প্রকৃতি ও প্রত্যয় কাকে বলে? প্রকৃতি ও প্রত্যয় কত প্রকার কী কী?

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

প্রকৃতি ও প্রত্যয়:

ভূমিকা:
বাংলা ভাষার গঠন ও ব্যাকরণ বোঝার ক্ষেত্রে প্রকৃতি ও প্রত্যয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। শব্দের উৎপত্তি, রূপান্তর ও অর্থবিকাশের সঙ্গে প্রকৃতি ও প্রত্যয় নিবিড়ভাবে যুক্ত। কোনো শব্দের মূল রূপকে বলা হয় প্রকৃতি, আর সেই মূল রূপে যুক্ত হয়ে যে অংশ নতুন অর্থ বা রূপ সৃষ্টি করে, তাকে বলা হয় প্রত্যয়। অর্থাৎ, প্রকৃতি ও প্রত্যয় একত্রে কাজ করে শব্দকে নতুন রূপ ও অর্থে সমৃদ্ধ করে তোলে। বাংলা ভাষার শব্দগঠনের এই প্রক্রিয়ায় প্রকৃতি ও প্রত্যয়–এর ভূমিকা এতটাই মৌলিক যে, এদের সম্পর্ক না বুঝে ভাষার ব্যাকরণিক সৌন্দর্য অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়
ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

প্রকৃতি ও প্রত্যয় : বিস্তারিত আলোচনা।

বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত শব্দসমূহকে বিশ্লেষণ করলে ক্রিয়াবাচক ও নামবাচক এ দু’ধরনের শব্দ পাওয়া যায়। এ ক্রিয়াবাচক ও নামবাচক শব্দের মূলকে প্রকৃতি বলে। ক্রিয়াবাচক শব্দের মূল বলতে ধাতু, আর নামবাচক শব্দের মূল বলতে মৌলিক শব্দকেই বোঝায়। অর্থাৎ যে কোনো শব্দ থেকে প্রত্যয় বাদ দিলে প্রকৃতি পাওয়া যায়। যেমন- গোলাপি একটা শব্দ। এ শব্দের মূল অংশ হলো – গোলাপ, আর অতিরিক্ত অংশ হলো । মূল অংশ গোলাপ হলো প্রকৃতি আর হলো প্রত্যয়

অতএব বলা যায় শব্দ ও ধাতুর মূলই হলো প্রকৃতি। এখানে শব্দ বলতে নামশব্দ আর ধাতু বলতে ক্রিয়ার মূলকে বোঝানো হয়েছে।

প্রকৃতি ও প্রত্যয় : প্রকৃতির প্রকারভেদঃ

প্রকৃতি দুই প্রকার। যথা : ১. ক্রিয়া প্রকৃতি  ও ২. নাম প্রকৃতি।

১.ধাতু বা ক্রিয়া-প্রকৃতিঃ ক্রিয়া পদের মূলকে বলা হয় ক্রিয়া-প্রকৃতি বা ধাতু-প্রকৃতি। এখানে বলা দরকার যে, যাতু ও ক্রিয়া-প্রকৃতি একই জিনিস। কেননা, ক্রিয়ার মূলকেই ধাতু বলে। অবশ্য ধাতু বলতে মৌলিক ধাতুকেই বুঝতে হবে। যেমন-

চল+অন্ত =  চলন্ত;  কর+ আ  = করা এখানে’ চলন্ত’ ও’ করা‘ কুদস্ত পদের মূল অংশ হলো যথাক্রমে ‘চল‘ ও’ কর‘। ‘চল‘ ও ‘কর‘ ক্রিয়া-প্রকৃতি বা ধাতু-প্রকৃতি।

২. নাম-প্রকৃতি বা শব্দ-প্রকৃতি: শব্দের মূলকে বলে নাম-প্রকৃতি বা শব্দ-প্রকৃতি। অর্থাৎ নাম-শব্দ বা বিষেষ্যবাচক শব্দের মূল হলো নাম-প্রকৃতি বা শব্দ-প্রকৃতি। যেমন ‘বাঘা ‘একটি নাম শব্দ। একে বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় বাঘ + আ = বাঘা। অর্থাৎ বাঘা শব্দের মূল হলো ‘বাঘ‘। অতএব ‘বাঘ‘ হলো নাম-প্রকৃতি বা শব্দ-প্রকৃতি।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়: প্রশ্ন : প্রত্যয় কাকে বলে? প্রত্যয়ের প্রকারভেদ আলোচনা কর।

উত্তরঃ বাংলা ভাষায় শব্দ গঠনের অন্যতম উপায় হলো প্রত্যয়। প্রত্যয় নামশব্দ ও ধাতুর পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে। প্রত্যয় হলো শব্দ বা শব্দাংশ। এরা বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি। এরা প্রকৃতির শেষে যুক্ত হয়।

অতএব বলা যায় প্রকৃতির পরে যে বর্ণ বা বর্ণসমটি যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে প্রত্যয় বলে। যেমন-

বাঘ + আ = বাঘা,  চল+অন্ত-চলন্ত।  এখানে ‘বাঘ‘ হলো শব্দ প্রকৃতি, আর ‘ হলো প্রত্যয়। আবার চল্‘ হলো ক্রিয়া বা ধাতু-প্রকৃতি, আর ‘অন্ত‘ হলো প্রত্যয়।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়: প্রত্যয়ের প্রকারভেদ:

প্রকৃতির ধরন বিচারের উপর প্রত্যয়ের ধরন নির্ভর করে। অর্থাৎ, প্রকৃতির প্রকারভেদের সাথে প্রত্যয়ের প্রকারভেদ জড়িত। প্রত্যয প্রধানত দুই প্রকার। যথাঃ

১. কৃৎ প্রতায় বা ধাতু প্রত্যয়। ও ২. তদ্ধিত প্রত্যয় বা শব্দ প্রত্যয়।

১. কৃৎ প্রতায় বা ধাতুপ্রত্যয়: ধাতু-প্রকৃতির সাথে বা ক্রিয়ামূলের সাথে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে কৃৎ-প্রত্যয় বলে। যেমন চল+অন্ত চলন্ত এখানে’ চল’ হলো ক্রিয়া-প্রকৃতি, তাই ‘অন্ত’ হলো কৃৎ প্রত্যয়।

২. তদ্ধিত প্রত্যয় বা শব্দ প্রত্যয়ঃ শব্দ-প্রকৃতি বা নাম- প্রকৃতির সাথে যে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে, তাকে তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন – ঢাকা + আই = ঢাকাই। এখানে ঢাকা‘ হলো নাম-প্রকৃতি বা শব্দের মূল। এর সাথে ‘আই’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করেছে। তাই ‘আই’ তদ্ধিত” প্রত্যয়।

[একটা কথো মনে রাখতে হবে যে প্রকৃতির উপরই নির্ভর করে প্রতায় কৃৎ হবে না তদ্ধিত হবে। অর্থাৎ ক্রিয়া-প্রকৃতির সাথে যুক্ত হলে কৃৎ প্রতায় এবং নাম-প্রকৃতির সাথে যুক্ত হলে তদ্ধিত প্রত্যয় হবে।।

কৃৎ-প্রত্যয় দুই প্রকার। যথাঃ বাংলা কৃৎ প্রত্যয় ও সংস্কৃত প্রত্যয়। (প্রকৃতি ও প্রত্যয়)

বাংলা কৃৎ প্রত্যয়: ধাতু বা ক্রিয়া-প্রকৃতির সাথে প্রাকৃত বা বিদেশি শব্দ থেকে আগত প্রত্যয় যুক্ত হলে, তাকে বাংলা কৃৎপ্রত্যয় বলে। যেমন কর আ করা। এটি বাংলা কৃৎ প্রত্যয়।

সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়: ধাতু বা ক্রিয়া-প্রকৃতির সাথে সংস্কৃত শব্দ থেকে আগত প্রত্যয় যুক্ত হলে, তাকে সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয় বলে। যেমন দৃশ্ + অনট= দর্শন। এখানে ‘অনট’ সংস্কৃত কৃৎ প্রত্যয়।

তদ্ধিত প্রত্যয় তিন প্রকার। যথাঃ বাংলা তদ্ধিত প্রকায়, সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয় ও বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়।

বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয়ঃ নাম-প্রকৃতির পরে বাংলা শব্দাংশ যুক্ত হলে, তাকে বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন- বাঘ + আ = বাঘা।

সংস্কৃত তদ্ধিত প্রত্যয়ঃ নাম-প্রকৃতির পরে সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হলে, তাকে সংস্কৃতি তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। যেমন- ধর্ম + ইক = ধার্মিক।

বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয়ঃ নাম-প্রকৃতির পরে বিদেশি কোন প্রতায় যুক্ত হলে তাকে বিদেশি তদ্ধিত প্রত্যয় বলে। একে বালো তদ্ধিত প্রত্যয় বলে বিবেচনা করা হয়। যেমন- বাবু + আনা = বাবুয়ানা।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়: প্রশ্নঃ প্রত্যয় যোগে গঠিত শব্দ কয় প্রকার?

উত্তরঃ প্রত্যয় দ্বারা গঠিত শব্দ দুই প্রকার। যথাঃ ১. তদ্ধিতান্ত শব্দ ও ২. কৃদন্ত শব্দ।

১. তদ্ধিতান্ত শব্দ:  নাম-প্রকৃতির সাথে বাংলা প্রত্যয় বা সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে নতুন শব্দ গঠিত হয় তাকে তদ্ধিতান্ত শব্দ বলে। যেমন- লাঠি+ আল = লাঠিয়াল।

এখানে’ লাঠি‘ নাম প্রকৃতির সাথে বাংলা প্রত্যয় ‘আল‘ যুক্ত হয়েছে। তাই ‘লাঠিয়াল’ তদ্ধিতান্ত শব্দ।

বিজ্ঞান + ফিক বৈজ্ঞানিক। এখানে’ বিজ্ঞান‘ নাম-প্রকৃতির সাথে ‘ইক(ষ্ণিক)’ প্রতায় যুক্ত হয়েছে। তাই ‘বৈজ্ঞানিক’  তদ্ধিতান্ত  শব্দ।

২. কৃদন্ত শব্দঃ ক্রিয়া-প্রকৃতি বা ধাতু-প্রকৃতির সাথে বাংলা বা সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে নতুন শব্দ গঠিত হয়, তাকে কৃদন্ত শব্দ বলে। যেমন-  চল+ অন্ত চলন্ত। এখানে’ চল’ ধাতুর সাথে ‘অন্ত’ প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে, তাই এটি কৃদন্ত শব্দ। গম +তব্য= গন্তব্য,

এখানে গম’ ধাতুর সাথে সংস্কৃত প্রত্যয় যুক্ত হয়েছে। তাই ‘গন্তব্য’ কৃদন্ত শব্দ।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়: প্রশ্নঃ শব্দ গঠনে প্রত্যয়ের ভূমিকা আলোচনা কর।

উত্তর: প্রত্যয়ের প্রধান কাজ হলো শব্দ গঠন করা। শব্দের মূল বা ক্রিয়ার মূলের সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে নতুন নতুন শব্দ গঠিত হয়। প্রত্যয়গুলো এক শব্দ থেকে অন্য শব্দ তৈরি করে। কৃৎ ও তদ্ধিত প্রত্যয় অসংখ্য। কৃৎ ও তদ্ধিত প্রত্যয় দ্বারা বিভিন্ন ধরনের শব্দ গঠনের কিছু নমুনা দেয়া হলো।

কৃৎ প্রত্যয় যোগে:

তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে-

বাংলা তদ্ধিত প্রত্যয় যোগে।

এ ছাড়াও বাংলা ভাষায় প্রত্যয়ের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। যেমন-

ক) ডঃ রফিকুল ইসলাম বাংলা ব্যাকরণ সমীক্ষায় উপসর্গকেও এক প্রকার প্রত্যয় বলেছেন। তবে প্রত্যয় শব্দের পরে বসে, আর উপসর্গ শব্দের আগে বসে। দুটোর কাজ এক।

খ) বচন প্রকাশের ক্ষেত্রেও প্রত্যয়ের ব্যবহার রয়েছে। প্রত্যয় যুক্ত করে এক বচন থেকে বহুবচন করতে হয়।

গ) বাংলা ভাষায় আ, ঈ, ইনী, ইকা ইত্যাদি প্রত্যয় যোগ করে পুংলিঙ্গ শব্দকে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দে রূপান্তরিত করা হয়। যেমন-পিতামহ + ঈ = পিতামহী,  বন্দী +ইনী =বন্দিনী, ইত্যাদি।

ঘ) বাংলায় আরেক ধরনের প্রত্যয় আছে যাকে সাধারণভাবে নির্দেশক প্রত্যয় বলে। যেমন টি, টা, খানা, খানি ইত্যাদি। আবার এই, টি, টিা, গুলি ইত্যাদির সাথে কে, র ইত্যাদি যোগ করে এক পদ থেকে অন্য পদে রূপান্তর করা যায়।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়: প্রশ্ন: প্রত্যয় ও বিভক্তির মধ্যে পার্থক্য আলোচনা কর।

বিভক্তি: বাক্যের মধ্যে ক্রিয়াপদের সাথে নামপদের বা এক পদের সাথে অন্য পদের সম্পর্ক  নির্ণয়ের জন্য শব্দের শেষে যে বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয় তাকে বিভক্তি বলে।

বর্ণ অর্থাৎ, বিভক্তি হলো বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি, এরা শব্দের শেষে যুক্ত হয়ে বাক্যের জন্য পদ সৃষ্টি করে, এরা বাক্যে ব্যবহৃত ক্রিয়াপদের সাথে অন্যপদের সম্পর্ক নির্ণয় করতে সাহায্য করে। যেমন-

টেপি টেপাকে মারল। এখানে (টেপি+০), (টেপা+কে), (মার+ ইল/ল) শুন্য, কে, ইল/ল বিভক্তি।

প্রত্যয়: প্রকৃতির পরে যে সব বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে তাকে প্রত্যয় বলে। যেমন-

ঢাকা + আই = ঢাকাই   এখানে ‘আই’ ও ‘ই’ হলো প্রত্যয়।  হাত + ই = হাতি।

বাক্যের বাইরে যা শব্দ, বিভক্তি যুক্ত হলে তা হয়, পদ। অর্থাৎ শব্দ বিভক্তি যুক্ত হয়ে বাক্যে ব্যবহৃত হয়। বিভক্তি শব্দকে পদে পরিণত করে। প্রত্যয় শব্দ ও ধাতুর পরে যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠন করে। নতুন শব্দ গঠনই এর প্রধান কাজ। অন্যদিকে বিভক্তি যুক্ত না হলে শব্দ বা ধাতু বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে না।

প্রত্যয়যুক্ত শব্দের পরে বিভক্তি যুক্ত হতে পারে, কিন্তু বিভক্তি যুক্ত শব্দের পরে অন্য কিছু যোগ হতে পারে না।

বিভক্তি শব্দকে যথার্থ অর্থবহ করে তোলে এবং বচন ও কারক অনুসারে শব্দের প্রয়োজনীয় রূপান্তর ঘটায়, কিন্তু নতুন শব্দ গঠন করে না। অন্যদিকে প্রত্যয় নতুন শব্দ গঠন করে।

বিভক্তিও বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি, প্রত্যয়ও বর্ণ বা বর্ণসমষ্টি।

বিভক্তি শব্দের অংশ নয়, কিন্তু প্রত্যয় শব্দের অংশ।

বিভক্তি শব্দের পরে যোগ হয়, স্বাধীনভাবে ব্যবহার হয় না, প্রত্যয়ও শব্দের পরে যোগ হয়, স্বাধীনভাবে ব্যবহার হয় না।

প্রশ্নঃ প্রকৃতির সাথে প্রত্যয় যুক্ত হলে প্রকৃতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটে উদাহরণ সহকারে বুঝিয়ে দাও। (প্রকৃতি ও প্রত্যয়:)

উত্তরঃ শব্দ ও ধাতুর মূলকে প্রকৃতি বলে। আর প্রকৃতির পরে যে সব বর্ণ বা বর্ণসমটি যুক্ত হয়ে নতুন শব্দ গঠিত হয়, তাকে প্রত্যয় বলে।

প্রত্যয়ের সাহায্যে নতুন শব্দ গঠিত হয়, অর্থাৎ প্রত্যয় হলো বাংলা সাধিত শব্দ গঠনের অন্যতম মাধ্যম।

প্রত্যয় যুক্ত হবার ফলে প্রকৃতির অবস্থার পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনগুলোর নাম গুণ, বৃদ্ধি ও সম্প্রসারণ। এই তিনটিকে একত্রে ‘অভিশ্রুতি’ বলে।

গুণের উদাহরণ

প্রকৃতির প্রথমে ই, ঈ স্থলে এ’ হয়। যেমন

চিন্ + আ = চিনা> চেনা। এখানে ‘ই’ স্থলে ‘এ’ হয়েছে। নী+আ= নেওয়া। এখানে ‘ঈ’ স্থলে ‘এ’ হয়েছে।

প্রকৃতির প্রথমে উ, উ স্থলে ‘ও’ হয়ে থাকে। যেমন-

ধু+আ= ধোয়া। উ> ও হয়েছে।

ঋ স্থলে ‘অর’ হয়। যেমন-  কৃ+তা=করতা> কর্তা। কৃ+ অন = করণ।

বৃদ্ধিঃ প্রকৃতির সাথে কিছু কিছু প্রত্যয় যোগ করলে প্রকৃতির প্রথম স্বরে বৃদ্ধি ঘটে। যেমন-

সম্প্রসারণ:

সাধু ভাষায় বাংলা ধাতুতে প্রত্যয় যুক্ত হলে ধাতুর কোনো পরিবর্তন হয় না, কিন্তু চলিত বাংলায় ধাতু প্রকৃতির পরিবর্তন হয়। যেমন রাখ+ইয়া= রাখিয়া (সাধুরূপ)> রাইখ্যা> রেখে (চলিত রূপ)।

অনেক সময় কিছু কিছু প্রত্যয় যোগে পুরুষবাচক শব্দ স্ত্রী বাচক শব্দে রূপান্তরিত হয়। এসব ক্ষেত্রে বানানেরও পরিবর্তন হয়। যেমন বন্দী+ইনী =বন্দিনী।

অনেক সময় প্রকৃতির সাথে প্রত্যয় যোগ করলে বানানের পরিবর্তন হয়। যেমন-

কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যয় যুক্ত হলে প্রকৃতি থেকে কিছু স্বর লোপ পায়। যেমন-কবি + য = কাব্য। (ই লোপ পেয়েছে।)। সেনা+য = সৈন্য। আ লোপ পেয়েছে।

প্রত্যয় যোগ করার ফলে অনেক সময় পদেরও পরিবর্তন হয়। যেমন-‘পৃথিবী’  বিশেষ্য পদ, কিন্তু পৃথিবী+  অ= পার্থিব  বিশেষণ পদ।

এভাবে বিভিন্ন উদাহরণের সাহায্যে দেখানো যায় যে প্রত্যয় যোগ করার ফলে প্রকৃতির অবস্থার পরিবর্তন হয়।

প্রকৃতি ও প্রত্যয়: উদাহরণ

কৃৎ-প্রত্যয় যোগে শব্দগঠন:

  • টান+অক = টনককাঁদ+অন = কাঁদন > কান্না
  • ফির+তা= ফিরতা> ফেরতা
  • সিল+আই= সিলাই> সেলাই
  • উড়+উয়া= উড়ুয়া> উড়ো
  • দে+অনা=দেনা
  • নী+অক =নায়ক
  • ভাসা+আন = ভাসানো
  • খা+উকা =খাউকা> থেকো
  • সড়+অক =সড়ক
  • বৈঠ+অক =বৈঠক;
  • গাহ+ইয়ে =গাহিয়ে >গাইয়ে> গেয়ে
  • খা+উকা= খাউকা> খেকো ;  মিশ + উক = মিশুক
  • বা+আইত =বাইত+ই =বাইতি ; মর+অ =মর- মরমর মরোমরো
  • কহ+ইয়ে= কহিয়ে> কইয়ে
  • কৃ+ণক= কারক
  • খা+ অন = খাওন
  • হ+অন= হওন
  • জী+অন্ত = জ্যান্ত
  • বস+অত =বসত
  • ভর+তি = ভরতি
  • ফুট+আ=ফোটা
  • হেলা+আন= হেলানো
  • ফাট+অক =ফাটক, ফটক
  • ডাক+আইত= ডাকাইত> ডাকাত
  • পুজ+আরী = পূজারী

তদ্ধিত প্রত্যয়

  • পর+ওয়া =পরোয়া।
  • লেং (নগ্ন) +টা= লেংটা/নেংটা
  • সেবা+আইত= সেবাইত।
  • ভাগ (ভগ্ন)+আড়=ভাগাড়:
  • কাম+আর =কামার।
  • সাঁতার+আবু =সাঁতারু।
  • দয়া+আল=দয়াল;
  • মা+ইয়া =মাইয়া > মেয়ে
  • শাশ+ড়ি =শাশুড়ি
  • জাল+ইয়া-জালিয়া > জেলে:  সাপ+উড়িয়া = সাপুড়িয়া > সাপুড়ে।
  • কুম+আর = কুমার।
  • গোর (গৌর-+আ=গোরা।
  • গম+তব্য =গন্তব্য
  • ফলা+ক =ফলক।
  • পা+আ=পায়া।
  • আঁ(আগুন)+আচ =আঁচ।
  • ইহ+ইক =ঐহিক;
  • সহায়+য-=সাহায্য
  • নীল+ইমা = নীলিমা ;
  • প্রিয়+ঈয়সী= প্রেয়সী;
  • স্ব+ঈয়= স্বীয়;
  • মহৎ+ঈয়সী= মহীয়সী
  • গুরু+অ=গৌরব
  • রাজন+য =রাজ্য ;
  • ন্যায়+য=ন্যায্য
  • ভাত +উয়া = ভাতুয়া > ভেতো।  
  •  লাল + চে =লালচে> লালচে;  
  • বখা+টিয়া =বখাটিয়া > বখাটে।
  • বাদা+আড় =বাদাড়।
  • ভেজ+আল= ভেজাল।
  • সূতা+ই সুতি
  • চাম+ চা =চামচা
  • ময়+ রা=ময়রা
  • কৃ+অনীয় =করণীয়
  • সড়+কি = সড়কি।
  • মিঠা+আই =মিঠাই
  • কান+আই  =কানাই
  • উজ+আড়=উজাড়।
  • সূত+আর =সুতার > ছুতার;   
  • সিদ+আল= সিদাল>সিদেল ; 
  • ঢাক+ঈ=ঢাকী
  • বাগ+চা =বাগিচা
  • পানি+সা=পানিসা > পানসে
  • চল্লিশ +ইয়া= চল্লিশিয়া > চল্লিশে।
  • কাঠ+উড়িয়া= কাঠুরিয়া > কাঠুরে:
  • গোপাল >গোআল+ আ = গোয়ালা;
  • সেব+আইত= সেবাইত
  • ছোট+কি= ছোটকি> ছুটকি।
  • মাল (সর)+আই= মালাই:
  • ছাঁচ্+আচ=ছাঁচ:
  • চাম+আর= চামার।
  • ভিখ+আরী= ভিখারী/ ভিখারি:
  • গয়া+আল= গয়াল;
  • ঢোল+উ-=চুলি
  • হিজ+ড়া-=হিজড়া
  • লাঠি+ইয়াল= লাঠিয়াল।
  • গাছ+উয়া =গাছুয়া>গেছো।
  • ছাওয়াল+ ইয়া= ছাওলিয়া> ছেলে
  • কবি+য=কাব্য;
  • মনু+অ=মানব;
  • শিশু+অ= শৈশব;

উপসংহার: প্রকৃতি ও প্রত্যয়
বাংলা ব্যাকরণের গঠনতত্ত্বে প্রকৃতি ও প্রত্যয় দুটি অঙ্গ একে অপরের পরিপূরক। শব্দগঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রকৃতি যে অর্থবাহী ধাতু বা পদ, তা থেকেই নতুন শব্দের জন্ম ঘটে; আর প্রত্যয় সেই শব্দে সংযোজিত হয়ে অর্থ, রূপ ও ব্যাকরণগত পরিবর্তন ঘটায়। অর্থাৎ, প্রকৃতি ও প্রত্যয়–এর যুগল সংযোগেই বাংলা ভাষায় নিত্যনতুন শব্দ সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

শব্দের রূপবৈচিত্র্য, অর্থবৃদ্ধি ও ভাবপ্রকাশের সৌন্দর্য – সবকিছুরই পেছনে প্রকৃতি ও প্রত্যয়–এর কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। তাই বলা যায়, বাংলা শব্দতত্ত্ব বুঝতে হলে প্রকৃতি ও প্রত্যয় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। যে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রকৃতি ও প্রত্যয় থেকে প্রশ্ন থাকে। তাছাড়া প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের জ্ঞান ছাড়া ভাষার দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। নিত্যনতুন শব্দ-গঠন, শব্দ প্রয়োগে বৈচিত্র্য আনা, ভাষার গাথুনি মজবুত করতে প্রকৃতি ও প্রত্যয়ের অতি আবশ্যক।

4 Responses

  1. ধন্যবাদ স্যার,,, সময়পযোগী একটা পোস্ট,,, অনেক উপকার হবে আমাদের 🤍

  2. অসাধারণ ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বপরি বলতে চাই,খোলা পাতা আমাদের জন্য আর্শিরবাদ।💝💝💝💝💝

  3. প্রিয় স্যার,অসাধারণ ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বপরি বলতে চাই,খোলা পাতা আমাদের জন্য আর্শিরবাদ।💝💝💝💝💝

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *