পয়ার ছন্দের শাখা-প্রশাখা- অক্ষরবৃত্ত ছন্দের রূপ বৈচিত্র্য।

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর
খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা:

ভূমিকা

বাংলা ছন্দের ইতিহাসে অক্ষরবৃত্ত ছন্দ একটি মৌলিক ও প্রাচীন কাঠামো হিসেবে পরিচিত। এই ছন্দের ভেতরে যে রূপগত বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়, তা মূলত তার শাখাপ্রশাখা বিস্তারের মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অক্ষরের সংখ্যা ও বিন্যাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ছন্দের শাখাপ্রশাখা বাংলা কাব্যভাষাকে দিয়েছে দৃঢ় কাঠামো ও সংগীতধর্মী সৌন্দর্য। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত কবিরা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা ব্যবহার করে ভাব, অনুভূতি ও কল্পনাকে সুশৃঙ্খল রূপ দিয়েছেন। বিশেষত পয়ার ছন্দের শাখাপ্রশাখা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের রূপ বৈচিত্র্যকে আরও বিস্তৃত করেছে।

ছন্দ কেবল কবিতার অলংকার নয়; এটি ভাষার শ্বাস-প্রশ্বাস। সেই শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দোময় প্রকাশ ঘটেছে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা বিন্যাসের মধ্য দিয়ে। প্রতিটি শাখাপ্রশাখা একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চললেও ভাবপ্রকাশে স্বাধীনতা এনে দেয়। এই কারণেই অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘকাল ধরে টিকে আছে। পয়ার, ত্রিপদী, চৌপদী প্রভৃতি রূপের শাখাপ্রশাখা কবিকে দিয়েছে গঠনগত নিয়ন্ত্রণ ও শিল্পীসত্তার স্বাচ্ছন্দ্য।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, কীভাবে একটি মূল কাঠামো থেকে নানা রূপের জন্ম হয়েছে। এই শাখাপ্রশাখা কেবল ছন্দের ভিন্নতা নয়, বরং ভাষার ব্যবহারিক ও নান্দনিক সম্ভাবনার দিকনির্দেশনা। তাই অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা আলোচনা বাংলা ছন্দচর্চার একটি অপরিহার্য অধ্যায়। নিম্নে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা-প্রশাখা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা:

সংস্কৃত ‘পজঝটিকা’ (প্রাকৃত) পাদাকুলক ছন্দ থেকে ‘পয়ার’ শব্দটি উদ্ভব হয়েছে। আসলে পয়ার অক্ষরবৃত্তের প্রাচীন নাম। সমগ্র মধ্যযুগের সাহিত্যের একচ্ছত্র বাহন হিসেবে ‘পয়ার জাতীয় ছন্দ’ বা অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা ব্যবহৃত হয়েছে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মূল কাঠামোকেই সাধারণভাবে পয়ার নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

ব্যাপক অর্থে পয়ার একটি ছন্দরীতি। কিন্তু সংকীর্ণ অর্থে পয়ার একটি পর্ববন্ধের নাম। অবশ্য অনেকে পয়ার বলতে আলাদা কোন ছন্দ প্রকৃতি বা রীতি বলতে রাজী নন। তাদের মতে পয়ার এক ধরণের ছন্দ-বন্দের নাম। পয়ার ছন্দের গঠন প্রকৃতি সম্পর্কে সত্যেন্ত্রনাথ দত্ত তাঁর ছন্দ স্বরস্বতীতে বলেছেন-

‘ আট ছন্দ আট ছয়
পয়ারের ছাদ কয়।

প্রবোধ সেনের মতে“ যে ছন্দোবন্দের দুই পদে যথাক্রমে আট ও ছয় মাত্রা থাকে তারই দীর্ঘকালীন প্রয়োগসিদ্ধ নাম পয়ার। তাঁর মতে শুধুমাত্র আট ও ছয় মাত্রার দ্বিপদী ছন্দই পয়ার।

পয়ারের প্রত্যেক চরণে মাত্রাসংখ্যা থাকে চৌদ্দ। প্রতি চরণে দুটি পর্ব থাকে। প্রথম পর্ব আট মাত্রা এবং দ্বিতীয় পর্বে ছয় মাত্রা হয়। দুটি চরণ মিলে একটি ¯তবক হয়। চরণ দুটির শেষে মিল বা অšত্যানুপ্রাস থাকে। প্রথম পর্বের পরে অর্ধযতি পড়ে। দ্বিতীয় পর্বের পরে পূর্ণযতি পড়ে। এতে একটি ভাবের বা বিষয়ের আংশিক বা সামগ্রিক সমাপ্তি ঘটে।

সাত কোটি সন্তানের /হে মুগ্ধ জননী//
রেখেছো বাঙ্গালী করে/মানুষ করনি//

এখানে চৌদ্দ মাত্রার চরণে দুটি করে পর্ব। ১ম পর্ব আট মাত্রার এবং ২য় পর্ব ছয় মাত্রার। চরণের শেষে মিল রয়েছে। যেমন জননী ও ‘করনি’। ১ম চরণের পর্বের ৮+৬ মাত্রা বিন্যাসের সাথে ২য় চরণের ৮+৬ মাত্রার পর্ব বিন্যাসের মিল রয়েছে।
এখানে একটি ভাবেরও সম্পূর্ণ সমাপ্তি ঘটেছে। তাই এ চরণ দুটি পয়ারের দৃষ্টাšত। অক্ষরবৃত্তের অন্তর্গত বলে এর লয়ও সব সময় ধীর।
পয়ারের চরণান্তে মিল থাকে বলে একে মিত্রাক্ষর ছন্দ বলা হয়ে থাকে।

পয়ারের বৈশিষ্ট্য আলোচনা শেষে আমরা বলতে পারি যে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অন্তর্গত যে মিত্রাক্ষর চরণে প্রথম পর্ব আট মাত্রার এবং দ্বিতীয় পর্ব ছয় মাত্রার এবং যাতে একটি ভাবের আংশিক বা সামগ্রিক সমাপ্তি ঘটে থাকে তার নাম পয়ার।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: পয়ার ও তার প্রকারভেদ

পয়ারের শ্রেণী ভাগ : আয়তন ভেদে পয়ার দু প্রকার :  (১) লঘু পয়ার ও (২) দীর্ঘ পয়ার বা মহাপয়ার।

১। লঘু পয়ার: পয়ার সম্পর্কে যা আলোচিত হয়েছে, অর্থাৎ পয়ার বলতে যা বুঝি তাই লঘু পায়ার। ৮+৬ মাত্রার পর্ব ভাগের দুটি চরণের নাম পায়ার, যার শেষে অšতমিল থাকে। আর এই পায়ারকে লঘু পায়ার বলে। পয়ার সমিল হতে পারে আবার অমিলও হতে পারে।

২। দীর্ঘ পয়ার বা মহাপয়ার: পয়ারের সব বৈশিষ্ঠ্য বিদ্যমান; শুধু চরণের শেষ পর্বটি ছয় মাত্রার না হয়ে দশ মাত্রার হয়। অর্থাৎ, মহাপয়ারের দুটি চরণ। চরণ শেষে মিল থাকে। প্রতি চরণে দুটি পর্ব। ১ম পর্ব ৮ মাত্রার এবং শেষপর্ব ১০ মাত্রার। এখানে একটি ভাব বা বিষয়ের আংশিক বা সমাপ্তি ঘটে।
পয়ারের মাত্রবিন্যাস ৮+৬, মহাপয়ারের মাত্রা বিন্যাস ৮+১০।

(১) ধ্বনি খুঁজে প্রতিধ্বনি/ প্রাণ খুজে মরে প্রতি প্রাণ//৮+১০
জগৎ আপনা দিয়ে/ খুঁজিছে তাহার প্রতিদান // ৮+১০
(২) তাদের সকল আলো/ একদিন নিভে গেলে পরে //৮+১০
তুমিও কি ডুবে যাবে/ ওগো প্রেম পশ্চিম সাগরে?//৮+১০

এখানে প্রতি চরণে ৮+১০ মাত্রার পর্ব বিন্যাস। অšতমিল রয়েছে। অর্থাৎ মিত্রাক্ষর চরণ। একটি ভাবেরও সম্পূর্ণ সমাপ্তি ঘটেছে। তাই এরা মহাপায়ারের দৃষ্টাšত।
মহাপয়ার সমিল ও অমিল দুই প্রকার হতে পারে।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: সমিল ও অমিল মহাপয়ার

১) সমিল মহাপয়ার: মহাপয়ারের চরণের সাথে চরণের অšতমিল থাকে, তাকে সমিল মহাপয়ার বলে। আগের দৃষ্টাšত দুটি সমিল মহাপয়ারের দৃষ্টাšত।
(২) অমিল মহাপয়ার: যে মহাপয়ারে চরণের শেষে অšতমিল থাকে না, তাকে অমিল মহাপয়ার বলে। মহাপয়ারের আর সব বৈশিষ্ট্য ঠিক থাকে। যেমন-


এই বাণী গাব আমি/প্রভাতী প্রথম জাগা পাখী//
যে সুর ঘোষণা করে/আপনাতে আনন্দ আপন//

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখা-প্রশাখা হিসেবে যে পয়ার ছন্দের প্রতি চরণে দুটি পর্ব থাকে এবং পর্বের মাত্রা বিন্যাস হয় আট ও দশ, সেই সাথে একটি ভাবের সমাপ্তি ঘটে, তাকে মহাপয়ার বা দীর্ঘ পয়ার বলে। মহাপয়ার মিত্রাক্ষর বা অমিল দুইই হতে পারে।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা:

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের গঠন-বৈশিষ্ট্য: পয়ারের রূপ বৈশিষ্ট্য: অক্ষর বৃত্ত ছন্দের প্রধান শাখার নাম পয়ার। তবে পয়ার বলতে সাধারণত আট-ছয় মাত্রার লঘু পয়ারকেই বোঝায়। চরণের মাত্রা সংখ্যা ও চরণের মাত্রায় বা পর্বের মিলবিন্যাসের দিকে থেকে পয়ারের কিছু রূপভেদ বৈচিত্র্য রয়েছে। সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: মাত্রাবিন্যাসের দিক থেকে

মাত্রা বিন্যাসের দিক থেকে পয়ার ঃ
(ক) একাবলী: পয়ার সাধারণত ৮+৬ মাত্রার পর্ব বিন্যাস থাকে এবং মাত্রা সংখ্যা প্রতি চরণে ১৪। কিন্তু প্রতি চরণে যদি ১১ মাত্রা থাকে এবং তাদের মাত্রা বিন্যাস ৬+৫ বা ৮+৩ হয় তাহলে তাকে একাবলী বলে। চরণের সাথে চরণের অšতমিল থাকে।


বড়র পিরীতি/বালির বাঁধ// ৬+৫
ক্ষণে হাতে দড়ি/ক্ষণেকে চাঁদ// ৬+৫

(খ) দীর্ঘ একাবলী ঃ একাবলী ছন্দ যদি ১১ মাত্রার চরণ না হয়ে ১২ মাত্রার হয় এবং মাত্রা বিন্যাস যদি ৬+৬ হয়, তাহলে তাকে দীর্ঘ একাবলী বলে। একাবলীর আর সব বৈশিষ্ট্য বর্জায় থাকে। চরণ মিত্রাক্ষর হয় চরণে দুটি পর্ব। যেমন-

রাজা জাগি ভাবে/বৃথা রাজ্য ধন//
গৃহী ভাবে মিছা/তুচ্ছ আয়োজন//

(গ) একপদী বা এক পার্বিক: অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখার এ ছন্দে নিয়মিত ভাবে এক পার্বিক চরণ দ্বারা কবিতা লেখা হয়। অর্থাৎ এই ছন্দে প্রতি চরণে বা পংক্তিতে একটি মাত্র পর্ব থাকে। আর এ পর্বের মাত্রা সংখ্যা হয় আট।

যে যেমন তার ঘরে
তেমনি মুরতি ধরে,
মানবের কাছ কাছে
সদা সে মোহিনী আছে।

(ঘ) দিগক্ষরা: যে একপদী বা এক পার্বিক পংক্তিতে মাত্রা সংখ্যা দশ তাকে ‘দিগক্ষরা ছন্দ বলে’ অথাৎ ১০ মাত্রা বিশিষ্ট এক পার্বিক ছন্দকে দিগক্ষরা বলে। প্রতি চরণ দুই পর্বের এবং তার মাত্রা সংখ্যা ১০। এক পংক্তিই এক পর্ব। চরণে দুটি পংক্তি।

চলিয়াছে দুরাশার স্রোত/
বুকে তার বহু ভগ্ন পোত// (সুকান্ত ভট্রাচার্য)

অথবা,
লুটে লও ভরিয়া অঞ্চল/
জীবনের সকল সম্বল// (রবীন্দ্রনাথ)

যে বিশেষ পয়ারের প্রতি চরণে দশ-দশ ক্রমে পর্বের মাত্রাবিন্যাস থাকে তাকে দিগক্ষরা বলে।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: —মিল বিন্যাসের দিক থেকে পয়ার:

১) তরল পয়ার ঃ মধ্যযুগের যে পয়ারে চরনাšত মিল ছাড়াও আট মাত্রার পর্বে ৪র্থ ও অষ্টম অক্ষরে অতিরিক্ত মিল থাকে, তাকে তরল পয়ার বলে। তরল পয়ারে লঘু পয়ারের সমস্ত বৈশিষ্ট্যই থাকে।
যেমন- দুটি চরণ থাকে। চরণে দুটি পর্ব এবং তাদের মাত্রাবিন্যাস আট ও ছয়। অšতমিল থাকে। একটি ভাবেরও সমাপ্তি ঘটে। তবে অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চরণের চতুর্থ ও অষ্টম অক্ষরে মিল থাকে।

দেখ দ্বিজ মনসিজ/ জিনিয়া মুরতি।// ৮(৪ঃ৪)+৬
পদ্ম পত্র যুগ্মনেত্র/ পরশয়ে শ্রুতি।।// ৮(৪ঃ৪)+৬

অথবা,

অনুপম অনুসম/ নৗলোৎপল আভা।//
মুখরুচি কত শুচি / করিয়াছে শোভা।//

এখানে চরণের শেষে মিল আছে। ৮+৬ পর্বের চরণ। অতিরিক্ত হিসাবে প্রথম ৮ মাত্রার পর্বে ৪ মাত্রার জোড়ে অর্থাৎ ৪র্থ অক্ষরের সাথে ৮ম অক্ষরের মিল। যেমন- দ্বিজ-সিজ পত্র- নেত্র, পম- সম রুচি- শুচি। তাই এটি তরল পয়ার।

(২) মালঝাঁপ পয়ার:
মধ্যযুগের যে পয়ারে পয়ারের সমস্ত বৈশিষ্ট্য নিয়েও যদি ৪র্থ ৮ম ১২তম অক্ষরে অতিরিক্ত মিল থাকে তবে তাকে মালঝাঁপ পয়ার বলে। মালঝাঁপ পয়ারে পয়ারের সব বৈশিষ্ঠ্য বিদ্যমান থাকে। যেমন-

গুণহীন চিরদিন / পরাধীন রয়।
নাহি সুখ ম্লান মুখ/ চিরদুখ সয়//

এখানে দুটি চরণ। প্রতি চরণে পর্ব। অšতমিল রয়েছে। পর্ববিন্যাস আট ও ছয়। ভাবের সমাপ্তি ঘটেছে। অতিরিক্ত মিল রয়েছে ৪র্থ, ৮ম ও ১২ তম অক্ষরে। তাই এটি মালঝাঁপ পরায়।

৩) পর্যায়সম পয়ার:  যে পরায় ছন্দে ১ম চরণের সাথে ৩য় চরণের এবং ২য় চরণের সাথে ৪র্থ চরণের অšতমিল থাকে তাকে পর্যায়সম পয়ার বলে। পয়ারে যেখানে পরপর চরণে অšতমিল থাকে পর্যায়সম পয়ারে সেখানে ১ম ও ৩য় চরণে এক ধরণের অšতমিল এবং ২য়ও ৪র্থ চরণে অন্যএক প্রকার অšতমিল থাকে। পয়ারের মত এখানেও প্রতি চরণ দু পর্বের। মাত্রা বিন্যাস আট ও ছয়।

           মরিতে চাহিনা আমি/সুন্দর ভূবনে,// ৮+৬ = ক
           মানবের মাঝে আমি/বাঁচিবারে চাই// ৮+৬ = খ
           এই সূর্যকরে, এই/পুষ্পিত কাননে,// ৮+৬ = ক
           জীবšত হৃদয়- মাঝে/ যদি স্থান পাই// ৮+৬= খ

৪) মধ্যসম পয়ার: পয়ারের সব বৈশিষ্ট্যসহ যে পয়ার ছন্দে অšতমিলের দিক থেকে পর পর চরণের অšতমিল না থেকে ১ম চরণের সাথে ৪র্থ চরণের এক রকম মিল এবং ২য় চরণের সাথে ৩য় চরণের আর এক প্রকার অšতমিল থাকে, তাকে মধ্যসম পয়ার বলে। এ ছন্দেও পয়ারের মতো দুই পর্বের চরণ। মাত্রাবিন্যাস আট ও ছয়। যেমন-

প্রভাব হইল নিশি/ হাতে লয়ে থালা// ৮+৬= ক
পুরিত উদ্যান সার/ সুরসাল ফলে//৮+৬= খ
ধরে ধীরে উপনীত/ বকুলের তলে//৮+৬= খ
ধনশালী কোন এক/বণিকের বালা//৮+৬= ক

(৫) হীনপদ পয়ার: যে পয়ার ছন্দের প্রথম চরণ আট মাত্রার এবং দ্বিতীয় চরণ চৌদ্দ মাত্রার হয় তাকে হীনপদ পয়ার বলে। এ পয়ার ছন্দে অšতমিল থাকে। যেমন-

ধনী বিনত বদনে// ৮
এসো এসো বলি/ তোষে সম্বোধনে// ৮+৬

এখানে প্রথম চরণে আট মাত্রার একটি পর্ব। দ্বিতীয় চরণে আট ও ছয় মাত্রার দুটি পর্ব।

(৬) ভঙ্গ পয়ার: হীনপদ পয়ারের প্রথম চরণের আট মাত্রার পর্বের পুনরাবৃত্ত হলে তাকে ভঙ্গ পয়ার বলে। হীনপদ পয়ারে ১ম চরণ আট মাত্রার এবং দ্বিতীয় চরণ আট ও ছয় মাত্রার দুটো পর্ব
থাকে। চরণে অšতমিল থাকে। ভঙ্গ পয়ারে হীনপদ পয়ারের ১ম চরণ দুবার লেখা থাকে। যেমন ঃ

শুন রাজা মহাশয়/ শুন রাজা মহাশয়।//৮+৮
চোরের কথায় কোথা /কে কারে প্রত্যয়।//৮+৬

এখানে প্রথম চরণে ৮ মাত্রার পর্বের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। দ্বিতীয় চরণে আট ও ছয় মাত্রার দুটি পর্ব। চরণের শেষে মিল আছে। তাই এটা ভঙ্গ পয়ার।

(৭) মালতী ঃ পয়ার অর্থাৎ লঘু পয়ারে চরণের মাত্রা সংখ্যা হয় ১৪। আট ও ছয়ের দুটি পর্ব থাকে। চরণ শেষে অšতমিল থাকে। এই লঘু পয়ারের চরণে মাত্রা সংখ্যা যদি ১৫ হয় তবে তাকে মালতি বলে। অর্থাৎ পয়ার থেকে এক মাত্রা বেশি থাকে। যেমন ঃ

তেজস্বীর তেজ সয়/তত দুঃখ হয় না। ৮+৭
তার তেজে যার তেজ/তার তেজ সয় না।। ৮+৭

এখানে প্রতি চরণের শেষ পর্ব ছয় মাত্রার না হয়ে সাত মাত্রার হয়েছে। অর্থ্যাৎ ১৪ মাত্রার চেয়ে এক বেড়ে ১৫ মাত্রার হয়েছে।

বিশাখা পয়ার: পয়ারের প্রতি চরণের মাত্রাসংখ্যা ১৪ এর চেয়ে বেশি হলে হয় মালতী। আর এই মালতী পয়ারের পরে ছয় মাত্রা যোগ হলে বিশাখা পয়ার হয়। যেমন –

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে ৮+৭
কে বাঁচিতে চায়? ৬
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে ৮+৭
কে পরিবে পায় ? ৬

আধুনিক কালে এই জাতীয় ছন্দকে অক্ষরবৃত্তের অসম-পার্বিক ত্রিপদী ছন্দ বলে।

(৯) কুসুম মালিকা: পয়ার ছন্দ অর্থাৎ লঘু পয়ার ছন্দের সাথে এক মাত্রা যোগ হলে হয় মালতী। মালতীর সাথে ছয় মাত্রা যোগ হলে হয় বিশাখা। আর লঘু পয়ার ছন্দের সাথে দুই মাত্রা যোগ হলে তাকে কুসুম মালিকা বলে। কুসুম মালিকার চরণে মোট ১৬ মাত্রা থাকে।

পিক করে কুহু কুহু/নৃপ করে উহু উহু।
বায়ু করে হুহু হুহু/দেহ দহে মুহুর্মুহু।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: ত্রিপদী

ত্রিপদী: অক্ষর বৃত্তের যে ছন্দে প্রতি চরণে তিনটি করে পর্ব। দুই চরণের মধ্যে অšতমিল থাকে এবং প্রতি চরণের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বেও অšতমিল থাকে তাকে ত্রিপদী ছন্দ বলে।

ত্রিপদী দুই প্রকার (১) লঘু ত্রিপদী (২) দীর্ঘ ত্রিপদী

লঘু ত্রিপদী ঃ যে ত্রিপদী ছন্দে চরণের প্রথম দুপর্ব ছ’ মাত্রার, তৃতীয় পর্বটি আট মাত্রার এবং ত্রিপদী ছন্দের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও বজায় থাকে তাকে লঘু ত্রিপদী ছন্দ বলে।
যে জন দিবসে/ মনের হরষে/
জ্বালায় মোমের বাতি// ৬+৬+৮
আশু গৃহে তার/ দেখিবে না আর/
নিশিতে প্রদীপ ভাতি// ৬+৬+৮
এখানে দুটি চরণে অন্ত্যমিল রয়েছে। প্রতি চরণে তিনটি করে পর্ব, প্রতি চরণের ১ম পর্বের সাথে ২য় পর্বের অšতমিল রয়েছে, মাত্রা বিন্যাস ৬+৬+৮। অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অšতর্গত এই ধরনের কবিতা রীতির নাম ত্রিপদী। আর এটি লঘু ত্রিপদী।

দীর্ঘ ত্রিপদী ঃ যে ত্রিপদী ছন্দে প্রতি চরণের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব আট মাত্রার শেষ পর্ব দশ মাত্রার এবং ত্রিপদী ছন্দের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও বজায় থাকে, তাকে ত্রিপদী ছন্দ বলে।

বলো না কাতর স্বরে/ বৃথা জন্ম এ সংসারে/
এ জীবন নিশার স্বপন// ৮+৮+১০
দ্বারা পুত্র পরিবার/ তুমি কার কে তোমার/
বলে জীব করো না ক্রন্দন// ৮+৮+১০

এখানে দুটি চরণে অšতমিল রয়েছে, প্রতি চারণে তিনটি করে পর্ব, প্রতি চরণের ১ম পর্বের সাথে ২য় পর্বের অšতমিল রয়েছে। মাত্রা বিন্যাস ৮+৮+১০। এটি দীর্ঘ ত্রিপদী।

বি: দ্র: – ত্রিপদী ছন্দের মূল মিল হয় চরণাšেত। পাশাপাশি দুটি পর্বে মিল থাকতেও পারে, আবার নাও থাকতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মিল দেখা গেলেও ১ম পর্বের সাথে ২য় পর্বের মিল না থাকার দৃষ্টাšত পাওয়া যায়-
ঢলঢল কাঁচা/ অঙ্গের লাবনী/
অবনী বহিয়া যায়// ৬+৬+৮
ঈষৎ হাসির/ তরঙ্গ-হিলোলে/
মদন মুরুছা যায়// ৬+৬+৮
অথবা,

মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন
হয়েছেন প্রতি স্মরনীয়, ৮+৮+১০
সেই পথ লক্ষ্যকরে- স্বীয় কীর্তি বৈজাধরে
আমরাও হব বরনীয় । ৮+৮+১০

এটি দীর্ঘ ত্রিপদীর উদাহরণ ।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: চৌপদী

চৌপদী ঃ অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অšতর্গত যে ছন্দে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব চরণাšত অšতমিল এবং প্রতি চরণের প্রথম তিনটি পর্বেরও অšতমিল থাকে, তাকে চৌপদী ছন্দ বলে।
পর্বে মাত্রা ব্যবহারের রীতি অনুযায়ী চতুর্থপদী বা চৌপদী ছন্দকে দুটি ভাগ করা হয়ে থাকে। লঘু ও দীর্ঘ চৌপদী।
লঘু চৌপদী ঃ অক্ষর বৃত্ত ছন্দের অšতর্গত যে ছন্দে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব, চরনাšেত অšতমিল, প্রতি চরণে প্রথম পরপর তিনটি পর্বেও অšতমিল এবং প্রথম তিনটি পর্বের মাত্রা ছয়, শেষ পর্বের মাত্রা সংখ্যা তার চেয়েও কম হয়, তাকে লঘু চৌপদী বলে।

চিরসুখী জন /ভ্রমে কি কখন/
ব্যথিত বেদন /বুঝিতে পারে ?// ৬+৬+৫+৫
কি যাতনা বিষে /বুঝিবে সে কিসে/
কভু আশীবিষে /দংশেনি সারে ?// ৬+৬+৬+৫

এখানে প্রতিটি চরণেরই চারটি করে পর্ব। প্রথম তিনটি পর্ব পরস্পর মিলযুক্ত ও ছ মাত্রার, শেষ পর্বটি পাঁচ মাত্রার। দুটি চরণই অšতমিল যুক্ত। তাই এ চরণ দুটি লঘু চৌপদীর উদাহরণ।

দীর্ঘ চৌপদী ঃ অক্ষরবৃত্ত ছন্দের অšতর্গত যে ছন্দে প্রতি চরণে চারটি করে পর্ব, চরনাšেত অšতমিল, প্রতি চরণের প্রথম তিনটি পর্ব পরস্পর মিলযুক্ত এবং চরণের চারটি পর্বের মধ্যে প্রথম তিনটি আট ও শেষ পর্বটি হয় তার চেয়েও কম মাত্রার তার নাম দীর্ঘ চৌপদী। (৮+৮+৮+৭) (৮+৮+৮+৬) (৮+৮+৮+৫)

নীলাম্বরে কিবা কাজ / তীরে ফেলে এসো আজ/
ঢেলে দেব সব লাজ / সুনীল জ্বলে।// ৮+৮+৮+৫
সোহাগ তরঙ্গ রাশি / অঙ্গখানি দিবে গ্রাসি/
উচ্ছ¡সি পড়িবে আসি / উরসে গলে।//৮+৮+৮+৫

এখানে এই দুটি চরণে চারটি করে পর্ব। প্রথম তিনটি পর্ব আট মাত্রার এবং পরস্পর মিলযুক্ত। শেষ
পর্বটি পাঁচ মাত্রার। চরণ দুটি মিলযুক্ত।

কেবা মত্য কেবা মিছে/ নিশিদিন আকুলিছে/
কভু ঊর্দ্ধে কভু নিচে/ টানিছে হৃদয়ে// ৮+৮+৮+৬
জড় দৈত্য শক্তি হানে/ মিনতি নাহিকমানে/
প্রেম এসে কোলে টানে / দূর করে ভয়।// ৮+৮+৮+৬

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: — গৈরিশ ছন্দ
অভিনেতা-নাট্যকার গিরিশচন্দ্র গোষ পৌরাণিক নাটকের সংলাপ সৃষ্টির জন্য অক্ষরবৃত্তের অšতর্গত অমিত্রাক্ষর ছন্দকে ভেঙ্গে অসম পর্ব, পংক্তি ও চরণের বিশেষ বিন্যাসে যে ছন্দরীতির প্রবর্তন করেন তাকে গৈরিশ ছন্দ বলা হয়।

গৈরিশ ছন্দও এক প্রকার অমিত্রাক্ষর ছন্দ। এই ছন্দকে ভঙ্গ অমিত্রাক্ষর বলা যেতে পাারে। গৈরিশ ছন্দের দ্বারা বাংলা ছন্দের অতিরিক্ত মুক্তি সাধিত হয়েছে। গৈরিশ ছন্দকে মধুসূদনের অমিত্রাক্ষর এবং রবীন্দ্রনাথের মুক্তক ছন্দের মধ্যবর্তী পর্যায়ে স্থান দেওয়া যায়। এখানে অমিত্রাক্ষরের প্রবহমানতাকে কাজে লাগিয়ে পংক্তির মাত্রাসংখ্যাকে অসমান করা হয়েছে।

বৈশিষ্ঠ্য ঃ
(১) এর লয় ধীর
(২) পয়ারের স্বাভাবিক যতি ও পর্ব বিন্যাস এতে মানা হয় নি। অসমপার্বিক এবং যতি পড়ে ভাব অনুযায়ী।
(৩) সংলাপের প্রয়োজন অনুযায়ী এতে পর্ব ,পংক্তি ও চরণ বিন্যা¯ত।
(৪) পংক্তি ও চরণ সব সময় মিলহীন।
(৫) প্রবহমানতা আছে।
(৬) পুুরাতন পন্থী সাধুভাষাই এতে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।
(৭) প্রধানত পৌরাণিক নাটকের ভক্তিরসই এর বিশেষ উপজীব্য।

ব্যস তব / দর্শন আশায় // ৪+৬
প্রতীক্ষায় বহুদিন / আছি কাশী ধামে। // ৮+৫
শান্তিদাতা / বৈরাগ্য তোমায়। // ৪+৬
বিবেক বৈরাগ্য / তব সাথী তুমি, // ৬+৪
বিরক্ত সন্ন্যাসী তুমি,// ৮+০
সাহায্যে তোমায় // ০+৬
বহু কার্য / কবির উদ্ধার। // ৪+৬
এখানে ভাব চরণ থেকে চরণাšতরে স্বচ্ছন্দে প্রবহমান। লয় ধীর, অক্ষরবৃত্তে বিন্যা¯ত এর পংক্তিগুলো
অসম মাত্রার। পর্বও অসম, চরণও অসম।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: পয়ার

দেখেছি সবুজ পাতা/ অঘ্রাণের অন্ধকারে/ হয়েছে হলুদ,// ৮+৮+৬
হিজলের জানালায় /আলো আর বুলবুলি /করিয়াছে খেলা,// ৮+৮+৬
ইঁদুর শীতের রাতে/ রেশমের মত রোমে /মাখিয়াছে খুদ,//৮+৮+৬
চালের ধূসর গন্ধে/ তরঙ্গেরা রূপ হয়ে/ ঝরেচে দু’বেলা। //৮+৮+৬

অক্ষরবৃত্তের পয়ার ছন্দ। চার পংক্তির একটি স্তবক। লয় ধীর। প্রতি চরণে তিনটি করে পর্ব। পর্বের মাত্রাবিন্্যাস ৮,৮ ও ৬। মিলবিন্যাসে সনেটের বিশেষ রীতি অনুসরণ করা হয়েছে ।

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: অমিত্রাক্ষর

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: মুক্তক ছন্দ

অক্ষরবৃত্তের শাখা-প্রশাখা: গদ্য ছন্দ

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্বের মূল কারণ তার সুগঠিত শাখাপ্রশাখা বিন্যাস। এই শাখাপ্রশাখা বাংলা কবিতাকে দিয়েছে নিয়ম ও স্বাধীনতার ভারসাম্য। পয়ার ছন্দের শাখাপ্রশাখা বিশেষভাবে অক্ষরবৃত্ত ছন্দের রূপ বৈচিত্র্যকে সুস্পষ্ট করেছে। প্রতিটি শাখাপ্রশাখা ছন্দকে করেছে সমৃদ্ধ, গ্রহণযোগ্য ও যুগোপযোগী।

অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা আমাদের দেখায় কীভাবে একটি নির্দিষ্ট অক্ষরসংখ্যার কাঠামো নানা ছন্দরূপে বিকশিত হতে পারে। এই শাখাপ্রশাখা না থাকলে বাংলা ছন্দ হতো একরৈখিক ও সীমাবদ্ধ। বরং শাখাপ্রশাখার মাধ্যমেই ছন্দ পেয়েছে প্রাণ ও চলমানতা। আধুনিক কবিতাতেও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা নতুন ব্যঞ্জনায় ফিরে আসে, যা তার শক্তি ও নমনীয়তার প্রমাণ।

অতএব বলা যায়, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা কেবল ছন্দতাত্ত্বিক আলোচনা নয়; এটি বাংলা কবিতার শিল্পমূল্য বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। শাখাপ্রশাখার এই রূপ বৈচিত্র্য বাংলা সাহিত্যকে করেছে ঐতিহ্যসম্মত ও সৃজনশীলতার ধারক। ভবিষ্যতেও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের শাখাপ্রশাখা বাংলা ছন্দচর্চায় প্রাসঙ্গিক ও অনিবার্য হয়ে থাকবে।

ছন্দের সংজ্ঞা ও প্রকারভেদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *