ভাষার বংশানুক্রমিক বা বংশগত শ্রেণিবিন্যাস : সংজ্ঞা ও তাৎপর্য এবং বাংলা ভাষার স্থান নির্ণয় কর। (বংশপীঠিকা)


বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস: বাংলা ভাষার অবস্থান
ভূমিকা: পৃথিবীতে হাজার ভাষা রয়েছে। এসব ভাষার কোনটি জীবিত, কোনটি মৃত, কোনটির লিখিত রূপ আছে আবার কোনটির লিখিত রূপ নেই। ভাষাবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সমস্ত ভাষাকে কতকগুলো শ্রেণিতে ভাগ করে একটা নিয়ম শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে ভাষার কিছু মৌল বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করেছেন। কেননা পৃথিবীর ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে নানা সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য। বহু ভাষার মধ্যে রয়েছে বংশগত সম্পর্ক। প্রকৃতির গোপন খেয়ালে গড়ে ওঠা আর পাঁচটি জিনিসের মতো ভাষাও বড় বিচিত্র ও জটিল। তাই আটপৌরে ধরা বাধা নিয়মের বন্ধনে ফেলে ভাষাকে শৃঙ্খলিত করা বড় কঠিন।
তবুও একই পর্যায়ে কিংবা বিভিন্ন ¯তরের মধ্যে যদি শব্দকোষ বা ব্যাকরণে লক্ষ্যণীয় ঐক্য দেখা যায় অথবা দুটি ভাষার পূর্বতন রূপ যদি একই প্রকারের হয়, তবে সেই ভাষার মৌলিক সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে- ভাষাবিজ্ঞানের এটাই হলো একটা মূলসূত্র। এভাবে ভাষাতত্তি¡ক মূলসূত্র ধরে পৃথিবীর ভাষাগুলোকে নানাভাবে শ্রেণীকৃত করা যায়। তবে শ্রেণীকরণের মধ্যে বংশানুক্রমিক ও রূপতাত্ত্বিক শ্রেণিবিন্যাস ভাষা শ্রেণিকরণে অত্যন্ত প্রচলিত। এর মধ্যে বংশানুক্রমিক শ্রেণিকরণ পদ্ধতিই প্রধান। অনেকের মতে এটাই একমাত্র পদ্ধতি। যার সাহায্যে পৃথিবীর ভাষাগুলোকে বিভিন্ন তাৎপর্যপূর্ণ শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা সম্ভব।
এখানে যা জানা যাবে-
১. ভাষা শ্রেণিবিন্যাসের ধারণা
২. ভাষার বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস : সংজ্ঞা ও তাৎপর্য
৩. ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত পরিচয়
৪. শতম ও কেন্তুম ভাষার বিভাজন
৫. ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠী ও ভারতীয় আর্য শাখা
৬. প্রাচীন, মধ্য ও নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা
৭. প্রাকৃত, পালি ও অপভ্রংশের ভূমিকা
৮. গৌড়ীয় প্রাকৃত ও বঙ্গ-কামরূপী ধারা
৯. ভাষার বংশধারায় বাংলা ভাষার অবস্থান
১০. বাংলা ভাষার ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ভাষা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও সামাজিক অভিজ্ঞতার মৌলিক প্রকাশমাধ্যম। সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে ভাষাও পরিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছে। এই পরিবর্তন কখনো ধীর, কখনো দ্রুত; কখনো স্বতঃস্ফূর্ত, আবার কখনো সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাবজাত। ভাষাবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ভাষার শ্রেণিবিন্যাস, যার মাধ্যমে পৃথিবীর অসংখ্য ভাষাকে তাদের উৎপত্তি, গঠন ও পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে সাজানো হয়। এই শ্রেণিবিন্যাসের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হলো বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস, যেখানে ভাষার জন্ম, বিকাশ ও আত্মীয়তার ধারাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ভাষার এই শ্রেণিবিন্যাস কেবল ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল মেটায় না, বরং মানবসভ্যতার ইতিহাস, মানুষের অভিবাসন, সংস্কৃতির বিস্তার ও চিন্তাধারার পরিবর্তন বুঝতেও সহায়তা করে। কোনো ভাষা হঠাৎ জন্ম নেয় না; প্রতিটি ভাষার পেছনে থাকে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পথচলা। এই পথচলার ধারাবাহিক অনুসন্ধানই ভাষার বংশধারা নির্ণয়ের মূল উদ্দেশ্য। ফলে বংশানুক্রমিক বিশ্লেষণ ভাষাকে বিচ্ছিন্ন কোনো সত্তা হিসেবে না দেখে একটি বৃহৎ ভাষাপরিবারের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করে।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ভাষাপরিবার হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী। ইউরোপের অধিকাংশ ভাষা এবং দক্ষিণ এশিয়ার বহু ভাষা এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এই গোষ্ঠীর ভেতরেই রয়েছে শতম ও কেন্তুম নামক দুটি প্রধান ধারা, যেগুলো ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত। এই বিভাজনের মধ্য দিয়েই ইন্দো-ইরানীয় ভাষাগোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে, যা পরবর্তীকালে ইরানীয় ও ভারতীয় আর্য—এই দুই প্রধান শাখায় বিস্তৃত হয়।
বাংলা ভাষা এই দীর্ঘ ভাষাগত উত্তরাধিকারেরই এক উজ্জ্বল ফল। বাংলা ভাষার অবস্থান নির্ণয় করতে হলে প্রাচীন ভারতীয় আর্য থেকে শুরু করে মধ্য ভারতীয় আর্য, প্রাকৃত, অপভ্রংশ এবং গৌড়ীয় প্রাকৃত—এই ধারাবাহিক স্তরগুলো অনুধাবন করা প্রয়োজন। এই ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। তাই ভাষার ইতিহাসে বাংলা ভাষার স্থান নির্ধারণ মূলত তার বংশানুক্রমিক পরিচয়ের ওপরই নির্ভরশীল।
এই আলোচনায় ভাষার বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাসের তাত্ত্বিক ভিত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে বাংলা ভাষার অবস্থান নির্ণয়ের একটি সুস্পষ্ট চিত্র উপস্থাপন করা হবে।
বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস পদ্ধতি ঃ ভাষার শ্রেণীবিন্যাসে বংশানুক্রমিক পদ্ধতি বেশি প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। বিশেষ করে তুলনামূলক ভাষাতত্তে¡ এ পদ্ধতির প্রচলন বেশি। বংশানুক্রমিক পদ্ধতিতে শ্রেণিবিন্যাস করা হয় বিভিন্ন ভাষার উদ্ভব, বিকাশ ও পারম্পরিক সম্পর্ক ও সাদৃশ্যের ভিত্তিতে। বর্তমানে প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে যতই বৈসাদৃশ্য থাকুক না কেন ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যাবে এক ভাষার সাথে অন্য ভাষার মূল ধ্বনি, শব্দ ভান্ডার রূপতত্ত¡, বাক্য গঠনরীতির ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক মিল রয়েছে। তাই ধারণা করা হয় এক ভাষা থেকে জন্ম নিয়েছে বহু ভাষার। এভাবে প্রাচীনরূপে মিল খুঁজে বের করে এক গোত্রের মধ্যে ফেলে ভাষার শ্রেণিবিন্যাস করার নামই বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস।
ভাষার বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত রূপমূলের উদ্ভবের দিকটি তুলনা করা হয়। রূপমূল উদ্ভবের ইতিহাস আলোচনা করে ভাষাবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সম¯ত ভাষাকে কতকগুলো বংশে ভাগ করেছেন। বংশানুক্রমিক ভাগ করার তারা একটা মূলসূত্র অনুসরণ করেছেন। সেই সূত্র হলো
বিভিন্ন ভাষার ক্রম পরিণতির বিভিন্ন স্তরের মধ্যে যদি শব্দ কোষ এবং ব্যাকরণে বিশেষ মিল দেখতে পাওয়া যায় কিংবা যদি দুটি ভাষার আদিরূপের মধ্যে বিশেষ মিল পাওয়া যায়, তবে জানতে হবে সেই ভাষাগুলোর পরম্পরের সঙ্গে মৌলিক সম্পর্ক থাকবেই।
সহজ কথায়- বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত রূপমূলের গঠনরীতি ও অর্থগত সাদৃশ্যের প্রেক্ষিতে বংশানুক্রমিক বা বংশগত শ্রেণিবিন্যাস নির্ণীত হয়ে থাকে। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য উদাহরণ দেওয়া যাক-
কেন্তুম ভাষার উদাহরণ
| ফরাসি | স্পেনীয় | পর্তুগীজ | বাংলা অর্থ |
|---|---|---|---|
| Dent | diente | dente | দাঁত |
| Chose | cosa | cousa | জিনিস |
| Blanc | blanco | branco | সাদা |
| Deux | dos | dois | দুই |
🔹 এগুলো কেন্তম ভাষাগোষ্ঠীর (ইটালিক শাখা) উদাহরণ
🔹 ল্যাটিন থেকে বিকশিত হয়ে ফরাসি–স্পেনীয়–পর্তুগীজ ভাষা হয়েছে
🔹 তাই এরা বাংলার আত্মীয় নয়, কিন্তু একই ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের সদস্য
উপরে সমশ্রেণীর রূপমূলের গঠনগত সাদৃশ্য লক্ষ করলেই সেগুলোর বংশগত সম্পর্ক উপলব্ধি করা যায়। এ সাদৃশ্য দেখে ধরে নেয়া যায় এ ভাষাগুলো একই মূল ভাষা থেকে উদ্ভত। এভাবে বাংলা, আসামী, উড়িয়া, গুজরাটি, হিন্দি প্রভৃতি ভাষাগুলো বর্তমানে বিচ্ছিন্ন হলেও একই ভাষামূল থেকে উদ্ভত তা তাদের রূপমূলের ইতিহাস আলোচনা করলে পাওয়া যায়।
বংশগত শ্রেণীবিণ্যাসকরণ প্রসঙ্গে হুমাযুন আজাদ তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান গ্রন্থে বলেছেন-
এর ‘ভিত্তি হচ্ছে বিভিন্ন ভাষার জন্মগত ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক। ওই সম্পর্ক নির্ণীত হয় ভাষাগুলোর ধ্বনিতাত্তি¡ক ও রূপতাত্তি¡ক প্রতিসাম্য দ্বারা।”
এ প্রসঙ্গে মাইয়ের ভাষাবংশের সংজ্ঞা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন যে, যখন দুটি ভাষা কোন পূর্ববর্তী কথ্য ভাষা থেকে দু’রকম বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে বিকশিত হয়, তখনই তাদের সম্পর্কিত বলা হয়।
দুটো ভাষার মধ্যে মিল খুঁজে পেলেই মনে করা হয় যে, এসব ভাষা একদা একই ভাষা ছিল। কালক্রমে বিবর্তিত হয়ে পরিণত হয়েছে বিভিন্ন ভাষায়। যখন প্রমাণিত হয় যে, দুটি ভাষা এক সময় অভিন্ন ছিলো। তখন ধরে নেয়া হয় তারা একই ভাষাবংশের অন্তর্ভূক্ত। আর একই ভাষাবংশভূত ভাষাগুলো ঐতিহাসিকভাবে সম্পর্কিত। বংশ নির্ণয়ের সময় ভাষাগুলোর ভৌগোলিক অবস্থানও বিবেচনা করা হয়। কারণ সম্পর্কিত ভাষাগুলো ভৌগোলিকভাবে সন্নিহিত থাকে আর ভৌগোলিকভাবে পরস্পর বিচ্ছিন্ন থাকলেও মনে করা যেতে পারে, কোন-না-কোন কারণে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো।
বংশানুক্রমিক বা বংশগত সম্পর্কের ক্ষেএে ভাষার সঙ্গে গাছের তুলনা করা হয়। গাছের মূলের সাথে তার শাখার যে সম্পর্ক থাকে ,মূলভাষার সঙ্গেও পরবর্তীকালে বিচ্ছিন্ন ভাষার একই সম্পর্ক থাকে। অর্থাৎ বংশগত সম্পর্ক জ্ঞাপনের জন্য তুলনামূলক- ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়ে থাকে আউগুস্ট শ্লাইখারের উদ্ভাবিত বংশলতিকা চিত্র। বংশতরুর শীর্ষে থাকে আদিভাষা।
বংশানুক্রমিক বা বংশগত শ্রেণিবিন্যাসের উপযুক্ত পদ্ধতির সাহায্যে সাদৃশ্য মিলের উপর ভিত্তি করে নির্ণয় করা হয়েছে যে পৃথিবীর ভাষাগুলো কয়েকটি আদি উৎস থেকে জম্মলাভ করেছে। এই আদি উৎসগুলোকে প্রাচীনতম ভাষাবংশ বলা হয়। সারা পৃথিবীর সমস্ত ভাষাকে মোট ২৬ টি বংশে ভাগ করা হয়েছে, তার মধ্যে প্রধান ১২টি বংশ বা গোষ্ঠী চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন-
- (১) ইন্দো-ইউরোপীয়
- (২) সেমীয়- হামীয়
- (৩) বান্টু
- (৪) ফিন্নো-উগ্রীয় বা উরালীয়
- (৫) তুর্ক- মোঙ্গল মাঞ্চু
- (৬) ককেশীয়
- (৭) দ্রাবিড়
- (৮) অষ্ট্রিক
- (৯) ভোট-চীনীয়
- (১০) প্রাচীন এশীয় বা উত্তর-পূর্ব-সীমান্তীয়
- (১১) এসকিমো ও
- (১২) আমেরিকার আদিম ভাষাগুলি ।
তবে ভাষাবংশের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাবংশ। পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের ভাষা এ ভাষা বংশের অন্তর্গত। ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, ইতালীয়, বাংলা ইত্যাদি ভাষা এ বংশেরই আধুনিক সংস্করণ। এ ভাষা বংশকে ভাষা বিজ্ঞানীরা ১০টি প্রাচীন শাখায় বিভক্ত করেছেন।


সবশেষে বলা যায় যে, এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও আমেরিকায় প্রচলিত ভাষাগুলোকে শ্রেণিবিন্যাস করার চেষ্টা করা গেলেও এমন অনেক ভাষা আছে যেগুলোকে শ্রেণিবিন্যাসের আওতায় আনা যায়নি। পৃথিবীতে এমন অনেক ভাষা আছে যার কোন নিকট আত্মীয় পাওয়া যায়নি। যেমন-উত্তর স্পেন ও দক্ষিণ ফ্রান্সে প্রচলিত ‘বাস্ক’ ভাষা। এভাবে দু’একটি ভাষার প্রাচীন গোত্র-সম্পর্ক পাওয়া না গেলেও মোটামুটিভাবে বলা যায় পৃথিবীর যাবতীয় ভাষাকেই তথ্য-প্রমাণাদিসহ সম্পর্কিত করে এ পদ্ধতিতে শ্রেণিবিন্যাস করা সম্ভব হয়েছে।
ভাষার বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাসে বাংলা ভাষার অবস্থান:
বাংলা ভাষা প্রাকৃত ভাষা থেকে অপভ্রংশের মধ্যে দিয়ে উদ্ভত হয়েছে। তবে বাংলা, আগামী, উড়িয়া ভাষাগুলোর তুলনামূলক প্রাচীন বিবর্তনের ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে এদের আরও প্রাচীন স্তর রয়েছে। অর্থাৎ প্রাকৃত এবং তারও আগে প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার অন্তর্ভূক্ত। এরও প্রাচীনরূপ ইন্দো-ইরানীয়। এই ইন্দো-ইরানীয় আবার শতম শাখা এবং এই শতম শাখা আবার ইন্দো-ইউরোপীয় শাখার অন্তর্ভূক্ত। তাহলে দেখা যাচ্ছে বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্যতম শাখা ইন্দো-ইরানীয় শাখার একটি।
মূল ভাষা থেকে বিবর্তিত ভাষার শাখা বিন্যাসের মাধ্যমে আধুনিক বাংলার পরিবর্তন নির্দেশ করা সম্ভব।
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী
(শতম ও কেন্তুম বিভাজনসহ সম্পূর্ণ বংশপীঠিকা ছক)
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী
│
┌────────────────────┴────────────────────┐
│ │
কেন্তুম (Centum) শতম (Satem)
│ │
┌─────────────┼─────────────┐ ┌───────────────┼───────────────┐
│ │ │ │ │ │ │
গ্রিক ইটালিক জার্মানিক ইন্দো-ইরানীয় আর্মেনীয় বাল্টো-স্লাভেনীয় │
│ │ │
│ │ আলবেনীয়
│ │
(ফরাসি, স্পেনীয়, │
পর্তুগীজ ইত্যাদি) │
│
┌──────┴──────┐
│ │ │
ভারতীয় আর্য ইরানীয় আর্য দারদিক
│
┌─────────────────────┴─────────────────────┐
│ │ │
ভারতীয় আর্য প্রাচীন ভারতীয় আর্য নব্য ভারতীয় আর্য
│ │
(সংস্কৃত) (আধুনিক ভাষা)
│
মধ্য ভারতীয় আর্য
│
┌───────────────────────────┼───────────────────────────┐
│ │ │
পালি প্রাকৃত অপভ্রংশ
│
┌─────────────────────────┴─────────────────────────┐
│ │
গৌড়ীয় প্রাকৃত মাগধী প্রাকৃত
│
┌────────┴────────┐
│ │
বঙ্গী কামরূপী
│ │
বাংলা অসমীয়া
বাংলা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর শতম শাখাভুক্ত।
শতম শাখার ইন্দো-ইরানীয় গোষ্ঠী থেকে ভারতীয় আর্য ভাষার বিকাশ ঘটে।
প্রাচীন ও মধ্য ভারতীয় আর্যের ধাপ অতিক্রম করে গৌড়ীয় প্রাকৃত → বঙ্গী উপভাষা থেকে আধুনিক বাংলা ভাষার জন্ম।
উপসংহার
ভাষার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে ভাষা একটি জীবন্ত সত্তা, যা সময় ও সমাজের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। ভাষার শ্রেণিবিন্যাসের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে বংশানুক্রমিক পদ্ধতিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, কারণ এটি ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশের ধারাকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ভাষাকে বিচ্ছিন্ন কোনো উপাদান হিসেবে নয়, বরং একটি বৃহৎ ভাষাপরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
বাংলা ভাষার স্থান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এই শ্রেণিবিন্যাস বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর শতম শাখার অন্তর্গত ইন্দো-ইরানীয় গোষ্ঠী থেকে ভারতীয় আর্য ভাষার উদ্ভব ঘটে। প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষা সংস্কৃতের মধ্য দিয়ে যে ভাষাধারা প্রবাহিত হয়, তা মধ্য ভারতীয় আর্য পর্যায়ে এসে প্রাকৃত ও পালির রূপ লাভ করে। এই স্তর থেকেই অপভ্রংশ ভাষার জন্ম হয়, যা আবার গৌড়ীয় প্রাকৃতের মাধ্যমে বঙ্গ ও কামরূপী ধারায় বিভক্ত হয়ে আধুনিক বাংলা ও অসমীয়া ভাষার ভিত্তি স্থাপন করে।
এই দীর্ঘ বিবর্তন প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে বাংলা ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক সৃষ্টি নয়। এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা একটি সমৃদ্ধ ভাষা, যার মধ্যে বহু স্তরের ভাষাগত স্মৃতি ও ঐতিহ্য সঞ্চিত রয়েছে। ভাষার এই ধারাবাহিকতা অনুধাবন করলে বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার, ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য ও ব্যাকরণিক গঠনের পেছনের কারণগুলোও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলা ভাষার বংশানুক্রমিক পরিচয় কেবল ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। এই ভাষার মাধ্যমে একটি জাতির ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও সামাজিক অভিজ্ঞতা প্রকাশ পেয়েছে। তাই বাংলা ভাষার স্থান নির্ণয় মানে শুধু একটি ভাষার অবস্থান চিহ্নিত করা নয়, বরং একটি সভ্যতার ধারাবাহিক উত্তরাধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া।
পরিশেষে বলা যায়, ভাষার বংশানুক্রমিক শ্রেণিবিন্যাস আমাদেরকে ভাষার শিকড় চিনতে শেখায়। এই শিকড়ের গভীরতা যত বেশি অনুধাবন করা যায়, ভাষার বর্তমান রূপ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষা তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রার মধ্য দিয়ে আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছে, তা এই ধারাবাহিক বিবর্তনেরই স্বাভাবিক ফল।