র তিনি একেঁছেন। বাস্তব অভিজ্ঞতাকে মূল উপাদান হিসেবে গ্রহণ করে তিনি মানবজীবনের লীলা বৈচিত্র্যের রূপ প্রকাশ করেছেন। এ সম্পর্কে তিনি নিজে বলেছেন- “আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখনও ঘটেনি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।”

রবীন্দ্র-ছোটগল্প নানা পসরার সমাহার। বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রেম, সামাজিক ও পারিবারিক জীবন, প্রকৃতি ও প্রকৃতির সাথে মানবমনের সম্পর্ক, অতিপ্রাকৃতের স্পর্শ, নগর জীবনের স্বাদ-ইত্যাদি বিষয় তাঁর ছোটগল্প-এ ভীড় করে আছে।

প্রেমের গল্প হিসেবে একরাত্রি, মহামায়া, সমাপ্তি, দৃষ্টিদান, মাল্যদান, শাস্তি, মধ্যবর্তিনী, অধ্যাপক, নষ্টনীড়, রবিবার, শেষকথা, ল্যাবরেটরী ইত্যাদি গল্প বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এসব গল্পের কোনটিতে প্রেমের মধুর সম্পর্ক, আবার কোনটিতে বুদ্ধিমিশ্রিত প্রেমের ব্যক্তিত্বশালী দীপ্ত লীলা প্রকাশ পেয়েছে।

মানুষ সামাজিক জীব। নানা সম্পর্কের জালে সে আবদ্ধ। সমাজ জীবনের বিচিত্র সম্পর্কের লীলা বৈচিত্র্য রবীন্দ্রনাথের যেসব গল্পের বড় বৈশিষ্ট্য, সেগুলো হলো-ব্যবধান, মেঘ ও রৌদ্র, পণরক্ষা, দিদি, দান-প্রতিদান, হৈমন্তী ছুটি, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, ইত্যাদি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্পে প্রকৃতি ও মানুষ মিশে একাকার হয়ে গেছে। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড়তা অপূর্ব ব্যঞ্জনা পেয়েছে তার কিছু কিছু গল্পে। শুভা, অতিথি, আপদ প্রভৃতি গল্পে উদার বিশাল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের কাহিনীগুলো নিটোল গীতি কবিতার আকারেই ফুটে উঠেছে।

গুপ্তধন, জীবিত ও মৃত, নিশীতে, মণিহারা, ক্ষুধিতপাষাণ প্রভৃতি গল্পের মধ্যে অতিপ্রাকৃতের স্পর্শ রয়েছে। শেষ জীবনে লেখা-রবিবার শেষকথা, ল্যাবরেটরি গল্পগুলোতে আধুনিক সমাজের নানা সমস্যার অবতারণা করেছেন প্রখর বুদ্ধিদীপ্তের সঙ্গে।

স্নেহপ্রেমময় পারিবারিক রূপ ফুটে উঠেছে কিছু গল্পে, যাতে দৈনন্দিন জীবন পরিচিতি খুবই নিবিড় রসে ভরে ওঠে। যেমন, দিদি, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা, ছুটি প্রভৃতিগল্পে। মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণমূলক ছোটগল্পের দিক থেকে অনবদ্য শিল্পরূপ লাভ করেছে ‘নষ্টনীড়’ গল্পটি।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের বিষয় বৈচিত্র্য সম্পর্কে শিশির কুমার দাস বাংলা ছোটগল্প গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন –

‘রবীন্দ্রনাথের গল্পের বিষয় বৈচিত্র্য অসাধারণ। শহর, গ্রাম, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অতিপ্রাকৃত আবহাওয়া, চরিত্রের মধ্যে আছে রাজারাণী, জমিদার প্রভৃতি, আছে ভ্রাতৃস্নেহ, প্রভৃ ও প্রতি আনুগত্য, মায়ের প্রতি ভালবাসা, অতীত বর্তমান ইত্যাদি এমন কিছু নেই, যা তার ছোটগল্পে আসেনি। চরিত্রের কথা বলতে গেলে দু-একটি চরিত্র ছাড়া আর সব চরিত্রই সাধারণ নর-নারী। আবার এর মধ্যে পুরুষ চরিত্র চেয়ে নারী চরিত্র বেশী উজ্জ্বল।

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলো কাব্যধর্মী। কল্পনার প্রাচুর্য অলংকার বাহুল্য ইত্যাদি কাব্যগুণ তার গল্পে দেখা যায়। এ কাব্যগুণ দোষের আকর না হয়ে বরং একটা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করেছে। তিনি গল্প আরম্ভকরেই পাঠককে ঘটনা স্রোতে মগ্ন করে তোলেন। দম নেবার সুযোগ দেন না। কোন উপদেশ বা তত্ত্বও প্রকাশ করেন না।

 বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ও উত্তরাধিকার

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের কলাকৌশল বৈচিত্র্যময়। গল্পের প্রস্তাবনা, উপস্থাপনা, পরিণতি, ও উপসংহার -সব মিলে এক অপূর্ব ব্যঞ্জনা এনে দেয়। বিষয় ও রস পরিণতির দিক থেকেও বৈচিত্র্যপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের এ কলাকৌশলই বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্পের ধারায় ব্যাপকভাবে অনুসৃত হয়েছে।

ডঃ শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় মন্তব্য করেছেন যে, রবীন্দ্রনাথের সব গল্প আলোচনা করে তার প্রসার ও বৈচিত্র্য দেখে চমৎকৃত হতে হয়। আমাদের অতীত ব্যবস্থা ও জীবন যাত্রার সব রস এক নিঃশ্বাসে পান করেছেন এবং বাংলার জীবন ও প্রকৃতির সমস্ত সৌন্দর্য প্রকাশ করেছেন। অতীতের ফসল ঘরে তুলে তিনি-” ভবিষ্যতের ক্রমসঞ্চীয়মান ভাবসম্পদের দিকে অঙ্গুলি সংকেত করিয়াছেন’।

বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের অবদান সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভূদেব চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের ‘ছোটগল্প ও গল্পকার’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন-

“রবীন্দ্রনাথের আশ্রয়ে বাংলা ছোটগল্প প্রথম পূর্ণতা পেয়েছিল। কিন্তু এইটেই বড় কথা নয়। গল্পগুচ্ছের প্রাথমিক যুগের রবীন্দ্রগল্পের মধ্যেই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জীবন-ভূমি পরিবর্তিত হয়েছে-শিল্পীর জীবন দৃষ্টি পেয়েছে এক অনাবিষ্কৃত জগতে প্রথম প্রবেশাধিকার।”

উপসংহারঃ বাংলা ছোটগল্পে রবীন্দ্রনাথের অনন্য মহিমা

পরিশেষে বলা যায়-রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে জনপদের কলরব এবং বিশাল উদার প্রকৃতির নীরবতা আশ্চর্য কৌশলে মিশে গেছে। রবীন্দ্রনাথের সুদৃঢ় পদচারণায় বাংলা ছোটগল্পের ভাণ্ডার পূর্ণ হয়ে সারা ভারতবর্ষসহ সমগ্র পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠত্বের গৌরবমুকুট মাথায় ধারণ করেছে। তিনি শুধু ছোটগল্পের স্রষ্টা নন, ছোটগল্পকে বিশিষ্ট শিল্পমূর্তিরূপে প্রতিষ্ঠা করা তাঁর একক কৃতিত্ব বলে পরিগণিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *