ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গদ্যের ভাষাগত বৈশিষ্ট্য


ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: বাংলা গদ্য-রীতির রূপান্তর: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আগে ও পরে তুলনামূলক আলোচনা
ভূমিকা: উনিশ শতকের কীর্তিমান বাঙালিদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর স্বীয় সাধনার দ্বারা তিনি অপরিসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। মানবতাবাদী, বাংলা গদ্যের জনক, নারী মুক্তি-আন্দোলনের পথিকৃৎ এই কীর্তিমান ‘পুরুষ কর্মক্ষেত্রে শুধু সমাজসংস্কার, শিক্ষা বিস্তার নারীশিক্ষা প্রসার, সংস্কৃত শিক্ষা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিবর্তনের ইতিহাসে বিশেষ করে বাংলা গদ্যের বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন।বাংলা গদ্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এক দীপ্তিমান আলোকস্তম্ভ, যিনি আধুনিক গদ্যের রূপকার হিসেবে সর্বাগ্রে স্মরণীয়। উনিশ শতকের বঙ্গসমাজে ভাষার দুর্বোধ্যতা, জটিল রচনা–রীতি এবং শিক্ষায় অগোছালো পরিবেশের মধ্যেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গদ্যকে সহজ, সাবলীল ও মানুষের বোধের উপযোগী রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর রচিত বর্ণপরিচয়, কথামালা ও বিভিন্ন অনুবাদ–গ্রন্থ বাংলা গদ্যের শৈলী, গঠন ও ব্যবহারিক প্রয়োগে নতুন মাত্রা এনে দেয়।

শিক্ষা–সংস্কার, সাহিত্যচর্চা ও সমাজ–উন্নয়নের যে বহুমুখী কর্মযজ্ঞ তিনি চালিয়েছেন, তা মূলত গদ্যভাষার আদর্শ নির্মাণেই প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছে। তাই বাংলা গদ্যের আধুনিক বিকাশ–ধারার আলোচনায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর–এর অবদান অপরিহার্য ও অনস্বীকার্য। আলোচ্য নিবন্ধে আমরা বাংলা গদ্যের বিকাশে বিদ্যাসাগরের অবদান নিয়ে আলোচনা করব।
বিদ্যাসাগরের আবির্ভাবের আগে বাংলা গদ্যের ক্ষেত্রে কোন শৃঙ্খলা ছিল না। তাঁর আগের রচিত গদ্যে ছন্দ বা লালিত্য খুব একটা ছিল না। চলিত ভাষার সাথে আভিধানিক সংস্কৃত শব্দের অতিরিক্ত সংযোজন, সংস্কৃত বা ইংরেজি ছাঁচে বাক্য গঠন পদ্ধতি, বাক্যের বহর অযথা বড় করা, বাক্যের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকা ইত্যাদি কারণে বাংলা গধ্যের স্বাভাবিক গতিশীলতা ছিল না। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের এই বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সক্ষম হন। গদ্যের কাঠামো গঠনে এবং বাক্যের ভারসাম্য স্থিরীকরণে তৎকালীন গদ্য রচনাকারীদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরই সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন।
এ প্রসঙ্গে রাজনারায়ণ বসু তার স্বদেশীয় ভাষানুশীলন প্রবন্ধে লিখেছেন-
১০/১২ বৎসর পূর্বে বাংলা ভাষাতে বিভিন্ন প্রস্তাব রচনা করা যেরূপ কঠিন বোধ হইত এক্ষণে সেইরূপ কঠিন বোধ হয় না। এই পরমোপকারের জন্য পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের নিকট এই দেশ কৃতজ্ঞতার ঋণে আবদ্ধ আছে।
অমিততেজ ক্ষণজন্মা পুরুষ বিদ্যাসাগর ছিলেন মুক্তবুদ্ধির অধিকারী এবং মানবদরদি। মানব ও সমাজের কল্যাণে আধুনিক শিক্ষা সম্প্রসারণ, স্ত্রীশিক্ষা প্রচার, সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে বিরোধিতা, বিধবা বিবাহ প্রচার, বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ, জাতিকে মানব প্রেমে দীক্ষা দেওয়া ইত্যাদি কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেন। এজন্য তৎকালীন রক্ষণশীল ধ্বজাধারী শাস্ত্রকাররা তাঁর বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে লাগে। বিদ্যাসাগর তাদের দাঁতভাঙা জবাব দিতে জীবন-সমুদ্র মন্থন করে এবং বিভিন্ন শাস্ত্রসংহিতা ঘেঁটে উপযুক্ত বক্তব্য প্রদান করেন।
বিদ্যাসাগরের সংগ্রামময় কর্মজীবনের বহিঃপ্রকাশ তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ। মধুসূদনের মতে তিনি-প্রাচীন ঋষির জ্ঞান ও প্রতিভা, ইংরেজের কর্মশক্তি এবং বাঙালি মায়ের হৃদয় দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠিত।
বিদ্যাসাগরের রচনাবলিকে বিষয়ানুযায়ী মোটমুটি কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-সমাজ সংস্কারমূলক রচনা, অনুবাদমূলক রচনা, শিক্ষামূলক রচনা, মৌলিক রচনা ও বেনামি রচনা।
শিক্ষা–সংস্কার ও সমাজচিন্তায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের গদ্যভাষা
সমাজ সংস্কারমূলক রচনা: সমাজবিষয়ক রচনার মধ্যে বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি-না এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব ১ম খণ্ড (১৮৫৫) এবং দ্বিতীয় খণ্ড (১৮৫৬), বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কি-না এতদ্বিষয়ক বিচার ১ম খণ্ড (১৮৭১) এবং দ্বিতীয় খণ্ড (১৮৭৩) উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের মধ্যে তিনি তৎকালীন বিধবাদের জীবনের করুণ কাহিনি এবং বহুবিবাহের কুফল সম্পর্কে আলোচনাপূর্বক তা রহিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ জন্য তিনি শাস্ত্রীয় প্রমাণসহ বলিষ্ঠ মতবাদ প্রকাশ করেছেন। এ-সব গ্রন্থে বিদ্যাসাগরের নিজস্ব বক্তব্য যেমন বলিষ্ঠতাসহকারে প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি আনুষঙ্গিকভাবে এ-সব রচনার ভাষায় ওজস্বিতা ফুটে উঠেছে।
পাঠ্যপুস্তক রচনায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অগ্রণী উদ্যোগ
বর্ণপরিচয় ও ব্যাকরণে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান
শিক্ষামূলক রচনা: বাঙালির শিক্ষারীতিকে ফলপ্রসু করার জন্য বিদ্যাসাগর শিশুতোষ ও কিশোর স্কুল পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বাঙলার ইতিহাস (১৮৪৮), জীবনচরিত (১৮৪৯), বোধদয় (১৮৫১), বর্ণপরিচয় (১৮৫৫), কথামালা (১৮৫৬), আখ্যানমঞ্জুরী (১৮৬৩) ইত্যাদি। দেশে শিক্ষা-বিস্তারের উদ্দেশ্যে তাকে উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তক রচনায় আত্মনিয়োগ করতে হয়। পাঠ্যপুস্তক হিসেবে একসময় বোধোদয় সবচেয়ে বেশি আদৃত হয়েছিল। বাক্যরীতি, পদবিন্যাস, শব্দযোজনা এবং উপযুক্ত ছেদচিহ্ন প্রয়োগ করে বিদ্যাসাগর এখানে অপূর্ব কলানৈপূণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। যেমন-
বালকগণের উচিত, বাল্যকাল অবধি পরিশ্রম করিতে অভ্যাস করা। তাহা হইলে বড় হইয়া অনায়াসে সকল কর্ম করিতে পারিবে। (বোধোদয়)
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুবাদ সাহিত্য ও গদ্যের প্রসার
বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে বিদ্যাসাগর হিন্দি-সংস্কৃত, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে নানা গ্রন্থ বাংলায় অনবাদ করেন। জাতীয় জীবনকে সুন্দর করে গড়ে তুলতে জাতির সামনে সৎসাহিত্যাদর্শ তুলে ধরতে অন্য ভাষার সাহিত্য তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। সুপ্রসিদ্ধ হিন্দি গ্রন্থ বেতালপঞ্চিশী থেকে অনুবাদ বেতালপঞ্চবিংশতি (১৮৪৭), কালিদাসের অভিজ্ঞানশকুন্তলম নামক সংস্কৃত নাটক থেকে অনুবাদ শকুন্তলা (১৮৫৪), মহাভারতের কিছু অংশের অনুবাদ মহাভারত (উপক্রমণিকা ভাগ), ভবভূতির উত্তর রামচরিত নাটকের অংশবিশেষ এবং বাল্মীকির রামায়ণ অবলম্বনে রচিত সীতার বনবাস (১৮৬০), শেকসপিয়রের কমেটি অব ইরস্ অবলম্বনে ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬০) এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এসব গ্রন্থের মধ্যে মধ্যপন্থী গদ্যরীতি অবলম্বন করা হয়েছে। এ রীতিতে আতিশয্য নেই, বিশেষ কোনো দিকে ঝোঁক নেই, অথচ ভিতরে ভিতরে একটা ছন্দঃস্রোত ও মাধুর্য আছে। যেমন-
লক্ষ্মণ বলিলেন, আর্য্য। এই সেই জন্মস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবণ গিরি। এই গিরির শিখরদেশ আকাশপথে সতত সঞ্চারমান জলধরমণ্ডলীর যোগে নিরস্তর নিবিড় নীলিমায় অলঙ্কৃত। (সীতার বনবাস)
মৌলিক রচনা :
বিদ্যাসাগরের কিছু মৌলিক রচনাও রয়েছে। এ ধরনের গ্রন্থের মধ্যে ক্ষুদ্র নিবন্ধ প্রভাবতী সম্ভাষণ (১৮৯২) ও বিদ্যাসাগর চরিত (১৮৯১) উল্লেখযোগ্য। তিনি শুধু অনুবাদক নন, মৌলিকপ্রতিভারও অধিকারী। তাঁর বিরুদ্ধবাদীরা যশ ও খ্যাতির ঈর্ষায় জ্বলে কেউ কেউ বিদ্যাসাগরের রচনা মৌলিকতাবিহীন এ অভিযোগ এনেছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রধান অভিযোগ ছিল যে-
বিদ্যাসাগর পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা মাত্র এবং তার রচনা মৌলিক নয়, সবই হয় ইংরেজির, নয় সংস্কৃতের অনুবাদ। সুতরাং বাঙ্গালা ভাষার শ্রেষ্ঠ গদ্য লেখকের সম্মান তাহার প্রাপ্য নয়।
বঙ্কিমের এ অভিযোগের প্রতিবাদ করে রাজনারায়ণ বসু লিখেছেন-
অনেকে মনে করেন, বিদ্যাসাগরের উদ্ভাবনী শক্তি নাই, তিনি যাহা লিখিয়াছেন, তাহা অনুবাদমাত্র, কিন্তু যিনি তাহার রচিত সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব এবং বিধবা বিবাহ বিচার গ্রন্থ পাঠ করিয়াছেন, তিনি বিদ্যাসাগরের অসাধারণ — রচনা শক্তি নাই, এমন কখনই বলিতে পারিবেন না। (স্বদেশী ভাষানুশীলন; প্রবন্ধ)
বেনামী রচনা:
নিরেট পাণ্ডিত্যের আড়ালে একটা সরল-সহজ কৌতুকপ্রবণ মন যে বিদ্যাসাগরের ছিল, তা তাঁর বেনামী রচনা পড়লে সহজে বোঝা যায়। তিনি এগুলো লিখেছিলেন একগুঁয়ে ও অযুক্তিবাদী প্রতিপক্ষদের হাস্যাস্পদ করার জন্য। বিদ্যাসাগর মনে করেছিলেন যে, যে-সব ভট্টাচার্যের দল বিধবা বিবাহ প্রচলন ও বহুবিবাহ রোধকে শাস্ত্রবিরুদ্ধ বলে আন্দোলন করছে, শাস্ত্রে তার পূর্ণ স্বীকৃতি আছে দেখালে তারা হয়তো বিরুদ্ধাচরণ নাও করতে পারে। কিন্তু ফল হলো উল্টো।
বিদ্যাসাগর ভাবলেন ভদ্রভাষায় এদের কিছু বললে তাদের স্থূল পৃষ্ঠে কোনো আঘাত লাগবে না। তাই তিনি ছদ্মনামে প্রতিপক্ষকে ফাজিল চালাক, মাকড় মারিলে ধোকড় হয়, বেঢপ বিদ্যাবাগীশ, তেদড়া-বেদড়া, পালের গোদা, বেআকুবের শিরোমণি, রাম ছাগল, জানোয়ার, বেয়াড়া প্রভৃতি ভাষায় আক্রমণ করে তাদের চোখা মুখ ভোতা করে দিয়েছিলেন। নিজ নাম গোপন করে রসিকতাপূর্ণ ৩টি ছদ্মনাম নিয়ে ৫টি বেনামি গ্রন্থ লিখেছেন ।
সেগুলো হলো কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য রচিত অতি অল্প হইল (১৮৭৩), আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩), কস্যচিত তত্ত্বান্বেষিণ রচিত বিধবা বিবাহ ও যশোহর হিন্দু ধর্মরক্ষিণী সভা (১৮৮৪), যৎকিঞ্চিত অপূর্ব মহাকাব্য ব্রজবিলাস (১৮৮৪); কস্যচিত উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য রচিত রত্নপরীক্ষা (১৮৮৬) উল্লেখযোগ্য। এ বেনামি রচনাগুলোতে কথ্য ভাষারীতির মতো হালকা রূপ ফুটে উঠেছিল। এ ধরনের ভাষায় এমন একটি সরল রসিকতা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের প্রখরতা বিদ্যামান; যা বিদ্যাসাগরকে পাঠকের কাছের মানুষ করে তুলেছে।
সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল গদ্য নির্মাণে বিদ্যাসাগরের ভূমিকা
বিদ্যাসাগর যথার্থ শিল্পী। তাঁর আগে বাংলা গদ্যে ব্যাকরণগত কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। তাঁর অক্লান্ত সাধনায় সদ্য জন্ম নেওয়া বাংলা গদ্য হয়েছে দীপ্তিময়। বিদ্যাসাগরের অন্যতম প্রধান কীর্তি বাংলা ভাষা। বাংলা গদ্য তাঁর হাতেই সাহিত্যিক গদ্যে রূপান্তরিত হয়। তিনি বাংলা গদ্যকে সাবলীল গতিভঙ্গী ও অশেষ ব্যঞ্জনা দান করেন। তাঁর সচেতন শিল্পীমন এবং আন্তরিকতা বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধি সাধন করেছে এবং তাঁর হাতে পড়ে বাংলা গদ্য একটি স্বচ্ছন্দ, সৌষ্ঠবময় এবং সর্বাঙ্গ সুন্দর মূর্তি লাভ করে।
মুহম্মদ আব্দুল হাই তাঁর বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বিদ্যাসাগরের দুটি দানের কথা উল্লেখ করেছেন। একটি হলো বাংলা গদ্যের অন্তর্নিহিত ছন্দের আবিষ্কার এবং দ্বিতীয়টি হলো বাংলা প্রবাদ বা ইডিয়মের সার্থক ব্যবহার। প্রবাদ-প্রবচন বা বাগধারা সব ভাষারই একটা বিশিষ্ট সম্পদ। সুদক্ষ শিল্পী বিদ্যাসাগর অপূর্ব দক্ষাতর সাথে তাঁর বেনামি রচনাবলির মধ্যে সর্বপ্রথম এগুলোর সার্থক প্রয়োগ দেখান। যার ফলে ভাষা হয়েছে শানিত।
পদ্যে মধুসূদন যা করেছিলেন, গদ্যে তা করেছেন বিদ্যাসাগর। ভাবানুসারী শব্দের সমন্বয়ে বাংলা বাক্যের গদ্য কাঠামোতেও যে স্বাভাবিক ছন্দঃস্রোত প্রবাহিত হয়, তা তিনি যথার্থভাবে হৃদয়াঙ্গম করেছিলেন। তাই, তিনি বাক্যের মধ্যে উপযুক্ত স্থানে বিরাম চিহ্ন- দাঁড়ি, কমা, প্রভৃতি ব্যবহার করেছিলেন এবং শ্বাসপর্ব ও সার্থক পর্বানুসারে সিলেবলভিত্তিক সমমাত্রার পর্ব নির্মাণ করেছিলেন। এর ফলে একদিকে যেমন ধ্বনিব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়েছে, অন্যদিকে তেমন সৃষ্টি হয়েছে শব্দার্থের অতিরিক্ত ব্যঞ্জনা।
যথার্থ শিল্পীর প্রধান বৈশিষ্ট্য তার স্টাইল। বিদ্যাসাগরের একটা নিজস্ব স্টাইলের জন্য তাঁর কলম ও পাঠকের রুচি একটা সহজ সরল পথে চলতে পেরেছিল।
বিদ্যাসাগর নব নব সাহিত্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা ভাষার উন্নতি সাধনের পথ উন্মুক্ত করেছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে ‘বাংলা ভাষার ব্যবহার’ ও প্রয়োগকে ব্যাপক ও সুবিস্তৃত করেছিলেন। ফলে উনিশ শতকের মধ্যেই বাংলা ভাষা বাঙালি জাতির জাতীয় ভাষারূপে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার মধ্যে শ্রেষ্ঠ আসন লাভ করেছিল। বাংলা গদ্যের অন্তসৌন্দর্য ও গতিবৈচিত্র্য সৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের কৃতিত্বের স্বীকৃতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উক্তির মধ্যে সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি লাভ করেছে-
তাঁর প্রধান কীর্তি বঙ্গভাষা। যদি এই ভাষা অমরভাব জননীরূপে মানব সভ্যতার ধাত্রীগণ ও মাতৃগণের মধ্যে গণ্য হয় তবে সে গৌরব একমাত্র তাঁরই। তিনি ভাষার যথার্থ শিল্পী। তিনি সর্বপ্রথম বাংলা গদ্যে কলানৈপূণ্যের অবতারণা করেছিলেন। ভাষা যে কেবল ভাবের আধার মাত্র নয়; তার মধ্যে যেনতেন ভাবে বক্তব্য পুরে দিলেই যে হয় না- তা বিদ্যাসাগর প্রমাণ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ আরো বলেছেন
বঙ্গ সাহিত্যে আমার কৃতিত্ব দেশের লোক যদি স্বীকার করে থাকেন তবে আমি যেন স্বীকার করি একদা তার দ্বার উদ্ঘাটন করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যের জনক ছিলেন।
সবশেষে বলতেই হয় বিদ্যাসাগর সৃষ্ট গদ্যের ভিত্তির উপর পরবর্তিতে বাংলা গদ্যের শিল্পিত ইমারত গড়ে ওঠে। গদ্যরীতির মধ্যে লালিত্য-সঞ্চার ও নমনীয়তা নিয়ে আসা, ভাষার অন্তর্নিহিত ধ্বনি-প্রবাহ সৃষ্টি, পদ্যের মত গদ্যের মধ্যেও তাল ও ছন্দ আবিষ্কার করা, ভাবানুসারে শব্দ সাজিয়ে বাক্য-গঠন, বিরাম-চিহ্ন, প্রবাদ-প্রবচনের ব্যবহার, সার্থক পর্ব সৃষ্টি প্রভৃতি অবদানকে স্বীকার করলে বাংলা গদ্যের বিকাশে বিদ্যাসাগরের কৃতিত্ব যে কতখানি আকাশচুম্বী তা সহজেই অনুমান করা যায় এবং তাকে আধুনিক বাংলা গদ্যের জনক বলতে দ্বিধাবোধ হয় না।
উপসংহার
বাংলা গদ্যের ইতিহাসে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এমন এক নাম যিনি গদ্যভাষাকে নতুন পরিচয়ে উজ্জ্বল করে তুলেছেন। বাংলা ভাষার সরলীকরণ, যুক্তিবাদী রীতি প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যে পথ দেখিয়েছেন, তা পরবর্তী সব লেখকের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তাঁর বর্ণপরিচয়, কথামালা কিংবা অনুবাদ–রচনা—সবই প্রমাণ করে যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ভাষাকে মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।
বিদ্যাসাগরের গদ্যরীতি বাংলা ভাষায় যুক্তি, স্পষ্টতা ও মানবিকতার মিশেল ঘটায়। তাই বলা হয়—যেখানে আধুনিক বাংলা গদ্যের ভিত্তি, সেখানে আছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি শুধু ভাষা–সংস্কারক নন; শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। গদ্যকে সহজ করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অদম্য চেষ্টায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বাংলা সাহিত্যে স্থাপন করেছেন এক অনন্য উচ্চতা।
এখানে স্মরণ করতে হয় যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গদ্যের নিয়ম-নীতি তৈরি করে, যুক্তাক্ষর ও বানানের রীতি সহজ করে এবং নতুন শব্দ–ব্যবহারের পথ খুলে দিয়ে ভাষার পুনর্জাগরণ ঘটান। তাঁর প্রতিটি উদ্যোগে প্রতিফলিত হয়েছে সমাজসচেতনতা ও মানবকল্যাণের দর্শন। আধুনিক বাংলা গদ্যের স্বচ্ছ, যুক্তিনিষ্ঠ এবং মানবিক রূপ নির্মিত হয়েছে মূলত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর–এর চিন্তাশক্তি ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে।