নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি প্রাগ্রসর ও যুগান্তকারী- আলোচনা কর। অথবা, নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য/নারীর মর্যাদা/নারী চরিত্রের বৈচিত্র্য।


নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – প্রেক্ষিত রবীন্দ্র ছোটগল্প
ভূমিকা: বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত, বিশেষত নারীর প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রাগ্রসর ও যুগান্তকারী। যে সময়ে নারী ছিল মূলত সংসারকেন্দ্রিক ও পুরুষনির্ভর এক সামাজিক সত্তা, সেই সময়েই রবীন্দ্রনাথ সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য-এর কথা। তাঁর সাহিত্য, প্রবন্ধ ও দর্শনে বারবার উঠে এসেছে নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য, যা নারীর নিজস্ব চিন্তা, ইচ্ছা, অনুভূতি ও আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি দেয়।

রবীন্দ্রনাথ নারীর পরিচয়কে শুধু স্ত্রী, মাতা বা কন্যার গণ্ডিতে আবদ্ধ করেননি; বরং তিনি নারীর স্বতন্ত্র মানবসত্তাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করে কোনো সমাজ প্রকৃত সভ্য হয়ে উঠতে পারে না। উপন্যাস, গল্প ও কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এমন সব নারী চরিত্র সৃষ্টি করেছেন, যারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল, আত্মমর্যাদায় সচেতন এবং নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এই দৃষ্টিভঙ্গি রবীন্দ্রনাথকে তাঁর সময়ের অনেক চিন্তাবিদের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা, তার স্বাধীন চিন্তা ও স্বাধীন অস্তিত্বকে স্বীকার করা—এসবের কেন্দ্রে রয়েছে নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য। তাই রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য শুধু সৌন্দর্যবোধ নয়, বরং নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকারের এক শক্তিশালী মানবিক ঘোষণা।
বাংলা সাহিত্যে সার্থক ছোটগল্পের স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলো বৈচিত্র্যময় নানা দিক থেকে। সমাজ, মানুষ, প্রকৃতি নানামনের অন্তরতল সবকিছুই তাঁর ছোটগুল্পের আঙ্গিনায় চিত্রিত। পাশ্চাত্য সভ্যতার বিকাশে বাংলা সাহিত্যে নারীর ব্যক্তি স্বাতস্ত্র্য প্রকাশ পেলেও ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থায় নারীমুক্তি পুরোপুরিভাবে সম্ভব হয় নি। রবীন্দ্র ছোটগল্পে প্রকাশিত অধিকাংশনারী চরিত্রগুলো ব্যক্তিত্বময়তায় উজ্জল। রবীন্দ্রপূর্ব রচনায় নারী চরিত্রগুলো মূল্যহীন এবং ইতিহাস ও রোমান্সের ছোঁয়ায় অনাদারে প্রকাশমান, সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ নারীচরিত্রগুলোকে মূল্যায়ন করেছেন বিশেষভাবে। দরদ দিয়ে নারীর অন্তর্জগতের দ্বার খুলে দিয়েছেন।
মানবিকতার সর্বোতমুখী প্রকাশ দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের জগতে। এ মানবিকতা বালক, বয়োবৃদ্ধ এবং নারীচরিত্রের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। বিশেষভাবে অধিকাংশ গল্পে নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় সবক্ষেত্রে সোচ্চার। রবীন্দ্রনাথ কবিত্বের স্পর্শে নারীর যন্ত্রনার দিকটি পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। নারীর বেদনা ক্লিষ্ট চিত্তের প্রকাশ যেমন ঘটেছে তেমনি অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদী কন্ঠও শোনা যায়। নারী চরিত্রের মধ্যে যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের পুরুষ চরিত্রের মধ্যে তার প্রকাশ অনেক কম। এবার আলোচনা করা যাক।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – বিশ্লেষণ
‘দেনা-পাওনা’ গল্পের নিরুপমা এক ভাগ্য বিড়ম্বিত নারী চরিত্র। সে পণপ্রথা ও পরিবারের অত্যাচারে অমানুষিক কষ্টের শিকার হলেও হৈমন্তীর মতই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে রবীন্ত্রনাথ নিরুপমা চরিত্র নির্মাণ করেছেন। সমাজের কলঙ্কিত একটা চিত্রকে লেখক এখানে উপস্থাপন করেছেন।
যৌতুক লোভী শ্বাশুর রায়বাহাদুরের নিষ্ঠুর আচরণে নিরুপমা ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে ওঠে। নিরুপমাকে বাবার বাড়ি যেতে দেয় না স্বামীর সাথে যোগাযোগ রাখতে দেয় না। নিরুপমা একটু একটু করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়। অনেক কষ্টে নিরুপমার বাবা যখন নিজের বাড়ি বিক্রি করে পনের বাকী টাকা নিয়ে আসে তখন নিরুপমা বলে-
‘টাকা যদি দাও তবেই অপমান। তোমার মেয়ের কি কোন মর্যাদা নেই। আমি কি কেবল একটা টাকার থলি, যতক্ষণ টাকা আছে ততক্ষণ আমার দাম। না বাবা, এ টাকা দিয়ে তুমি আমাকে অপমান করো না। তাছাড়া আমার স্বামী এ টাকা চান না।’
এ উক্তির মধ্যে নিরুপমার কঠোর ব্যক্তিত্বময়তার রূপটি ফুটে উঠেছে। এ রকম ব্যক্তিত্ব আরও স্পষ্ট হয়েছিল ‘স্ত্রীর পত্র’-এ মৃনাল চরিত্রের মধ্যে। সমাজের পুরুষ শাসিত প্রথাকে অত্যন্ত সচেতনভাবে মৃনাল অবজ্ঞা করে সংসার ত্যাগ করেছিল। কিš,‘ সংসারের নিষ্ঠুর শাসন এবং পণপ্রথার হিংস্র বিষাক্ত থাবা নিরুপমার স্বাভাবিক জীবনের অপমৃত্যু ঘটিয়েছে। এ নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থা ও শাসন মানুষের বিবেকের আড়ালে জোঁকের মতো আঁকড়ে থেকে এভাবেই নারীত্বের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পথটকে রদ্ধ করে দেয়। নিরুপমার ব্যক্তিত্ব ও বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে লেখক সমাজের অপমানকর শাসন ব্যবস্থা ও বিবেকের প্রতি ধিক্কার প্রকাশ করেছেন এবং নারী হৃদয়ের অন্তর্বেদনা প্রকাশ করেছেন।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – মাল্যদান গল্পে
‘মাল্যদান’ গল্পের অবহেলিত কুড়ানি চরিত্রের মধ্যে ব্যক্তিত্বের চরম রূপ প্রকাশিত। পটলের পরিহাস ও যতীনের অবহেলার মধ্যে দিয়ে যে মালাবদল হয়েছিল কুড়ানি তাকেই জীবনের সম্বল করে বসে। যতীন লজ্জায় ও বিরক্তিতে পটলের বাড়ি ত্যাগ করে চলে গেলে কুড়ানি ধাক্কা খেয়ে জেগে ওঠে এবং ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। একাগ্র প্রেম নিয়ে অসুস্থ হয়ে কুড়ানি মৃত্যুর কাছাকাছি আসে এবং গৃহত্যাগ করে।
ভাগ্যক্রমে যতীনের সাথে হাসপাতালে কুড়ানির দেখা হয়। খবর পেয়ে পটলও আসে। কিন্তু কুড়ানির আর ঘরে ফেরা হয় না, যতীনের স্ত্রী হয়ে সংসার রচনা করাও হয় না। যতীন এক সময় কুড়ানির হাতে গোপনে রক্ষিত শুকনো বকুলের মালা দেখতে পায় এবং যতীন পরম বিস্ময়ে ও ব্যথায় কুড়ানির মর্মযাতনা ও অন্তরকে আবিষ্কার করে। যতীন পরম যতেœ কুড়ানির গলায় মালা পরায়। কুড়ানি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
কুড়ানির মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে নারীত্বের আদর্শ রক্ষিত হয়েছে। পটলের সামান্য ভুল এবং যতীনের অবহেলা কুড়ানিকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে। যতীন চিকিৎসক বটে, কিন্তু কুড়ানির মনের ক্ষত ও তার ভালোবাসার গভীরতা বুঝতে অক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে গল্পগুচ্ছে নারী চরিত্রগুলো পুরুষের তুলনায় স্বতন্ত্র।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – নিশীথৈ গল্পে
‘নিশীথে’ গল্পের মনোরমাও অত্যন্ত শিল্পমন্ডিত চরিত্র, স্বামী দক্ষিণাচরণের সাথে প্রেম-ভালোবাসায় মধুর দাম্পত্য গড়ে ওঠে। স্বামীর কঠিন অসুখে মনোরমা কঠিন সেবা দ্বারা সুস্থ করে তোলে। মনোরমা কঠিন অসুখে শয্যাগত। স্বামী দক্ষিণাচরণ স্ত্রীর সেবার কোনো ত্রæটি করতে চান না। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে বলেছিলেনÑ
তোমার ভালোবাসা আমি কোনকালে ভুলিব না। এ কথাতে স্ত্রী বলেছিলেনÑ
কোনোকালে ভুলিবে না, ইহা সম্ভব নয় এবং আমি তা প্রত্যাশা করি না।
কালক্রমে দক্ষিণাচরণ বাবু স্ত্রীকে নিয়ে বায়ু পরিবর্তনে এসে প্রথম স্ত্রীর বর্তমানেই অন্য একজনকে ভালোবাসেন এবং এ দৃশ্য তার প্রথম স্ত্রী নিজের জন্য অপমান মনে করে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে। পুরুষের এ দ্বিমুখী চরিত্রের পাশে মনোরমাকে লেখক অত্যন্ত উজ্জ্বল করে চিত্রিত করেছেন।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য -সুভা গল্পে
‘সুভা’ গল্পের সুভা মূক, নির্বাক হলেও অন্তরের অনুভূতি প্রকাশে অনন্য। সে প্রকৃতির মতো, তাই প্রকৃতির সাথেই তার ঘনিষ্ঠতা, পশু-পাখির সাথে তার বন্ধুত্ব। গ্রামের প্রতাপ নামের একটি ছেলেকে সে হৃদয়েও জায়গা দেয়। সুভাকে তার বাবা শহরে নিয়ে বিয়ে দেয়। সুভা কথা বলতে পারে না জানাজানি হলে বরপক্ষ আবার দেখেশুনে আর একটি বধূকে ঘরে আনে। সমাজের কাছে মূক সুভার নারিত্ব প্রকাশিত হলো না। মূক হওয়াতে তার জীবন সমাজের কাছে অপরাধের। নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বিচারে বোবা মেয়ে সুভাও এক অনন্য মাত্রা পেয়েছে।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – পোস্টমাস্টার গল্পে
‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে এগারো বছরের দরিদ্র কিশোরী রতনের মনঃস্তত্ত¡ ও চারিত্রিক উজ্জ্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। সমাজের প্রথা-অনুযায়ী যে-বয়সে সংসার করার কথা, দারিদ্র্যের জন্য তাকে দুমুঠো ভাতের জন্য কাজ করতে হয়। ‘জলের মাছ ডাঙ্গায়’ ওঠা এক যুবকের দায়িত্ব নেয় পিতৃমাতৃহীন দরিদ্র বালিকা চারটি চারটি খাওয়ার শর্তে। কেবল দায়িত্ব নয়, আপন কর্তব্য পালনে অগ্রসর হয়। লেখকের বর্ণনা-
“এ ঘোর প্রবাসে রোগ যন্ত্রণায় স্নেহময়ী নারীরূপে জননী ও দিদি পাশে বসিয়া আছেন এই কথা মনে করিতে ইচ্ছা করে এবং এ স্থলে প্রবাসীর মনের অভিলাষ ব্যর্থ হইল না। বালিকা রতন আর বালিকা রহিল না। সেই মুহূর্তেই জননী পদ অধিকার করিয়া বসিল।”
পোষ্টমাস্টারের সাথে রতন যে-বন্ধন গড়ে তোলে, তাতে কোলকাতা-যাত্রার প্রাক্কালে সঙ্গে যাবার অনুরোধ জানায় কিন্তু পোষ্টমাস্টার বলেÑ ‘সে কী করে হবে’। পোস্টমাস্টারের সাথে রতনের অবস্থানগত পার্থক্য। তবে রতন প্রত্যাখ্যাত হলেও দায়িত্ব ভোলে না। সামনে না আসলেও পোস্টমাস্টার হাতের কাছে সব পেয়ে যায়। নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বিচারে রতন বিশেষ বিবেচ্য।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – স্ত্রীর পত্র গল্পে
‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পের মৃণাল সন্তানহীনা, স্নেহশীলা, বৃহৎ পরিবারের বধূ। মৃণালের স্নেহে বড় হয় মাতৃপিতৃহীনা। অনাথ লাঞ্ছিত অসুন্দরী বালিকা বিন্দু। বিন্দু সংসারে লাঞ্চিত হতে থাকলে বিন্দুকে ভালোবেসে এবং সেই ভালোবাসার দাম দিতে গিয়ে স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সবার হীনম্মন্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে সংসার ত্যাগ করে। সংসারের ক্লিষ্ট ঘৃণ্য পরিধির বাইরে নিজের স্বরূপ ও মহিমা উপলব্ধি করে। পনেরো বছরের বধূ জীবনের অভিজ্ঞতায়, অনেক গ্লানি স্বীকর করে, অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে মৃণাল বুঝেছে যে, তার চরম বিকাশ পত্নিত্বে নয়, নারিত্বে। সে কথাই দূর হতে পত্রে তার স্বামীকে জানিয়ে নারিত্বের স্বাতন্ত্র্যকে উজ্জ্বল করে তুলেছে। নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে মৃণাল এক অনন্য চরিত্র।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – পয়লা নম্বর গল্পে
‘পয়লা নম্বর’ গল্পের অনিলা ব্যক্তিত্ব সম্পন্না নারী। সে তার পন্ডিত স্বামীর কাছ থেকে নিরন্তর অবমাননা ও উপেক্ষা পেয়েছে। পাশের বাড়ির সিতাংশু মৌলী অনিলার দাম্পত্য অবমাননাকে পুঁজি করে অনিলার প্রতি কামনার হাত বাড়িয়ে দেয়। ব্যক্তিত্বসম্পন্না অনিলা স্বামী ও সিতাংশু উভয়ের প্রতিই একই ঘৃণা উচ্চারণ করে সে গৃহত্যাগ করে।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য– কঙ্কাল গল্পে
‘কঙ্কাল’ গল্পের কথক নারী গল্প লেখকের কাছে ছায়ারূপে এসে তার জীবনের ব্যর্থতার কথা বলেছে। ডাক্তার শশিভূষণের লোভ এবং সামাজিক কুপ্রথা যৌতুকের ওপর প্রচন্ড ধিক্কার দিয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে দিয়ে তৎকালীন সমাজ ও লোভী প্রেমিকের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদে জানিয়ে সে হয়ে উঠেছে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা প্রত্যাশী নারী।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য– শাস্তি গল্প
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য বিচারে সবচেয়ে উজ্জ্বল অনন্য নারী হলো ‘শাস্তি’ গল্পের চন্দরা। চন্দরাকে সমস্ত গল্পগুচ্ছের অন্যতম প্রতিবাদী চরিত্র ভাবা যায়। চন্দরা ছিদামের স্ত্রী। বড় ভাই দুঃখীরাম রাগের মাথায় আঘাত করে স্ত্রীকে মেরে ফেলে। ছিদাম চন্দরার উপর খুনের দায় চাপিয়ে ভাইকে বাঁচাতে চায়। স্বামীর প্রস্তাবে চন্দরা স্তম্ভিত হয়ে যায়। চন্দরা ঘৃণায় স্বামীর প্রত্যাশাকেই পুরণ করে। নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টায় সে আর করে না। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকালে ‘মরণ’ শব্দটি উচ্চারণ করে স্বামী নামক কেতাবি বস্তুটার প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছে।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – ল্যাবরেটরী গল্পে
‘ল্যাবরেটরী’ গল্পের মোহিনী রবীন্দ্রনাথের হাতে নারী ব্যক্তিত্বের বিশেষ মূর্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। নারীর সতীত্ববোধের সাথে শিক্ষা ও সংস্কার ভিত্তিভূমি হিসেবে জড়িত। কিন্তু সোহিনী দেখিয়েছে যে, শিক্ষা ও সংস্কারের অভাবে দৈহিক শুদ্ধতা রাখতে না পারলেও ভালোবাসার জোরে সতীত্বের উচ্চতর আদর্শে নারী অবিচল থাকতে পারে।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – মহামায়া গল্পে
‘মহামায়া’ গল্পের নায়িকা মহামায়া নারী ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল চরিত্র। সমাজের বিচারে যুবকে রাজিব লোচনকে ভালোবাসার কারণে ঘাটের মরাকে বিয়ে করতে হয় মহামায়াকে। বিয়ের পরপরই তাকে সহমরণের চিতায় উঠনো হয়। বিয়ের আগে মহামায়া রাজিবকে বলেছিল-
“রাজিব তোমার ঘরেই আমি যাইব। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করিয়ো।” মহামায়া তার কথাটি রেখেছিল। সহমরণের চিতা জ্বালানোর পর প্রচন্ড ঝড়ে চিতা নিভে গেলে সবার অলক্ষ্যে সে রাজিবের ঘরে আসে। শর্ত দেয় যে, রাজিব কখনো তার মুখ দেখবে না। দেখলে তাকে চিরতরে হারাবে। কিন্তু একদিন প্রবল জোছনা ভরা রাতে রাজিব নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। আর একারণে মহামায় চিরদিনের মত তার ঘর ছেড়েছে।
নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য – বিচারে অন্যান্য গল্প
এভাবে সুরবালা (একরাত্রি), ‘কাবুলিওয়া’র মিনি, অপরাজিতা’র নায়িকা কল্যাণী, ‘আপদ’ গল্পের কিরণময়ী, মধ্যবর্তিনী’র হরসুন্দরী ও শৈলবালা, ষাটের কথার নায়িকা, অতিথি’র চারুশশী, ‘মেঘ ও রৌদ্রে’র গিরিবালা, জীবন ও মৃত্যু’র কাদম্বিনী, ‘সমাপ্তির’র মৃন্ময়ী প্রভৃতি নারী চরিত্রের কথা বলা যায়।
সমস্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, গল্পগুচ্ছের নারী চরিত্রগুলো অপেক্ষকৃত পুরুষ চরিত্রের তুলনায় স্বতন্ত্র্য ও ব্যক্তিত্বময়ী। নিজের কর্তব্য এবং নিজস্বকে রক্ষা করার জন্যে নারীরা সবসময় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সমাজের সমস্ত অপপ্রথার বিরুদ্ধে কখনো তারা সোচ্চার, কখনো বা ব্যক্তিসত্তা রক্ষার জন্য প্রাণটাকে বিসর্জন দিয়ে সমাজের পুরুষ-শাসিত প্রথাকে ধিক্কার দিয়েছে এভাবে লেখক নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকারবোধকে শিল্পিতভাবে উচ্চারণ করেছেন ; এতে শিল্পীর প্রাগ্রসর ও যুগান্তকারী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে।
উপসংহার
সবশেষে বলা যায়, নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নিঃসন্দেহে প্রাগ্রসর ও যুগান্তকারী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য দমিত থাকলে সমাজের সামগ্রিক বিকাশ অসম্ভব। তাই তাঁর সাহিত্যজুড়ে নারীর আত্মসম্মান, স্বাধীনতা ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটেছে বারবার।
রবীন্দ্রনাথের নারী চরিত্রগুলো কেবল কাহিনির অলংকার নয়; তারা নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য-এর জীবন্ত প্রতীক। কখনো তারা সামাজিক বাঁধন ভাঙে, কখনো নীরব প্রতিবাদে নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করে—সব ক্ষেত্রেই নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য তাদের মূল শক্তি। এই কারণে রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান সমাজে যখন নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় প্রতিফলিত নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য আমাদের নতুন করে পথ দেখায়। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ নারীকে দেখেছেন সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে—যার অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নারীর ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য।


প্রফেসর মো: আখতার হোসেন