ক্রিয়াপদ-এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ / চলিত ক্রিয়াপদ গঠনের নিয়ম / সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার পার্থক্য। ধাতু কাকে বলে? ধাতুর বিভিন্ন রূপ নির্ণয়।


ক্রিয়াপদ-এর সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ
উত্তরঃ যে পদের দ্বারা কোনো কার্য সম্পাদন করা বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে। অর্থাৎ, যে পদের সহায়তায় কোনো কিছু করা বা হওয়া বা কোনো কাজ বোঝায়, তাকে ক্রিয়াপদ বলে।
অন্যভাবে, বাক্যের অন্তর্গত যে পদ দ্বারা কোনো পুরুষ কর্তৃক নির্দিষ্ট কালে কোনো কার্যের সংঘটন বোঝায় তাকে ক্রিয়াপদ বলে। যেমন- করিম বই পড়ছে।
এখানে নাম-পুরুষ করিম কর্তৃক ‘পড়া‘ কাজের সংঘটন প্রকাশ করছে। অতএব, ‘পড়ছে‘ ক্রিয়া।
ক্রিয়ার গঠন: ধাতু বা ক্রিয়ামূলের সাথে পুরুষ অনুযায়ী কালসূচক বিভক্তি যুক্ত হয়ে ক্রিয়া গঠিত হয়।
তাহলে বলা যায়- ক্রিয়ার দুটো অংশ। একটা হলো মূল অংশ-যার নাম ধাতু, অন্যটি হলো বিভক্তি। যেমন- সে পড়ে। এই ‘পড়ে‘ ক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে পাওয়া যায় পড়+এ, এখানে ‘পড়‘ হচ্ছে ধাতু, ‘এ’ হচ্ছে বিভক্তি।
বাক্যে ক্রিয়াপদের গুরুত্ব : বাক্যে ক্রিয়ার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। ক্রিয়া হলো বাক্যের রাণী। বাক্যের মধ্যে অর্থ প্রকাশের দিক থেকে ক্রিয়ার অবস্থান বিচার করলে ক্রিয়ার অপরিহার্যতা বোঝা যায়। ক্রিয়া ছাড়া বাক্য সম্পূর্ণ হয়না। শুধু ক্রিয়া দিয়েও বাক্য হতে পারে যেমন পড়। খাও। যাও। ইত্যাদি। যে কোন বাক্যে ক্রিয়া থাকবেই। তবে কখনো হয়তো তার চেহারা চোখে পড়ে না। তার সাহচর্য হয় আড়ালে। যেমন- সে ভাল ছেলে।
এখানে ক্রিয়াটি উহ্য রয়েছে। অর্থাৎ বাক্যটি হবে সে হয় ভাল ছেলে। বাক্যের গঠন ও ব্যবহারের দিক থেকে ‘হয়’ ক্রিয়া ব্যবহারের তেমন প্রয়োজন পড়ে না।
ক্রিয়াপদের প্রকারভেদ:
বিবিধ অর্থে ক্রিয়াপদের শ্রেণীবিভাগ করা যায়।
ভাব বা অর্থ প্রকাশের দিক থেকে ক্রিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
১. সমাপিকা ক্রিয়া ও ২. অসমাপিকা ক্রিয়া।
১. সমাপিকা ক্রিয়াঃ যে ক্রিয়াপদ বাক্যে পূর্ণতা বা পরিসমাপ্তি ঘটায়, তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন- সে মন দিয়ে পড়ে। করিম রোজ স্কুলে যায়। এখানে ‘পড়ে‘ ও ‘ যায়‘ ক্রিয়াপদগুলো বাক্যের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। তাই, এরা সমাপিকা ক্রিয়া।
সমাপিকা ক্রিয়া সকর্মক, অকর্মক ও দ্বিকর্মক হতে পারে। ধাতুর সাথে বর্তমান, অতীত বা ভবিষ্যৎ কালের বিভক্তি যুক্ত হয়ে সমাপিকা ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন-করিম বই পড়ে। বর্তমান কাল, সকর্মক ক্রিয়া। সে সারাদিন খেলেছিল। অতীত কাল, অকর্মক ক্রিয়া।
সে তাকে একটি বই উপহার দেবে। ভবিষ্যৎ কাল, দ্বিকর্মক ক্রিয়া।
পূর্ণাঙ্গ বাক্য গঠন করতে হলে অবশ্যই সমাপিকা ক্রিয়া ব্যবহার করতে হবে।
২. অসমাপিকা ক্রিয়া : যে ক্রিয়াপর দ্বারা বাক্যের পরিসমাপ্তি ঘটে না, বক্তার কথা অসমাপ্ত থেকে যায়, তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন-
আমি বাড়ি গিয়ে—-। সে নিয়মিত পড়তে পড়তে—- । এখানে ‘গিয়ে‘, ও ‘পড়তে পড়তে‘ ক্রিয়া দ্বারা বাক্য পরিসমাপ্তি ঘটেনি, তাই এগুলো অসমাপিকা ক্রিয়া।
অসমাপিকা ক্রিয়াপদ গঠন: সাধারণত ধাতুর সাথে কাল নিরপেক্ষ ‘ইয়া (য়)’, ‘ইতে (ত)’ অথবা ‘ইলে (ল)’ বিভক্তি যুক্ত হয়ে অসমাপিকা ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন- খা+ইতে =খাইতে, খা+ইলে= খাইলে, খা+ইয়া =খাইয়া।
অন্য পদের সাথে সম্পর্ক বিচারে ক্রিয়ার প্রকারভেদঃ
বাক্যে অন্য পদের সাথে সম্পর্ক বিচারে বা ব্যবহার ভেদে আবার ক্রিয়া কয়েকটি ভাগে বিভক্ত। যথা:
সকর্মক ক্রিয়াঃ যে ক্রিয়ার বিষয় বা কর্ম থাকে তাকে সকর্মক ক্রিয়া বলে। যেমন- আমি চিঠি লিখছি। করিম বই পড়ছে।
এখানে লিখছি, পড়ছি, ক্রিয়া সমকর্মক ক্রিয়া। কারণ, এদের কর্ম আছে। কর্মগুলো হলো চিঠি, ও বই। কর্মপদযুক্ত ক্রিয়াই সকর্মক ক্রিয়া।
অকর্মক ক্রিয়া: যে ক্রিয়ার কোনো বিষয় বা কর্ম থাকে না, তাকে অকর্মক ক্রিয়া বলে। যেমন- আমরা রোজ বেড়াই। এখানে কি বেড়াই’ বা ‘কোথায় বেড়াই’ কোনো বিষয় বা কর্ম নেই। তাই ‘বেড়াই‘ ক্রিয়া অকর্মক ক্রিয়া।
দ্বিকর্মক ক্রিয়াঃ যে ক্রিয়ার দুটো কর্ম থাকে, তাকে দ্বিকর্মক ক্রিয়া বলে। যেমন- সে তাকে একটি কলম দিলো। এখানে ‘দিলো‘ ক্রিয়ার দুটো কর্ম ‘তাকে‘ ও ‘কলম‘। তাই ‘দিলো‘ ক্রিয়া দ্বিকর্মক ক্রিয়া।
দুটো কর্মের মধ্যে একটি বস্তুবাচক ও একটি ব্যক্তিবাচক হয়ে থাকে। বস্তুবাচক কর্মকে মূখ্যকর্ম, আর ব্যক্তি বাচক কর্মকে গৌণকর্ম বলে।
সকর্মক ক্রিয়ার অকর্মক রূপ: ক্রিয়াপদের প্রয়োগ-বৈশিষ্ট্যে সকর্মক ক্রিয়া অকর্মক ক্রিয়া হতে পারে। যেমন-
- সকর্মকক্রিয়া- আমি আকাশে চাঁদ দেখি নে।
- অকর্মক ক্রিয়া আমি চোখে দেখি নে।
- সকর্মক ক্রিয়া-আমি রাতে ভাত খাব না।
- অকর্মক ক্রিয়া-আমি রাতে খাব না।
অকর্মক ক্রিয়ার সকর্মক ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহার:
বাক্যের ক্রিয়া ও কর্ম একই ধাতু থেকে গঠিত হলে ঐ কর্মপদকে সমধাতুজ কর্ম বা ধাত্বর্থক কর্মপদ বলে। যেমন- আর কত খেলা খেলবে। এখানে ‘খেলবে ‘ক্রিয়াপদ ও ‘খেলা‘ কর্ম উভয়ই গঠিত হয়েছে মূল ‘খেল‘ ধাতু থেকে। তাই, ‘খেলা‘ পদটি সমধাতুজ বা ধাতুর্থক কর্ম। এ সমধাতুজ কর্মপদ অকর্মক ক্রিয়াকে সকর্মক ক্রিয়া করে।
তাহলে, বলা যায় যে, অকর্মক ক্রিয়া নিজেরা যে ধাতু থেকে এসেছে সেই ধাতু থেকেই ভাববাচক কর্ম বানিয়ে নিয়ে সকর্মক ক্রিয়া হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- বেশ এক ঘুম ঘুমালাম। কী খেলাই খেললে।
এখানে ক্রিয়া ও কর্ম একই মূল ধাতু থেকে গঠিত হয়েছে। তাই, এসব অকর্মক ক্রিয়া সমধাতুজ কর্ম দ্বারা সকর্মক ক্রিয়া হয়ে উঠেছে।
গঠন অনুসারে ক্রিয়ার প্রকারভেদ:
গঠন অনুসারে ক্রিয়া বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। যেমন-
- মৌলিক ক্রিয়া: মৌলিক ধাতু থেকে যে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়ে থাকে, তাকে মৌলিক ক্রিয়াপদ বলে। যেমন-নাচে, কাটে, খাচ্ছে ইত্যাদি।
- প্রযোজক ক্রিয়া: যে ক্রিয়ার কার্য একজনের প্রেরণা, প্ররোচনা,পরিচালনায় অন্যজন কর্তৃক সম্পন্ন হয়, তাকে প্রযোজক ক্রিয়া বলে। যেমন- মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছে।
এখানে মায়ের প্রযোজনায় শিশু কর্তৃক চাঁদ দেখানো হচ্ছে। মা প্রযোজক কর্তা, এবং দেখানো বা দেখাচ্ছে প্রযোজক ক্রিয়া।
- ধ্বন্যাত্মক ক্রিয়াঃ ধ্বন্যাত্মক ধাতু থেকে যে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়, তাকে ধ্বন্যাত্মক ক্রিয়া বলে। যেমন-মড়মড়ায়, ছটফটানো ইত্যাদি।
- নামধাতুজ ক্রিয়াঃ নাম ধাতু থেকে যে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়, তাকে নাম ধাতুজ ক্রিয়া বলে। যেমন হাতানো, ঘুমায়, বেতানো ইত্যাদি।
- যৌগিক ক্রিয়া: একটি সমাপিকা ও একটি অসমাপিকা ক্রিয়া যোগে যে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়, তাকে যৌগিক ক্রিয়া বলে। যেমন- মেয়েটি কাঁদতে বসল। সে মাছ ধরতে লাগল।
- মিশ্র বা সংযোগমূলক ক্রিয়াঃ বিশেষ্য, বিশেষণ ও ধ্বন্যাত্মক অব্যয়ের সঙ্গে বিভিন্ন ধাতু যোগে গঠিত ক্রিয়াপদকে মিশ্র ক্রিয়া বলে। যেমন- নিজের চেষ্টায় বড় হও। এখানে ‘বড় হও ‘মিশ্র ক্রিয়া।
ক্রিয়ার বাচ্য ও তার প্রকারভেদ:
ক্রিয়ার বাচ্য : ক্রিয়াপদটি বাক্যের মধ্যে কর্তাকে অবলম্বন করে না কর্মকে অবলম্বন করে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বাক্যের মধ্যে কার প্রাধান্য বেশি অথবা ক্রিয়া নিজেই প্রধান কি না এসব বিষয় ক্রিয়ার যে রূপের দ্বারা বোঝা যায়, তাকে ক্রিয়ার বাচ্য বলে।
সহজ কথায়, বাক্যের মধ্যে কর্তা, কর্ম ও ক্রিয়া, এদের মধ্যে কে প্রধান তা বোঝা যায় ক্রিয়ার যে রূপের দ্বারা তা-ই বাচ্য।
বাচ্য চার প্রকার। যথাঃ কর্তৃবাচ্য, কর্ম বাচ্য ভাব বাচ্য ও কর্মকর্তৃবাচ্য।
- কর্তৃবাচ্য: বাক্যের মধ্যে ক্রিয়ার কর্তা প্রধান হলে তাকে কর্তৃবাচ্যের ক্রিয়া বলে। যেমন- সে বই পড়ে। এখানে ‘সে’ কর্তাই প্রধান।
- কর্মবাচ্যঃ কর্ম প্রধান হলে তাকে কর্মবাচ্যের ক্রিয়া বলে। যেমন- চিঠি লেখা হচ্ছে। এখানে চিঠি‘ কর্মই প্রধান।
- ভাববাচ্যঃ কর্তা অথবা কর্ম অপ্রধান হয়ে ক্রিয়ার ঘটনাই প্রধান হলে, তাকে ভাববাচ্য বলে। যেমন-আমার খাওয়া হয়েছে। এখানে ‘খাওয়া‘ ক্রিয়াই প্রধান।
- কর্মকর্তৃবাচ্যঃ যে বাক্যে কর্মই কর্তার মত ক্রিয়া সম্পাদন করে, তাকে কর্মকর্তৃবাচ্য বলে। যেমন বাঁশি বাজে। এখানে এমন ভাব প্রকাশ পাচ্ছে যে, যেন বাঁশি নিজে নিজেই বাজছে।
সমাপিকা ক্রিয়া ও অসমাপিকা ক্রিয়ার পার্থক্য উদাহরণসহ আলোচনা কর।
উত্তর: অর্থ প্রকাশের দিক থেকে ক্রিয়াপদ দুই প্রকার। যেমন-
সমাপিকা ক্রিয়া ও অসমাপিকা ক্রিয়া।
এদের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। পার্থক্যগুলো আলোচনা করা হলো।
- যে ক্রিয়াপদ বাক্যে পূর্ণতা বা পরিসমাপ্তি ঘটায় তাকে সমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন- সে মন দিয়ে পড়ে। করিম রোজ স্কুলে যায়। এখানে ‘পড়ে’ ও ‘যায়’ ক্রিয়াপদগুলো বাক্যের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছে। তাই, এরা সমাপিকা ক্রিয়া।
- অন্যদিকে, যে ক্রিয়াপদের দ্বারা বাক্যের পরিসমাপ্তি ঘটে না, বক্তার কথা অসমাপ্ত থেকে যায়, তাকে অসমাপিকা ক্রিয়া বলে। যেমন- আমি বাড়ি গিয়ে সে নিয়মিত পড়তে পড়তে। এখানে ‘গিয়ে’, ও ‘পড়তে পড়তে’ ক্রিয়ার দ্বারা বাক্য পরিসমাপ্তি ঘটে নি, তাই এগুলো অসমাপিকা ক্রিয়া।
- সমাপিকা ক্রিয়া দ্বারা বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ পায়, অসমাপিকা ক্রিয়া দ্বারা বাক্যের ভাব সম্পূর্ণ রূপে প্রকাশ পায় না। একটি বাক্যে সমাপিকা ক্রিয়া অবশ্যই থাকতে হবে। অন্যদিকে অসমাপিকা ক্রিয়া থাকতেও পারে, আরার নাও থাকতে পারে। তবে অসমাপিকা ক্রিয়া থাকলে সমাপিকা ক্রিয়া অবশ্যই থাকতে হবে।
- সমাপিকা ক্রিয়া বাক্যের শেষে বসে। অসমাপিকা ক্রিয়া বাক্যের সমাপিকা ক্রিয়ার আগে বাসে। যেমন সে বই পড়ে। সে বসে বসে বই পড়ে।
- কর্তার পুরুষ ভেদে সমাপিকা ক্রিয়ার রূপের পরিবর্তন হয়। যেমন আমি পড়ি, সে পড়ে, তুমি পড়। কিন্তু কর্তার পুরুষ ভেদে অসমাপিকা ক্রিয়ার রূপের পরিবর্তন হয় না। যেমন আমি গিয়ে বসব। সে গিয়ে বসবে। তুমি গিয়ে বসবে।
- সমাপিকা ক্রিয়া স্বাধীন ও নিরপেক্ষ। অসমাপিকা ক্রিয়া সমাপিকা ক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল। ফলে, অসমাপিকা ক্রিয়া পরাধীন ও সমাপিকা ক্রিয়াসাপেক্ষ।
- সমাপিকা ক্রিয়া অন্য ক্রিয়ার সাহায্য ছাড়াই সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশক বাক্য গঠন করতে পারে। কিন্তু অসমাপিকা ক্রিয়া সমাপিকা ক্রিয়ার সাহায্য ছাড়া সম্পূর্ণ ভাব প্রকাশক বাক্য গঠন করতে পারে না।
- ধাতুর সাথে বর্তমান, অতীত বা ভবিষ্যৎ কালের বিভক্তি যুক্ত হয়ে সমাপিকা ক্রিয়া গঠিত হয়। অন্যদিকে, ধাতুর সাথে কাল নিরপেক্ষ ‘ইয়া’, ‘ইতে’, ‘তে’ ‘ইলে’, ‘লে’ (সচরাচর) এই বিভক্তি গুলো যুক্ত হয়ে অসমাপিকা ক্রিয়া গঠিত হয়। যেমন থাইয়া, খাইতে, খাইলে, খেলে, খেতে ইত্যাদি।
প্রশ্নঃ ধাতু কাকে বলে? ধাতুর প্রকার ভেদ আলোচনা কর।
উত্তরঃ ক্রিয়ার মূলকে ধাতু বলা হয়। অর্থাৎ, ক্রিয়াপদকে বিশ্লেষণ করলে দুটো অংশ পাওয়া যায়। এক, ধাতু বা ক্রিয়া প্রকৃতি বা ক্রিয়ামূল। দুই, ধাতু বিভক্তি বা ক্রিয়া বিভক্তি। ক্রিয়া পদ থেকে ক্রিয়া বিভক্তি বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে তা-ই ধাতু। যেমন- ‘করে’ একটি ক্রিয়াপদ। এর দুটো অংশ হলো- কর+ এ =করে। এখানে কর‘ হলো ধাতু, আর ‘এ‘ হলো ক্রিয়া বিভক্তি।
তাহলে বলা যায় ধাতুর সঙ্গে প্রত্যয় ও বিভক্তি যোগ করে এবং বিস্তার ঘটিয়ে ক্রিয়াপদ সৃষ্টি করা হয় এবং বাক্যে ব্যবহার করা হয়।
ড. সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় ধাতুকে সঙ্গায়িত করেছের এভাবে-
ক্রিয়ার মূল অর্থ হতে নিহিত, যার যারা ক্রিয়ার ভাবটি প্রাতিপাদিত হয়, তাকে বলে ক্রিয়ার ধাতু। কোনও ক্রিয়াপদকে বিশ্লেষণ করলে বা ভাঙলে শেষ পর্যন্ত এমন একটি মুল বা জড় পাওয়া যায়, যাকে আর বিশ্লেষণ বা ভাগ করা সম্ভব নয়, যার দ্বারা ক্রিয়াপদের অন্তর্নিহিত অর্থ বা ভাবটি প্রকাশ পায়, ক্রিয়াপদের এই অবিভাজ্য, এই মুলকে বলে সেই ক্রিয়ার ধাতু।
ধাতুর প্রকারভেদ:
ধাতু তিন প্রকার। যেমন-
- ১. মৌলিক ধাতু বা সিদ্ধ ধাতু
- ২. সাধিত ধাতু
- ৩. সংযোগমূলক ধাতু।
১. মৌলিক ধাতু: যে সব ধাতু বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়, যাকে প্রকৃতি প্রত্যয় রূপে বিশ্লেষণ করা যায় না, সেগুলোই মৌলক ধাতু। এগুলোকে সিদ্ধ বা স্বয়ং সিদ্ধ ধাতুও বলা হয়। যেমন- চল, গড়, কর, হ. খা ইত্যাদি।
মৌলিক ধাতু উৎস অনুসারে তিন প্রকার। যেমন-
ক) বাংলা মৌলিক ধাতু: যে ধাতুগুলো সংস্কৃত থেকে সরাসরি বা সোজাসুজি আসেনি তাকে বাংলা ধাতু বলে। যেমন- কাট্, কাঁদ্ , জান্ , নাচ্ ইত্যাদি।
খ) সংস্কৃত মৌলিক ধাতু: যে ধাতুগুলো সংস্কৃত থেকে সরাসরি বা সোজাসুজি এসেছে, সেগুলোকে সংস্কৃত ধাতু বলে। যেমন-কৃ, গম, পঠ, দা, ত্যজ্ ইত্যাদি।
গ) বিদেশি মৌলিক ধাতু: প্রধানত হিন্দি এবং কদাচিৎ আরবি-ফারসি ভাষা থেকে যে সব ধাতু বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলোকে বিদেশি খাতু বলে। যেমন খাঁট্, ভর, টান্ ইত্যাদি।
এছাড়াও কিছু মৌলিক ধাতু আছে যাদের মূল ভাষা নির্ণয় করা কঠিন, সেগুলোকে অজ্ঞাতমূল ধাতু বলে। যেমন- ভিক্ষে মেগে খায়।
এখানে ‘মাগ‘ ধাতু হিন্দি ‘মাত‘ থেকে এসেছে, কিন্তু ‘হের ঐ দুয়ারে দাঁড়ায়ে কে?’ এখানে ‘হের‘ ধাতুর উৎস ভাষা পাওয়া যায় না। এটি অজ্ঞাতমূল ধাতু।
২. সাধিত ধাতুঃ মৌলিক ধাতু কিংবা কোনো কোনো নাম শব্দের সাথে ‘আ‘ প্রত্যয় যোগে যে ধাতু গঠিত হয়, তাকে সাধিত ধাতু বলে। সাধিত ধাতুর সাথে কাল ও পুরুষসূচক বিভক্তি যুক্ত হয়ে ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। যেমন-দেখায়= দেখ্+আ+ বর্তমান কালের সাধারণ নামপুরুষের ক্রিয়া বিভক্তি ‘য়‘ = দেখায়। মা শিশুকে চাঁদ দেখায়।
গঠনরীতি ও অর্থের দিক থেকে সাধিত ধাতু নানারকম হতে পারে। যেমন-
ক) নাম ধাতু: বিশেষ্য ও বিশেষণ পদের পরে ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করে যে ধাতু গঠিত হয়, তাকে নাম ধাতু বলে। যেমন- ঘুম+আ= ঘুমা। সে ঘুমাচ্ছে।
খ) প্রযোজক ধাতু: মৌলিক ধাতুর পরে প্রেরণার্থ (অপরকে নিয়োজিত করা অর্থে) ‘আ’ বা ‘ওয়া’ প্রত্যয় যোগ করে প্রযোজক বা ণিজন্ত ধাতু গঠিত হয়ে থাকে। যেমন- কর্+আ= করা, সে নিজে করে না অন্যকে দিয়ে করায়। সে ছাত্রকে পড়াচ্ছে।
গ) কর্মবাচ্যের ধাতু: মৌলিক ধাতু সঙ্গে ‘আ’ প্রত্যয় যোগ করে যে ধাতু গটিত হয় তাকে কর্মবাচ্যের ধাতু বলে। এটি বাক্য মধ্যস্থ কর্ম পদের অনুসারী ক্রিয়ার ধাতু। যথা- দেখ+ আ = দেখা, কাজটি ভাল দেখায় না। হার্+আ= হারা। ‘যা কিছু হারায় গিন্নী বলেন, কেষ্টা বেটাই চোর’।
ঘ) ধ্বন্যাত্মক ধাতুঃ ধ্বন্যাত্মক শব্দ ধাতুরূপে ব্যবহৃত হলে তাকে ধ্বন্যাত্মক ধাতু বলে। অনুকার অব্যয়ের পরে। প্রত্যয় যোগ করে ধ্বন্যাত্মক ধাতু গঠিত হয়। যেমন- চনমন্+আ= চনমনা, চনমনিয়ে রোদ উঠলো। ছটফট্ +আ= ছটফটা, ইত্যাদি।
৩) সংযোগমূলক ধাতু: বিশেষ্য বিশেষণ বা অনুকার অব্যয়ের সঙ্গে ‘কর ”দে’, ‘পা’, ‘খা’, ‘যা’, ‘হ‘ ইত্যাদি মৌলিক ধাতু সংযুক্ত হয়ে যে ধাতু গঠিত হয়, তাকে সংযোগমূলক ধাতু বলে। সংযোগমূলক ধাতু অকর্মক ও সকর্মক হতে পারে। যেমন গান কর, রাজি হ. পুজো কর, ভাল বাস, অ্যাপ্লাই কর ইত্যাদি।
ক্রিয়াপদের সাধু ও চলিতরূপঃ
পৃথিবীর সব উন্নত ভাষার মতো বাংলা ভাষারও দুটো রূপ। একটা লৈখিক বা সাহিত্যিক রূপ, অন্যটি মৌখিক রূপ। আধুনিক কালে এসে সাহিত্যিক রূপে সাধু ও চলিতরীতি নামে দুটো রূপ ব্যবহৃত হচ্ছে। সাধুরীতির সাথে চলিত রীতির অনেক পার্থক্য রয়েছে। গঠনগত পার্থক্যের কথা বলতে গেলে এক কথায় যা আসে তা হলো-
সাধু ভাষায় তৎসম শব্দ এবং এর পূর্ণাঙ্গ রূপ ব্যবহৃত হয়। আর চলিতরীতিতে অ-তৎসম রূপ এবং শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপটিই ব্যবহৃত হয়। তবে গঠনগত পার্থক্যের মধ্যে ক্রিয়াপদের রূপগত পার্থক্যই সবচেয়ে বেশি। সাধু ভাষার ক্রিয়াপদ চলিতরীতিতে সংকুচিত হয়ে সংক্ষিপ্ত রূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন-
সাধুরূপ- করিতেছি, আসিতেছি, খাইব ইত্যাদি। চলিত রূপ করছি, আসছি, খাব ইত্যাদি।
চলিত ক্রিয়াপদ গঠনের নিয়মঃ
- ক্রিয়াপদের মধ্যে ‘ই’ স্বরধ্বনি থাকলে তা লোপ পেয়ে চলিত ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। যেমন- খাইব – খাব, যাইব- যাব ইত্যাদি।
- ক্রিয়াপদের মধ্যে ‘উ’ স্বরধ্বনি থাকলে তা লোপ পেয়ে চলিত ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। যেমন-খাউক >থাক, হউক >হোক ইত্যাদি।
- ক্রিয়াপদের শেষে অ, আ, এ থাকলে আগের ‘উ‘ ধ্বনি ‘ও‘ হয়ে যায়। যেমন শুন> শোন, বুঝা >বোঝা, ফুটে> ফোটে ইত্যাদি।
- ক্রিয়াপদের শেষে অ, আ, এ থাকলে আগের ‘ই‘ ধ্বনি ‘এ‘ হয়ে যায়। যেমন- লিখ> লেখ, লিখা> লেখা শিখা >শেখা ইত্যাদি।
- ক্রিয়াপদের আগের ‘ই‘ ধ্বনির প্রভাবে পরের আ-এ হয়। যেমন- গিয়া> গিয়ে, দিয়া >দিয়ে ইত্যাদি।
- ক্রিয়াপদের আগের ‘উ‘ ধ্বনির প্রভাবে পরের আ>ও হয়। যেমন- উল্টানো > উল্টোনো; জুতা মারিল > জুতো মারিল ইত্যাদি।
- সাধুরীতির ক্রিয়াপদ অপিনিহিতি ও অভিশ্রুতির মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত হয়ে চলিত ক্রিয়াপদে পরিণত হয়। যেমন – করিয়া >কইর্যা >করে; রাখিয়া> রাইখ্যা > রেখে।
- কখনো কখনো সাধুরীতির ক্রিয়াপদ চলিতরীতিতে পরিবর্তিত হয়ে যায়। যেমন- কহিলেন > বললেন, কহিল >বলল, লইল> নিল।
- অনেক ক্ষেত্রে সাধুরীতির ক্রিয়াপদের মাঝের ‘হ‘ লোপ পায় এবং পরে অভিশ্রুতির মাধ্যমে ক্রিয়াপদ সংক্ষিপ্ত হয়ে চলিত ক্রিয়াপদ গঠিত হয়। যেমন- গাহিয়ে >গাইয়ে >গেয়ে। নাহিয়ে >নাইয়ে >নেয়ে।
- অনেক ক্ষেত্রে শুধু ‘হ ‘লোপ পেয়েও ক্রিয়াপদটি ব্যবহৃত হয়। যেমন- গাহিতে গাহিতে গেল> গাইতে গাইতে গেল।
‘একই ক্রিয়ার কাল ও পুরুষভেদে বিভিন্ন রূপ :
