রূপতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে ভাষার শ্রেণিবিন্যাস কর এবং এ পদ্ধতিতে বাংলা ভাষার স্থান নির্দেশ কর।


ভূমিকা: পৃথিবীতে হাজার হাজার ভাষা রয়েছে। প্রকৃতির গোপন খেয়ালে বেড়ে ওঠা এ ভাষাসমূহ বড় বিচিত্র ও জটিল। তাই ভাষাতাত্ত্বিকরা পঠন-পাঠনের সুবিধার্থে পৃথিবীর সমস্ত ভাষাকে শ্রেণিবিন্যাস করে একটা নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে চেয়েছেন। আর এটা করতে গিয়ে তারা ভাষার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করেছেন। কেননা ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য। কোনো কোনো ভাষার মধ্যে ধ্বনি, রূপ ও বাক্যের মধ্যে মিল রয়েছে। আবার কিছু ভাষার মধ্যে রয়েছে বংশগত সম্পর্ক। শব্দকোষে বা ব্যাকরণে লক্ষনীয় ঐক্য ধরে ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রধানত দু’ভাগে পৃথিবীর যাবতীয় ভাষাকে শ্রেণীবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। তাহলো-
- ১) ভাষাসমূহের ব্যাকরণ গত বা রূপতাত্তি¡ক শ্রেণিবিন্যাস। এটাকে বাক্যগঠনরীতিগত শ্রেণিবিভাগও বলা যায়।
- ২) বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস।
নিম্নে রূপতাত্ত্বিক পদ্ধতিতে ভাষার শ্রেণিকরণ আলোচনা করা হলো।
ভাষার রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিকরণ।
বৈশিষ্ট্য: রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিকরণ অনেকটা আধুনিকতর। রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিকরণ-এ ভাষার রূপমূলের অন্তর্নিহিত গঠন-প্রকৃতি অনুসারে বিভিন্ন ভাষা একই শ্রেণিভূক্ত করা হয়। রূপমূলের গঠন, রূপমূলের সঙ্গে প্রত্যয়-বিভক্তি অন্তর্ভূক্তির আদর্শ, রূপমূলের পরিবর্তন, রূপমূলের অর্থগত দিক ইত্যাদির উপর গুরুত্ব আরোপ করে রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিকরণ করা হয় বলে একে রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিকরণ বলা হয়ে থাকে। ভাষার অন্তর্নিহিত উপাদানের বৈশিষ্ট্যই এক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য দিক।
যে-কোনো ভাষার বাক্য সেই ভাষার একক। এই বাক্য গঠন পদ্ধতির জন্যই বিভিন্ন ভাষার মধ্যে পার্থক্য লক্ষ করা যায়। এদিক বিবেচনায় ভাষাকে দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
- ১) অসমবায়ী বা বিশ্লিষ্ট বা অবস্থানিক।
- ২) সমবায়ী বা জৈববন্ধনমুক্ত বা আশ্লেষযুক্ত।
১) অসমবায়ী বা বিশ্লিষ্ট বা অবস্থানিক:
শব্দের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন ছাড়া কেবলমাত্র তার অবস্থানের দিক দিয়ে যেখানে বাক্যগঠন করা হয় অর্থাৎ যে-সব ভাষায় শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হলে তার পরিবর্তন হয় না, সে সকল ভাষাকে অসমবায়ী বা অবস্থানিক ভাষা বলা যেতে পারে। যেমনÑ চীনা ও ইংরেজি ভাষা। চীনা ও সম্পৃক্ত ভাষাগুলোতে শব্দরূপ ও ধাতুরূপ নেই ; শব্দ ও পদের মধ্যেও কোনো পার্থক্য নেই। একই শব্দ, বাক্যে তার অবস্থান অনুসারে, বিশেষ্য বা বিশেষণ, বা ক্রিয়া বিশেষণ হয়ে ওঠে। চীনা ভাষা এর প্রমাণ-
Wo Da Ni√
ওর্অ র্তা (ত) নি√ (নি)
আমি মারি তোমাকে
এখানে ‘Wo’ হলো কর্তা, Ni√ হলো কর্ম। এর সাথে কোনো বিভক্তি যোগ হয় নি।
Ni Da Wo√ এখনে পদ পাল্টে গেছে
তুমি মারো আমাকে বাক্যের অর্থও পরিবর্তিত হয়েছে।
ইংরেজি: Men kill tigrs.
Tigers kill men.
২) সমবায়ী বা জৈববন্ধনমুক্ত বা আশ্লেষযুক্ত :
যে সকল ভাষায় শব্দের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন সাধিত হয় অথবা উপসর্গ প্রত্যয় বিভক্তি যোগ করে বাক্যের গঠনরীতি বোঝানো হয়, অর্থাৎ যে সব ভাষায় শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হলে তার রূপান্তর ঘটে, সে-সব ভাষাকে সমবায়ী ভাষা বলা হয়। পৃথিবীর বেশির ভাগ ভাষাই এই শ্রেণীভূক্ত। বাংলা ভাষাও মূলত এই শ্রেণীতে পড়ে।
সমবায়ী ভাষা ভাষাগুলো আবার তিনটি ভাগে বিভক্ত ঃ
- ক) সর্বসমবায়ী বা অবিচ্ছিন্ন গঠনযুক্ত/বহুসংশ্লেষণাত্মক;
- খ) যৌগিক সমবায়ী বা যৌগিক গঠনযুক্ত বা সংসক্ত ভাষা;
- গ) সমন্বয়ী সমবাযী/সংশ্লেষণাত্মক ভাষা;
ক) সর্বসমবায়ী বা অবিচ্ছিন্ন গঠনযুক্ত/বহুসংশ্লেষণাত্মকঃ
যে ভাষায় কর্তা, কর্ম ও অন্যান্য ব্যাকরণিক উপাদান ক্রিয়ারূপে একীভূত হয়ে যায় এবং এক শব্দে গঠিত হয় একটি বাক্য, সে ভাষা বহুসংশ্লেষণাত্মক বা সর্বসমবায়ী বা অবিচ্ছিন্ন গঠনযুক্ত ভাষা। আমেরিকার আদিভাষাগুলো এ শ্রেণীর। যেমন- এস্কিমো ভাষা-
Takusar-iartor-uma-galuar-nerp-d.
[আক্ষরিকার্থ : সে নিজেকে তাতে নিয়োজিত রাখে+সে যায়+সে ইচ্ছে করে+সে তা করে+কিন্তু+তুমি কি মনে করো সে। অর্থাৎ তুমি কি মনে করো যে সে সত্যিই এটি দেখাশোনা করতে যাচ্ছে ?]
গ্রিনল্যান্ডীয় ভাষায়-- Aulisariar to rasuarpok
[আউলিসারি আর তো রাসু আরপোক]
একটি শব্দ একটি বাক্য-এর অর্থ ‘সে মাছ ধরতে ছুটে যায়’। বাক্যটি কতগুলো পদের প্রধান অংশ একসঙ্গে যোগ করে গঠিত হয়েছে।
খ) যৌগিক সমবায়ী বা যৌগিক গঠনযুক্ত বা সংসক্ত ভাষা ঃ
যে ভাষায় এক শব্দে একাধিক অর্থ উপাদান থাকে, কিন্তু সেগুলো স্বতন্ত্ররূপে বিরাজ করে এবং সেগুলোর কোনো রৌপ পরিবর্তন হয় না, সেটি যৌগিক সমবায়ী বা সংসক্ত ভাষা। এই পর্যায়ের ভাষাগুলোতে শব্দে উপসর্গ, প্রত্যয়, বিভক্তি যোগ করা সত্ত্বেও মূল শব্দ বা ধ্বনিটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। তুর্কী ভাষা এর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
যৌগিক সমবায়ী আবার দিন প্রকারের ঃ
১) উপসর্গ যৌগিক ঃ এই ভাষায় শব্দের আদিতে উপসর্গ যোগ করে প্রত্যয় বিভক্তি ইত্যাদির অর্থ প্রকাশ করা হয়। যেমন-কাফ্রি ভাষায়- Umuntu = একজন লোক (Umu = একবচন বাচক উপসর্গ), Abantu = একাধিক লোক (অনধ = বহুবচন বাচক উপসর্গ)। মধ্য আফ্রিকার বাল্টুগোষ্ঠীর ভাষা এর অন্তর্গত।
২) অনুসর্গ যৌগিক ঃ এই ভাষায় শব্দের শেষে অনুসর্গ বা প্রত্যয় বিভক্তি যোগ করা হয়। যেমন কন্নড় ভাষায় Sevaka-ru = সেবকগণ (ru = কর্তৃকারকের বহুবচনের বিভক্তি)। Sevaka-rannu (rannu = কর্মকারকের বহুবচনের বিভক্তি)। তুর্ক-তাতার ও দ্রাবিড় বংশের ভাষাগুলো এই শ্রেণীতে পড়ে।
৩) অন্তঃসর্গ যৌগিক ঃ এই ভাষায় শব্দের আদিতে বা অন্তে নয়, শব্দের মাঝখানে প্রত্যয়, বিভক্তি ইত্যাদি যোগ করা হয়। যেমন- তুর্কি ভাষায় Sev-mek = ‘ভালবাসা’ (ক্রিয়া)। Sev-er অর্থ ‘প্রেমিক’, Sev-me-mek অর্থ ‘ভালো না বাসা’ ইত্যাদি।
গ) সমন্বয়ী সমবায়ী/সংশ্লেষণাত্মক ভাষা ঃ
যে ভাষায় এক শব্দে একাধিক সার্থ উপাদান থাকে, কিন্তু সেগুলো যদি পরস্পর সংশ্লেষিত হয়ে যায় ও বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে রৌপ পরিবর্তন পরিগ্রহ করে, তবে সেটি সমন্বয়ী সমবায়ী/সংশ্লেষণাত্মক ভাষা। মনে করা হয় এর উপাদানগুলো আগে স্বাধীন ছিল, কিন্তু পরে অবিচ্ছেদ্যভাবে শব্দমূলের সাথে সংশ্লেষিত হয়ে গেছে। অর্থাৎ শব্দের পরিবর্তনের ফলে মূল ধাতু বা শব্দটিকে চিনতে অসুবিধা হয়। ইন্দো-ইউরোপীয় ও সেমিটীয় ভাষা এ শ্রেণীর। আরবি থেকে উদাহরণ- ‘কতল’ (Qtl) একটি ধাতু। এর মধ্যে a-a-a যোগ করলে কতল (Qatala) হয়, অর্থ- ‘সে মারল’। আবার u-i-a যোগ কলে পাওয় যায় কুতিল (Qutila) = ‘সে মারা পড়ল’। শুধু র যোগ করলে কিতল (Qitl) হয়, অর্থ শত্রু।


বাংলা ভাষার স্থান নির্ণয় ঃ
বাংলায় ব্যবহৃত রূপমূল গঠনের প্রকৃতির সাহায্যে বাংলা শ্রেণিবিন্যাসগত রূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আলোচিত রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাসের বৈশিষ্ট্য লক্ষ করলে দেখা যায় যে, অনেক ভাষার মধ্যেই একাধিক রূপতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। বাংলার ক্ষেত্রেও একথা প্রযোজ্য। তবে বাংলা রূপমূলের গঠন বৈশিষ্ট্যের আলোকে রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি অনুসারে বাংলা ভাষাকে সমন্বয়ী সমবায়ী বা সংশ্লেষণাত্মক ভাষা বলা যায়। কেননা বাংলায় ধাতুর ব্যঞ্জণধ্বনির আগে, মধ্যে বা শেষে স্বরধ্বনি যোগ করে পদ সৃষ্টি করা সম্ভব। কর+ই = করি, কর+এ = করে, সুতরাং বাংলা ভাষা সংশ্লেষণাত্মক/সমন্বয়ী সমবায়ী ভাষার অন্তর্গত।