নীলদর্পণ – দীনবন্ধু মিত্র | গঠন-শৈলী | সংলাপগত বৈশিষ্ট্য / আখ্যানগত বৈশিষ্ট্য

প্রফেসর মো: আখতার হোসেন, বাংলা বিভাগ, সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজ, যশোর

নীলদর্পণ – দীনবন্ধু মিত্র

ভূমিকা :

নীলদর্পণ দীনবন্ধু মিত্রের এক যুগান্তকারী সামাজিক নাটক, যা ঔপনিবেশিক বাংলার কৃষকজীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে মঞ্চে তুলে ধরে। নীলদর্পণ নাটকটি নীলকর সাহেবদের অত্যাচার, শোষণ ও নির্যাতনের নির্মম চিত্র উপস্থাপন করে পাঠক ও দর্শকের বিবেককে নাড়া দেয়। ঔপনিবেশিক বাস্তবতায় নীলদর্পণ হয়ে ওঠে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর, যেখানে নাট্যরূপের আড়ালে সামাজিক দলিল রচিত হয়েছে।

গঠন-শৈলীতে নীলদর্পণ সরল অথচ শক্তিশালী কাঠামো গ্রহণ করেছে, যা ঘটনাপ্রবাহকে স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। সংলাপের ক্ষেত্রে নীলদর্পণ বাস্তব জীবনের ভাষাকে ধারণ করে, ফলে চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। আখ্যানগতভাবে নীলদর্পণ ক্রমান্বয়ে সংঘাতকে তীব্র করে তোলে এবং শোষণের গভীরতা উন্মোচিত করে। একই সঙ্গে নীলদর্পণ মানবিক বেদনা ও সামাজিক ক্ষোভকে এক সুতোয় গেঁথেছে।

নাট্যরূপে নীলদর্পণ কাহিনি ও সংলাপের ভারসাম্যে একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণ করে। এই কারণে নীলদর্পণ কেবল সাহিত্যকর্ম নয়, বরং সামাজিক প্রতিবাদের দলিল। বাংলা নাটকের ইতিহাসে নীলদর্পণ এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।

নাটকের ভূমিকাংশ শুরু হয় কীভাবে ?

নীলকর নিকর করে নীলদর্পণ অর্পণ করিলাম। এক্ষণে তাহারা নিজ ২ মুখ সন্দর্শন পূর্বক তাঁহাদিগের ললাটে বিরাজমান স্বার্থপরতা তিলক কলঙ্ক বিমোচন করিয়া তৎপরিবর্তে পরোপকার শ্বেতচন্দন ধারণ করুন তাহা হইলেই আমার পরিশ্রমের সাফল্য। নিরাশ্রয় প্রজা ব্রজের মঙ্গল এবং বিলাতের সুখ রক্ষা। …………..
কস্যচিৎ পথিকস্য

নীলদর্পণ নাটক বাস্তবজীবনাশ্রয়ী।
সরকারি কার্যোপলক্ষ্যে দীনবন্ধু বাংলাদেশের নানাস্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেসব অভিজ্ঞতা তাঁর গ্রন্থের মধ্যে প্রতিফলিত।
 নীলচাষকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন ভারতে জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসে প্রথম গণজাগরণ। নীলদর্পণ নাটক সেই গণজাগরণের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি।
নীলদর্পণ নাটক এক বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছিল।
নীলদর্পণ নাটক বাঙ্গালির সংগ্রামশীল মানসিকতার প্রতিবিম্ব।
নীলদর্পণ বাংলার নীলচাষীদের দীর্ঘকালের নির্যাতনের এক করুন কথাচিত্র।
 ১৮৩০ খ্রিঃ ৫ম আইনে বলা হয় দাদন গ্রহণকারী কৃষকদের নীলচাষ না করাটা হবে সম্পূর্ণভাবে বে-আইনী।
 নীল বিদ্রোহী কৃষকেরা তাদের নেতাদের ‘নানাসাহেব’ ও তাঁতিয়া টোপী নামে অভিহিত করতেন।

 লুঠতরাজ, গৃহদাহ, নারীনির্যাতন, পারিবারিক সম্ভ্রমহানি, নরহত্যা সমস্ত কিছুই অত্যাচারের অন্তর্ভূক্ত।
 ১৮৬০ সালে বেনামীতে প্রকাশিত নাটকে লেখা ছিল- নীলকর বিষধর দংশন কাতর প্রজানিকর ক্ষেমঙ্করেন কেনচিৎ পথিকে লাভ প্রণীতম।
 ‘নীলদর্পণ’ নাটককে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র বাংলার টৎপষব ওড়স’ং ঈধনরহ. টম কাকার কুটির আমেরিকার কাফ্রিদিগের দাসত্ব ঘুচিয়েছে। নীলদর্পণ নীলচাষীদের দাসত্ব মোচনে অনেকটা কাজ করেছে।


 নীলদর্পণ নাটকে নাট্যকারের অভিজ্ঞতা এবং সহানুভূতি পূর্ণ মাত্রায় ছিল। সাহিত্য জীবনের শুরু কাব্যর্চ্চার মধ্যে দিয়ে।
 নাট্যকারের রচনা ঃ নবীন তপস্বিনী (১৮৬৩), সধবার একাদশী (১৮৬৬) নাটক, জামাই বারিক (১৮৭০)। সুরধুনীকাব্য (১৮৭১) কমলে কামিনী ১৮৭৩
 টৎপষব ওড়স’ং ঈধনরহ আমেরিকার মহিলা ঔপন্যাসিক হেরিয়েট বিচার স্টো।
 ‘নীলদর্পণ’ নাটক উদ্দেশ্যমূলক রচনা। নিপীড়িত মানবাত্মার ক্রন্দন এতে ভাষা পেয়েছে। নীলকরদের অত্যাচারের ছবি ফুটিয়ে তোলা এবং নিপীড়িত কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে বিদ্রোহী করে তোলা।
 দীনবন্ধু মিত্র ছিলেন হিন্দু কলেজের ছাত্র।
 ‘হিন্দু পেট্রিয়ট’ পত্রিকা ঃ হরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় নীলচাষীদের অভাব অভিযোগকে সংগঠিত করে লিখতেন। ইংরেজ সরকার ‘ইন্ডিগো কমিশন’ গঠন করতে বাধ্য হয়। নীলকরদের অত্যাচারের কাহিনি উক্ত পত্রিকায় ছাপা হতো।
 নদীয়ার অন্তর্গত গুয়াতেলির মিত্র পরিবারের দুর্দশা ‘নীলদর্পণ’ উপাখ্যানটির ভিত্তিভূমি।


 নীলচাষের জন্য বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে সাহেবরা পত্তনি নিত। জমিদারেরাও পত্তনি নিতে বাধ্য হতেন। রায়ত সাধুচরণ ও জমিদার গোলক চন্দ্র ‘পত্তনি’র শিকার হয়ে করুণ পরিণতি বরণ করে।
 নীলসাহেবদের পত্তনির একটা করুণ বর্ণনা ঃ সাধুচরণ ও গোলকবসুর কথোপকথন। তিন বছর সাহেব পত্তনি নিয়েছে। গ্রাম ছারখার হয়ে গেছে। দক্ষিণপাড়ার মোড়লদের ১০ খানা লাঙল, ৩০/৪০ টা হালগরু ছিল, উঠান যৌড়দৌড়ের মাঠ, গোয়াল যেন পাহাড়, ৬০ খান পাত পড়তো, ধানের পালা সাজালে মনে হতো পদ্মফুল ফুটে আছে ‘চন্দন বিলে’। নীল চাষ না করার কারণে মেজো ও সেজো ছেলেকে ধরে নিয়ে মারধর করে। ছাড়াতে গিয়ে হালগরু সব বিক্রি হয়ে যায়। গ্রাম ছেড়ে চলে যায়। ভিক্ষে করে খাবে, তবু তারা গাঁয়ে আর ফিরবে না।


 নবীন মাধবের অবস্থা ঃ ৭ শত টাকার লাভের গাঁতি, ১৫ গোলা ধান, ১৬ বিঘার বাগান, ২০ খান লাঙল, ৫০ জন মাইন্দার, পুজোর সময় সমারোহ, ব্রাহ্মন ভোজন, কাঙালি ভোজ ও বস্ত্র দান, বৈজ্ঞবের গান, আমোদজনক যাত্রা, অর্থব্যয়, পাত্র ভেদে একশত টাকা দান।


 আমীনদের অত্যাচার ঃ এরা রায়তদের ভালো ভালো জমিতে ‘দাগ’ মারতো অর্থাৎ নীল চাষের জন্য চিহিৃত করতো। রাইচরনের কথাÑ আমি সুমুন্দি খ্যান। জোর করে তার সাঁপোলতলার জমিতে দাগ দেয়। সাধুচরণ তার ভাই রায় চরনকে বলে কাঁদিসনে। কাল হাল গরুবেচে গাঁর মুখে ঝ্যাঁটা মেরে বসন্তবাবুর জমিদারিতে পালায়ে যাব। আমিনরা জোর করে দাদন দেয়, সাদা কাগজে সই করিয়ে নেয়, রায়তদের ধরে বেঁধে নিয়ে যায়। সাহেবদের জন্য মেয়ে সংগ্রহ করে দেয়। যেমন ক্ষেত্রমনিকে দেখে বলেছে। আমিনদের নিষ্ঠুরতা নাটকের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে রেবতী ঃ ওযে একটু জলখ্যাতি চেয়েলো। ও আমিন মশাই তোমার কি মাগ ছেলে নাই। কেবল লাঙ্গল রেখেছে আর এই মারপিট। কি করবো, কি পোড়া দেশে এলাম, ধনে প্রানে গ্যালাম——-। ১ম/২য়

নীলকরদের অত্যাচার ঃ সাধুচরণকে ধরে নিয়ে অপমান, রাইচরণকে মারপিট, সাধুচরণকে জুতোর গুঁতো মারা, ‘শ্যামচাঁদ’ দিয়ে আঘাত করা, জোর করে নীল চাষে বাধা করা, নীলের দাম না দেওয়া, গুদাম ঘরে আটকে রাখা, গালাগালি করা, আদালতে মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে আসা, যেমন তোপাকে ধরে নিয়ে আসে গোলকবসুর বিরুদ্ধে মিথ্যে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য। অত্যাচারের কথা ঘাতে বাইরে প্রচার না হয়, তাই বন্দী রায়তদের কোনো নির্দিষ্ট কুঠিতে বেশি দিন রাখতো না। নীলকরদের অত্যাচারের দোসর ছিল দেশীয় দেওয়ান ও আমিনরা।


নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ ও প্রকাশনার সমস্ত দায়িত্ব একাকী বহন করেছিলেন মানবপ্রেমিক পাদ্রী লঙ।
অনুবাদক হিসেবে মহাকবি মধুসূদন দত্তের বিশেষ ভাবে প্রচারিত হলেও এ নিয়ে মতপার্থক্য আছে। নীলকমিশনের সভাপতি,ডবলিউ,এস,সিটনকার-প্রচারে বিশেষ সাহায্য করেন।
পাদ্রী লঙ অনেক ‘কপি’ ইংল্যান্ডে বিশিষ্ট- ব্যক্তিদের কাছে পাঠান।
প্রকাশক ছিলেন- সি,এইচ,ম্যানুয়েল। বিচারে অপরাধী প্রমাণিত না হলেও তার ১০টাকা জরিমানা হয়।
১৮৬১ সালের ১৯,২০,২৪ শে জুলাই কলকাতার সুপ্রীম কোর্টে মামলা চলে।


শিক্ষিত ও খ্যাতনামা বাঙারিদের সঙ্গে সরকারি বেসরকারি ব্যবসায়ী ও সাধারণ ব্যক্তি সকলেই উপস্থিত থাকতেন বিচারের সময়। এমন কি দীনবন্ধুও উপস্থিত থাকতেন।
২৪ জন জুরির মধ্যে ১৭ জনকে ডাকা হয়।
এদের মধ্যে একমাত্র ভারতীয়-মানিকজি রুস্তমজি, নীলকরদের ‘প্রসিকিউটার’- পেটারসন ও কাউই। পাদ্রী লঙের পক্ষে ছিলেন- এ্যালিংটন ও নিউমার্চ।

বিচারপতি ছিল-স্যার মরডান্ট ওয়েলস্। পাদ্রী লঙের এক হাজার টাকা জরিমানা ও একবছরের জন্য জেল হয়। তাকে সাধারণ জেলে রাখা হয়। সুসাহিত্যিক কালীপ্রসন্নসিংহ জরিমানার টাকা দিয়ে দেন। রাজা প্রতাপ চন্দ্র সিংহ উকিল খরচ বহন করেন।

নাট্যকার ঃ জন্মÑ ১২৩৬ চৈত্র মাস ১৮৩০ সাল।
স্থান ঃ নদীয়া জেলার কাঁচরাপাড়া স্টেশনের কাছে চৌবেড়িয়া গ্রামে। (মাতুলালয়)
পিতা ঃ কালাচঁদ মিত্র।
পূর্ব পুরুষের বাসস্থান ঃ চব্বিশ পরগনার বেলিনী গ্রাম।
পিতৃদত্ত নাম ঃ গন্ধর্বনারায়ন। ছাত্রজীবনে তা ত্যাগ করে নাম দীনবন্ধু করে।
ছয় ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ট।


পিতা জমিদারি সেরেস্তায় অতি সামান্য বেতনে চাকুরি দেন।
দীনবন্ধু তা বাদ দিয়ে কলকাতা এসে মহাত্মা লঙ সাহেবের অবৈতনিক ইংরেজি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পাদ্রী লঙ তাকে বই ও অর্থ দিয়ে সাহাজ্য করতেন।
১৮৫৫ খ্রি ঃ এ ১৫০ টাকা বেতনে পাটনার পোস্ট মাস্টারের পদ গ্রহণ।
বিয়ে ঃ ১৮৫৫ খ্রিঃ ২৫ বছর বয়সে বাঁশ বেড়িয়ার সরকার বংশের কালিদাস সরকারের কন্যা অন্নদা সুন্দরীকে বিয়ে করেন।
তার সাত পুত্র ও এক কন্যা।
শেষ জীবন ও মৃত্যু ঃ
শেষ জীবনে অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরকারি রোষানলে পড়ে তাকে বার বার বদলি হতে হয়। স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। মাত্র ৪৩ বছর বয়সে ১৮৭৩ খ্রিঃ ১ লা নভেম্বর মারা যান।

ব্যক্তিত্ব ও শিল্পিমানস ঃ
ঈশ্বর গুপ্তের কাব্যশিষ্য। মনেপ্রাণে খাঁটি বাঙালি। দীনবন্ধু বস্তুবাদী ও বাস্তববাদী। মিশুক মানুষ, বাস্তব জীবন-চিত্র অঙ্কনে অত্যন্ত সহৃদয় এবং সহানুভূতিশীল। মধ্যবিত্ত সমাজের ভদ্র চরিত্র তার লেখনীতে জীবন্ত হয়নি, কারণ এ ধরনের চরিত্র সম্পর্কে তার ধারণার অভাব। মধ্যবিত্ত সমাজ তখনও গড়ে ওঠেনি। নিম্নবিত্ত চরিত্র অত্যন্ত জীবন্ত। কেননা এগুলো তার চোখে দেখা, অভিজ্ঞতার আলোয় আলোকিত।


কৌতুক প্রিয় ঃ
১৮৮০ খ্রিঃ জার্মান বিজ্ঞানী আভল্ক পন বেইয়ার আলকাতরা থেকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম নীল রং প্রস্তুত করেন। এই নীল ১৮৯২ খ্রিঃ থেকে বাজারে সস্তাদরে চালু হওয়াতে ভারতে নীল চাষ প্রায় বন্ধ যায়।

নীলদর্পণ নাটকে গণচেতনার স্বরূপ ঃ


নীলকরদের অত্যাচারে বাংলার বৃহত্তর জনসাধারণের মনে প্রতিরোধের ধারনা জাগিয়ে তোলো। নীলকে কেন্দ্র করে আন্দোলন দানা বাঁধে। অনেক রক্ত অনেক ত্যাগ কৃষকদের করতে হয়।
নীলকে নিয়েই নীলদর্পণ, কিন্তু নীল- আন্দোলনের সামগ্রিক ছবি এ নাটকে নেই। নীলচাষীরা যে শেীর্য বীর্যের পরিচয় দিয়েছিল তা এ নাটকে অনুপস্থিত। নাট্যকারের রাজনৈতিক সমস্যা সম্বন্ধেও সচেতন ছিলেন না। বাস্তবে যা দেখতেন তা তাকে নাড়া দিত। অত্যাচারিদের প্রতি গভীর সহানুভূতি ছিল বলেই নানা চরিত্র এ নাটকে উঠে এসেছে। গোলক বসু, সাধুচরণ, মোত্রমনির প্রতি অত্যাচারের ছবি একে পাঠক হৃদয়কে আকর্ষন করতে সক্ষম হয় নাট্যকার। এখানেই এর সার্থকতা গণ-আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র না থাকলেও নাট্যকারের গণ-চেতনার পরিচয় স্পষ্টভাবে প্রকাশিত।

নীলদর্পণ নাটকের উদ্দেশ্য মূলকথা ঃ

নাট্যকার একটি উদ্দেশ্য নিয়েই নীলদর্পণ নাটকটি লেখেন। নীলদর্পণ নাটকের ভূমিকায় নাট্যকার তার সে উদ্দেশ্যের কথা বলেছেন ও। নাটকটি সাময়িক উদ্দেশ্য সাধনে সার্থকথা ও লাভ করে। কিন্তু নীলচাষ , নীল হাঙ্গামা, নীল আন্দোলন বর্তমানে ইতিহাস হলেও নীলদর্পণ নাটকটি সাময়িকতাকে অতিক্রম করে এ যুগেও পাঠকও দর্শকমনে আবেদন সৃষ্টি করে। তাই নাটকটি উদ্দেশ্য মুলক নাটক হলেও উদ্দেশ্য সর্বস্বতা এর ধর্ম নয়। নাট্যকার জীবন ও জীবন সত্যের মধ্যে গভীর ভাবে প্রবেশ করে নাটকের চরিত্র গুলোকে এমনভাবে সুষ্টি করেছেন যে, সেগুলো সাময়িকতার গন্ডী-অতিক্রম করে চিরন্তনতার ঔজ্জ্বল্যে ভঅস্বর হয়ে উঠেছে।

নীলদর্পণ নাটকে ট্র্যাজেডির স্বরূপ ঃ

নীলদর্পণ নাটকে দুটি শক্তির সংঘাতের মধ্যে দিয়ে বিষাদময় পরিনতি ঘটেছে। কারুণ্য ও বিষাদময়তা ট্র্যাডেজডি হতে পারে কিনা তা বিচার্য। নীলদর্পণ নাটকে নিয়তির কোনো প্রভাব নেই। আছে মানুষে মানুষে সংঘাত। তাও আবার অসম দুটি পক্ষ। শেক্সপীয়রের নাটকের মতো কোনো ট্র্যাজিক হিরোর সাক্ষাতও এ নাটকে পাওয়া যায় না। এ নাটেক সুস্পষ্ট নায়ক-নায়িকাও নেই। নবীন মাধব চরিত্রটি ট্র্যাজিক হিরোর মর্যাদা পায় নি। যে-চারিত্রিক দুর্বলতার ছিদ্র পথ দিয়ে পতনের বীজ প্রবেশ লাভ করে তা এ চরিত্রে নেই। তাই শেক্সপীয়রীয় ট্র্যাজেডির মধ্যেও পড়ে না।

নীলদর্পণ নাটকে দুটো ত্র“টির কথা বলা হয়-
১। অসম শক্তির মধ্যে সংঘাত বলে, অত্যাচারীরর বিরুদ্ধে অত্যাচারীতের প্রতিরোধ যথেষ্ট তীব্র নয়।
২। মৃত্যুর ঘনঘটা ট্র্যাজিক রসকে বিঘিœত করেছে। তবে নাট্যকারের ট্র্যাজিক-চেতনা সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা যায় না। সমকালের প্রেক্ষাপটে নবীন মাধব ও তোরাপ-রাইচরনের প্রতিরোধ স্পৃহা যথেষ্ট তাৎপর্যময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মধ্যে দিয়েই তীব্র লাঞ্ছনা না পরাজয় এসেছে।


ঘনঘন মৃত্যুও একটা উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য এসেছে। ট্র্যাজেডির উপাদানও যথেষ্ট আছে। ট্র্যাজিক হিরোর যোগ্যতাও চরিত্রের মধ্যে ছিল, কিন্তু নাট্যকার তা পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারে নি। তাই নাটকটি ট্র্যাজেডির লক্ষণাক্রান্ত বটে, কিন্তু সার্থক ট্র্যাজেডি নয়।


নীলদর্পণ নাটকে নায়ক-সমস্যা ঃ

কোনো বিশেষ চরিত্র সকল ঘটনাবর্তের কেন্দ্রে অবস্থান করে উপন্যাস বা নাটকের কাহিনী ও বিভিন্ন চরিত্রকে প্রভাবিক ও নিয়ন্ত্রিত করে থাকে। তাই সাধারণত কেন্দ্রীয় ও নায়ক চরিত্র এক ও অভিন্ন হয়ে থাকে নাটক বা উপন্যাসে।
যাকে কেন্দ্র করে কাহিনী আবর্তিত হয় তা কেন্দ্রীয় চরিত্র। আর -যে চরিত্র কাহিনীর সকল ঘটনা ও চরিত্রকে নিয়ন্ত্রিত করে একটি পরিণতির দিকে নিয়ে যায় তা নায়ক চরিত্র।


এসব বিচারে ‘নীলদর্পণ’ নাটকে যথার্থ নায়ক চরিত্র পাওয়া কষ্টকর। নাট্যকার নবীন মাধবকে নায়ক করতে চাইলেও তার মধ্যে নায়কোচিত অনেক গুণও আছে, কিন্তু কাহিনীর গতি-প্রকৃতিতে তার প্রভাব কম।

নীলদর্পণ নাটকে চরিত্র-চিত্রণে কৃতিত্বঃ

নাটকে চরিত্র অন্যত্তম উপাদান।বাস্তব ও জীবন্ত চরিত্র নাটককে সার্থক করে তোলে। নাট্যকারের সকল বশ্রণির মানুষের সাথে মেশার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল বলেই নাটকে বর্ণিত বেশিরভাগ চরিত্রই তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা জাত। তবে সব চরিত্র তার শিল্পিসত্তায় সমানভবে সাড়া দেয় নি। উঠচ চরিত্র অপেক্ষ নিম্নশ্রেনির চরিত্র নাট্যকারের হাতে জীবন্ত হয়ে ধরা পড়েছে।

ভদ্র শ্রেণিঃ গোলক বসুর পরিবারভুক্ত চরিত্র গুলো প্রথম শ্রেণির
ভদ্রের শ্রেণি ঃ গোলক বসুর পরিচারিকা, সাধুচরণ, রাইচরনের পরিবার ও কৃষকশ্রেণিভূক্ত চরিত্রগুলো দ্বিতীয়শ্রেনির। দুই শ্রেণির চরিত্রই নাট্যকারের অভিজ্ঞতার অন্তর্ভূক্ত হওয়া সত্তে¡ও প্রথম শ্রেণির চরিত্রসৃষ্টিতে ব্যর্থ, এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চরিত্রসৃষ্টিতে সার্থকতা লাভ করেছেন। অবশ্য এর নানাবিধ কারণ রয়েছে।

(১) নির্লিপ্ততা রক্ষা না করা (২) পোষিত আদর্শ মেনে নেওয়া (৩) ভাষার দ্ব›দ্ব (৪) নাট্যক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে বিকশিত না করা (৫) উনিশ শতকের শিক্ষিত মানুষের পরিবর্তনশীল মানসিকতা।


(২) নীলদর্পণ নাটকের সংলাপ ঃ

সংলাপ কাহিনী ও চরিত্রকে গড়ে তোলে। এ নাটকে দুই শ্রেণির চরিত্র, তাই স্বাভাবিকভাবেই সংলাপ দুই রকমের। ১৮৬০ সালের দিকে বাংলা গদ্য মানসম্মত না হওযায় এবং শিক্ষিত মদ্যবিত্ত মানুষের মান ভাষা কী হবে তা নির্ধারিত না থাকায় নাট্যকার উচ্চ শ্রেণির চরিত্রের মধ্যে সাধু সাধু নীরস সংলাপ জুড়ে দিয়ে সংলাপকে যেমন নীরস করেছেন, চরিত্রগুলোকেও কাঠের পুতুল বানিয়ে ফেলেছেন। কৃত্রিম ও প্রাণরস বর্জিত। অন্যদিকে ভদ্রেতর চরিত্রে সংলাপ স্বাভাবিক ও নাটকীয় গুনসমৃদ্ধ ও চরিত্রানুগ হওযায় চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়েছে, সংলাপও হয়েছে প্রাণরসেপূর্ণ।

নীলদর্পণ
প্রকাশ ঃ
১৮৬০ সাল সেপ্টেম্বর (শবাব্দ ১৭৮২, ২ আশ্চিন) ঢাকা থেকে প্রথম প্রকাশ। ঢাকার বাংলাবাজার বাংলাযন্ত্রে শ্রীরামচন্দ্র ভৌমিক কর্তৃক মুদ্রিত।

মঞ্চাযর্ণ ঃ
১৮৬১ সাল মে মাসের শেষে অথবা জুনের প্রথমে পূর্ববঙ্গীয় বঙ্গভূমির উদ্যোগে প্রথম টাকায় অভিনীত।
১৮৭২ সালে কলকাতায় ন্যাশনাল থিয়েটারে।
১৮৭৩ সালে টাউন হলে গিরিশচন্দ্র কর্তৃক।

অনুবাদ ঃ ১৮৬১ সালের জুন মাসে। “ইন্ডিগো প্লান্টিং মিরর”
মুদ্রক ঃ সি, এইচ ম্যানুয়েল
প্রেম ঃ কলকাতা ওয়েলসলি স্ট্রিটের প্রিন্টিং এ্যান্ড পাবলিসিং প্রেস।
ব্যয়ভার ঃ ৫০০ কপির ভার বাংলা সরকার।
অনুবাদকার্য পরিচালনা ঃ বাংলা সরকারের সেক্রেটারি মি. সিটনকার এবং রেভারেন্ড জেমস্ লঙ।
ছোটলাট ছিলেন ঃ জি পি গ্রান্ট।

নীলদর্পণ-এর কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য ঃ


পাঁচটি অঙ্ক, আঠারটি দৃশ্য। প্রায় অর্ধশত চরিত্র। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভাবনাকে নাট্যকার এ নাটকে গেঁথে দিয়ে বিষন্নময় এক কাহিনী উপস্থাপন করেছেন।

নীলদর্পণ নাটকের আখ্যানগত বৈশিষ্ট্য ঃ

দুটো সামাজিক চিত্র। একদিকে উপদ্রুচাষী বা রাইয়ত কাহিনী, অন্যদিকে তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল গোলকবসুর মধ্যবিত্ত পরিবার। সহানুভূতি দেখাতে গিযে নীলকরদের রোষানলে পড়ে। নবীনমাধব নিজ শিক্ষা ও আদর্শ দ্বারা চাষীদেরকে রক্ষা করতে গিয়ে পিতার নামে মিথ্যা মামলা হয়, লাঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা, নবীন মাধব নিজের রক্ত দিয়ে অত্যাচারের প্রতিকার করে, মা সাবিত্রী উম্মদ হয়ে পুত্র বধূ সরলতাকে মেরে ফেলে, শেষে নিজে মরে।

রোগ সাহেব অত্যাচার করে সাধুচরনের কন্যা অন্তঃসত্ত¡া ক্ষেত্রমনিকে মেরে ফেলে রেবতীর শোক এ রকম এক মর্মস্পর্শী চিত্র অঙ্কিত হয়েছে মূলত নীলকরদের অত্যাচারে পীড়িত অসহায় ও প্রতিকারে অসমর্থ মানুষদের কাহিনী সামাজিক পটভূমিকায় অঙ্কিত, তবে শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের বিপর্যায় নাট্যকাহিনীতে প্রাধান্য লাভ করেছে।

নীলদর্পণ সংলাপগত বৈশিষ্ট্য ঃ

সংলাপ আসাধারণ গতি সম্পন্ন। সংলাপ দুই ধরনের বাংলার সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত, শহুরে শিক্ষা ও বিত্তগত অভিজাত বোধ, শহরে চালচলন জানা একদল। আবার এদের মধ্যে অনেকে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে যুক্ত। এ দুদলের মুখের ভাষা যথাসম্ভব অদ্র এবং কিছুটা কৃত্রিম। গোলক বসু বিত্তশালী তবে তার ভাষায় গ্রামীণ রসটি বিদ্যমান। নবীনমাধব ও বিন্দু মাধবের ভাষা শহুরে কৃত্রিম। বই এর ভাষায় এরা কথা বলে। এদের কথায় সংস্কৃত শব্দের বাহুল্য।

খেটে খাওয়া মানুষ সাধুচরন, রাইচরণ, তোরাপ ও চারজন রায়ত এদের ভাষা যথার্থ প্রাকৃত এবং যশোর অঞ্চলের মুখের ভাষা।

উড ও রোপ ইউরিােপীয়। তারা নীলকর, নীলচাষ এবং গোমস্তা ও আমিনদের সঙ্গে তাদের নিত্য পরিচয়। তারা দু’জনে ইংরেজি বাংলা বাংলা মিশিয়ে সংকর ভাষা বলে।

নীলদর্পণ নাটকে যে গ্রাম্যতা বা অশ্লীলতা তা আর্টের অশ্লীলতা নয়, তা কিছু চরিত্রের সহজাত অধিকার। কারণ তাদের ভাব, ভাষা ও ভঙ্গী তাদের নিজস্ব। এ সংশোধন করতে গেলে রসকে ক্ষুন্ন করতে হয়।

নারী চরিত্রগুলোর মধ্যে একদল উচ্চবিত্ত গৃহস্থ বাঙালি বধূ। অন্যরা গরিব চাষিগৃহের রমনী। স্বৈরশ্রী, সরলতা শহুরে মেয়ে, তাদের ভাষা বাবু বাংলা। তবে তারা নবীন বা বিন্দু মাধরের মতো কৃত্রিম নয়।

ক্ষেত্রমনি, রেবতী, বিশেষ করে আদুরীর ভাষা নিত্যদিনের ব্যবহৃত মুখের ভাষা। তাদের ভাষায় শ্লীল, অশ্লীল, ভদ্র, অভদ্র ইত্যাদির কোনো বিচার নেই। তাদের মুখের ভাষায় বাংলা দেশের একটি বিশেষ অঞ্চল তার সমস্ত সত্য, সৌন্দর্য এবং স্বাভাবিকতার আলোকে প্রদ্বীপ হয়ে আছে। এভাষা একদিকে যেমন সত্য ও জীবন্ত, অন্যদিকে এ ভাষা কাঠামোর মধ্যে প্রকৃত ও প্রাকৃত জীবনের প্রতিচ্ছবি অতি পরিচিত আত্মীয়ের মতো প্রস্ফুটিত।

নীলদর্পণ চরিত্রগুলোর পরিচয় ঃ

গোলক বসু ঃ স্বরপুরের সচ্ছল মানুষ। নবীন সাধব ও বিন্দু সাধবের বাবা। ৪র্থ অঙ্ক,তৃতীয় গর্ভাঙ্কে ইন্দ্রাবাদের জেলখানায় উদ্বন্ধনে আত্মহত্যা করে। মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে হাজতে যান।
নবীনমাধব ঃ প্রদান চরিত্র। নায়ক। নীলকরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চেষ্টা করে। ক্ষেত্রমনিকে উদ্ধার করে। সাহেবরা অপমান করলে রেগে গিয়ে সাহেবের বুকে লাথি মারে। সাহেব প্রতিশোধে মাথায় লাঠির আঘাত করে। মারা যায়।
সাধুচরণ ঃ বসুপরিবারের আশ্রিত মও প্রতিবেশী চাষী গৃহস্থ। বেগুনবেড়ের ফুটিতে ধরে নিয়ে যায়। চাষী হয়েও শিক্ষিত। দাদন গ্রহনের বিরুদ্ধে সোবচার, সংযত, এমনকি শ্যামচাঁদের প্রহারেও কাতরোক্তি করে নি।


রাইচরণ ঃ সাধুচরণের ভাই, অত্যন্ত জীবন্ত। জমি অন্ত প্রাণ, তাই সাঁপোল তলার জমিতে আমিন দাগ দিলে বিচলিত হয়েছে।
তোরাপ ঃ অবিস্মরনীয় সৃষ্টি। সাধারণ চাষী। নবীন সাধবের অনুগত। সাহসী, প্রতিবাদী। রসবোধ আছে। নবীনমাধব উদ্ধারে ও ক্ষেত্রমনির উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। নবীনকে বাঁচাতে সে ছোট সাহেবের তলোয়ারের আগাত হাত দিয়ে ঠেকাই।
সারিত্রী ঃ বসুপরিবারের কর্ত্রী। গোলকবসুর স্ত্রী। নবীনের মৃতবৎ দেহ দেখে উম্মাদ হয়ে যায়। সরলতাকে সাহেবের বিবি মনে করে হত্যা করে। জ্ঞান ফিরলে অনুশোচনায় মৃত্যু মুখে পতিত হয়।


সৈরিন্ধ্রী ঃ বসুপরিবারের বড় বউ। একমাত্র পুত্র বিপিন সে বাঙালি ঘরের আদর্শ বধূ।
সরলতা ঃ বিন্দু মাধবের স্ত্রী, বসু পরিবারের ছোট বউ।
রেবতী ঃ সাধুচরণের স্ত্রী, ক্ষেত্রমনির মা।
ক্ষেত্রমনি ঃ সাধু ও রেবতীর সন্তান। সুন্দরী। তাই আমিন তাকে দেখে ছোট সাহেবকে উপঢৌকন দেবার কথাভাবে। দাসদীঘিতে জল আনতে গেলে নীলকরদের লাঠিয়ালরা ধরে নিয়ে যায়। অন্তঃসত্ত¡ ছিল। নীলকরদের অত্যাচারে বাউপাত ঘটে, অকালে মৃত্যু।


উড ও রোগঃ বড় সাহেব উড, আর ছোট সাহেব রোগ। উড সাহেব নীলের মুনাফা ছাড়া কিছুই বোঝে না । প্রজাপীড়নে , মিথ্যা মামলা সাজাতে ও বিচারকদের পক্ষে আনত্তে তার ক্লান্তি নেই। তার নিজের কীর্তির কথাা গোপীনাথকে বলে। উডের ঘড়যন্ত্রে গোলক বসুর হাজত বাস হয়। বিচারকালে বিচারককে নিজের পক্ষে আনে। রোগ সাহেব উডের ন্যায়। তবে নারীর প্রতি লোভ।


পদী ময়রানী ঃ দুষ্ট স্ত্রীলোক। রক্ষিতা তবে নারীত্বের ধর্ম লুপ্ত হয় নি। ক্ষেত্রমণিকে রোগ সাহেবের কাছে আনলেও কাজটি যে অন্যায় তা ভোলে না।

দীনবন্ধু মিত্র
নীলদর্পণ নাটক

গোপীনাথ দাস ঃ নীলকরদের দেওয়ান। নীলকরদের খুশি করার জন্য সর্বদা প্রজাপীড়ন করে। ঘর জ্বালানো কুঠিতে চাষীদের আটকে রাখা, ধানী জমিতে নীলচাষে বাধ্য করা, ইত্যাদি কাজে উস্তাদ।
আদুরী ঃ বসুপরিবারের বহু দিনের ঝি।“ সেই সাগর ন্যাড়ের বিয়ে দ্রায় ছ্যা”- তার বিখ্যাত উক্তি, বিধবা, বর্ষীয়সী,স্বাধীর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। তার কথায় গ্রাম্যতা দোষ আছে। সব ব্যাপারে কথা বলে। বসু পরিবারের বিপর্যয়ে ব্যথিত হয়ে স্তব্ধবাক হয়ে পড়ে। কালা কিঞ্চিৎ বিকলবুদ্ধিও।

খোলা পাতা – বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক …

উপসংহার :


পরিশেষে বলা যায়, নীলদর্পণ-এর গঠন-শৈলী ও সংলাপগত বৈশিষ্ট্য একে সময়োত্তীর্ণ করে তুলেছে। নাটকের আখ্যানবিন্যাসে নীলদর্পণ ধাপে ধাপে শোষণের বাস্তবতা উন্মোচন করে দর্শককে সচেতন করে তোলে। সংলাপের স্বাভাবিকতায় নীলদর্পণ চরিত্রগুলোর যন্ত্রণা ও প্রতিবাদকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

গঠনগত সরলতায় নীলদর্পণ নাট্যরস ও সামাজিক বক্তব্যকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। আখ্যানের প্রবাহে নীলদর্পণ আবেগ ও যুক্তির সমন্বয় ঘটায়। ফলে নীলদর্পণ শুধু ঐতিহাসিক নাটক নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধের প্রতিচ্ছবি।

সামাজিক প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে নীলদর্পণ আজও প্রাসঙ্গিক। নাট্যরীতির দিক থেকে নীলদর্পণ বাংলা নাটকের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পাঠক ও দর্শকের মনে নীলদর্পণ দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। তাই গঠন, সংলাপ ও আখ্যান—সব দিক থেকেই নীলদর্পণ একটি অনবদ্য নাট্যকীর্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *