উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে আলোচনা কর।| বিভিন্ন অর্থে শব্দ তৈরি করে বাক্যে প্রয়োগ |

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

উপসর্গ: সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, প্রয়োজনীয়তা, শব্দ-গঠন।

বাংলা শব্দ গঠনের যতগুলো উপায় আছে, তার মধ্যে উপসর্গ অন্যতম মাধ্যম। এটি যোগে নিত্য নতুন শব্দ গঠন করা হয়। নিম্নে এর সংজ্ঞা ও প্রয়োজনীয়তা আলোচনা করা হলো।

সংজ্ঞা: যে সব বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি নাম শব্দ ও কৃদন্ত শব্দের আগে বসে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে উপসর্গ বলে।

এরা অব্যয় জাতীয় শব্দাংশ, এরা স্বাধীন ভাবে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না। এরা অন্য শব্দের আগে বসে। এরা নতুন অর্থবোধক শব্দ তৈরি হয়। শব্দের অর্থের পূর্ণতা আসে, কিংবা শব্দের অর্থের সম্প্রসারণ বা সংকোচন ঘটে। তাই, এরা অর্থহীন, কিন্তু অর্থদ্যোতক। এদের সাথে কোনো প্রত্যয় বা বিভক্তি যুক্ত হয় না, তাই এদের রূপের কোনো পরিবর্তন হয় না। এজন্যই একে অব্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

সংস্কৃত সংজ্ঞাঃ ডঃ মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে বাংলা ও সংস্কৃত ব্যাকরণ এর সংজ্ঞা আলাদা। সংস্কৃত ব্যাকরণে বলা হয়েছে-

“উপসর্গেন ধাতুর্থো অন্যত্র বলাদন্যত্র নীয়তে।”

অর্থাৎ এর দ্বারা ধাতুর অর্থ বল পূর্বক অন্যত্র নীত হয়।

সহজ কথায় ধাতুর সাথে প্রত্যয়যোগে গঠিত কৃদন্ত শব্দের আগে যে সব অব্যয়জাতীয় শব্দ বসে ঐ কৃদন্ত শব্দের অর্থের সংকোচন প্রসারণ ও পরিবর্তন সাধন করে, তাদেরই কেবল সংস্কৃতে উপসর্গ বলা হয়। বাংলা ভাষায় এরূপ অচল। কেননা বাংলা ভাষায় শুধু কৃদন্ত শব্দের আগে নয়, নাম শব্দের আগেও এটি ব্যবহৃত হয়। বাংলা ভাষায় ইংরেজি ব্যাকরণের Prefex বা উপশব্দের প্রভাবে যে কোনো নাম বা কৃদন্ত শব্দের আগে ব্যবহৃত অব্যয় শব্দকে এটি বলে স্বীকার করে নেয়া হয়।

প্রকারভেদ:

বাংলা ভাষায় তিন প্রকারের উপসর্গ আছে। যথাঃ

১. বাংলা : বাংলা শব্দের আগে ব্যবহৃত উপসর্গই বাংলা উপসর্গ। বর্তমানে এদের সংখ্যা  ২১টি। যথাঃ

অ, অ, ঘা, অজ, অনা, আ, আড়, আন, আব, ইতি, উন (উনা), কদ, কু, নি, পাতি, বি, ভর, রাম, স, সা, সু, হা।

২. সংস্কৃত বা তৎসম : তৎসম শব্দের আগে ব্যবহৃত উপগর্সই তৎসম উপসর্গ। এদের  সংখ্যা ২০ টি। যথাঃ

পু, পরা, অপ, সম, নি, অব, অনু, নির, দুর, বি, অধি, সু, উৎ, পরি, প্রতি, অভি, অতি, অপি, উপ, আ।

৩. বিদেশি : বিদেশি শব্দের অনুপ্রবেশের সাথে সাথে বাংলা ভাষায় এদের আগমন ঘটেছে। তবে ইংরেজি ও ফারসির সংখ্যাই বেশি। বিদেশি বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি অসংখ্য। এদের কিছু উদাহরণ দেখানো হলো।

ব্যবহার বিধি :

এদের কাজ বা প্রয়োজনীয়তাঃ

উপসর্গ কথাটির অর্থ ‘উপসৃষ্টি; এরা অর্থহীন, কিন্তু অর্থদ্যোতক। এদের কাজ নতুন শব্দ তৈরি করা। এরা শুধু নতুন শব্দই সুষ্টি করে না, শব্দের সাথে যুক্ত হয়ে মূলের অর্থের পরিবর্তন করে। অর্থের বিশিষ্টতা দান করে, কখনো নতুন শব্দের সৃষ্টি করে। এটি চুম্বক দন্ডের মতো। চুম্বক যেমন লৌহ শলাকার কাছে গেলে একটা মোচড় দেয়, তেমনি এরা কোনো শব্দের আগে যুক্ত করার ফলে ঐ শব্দের আকার আকৃতি বা অর্থে একটা মোচড় দেবেই। এক কথাই বলা চলে, শব্দ গঠনে অর্থের দিক থেকে বৈচিত্র্য আনাই এদের কাজ। এটি যোগ কারার পর শব্দের যে ধরনের পরিবর্তন ঘটে তা নিম্নরূপঃ

বাংলা শব্দ গঠনে ভূমিকা:

নতুন নতুন শব্দ গঠনে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এদের নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, কিন্তু এগুলো শব্দগঠন করে শব্দের বৈচিত্র্য বা পরিবর্তন আনে। এটি যোগে ভিন্নার্থক ও বিশিষ্টার্থক পৃথক পৃথক শব্দ গঠন করা যায়। এ জন্যই বলা হয় ‘উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে।’

নিত্য নতুন শব্দ তৈরিই এদের প্রধান কাজ। এরা ধাতু বা শব্দের আগে বসে ধাতু বা শব্দের অর্থের পরিবর্তন ঘটায়। কখনো অর্থের বিশিষ্টতা দান করে। আবার কখনো নতুন অর্থের সৃষ্টি করে। উদাহরণ দেয়া যাক-

‘হৃ’ ধাতু থেকে ‘হার‘ কৃদন্ত শব্দ গঠিত। এর আগে যোগ করলে-

এভাবে হাজারো উদাহরণের সাহায্যে বাংলা শব্দ গঠনে এদের ভূমিকা তুলে ধরা যায়।

উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে-আলোচনা কর।

যে সব অব্যয় জাতীয় বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি নামশব্দ বা কূদন্ত শব্দের আগে বসে ঐ শব্দের অর্থের সংকোচন, সম্প্রসারণ কিংবা অন্য কোনো পরিবর্তন করে তাদেরকে উপসর্গ বলে।

উপর্যুক্ত কথার বাস্তবতা যাচাই করা যেতে পারে। যেমন-

‘হৃ’ ধাতু থেকে ‘হার’ শব্দটি এসেছে; যার অর্থ ‘হরণ’ করা। এই ‘হার’ শব্দের আগে এদের যোগ করলে নতুন নতুন শব্দ পাওয়া যাবে।

এখানে প্র. আ, বি, সম, উৎ এইগুলোর নিজস্ব কোনো অর্থ নেই, অথচ ‘ ‘শব্দের আগে যোগ করার ফলে প্রতি ক্ষেত্রেই নতুন নতুন শব্দের সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ নিজস্ব অর্থ না থাকলেও নতুন শব্দ সৃজনের ক্ষমতা আছে। এভাবে এরা বিভিন্ন অর্থে বিভিন্ন শব্দ তৈরি করে বলে বলা হয় যে, এদের অর্থবাচকতা নেই, কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে।

তবে বাংলা ভাষায় ‘অতি’, ‘প্রতি’ ও ‘ইতি’ এগুলোর স্বাধীন ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন-

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *