অনার্য প্রভাব বাংলা ভাষায় অনার্য প্রভাব আলোচনা করে দেখাও যে, “অনার্য প্রভাবের মধ্যে একমাত্র কোল (মুন্ডা) ভাষার প্রভাবই বেশি।”

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

বাংলা ভাষায় অনার্য প্রভাব

বাংলা ভাষার গঠন ও বিকাশে আর্য ভাষার পাশাপাশি অনার্য ভাষারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। বাংলার প্রাচীন ভূখণ্ডে আর্য জাতির আগমনের পূর্বেই বহু অনার্য জনগোষ্ঠী বাস করত। যেমন—দ্রাবিড়, মুণ্ডা, কোল, ভিল, সাঁওতাল প্রভৃতি জাতি। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, উচ্চারণ, ব্যাকরণ ও ভাবধারায় গভীর ছাপ রেখে গেছে।

বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত – ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্
অনার্য শব্দ

বাংলা ভাষায় প্রচুর অনার্য শব্দ পাওয়া যায়—যেমন ‘ডাল’, ‘বাচ্চা’, ‘মাটি’, ‘কোদাল’, ‘বউ’, ‘লাঠি’, ‘মাছ’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বাংলা ভাষার স্বরাঘাত, ধ্বনিগত সরলতা, ও প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা ভাবধারা অনার্য প্রভাবের ফল। অনার্য জাতির লোকজ রীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস, এবং দৈনন্দিন জীবনের শব্দভাণ্ডার বাংলা ভাষার ভেতর মিশে গিয়ে তাকে করেছে প্রাণবন্ত ও দেশজ।

আর্যরা ভারতবর্ষে আসার আগে এদেশে যারা বাস করতো, তাদেরকে অনার্য বলা হতো। এদের ব্যবহৃত ভাষাই হলো অনার্য ভাষা। বাংলা ভাষা আর্য ভাষার বিবর্তনের ফল। বাংলা ভাষা বিবর্তনের সময় অনার্য ভাষার অনেক রূপ স্বীকার বা আয়ত্ত করে। তবে দ্রাবিড়, অস্ট্রিক, ভোটচীনীয় (তিব্বতী বর্মী), কোল (মুন্ডা) প্রভৃতি অনার্য ভাষার মধ্যে কোল বা মুন্ডা ভাষার প্রভাবই বাংলা ভাষায় বেশি লক্ষণীয়। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা সে বিষয়ে আলোকপাত করবো।

আর্য জাতির আগমনকালে ভারতবর্ষে দ্রাবিড় ভাষা প্রতিষ্ঠিত ভাষা বলে তার প্রভাব থাকাটা স্বাভাবিক এমনটি মনে করেন অনেকে। মূর্ধন্য ধ্বনির ব্যবহার, শব্দের প্রথমে যুক্তাক্ষর না থাকা ইত্যাদি যে বৈশিষ্ট্য দ্রাবিড় থেকে এসেছে বলে মনে হয়, তা সঙ্গত নয়, কেননা এগুলো মুন্ডা ভাষারও বৈশিষ্ট্য।

বহুবচনের ‘গুলা’ ‘রা’ দ্রাবিড় প্রভাবজাত মনে হলেও ডাঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন দ্রাবিড় বিভক্তির সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। উলু, পিলে, কুড়া, খাল ইত্যাদি শব্দ, গ্রামের নামের সাথে যুক্ত জোল, কুন্ড, ভিটি ইত্যাদি দ্রাবিড় প্রভাবজাত মনে হলেও ডাঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, সেন বংশীয় রাজারা কর্ণাটক থেকে এসেেেছন বলে ‘কানাড়ী’ ভাষা থেকেই ঐগুলো আসতে পারে।

গ্রামের নামের শেষে দহ, দ, কোল, বাড় ইত্যাদি শব্দ অষ্ট্রিক প্রভাবজাত বলে মনে হয়। পূর্বাঞ্চলীয় স্থানীয় উপভাষার উপর ভোটধর্মী (তিব্বতীবর্মী) ভাষার প্রভাব লক্ষণীয়। যেমনÑ ঘ, ধ, ভ, ড়(ঢ়) মহাপ্রাণতা হারিয়ে গ, দ, ব, র হয়ে যাওয়া।

এভাবে অনার্য প্রভাব আলোচনা শেষে বলা যায় যে, অষ্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটবর্মী ভাষার প্রভাব তেমন নেই বললেই চলে। মুন্ডা বা কোল ভাষার প্রভাবই সবচেয়ে বেশিÑ এটা অনেকে স্বীকার করেছেন। এবার বাংলা ভাষার উপর অনার্য প্রভাব হিসেবে কোল বা মুন্ডা ভাষার প্রভাব আলোচনা করা যেতে পারে।

বাংলা ভাষায় অনার্য প্রভাব হিসেবে মুন্ডা ভাষার প্রভাব

(ক) ধ্বনিতাত্ত্বিক দিক থেকে অনার্য প্রভাব

১। বাংলা ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর দ্বিস্বরধ্বনির সংখ্যাধিক্য। যেমনÑ ঐ, ঔ, অয়, অও, ইই, ইউ ইত্যাদি সংস্কৃতে এ বৈশিষ্ট্য নেই কিন্তু মুন্ডা ভাষায় আছে।
২। বাংলায় যেকোনো স্বরধ্বনিই আনুনাসিক হতে পারে। মুন্ডা ভাষায়ও এরকম হয়ে থাকে।
৩। বাংলা ভাষার স্বরসঙ্গতির নিয়মকে সাঁওতালী ভাষার সাথে সাদৃশ্য করে দেখেছেন সুনীতি কুমার। তিনি অবশ্য কোল বা মুন্ডা ভাষার সকল প্রাদেশিক ভাষায় এটি আছে বলে স্বীকার করেছেন। ডঃ শহীদুল্লাহ মনে করেন যে, দ্রাবিড় ভাষাসমূহ মুন্ডা ভাষাগোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছে।

৪। কোনো বাংলা শব্দই যুক্ত ব্যঞ্জন দিয়ে শুরু হয় না। মুন্ডা ভাষায়ও এ নিয়ম রক্ষিত হয়েছে।
৫। খাঁটি বাংলা শব্দ ‘য়’ ও অন্তঃস্থ ‘ব’ দিয়ে আরম্ভ হয় না। মুন্ডা ভাষাতেও হয় না।
৬। বাংলা ভাষায় স, শ, ষÑ তিনটি শ-কার উচ্চরিত হয়। মুন্ডা ভাষাও শ-কার উচ্চারণ হয়ে থাকে।
৭। বাংলায় অনেক শব্দের প্রথম ‘ল’ ও ‘ন’ ধ্বনি পরষ্পর স্থান পরিবর্তন করে। যেমনÑ লাল>নাল, লাচার>নাচার, লঙ্গর>নোঙ্গর ইত্যাদি।
‘ল’ ও ‘ন’ এর স্থান পরিবর্তন মুন্ডাতেও দেখা যায়।

৮। ‘ণ’ ‘ড়’ ‘ঢ়’ দ্বারা কোনো বাংলা শব্দ শরু হয় না। মুন্ডাতেও এই রীতি লক্ষ করা যায়।
৯। স্বরধ্বনির পরিমাণের দিক থেকেও উভয় ভাষার আশ্চর্য রকম মিল লক্ষ্য করা যায়। (একাক্ষরিক, অনাক্ষরিক)
১০। মহাপ্রাণ ঘোষ, অঘোষধ্বনি বাংলা ও মুন্ডা উভয় ভাষায় ব্যবহৃত হয়। তবে মুন্ডা গোষ্ঠীর শবর ভাষা দ্রাবিড় ভাষার প্রভাবে প্রথক ধ্বনিতাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে।

খ) রূপতাত্ত্বিক দিক থেকে অনার্য প্রভাব

১। খাঁটি বাংলা শব্দে বিশেষণের অন্বয় বিশেষ্যের বচন, লিঙ্গ ও কারকের সঙ্গে হয় না। যেমনÑ বড় ছেলে, ছোট ছেলে, বড় মেয়ে, ছোট মেয়ে, ছোট মেয়েদের। এক্ষেত্রে বাংলা সাথে মুন্ডার মিল রয়েছে।
২। মুন্ডা ভাষার মত বাংলাতও উভয় লিঙ্গবাচক শব্দের আগে পুরুষ বা স্ত্রীবাচক কোনো শব্দ ব্যবহার করে লিঙ্গ নির্দেশ করা হয়। যেমনÑ বেটা ছেলে, মেয়ে ছেলে ইত্যাদি।
৩। বাংলায় মূল শব্দের সঙ্গেই কারক বিভক্তি যুক্ত হয় অকর্তৃকারকের রূপে নয়। মুন্ডা ভাষাতেও এই বৈশিষ্ট্য আছে। দ্রাবিড় ভাষাতে অকর্তৃকারকের রূপে যুক্ত হয়।

বাংলা মুন্ডা
কর্ম ও স¤প্রদানে- ‘কে’ ‘কে’ শবরে– ‘কু’
করণে ‘তে’ সাঁওতালী মুন্ডায়- তে
সম্বন্ধে ‘র’-এর ‘রেন’ (সাঁওতালী, মুন্ডারী, কোড়া)
অধিকরণে- ‘তে’ ‘রে’ তে (খড়িয়া)
কর্তায়, কর্মে- ‘০’ ‘রে’ (সাঁওতালী, মুন্ডারী) ‘০’

ছকে উল্লিখিত কারক বিভক্তি শুধু একবচনে নয়, বহুবচনেও যুক্ত হয়। মুন্ডাতেও তদ্রূপ হয়ে থাকে।

৪। বাংলায় বিশেষ্য ও সংখ্যাবাচক শব্দের সাথে নির্দেশক Ñটা, Ñটি ব্যবহৃত হয়। যেমনÑ একটা, ছেলেটি ইত্যাদি। মুন্ডা ভাষাতেও এ ক্ষেত্রে অনুরূপ নির্দেশক ব্যবহৃত হয়। যেমনÑ হাপান-দা = ছেলেটা। ‘হেনটে’ = বাচ্চাটি ইত্যাদি।
৫। বাংলায় কখনো কখনো বিশেষণ বোঝাতে সম্বন্ধ পদের প্রয়োগ হয়। যেমনÑ ‘সোনার কলম’। মুন্ডতেও এ রকম ব্যবহার রয়েছে।

গ) পদক্রমের দিক থেকে সাদৃশ্য: (অনার্য প্রভাব)

পদবিন্যাসের দিক থেকেও মুন্ডা ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার মিল রয়েছে। বাংলা বাক্যে পদবিন্যাসের প্রচলিত ক্রম হলো-

২। মুন্ডা ভাষার মতো বাংলা ভাষায়ও পরোক্ষ উক্তি ব্যবহৃত হয় না।
৩। কখনো কখনো ‘বলে’ (বলিয়া) যোগে বাংলায় পরোক্ষ উক্তি প্রয়োগ করা হয়। যেমন- সে ভাল ছেলে বলে সকলে তাকে ভালোবাসে। মুন্ডা ভাষাতেও এই একই রীতি দেখা যায়।
৪। বাংলায় শব্দদ্বৈতের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। যেমন- প্রাচীন বাংলায়- আলজালা (তুচ্ছ), উঞ্চল-পাঞ্চল (ছটফট করা), একুবাকু (আঁকাবাঁকা) ইত্যাদি।
আধুনিক বাংলা- অলিগলি, আবোলতাবোল, ইত্যাদি।
সাঁওতালী ও অন্যান্য মুন্ডা ভাষাতেও শব্দদ্বৈতের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। যেমন- সাঁওতালী অচেল পচেল (ধনদৌলত), অধাপধা (অসমাপ্ত), অর্চিরপচির (ঘরবাড়ি) অহিবহি (ব্যস্ত) ইত্যাদি।

৫। বাংলা ভাষায় ক্রিয়াপদ গুলো বিশেষণ রূপেও ব্যবহৃত হয়। যেমন- প্রাচীন বাং- বেঢ়িল হাক, ম, বাং- কাটিল (কদলী), ভূখিল (কাক)। আঃ বাং- চেনা লোক, আসছে কাল। মুন্ডা ভাষাতেও তদ্রূপ।

ঘ) শব্দকোষ-এর দিক থেকে অনার্য প্রভাব

বাংলা ভাষায় বহু অনার্য শব্দ রয়েছে। তবে বেশির ভাগ মুন্ডা গোষ্ঠীর শব্দ। অষ্ট্রিক ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর শব্দও রয়েছে। মুন্ডা গোষ্ঠীর কতকগুলো শব্দ-
কাঁড়া (মহিষ), মেনী (বিড়াল), কুড়ি। ডঃ শহিদুল্লাহ অনেক শব্দের কথা বলেছেন যা তাঁর ধারণায় মুন্ডা থেকে আসতে পারে। যেমনÑ
আকাল, আখড়া, বড়শী, বট (বড়ে), বেঁটে (বন্ড), হাঁ (হে), খুঁটি (খুঁটু) ইত্যাদি।

এছাড়াও বাংলা ভাষার শব্দ ভান্ডারে অনেক শব্দকে ‘দেশি’ বলে শ্রেণীভূক্ত করা হয়েছে। যেমন- ঝাড়, ঝোপ, ঝিঙ্গ, ঢোল, ঢাকা, ঢ্যাঙ্গা, ঢেঁকুর ইত্যাদি। এসব শব্দের উৎস পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয় দ্রাবিড়, কোল, ভোটবর্মী, মোনখমের ভাষাগুলোর মধ্যে অনুসন্ধান করলে এ জাতীয় শব্দের মূল পাওয়া যেতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় যে, বাংলা ও মুন্ডা ভাষার মধ্যে যে মিল, তা কেবল ঋণ গ্রহণ নয়, গভীর প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। বাংলা ভাষার উপর অনার্য ভাষার প্রভাব আলোচনা শেষে বলা যায় বর্তমান বাংলা ভাষাভাষির স্থান সমূহে একদা অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষাসমূহ প্রচলিত ছিল। এসব স্থানে পরে আর্য ভাষা প্রতিষ্ঠিত হয়। অনার্য ভাষা সমূহ আর্যভাষার প্রভাবে নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। তবু অষ্ট্রিক গোষ্ঠীর ভাষাসমূহ বাংলায় শুধু বাকভঙ্গির ছাপই রেখে যায় নি, শব্দ কোষেও প্রচুর শব্দ রেয়ে গেছে। হয়তো বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাপকতর গবেষণায় আরও প্রভাব আবিষ্কার হতে পারে।

অষ্ট্রিক ভাষাগোষ্ঠী

(শবর, সাঁওতালী, মন্ডারী)

দ্রাবিড় — উত্তর, পশ্চিম, মধ্য, অন্ধ্র, তেলেগু, দক্ষিণ, ব্রাহুই, গোন্ডীম, কই, কুরুখ,
মালতো (ওরাও), টুলু, কন্নড, প্রাচীন তামিল —-মলয়লেম তামিল

উপসংহার

বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশে অনার্য প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। এই অনার্য প্রভাব-ই বাংলা ভাষাকে করেছে স্থানীয়, প্রাণবন্ত ও মানুষের মুখের ভাষা। ভাষার গঠন, শব্দভাণ্ডার, স্বরধ্বনি ও ভাবপ্রকাশে যে স্বতন্ত্রতা দেখা যায়, তার পেছনে রয়েছে অনার্য জনগোষ্ঠীর দীর্ঘকালীন সহাবস্থান। তাই বলা যায়, বাংলা ভাষার ইতিহাসে অনার্য প্রভাব কেবল একটি প্রাথমিক ধাপ নয়, বরং এটি ভাষার শিকড়-নিবদ্ধ ঐতিহ্য। বাংলা ভাষার স্বরূপ ও আত্মাকে বুঝতে হলে অনার্য প্রভাব অনুধাবন করা অপরিহার্য।

আগের পোস্ট পড়তে ক্লিক করুন

প্রকৃতি ও প্রত্যয় : সংজ্ঞা, প্রকারভেদ, শব্দ-গঠনে ভূমিকা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *