বাংলা বর্ণমালা বানানের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যার সৃষ্টি করে কী? আলোচনা করা।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

বাংলা বর্ণমালা: বাংলা বানানে তাদের ভূমিকা।

ভূমিকা: বাংলা বানান নিয়ে বিভ্রান্তি দীর্ঘদিনের। প্রাচীন ও মধ্য যুগেও পুঁথিতে বাংলা বানান নিয়ে সমস্যার অন্ত ছিল না। তাছাড়া সে সময়ে বাংলা বানানের সর্বজনগ্রাহ্য কোনো মানদন্ড ছিল না। ছাপাখানা আবিষ্কারের পূর্বে লিপিকরদের খেয়ালখুশির কারণে বানানে নানা বিশৃঙ্খলা বিদ্যমান ছিল।

আধুনিককালে এসে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি বাংলা বানানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন। অনেক নিয়মও প্রবর্তিত হয়েছে। তবু ইচ্ছা-অনিচ্ছায় বানান সমস্যা থেকেই গেছে। বাংলা বানান বিশৃঙ্খলার মূল বা অন্যতম কারণ হচ্ছে বাংলা বর্ণমালার কিছু কিছু বর্ণ। বাংলা বর্ণমালার উচ্চারণের সাথে তার লিখনপদ্ধতির অসংগতি রয়েছে। আবার যা উচ্চারণ করা হয় তা লেখা হয় না, আর যা লেখা হয় তা উচ্চারণ করা হয় না। বর্ণমালা বিষয়ক সমস্যার জন্য গোড়া থেকেই বানান বিশৃঙ্খলা লক্ষণীয়।

বাংলা ভাষার শুদ্ধ রূপ রক্ষা করতে বাংলা বর্ণমালা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বানান ভুলের বড় একটি অংশ তৈরি হয় বাংলা বর্ণমালা–সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা ও ব্যবহারের অসতর্কতা থেকে। ধ্বনি–বর্ণ সম্পর্কের জটিলতা, যুক্তাক্ষরের বিভ্রান্তি, সমোচ্চারিত বর্ণ, আর প্রাচীন ও আধুনিক রূপের ব্যবধান—সব মিলিয়ে বাংলা বর্ণমালা প্রায়ই শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ভাষাবিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাংলা বর্ণমালা ঠিকভাবে শেখানো না হলে বানান–শুদ্ধি অর্জন কঠিন। তাই আজকের আলোচনায় আমরা দেখব, কীভাবে বাংলা বর্ণমালা বানানের সমস্যা হ্রাস বা বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রাখে এবং কেন বাংলা বর্ণমালা–শিক্ষাকে আরও সুসংহত করা প্রয়োজন। সার্বিকভাবে বলতে গেলে, বাংলা বর্ণমালা–ভিত্তিক শিক্ষার দুর্বলতা আমাদের বানান–ব্যবস্থায় গভীর প্রভাব ফেলে।

ধ্বনি ও বর্ণের অসমতা, যুক্তাক্ষরের গঠন ও উচ্চারণে জটিলতা, বর্ণের সংক্ষিপ্তরূপের ভিন্নতা, একই ধ্বনির জন্য একাধিক বর্ণ, ধ্বনি একাধিক হলেও বর্ণ একটি এ রকম নানা অসঙ্গতি বানানে প্রভাব বিস্তার করে এবং বানান সমস্যাকে আরো জটিল করে তুলেছে।

বাংলা বর্ণমালা
বানান ও বর্ণমালা

বানান সমস্যায় বর্ণমালার ভূমিকাঃ

(১) ধ্বনি এক কিন্তু বর্ণ একাধিক:  বাংলা ভাষায় একই ধ্বনির জন্য একাধিক বর্ণ ব্যবহৃত হয়। যেমন- ই ধ্বনির জন্য দুটি (ই/ঈ), উ-ধ্বনির জন্য দুটি (উ/উ), ঙ-ধ্বনির জন্য দুটি (ঙ/ং), জ-ধ্বনির জন্য দুটি (জ/য), ত ধ্বনির জন্য দুটি (ত/ৎ), ন-ধ্বনির জন্য দুটি (ন/ণ), শ-ধ্বনির জন্য তিনটি (শ/স/য)। ফলে বহু সমোচ্চারিত শব্দের উচ্চারণ একই হলেও বানান ও অর্থ আলাদা। যেমন- দিন, দীন, শব, সব ইত্যাদি।

(২) ধ্বনি একাধিক কিন্তু বর্ণ একটি:  একাধিক ধ্বনির জন্য একই বর্ণ রয়েছে। যেমন- এবং এ্যা/অ্যা ধ্বনির জন্য ‘‘। এ্যা/অ্যা ধ্বনির জন্য কোনো চিহ্ন নেই। তাই, এ ধরনের শব্দ (বিশেষ করে বিদেশাগত শব্দের ক্ষেত্রে) বহু বিকল্প চিহ্নের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন- এসিড/এ্যাসিড/অ্যাসিড/য়্যাসিড ইত্যাদি।

(৩) একই ধ্বনির নানা রূপ:  একই বর্ণ আবার অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন রূপ নেয়। ফলে বানান বিভ্রাট সৃষ্টি করে। যেমন- স্বরধ্বনি ‘‘ স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হলে তার রূপ ঠিক থাকে, কিন্তু ‘‘ ধ্বনি কার (ু) হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সময় বিভিন্ন রূপ নেয়। যেমন- তুলি, রুচি, গুপ্ত, শুভ, হুতাশন, বস্তু ইত্যাদি।

(৪) সমধ্বনি যুক্তব্যঞ্জন:  বাংলা ভাষায় সমধ্বনি যুক্তব্যঞ্জনের আধিক্য রয়েছে। যা বানানে সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন- ত্ত/ত্ত্ব/ত্য, শ্ব/স্ব/শ্য/স্য/ষ্য ইত্যাদি।

(৫) সমউচ্চারিত ধ্বনির ভূমিকা: মুখে উচ্চারিত শব্দ উচ্চারণ অনুযায়ী লেখা হয়। ফলে সম-উচ্চারিত ধ্বনি বানানে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আবার ভুল উচ্চারণও বানানে প্রভাব ফেলে। যুক্তব্যঞ্জন এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। অনেক যুক্তাক্ষরের উচ্চারণ বর্ণানুক্রমিক নয়।  যেমন- হ্য,  ঞ্জ ইত্যাদি। সহ্য-শোজঝো,  জ্ঞান- গ্যান, বিজ্ঞান- বিগগান/বিগগ্যান্।

(৬) স্থানভেদে ধ্বনির ভিন্ন ‍উচ্চারণ: আবার অনেক যুক্তাক্ষর শব্দের প্রথমে হলে এক রকম, শব্দের মাঝে/শেষে হলে ভিন্ন উচ্চারণ হয়। ফলে এসব শব্দ উচ্চারণ ভিত্তিক লিখতে গেলেই বানান ভুলের সম্ভাবনা থাকে। যেমন – ক্ষতি> খোতি, কিন্তু, রক্ষা > রোকখা ইত্যাদি।

(৭) যুক্তাক্ষরের গঠন-বৈচিত্র্য:  যুক্তাক্ষরের গঠন-বৈচিত্রাও বানান বিভ্রাট ঘটায়। যে-সব বর্ণ মিলে যুক্তাক্ষর গঠিত হয়, অনেক সময় তা চেনা যায় না, অর্থাৎ বর্ণ পরিবর্তিত হয়। যেমন- ত্ত, ত্র, ঞ্চ, জ্ঞ, ঞ্জ, ঙ্গ, র্ণ , ক্য ইত্যাদি।

(৮) ছদ্মবেশী যুক্তাক্ষর: অনেক ছদ্মবেশী যুক্তাক্ষর বানান ভুলের সৃষ্টি করে। যেমন- ষ্ণ , দেখলে মনে হয় ষ+ ঞ মিলে  এটি তৈরি। আসলে তা নয়। এটি ষ+ণ।

(৯) বাংলা বর্ণমালা মাত্রাভিত্তিক। কোনোটি পূর্ণমাত্রা, কোনোটি অর্ধমাত্রা, আবার কোনোটি মাত্রাহীন। এই মাত্রার হেরফের হলে অনেক সময় বর্ণ পাল্টে যায়। যেমন- ও এটি স্বরবর্ণ, কিন্তু এর মাথায় মাত্রা দিলে হয় ত-য়ে ত = ত্ত, এ স্বরবর্ণ কিন্তু ত্র-  ত-য়ে র-ফলা।

(১০) লিখিত রূপ ও উচ্চারণে ভিন্নতা:  বাংলা ভাষায় যুক্তাক্ষরের অনেক বর্ণ উচ্চারিত হয় না, যা বানান ভুলের অন্যতম কারণ। যেমন- আত্মা, স্বাধীন ইত্যাদি।

(১১) হ্রস্বস্বর ও দীর্ঘস্বরের বিড়ম্বনা: বাংলায় হ্রস্বম্বর ও দীর্ঘস্বর রয়েছে। যদিও উচ্চারণে স্বীকার্য নয়। বাংলা ভাষায় তৎসম শব্দের বানান তৎসম/সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুযায়ী হয়। তাই, সেখানে হ্রস্ব ও দীর্ঘস্বর মেনে চলতে হয় অর্থের জন্য। বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্বর ব্যবহার হয় না। বর্ণের এই ভিন্নতা বানান সমস্যা সৃষ্টি করে।

(১২) উৎসভেদে ভিন্নতা:  একই বর্ণ তৎসম ও অতৎসম শব্দ ভেদে ভিন্নতার জন্য বানান ভুল হয়। যেমন- ণ, ন, স, ঘ। এই বর্ণগুলো তৎসম শব্দ ও অ-তৎসম শব্দ ভেদে ভিন্নভাবে অবস্থান করে।

(১৩) বর্ণের পূর্ণবর্ণ ও তাদের সংক্ষিপ্তরূপের ভিন্নতা :  পূর্ণবর্ণ ও তাদের সংক্ষিপ্তরূপ অর্থাৎ ‘কার বা ফলা’র ক্ষেত্রে ভিন্নতার কারণে বানান ভুল হয়। যেমন- ও যেখানে বসে, ও-কার (নো) সেখানে নাও বসতে পারে। যেমন- কারও-কারো, আরও- আরো চলে, কিন্তু এমনও এমনো, তেমনও তেমনো চলে না। এসব ক্ষেত্রে ও-কার না দেওয়াই উত্তম। সন্ধির ক্ষেত্রে এই ও-কার এক এক বর্ণের ক্ষেত্রে এক এক রকম আচরণ করে। ফলে বানানে আমরা বিভ্রান্ত হই। যেমন-

ততঃ+অধিক ততোধিক, ও-কার হয়েছে। প্রাতঃ+কাল= প্রাতঃকাল: ও-কার হয় নি।

(১৪) ঙ এবং ং এর গণ্ডগোল: ঙ/ং প্রায় সর্বত্র আজকাল পরস্পর বিনিময়যোগ্য বর্ণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাদের উচ্চারণ একই বলে একটির বিকল্পে অপরটি প্রযোজ্য হতে পারে এরকম ধারণা জন্মেছে। তবু ঙ ও ং এক নয়। ঙ একটি স্বতন্ত্র স্বাবলম্বী বর্ণ, ং কোনো বর্ণ নয়, এটি ঙ-এর হসন্ত রূপ অর্থাৎ ং = ঙ

ঢঙ = ঢং, বঙ্গ = বংগ চলতে পারে। কিন্তু অঙ্কন, আকাঙ্ক্ষা, আশঙ্কা, কঙ্কণ ইত্যাদি শব্দে  ং চলতে পারে না। এই যে, ঙ এবংং এক হয়েও এক নয়, তা বানানে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। কেননা, কিছু শব্দে শুধু ঙ হয়। কিছু শব্দে শুধু ং হয়, আবার কিছু শব্দে ঙ এবংং উভয়ই শুদ্ধ।

(১৫) য-ফলা এবং রেফ সংক্রান্ত: য-ফলা  এবং রেফ  সম্পর্কে সতর্ক না হলে বানান ভুল হতে পারে। য-ফলা বিশেষ্য ও বিশেষণ পদ এবং যোগ্য বা উচিত বোঝাতে শব্দের শেষে ব্যবহৃত হয়। বিশেষণকে বিশেষ্য করতে গিয়ে যদি শব্দের শেষে র-ফলা  বা রেফ  থাকে, তবে সেখানে য-ফলা প্রয়োজন হয়। যেমন- দরিদ্র> দারিদ্র্য, দীর্ঘ >দৈর্ঘ্য।

আবার বেশিরভাগ বর্ণে য-ফলা যুক্ত হলেও র-এর সাথে য-ফলা যুক্ত হয় না। সেক্ষেত্রে য-ফলা পূর্ণরূপ পায় এবং র রেফ হয়ে যায়। সহিত+য= সাহিত্য, কিন্তু মধুর+য মাধুর্য, সুন্দর + য = সৌন্দর্য।

র বর্ণ হসন্ত হলেই রেফ  হয়। তখন তার অবস্থান হয় পরের বর্ণের মাথার উপর। এ অবস্থান ভিন্নতা বানানে প্রভাব ফেলে।

সন্ধির ক্ষেত্রে বর্ণমালার ভিন্নতা: সন্ধিতে ই/ঈ এর পরে অন্য স্বর থাকলে ই/ঈ স্থানে য-ফলা হয়। ইতি+আদি= ইত্যাদি। কিন্তু র থাকলে য য-ফলা না হয়ে পূর্ণরূপ পায় এবং র রেফ হয়ে যায়। যেমন- পরি+অন্ত পর্যন্ত। উপরি+উপরি উপর্যুপরি ইত্যাদি। উপরি+উক্ত = উপর্যুক্ত।

(১৬) খণ্ড ৎ এবং আস্ত ত : খন্ড-ৎ আর আস্ত ত কোথায় বসে আর না বসে এটা না জানলে বানান ভুল হতে পারে। ৎ এবং ত একই ধ্বনি হলেও বর্ণ ভিন্ন এবং তাদের ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। এদের ভিন্নতার কিছু দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক-

(১৭) তিন শ এর ফিসফিসানি: শ, স, য- এই তিন বর্ণ বানানের ক্ষেত্রে যে কত বিভ্রাট সৃষ্টি করে তা বলে শেষ করা যায় না। শিশ, শিষ, শিস- তিনটি শব্দের উচ্চারণ অবিকল একই রকম। কিন্তু শ/স/ঘ- এই তিন বর্ণের ভিন্নতার কারণে অর্থ ভিন্ন।

(১৮) স্ত বনাম স্থ : স্ত এবং স্থ এর গন্ডগোল আমরা সবাই জানি এবং বিড়ম্বনায় পড়ি। তাহাড়া স্থ লেখা হয় স্থ এভাবে। যা বানানে আরও গন্ডগোল সৃষ্টি করে।

মুখস্ত হবে, না মুখস্থ হবে, অভ্যস্থ হবে না অভ্যস্ত হবে এ রকম বিড়ম্বনায় পড়ে না, তাদের সংখ্যা নিতান্তই কম।

এভাবে আলোচনা শেষে দেখা যাচ্ছে, বানান ভুলের ক্ষেত্রে বাংলা বর্ণমালার যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। বাংলা বর্ণমালা ৫০ টি হলেও প্রকৃতপক্ষে ধ্বনি ততটি নয়। আবার যে ধ্বনির জন্য বর্ণটি প্রচলিত, তা ঐ ধ্বনির প্রকৃত স্বরূপ তুলে ধরে না। একই ধ্বনির জন্য একাধিক বর্ণ, আবার বর্ণ একটি, কিন্তু ধ্বনি একাধিক, মুখে যা বলি তা লিখি না, যা লিখি তা উচ্চারণ করি না, যুক্তাক্ষরের গঠন, বর্ণের চিহ্নের ভিন্নতা ইত্যাদি কারণে বানানে গন্ডগোল হয় থাকে।

উপসংহার

সবশেষে বলা যায়, বানান–ত্রুটি কমাতে বাংলা বর্ণমালা শেখার ভিত্তি সুদৃঢ় হওয়া জরুরি। ভাষা–শিক্ষার প্রথম ধাপেই যদি বাংলা বর্ণমালা পরিষ্কারভাবে বোঝানো যায়, তবে শিক্ষার্থীরা সঠিক বানানে দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হয়। আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে বাংলা বর্ণমালা–কেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো উচিত, কারণ বানান–বিভ্রান্তির একটি বড় কারণ হলো বাংলা বর্ণমালা বিষয়ে দুর্বল ধারণা। গবেষকরাও বলেন, বাংলা বর্ণমালা–জ্ঞান যত শক্তিশালী হবে, বানান সমস্যা তত কমবে। তাই প্রত্যেক ভাষা–শিক্ষার্থীর জন্য বাংলা বর্ণমালা–শিক্ষা অপরিহার্য এবং একটি সুশৃঙ্খল ভাষাচর্চার ভিত্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *