রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া : স্থায়ীভাব কীভাবে বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংস্পর্শে রসে পরিণত হয়, আলোচনা কর।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া : কীভাবে কবি অলৌকিক মায়ার জগৎ সৃষ্টি করেন বা কাব্যনির্মাণকলার কোন কৌশলে কবি রস সৃষ্টি করেন, তা আলোচনা কর।


সূচনা: ভারতীয় কাব্যতত্ত্বে রস হলো সাহিত্যের প্রাণ, যে অনুভূতিতে পাঠক বা দর্শক শিল্পের স্বাদ গ্রহণ করে। রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া মূলত একটি নন্দনচেতনার রূপান্তর, যেখানে স্থায়ীভাব, বিভাব, অনুভাব, সঞ্চারীভাব, ব্যাভিচারী ভাব, আলঙ্কার, ধ্বনি, রীতি, শব্দচয়ন, ছন্দ, চিত্রকল্প, অভিনয়, রসাস্বাদন, রসোৎপত্তি, সহৃদয় পাঠক, নন্দনতত্ত্ব, সংবেদন, সহানুভূতি, এবং রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া—সবই মিলে একটি সামগ্রিক অভিজ্ঞতা গড়ে তোলে। সাহিত্য তখনই সম্পূর্ণ হয় যখন পাঠকের মনের গহীনে সঞ্চিত স্থায়ী আবেগকে শিল্পরূপে আন্দোলিত করে রস জাগ্রত হয়। সুতরাং রস শুধু একটি তত্ত্ব নয়; এটি সাহিত্য, নাট্য, কাব্য ও শিল্প-অনুভূতির সর্বোচ্চ পূর্ণতা।
কারো কথা ভালো না লাগলে বলি, তার কথায় কোনো রস-কষ নেই। অথবা, কারো কথা ভালো লাগলে বলি, তার কথায় রসবোধ আছে। সাহিত্যে রস থাকে। এ রস কী? কীভাবে তা বোঝা যায়? সাহিত্যে কীভাবে রস সৃষ্টি হয়? এ নিয়ে রসতাত্ত্বিকরা নানাবিধ আলোচনা করেছেন, কিন্তু রসের কথা বলতে গিয়ে এমন গুরুগম্ভীর আলোচনার অবতারণা করেছেন যে, তাদের কথার মর্মার্থ বের করতে গিয়ে আমরাই রসহীন হয়ে পড়ি।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া – রস কী ?
রস শব্দটির সাধারণ অর্থ স্বাদ। অলঙ্কার শাস্ত্র অনুযায়ী রস ধাতুর অর্থ আস্বাদন করা। তাই বিশ্বনাথ কবিরাজ বলেছেন যে, যা রসিত বা আস্বাদিত হয়, তা-ই রস।
রসের অবস্থান কেবল সহৃদয় সামাজিকের মনে। তাই এ রস সহৃদয়হৃদয়সংবাদী। মিষ্টি, টক, লবণ, তিতা, কষা- এসব খাবারের রস যেমন জিভ দিয়ে আমরা গ্রহণ করি, তেমনি কাব্য-সাহিত্যের রস আস্বাদন করা হয় অন্তরের অনুভূতি দিয়ে। এক এক খাবারের স্বাদ যেমন এক এক রকম, সাহিত্যেও তেমন নয়টি রস। সেগুলো হলো- শৃঙ্গার বা মধুর, করুণ, হাস্য, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভূত ও শান্ত। এ রস সহৃদয় পাঠক ছাড়া অন্য কেউ অনুভব করতে পারে না। তাই, অতুল চন্দ্র গুপ্ত অভিনব গুপ্তের অনুসরণে বলেছেন-
দর্পণ-স্বচ্ছ নির্মল মনের দরদী লোকের সুকাব্যজনিত চিত্তের অনুভূত বিশেষের নাম রস।
ডঃ সুধীর কুমার দাশ গুপ্ত বলেছেন-
শব্দার্থজাত ভাবতন্ময় চিত্তে আনন্দ-স্বরূপের প্রকাশই রস।
তাহলে, আমরা বলতে পারি, সহৃদয় ব্যক্তি তাঁর অনুভূতিপ্রবণ চিত্তে কাব্য-নাটক ইত্যাদি পড়ে-শুনে-দেখে যে অলৌকিক আনন্দ অনুভব করেন, তাই রস।
সংবেদী পাঠক কাব্য পাঠের পর তার মনে যে ভাব-তন্ময়তার জন্ম নেয়, কাব্যতত্ত্ববিদগণ তার নাম দিয়েছেন রস। এ রসের প্রভাবে কাব্যজগত এক অপরিচয়ের বিষ্ময়মিশ্রিত জগৎ হয়ে ওঠে, একে পণ্ডিতেরা বলেছেন, অলৌকিক মায়ার জগৎ। কবির অপূর্ব বস্তু নির্মাণক্ষম প্রজ্ঞা শক্তির প্রভাবে বাস্তব জগতের সাদামাটা আটপৌরে বস্তু মধুরতম মোহনীয় হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে, যাকে বলা হয় অলৌকিক মায়ার জগৎ। কাব্যের জগৎ আসলেই অলৌকিক মায়ার জগৎ। আর এটি সম্ভব হয়, রসের কারণে। কেননা, রসাত্মক বাক্যই কাব্য। রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
সংক্ষেপে রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া :
রস কীভাবে সৃষ্টি হয় রস সৃষ্টির প্রক্রিয়ার তার সহজ উত্তর হলো- কাব্য-নাটকের বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংস্পর্শে এসে স্থায়ীভাব রসে রূপান্তরিত হয়। পাঠক যখন কাব্য-নাটক পাঠ করে, তখন কাব্য-নাটকের অনুরূপ ভাব পাঠকের মনে জন্ম নেয়। কাব্যজগত পাঠককে এক অলৌকিক জগতে নিয়ে যায়। পাঠকের সাথে কাব্যের অনুভূতির একাত্মতা সৃষ্টি হয়। কাব্যের বিষয়ের মধ্যে পাঠকের আত্মবিলুপ্তি ঘটে বা সাধারণীকরণ হয় । পাঠক অলৌকিক আনন্দ লাভ করে। এ দিব্য অনুভূতিসঞ্জাত নির্মল আনন্দময় মানসিক অবস্থার নাম রস।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজ কথা- কাব্যের বিভাব, অনুভাব পাঠকের মনে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সঞ্চারীভাব স্থায়ীভাবকে পরিপুষ্টি সাধন করে। ফলে, স্থায়ীভাব ধীরে ধীরে রসে রূপান্তরিত হয়।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া যত সহজে বলা হলো, তা তত সহজ নয়। রসতত্ত্বে রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া বা রস কীভাবে সৃষ্টি হয়, এ প্রশ্নের একটি বাক্যে উত্তর দেওয়া হয়েছে। তা হলো- স্থায়ীভাব, বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংস্পর্শে রসে রূপান্তরিত হয়। অর্থাৎ, কাব্য-নাটকের বিভাব-অনুভাবের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মানবমনে সৃষ্ট স্থায়ীভাবটি ধীরে ধীরে কতকগুলো ধাপ বা স্তর পেরিয়ে রসে পরিণত হয়।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া : রসের উপাদান:
রস বিশ্লেষণে আলংকারিকেরা দুটো উপাদান পেয়েছেন- মানসিক ও বাহ্যিক। মানসিক উপাদান হলো ভাব, আর বাহ্যিক উপাদান হলো কাব্যজগৎ। রসের বাহ্যিক উপাদানের ক্রিয়ায় মানব মনের ভাব রূপান্তরিত হয়ে রসে পরিণত হয়।
কবি অলৌকিক মায়ার জগৎ সৃষ্টি করেন। পাঠক তা পাঠ করে রসসিক্ত হয়ে ওঠে। কবির মায়াজগৎ সৃষ্টির সেই অপূর্ব কৌশল কী- তার যথার্থ উত্তর খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব। আলংকারিকরা মনে করেন পাঠকের মনের স্থায়ীভাবগুলো কাব্যনির্মাণ কৌশলের গুণে রসে পরিণত হয়। এই কাব্য-নির্মাণ-কলার তিনটি ভাগ- বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাব।
বিভাব: লৌকিক জগতে ঘটে যাওয়া হাজারো ঘটনা আমাদের মনের ভাবগুলোকে জাগিয়ে তোলে। যে সকল কারণে মনে স্থায়ীভাব উৎপন্ন হয়, তাদের নাম বিভাব। ভাবরূপ কার্যের হেতুকে বিভাব বলে। লৌকিক জগতে যা বিভিন্ন ভাবের জন্ম দেয়, কাব্য বা নাটকে তাকেই বিভাব বলে।
বিভাব দুই প্রকার- আলম্বন বিভাব ও উদ্দীপন বিভাব। যাকে অবলম্বন করে রসের সৃষ্টি হয়, তাকে আলম্বন বিভাব বলে। আর যেসব অবস্থা বা বস্তু রসকে উদ্দীপিত করে, অর্থাৎ রস সৃষ্টিতে সহায়তা করে তাকে উদ্দীপন বিভাব বলে।
অনুভাব: মনে ভাব আসলে বাইরে যে লক্ষণ প্রকাশ পায়, কাব্য-নাটকে সেই লক্ষণকে অনুভাব বলে। অর্থাৎ মনে ভাব জাগরিত হলে যে-সব স্বাভাবিক উপায়ে তা বাইরে প্রকাশিত হয়, ভাবরূপ কারণের সে সব লৌকিক কার্যকে কাব্য-নাটকে অনুভাব বলে।
অনুভাব তিন প্রকার– অলংকার, উদ্ভাসর ও বাচিক।
সঞ্চারীভাব: মানব মনের অনন্তভাবের যেগুলো স্থায়ী নয়, হৃদয়ে উদিত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়, সে-সব ভাব আলংকারিকদের মতে সঞ্চারীভাব। এদের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। এরা স্থায়ীভাবের সম্পর্কে সম্পর্কিত, এরা স্থায়ীভাবকে পরিপুষ্টি সাধন করে রসে পরিণত করতে সাহায্য করে। স্থায়ীভাব থেকে রসের সৃষ্টি হয় ঠিকই, কিন্তু সঞ্চারীভাব ছাড়া রসের রসত্বই হয় না।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া – রসের জগৎ
আচার্য ভরতমুনি থেকে বিশ্বনাথ কবিরাজ পর্যন্ত রসবাদী আলংকারিকরা রসসৃষ্টির প্রক্রিয়ার সাথে চারটি জগতের কথা বলেছেন। জগৎ চারটি হলো- লৌকিক জগৎ, কবির চিত্ত জগৎ, কাব্য-জগৎ ও সহৃদয় সামাজিকের চিত্তজগৎ বা পাঠকের জগৎ।

লৌকিক জগতের ঘটনা কবির মনে বিভিন্ন ভাব বা অনুভূতির জন্ম দেয়, জগৎ-সংসার কবির মনকে আন্দোলিত করে, কবির মনে জন্ম নেয়া ভাবের সাথে কবির কল্পনা-চিন্তা-ভাবনা, সেই সাথে নির্মাণ-কলার প্রজ্ঞা মিশে কবির চিত্ত জগৎ সৃষ্টি হয়। কবির চিত্তজগতে জেগে ওঠা ভাব শব্দের রূপ ধরে কাব্যজগতে প্রকাশ লাভ করে। চিত্তজগতে জাগা ভাব কাব্যজগতে বিভাব নামে পরিচিতি লাভ করে।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া — সাধারণীকরণ
কাব্য-নাটক পাঠের পর কাব্যের মধ্যে গ্রথিত কবির মনের অনুরূপ ভাব সহৃদয় লোকের মনে অর্থাৎ পাঠকের মনে সঞ্চারীত হয়। পাঠকের মনে বিভিন্ন অনুভূতির জন্ম হয়। পাঠকের কাছে না-দেখা লৌকিক জগৎ, কবির চিত্তজগৎ ও কাব্যজগৎ এক মায়াময় মোহনীয়রূপে ধরা দেয়। পাঠকের অলৌকিক জগতে মানসাভিসার চলে। এক এক ভাব পাঠককে এক এক জগতে নিয়ে যায়। কাব্যজগতের ভাবানুভূতির সাথে পাঠকের একাত্মতা সৃষ্টি হয়। কাব্যের বিষয়ের মধ্যে পাঠকের আত্মবিলুপ্তি ঘটে। কাব্যজগতের সাথে সহৃদয় সামাজিকের(পাঠকের) চিত্তজগতের এই যোগাযোগের প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সাধারণীকরণ। কাব্যজগতের সাথে পাঠকের চিত্তজগতের একাত্মতাবোধই সাধারণীকরণ। ( একই নাটক বা সিনেমা দেখে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ছোট-বড় সকল মানুষের মনে একই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, এই যে সকল মানুষ একই বৃত্তে বা কাতারে আসে, তাকেই বলে সাধারণীকরণ। )
| আরও পড়ুন — 47 – রসববাদের প্রবক্তা ভরতের কাব্য নির্মাণ কলা সম্পর্কিত মতামত। 48 ভাবের সংজ্ঞা : ভাব কী? ভাবের বৈশিষ্ট্য |
কাব্য-নাটকের বিভাবাদির সঙ্গে সাধারণীকরণের ফলে পাঠকের মনে অনুরূপ স্থায়ীভাবের জন্ম হয়। পাঠক মনের এই স্থায়ীভাব কাব্য-নাটকের বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
মানুষের আত্মার তিনটি অংশ- সৎ, চিৎ ও আনন্দ। এই তিনটি অংশের উপর একটা অজ্ঞানের আবরণ থাকে। কাব্য-নাটকের বিভাবাদির দ্বারা সৃষ্ট পাঠকের মনে জেগে ওঠা স্থায়ীভাবগুলো আত্মার আবরণের উপর চাপ দিয়ে ভেঙে ফেলে। পাঠক নির্মল আনন্দ লাভ করে। এই নির্মল আনন্দ প্রকাশের নামই রস।
বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর সাহিত্য-দর্পণ গ্রন্থে রসের উৎপত্তি বা রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া বর্ণনা করতে গিয়ে যথার্থ বলেছেন যে, মানব মনে স্থায়ীভাব কাব্য-নাটকের বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংস্পর্শে রূপান্তর প্রাপ্ত হয়ে রসে পরিণত হয়। স্থায়ীভাব যদি কাব্য-নাটকের বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভাবের সংস্পর্শে রূপান্তর প্রাপ্ত না হয়, তবে তা কাব্যরস হতে পারে না। তাই, কবিকে কাব্যরস সৃষ্টির জন্য অপূর্ব কাব্যনির্মাণ কৌশলের সাহায্যে কাব্যের মায়াজগৎ সৃষ্টি করতে হয়। আর এ মায়াজগৎ অলৌকিক।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া : প্রাচ্য মতানুসারে বিভাবের পরিচয়
বিভাব শব্দের অর্থ কারণ। রসতত্ত্বের ভাষায় রসানুভূতির কারণকেই বিভাব বলে। মনীষী ভরত তাঁর নাট্যশাস্ত্রে বিভাবের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন যে, বিভাব, কারণ, নিমিত্ত, হেতু একই পর্যায়ের শব্দ।আসলে বিভাব হচ্ছে, আমাদের জীবনে যা রতি শোক হাস ইত্যাদি স্থায়ীভাবের জম্ম দেয়, তা-ই কাব্যে বা নাটকে শিল্পিতভাবে সন্নিবেশিত হলে তাকে বিভাব বলে। এ কথার সমর্থন মেলে বিশ্বনাথ কবিরাজের কথার মধ্যে। তিনি বলেছেন যে, লৌকিক জগতে যা রতি শোক হাস প্রভৃতি ভাবের হেতু বা উদ্বোধক, কাব্যে বা নাট্যে তা-ই বিভাব নামে পরিচিত।
পণ্ডিতদের মন্তব্যের আলোকে বলা যায় যে, বিভাব যেহেতু পাঠক বা সামাজিক চিত্তে লৌকিক জগতের রতি শোক হাস প্রভৃতি ভাবকে বিভাবিত করে রসে পরিণত করে, সেজন্যেই এরা বিভাব নামে পরিচিত। যেমন- আমরা আপনজনের মৃত্যুতে শোকার্ত হই, অন্যায় উৎপীড়নের দৃশ্যে আমরা রাগান্বিত হই, অবিবেকী আচরণে ক্ষুব্ধ হই, বিষাক্ত সাপ বা হিংস্র পশু দেখলে ভীতসন্ত্রস্ত হই, প্রেমের গানে প্রীত হই, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা-গানে হয়ে উঠি উৎসাহিত। এভাবে আমাদের জাগতিক জীবনে যে সমস্ত কারণ আমাদের মনের মধ্যে বিভিন্ন ভাবকে জাগিয়ে তোলে, তাদেরকেই অলঙ্কারশাস্ত্রীরা তাদের শাস্ত্রের পরিভাষায় বিভাব নামে অভিহিত করেছেন। যেমন-
জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন
এই কবিতা শোনার সাথে সাথে দেশদ্রোহী শক্তির প্রতি প্রবল ঘৃণাভাব জাগ্রত হয়।
লৌকিক জগতের যে সব কারণ বা ঘটনা মানুষের মনে ভাবকে জাগিয়ে তোলে, সেই ঘটনাকে কবি যখন তাঁর যাদুস্পর্শে অলৌকিক রূপে কাব্যে রূপদান করেন, তখন তাকে বিভাব বলে।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া — বিভাবের প্রকারভেদ:
বিভাব দুই প্রকার।
- ১. আলম্বন বিভাব ও
- ২. উদ্দীপন বিভাব
১. আলম্বন বিভাব: যে বস্তুকে অবলম্বন করে রসের উৎপত্তি ঘটে, তাকে আলম্বন বিভাব বলে। যেমন- কালিদাসের অভিজ্ঞান শকুন্তলা নাটকে শকুন্তলাকে দেখে রাজা দুষ্মন্তের মনে রতি ভাবের উদ্বোধন ঘটে, এ ক্ষেত্রে শকুন্তলা রতিভাবের কারণ বা হেতু, তাই এখানে শকুন্তলা আলম্বন বিভাব। নাটকে-সিনেমা-গল্পে নায়ককে দেখে নায়িকার মনে, আর নায়িকা দেখে নায়কের মনে রতি ভাবের উদয় হয়, এ ক্ষেত্রে নায়ক ও নায়িকা পরস্পরের আলম্বন বিভাব।
২. উদ্দীপন বিভাব: যে সকল অবস্থা বা যে বিশিষ্ট পরিবেশ বিভিন্ন স্থায়ীভাব থেকে কাঙ্ক্ষিত রস সৃষ্টি সহায়ক হিসেবে কাজ করে তাকে উদ্দীপন বিভাব বলে। ইংরেজিতে এগুলোকে বলা যেতে পারে রসের objective condition.
আলম্বন বিভাব দ্বারা রসের অঙ্কুর হয় এবং উদ্দীপন বিভাব তাকে পরিপূর্ণতা দান করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, নায়িকাকে দেখে নায়কের মনে যে রতি ভাবের জন্ম নেয়, নায়িকার রূপলাবণ্য, প্রসাধন, সাজসজ্জা পুষ্পমাল্য ইত্যাদি নায়কের মনে জন্ম নেওয়া সে রতি ভাব থেকে প্রেমানুভূতির জন্ম নিতে সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে। ফলে এগুলো উদ্দীপন বিভাব। এর সাথে যোগ হতে পারে বসন্তে কোকিলের ডাক, সুন্দর জোছনা রাত, নির্জন সমুদ্র সৈকত, অন্ধকার ঝড়ের রাত ইত্যাদি।
তাহলে বলা যায়, যে সব বস্তু বা আবহ লৌকিক জীবনে স্থায়ীভাবের উদ্দীপনে বা রস সৃষ্টিতে সহায়তা করে তাকে কাব্যে বা নাটকে উদ্দীপন বিভাব বলে।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া : প্রাচ্য মতানুসারে অনুভাবের পরিচয় দাও।
উত্তরঃ অনু +ভাব -শব্দের অর্থ পশ্চাৎ ভাব অর্থাৎ, পরে উৎপত্তি যাদের, তারা অনুভাব। যা ভাবকে অনুভব করায়, তা-ই অনুভাব।
আলম্বন ও উদ্দীপন বিভাবের ফলকেই অনুভাব বলে। আলঙ্কারিক জগন্নাথ বলেছেন-
যাহা আলম্বন এবং উদ্দীপন বিভাবের কার্যরূপে খ্যাত, সাহিত্যে সেই সকলই অনুভাব শব্দের দ্বারা পরিচালিত হয়।
ভাবের দুটো দিক- শারীরিক ও মানসিক। মানসিক পরিবর্তন চোখের আড়ালে ঘটে, কিন্তু তার কিছু আলামত শরীরে ফুটে ওঠে। মনের মধ্যে ভাব জাগলে শরীরে যে লক্ষণগুলো ফুটে ওঠে, কাব্যতত্ত্বে তার নাম অনুভাব। ধরা যাক, মনে রতি ভাবের উদয় ঘটেছে, তবে তার অনুভাব রূপে স্বাভাবিক ভাবেই কটাক্ষ, ভ্রবিলাস, কম্পন, রোমাঞ্চ ইত্যাদি শারীরিক লক্ষণ ফুটে উঠবে। যদি ভাব শোক হয়, তবে দীর্ঘশ্বাস, ক্রন্দন, হাহাকার, অশ্রু, মূর্ছা ইত্যাদি অনুভাব অনিবার্যভাবে প্রকাশ পাবে।
বিশ্বনাথ কবিরাজ তাঁর সাহিত্যদর্পণ গ্রন্থে বলেছেন যে,
মনে ভাব উদ্বুদ্ধ হলে যে-সব স্বাভাবিক বিকার ও উপায়ে তা বাইরে প্রকাশিত হয়, ভাবরূপ কারণের সেইসব লৌকিক কার্য কাব্য বা নাটকে অনুভাব নামে পরিচিত।
পণ্ডিতরাজ জগন্নাথের ভাষায়-
যা আলম্বন ও উদ্দীপন বিভাবরূপ কারণের কার্য বলে পরিচিত, কাব্য ও নাট্যে সেই সবই অনুভাব শব্দ দ্বারা কথিত হয়।
অনুভাবকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো নিম্নে আলোচনা করা হল-
ক) অলঙ্কার, খ) উদ্ভাসর ও গ) বাচিক।
ক) অলঙ্কার : নায়িকার মনে রতি ভাব জাগলে তাদের দেহ ও মনে যে লক্ষণ প্রাথমিকভাবে ফুটে ওঠে, তা অলঙ্কার। যেমন গ্রীবা বাঁকিয়ে চোখে-ভ্রতে নানা ইশারা প্রকাশ, প্রেমিকের স্পর্শে হৃদয়ে প্রীতি, লজ্জা-অভিমান-ঈর্ষায় মনের মধ্যে কথা লুকিয়ে রাখা ইত্যাদি।
খ) উদ্ভাসর: চুল এলিয়ে হাই তোলা, শরীর থেকে আঁচল খসে পড়া ইত্যাদি লক্ষণগুলো উদ্ভাসর অনুভাব।
গ) বাচিক: আলাপ, বিলাপ, প্রলাপ, সংলাপ ইত্যাদি বাচিক অনুভাব।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া : সঞ্চারী বা ব্যভিচারী ভাবের পরিচয় দাও।
উত্তর : মানব হৃদয়ে জন্ম নেওয়া সমস্ত ভাবই সমানভাবে আন্দোলিত করে না বা স্থায়ী হয় না, কিছু ভাব হৃদয়ে উদিত হয়ে আবার মিলিয়ে যায়। যে ভাব আমাদের চিত্তে কখনো আবির্ভূত হয়, কখনো অন্তর্হিত হয়, তাকে সঞ্চারী ভাব বলে।’
মানব মনে জন্ম নেওয়া ভাবের সংখ্যা ৪২। এদের মধ্যে ৯টিকে স্থায়ী এবং ৩৩টিকে অস্থায়ীভাব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আলঙ্কারিকেরা।
সঞ্চারী ভাবের স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব নেই। এ ভাবগুলো কোনো না কোনো স্থায়ীভাবের সূত্রে উদয় হয়, আবার মিলিয়ে যায়। এরা স্থায়ীভাবের সহচর হিসেবে উদয় হয় বলে এদেরকে সঞ্চারী বা সহচারী অথবা ব্যভিচারী ভাব বলে।
সঞ্চারী ও স্থায়ীভাবের সম্পর্ক নির্ণয় করতে গিয়ে পণ্ডিতেরা উপমা দিয়েছেন এভাবে যে, স্থায়ীভাব যেন সমুদ্র, আর সঞ্চারী ভাব যেন সেই সমুদ্রের ঢেউ। সমুদ্রেই এদের উদ্ভব এবং সমুদ্রবক্ষেই তাদের বিলয়। সঞ্চারী ও স্থায়ীভাবের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সঞ্চারী ভাবগুলো স্থায়ীভাবকে পরিপুস্টি দান করে। এরা স্থায়ীভাবের দিকে বিচরণ করে বলেই এরা ব্যভিচারী।
স্থায়ীভাবও সঞ্চারী ভাব’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখন আমাদের চিত্তে কোনো স্থায়ীভাব উদয় হয়, তখন হয়তো অন্য কোনো স্থায়ীভাব সহকারী ভাবে পরিণত হয়ে উক্ত স্থায়ীভাবকে পরিপূর্ণ করে তোলে। এক্ষেত্রে সহকারী স্থায়ীভাবকে সঞ্চারী বা ব্যভিচারী ভাব বলা হয়। যেমন-
রতি স্থায়ীভাবের সাথে যদি হাস স্থায়ীভাব উদয় হয়ে রতি ভাবকে পূর্ণতা দান করে রতি ভাবের মধ্যে নিজেকে বিলুপ্তি ঘোষণা করে, তবে সেক্ষেত্রে হাস আর স্থায়ীভাব থাকে না, ব্যভিচারী বা সঞ্চারীভাবে পরিণত হয়। তাহলে বলা যায় মানব চিত্তে যে ভাবগুলো স্থায়ী হয় না, ফোটে আবার টুটে, উদ্ভূত হয়, আবার মিলিয়ে যায়, মানব মনের এসব অস্থায়ী ভাবগুলোকে অলংকার শাস্ত্রে সঞ্চারী বা ব্যভিচারী ভাব বলা হয়।
প্রশ্নঃ রস কাকে বলে? সংক্ষেপে রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া আলোচনা কর।
উত্তর : রস শব্দটির সাধারণ অর্থ স্বাদ। অলঙ্কার শাস্ত্র অনুযায়ী রস ধাতুর অর্থ আস্বাদন করা। তাই বিশ্বনাথ কবিরাজ বলেছেন যে, যা রসিত বা আস্বাদিত হয়, তা-ই রস।
এ রস সহৃদয়হৃদয়সংবাদী। মিষ্টি, টক, লবণ এসব খাবারের রস যেমন জিহবা দিয়ে আমরা গ্রহণ করি, তেমনি কাব্য-সাহিত্যের রস আস্বাদন করা হয় অন্তরের অনুভূতির দ্বারা। এক এক খাবারে স্বাদ যেমন এক এক রকম, সাহিত্যেও তেমন নয়টি রস-মধুর বা শৃঙ্গার, করুণ, হাস্য, রৌদ্র, বীর, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভূত ও শান্ত। এ রস সহৃদয় পাঠক ছাড়া অন্য কেউ অনুভব করতে পারে না। তাই, অতুল চন্দ্র গুপ্ত অভিনব গুপ্তের অনুসরণে বলেছেন-
দর্পণ স্বচ্ছ নির্মল মনের দরদী লোকের সুকাব্যজনিত চিত্তের অনুভূতি বিশেষের নাম রস।
ডঃ সুধীর কুমার দাসগুপ্ত বলেছেন-
শব্দার্থজাত ভাবতায় চিত্তে আনন্দ-স্বরূপের প্রকাশই রস।
তাহলে আমরা বলতে পারি, সহৃদয় ব্যক্তি তাঁর অনুভূতিপ্রবণ চিত্তে কাব্য-নাটক ইত্যাদি পড়ে, শুনে, দেখে যে অলৌকিক আনন্দ অনুভব করেন, তাই রস।
রস কীভাবে সৃষ্ট হয় বা রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া কী – তার সহজ উত্তর হলো কাব্য-নাটকের বিভাব, অনুভাব ও সঞ্চারীভারের সংস্পর্শে স্থায়ীভাব রসে রূপান্তরিত হয়। পাঠক যখন কাব্য-নাটক পাঠ করে, তখন কাব্য-নাটকের অনুরূপ ভাব পাঠকের মনে জন্ম নেয়। কাব্যজগত পাঠককে এক অলৌকিক জগতে নিয়ে যায়। পাঠকের সাথে কাব্যের অনুভূতির একাত্মাতা সৃষ্টি হয়। কাব্যের বিষয়ের মধ্যে পাঠকের আত্মবিলুপ্তি ঘটে বা সাধারণীকরণ হয়। পাঠক অলৌকিক আনন্দ লাভ করে। এ দিব্য অনুভূতি সঞ্জাত নির্মল আনন্দময় মানসিক অবস্থার নাম রস।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে সহজ কথা- কাব্যের বিভাব, অনুভাব পাঠকের মনে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সঞ্চারীভাব স্থায়ীভাবকে পরিপুষ্টি সাধন করে। ফলে, স্থায়ীভাব ধীরে ধীরে রসে রূপান্তরিত হয়।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া — উপসংহার
সাহিত্য বা নাটকে রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া কখনই একক উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং স্থায়ীভাব, বিভাব, অনুভাব, সঞ্চারীভাব, নাট্যরীতি, বর্ণনাশৈলী, শব্দপ্রয়োগ, ব্যঞ্জনা, রীতি, স্টাইল, অভিনয়, ধ্বনিগুণ, অলঙ্কার, রসোত্তরণ, সহানুভূতি, সংবেদন, রসানুভূতি, রসোৎপত্তি, ভাবসংক্রমণ, নন্দনচেতনা, সহৃদয়তা, আবেগ, চিত্রকল্প, এবং সর্বশেষে রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া—এসব মিলেই পাঠকের অন্তঃকরণে একটি পরিশীলিত অনুভূতির জগৎ তৈরি হয়। কাব্য তখন আর শব্দের সমাবেশ নয়; তা হয়ে ওঠে অনুভূতির অভিজ্ঞান। তাই রস হলো সাহিত্যের চূড়ান্ত সার্থকতা—যেখানে কবির অনুভূতি পাঠকের অনুভূতি হয়ে ওঠে, আর শিল্প তার নন্দন পরিপূর্ণতা অর্জন করে। কবির অপূর্ব নির্মাণে কৌশলে বা কবি প্রজ্ঞার পরম কৌশলে বাক্য রসময় হয়ে এক মায়ার জগৎ সৃষ্টি হয়, পাঠক অলৌকিক আনন্দময় জগতে গিয়ে অলৌকিক আনন্দ লাভ করে। এ সবই রস সৃষ্টির প্রক্রিয়ার অংশ।
রস সৃষ্টির প্রক্রিয়া
↓
| বিভাব (Cause/Stimulus) |
↓
অনুভাব (Expression/Effect) |
↓
| স্থায়ীভাব (Permanent Emotion) |
↓
| সঞ্চারী/ব্যবিচারী ভাব (Transition) |
↓
| সহৃদয় পাঠকের মনে রসোৎপত্তি |