একবচন ও বহুবচন প্রকাশের উপায় আলোচনা কর।/ কী কী উপায়ে বচন গঠিত হয়? একবচন থেকে বহুবচনে রূপান্তর কর।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

একবচন ও বহুবচন: বচনের সংজ্ঞাসহ প্রকারভেদ এবং গঠন

ভুমিকা: বাংলা ব্যাকরণে বচনের ধারণা ভাষা ব্যবহারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক অংশ। কোনো বিশেষ্য বা সর্বনাম দ্বারা একটি বস্তু, ব্যক্তি বা প্রাণী বোঝানো হচ্ছে না কি একাধিক বোঝানো হচ্ছে—এই সংখ্যাগত পার্থক্য প্রকাশের জন্যই একবচন ও বহুবচন ব্যবহৃত হয়। ভাষার অর্থ স্পষ্ট করতে, বাক্যের ভাব নির্ভুলভাবে প্রকাশ করতে এবং যোগাযোগকে সাবলীল করতে একবচন ও বহুবচন-এর সঠিক প্রয়োগ অপরিহার্য।

বাংলা ভাষায় একবচন ও বহুবচন প্রকাশের উপায় শুধু সংখ্যা নির্দেশে সীমাবদ্ধ নয়; প্রত্যয়, শব্দ পরিবর্তন, বিভক্তি এবং কখনো কখনো প্রসঙ্গের মাধ্যমেও একবচন ও বহুবচন নির্ধারিত হয়। শিক্ষার্থীদের জন্য যেমন একবচন ও বহুবচন জানা জরুরি, তেমনি লেখালেখি, বক্তৃতা ও ব্লগ লেখার ক্ষেত্রেও একবচন ও বহুবচন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

এই আলোচনায় একবচন ও বহুবচন কাকে বলে, কী কী উপায়ে একবচন ও বহুবচন গঠিত হয় এবং একবচন থেকে বহুবচনে রূপান্তরের নিয়ম কী—তা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করা হবে, যাতে পাঠকের কাছে একবচন ও বহুবচন ধারণাটি পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে।

বচন কাকে বলে?

বচন শব্দের অর্থ সংখ্যার ধারণা। বচন ব্যাকরণের একটি পারিভাষিক শব্দ। যা কিছু গণনা করা যায়, তারই বচন হয়। বাংলা ভাষায় কেবল বিশেষ্য ও সর্বনাম পদের বচন আছে।

সংজ্ঞাঃ পদের যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে সংখ্যা বোঝানো হয়, তাকে বচন বলে। অন্য কথায় বিশেষ্য ও সর্বনামের একত্ব ও বহুত্বের বোধকে বচন বলে। যার দ্বারা পদার্থের সংখ্যা বিষয়ে বোধ জন্মে তাকে বচন বলে।

প্রকারভেদঃ একবচন ও বহুবচন

বচন দুই প্রকার। যথা: ১. একবচন ও ২. বহুবচন।

১. একবচনঃ যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একটি মাত্র সংখ্যার ধারণা হয়, তাকে একবচন বলে। সাধারণত মূল শব্দই একবচন রূপে ব্যবহৃত হয়। যেমন সে, মেয়েটি, আমি, ছাগলটি, বালক, ইত্যিাদি।

২. বহুবচন: যে শব্দ দ্বারা কোনো প্রাণী, বস্তু বা ব্যক্তির একের অধিক অর্থাৎ বহু সংখ্যার ধারণা হয়, তাকে বহুবচন বলে। যেমন তারা, মেয়েরা, আমরা, বালকেরা ইত্যাদি।

(বাংলায় বচন দুটি। এক বোঝালে একবচন, একাধিক বোঝালে বহুবচন। বাংলায় কোনো দ্বিবচন নেই। দুটি সংখ্যা বোঝাতে দুই, দ্বয়, যুগোল, জোড়া প্রভৃতি শব্দের ব্যবহার বাংলায় থাকলেও তাদের দ্বিবচন বলা চলে না।)

প্রশ্নঃ বাংলায় একবচন প্রকাশের উপায়গুলো আলোচনা কর। (একবচন ও বহুবচন)

উত্তরঃ বাংলায় এক বচনরে জন্য বিশেষ কোনো প্রত্যয় বা বিভক্তি নেই। শব্দের মূল রূপটি একবচন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবুও একবচন নির্দেশ করার জন্য কয়েকটি নিয়ম রয়েছে। নিয়মগুলো উদাহরণসহ আলোচনা করা হলো।

শব্দের মূল রূপটি একবচন নির্দেশ করে। যেমন গাছ, আম, ছেলে, আমি, সে ইত্যাদি।

বিশেষ্যের আগে সংখ্যা বাচক শব্দ ‘এক’ বসিয়ে একবচন নির্দেশ করা হয়। যেমন এক লোক, এক টাকা ইত্যাদি।

বিশেষ্যের সাথে টা, টি, খান, খানা, খানি, গাছা, গাছি, ছড়া ইত্যাদি নির্দেশক প্রত্যয় যোগ করে একবচন নির্দেশ করা হয়। যেমন ছেলেটা, চিঠিখানা, চুড়িগাছি, হারছড়া ইত্যাদি।

সংখ্যাবাচক শব্দ ‘এক’ এর সাথে টা, টি, খানা, খানি, গাছা, ইত্যাদি যোগ করে বিশেষ্যের  আগে ব্যবহার করে একবচন নির্দেশ করা হয়। যেমন একটা লোক, একখানা বই ইত্যাদি।

একবচনের বিভক্তি যোগ করেও একবচন নির্দেশিত হয়। যেমন লোককে।

কখনো কখনো রূপের দিক থেকে বহুবচন বোধক হলেও প্রকৃত পক্ষে তা একবচন বোঝায়। যেমন- আপনারা জ্ঞানীগুণী লোক। এখানে ‘রা’ প্রত্যয় যোগে বহুবচন গঠিত হলেও মূলত বলা হয়েছে একজনকেই।

বহুবচন প্রকাশের উপায়একবচন ও বহুবচন

বাংলায় বহুবচন প্রকাশের নানা উপায় রয়েছে। সেগুলো নিম্নে উদাহরণসহ আলোচনা করা গেল।

শব্দের শেষে বহুত্বজ্ঞাপক বিভক্তি বা প্রত্যয় যোগ:

রা, এরা, দিগকে, দের, দেরকে, এদের ইত্যাদি বিভক্তি এবং গুলি, গুলো ইত্যাদি প্রত্যয় শব্দের শেষে যুক্ত করে বহুবচন প্রকাশ করা হয়। যেমন ছেলেরা, বইগুলো ইত্যাদি।

সমষ্টিবাচক শব্দ বিশেষণ রূপে শব্দের আগে বসায়ে:

সব, সকল, সমস্ত, বহু, অনেক ইত্যাদি সমষ্টিবাচক পদ, দুই তিন ইত্যাদি সংখ্যাবাচক শব্দ এবং এত, কত, কতক প্রভৃতি সর্বনামজাত সমষ্টিবাচক শব্দ বিশেষ্য ও সর্বনামের আগে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে বহুবচন প্রকাশ করে। যেমন- সব বাড়ি, ছয় ছাগল, কত টাকা ইত্যাদি।

সর্বনাম বা বিশেষ্যের পরে সমষ্টিবাচক শব্দ বসিয়ে বহুবচন প্রকাশ করা যায়। শব্দগুলো আবার প্রাণী ও অপ্রাণী শব্দ ভেদে আলাদা আলাদা বসে। যেমন-

একপদ দুইবার ব্যবহার:

একপদ দুইবার ব্যবহার করার ফলে বহুবচন তৈরি হয়। যেমন ছোট ছোট মাছ, ফুলে ফুলে ঘর ভরে গেছে।  লোকটি খেটে খেটে মরে গেল।

শব্দের একবচনের রূপ বহুবচন হিসেবে ব্যবহার করা।

কখনো কখনো শব্দে একবচনের রূপ বহুবচন প্রকাশ করে যেমন লোকের (লোকদের) কথায় কান দিয়ো না।

সর্বনামের একবচন ও বহুবচনের আলাদা আলাদা রূপ ব্যবহার করে: যেমন আমি আমরা, ও-ওরা, সে-তারা, কি-কিসব ইত্যাদি।

ব্যক্তিবাচক বিশেষ্যের বহুবচন না হলেও প্রয়োগের গুণে কখনো কখনো বহুবচন হয়। যেমন-তুহিনরা পাঁচ ভাই। (তুহিনরা বলতে তুহিন ও অন্যান্য ভাইকে বোঝাচ্ছে)

সমার্থক শব্দ যোগেও বহুবচন প্রকাশ পায়। যেমন চিঠিপত্র, বন্ধু-বান্ধব ইত্যাদি।

(বিঃ দ্রঃ পাল ও যুথ দুটো কেবল জন্তুর বহুবচনে ব্যবহৃত হয়। যেমন- গরুর পাল, হস্তিযুথ।।

বহুবচন প্রকাশের বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলো সাধারণত তৎসম শব্দের নিয়ম অনুযায়ী। খাঁটি বাংলা শব্দের বহুবচন ও চলিত রীতিতে ‘রা’ ‘এরা’ ‘গুলা’ ‘গুলো’ ‘দের’ এসব প্রত্যয় এবং ‘অনেক’ ‘বহু’, ‘সব ‘ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার বেশি হয়। বাক্যে একই সঙ্গে দুবার বহুবচনবাচক শব্দ বা প্রত্যয় ব্যবহৃত হয় না।

একবচন ও বহুবচনবহুবচন প্রকাশের কিছু উদাহরণ

একবচন ও বহুবচন এর উদাহরণ

একবচন ও বহুবচন উদাহরণ

গায়কদলফুলে ফুলেপিককুলতারাবলি
সৈন্যদলপাখিসববালিরাশিশব্দাবলি
বারিরাশিআত্মীয়বর্গপংক্তিমালামেঘে মেঘে
ধূলারাশিগুণিগণচেড়ীবৃন্দআঙুরগুচ্ছ
নরকুলমৃগপালযোদ্ধাগণজাতিসমূহ
আলোকমালাবনরাজিরত্নাবলিবুধমণ্ডল
গ্রন্থাবলিপরিচালকবৃন্দতরঙ্গনিকরকুসুমদাম
দেশসমূহগল্পগুচ্ছপুরোহিতসংঘজাতিপুঞ্জ
মেষপালজলরাশিনাটকাবলিবাড়ি বাড়ি
নদীসমূহখেলোয়াড়বৃন্দপ্রেমিকশ্রেণিরাক্ষসকুল
ফুলদলঅগ্নিরাশিঘরে ঘরেমনুষ্যসমূহ
নারীমহলপাতাকুলসে-সবযে-সব
ছাত্রদলকারানিজেরাবন্ধুবর্গ
পণ্ডিতবর্গকচিকুলবৃজুর্গানমন্দিরগুলো
বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত – ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্

উপসংহার

সবশেষে বলা যায়, বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও অর্থবহ প্রয়োগের জন্য একবচন ও বহুবচন সম্পর্কে জ্ঞান অপরিহার্য। একটি বাক্যে একবচন ও বহুবচন সঠিকভাবে ব্যবহার না হলে অর্থ বিভ্রান্ত হতে পারে এবং ভাষার সৌন্দর্য নষ্ট হয়। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে একবচন ও বহুবচন-এর গঠন ও রূপান্তর আয়ত্ত করা।

ব্যাকরণিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, একবচন ও বহুবচন গঠনের পদ্ধতি যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি ব্যবহারেও রয়েছে সূক্ষ্মতা। সাহিত্য, প্রবন্ধ, গল্প কিংবা ব্লগ—সব ক্ষেত্রেই একবচন ও বহুবচন ভাষাকে পরিশীলিত ও প্রাঞ্জল করে তোলে। সঠিকভাবে একবচন ও বহুবচন প্রয়োগ করলে লেখকের বক্তব্য আরও বিশ্বাসযোগ্য ও সুসংহত হয়।

অতএব, বাংলা ভাষা চর্চায় যারা আগ্রহী, তাদের জন্য একবচন ও বহুবচন শুধু একটি ব্যাকরণিক অধ্যায় নয়; বরং ভাষা দক্ষতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নিয়ম মেনে একবচন ও বহুবচন ব্যবহার করলেই ভাষা হয়ে উঠবে শুদ্ধ, স্পষ্ট ও প্রভাবশালী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *