ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতির বৈশিষ্ট্য ও উপযোগিতা আলোচনা কর।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি:

ভূমিকা
ভাষা অধ্যয়নে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি এমন এক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার মাধ্যমে ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও পরিবর্তনকে সময়ের ধারাবাহিকতায় পর্যবেক্ষণ করা হয়। ভাষা কোনো নির্দিষ্ট দিনে সৃষ্টি হয়নি, বরং বহু শতাব্দীর বিবর্তন, স্থানান্তর, ধার, পরিবর্তন ও সংমিশ্রণের ফলে আজকের রূপ পেয়েছে। তাই, ভাষা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি গ্রহণ করলে আমরা ভাষার শব্দভাণ্ডার, ধ্বনি-ব্যবস্থা, রূপ-গঠন, ব্যাকরণ ও অর্থের পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাই। উদাহরণস্বরূপ, বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া ও উর্দু একই উৎস থেকে এসেছে—এটি আমরা জানি ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি দ্বারা।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে ভাষাগুলোর মিল-অমিল নির্ণয় করা সম্ভব হয়, যা ভাষাতত্ত্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত ভাষার বয়স নির্ধারণ, ভাষাগত ধার বা শব্দগঠন প্রক্রিয়া, উপভাষার উৎপত্তি ও ভাষা পরিবারের শ্রেণিবিন্যাসে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি অপরিহার্য। তাই, ভাষাতত্ত্বের ছাত্র, গবেষক কিংবা বিশ্লেষক—সকলের ক্ষেত্রেই ভাষাকে গভীরভাবে বুঝতে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকরী। ভাষা-ইতিহাসের ভিতর নিহিত থাকে জাতির সংস্কৃতি, সমাজের মনন এবং মানব-সভ্যতার বংশবৃক্ষ। ফলে ভাষা বিচারের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি শুধু ভাষাতাত্ত্বিক অনুশীলন নয়, বরং এটি এক গভীর মানবিক অনুসন্ধান।

আধুনিক ভাষাতত্ত্ব
তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান – হুমায়ুন আজা

ভাষাকে বিচার-বিশ্লেষণ করে ভাষার স্বরূপ নির্ণয় করা হয়। ভাষা বিচারের বিভিন্ন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া রয়েছে। ভাষা বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যগত পার্থক্যের কারণে একটা পদ্ধতির সাথে আরেকটি পদ্ধতির পার্থক্য রয়েছে। আর এ প্রক্রিয়া বা উদ্দেশ্যগতর কারণে একটি পদ্ধতির কাঠামো অন্য পদ্ধতি থেকে স্বতন্ত্র। ভাষা বিচারের প্রচলিত পদ্ধতিগুলো হলো-

এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন পদ্ধতি হচ্ছে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি। বর্ণনামূলক ও রূপান্তরমূলক পদ্ধতি প্রয়োগের আগে ভাষার ইতিহাস ও রূপ গঠনের তুলনামূলক বিচারে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হতো।

ঐতিহাসিক পদ্ধতি : ভাষার অতীতকালের ইতিহাস ও বিবর্তনগত দিক বিশ্লেষণ করে ভাষার স্বরূপ নির্ণয় করা হয় যে পদ্ধতিতে তাকে ঐতিহাসিক পদ্ধতি বলে। কোনো এক ভাষার শব্দরূপের বিবর্তনের ইতিহাস আলোচনাকে ঐতিহাসিক পদ্ধতি বলে।

ভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। এ পরিবর্তনের প্রকিয়া কেমন তা ভাষাবিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করে। তারা বিভিন্ন ভাষার ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে সৃষ্টি করেছিলেন ভাষা পরিবর্তন সম্পর্কে সর্বজনীন তত্ত¡। যেমন- কৃষ্ণ > কনহ > কানহ > কাহৃ। কৃষ্ণ থেকে কাহৃ শব্দ কীভাবে এলো এই বিবর্তনের ধারা আলোচনাই ঐতিহাসিক পদ্ধতি।

একটি ভাষার আলোচনা হয় এ পদ্ধতিতে। একটি ভাষা বা সম্পর্কিত ভাষার মধ্যে ধ্বনি ও রূপমূল কীভাবে পরিবর্তিত হয়, এ পদ্ধতির সাহায্যে তা অনুসন্ধান করা হয়।

বিশেষ ভাষার বিশেষ কালের বিশেষ অবস্থায় বর্ণনার বদলে এ পদ্ধতি একটি ভাষা বিভিন্নকালে যেভাবে পরিবর্তিত হয়, তার বর্ণনা করে। ভাষার পরিববর্তনের সূত্র আবিষ্কার করে। কারণ, কোনো ভাষার বিভিন্ন কালের অবস্থার মধ্যে তুলনা করলেই পরিবর্তনের সূত্র আবিষ্কার সম্ভব।

বাংলা ভাষার জন্ম সপ্তম-অষ্টম-দশম শতক থেকে। এ ভাষার ইতিহাস জানতে হলে ঐ সময় থেকে কালানুক্রমিক ভাবে কী অবস্থায় ছিল তা জানতে হবে। এবার প্রতিটি অংশের তুলনা করলেই জানা যাবে বাংলা ভাষার কালানুক্রমিক বিকাশের রীতি।

এ পদ্ধতির মূল কথা হলো ভাষা সময়ে পরিবর্তিত হয়, এ পরিবর্তন বিশৃঙ্খল নয়,  তা সুশৃঙ্খল। 

মূলত বিবর্তিত ভাষার পূর্বরূপের গঠনগত পরিবর্তন, তার আদিরূপের গঠন ইত্যাদি বিশ্লেষণ এ পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য।

একই ভাষা-পরিবারের প্রাচীন ভাষার সাথে পরবর্তী শাখাগুলোর ভাষা গঠনে যে পরিবর্তন, তা সূত্রাকারে বর্ণনা করা এ পদ্ধতির কাজ। গ্রিম,, বপ, গ্রাসম্যান, ভার্ণার প্রমুখ পন্ডিতদের নির্দেশিত সূত্রের সাহায্যেই প্রাচীন ভাষার বিভিন্ন পরিবর্তনগত দিক সুষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ সম্ভব হয়েছে। ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার ধ্বনি পরিবর্তন বিশ্লেষণও সম্ভব হয়েছে।

ঐতিহাসিক পদ্ধতির উপযোগিতা: ভাষার পরিবর্তন যে বিশৃঙ্খল নয়, সুশৃঙ্খল তা জানা সম্ভব হয়েছে। এ পদ্ধতিতে বিশ্লেষিত উপাত্তের জন্যই জানা সম্ভব হয়েছে ভাষা বিজ্ঞানসম্মত বিষয়। এ পদ্ধতিই আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের ভিত রচনা করেছে। ভাষার প্রাচীন রূপ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। ভাষার উদ্ভব ও বিকাশের ক্রমবর্ধমান রূপ ভাষার আলোচনায় অত্যšত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার বর্তমান রূপ তার প্রাচীনরূপের সাথে সম্পর্কিত। তাই ভাষার প্রাচীন রূপের ধ্বনিগত, রূপমূলগত ও বাক্যতত্ত্বীয়গত বৈশিষ্ট্য জানা দরকার। এ পদ্ধতি তা আবিষ্কার করে।

প্রশ্ন : ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের গুরুত্ব আলোচনা কর। (ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)

উত্তর : ভাষার বিচারই ভাষাবিজ্ঞান। বিভিন্ন দিক থেকে ভাষার বিচার করা হয়ে থাকে। ভাষা বিচারে রয়েছে নানা পদ্ধতি। যেমনÑ ঐতিহাসিক, তুলনামূলক, বর্ণনামূলক ও রূপান্তরমূলক। এসব পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান, বর্ণনামূলক ভাষাবিজ্ঞান ও রূপান্তরমূলক সৃষ্টিশীল ব্যাকরণ। নিম্নে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব আলোচনা করা হল।

ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান ঃ ঐতিহাসিক পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে যে ভাষাবিজ্ঞান গড়ে উঠেছে, তাকে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান বলে। ভাষাবিজ্ঞানের যে শাখায় সুনির্দিষ্ট ভাষাসমূহের ঐতিহাসিক ক্রম-পরিণতির তত্ত¡ আবিষ্কার, ভাষা পরিবর্তন সংক্রান্ত সাধারণ প্রক্রিয়ার সূত্রবদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করে, তাকে ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান (Historical Linguistics) বলে।

গুরুত্ব ঃ কোনো ভাষার সম্ভাব্য প্রাচীনতম রূপটি থেকে আরম্ভ করে একাল পর্যন্ত তার ধারাবাহিক ক্রমবিবর্তনের ইতিহাস এই আলোচনার অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে। বর্তমানে ব্যবহৃত বাংলা শব্দের আদিরূপ কী ছিল, কেমনভাবেই বা তা ক্রমিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এই বিশেষ শব্দটিতে পরিণতি লাভ করলো, ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের সাহায্যেই তা দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব।

বিভিন্ন সময়ে ভাষার বিবর্তনের ফলে ভাষার আগের রূপের পরিবর্তন, ভাষার আদিরূপের গঠন ইত্যাদি দিক এ শাখায় পর্যালোচনা করা হয়। ভাষার ইতিহাস বর্ণনার সময় ভাষার অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনও নির্দেশিত হয়।

প্রতিটি ভাষাই কমবেশি পরিবর্তিত হয়। অনেক সময় একই পরিবারভূক্ত বিভিন্ন ভাষার বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, ভাষাপরিবারের প্রাচীন শাখার সাথে পরবর্তী শাখাগুলোর ভাষাবিন্যাসে অল্প বিস্তর ভাষাগত অসাম্য দেখা যায়। এটিও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের বিবেচ্য বিষয়। ভাষার বিবর্তন ধারার প্রকৃতি লক্ষ্য করেই ভাষাতাত্তি¡করা প্রাচীন বাংলা আধুনিক বাংলা প্রভৃতি নামে বিশেষায়িত করে থাকেন।

ভাষা পরিবর্তনের সময় কিছু উপাদান বর্জিত হয়, কিছু উপাদান নতুনভাবে গৃহীত হয়। ফলে ভাষার প্রাচীন রূপের সাথে পরবর্তীকালীন ভাষার বৈসাদৃশ্য সৃষ্টি হয়। এ পরিবর্তন সূত্রাকারে সহজেই নির্দেশ করা সম্ভব।

ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান গতিসম্পন্ন বা প্রগতিশীল বলে অনেকে মন্তব্য করেছেন। তার কারণ ভাষা পরিববর্তিত হলে এ পরিবর্তন শুধু রূপমূলে নয়, বরং ধ্বনি, রূপমূল, বাক্যে এবং অর্থগত পরিবর্তনও হয়। ফলে ভাষা পরিবর্তনে একটি গতিশীল রূপ সহজেই চোখে পড়ে।

ভাষার পরিবর্তন যে বিশেষ আদর্শ অনুযায়ী হয়, তা ভাষা পরিবর্তনের বিভিন্ন ধারিক বৈশিষ্ট্যের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশ করা যায়। ভাষা পরিবর্তনের একাধিক মতবাদ প্রকাশ পেলেও ঐতিহাসিক ভাষাতাত্তি¡দের মধ্যে ঐক্য বিদ্যমান এবং প্রতি ক্ষেত্রেই এরা ভাষা পরিবর্তনের মুখ্য কারণগুলোর উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানে ভাষা পরিবর্তনে সামাজিক, অর্থগত ও গঠনগত দিকগুলোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এ ছাড়াও আর যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়, সেসব দিকগুলো সংক্ষেপে আলোচনা করা যেতে পারে।

(ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)

ক) একক সৃষ্টি ঃ ভাষাতাত্তি¡করা মনে করেন যে ভাষার রূপমূল একটি সাধারণ বংশানুক্রমিক রূপ থেকে বিবর্তিত।

খ) অধঃস্তরঃ কোনো অঞ্চলের প্রচলিত ভাষা পরবতীকালে বিজয়ী জাতির ভাষার প্রাধ্যন্যের জন্য স্থানচ্যূত হয় এবং অনেক সময় দ্বিভাষারূপে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ভাষার অধঃস্তর দিক সামাজিক দিকরূপে গৃহীত এবং এই শ্রেণীর সংযোগের ফলে ভাষাগত পরিবর্তন সাধিত হয়।

গ) অধিস্তরঃ কোনো অঞ্চলের প্রচলিত ভাষা পরবতীকালে বিজয়ী জাতির ভাষা প্রচলনের ক্ষেত্রে তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

ঘ) পুনর্গঠন ঃ অনেক সময় ভাষা বিচারের ক্ষেত্রে পূর্বরূপ অলিখিত থাকলে অনুমানের সাহায্যে মূল ভাষার শাখাগুলোতে ব্যবহৃত শব্দের সাহায্যে মূল শব্দগঠন করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষার অনেক শব্দ পুনর্গঠন করা হয়েছে।

ঙ) ধ্বনিসূত্র ঃ একটি বিশেষ অঞ্চলে একটি বিশেষ ঐতিহাসিক কাল বৃত্তে যে ধ্বনি পরিবর্তন ঘটে তার কারণ নির্ণয় করে ধ্বনিসূত্র গঠন সম্ভব।

চ) সাদৃশ্য ঃ অনেক সময় একটি শব্দের প্রভাবে অন্য শব্দের অভ্যরÍরীণ গঠনরূপ পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে শব্দ রূপ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রকৃত বা খেয়ালীকরণ দিক ক্রিয়াশীল থাকতে পারে।

ছ) সরলীকরণ ঃ শব্দ গঠনের ক্ষেত্রে অনেক সময় স¤প্রসারিত প্রত্যয় বর্জিত হয় এবং তার পরিবর্তে স্বতন্ত্র শব্দ বা অন্য প্রক্রিয়ায় প্রত্যয় বা বিভক্তির কাজ সম্পাদিত হয়, একে সরলীকরণ সূত্ররূপে নির্দেশ করা হয়।

অন্তর্নিহিত উপাদানের সাহায্যে ঃ ভাষার অন্তর্নিহিত উপাদানের সাহায্যে ভাষার পরিবর্তন সাধিত হয়। এ বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের সাহায্যে ঐতিহাসিক ভাষাতত্তে¡ বিচার করা হয়।

সামাজিক সাংগঠনিক দিক ঃ ভাষা পরিবর্তনের সামাজিক সাংগঠনিক দিক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানকালে ভাষাতাত্তি¡করা ভাষা পরিবর্তনে সামাজিক প্রভাবকে স্বীকার করেন এবং এর সাথে ভাষাভাষীর মনস্তত্ত¡ীয় মানসিকতা যে জড়িত তাও ব্যাখ্যা করেন।

ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে দেখানো হয় যে, ভাষা কীভাবে এক কাল থেকে আরেককালে ভাষাটি পরিবর্তিত হয়। আর এ পরিবর্তন কোনো বিশৃংখল ব্যাপার নয়, তা বেশ সুশৃংখল প্রক্রিয়া, মেনে চলে নানা নিয়ম-কানুন।

রূপান্তরমূলক পদ্ধতি ঃ ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত¡ বিচারে রূপান্তর মূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করলেও ভাষার বিবর্তন ধারা ও গঠনগত পরিবর্তন ধারা নির্দেশ করা সম্ভব।

প্রত্যক্ষগোচর উপাদান ঃ অনেক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানী প্রত্যক্ষগোচর উপাদানের ভিত্তিতে ভাষা বিচারে বিশ্বাসী, অনেকে সাধারণ আদর্শে উৎসাহী। তবে উভয় শ্রেণীর ভাষা বিজ্ঞানীরাই ভাষার ধ্বনিরূপ, বাক্য ও অর্থগত পরিবর্তনে বিশ্বাসী।

যে-কোনো ঐতিহাসিক কালবিন্দু ঃ ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ভাষা বিচারে ঐতিহাসিক কালক্রমের নির্দিষ্ট কোনো গন্ডি নেই। অর্থাৎ যে কোনো ঐতিহাসিক কালবিন্দু থেকে ভাষা বিচার সম্ভব। অনেক সময় আলোচনার সুবিধার জন্য ভাষার ইতিহাস বিধি বহির্ভূত নির্দিষ্ট যুগ ধরা হয়ে থাকে।

ভাষার নিদের্শ ঃ ঐতিহাসিক ভাষাতাত্তি¡ক ভাষা পরিবর্তনের দুটো দিক নির্দেশ করে একটা হলো ভাষা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং অন্যটা হলো ভাষা কেন পরিবর্তিত হয়েছে ? আবার এ দিকটাও নির্দেশ করে যে, ভাষার প্রাচীনরূপের পরিবর্তন নির্দেশে ভাষার বর্তমানরূপে তা লক্ষণীয় না হলে এ শ্রেণীর পরিবর্তন নির্দেশ শুধু তত্ত¡ীয়রূপে চিহিৃত হবে।
লিখিত রেকর্ড না থাকলে ঃ ভাষার কোনো লিখিত রেকর্ড না থাকলে ভাষার পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়। ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ভাষা বিচারের ক্ষেত্রে ভাষা পুনর্গঠনের সাহায্যে লিখিত বিবরণের পূর্বে ভাষার প্রচলিতরূপের সন্ধান করা হয়। তবে এ শ্রেণীর পুনর্গঠিত রূপ থেকে ভাষার উদ্ভব বা অতীতকালীন বিবর্তনের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না।

লিখিত রেকর্ডের গুরুত্ব ঃ ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের লিখিত বিবরণ হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান দলিল। এজন্য ঐতিহাসিক ভাষাতাত্তি¡কদের কাছে যেভাবে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে লিখন প্রণালী বিবর্তিত হয়েছে তা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রাচীন লিখন পদ্ধতির প্রাপ্ত নমুনা দিয়ে অথবা নকশার সাহায্যে বর্ণিত এবং পরবর্তীকালে তা বর্ণনাতœক আকারের মাধ্যমে ক্রমশ স্পষ্ট ও নির্দিষ্টরূপ নেয়। একই সময়ে সেগুলো চলিতরীতি সম্মত হয়ে পড়ে এবং তা চিত্রের পরিবর্তে প্রতীকী রূপ ধারণ করে।

অভিজ্ঞতালব্ধ আদর্শ ঃ বিশেষত ভাষার পরিবর্তন নির্দেশে অভিজ্ঞতালব্ধ আদর্শ ঐতিহাসিক ভাষা বিজ্ঞানে একটা উল্লেখযোগ্য দিক। ভাষাতত্ত¡ীয় অবস্থাগুলো বৃহত্তর অর্থে সমাজ-সংস্কৃতির অংশ।

উপসংহার ঃ ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ভাষা বিচারের প্রকৃতি, এ পদ্ধতিতে আবিস্কৃত বা ব্যবহৃত তথ্য, সূত্রাবলি, ঐতিহাসিক ভাষা বিজ্ঞানের পরিধি, ভাষা পরিবর্তনের সূত্র নির্দেশ, ভাষার ইতিহাস বর্ণনা ইত্যাদি দিকগুলো বিবেচনায় আনলেই এ পদ্ধতিতে ভাষা বিচারের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। বিশেষ করে ভাষার অতীত ইতিহাস, ভাষার পুনর্গঠন, ভাষার পরিবর্তন সূত্র, ভাষা পরিবর্তনের কারণ, ভাষার গঠন শৃংখলা ইত্যাদি বিষয়ে তত্ত¡ নির্দেশ ও ব্যাখ্যা প্রদান এ রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

তূলনামূলক পদ্ধতি: (ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)

ভাষা বিচারের যে পদ্ধতিতে সম্পর্কিত বা অসম্পর্কিত ভাষাগুলোর ধ্বনি ও রূপমূল গঠনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়, তাকে তুলনামূলক পদ্ধতি বলে।

দূর কিংবা নিকট সম্পর্কিত দুই বা ততোধিক ভাষার সম্পর্ক নিরুপণ করা তুলনামূলক পদ্ধতির প্রতিপাদ্য বিষয়। এই পদ্ধতিতে ভাষাসমূহের তত্ত¡ ও প্রয়োগ কৌশল বা ব্যবহার বিধি আলোচনা করে। বিভিন্ন ভাষার ব্যাকরণের গঠন ও রূপমূলের মধ্যে সাদৃশ্য পর্যবেক্ষণ করে এই পদ্ধতি সিদ্ধাšত নিতে পারে যে, সেই সব ভাষা একই মূল ভাষা থেকে উৎপন্ন হয়েছে। যেমন- ‘মা’ শব্দের রূপ সংস্কৃতে, ইংরেজিতে জার্মানে, ল্যাটিনে, গ্রিকে একই রকম। সুতরাং উক্ত ভাষাগুলো যে একটি মূলভাষা অর্থাৎ ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে আগত, তুলনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে।

তুলনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে দুটো ভাষার মধ্যে সম্পর্ক আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

প্রাচীন ও সমকালীন যে কোনো ভাষার ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। সমকালীন ভাষার ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষার উপাদানগত সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য নির্দেশ করা সম্ভব, আবার অতীতকালের ভাষার ক্ষেত্রেও একই ভাবে প্রয়োগযোগ্য। ধ্বনিতত্ত্বীয়, রূপমূলীয় ও বাক্যতত্ত্বীয় যে-কোনো দিকে সম্পর্কিত বা অসম্পর্কিত ভাষার তুলনা করা সম্ভব।

বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয় করা, প্রাচীন রূপ পুণর্গঠন করা, এ পদ্ধতির অন্যতম উদ্দেশ্য। ভাষা পুণর্গঠন করে প্রাচীনকালীন বিভিন্ন ভাষার ধ্বনি ও রূপ সংগঠনে এ পদ্ধতির সার্থকতা অপরিসীম। সাদৃশ্য আবিষ্কার করে ভাষাকে গোষ্ঠীবদ্ধ করা এবং ভাষার বংশগত উৎস সন্ধানে এ পদ্ধতি যথেষ্ট কার্যকর। বর্তমানে একটি বিশেষ কালের একটি ভাষার গঠনের সাথে অন্য ভাষার গঠনের তুলনামূলক আলোচনা করা হয় এ পদ্ধতির সাহায্যে।

ধ্বনিরূপ, শব্দরূপ ও অর্থ এসব দিক থেকে কোনো ভাষার মধ্যে সাদৃশ্য পেলেই ধরে নেওয়া হয় ভাষাগুলো একই উৎসের। এভাবে সমশব্দ, প্রতিসম উপাদান, কালগত দিক বিবেচনা করে ভাষার আদিরূপ নির্ণয় করা হয় এ পদ্ধতিতে।

এ পদ্ধতিতে জীবšত মানুষের ছোঁয়া পাওয়া যায় না বলে, এটি পূর্ণ বিজ্ঞান ভিত্তিক নয়। তবুও মূলভাষার নমুনা পাওয়া না গেলেও এ পদ্ধতিতে অলিখিত আদিম ভাষাকে পুনগঠনের চেষ্টা করা যায়।

ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতির সম্পর্ক : (ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)

বিশ শতকে বর্ণনামূলক পদ্ধতি ব্যবহারের আগে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতির পারস্পরিকতার সাহায্যে ভাষা বিচার করা হতো।

দুটো ভাষার মধ্যে ব্যাকরণগত গঠন ও সাধারণ রূপমূলের মধ্যে সাদৃশ্য আছে কি না তা ঐতিহাসিক পদ্ধতির দ্বারা ভাষার পেছনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয়। এভাবে সম্পর্ক তৈরি করে বলা হয় ভাষাগুলো সাধারণ মূল ভাষা থেকে বিবর্তিত।

তুলনামূলক পদ্ধতি প্রয়োগ করে সম্পর্কিত দুটো ভাষার মধ্যে সম্পর্ক সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। এই সম্পর্ক নির্দেশের জন্য প্রয়োজন হয় ভাষাগত উপাদান বিবর্তনের ইতিহাস জানার। এর এটা জানায় ঐতিহাসিক পদ্ধতি।

দুই বা ততোধিক ভাষার ব্যবহৃত ধ্বনি ও রূপমূলে সাদৃশ্য থাকলে, সেগুলো যে সমপ্রকৃতিসম্পন্ন, তা ঐতিহাসিক পদ্ধতি নির্ণয়ে সাহায্য করে। আর তুলনামূলক পদ্ধতিতে ভাষাগুলোর উপাদানের বা অবস্থার তুলনা করে ভাষাগুলোর মূল যে একই তা নির্ধারণ করা যায়।

ভাষাকে গোষ্ঠীবদ্ধ করা ও বংশগত উৎস সন্ধান ঐতিহাসিক পদ্ধতির প্রত্যক্ষ ফল। ভাষার পরিবর্তনের কালগত অবস্থার বর্ণনা, আদিরূপের স্বরূপ আবিষ্কার ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে করা হয়। আর ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে আবিস্কৃত তথ্য উপাত্ত তুলনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে বিচার বিশ্লেষণ করা হয়।

প্রশ্নঃ তুলনামূলক পদ্ধতির উপযোগিতা আলোচনা কর। (ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)

উত্তর : তুলনামূলক পদ্ধতি প্রাচীন বা সমকালীন উভয় ভাষার ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়। এদিক থেকে এ পদ্ধতি সমকালীন ও অতীতকালীন। সমকালীন ভাষার তুলনা করার ক্ষেত্রে বর্তমান কালে প্রচলিত বিভিন্ন ভাষার ভাষাগত উপাদানের সাদৃশ্য ও পার্থক্য নির্দেশ করা সম্ভব। অতীতকালীন ভাষার ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি একই ভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব। ধ্বনিতত্ত্বগত, রূপমূলগত, বাক্যতত্ত্বগত, ও অর্থগত সব দিক থেকেই যে-কোনো ভাষার ক্ষেত্রে তুলনা করা যায়।

বিভিন্ন ভাষার মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ে, প্রাচীনরূপ পূর্ণগঠনে এ পদ্ধতি সার্থকভাবে প্রয়োগ সম্ভব। এ পদ্ধতির সাহায্যে ভাষা পূণর্গঠন করে প্রাচীনকালের বিভিন্ন ভাষার ধ্বনিরূপ ও শব্দরূপ কেমন ছিল তা জানা যায়।

ভাষাকে গোষ্টীবদ্ধ করা এবং ভাষার বংশগত উৎস সন্ধানের জন্য এ পদ্ধতি যথেষ্ট কার্যকর। বর্তমানে একটি বিশেষকালের একটি ভাষা গঠনের সাথে অন্য ভাষার গঠনের তুলনামূলক আলোচনা করা হয় এ পদ্ধতিতে।

প্রশ্নঃ তুলনামূলক পদ্ধতির ইতিহাস বিশদভাবে লিপিবদ্ধ কর।(ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)
অথবা, তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাস আলোচনা কর।

উত্তর ঃ বিশ শতকে ভাষার বিচার-বিশ্লেষণে বর্ণনামূলক ভাষা বিজ্ঞানের ব্যাপক চর্চা শুরু হলেও এর আগে ভাষার বিচার ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতি দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ শুরু হয়। উনিশ শতক তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের নিজস্ব বছর। তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে ভাষাবিচার উনিশ শতকের আগেও হয়েছে, বিশ শতকেও হয়েছে, তবে উনিশ শতকেই উদ্ভব ঘটে বিভিন্ন ভাষার তুলনা করার ও বিবর্তন বর্ণনার বিজ্ঞানসম্মত তত্ত¡ ও পদ্ধতি। গড়ে ওঠে এ শাস্ত্রের প্রবহমান ধারা। আবির্ভূত হয় বেশ কয়েকজন ভাষাবিজ্ঞানী, যারা এ শাখাকে সুশৃংখল ও শ্রদ্ধেয় করে তোলেন।

উনিশ শতকের ভাষাবিজ্ঞান প্রধানত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাসূহের সম্পর্ক উদ্ভব ও বিকাশ বর্ণনার শাস্ত্র। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোকে ভিত্তি করেই বিকশিত ও উন্মোচিত হয় তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের তত্ত¡ ও প্রণালীগত পদ্ধতি। নিম্নে তুলনামূলক পদ্ধতি তথা এ পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাস বর্ণনা করা হলো ঃ

এ শাখার আধুনিক রূপ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন তিন জোড়া ভ্রাতা। তারা হলেন-
১) ভিল হেলম ফন হুম বোলডট ও আলেক জেন্ডার ফন হুম বোলডট।
২) ফ্রিডারিখ ফন শ্লেগেল ও আউগুস্ট ভিল হেলম ফন শ্লেগেল।
৩) ইয়াকব গ্রিম ও ভিল হেলম গ্রিম।

তবে প্রথম জনের অবদানই সবচেয়ে বেশি। এছাড়াও আর যারা গুরুত্ব পূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাদের অবদান আলোচনা করা হল –

১৮০৮ ফ্রিডরিখ শ্লেগেলের গ্রন্থে প্রথম তুলনামূলক ব্যাকরণ অভিধাটি ব্যবহৃত হয়। এরপর ১৮১৪ খ্রিঃ ভাষাতত্তে¡ সর্বপ্রথম বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষার গঠন সম্পর্কে বিস্তৃত বিশ্লেষণে অগ্রসর হন ডেনমার্কের র‌্যাসমুল ক্রিশ্চিয়ান রাস্ক (১৭৮৭-১৮৩২)। তাঁর রচনায় সর্বপ্রথম আধুনিক তুলনামূলক ভাষাতত্তে¡র কয়েকটা মৌল আদর্শ ও পদ্ধতি উপস্থাপিত হয়। তিনি তাঁর রচনায় ধ্বনি প্রতিসাম্যের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি ভাষার পুনর্গঠন প্রকৃতি সম্পর্কিত সুসংবদ্ধ বিশ্লেষণের উপরও গুরুত্ব দেন। তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর মত যেভাবে প্রকাশ করেছেন তাহলো Ñ

একটা ভাষা বিভিন্নভাবে মিশ্রিত হলেও কতগুলো ভাষার সাথে একই শাখাভূক্ত করা সম্ভব। ভাষায় প্রয়োজনীয় নির্ধারক শব্দ অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে। যখন দুটো ভাষার মধ্যে একটা ঐক্য লক্ষ করা যায় এবং বহুল ব্যবহৃত শব্দের সাহায্যে সূত্র নির্দেশ, এক ভাষা থেকে অন্য ভাষার ধ্বনি পরিবর্তন দেখা যায়, তখন উভয় ভাষার মধ্যে যে একটা সম্পর্ক আছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। ১৮১৮ সালে রাস্কের অনুসন্ধান প্রকাশিত হয়।

১৮১৯ সালে রাস্কের পর যিনি ভাষাতত্তে¡র জনকরূপে বিখ্যাত হন তিনি হলেন ইয়াকব/জ্যাকব গ্রিম। গ্রিম জার্মান ভাষার একটা দীর্ঘ ব্যাকরণ রচনা করেন। রাস্ক ধ্বনিগত পরিবর্তন সম্পর্কে যে তথ্য দেন গ্রিম সেগুলোকে উদাহরণ ও সূত্রের সাহায্যে বিস্তৃত ব্যাখ্যা সহযোগে পরিবর্তনগুলোর বিবরণ দেন।

গ্রিম গ্রিক, ল্যাটিন, জার্মান, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার ধ্বনির উপর তুলনামূলক আলোচনার সাহায্যে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, জার্মান ও অ-জার্মান ভাষার ধ্বনি পরিবর্তণ অত্যন্ত নিয়মিত। তাঁর সূত্র গ্রিমের সূত্র নামে পরিচিতি লাভ করে। তিনি তাঁর সূত্রের সাহায্যে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা থেকে শুরু করে প্রাক জার্মান ও প্রাচীন উচ্চ জার্মান ভাষার ব্যঞ্জনধ্বনির পরিবর্তনের নিয়মগুলো সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করেন।

১৮১৮ সালে আউগুস্ট ফন শ্লেগেল প্রথম ভাষার রৌপ শ্রেণীকরণ করেন এবং মানব ভাষাগুলোকে বিশ্লিষ্ট সংশ্লেষণাত্মক ও সংসক্ত এ তিনটি রৌপ শ্রেণীতে ভাগ করেন।

১৮৩৩ সালে আউগুস্ট ফ্রিডরিখ পটের সময় থেকে ইন্দোজার্মান ভাষার ক্ষেত্রে শব্দের ব্যুৎপত্তি বিষয়ক গবেষণা শুরু হয়। তিনি তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করেন এবং বিজ্ঞানসম্মত ব্যুৎপত্তি শাস্ত্র উদ্ভাবনে কাজে লাগান।

১৮৫৭ সালে জার্মান অধ্যাপক ফ্রানজ বপ সংস্কৃত ও ইরানীয় ভাষা অন্তর্র্ভূক্তির সাহায্যে তুলনামূলক ব্যাকরণ রচনায় অগ্রসর হন। তিনি সংস্কৃত, গ্রিক, ল্যাটিন, লিথ্যুনীয়, গথিক ও জার্মানি ভাষার তুলনামূলক ব্যাকরণ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন ১৮৩৩ সালে এবং তিনি তা শেষ করেন ১৮৫৭ সালে।

১৮৫০-৫৫ সালের দিকে চযরষড়ঃড়মরব শব্দের বদলে খরৎমঁরংঃরশব অভিধাটি ব্যবহৃত হতে থাকে ভাষাবিদ্যার নামকরণে। এ শাস্ত্রটি যদিও ভাষা বিষয়ক ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে শুধু ভাষাই হয়ে ওঠে এর প্রধান বিষয়।

উনিশ শতকের অন্যতম ভাষাতাত্তি¡ক হলেন আউগুষ্ট শ্লাইখার। তিনি ১৮৬১ সালে তাঁর বিখ্যাত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার তুলনামূলক ব্যাকরণ রচনা করেন। শ্লাইখারের অবদান নিম্নরূপ ঃ
প্রথমত, বিভিন্ন ভাষার সম্পর্কগত সূত্র।

দ্বিতীয়ত, তুলনামূলক পদ্ধতির সাহায্যে মূল ভাষার পুনর্গঠন।
তৃতীয়ত, বিভিন্ন ভাষার শ্রেণীকরণ।

তুলনামূলক-ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন বংশলতিকাতত্ত¡ ও পুনর্গঠিত শব্দের আগে তারকাচিহেৃর প্রয়োগ প্রচলনের জন্য।

১৮৭২ সালে শ্লাইখারের ছাত্র শ্মিডট বংশলতিকা-তত্ত্বের বিরোধী একটা তত্ত্ব তরঙ্গতত্ত্ব উদ্ভাবন করে ইন্দোজার্মান ভাষা সমূহের সম্পর্র্ক নির্ণয় করেন।

১৮৭৫ সালে ডেনিস ভাষাতাত্তি¡ক কাল ভার্নার তুলনামূলক ভাষাতত্তে¡ তাঁর প্রবন্ধের মাধ্যমে ভাষাতত্ত্বের একটা নতুন দিক উন্মোচন করেন। গ্রিমের সূত্রের অপূর্ণতা ভার্ণারের সূত্র দ্বারা পূর্ণতা পায়।

উনিশ শতকের শেষ দিকে তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের বড় ঘটনা হল নব্য ব্যাকরণবিদদের আবির্ভাব। ১৮৭৮ সালে লাইপৎজিগে কার্ল ব্রুগমান (১৮৪৯-১৯১৯) ও হেরমান অশটহফ (১৮৪৭-১৯০৯) প্রকাশ করেন তাদের রূপতাত্তি¡ক অনুসন্ধান। এর ভূমিকায় তাঁরা ঘোষণা করেন-

“সমস্ত ধ্বনিপরিবর্তন, যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়, সূত্রানুসারে সংঘটিত হয়, যার কোনো ব্যতিক্রম নেই।”

নব্যব্যাকরণবিদরা প্রবীনদের দ্বারা তিরস্কৃত হলেও তারা তাদের গবেষণা দ্বারা তা গৌরবে পরিণত করেন।

নব্য ব্যাকরণবিদরা পাঁচটি বিষয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করতেন এবং নিজেদের রচনায় নিষ্ঠার সাথে পালন করতেন বিধানগুলো হলো।

উনিশ শতকের শেষদিকে ও বিশ শতকের প্রথম দিকে তুলনামূলক ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানের জগতে যেসব ভাষাবিজ্ঞানী বিশিষ্টতা অর্জন করেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ম্যাকসমুলার, মেইয়ে, চার্লস হকেট, লিওনার্ড Blumfield প্রমুখ।

সবশেষে বলা যায় যে, তুলনামূলক পদ্ধতিতে ভাষাচর্চা উনিশ শতকে ব্যাপক হলেও সুদূর প্রাচীনকাল থেকে এর সূচনা ও চর্চা হয়েছে কমবেশি। বিশ শতকেও হয়েছে, হচ্ছে তবে উনিশ শতক হচ্ছে তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের নিজস্ব বছর।

উপসংহার (ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি)

সব ভাষার ইতিহাসই এক দীর্ঘ বিবর্তনের গল্প; আর সেই গল্প পাঠের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায় ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি। ভাষার প্রাচীন রূপ থেকে আধুনিক রূপে যাত্রাপথ ব্যাখ্যা করতে গেলে এই পদ্ধতি ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। শব্দ-সাদৃস্যের ভিত্তিতে ভাষা পরিবার নির্ণয়, ভাষা-ধারার পরিবর্তন, ধ্বনির স্থানান্তর কিংবা অর্থের বিবর্তন—সবই প্রমাণ করে যে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি এক অবিচ্ছেদ্য গবেষণা কাঠামো।

ভাষাবিজ্ঞান আজ বিজ্ঞানের পর্যায়ে পৌঁছেছে এই কারণেই যে, ভাষাকে আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে বিচার করা হয়; আর সেই প্রমাণ সংগ্রহের নির্ভরযোগ্য রীতি হলো ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি। ভাষা বিচারে গবেষণা, শিক্ষা, ব্যুৎপত্তি নির্ণয়, এমনকি অভিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির ভূমিকা অপরিসীম। ভাষা যেমন পরিবর্তনশীল, তেমনই বহুধারায় বিস্তৃত; তাই ভাষার মূল শিকড় জানার জন্য ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি আজও একমাত্র যৌক্তিক উপায়। ভাষাকে জানা মানে নিজেকে জানা, নিজের জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে চেনা। এ কারণেই বলা যায়, ভাষাতত্ত্বের বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক ও তুলনামূলক পদ্ধতি শুধু একটি গবেষণাগত কৌশল নয়, বরং ভাষা ও সভ্যতার যৌথ ইতিহাসের অনুসন্ধান-আলোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *