কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি।


কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস : শিল্পের মানদণ্ডে বিচার।
ভূমিকা
উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগের সৃষ্টি। সার্থক বাংলা উপন্যাসের জন্ম বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে। উপন্যাসের শিল্পমূল্য বা সফলতা বিচার করতে গেলে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু গ্রন্থের দিকে তাকাতে হয়, যেগুলো এই শিল্পমূল্যের আদর্শ রূপ প্রদান করেছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস সেই তালিকার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস পাঠককে শুধু একটি নাটকীয় কাহিনির ভেতর নিয়ে যায় না, বরং উপন্যাসের শিল্পমূল্য কীভাবে নির্ণয় করা যায়, তারও বাস্তব নমুনা হাজির করে।


কারণ উপন্যাসের শিল্পমূল্য নির্ভর করে কাহিনির বিন্যাস, চরিত্রচিত্রণের সফলতা, ভাষাশৈলী, দেশ-কাল-বিশ্বাসের বাস্তবতা, মনস্তত্ত্বের গভীরতা, বর্ণনার ছন্দ, রসসংযোজন, নাটকীয় গতি, দার্শনিক ব্যঞ্জনা এবং নৈতিক মূল্যবোধের উপর। এ-সব দিকেই কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস তার স্বাতন্ত্র্য দেখিয়েছে; তাই কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসটি শিল্পমূল্য বিচারে একটি অসাধারণ শিল্পসৃষ্টি।
উপন্যাসটির কাহিনির সুষমা, চরিত্রের বহুমাত্রিকতা, বর্ণনার পরিমিতি, আবেগের আন্তরিকতা এবং চিন্তার গভীরতা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস আবারও প্রমাণ করে যে শিল্পমূল্যের মূল চাবিকাঠি হলো লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির শিল্পিত প্রকাশ। একটি শিল্পগুণসম্পন্ন উপন্যাস কেবল গল্প বলে না; পাঠকের সামাজিক ও নৈতিক বোধকে নাড়া দিয়ে তাকে নতুনভাবে ভাবতেও শেখায়। তাই কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস একটি সফল উপন্যাস —এর কাহিনি, গতি, রসবোধ, দার্শনিকতা এবং শৈল্পিক বুনন বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য গ্রন্থ।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের তথ্য-কণিকা:
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) উল্লেখযোগ্য সামাজিক উপন্যাস ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ (১৮৭৮)।
- কৃষ্ণকান্তের উইল —বাংলা সাহিত্যের প্রাণপুরুষ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি বাংলা উপন্যাস। উপন্যাসটি ১৮৭৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়।
- রোহিনী, ভ্রমর এবং গোবিন্দলালের ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনী বর্নিত হয়েছে কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে।
- এটি একটি সামাজিক উপন্যাস।
- প্রথম প্রকাশ — ১৮৮২ ও ১৮৮৪ সালে বঙ্গদর্শন পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
- উপন্যাসটির নাম কৃষ্ণকান্ত চরিত্রের নামে কৃষ্ণকান্তের উইল, কিন্তু সে চরিত্রটি , মুখ্য চরিত্র না।
- যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে উপন্যাসটি রচিত, তাতে বাহ্যিক বিচরণগুলো দেখিয়ে মূলটাকে লুকিয়ে রাখা হয়। এ উপন্যাসে মুখ্যচরিত্র কে তা বলা মুশকিল।
- উইল: জমিদার কৃষ্ণকান্ত তাঁর সারাজীবনের জমানো অর্থ মরার আগে তাঁর পুত্র-কন্যার মধ্যে ভাগ করে দিতে চান।
- বড়পুত্র হরলাল এই ভাগবাটোয়ারা মেনে নেয় না, নতুন উইল করার ফন্দি আঁটে।
- কাহিনি এগিয়ে চলে নতুন চরিত্রের দ্বারা।
- কৃষ্ণকান্তের ভ্রাতপুত্র গোবিন্দলাল, তাঁর পত্নী কালো- কুৎসিত ভ্রমর, আর সুন্দরী রুপবতী বিধবা রোহিনী। কাহিনির বাকি ঘটনাগুলো তাঁদের প্রেম অভিমান ঘিরেই গড়ে উঠেছে।
- অনেক বড় উপন্যাস। সাধুভাষায় লেখার কারণে উপন্যাস পড়তে একটু সমস্যা হতে পারে।
- প্রথম দিকে সাধারণ মনে হলেও এর আসল রহস্য তো শেষের দিকে।
- এ উপন্যাসের , নায়ক আর খলনায়ক আলাদা নয় বরং একজনই।
- কৃষ্ণকান্তের উইল কার কতটুকু- কৃষ্ণকান্ত তার দুই ছেলেকে তিন আনা করে, স্ত্রী কন্যাকে এক আনা করে ও ভাইপো গোবিন্দলাল কে আট আনা উইল করে ভালো চরিত্রের বলে।
- গোবিন্দলালের নামে আট আনা পরিবর্তন হলো কেন?
- স্ত্রী ভ্রমর থাকা সত্ত্বেও, রোহিনী প্ররোচনা করলে প্রেমে পরে যায় গোবিন্দলাল এবং ভ্রমর বাবার অসুস্থতায় বাবার বাড়ি গেলে পালিয়ে যায় তারা। পরে কৃষ্ণকান্ত রেগে ভ্রমরের নামে আট আনা উইল করে দেয়,
- ঘটনার রহস্য দানা বাঁধে: লেখক ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রোহিনীকে গোবিন্দলালের কাছে চরিত্রহীনা হিসেবে উপস্থাপন করে। রোহিনী আবার নিশাকরের প্রেমে পড়ে যায়।
- গোবিন্দলাল রোহিনীকে গুলি করে হত্যা করে। সাত বছরের জেল হয়।
- ফেরত এসে দেখে বউ মৃত্যুমুখে পতিত হয় স্বামীর শোকে। পরে সে গৃহত্যাগ করে ১২ বছর পর এক ঝলক বাড়ি এসে চিরতরে হারিয়ে যায় ভ্রমরের শোকে।
- ভালোবাসা বনাম মোহ
- রূপ দেখে কি ভালোবাসা হয়? রূপ আকৃষ্ট করে ঠিকই কিন্তু বাহ্যিক রূপের আকর্ষণ তো শুধুই মোহ। অন্যদিকে ভালোবাসা চির স্নিগ্ধ। মোহ, এক অন্ধকার জগত, মোহ মানুষকে মুগ্ধ করে, উন্মত্ত করে, হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত করে। মোহ, সে তো এক কানাগলি যা চিরকালের নয়।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের গোবিন্দলাল শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলো এ তো গুণ নয় রূপ, এ তো ভ্রমর নয় রোহিণী, এ তো ভালোবাসা নয় মোহ,। কিন্তু গোবিন্দলাল যা হারানোর তা হারিয়ে ফেলে। চিত্ত ও মন ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। , ন’বছর সাথে থাকা সতেরো বছরের বালিকাবধূকে সে কয়েক যোজন দূরে হারিয়ে ফেলে।
‘কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস ’ — মূল তথ্য (Key Points)
প্রকাশ ও রচনা সংক্রান্ত তথ্য
- লেখক: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
- প্রকাশকাল: ১৮৭৮
- পরে ১৮৮২ ও ১৮৮৪ সালে বঙ্গদর্শন-এ প্রকাশ
- জীবদ্দশায় মোট ৪টি সংস্করণ; সর্বশেষ ১৮৯২ সালে
ধরন (Genre)
- সামাজিক উপন্যাস
- বাংলা উপন্যাসের ইতিহাসে প্রাপ্তবয়স্ক প্রেম–নৈতিকতা–সামাজিক জটিলতার প্রাথমিক সফল প্রয়োগ
কাহিনির মূল উপাদান
- সম্পত্তির উইল–কে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব
- গোবিন্দলাল–ভ্রমর–রোহিণী ত্রিকোণ প্রেম
- বিধবা রোহিণীর প্রতি আকর্ষণের কুফল
- নৈতিকতার অবক্ষয় ও পরিণতি
- ট্র্যাজেডিক সমাপ্তি: রোহিণীর মৃত্যু, ভ্রমরের মৃত্যু, গোবিন্দলালের গৃহত্যাগ
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের শিল্পমূল্য
- রোহিণীর চরিত্র বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী নারীচরিত্র
- নারীর অন্তর্জগত, চাওয়া–পাওয়া, মানসিক দোলাচল প্রথমবার বিশ্লেষণের চেষ্টা
- চরিত্রের মনস্তত্ত্বে গভীরতা
- সামাজিক কূটনীতি, পুরুষতন্ত্র, বিধবা-জীবনের সংকট ফুটে ওঠে
- ‘মোহ ও প্রেম’-এর সূক্ষ্ম পার্থক্যকে বঙ্কিম অসাধারণভাবে উপস্থাপন করেছেন
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের থিম (Themes)
- রূপ বনাম গুণ
- প্রেম বনাম মোহ
- বিশ্বাসঘাতকতা
- নারী–পুরুষ সম্পর্কের টানাপোড়েন
- সামাজিক বিধিনিষেধ
- পাপ–পুণ্য ও নৈতিক পতন
- ট্র্যাজেডির অনিবার্যতা
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের লেখকের সমাজভাবনা:
লেখক দেখিয়েছেন এ সমাজের চারপাশে হরলালের মতো এমন অনেক মানুষ আছে যাদের কাছে গুরুতর অন্যায়টাই ন্যায়। শঠতাই যাদের স্বভাব। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য মানুষ যে কতটা অধম হতে পারে তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হরলাল। আবার ব্রক্ষ্মানন্দের মতো কিছু আশ্রিত মানুষও আছে যারা ঠিক মুনিবভক্তি নয় বরঞ্চ নিজেদের বিপদের কথা ভেবেই মুনিবের বিরুদ্ধে যেতে পারেনা কিন্তু লোভ সংবরণ করাটাও তাদের পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়ে।
সময়ের কথা সময়ে বলে ফেলার মূল্য যে কতখানি তা বঙ্কিমচন্দ্র এই উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠককে বুঝিয়ে দিয়েছেন। গোবিন্দলাল যদি তার কালিন্দী ভ্রমরকে একবার সেই রাত্রে উদ্যানগৃহে ঘটে যাওয়া ঘটনা খুলে বলতো তাহলে হয়তো উপন্যাসের শেষটা এমন নাও হতে পারতো। আবার হয়তো সবকিছুর পরেও ভ্রমরের ভক্তি, ভালোবাসা রোহিণীর রূপের কাছে হার মানতো। কারন ওইযে, আমরা বেশিরভাগ সময়ই রূপের পূজারী। ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত একটি সামাজিক উপন্যাস, যেখানে গোবিন্দলাল, ভ্রমর এবং রোহিণীর ত্রিভুজ প্রেমের গল্প বলা হয়েছে।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের কাহিনির বিভিন্ন স্তর:
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের মূল ঘটনা শুরু : কৃষ্ণকান্ত রায়ের উইলকে কেন্দ্র করে,
উইলের সূত্রপাত: কৃষ্ণকান্ত রায় তাঁর সম্পত্তির একটি অংশ নিজের স্ত্রীর বর্তমান, গোবিন্দলাল, এবং তাঁর দুই পুত্র ও এক কন্যার মধ্যে ভাগ করে উইল করেন।
প্রেমের ত্রিকোণ: গোবিন্দলাল তাঁর স্ত্রী ভ্রমরকে ভালোবাসলেও বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে তাঁর জীবনে রোহিণীর প্রবেশ ঘটে। রোহিণী একজন সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী বাল্যবিধবা, যিনি গোবিন্দলালকে প্রথম থেকেই ভালোবাসতেন এবং তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন।
আইন ও সম্পর্কের জটিলতা: জমিদার কৃষ্ণকান্ত রায়ের উইলকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সম্পত্তি নিয়ে আইনি জটিলতা এবং রোহিণীর প্রতি গোবিন্দলালের আকর্ষণ, ভ্রমর ও রোহিণীর মধ্যে এক জটিল সম্পর্কের সৃষ্টি করে। হরলাল ও গোবিন্দলাল, রোহিণী ও ভ্রমর একটা জটিলতার মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। পরিণতি হয় ভয়াবহ।
দুর্ঘটনা ও পরিণতি: গল্পে রোহিণীর বুদ্ধিমত্তা ও চাতুর্যের পাশাপাশি গোবিন্দলাল ও ভ্রমরের সম্পর্কের মধ্যে আসা টানাপোড়েন এবং তার পরিণতি হলো উপন্যাসের মূল উপজীব্য।
উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য: এই উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র বিধবার প্রতি পুরুষের প্রেমাসক্তির কুফল এবং সমাজের কিছু বাস্তব দিক তুলে ধরেছেন, যা এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক উপন্যাসে পরিণত করেছে।
সামাজিক উপন্যাস হিসেবে কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস :
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস একটি সামাজিক উপন্যাস, যা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা। এটি গোবিন্দলাল, ভ্রমর এবং রোহিণীর ত্রিকোণ প্রেমের গল্প বলে, যেখানে একটি জাল উইল এবং এর ফলে সৃষ্ট জটিলতাগুলোই প্রধান চালিকাশক্তি। উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু হলো প্রেম, লোভ, সামাজিক রীতিনীতি এবং হিন্দু সমাজে বিধবা পুনর্বিবাহের মতো বিষয়গুলো।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের প্রধান চরিত্র: উপন্যাসটির প্রধান চরিত্রগুলো হলো গোবিন্দলাল, তার স্ত্রী ভ্রমর এবং রোহিনী নামের এক বিধবা নারী।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস –কাহিনি সংক্ষেপ:
- বৃদ্ধ কৃষ্ণকান্ত রায় তাঁর সম্পত্তি নিয়ে একটি উইল করেন, যা পরবর্তীতে জাল করা হয় এবং এর ফলে গোবিন্দলাল ও ভ্রমরের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্দশা।
- এই উইলকে কেন্দ্র করে গোবিন্দলাল এবং রোহিণীর মধ্যে একটি অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা ভ্রমরের জন্য মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়ায়।
- উপন্যাসটি মূলত এই তিনজনের সম্পর্ক এবং এর ফলে উদ্ভূত সামাজিক ও পারিবারিক সংঘাতের উপর আলোকপাত করে।
মূল প্রতিপাদ্য: উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য হলো, বিধবা নারীর প্রতি পুরুষের আসক্তি কতটা বিধ্বংসী হতে পারে, এবং কীভাবে একটি জাল উইল পুরো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
গুরুত্ব: কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উপন্যাস হিসেবে স্বীকৃত, যা উনিশ শতকের বাংলা সমাজের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছে।
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে চরিত্র:
রোহিণী চরিত্র: : রোহিণী ছিল একজন যুবতী বিধবা, যিনি রূপে, গুণে এবং বুদ্ধিমত্তায় ছিল অসাধারণ।
প্রেমের সম্পর্ক: তিনি ছিলেন উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র গোবিন্দলাল এবং ভ্রমরের সাথে একটি ত্রিভুজ প্রেমের সম্পর্কের অংশ।
আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব: নিজের রূপ ও গুণের জন্য তিনি সংসার সুখ থেকে বঞ্চিত ছিলেন এবং তাঁর জীবনে প্রেম, বিশ্বাস ও প্রতারণা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উপন্যাসে রোহিনী, গোবিন্দলাল ও ভ্রমরের বিষাক্ত বা নিষিদ্ধ প্রেমের কাহিনি বর্ণিত হয়। স্ত্রীর বর্তমানে বিধবা নারীর প্রতি পুরুষের প্রেমাসক্তির কুফল এ উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য।
উপন্যাসের সবচেয়ে আলোচিত তথা বাংলা সাহিত্যের এক অমর চরিত্র ‘রোহিনী’। বাল্যবিধবা রোহিনী রূপবতী, বুদ্ধিমতী ও চঞ্চলা। অন্যদের থেকে রূপে গুণে বেশি হয়েও সে বিধবা হওয়ায় সংসার সুখ থেকে বঞ্চিত। প্রথমেই সে সম্পত্তির উইল চুরি করে কৃষ্ণকান্তের সাথে প্রতারণা করে হরলালকে বিয়ে করার জন্য কিন্তু হরলাল রোহিণীর সাথে প্রতারণা করে। সে বলে- ‘আমি যাই হই, কৃষ্ণকান্ত রায়ের পুত্র, সে (রোহিনী) চুরি করিয়াছে তাহাকে কখনো গৃহিণী করিতে পারিব না।’ হরলাল প্রত্যাখ্যান করে রোহিণীকে।
গোবিন্দলাল ও রোহিণীর সম্পর্কের শুরু কীভাবে?
হরলাল কর্তৃক প্রথ্যাখ্যাত হয়ে রোহিনী প্রেমে পড়ে কৃষ্ণকান্ত রায়ের ভ্রাতুষ্পুত্র, ভ্রমরের স্বামী গোবিন্দলালের। হরলালের উপর রাগ করে রোহিণীিউইল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। গোবিন্দলাল করুণাবশত রোহিনীকে চুরির অপরাধে কৃষ্ণকান্তের শাস্তি থেকে বাঁচাতে চায়। সুয়োগ পেয়ে রোহিণী গোবিন্দলালকে ভাললাগার কথা বলে ফেলে। কিন্তু গোবিন্দলাল সাড়া দেয় না। গোবিন্দলালকে না পাওয়ার বেদনা ও ব্যর্থ যৌবনের হাহাকারে সে বার বার আত্মহত্যার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে বাল্যবিধবা রোহিণীর অসাধারণ রূপ ও সব কাজের দক্ষতা স্ত্রীর ভালবাসায় পরিপূর্ণ থাকা সত্ত্বেও গোবিন্দলালকে আকর্ষণ করে। গোবিন্দলাল রোহিনীর প্রেমে সাড়া দেয়।
ভ্রমর চরিত্র:
উপন্যাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য নারী চরিত্র গোবিন্দলালের স্ত্রী ভ্রমর । উপন্যাসের সমগ্র কাহিনিতে তার উপস্থিতি। স্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সহজ সরল। তার কাছে স্বামীই সব। তার মতে স্বামীকে অবিশ্বাস করতে নেই, সব ক্ষেত্রেই স্বামীকে অনুসরণ করা স্ত্রীলোকের ধর্ম। ভ্রমর কোন দিন বিশ্বাস করতে পারে নি গোবিন্দলাল রোহিণীকে ভালোবাসতে পারে। এটা তার চিন্তারও বাইরে। কিন্তু গোবিন্দলাল রোহিণীর প্রেমে পড়ে এই ভ্রমরের সাথে প্রতারণা করে। একপর্যায়ে স্ত্রীকে রেখে রোহিনীকে নিয়ে গোবিন্দলাল পালিয়ে যায় এবং তারা যশোরে একা বাস করতে থাকে। তবে গোবিন্দলাল রোহিনীকে স্ত্রীর মর্যাদা দেয় না, কিন্তু তার কাছ থেকে শর্তহীন পতিব্রতা দাবি করে।
গোবিন্দলালের মনে দোলাচল:
গোবিন্দলাল রোহিণীকে নিয়ে পালিয়ে গিয়ে বসবাস করার সময় অর্থাৎ রোহিণীর সাথে বসবাসের সময় একপর্যায়ে সে ভ্রমরকে ফিরে পেতে চায়। একইভাবে গোবিন্দলাল ভ্রমরের সাথে বসবাস করার সময় ঐ রোহিণীকে কামনা করেছিল। এখানেই গোবিন্দলালের জীবনের ট্রাজেডি। গোবিন্দলাল যা চেয়েছে, আর যা পেয়েছে তার জন্য সে কখনোই প্রস্তুত থাকে নি ।
ভ্রমরের পিতার প্রতিশোধ:
ভ্রমরের পিতা নিজের কন্যার সংসার ও জীবন বাঁচানোর জন্য রোহিণী গোবিন্দলালকে আলাদা করার কৌশল অবলম্বন করে। সে চক্রান্ত করে নিশাকরের মাধ্যমে একটি ফাঁদ পাতে। রোহিণীর নিজের রূপ নিয়ে অহংকার ছিল। রোহিণী নিজের রূপের আকর্ষণ যাচাইয়ের মোহে সে ফাঁদে পা দেয়। নিশাকরের সাথে চুপিসারে দেখা করতে এসে গোবিন্দলালের নিকট হাতেনাতে ধরা পরে। এতে রাগান্বিত গোবিন্দলাল রোহিনীকে গুলি করে হত্যা করে।
গোবিন্দলালের শাস্তি:
পুলিশ গোবিন্দলালকে গ্রেপ্তার করলে গোবিন্দলালের শ্বশুর মিথ্যাস্বাক্ষী সাজিয়ে তাকে মুক্ত করে। দীর্ঘ ৭ বছর পর ফেরত এসে গোবিন্দলাল দেখে স্বামীর শোকে ভ্রমর মৃত্যুপথযাত্রী। কিছুদিন পর ভ্রমর মারা যায়। নিজ কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত গোবিন্দলাল পাগলপ্রায় হয়ে গৃহত্যাগ করে। দীর্ঘ ১২ বছর পর আবার এক ঝলক বাড়ি আসে সে। কিন্তু কেউ তাকে প্রথমে চিনতে পারে না। পরে পরিচয় দিলে সবাই যখন তাকে চিনতে পারে তারপরেই সে আবার চিরতরে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। আর কখনও গ্রামে দেখা যায় না তাকে।
রোহিণী চরিত্রের সর্বনাশা দিক:
রোহিনী শুধু এ উপন্যাসের নয়, সমগ্র বাংলা সাহিত্যের অন্যতম চরিত্র। এ উপন্যাসে লেখক রোহিণীকে কূটিল ও অদম্য সাহসী চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার কূটিলতা প্রথম ধরা পড়ে যখন সে ভ্রমরের ভুল না ভাঙ্গিয়ে বেদনা আরো বাড়িয়ে দেয়। গোবিন্দলাল রোহিনীকে বহুমূল্য উপহার সামগ্রী প্রদান করেছে- এ মিথ্যা লোকমুখে রটে গেলে রোহিনী ভ্রমরের কাছে গিয়ে সত্য কথা না বলে উল্টো বলে-
‘লোকে যতটা বলে ততটা নহে। লোকে বলে, আমি সাত হাজার টাকার গহনা পাইয়াছি। মোটে তিন হাজার টাকার গহনা আর এই শাড়ি খানা (ধার করা ) পাইয়াছি।’
অসীম সাহসই তাকে বার বার ভুল পথে নিয়ে গেছে। শেষ ভুলটা করে নিশাকরের প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিভঙ্গী:
বঙ্কিমচন্দ্র এ উপন্যাসজুড়ে বুঝিয়েছেন খারাপ প্রবৃত্তিগুলোর পরিণাম খারাপই হয়। একই সাথে খারাপের উপর ভালোকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। খারাপ প্রবৃত্তির কারণেই ভ্রমরকে রেখে গোবিন্দলাল রোহিনীর দিকে ধাবিত হয়। পরিণামে গোবিন্দলালের ক্রমাগত অধঃপতন। একই পথের পরিণতি হয় রোহিণীরও।
রোহিণী চরিত্রটি অত্যন্ত উজ্জ্বল ও শিল্পময় হওয়া সত্ত্বেও শিল্পের দৃষ্টিতে জয় পায়নি। নীতিবাদী বঙ্কিম ও শিল্পী বঙ্কিমের একটা টানাপোড়েন রোহিণী চরিত্রকে ঘিরে প্রকাশ পেয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র এ উপন্যাসে রোহিণীকে উনিশ শতকীয় আধুনিকতার ছাঁচে নির্মাণ করার চেষ্টা করলেও সময়, সমকাল আর সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে তাকে উপমহাদেশীয় পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দ্বিচারিণীর অপবাদ দিয়েছেন। তারপরও রোহিণী সমকালের রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের রীতিনীতির বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ প্রতিবাদী এক নারী-চরিত্র তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এখানেই রোহিণী চরিত্রের বিশেষত্ব।
বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরেই নারীর অন্তর-বেদনার ছাপ প্রথম প্রকাশ পায়। , বাংলা কথাসাহিত্যে বঙ্কিমবাবুই প্রথমবারের মতো নারীর আত্মজৈবনিক ও নিতান্ত ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার নানা দিকের ব্যাখ্যা-বিশেষণ করেছিলেন রোহিণীর মাধ্যমে। এই বিবেচনায় তিনিই বাংলা সাহিত্যে নারীর অন্তর্লোকের গূঢ় রহস্য আবিষ্কারের পথিকৃৎ।
তবে আগেই বলা হয়ছে যে, সামাজিক অসঙ্গতির কারণে বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে রোহিণীর জীবনচেতনাকে তৎকালীন বাস্তবতায় সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নেওয়াও সম্ভব ছিল না। মানতে পারেননি বলে কি বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর নায়িকাকে মেরে ফেলবেন? তা তিনি করেননি, বরং রোহিণী উপন্যাসের ঘটনা-পরম্পরায় নিজেকে এমন এক স্থানে নিয়ে গিয়েছিল, যেখানে ঘটনার অনিবার্য প্রবাহেই তার মৃত্যু ঘটেছে।
রোহিণীর মৃত্যুতে পাঠকের অন্তরে বেদনার বদলে উষ্মা ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটেছে কেউ কেউ বলেছেন। এতে এক ধরনের শান্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আর পাঠক উদ্বিগ্ন হয়েছে ভ্রমরের অকালমৃত্যুতে এবং গোবিন্দলাল সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করায়।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের চরিত্রসমূহ:
- ১. কৃষ্ণকান্ত
- ২. রামকান্ত, কৃষ্ণকান্তের ভাই
- ৩. গোবিন্দলাল- ঐ পুত্র, ৮ আনা
- ৪. হরলাল- কৃষ্ণকান্তের পুত্র, ৩ আনা
- ৫. বিনোদলাল- কৃষ্ণকান্তের পুত্র, ৩ আনা
- ৬. শৈলবতী- ঐ কন্যা, ১ আনা
- ৭. স্ত্রী, ১ আনা
- ৮. ব্রহ্মানন্দ-দলিল লেখক
- ৯. রোহিনী- ব্রহ্মানন্দের ভ্রাতৃকন্যা
- ১০. কৃষ্ণমোহিনী/কৃষ্ণকামিনী/অনঙ্গমন্জুরী/ভ্রমর/ভোমরা
- ১১. ক্ষিরি/ ক্ষিরোদা –দাসী
- ১২. হরমণি ঠাকুরানি-পাচিকা
- ১৩. মাধবী নাথ- ভ্রমরের বাবা, একচত্ত্বারিংশৎ বছর
- ১৪. রাজগ্রাম-ভ্রমরের পিত্রালয় ১৫. নিশাকর দাস-রোহিনীকে খুঁজতে প্রসাদপুরে যায়।
- ১৬. সোণা-রূপো-গোবিন্দলাল/রোহিনীর চাকর
- ১৭. বরাহনগর-নিশাকর/রাসবিহারীর বাড়ি বলে জানায়
- ১৮. দানেশ খাঁ-গায়ক
- ১৯. চিত্রা নদীর পাশে পুকুর ঘাটে নিশাকর বসে থাকে
- ২০. গোবিন্দ লাল প্রসাদপুরে চুনিলাল নাম ধারন করেন।
- ২১. ফিচেল খাঁ-ডিটেক্টর
- ২২. যামিনী- ভ্রমরের বোন
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসের উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট
১. রোহিনীর চরিত্রের দ্বৈততা—কূটিলতা + সহানুভূতি
- রোহিনীকে বঙ্কিম কেবল “খল” বানাননি ;
বরং কেন সে কূটিল হলো—সমাজ-ব্যবস্থা তার ভিতর যে অতৃপ্তি ও বঞ্চনা তৈরি করেছে—তা দেখিয়েছেন। - ফলে তাকে ঘৃণা করা যায় না—এটাই বঙ্কিমের বিশেষ শিল্পকৌশল।
- → এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নতুন বিশ্লেষণ।
২. গোবিন্দলালের চরিত্রে নৈতিক দ্বিচারিতা
- গোবিন্দলাল রোহিনীকে স্ত্রী-মর্যাদা দেয় না,
তবু তার কাছ থেকে শর্তহীন স্ত্রী-ধর্ম দাবি করে। - ভ্রমরের সময় যেমন রোহিণীকে চেয়েছিল, রোহিণীর সময় তেমনি ভ্রমরকে চায়।
- অর্থাৎ – গোবিন্দলাল সব সময়ই পেতে চেয়েছে, মূল্য দিতে কখনো প্রস্তুত নয়।
৩. ভ্রমরের সরলতা বনাম রোহিনীর কূটিলতা—বঙ্কিমের তুলনা
- বঙ্কিম ইচ্ছে করেই দু’টি নারীচরিত্রকে দুই প্রান্তে দাঁড় করিয়েছেন।
- একদিকে রোহিনীর লড়াই, উদ্যোগ, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস;
অন্যদিকে ভ্রমরের সারল্য, পতিধর্মে বিশ্বাস, বিনম্রতা। - সমাজে নারীর দুই ভিন্ন অবস্থানের চিত্র প্রকাশ হয়েছে।
৪. ভ্রমরের মানসিক জগৎ—নতুন উদ্ধৃতি
- ভ্রমরের হৃদয়ের যে বিখ্যাত বাক্যটি এসেছে—
- “হে সন্দেহভঞ্জন! হে প্রাণাধিক! তুমি আমার সন্দেহ—তুমিই আমার বিশ্বাস!”
- এ উদ্ধৃতিটি বেশ শক্তিশালী এবং ভ্রমরের চরিত্র ব্যাখ্যায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
৫. রোহিনীর আত্মহত্যা করার ব্যাখ্যা—দুই পর্যায়ের পরিবর্তন
- প্রথমবার—গোবিন্দলালকে ‘না পেয়ে’ আত্মহত্যা করতে যায়।
- শেষবার—গোবিন্দলালকে ‘পেয়ে’ ও আবার অন্যকে আকর্ষণ করে—তাই আর মরতে পারে না।
- এটা রোহিণীর মানসিক জটিলতার বদল দেখায়, যা নতুন বিশ্লেষণ।
৬. রোহিনীর “চুরিকাণ্ড”—সমাজবাস্তবতার গভীর দিক
- রোহিনীর চুরি করা ছিল মুহূর্তের দুর্বলতা—“চুরি” নয়, বরং “সমাজের অমানবিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ”।
- বঙ্কিম তার বিচার করতে গিয়ে তাকে আবারও মানবিকভাবে আঁকেন।
৭. উপন্যাসের ‘ট্রাজিক এন্ড’–এর সাহিত্যিক ব্যাখ্যা
প্রেমের কাহিনি সবসময় মিলনে শেষ হয় না—
ট্রাজেডিও প্রেমের পূর্ণরূপ হতে পারে।
এ উপন্যাসের সমাপ্তি বাস্তবতার ধারাকে মেনে চলে, রোমান্টিক কল্পনার মতো নয়।
৮. জেন্ডার বিশ্লেষণের নতুন দৃষ্টিকোণ
- বর্তমান দৃষ্টিকোণ দিয়ে রোহিণী-ভ্রমরকে বিচার করা ঠিক নয়।
- তখনকার সমাজে স্ত্রীধর্ম, পতিব্রত, নারীর সংকীর্ণ গণ্ডি ছিল সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।
- তাই ভ্রমরের বিশ্বাস-ভিত্তিক আচরণও সেই সময়ের সমাজের সত্য রূপ।
৯. রোহিনী–ভ্রমর–গোবিন্দলাল সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ নতুন দৃষ্টিভঙ্গি—
গোবিন্দলালের মনোজগতে
– অন্তরে ভ্রমর
– বাইরে রোহিনী
– এবং এই বৈপরীত্যই রোহিণীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।
কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস নিয়ে নিবন্ধে যা আলোচিত হয়েছে:
- রোহিনীর কূটিলতার পেছনের সামাজিক সত্য
- গোবিন্দলালের নৈতিক দুর্বলতা
- ভ্রমরের সরলতার মানসিক গভীরতা
- রোহিনী–ভ্রমর–গোবিন্দলালের ত্রিভুজ-মনস্তত্ত্ব
- রোহিনীর ভুলের ধারাবাহিকতা ও আত্মহত্যাপ্রবণতার কারণ
- উপন্যাসের ট্রাজেডিক সমাপ্তির দার্শনিক ব্যাখ্যা
- জেন্ডার বিশ্লেষণের সময়োপযোগী সীমাবদ্ধতা
চরিত্রতালিকা (পরীক্ষায় খুব উপকারে আসে)
- রোহিণী—ভ্রমর—গোবিন্দলাল তিন চরিত্রের ত্রিভুজে বঙ্কিম দেখিয়েছেন মানুষের ভালোবাসা যেমন নির্মল হতে পারে, তেমনি দুর্বলতাও তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।
- রোহিণী এখানে অপরাধিণী নয়—সে সমাজের কঠোর বিধিনিষেধের শিকার।
গোবিন্দলাল নায়ক নয়—সে দ্বিধা ও নৈতিক দুর্বলতার মানুষ।
ভ্রমর নিষ্ক্রিয় নয়—সে প্রেমের মানসিক আভিজাত্যের প্রতীক।- এই ত্রয়ীর সৃষ্ট সংঘর্ষই “কৃষ্ণকান্তের উইল”-কে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সার্থক ও গভীর সামাজিক উপন্যাসে পরিণত করেছে।
উপসংহার
সমস্ত আলোচনার সারমর্ম এই যে, কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস কাহিনি, চরিত্র, ভাষা, মনস্তত্ত্ব, সমাজবাস্তবতা, দার্শনিকতা ও নান্দনিকতার সুসমন্বিত এক রূপ। কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস শিল্পমূল্যে উন্নীত। উপন্যাসের শিল্পমূল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন পাঠক চরিত্রের দ্বন্দ্বে নিজের জীবনের প্রতিফলন খুঁজে পায়, কাহিনির গতি তাকে টেনে নিয়ে যায়, ভাষাশৈলী তার মধ্যে রসসঞ্চার ঘটায়, আর দার্শনিকতা তাকে চিন্তার নতুন পথে নিয়ে যায়। এই সবগুলো মাপকাঠিতেই কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস তার শিল্পমূল্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
সুতরাং বলা যায় কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাস একটি আদর্শ উপন্যাস। কাহিনির সুসংগঠিত বুনন, চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা, ভাষার শিল্পপ্রতিম ব্যবহার, আবেগ ও রসের সুষম সংযোজন—সব মিলিয়ে এই উপন্যাস প্রমাণ করে যে শিল্পসফল সৃষ্টি কী !
অসাধারণ স্যার ,,, অনেক সহজে ভাবে ব্যাখ্যা পেয়ে গেলাম আগামীকাল রবিবার সেমিনারের জন্য ভালো একটা প্রিপারেশন হয়ে গেলো স্যার ,, অনেক অনেক ধন্যবাদ স্যার 🤍🫶